ভজ মন রাম চরণ

ভজ মন রাম চরণ

১৪

অশ্বমেধ যজ্ঞের প্রস্তুতি

রাজা দশরথ এক্ষনে অশ্বমেধ যজ্ঞের প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে অতঃ ডেকে পাঠালেন তাঁর রাজসভার প্রধান মন্ত্রীবর সুমন্ত্রকে।

এ এক সুন্দর সকাল। রাজা দশরথ ভাবছিলেন কিছু অতীত কথা। তিন তিনজন রানীকে বিবাহের কথা। অপত্যহীনতার কথা। অন্ধক মুনীর পুত্রশোকের কথা । জটায়ুর সেই  অদ্ভুত  আশ্বাসের কথা ! 

‘ জয় হোক মহারাজ ! ‘ 

‘ আসুন সুমন্ত্র ! ‘

 রাজার মহলে প্রধানমন্ত্রী সুমন্ত্র এসে দেখা দিলেন,‘ মহারাজ , আপনি এবার সুস্থ তো ? আমার অভিনন্দন গ্রহন করুন ।’

রাজা দশরথ বলেন,’ হ্যাঁ মন্ত্রীবর আমি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। তবু আমি আরো কয়েকটা দিন পরে রাজসভায় গিয়ে বসব। তবে সর্বপ্রথম আমি জানতে চাইব মাননীয় ঋষ্যশৃঙ্গ মুনি, যিনি আমাদের পরম অতিথি, আমাদের অশ্বমেধ যজ্ঞের প্রধান হোতা, যাকে আমি নিজে অঙ্গপাদ রাজ্য থেকে আমন্ত্রন করে এনেছিলাম, তিনি কেমন আছেন ? 

প্রধান অমাত্য সুমন্ত্র বলেন, ‘মহারাজ তিনি রাজকীয় মর্যাদায় রাজকীয় আতিথ্যে খুশিই আছেন।  তিনি কখনো রাজসভার নর্তকীদের নৃত্যগীত উপভোগ করছেন। কখনো তিনি সুন্দরী নারীদের সঙ্গে বসে রসিকতা উপভোগ করছেন। কখনো আবার সভাপন্ডিতদের সঙ্গে বসে তিনি গভীরশাস্ত্র আলোচনা করছেন। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন মহারাজ। তিনি মহা আনন্দেই আছেন। তাঁর আতিথেয়তার কোন ত্রুটি ঘটবে না। আমার নিবেদন, মহারাজ, এইবার যদি আপনি স্বচক্ষে সেই বিশাল যজ্ঞভুমি পরিদর্শন করে দেখেন।‘ 

রাজা বললেন,‘ অবশ্যই সুমন্ত্র। আমি অসুস্থ হয়ে কর্মে অত্যন্ত অক্ষম হয়ে পড়েছিলাম। এখন আমি সুস্থ হয়ে উঠেছি। অচিরেই আমি আমার যজ্ঞের সার্বিক প্রস্তুতি এবং সেই যজ্ঞস্থল পরিদর্শন করব।’

সুমন্ত্র বললেন , ‘যথা আজ্ঞা !’

এইবার একদিন রাজা দশরথ তাঁর রাজবেশ পরিধান করলেন। রাজমুকুট মাথায় ধারন করলেন। অতঃপর পাত্রমিত্রঅমাত্য সহযোগে তিনি রাজদরবারে গিয়ে সকল রাজ্যবাসীকে দেখা দিলেন।

রাজপ্রহরী রাজসভা গৃহে সরবে ঘোষনা করে,‘ সাবধান ! সাবধান !  ত্রিভুবন বিজয়ী সূর্যবংশী মহাবাহু মহাপ্রতাপ  মহামহিম শ্রীল শ্রীযুক্ত মহারাজা দশরথ রাজসভায় পদার্পণ করছেন।’

অমনি রাজসভা অঙ্গনে তুরি ভেরি কাড়া নাকাড়া বেজে উঠল রাজার সন্মানে। পাত্র মিত্র অমাত্যগন সকলে এবং রাজার মহামন্ত্রী সুমন্ত্র ও অন্যান্য মন্ত্রীগন এক্ষনে মহারাজাকে যথাবিহিত সন্মান প্রদর্শন করলেন। 

অতঃ মহারাজা দশরথ রাজসভায় রাজসিংহাসনে  আসন গ্রহনের পূর্বে এইবার সবাইকে আসন গ্রহন করতে ইশারা করলেন  এবং তৎপরে তিনি স্মিতহাস্যে সকলকে অভিবাদন জানিয়ে স্বয়ং আসন গ্রহন করলেন। তারপর তিনি হাতযোড় করে সভাসদ মুনিজন মন্ত্রীগন সবাইকে শ্রদ্ধা জানালেন।  

রাজাকে ঘিরে বসে আছেন আটজন মন্ত্রী।  ধৃস্টি, জয়ন্ত,  বিজয়,  সুবাস্ট্র, রাস্ট্র বর্ধন, অকোপ, ধরমপাল এবং  সুমন্ত্র। তাহারা প্রত্যেকেই তেজ ক্ষমা ও যশের অধিকারী।  তাহারা প্রত্যেকেই উদার বুদ্ধিমান ব্যবহার নিপুন এবং ইঙ্গিতজ্ঞ ।

সুমন্ত্র রাজ্যের মহামন্ত্রী। তিনি অর্থশাস্ত্রে সুপন্ডিত। মহামন্ত্রী সুমন্ত্র চিরঅনলস সেবক এবং তিনি রাজা দশরথের সখা ও সচিব। তিনি পরম বিশ্বস্ত। কর্মে ধীর। ব্যক্তিত্বে নিকষিত কনক রেখার মত।

রাজা দশরথ যজ্ঞের ব্যাপারে সবার সাথে বসে হৃষ্ট  আলাপ আলোচনা করলেন। অনেক অনেক রাজা মহারাজা এই যজ্ঞ দেখতে আমন্ত্রিত হবেন। এই যজ্ঞ প্রত্যক্ষ করতে আসবেন অনেক অনেক ঋষিমুনীগন। তিনি মন্ত্রীগনকে বললেন সব রাজা মহারাজাকে আমন্ত্রন করার উদযোগ করতে। তিনি বশিস্ট বামদেব প্রভৃতি হৃত্বিক ব্রাহ্মনগনকে তাঁর যজ্ঞের সংকল্প জানালেন। তাঁরা সকলে বললেন, ‘সাধু সাধু।’

তৎপরে রাজা দশরথ মহামন্ত্রী সুমন্ত্র সমভিব্যহারে ঋষ্যশৃঙ্গ মুনির সাথে রাজঅতিথি গৃহে গিয়ে একান্তে সাক্ষাৎ করলেন। রাজা দশরথ এইবার ঋষ্যশৃঙ্গ মুনিকে পাদ্য অর্ঘ্য দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। -’মুনীবর আমার রাজ্যে আমার আতিথ্যে আপনি  নিশ্চয়ই কুশলেই আছেন !’ 

বালক মুনি ঋষ্যশৃঙ্গ বলে ওঠেন , ‘  সকুশল  মহারাজ  সর্বকুশল !’

রাজা দশরথ এইবার ঋষ্যশৃঙ্গ মুনীর নিকট অনুমতি প্রার্থনা করলেন অশ্বমেধ যজ্ঞের প্রারম্ভের শুভক্ষনের।  

ঋষ্যশৃঙ্গ মুনী বললেন,’ মহারাজ, আগত বসন্তে যজ্ঞ অতি প্রশস্ত।’-

রাজা দশরথ আশ্বস্থ হলেন। বললেন , ‘যথা আজ্ঞা !’ 

অশ্বমেধ যজ্ঞ। এ এক বিরাট যজ্ঞ। কত রাজা মহারাজা ঋষি মুনি সিদ্ধগন আসবেন এই যজ্ঞ প্রত্যক্ষ করতে। সবাই কি আর এই যজ্ঞ করতে পারেন ? এতে চাই লোকবল, অর্থবল, ভুজবল  ও পরিশেষে মনোবল।

রাজা দশরথ এইবার যজ্ঞভূমি পরিদর্শন করতে চললেন তাঁর চতুরশ্ব রথে বসে। আশী যোজন দীর্ঘ নির্মীয়মান যজ্ঞভূমি দেখে তিনি বড়ই প্রীত হলেন। এক যোজন অর্থাৎ আট মাইল। 

পাঠক বুঝতেই পারছেন সরযুনদীর কুলে আশী যোজন দীর্ঘ এই যজ্ঞভূমি ঠিক কত বড় স্থান। সুচারু রূপে নির্মিত এই পবিত্র যজ্ঞস্থান উচ্চবেদী সম্পন্ন। তাকে ঘিরে বড় বড় চারটি স্বর্ণমণ্ডিত স্তম্ভ। সরজু নদীর তীর ধরে এইরকম অনেকগুলি যজ্ঞবেদী এবং ওই একই রকম চারটি করে স্বর্ণমণ্ডিত স্তম্ভঘেরা যজ্ঞগৃহ পরপর দৃশ্যমান। পুরবাসীগনের সশ্রম যোগদানে গড়ে উঠেছে এমন সুদৃশ্য এক বিশাল যজ্ঞভুমি। 

এইবার বৎসরান্তে একদিন অযোধ্যা নগরীতে মহাসমারোহে ফিরে এলো রাজা দশরথ প্রেরিত সেই অশ্বমেধের ঘোড়া।   রাজার প্রিয় ঘোড়া অম্বর সারাদেশ ঘুরে এসেছে বিজয় গর্বে। দূর থেকে শোনা যেতে থাকে কাড়া নাকাড়া আর শিঙ্গার ধ্বনি। অশ্বমেধের এই অশ্ব গত এক বৎসরে যতদূর ভ্রমণ করে এসেছে তত দূরের সব শক্তিধর রাজা মহারাজারা তাদের বশ্যতার নিদর্শন স্বরূপ অশ্বের গায়ে কি কপালে তাদের নামাঙ্কিত জয়টীকা পরম যত্নে অঙ্কন করে দিয়েছেন। অশ্ব নিয়ে রাজ অনুচরগন নগরে প্রবেশ মাত্র দলে দলে কৌতূহলী নগরবাসী রাস্তার দুই ধারে ধারে পায়ে পায়ে রাজ প্রাসাদের দিকে এগিয়ে চলতে থাকে। তাদের যেন আর মনের আস মেটেনা রাজ অশ্বের গর্বিত পদক্ষেপ দেখে । আসলে এ যে অশ্বমেধের ঘোড়া। 

রাজা রাজপ্রাসাদ থেকে তাকিয়ে দেখেন ওই যে  তাঁর প্রিয় অশ্ব অম্বর ফিরে এসেছে। যে  যজ্ঞাশ্ব ছাড়া হয়েছিল এক বৎসর পূর্বে তা এখন ফিরে এলো রাজমহলে সগর্বে কেশর দোলাতে দোলাতে দুন্দুভিধ্বনি সহযোগে। এইবার  অযোধ্যার রাজপ্রাসাদে রাজসূয় যজ্ঞের কর্মকান্ড শুরু হয়ে গেলো মহা সমারোহে। অশ্বমেধের ঘোড়া মুক্ত করবার এক বৎসর পরে যজ্ঞের জন্য দীক্ষা নিতে হয় যজ্ঞকারীকে।

এইবার মহারাজ দশরথ মহর্ষি বশিস্টকে বললেন,‘ মুনিবর , আপনি যথাবিধি আমার যজ্ঞ সম্পাদন করুন। যজ্ঞের কোন অঙ্গে কোন রূপ বিঘ্ন না হয় তার বিধান করুন। আপনি আমাদের কুলগুরু। এই আরব্ধ যজ্ঞের ভার গুরুদেব আমি আপনার হাতেই সমর্পণ করলাম।’

বশিস্ট বললেন,‘ তথাস্তু।’

প্রধানমন্ত্রী সুমন্ত্র এসে জানালেন,‘মহারাজ,সমস্ত  নিমন্ত্রিত রাজা  ব্রাহ্মন পৌরজন এবং অতিথি বর্গের জন্য উপযুক্ত বাসগৃহ, অশ্বশালা, হাতিশালা  প্রভৃতি নির্মাণকার্য সমাপ্ত হয়েছে।’

রাজা দশরথ সেই সংবাদে হৃস্ট হলেন। 

বশিস্ট বললেন, ‘ মহারাজ ,সমুদয় আমন্ত্রিত ও  নিমন্ত্রিত সকলকে যথোপযুক্ত সমাদর যথাবিধি যত্ন সহকারে অন্নপ্রদান বিধেয়।‘

রাজা বললেন , ‘ যথার্থ।  আমি মহামন্ত্রী সুমন্ত্রকে ব্যবস্থাদির অনুমতি দিলাম। ‘ 

বশিস্টের সেই আদেশ শুনে সুমন্ত্র জানালেন, ‘ মুনিবর আপনার আজ্ঞা পালনে কোন ত্রুটি হবে না।’

মহারাজা দশরথ মন্ত্রিবরকে বললেন,’ সুমন্ত্র পৃথিবীতে যত  ধার্মিক রাজা আছেন তাদের নিমন্ত্রন কর।

মন্ত্রিবর সুমন্ত্র রাজার অনুরোধে এবং বশিস্টের উপদেশ অনুসারে সকলকে নিমন্ত্রনের ব্যবস্থা করলেন। 

বশিস্ট  বললেন, ‘ মহারাজ যজ্ঞাশ্ব এতদিনে ফিরে এসেছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে অশ্বমেধ যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হবে। এই ধরনীর সমস্ত রাজামহারাজাগন আপনার বশ্যতা স্বীকার করেছেন। সেই কারনে এই অশ্বমেধ যজ্ঞ। এই অশ্বমেধ যজ্ঞের পরে হবে আপনার পুত্র কামনায় পুত্রেষ্টি যজ্ঞ।’

রাজা বললেন, ‘ যথার্থ গুরুদেব। আমি প্রস্তুত !’

অনন্তর এক শুভনক্ষত্রযুক্ত দিবসে রাজা দশরথ  রানীগন সমভিব্যহারে যজ্ঞভূমিতে গেলেন এবং পত্নীগন সহ যজ্ঞে দীক্ষিত হলেন।

বশিস্টাদি দ্বিজগন এইবার ঋষ্যশৃঙ্গকে পুরোবর্তী করে শাস্ত্রানুসারে যজ্ঞের সকল কর্ম আরম্ভ করলেন।

বশিষ্ট বলেন, ‘মহারাজ যজ্ঞের প্রয়োজনে যতেক দ্রব্য বলি তাহা আনান শীঘ্রগতি। যব গম ধান্য লাগিবে প্রচুর। সুগন্ধি আতপ চাল আর দধি দুগ্ধ ঘৃত মধু তার ও করুন আয়োজন। তিল চাই রাশি রাশি, চাই এক লক্ষ ঘৃতের কলস। চাই তিরাশি লক্ষ বিল্বদল। তৎসহ চাই তিনশত শ্রী ফল। এবং চাই সেই শ্রীফল গাছের অনেক অনেক কাঠ যজ্ঞের নিমিত্তে। এ ছাড়া ও চাই বড় বড় জ্বালায় সমুদ্র জল।’

মন্ত্রীবর সুমন্ত্র বশিস্টদেবের কথায় যজ্ঞের সমস্ত দ্রব্য সংগ্রহ করিয়ে আনলেন। বড় বড় জ্বালায় ভরে সমুদ্র জল আনালেন। শ্রীফলের কাঠ সংগ্রহ করে আনালেন। যজ্ঞের জন্য তিরাশিলক্ষ বিল্বদল, রাশি রাশি তিল, থরে থরে ঘৃতের কলস, ভারে ভারে দধি দুগ্ধ ঘৃত মধু আর আতপ চাল যৎপ্রয়োজন তৎসমগ্র জোগাড় করে আনলেন। এ যে মহাযজ্ঞ। এ যজ্ঞ দেখতে আসবেন মুনিগন ঋষিগন সিদ্ধগন। যজ্ঞ দেখতে আসবেন ধনাধক্ষ্য কুবের এবং বরুনদেব এবং স্বয়ং যমরাজ এবং পবনদেব। আসবেন সসাগরা ধরনীর মহামান্য সব নৃপতিগন। 

যজ্ঞভূমিতে সব মুনিগণ যজ্ঞ করতে বসলেন। বেজে উঠল জয়ঢাক শিঙ্গা এবং কাড়া নাকাড়া। 

যজ্ঞ দেখতে এলেন ধনাধক্ষ্য কুবের, এলেন বরুণদেব, এলেন স্বয়ং যমরাজ এবং  পবনদেবও স্বয়ং এলেন সেই যজ্ঞে।

যজ্ঞ দেখতে এলেন মিথিলাধিপতি জনকরাজ এবং রাজ শ্বশুরত্রয়। তাঁরা হলেন কোশলরাজ , কৈকেয় রাজ এবং মগধ রাজ। রাজার বয়স্য অঙ্গরাজ্যের রাজা লোম্পাদ। এলেন কাশীরাজ, শ্বাল্য রাজ, মগধ রাজ। 

এ ছাড়া বিদ্যানগর বিজয়নগর কাঞ্ছি কর্নাট সব রাজ্যের রাজারা সকলে নিয়ে এলেন বিস্তর ঠাট। যজ্ঞ করতে বসেছেন সকল মুনিগণ বশিষ্ট্য দেবের পৌরহিত্যে। এইবার ঋষ্যশৃঙ্গ মুনিকে যজ্ঞের হোতা করে শুরু হল মহাযজ্ঞ।   

যজ্ঞস্থলে  যতেক ব্রাহ্মন, দাস, তপস্বী ও শ্রমনগন এবং বৃদ্ধ ও ব্যাধিগ্রস্থ এবং স্ত্রী ও বালকেরা নববস্ত্র দান পেলেন এবং তাহারা অনবরত আহার করতে লাগলেন। প্রতিদিন পর্বতাকার বহু অন্নকূট সজ্জিত হল। সুবক্তা বিপ্রগন পরস্পরকে হারাবার ইচ্ছায় শাস্ত্রীয় বিচারে প্রবৃত্ত হলেন। যজ্ঞস্থলে একুশটি কাষ্ঠনির্মিত যূপ রাখা হল। ইষ্টক দ্বারা  যজ্ঞ কুন্ড নির্মাণ করে তাতে স্বর্ণপক্ষ গরুড়াকার অগ্নি স্থাপন করা হল। দেবতার উদ্দেশ্যে যে সকল পশু উরগ পক্ষী ও অশ্ব ও জলচর সংগৃহিত ছিল সমস্তই ঋষিগন যথাশাস্ত্র বধ করলেন। তৎপরে অশ্বমেধের সেই ঘোড়াকে মহারাণী কৌশল্যা সম্যক পরিচর্যা করে পরম আনন্দে তিন খড়্গের আঘাতে তাকে বধ করলেন। শ্রৌতকর্মে নিপুন ঋত্বিকগন সেই অশ্বের বসা নিয়ে যথাশাস্ত্র হোম করলেন। রাজা দশরথ সেই ধূম আঘ্রান করলেন।  যজ্ঞকালে রাজা যাজক ও ব্রাহ্মণগনকে প্রচুর দক্ষিনা দিলেন। 

                                                         [আদিকান্ড ১ ]

   ১৫

জয় বিজয়                                                         

যক্ষরাজ বৈশ্রবন, যিনি কুবের নামে পরিচিত ছিলেন এবং রাক্ষসরাজ রাবণ যার আর এক নাম  ‘দশগ্রীব’ , তাঁরা উভয়ই বিশ্রবা মুনির পুত্র। রাবণ এবং বৈশ্রবণ তাঁরা পরস্পর বৈমাত্রেয় ভাই। কিন্তু রাবন হলেন রাক্ষস তাঁর মাতা কৈকসীর রাক্ষস জাতির সুত্রে। রাবন এবং কুম্ভকর্ণ এবং বিভীষণ তারা তিন ভাই । বিভীষণ রাক্ষস হয়ে ও দেবোপম। কিন্তু রাবণ বেদজ্ঞ হয়েও রাক্ষস স্বভাব। এবং কুম্ভকর্ণ তামসিক গুনসম্পন্ন। তিনি ঘুমিয়ে থাকবেন বলে বর চেয়ে নিয়েছিলেন ব্রহ্মার কাছে। তাই তাঁর তামসী নিদ্রা।

পুরাকালের কথা। ত্রেতা যুগের ত্রাস  যিনি রাবণ এবং তাঁর ভাই কুম্ভকর্ণ  ছিলেন বৈকুণ্ঠলোকে শ্রীবিষ্ণুর দুই দ্বারপাল। তাদের নাম ছিল জয় ও বিজয়। কিন্তু তাদের দুজনকে এক অমার্জনীয় অপরাধের জন্য পৃথিবীতে জন্ম নিতে হয়েছিল।

সে এক সুন্দর কাহিনী। 

একবার ব্রহ্মার চার মানসপুত্র সনৎকুমার চতুষ্টয় বা সনকাদি চারভাই  শ্রীবিষ্ণুর দর্শনপ্রার্থী হয়ে বৈকুণ্ঠে এসে হাজির হলেন। 

ব্রহ্মার সেই মানসপুত্র চারজন হলেন সনক [ অর্থ আদি], সনাতন [অর্থ চিরন্তন], সনন্দন [অর্থ উৎফুল্লতা]  এবং সনৎকুমার [অর্থ চিরকুমার]। তাঁরা চারজনই শিশুস্বভাব বিশিষ্ট এবং তাঁরা প্রকৃত অর্থেই শিশুসুলভ ও শিশুসদৃশ দেখতে ছিলেন। তাঁরা নিজের ইচ্ছায় সারা জগত ভ্রমন করতে পারতেন। সেই শিশুসদৃশ সনকাদি চারভাই একদা শ্রীবিষ্ণুর দর্শন লাভ করতে একবার তাঁরা চারজনেই বৈকুণ্ঠলোকে এসে হাজির হলেন। বৈকুণ্ঠলোকে তাহাদের অবারিত দ্বার । 

তাহারা বৈকুন্ঠপুরীর প্রথম ছয়টি দ্বার অতিক্রম করে সপ্তম দ্বারের সামনে হাজির হলেন। কিন্তু সেই সপ্তমদ্বারের সন্মুখে দন্ডায়মান দুই দ্বারী জয় ও বিজয় সেই শিশুসদৃশ সনকাদি চার ভাইকে দেখামাত্রই তাদের ভিতরে প্রবেশ করতে বাধা দিলেন। –  ‘ আরে , এ কোন চার শিশু এমন অসময়ে এই বৈকুন্ঠধামে ?  – অহো , তিষ্ঠ বালকাঃ তিষ্ঠ ! 

সনকাদি চারভাই অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন এবং বলে ওঠেন, ‘  ওহে ,দ্বারপাল । শোনো !  আমরা সনকাদি চারভাই। আমরা শ্রীহরির দর্শনপ্রার্থী !’  

ঘটনাক্রমে বৈকুণ্ঠ লোকের দুই দ্বারপাল সেই জয় এবং বিজয়, তাঁরা কেহই ব্রহ্মার মানসপুত্র সনকাদি চার ভাইয়ের সংবাদ বিশেষ অবগত ছিলেন না। পরন্তু সেই শিশুদর্শন চারজন কুমারকে তাঁরা শ্রীহরির সাথে সাক্ষাৎ করার মতো বিশেষ যোগ্য বা গুরুতর তেমন কেহ হতে পারে বলে মনে করলেন না। আর তাই দুই দ্বারপাল জয় এবং বিজয় সনকাদি সেই চারভাইকে বললেন,‘ কিন্তু স্বয়ং বিষ্ণুদেব এখন ক্ষীরসাগরে তাঁর  শয্যায় বিশ্রাম করছেন। ফলে তিনি এখন কাহাকে ও দর্শন দিতে অপারগ।’ 

সনৎকুমার চতুষ্টয় এ কথায় ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন এবং তাঁরা সেই দুই দ্বারপাল জয় এবং বিজয়কে বলে ওঠেন, ‘ ওহে দ্বারীগন, শ্রীহরি তাঁর দর্শন প্রার্থীদের সর্বদা দর্শন দিয়ে থাকেন। তাঁর ভক্তদের তিনি কখনোই নিরাশ করেন না। অতএব কেন তোমরা অযৌক্তিকভাবে আমাদের চারজনকে শ্রীহরির দর্শনে বাধা দিতে উদ্যত হয়েছো ? এর জন্য ওহে  জয় এবং বিজয়, তোমরা দুই দ্বারপাল এখন মরনশীল মানবরূপে ভূলোকে জন্মগ্রহন করবে এবং তোমরা দুইজনে অচিরেই তোমাদের দৈবশক্তি রহিত হবে। পৃথিবীর সাধারন মানবের মতোই তোমরা ও জন্মমৃত্যুর মায়াচক্রে পতিত হয়ে তোমাদের জন্ম অতিবাহিত করবে। এই আমাদের অভিশাপ।‘

জয় বিজয় বুঝতে পারেন তাদের দ্বারা কোন বিরাট বিভ্রম সংঘটিত হয়ে গেছে। কিন্তু এখন উপায় ? 

এমত সময়ে শ্রীবিষ্ণু সেখানে প্রকট হলেন এবং সনকাদি চারকুমারকে দেখে চমকে উঠলেন এবং বললেন, ‘একি ! আপনারা চতুঃসনকগন, আপনারা এই সময় আমার এইখানে, এই বৈকুন্ঠধামে? ‘

সনৎকুমার চতুষ্টয় বলেন , ‘ আমরা আপনার দর্শন প্রার্থী হয়ে এসেছিলাম ভগবন !’

শ্রী হরি বললেন , ‘ আহা , আমাকে কেউ কোন সংবাদ কেন প্রেরণ করেনি একবার ও ? একি, দ্বারপাল জয় বিজয় !  তোমরা কি চেনো না এই চার সনৎকুমারকে ? তোমরা আমাকে সংবাদ প্রদান করতে পারলে না ?  অহো ,  সনৎকুমারগন আসুন আসুন । বলুন  কি সংবাদ ? আপনাদের কুশল তো ?’

সনকাদি চারভাই তখন  শ্রীহরিকে বললেন,’হে দেব নারায়ন, আমরা আপনার দর্শন প্রার্থী হয়ে এসেছিলাম। কিন্তু আপনার এই দুই প্রবল দ্বারপাল আমাদের চারভাইকে বিনা কারনে আপনার কাছে দেখা করতে যেতে বাধা দেন। আমরা তাই এঁদের ধৃষ্টতার জন্য অভিশাপ দিয়েছি এই যে, এঁরা সাত সাতটি জন্ম পৃথিবীতে গিয়ে তাদের কৃতকর্মের পাপ ভোগ করবে। তাঁরা পৃথিবীতে আপনার নাম নিয়ে নিরত থেকে তাদের পাপমোচন অন্তে আবার এই বৈকুন্ঠে  প্রত্যাবর্তন করবে।’ 

সনকাদি চার ভাইয়ের এমত কথা শুনে শ্রী হরি চমৎকৃত হলেন এবং বললেন , ‘ অহো ! এই অভিশাপ কে খন্ডন করতে পারে ?  কেন তোমরা আমাকে সনৎকুমার চতুষ্টয় এর সংবাদ প্রদান করলে না ?’

দুই দ্বারপাল জয় এবং বিজয় তখন হাহাকার করে শ্রীবিষ্ণুর চরণে পতিত হয়ে যোড়হস্তে যথাসম্ভব অনুনয় আবেদন অনুরোধ করতে থাকে,‘ হে প্রভু , আমরা  আমাদের অজ্ঞাতে ভুল করে ফেলেছি। আপনি আমাদের ক্ষমা করে দিন। প্রভু আমরা সনকাদি চারভাইয়ের কথা অবগত ছিলাম না। আমাদের দয়া করুন। প্রভু , আপনি সনৎকুমার চতুষ্টয়কে বলুন আমাদের এমন শাপ হতে রহিত করতে। আমরা আমাদের দোষ স্বীকার করছি।’

তখন স্বয়ং নারায়ন সনকাদি চারভাইয়ের কাছে জিজ্ঞাসা করলেন,’ মান্যবর , আপনারা সনৎকুমার চতুষ্টয়, এদের পাপের জন্য দ্বিতীয় কোন সুযোগ কি দেওয়া সম্ভব? ‘

সনকাদি চারভাই বললেন,  ‘ বেশ আপনি  যা ভালো মনে করেন, তেমন শর্ত আপনি এদের কাছে রাখতে পারেন। ‘

ভগবান  শ্রীবিষ্ণু  তখন দ্বারপাল দুই ভাইকে বললেন, ‘জয় এবং বিজয়, তোমরা আমার প্রিয় দ্বারপাল নিশ্চয়। তোমাদের ভুল আচরনের জন্য সনকাদি চারভাই যে শাপ দিয়ে ফেলেছেন সেই শাপ কোনভাবেই মোচন করা সম্ভব নয়। তবে সেই শাপ হ’তে নিস্তারের দুটি পথ আছে। ‘

দ্বারপালদ্বয় জয় এবং বিজয় সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করেন, ‘ কি সেই পথ প্রভু , আমাদের আপনি বলুন !  ভগবন, আমরা  এমন ভুল আর কখনোই করব না।’ 

ভগবান শ্রীবিষ্ণু বললেন, ‘ জয় বিজয়, আমার বৈকুন্ঠ লোকের দ্বারপাল ,  শোনো !  প্রথমতঃ সনকাদি চারভাইয়ের শাপে তোমরা সাতজন্ম পৃথিবীতে আমার সেবক হয়ে কাটাতে পারো। ‘

জয় বিজয় আর্তনাদ করে ওঠেন, ‘ না প্রভু না, এমন শাস্তি আপনি আমাদের দেবেন না।  সাতজন্ম আমরা আপনাকে ছেড়ে মর্ত্যলোকে কাটাতে পারবনা।  প্রভু , এ কোন মতেই সম্ভব না। আপনি আমাদের শাস্তি কিঞ্চিৎ কম করে দিন ভগবন।’ 

নারায়ন বললেন,‘ আমি তবে দ্বিতীয় প্রস্তাব রাখছি জয় বিজয় ?’

জয় বিজয় সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করেন, ‘ কি সেই প্রস্তাব আমাদের বলুন , হে দেব নারায়ন ?’

দেব নারায়ন বলেন, ‘ জয় বিজয়,  সাতজন্ম অপেক্ষা তোমরা দুই ভাই তবে তিন জন্ম  আমার বিভিন্ন অবতারের শত্রু হয়ে জন্ম নিতে পারো এবং আমার হাতে তোমাদের মৃত্যু হলে তোমরা আবার এই বৈকুণ্ঠ লোকে ফিরে আসতে পারো।’ 

জয় এবং বিজয় প্রশ্ন করে, ‘ প্রভু , এ আপনি কি আদেশ করছেন আমাদের ?  তিনজন্ম আপনার সঙ্গে আমাদের বৈরীতা করতে হবে ? সে কি ভাবে ?’

নারায়ন বলেন,‘ হ্যাঁ বৎস, তোমাদের আমার সঙ্গে বৈরীতা করতে হবে। তারপর সেই বৈরিতা অন্তে তোমরা আমার হাতে মৃত্যুবরন করে আবার এই বৈকুন্ঠ লোকে ফিরে আসতে পারবে !’’

সনকাদি চার ভাই বললেন, ‘ হ্যাঁ এ ও সম্ভব। বৈরীতা অন্তে শ্রীহরির হাতে মৃত্যুবরণ করে এঁরা আবার স্বর্গলোকে ফিরে আসতে পারে ।’ 

বৈকুণ্ঠলোকের দুই দ্বারী জয় এবং বিজয় অগত্যা সেই কথাই মেনে নেয়।  সাতজন্ম শ্রীহরি হতে বিযুক্ত হয়ে থাকা অপেক্ষা 

তিন জন্ম সেও তবে অনেক কম সময় শ্রী হরি হতে দূরে থাকা। তাঁরা দুজনেই অতএব শ্রী হরির সেই প্রস্তাবেই অগত্যা রাজী হয়। তাঁরা সনকাদি চার ভাইয়ের শাপ হতে দ্রুত নিস্তার পাবার জন্য সাতজন্ম অপেক্ষা তিনজন্ম বরং শ্রী হরির শত্রুতা করে এবং অবশেষে তাঁর হাতে মৃত্যুবরণ করে দ্রুত স্বর্গে ফিরে আসতে আগ্রহী হন। 

তাই তাঁরা এখন অনন্যপায় হয়ে শ্রীবিষ্ণুর কাছে আবেদন করেন, ‘প্রভু, আমরা আপনার বাক্য অনুযায়ী তিন তিনজন্ম মর্ত্যলোকে থেকে এই বৈকুন্ঠপুরীতেই  ফিরে আসতে ইচ্ছা করি।  এবং তাহাতে যদি আপনার সাথে শত্রুতা করে আপনার হাতেই  মৃত্যুবরন করতে হয় , তবে , সে ও ভালো। আমরা ও তেমনই চাই।’

নারায়ন বলেন,’ তথাস্তু, যেমন তোমাদের ইচ্ছা।’

জয় এবং বিজয় বৈকুণ্ঠের দুই দ্বারপাল এই পৃথিবীতে প্রথম জীবনে অর্থাৎ কৃত [সত্য]  যুগে মহর্ষি কশ্যপ এবং প্রজাপতি দক্ষর কন্যা দ্বিতির দুই পুত্র হিরন্যাক্ষ ও হিরন্যকশিপু নামে জন্মগ্রহন করেন। সেই সত্যযুগে শ্রীবিষ্ণু তখন বরাহ অবতার হয়ে হিরনাক্ষ্যকে বধ করেন এবং ঐ যুগেই শ্রী বিষ্ণু তার ভক্ত প্রহ্লাদকে রক্ষা করতে নৃসিংহ অবতার  হয়ে  প্রহ্লাদের পিতা  হিরন্যকশিপুকে বধ করেন। 

দ্বিতীয় জীবনে ত্রেতাযুগে তারা ঋষি বিশ্রবা ও রাক্ষসী নিকষার দুই পুত্র রাবন ও কুম্ভকর্ণ নামে জন্মগ্রহন করেন এবং শ্রী বিষ্ণুর সপ্তম অবতার রাম এই ত্রেতাযুগে সেই দুই ভীষণ রাক্ষসকে বধ করেন।

তৃতীয় জীবনে দ্বাপর যুগে তাহারা শিশুপাল এবং দন্তবক্র নামে জন্মলাভ করেন এবং এই জীবনে তাঁরা শ্রীকৃষ্ণের হাতে নিহত হন। 

                                         [আদিকান্ড ১ ]

   ১৬

অথ রাবণ কথা

ব্রহ্মার পুত্র পুলস্ত্য। তস্য পুত্র বিশ্বশ্রবা। বিশ্বশ্রবার দুই পক্ষ। প্রথম পক্ষের পুত্র কুবের। এবং বিশ্বশ্রবার দ্বিতীয় পক্ষের পুত্র হলেন রাবণ। এবং তাঁর  অন্য দুই ভাই , কুম্ভকর্ণ এবং বিভীষণ।

কুবের হলেন ধনলোকপাল। তিনি একজন গন্ধর্ব। কিন্তু রাক্ষস কেন রাবণ ?

আসলে রাবন গুণে রাক্ষস কিন্তু জাতিতে ব্রাহ্মন। কারন তাঁর পিতা একজন ঋষি ছিলেন এবং তাঁর মাতা ছিলেন রাক্ষস প্রধান সুমালির কন্যা কৈকেসী। রাবন এর আসল নাম দশানন। শিব তাকে রাবন আখ্যা দেন।

একবার দশানন তাঁর আরাধ্য দেবতা দেবাদিদেব মহাদেবকে কৈলাস থেকে লংকায় নিয়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। শিব সেই প্রস্তাবে রাজী ছিলেন না। রাবণ তখন তার শক্তি দিয়ে সমগ্র কৈলাশ পর্বতকেই উঠিয়ে নিয়ে লংকায় স্থাপিত করার মানসে যখন ব্যাপৃত,তখন ভগবান শিব তাঁর পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দিয়ে কৈলাস পর্বতকে সজোরে চেপে ধরেন। এমন অসহনীয় চাপে দশানন এর হাতের আঙ্গুল প্রচন্ড যন্ত্রণায় নীলবর্ণ  ধারন করে। দশানন ব্যাথার চোটে চীৎকার করে ওঠেন এবং শিবের কাছে ক্ষমা চেয়ে তিনি তখন দেবাদিদেবকে তুস্ট করতে তৎক্ষণাৎ স্বরচিত স্তোত্র শিবতাণ্ডব মুখে মুখে গেয়ে ওঠেন।  মহেশ্বর অবাক হয়ে যান দশাননের এমন স্তুতিতে এবং দশাননকে তিনি রাবণ বলে আখ্যায়িত করেন। রাবন শব্দের অর্থ যে তেজের সঙ্গে চীৎকার করে সবাইকে সন্ত্রস্ত করে তোলে।

রাবন একজন সঙ্গীত পারদর্শী ও ছিলেন। তিনি একজন দক্ষ বীনাবাদক ছিলেন। রাবনের সঙ্গীতের ভীষণ দক্ষতা ছিল। রাবন এমন মধুর বীণা বাজাতেন যে, সেই কারনে দেবতারা ও তার বীণাবাদন শুনতে লংকায় চলে আসতেন। নয় কি অদ্ভুত ?

রাবণ ছিলেন ব্রহ্মজ্ঞানী। রাবণ ছিলেন মহাপন্ডিত বেদজ্ঞ বেদদর্শী। এই সেই রাবণ যিনি দশগ্রীব , দশানন ও বটে। 

  • unchecked[] [] [] [] [] [] []          

পুরাকালে সেই সত্যযুগে পুলস্ত্য নামে একজন ব্রহ্মজ্ঞানী মহাঋষি ছিলেন। তিনি প্রজাপতি ব্রহ্মার পুত্র। তিনি একদিন তপস্যা করতে গেলেন সুমেরু শিখরে। 

সুমেরুপর্বত পৃথিবীর কেন্দ্রে (“ভুব-মধ্য”) জম্বুনদীর (জম্বুদ্বীপ) ভূমিতে অবস্থিত। সুমেরুঃ পৃথ্বী-মধ্যে ক্রয়তে দৃশ্যতে ন তু”।  

সুমেরু পৃথিবীর কেন্দ্রে আছে বলে শোনা যায়, কিন্তু দেখা যায় না। মহাজাগতিকভাবে মেরুপর্বত পূর্বে মন্দরাচল পর্বত, পশ্চিমে সুপার্শ্ব পর্বত, উত্তরে কুমুদ পর্বত এবং দক্ষিণে কৈলাস দ্বারা বেষ্টিত। সেইখানে সেই সুমেরু পর্বতে ছিল রাজর্ষি তৃণবিন্দুর আশ্রম। 

মহাতেজা পুলস্ত্য সেই রাজর্ষি তৃণবিন্দুর আশ্রমের নিকট  কোনস্থানে বসে তপস্যা করতেন। অদুরেই সেই আশ্রম এবং  তৎপার্শ্বে ছিল সুন্দর এক বিরাট সরোবর। সেখানে কেলি করতে আসেন স্বর্গের অপ্সরাগন। নাগকন্যা, গন্ধর্বকন্যা এবং সকল অপ্সরাগন সকলেই কেলির আনন্দে মেতে উঠতেন। কেহ বা  বীণা বাজান, কেহ বা  নৃত্য করেন, আবার কেহ বা গান করেন। সেই কলরবে পুলস্ত্যমুনীর একাগ্রতায় বাধা পড়ত এবং ধ্যানভঙ্গে পুলস্ত্যমুনি যারপরনাই ভীষণ বিরক্ত হয়ে পড়তেন। একদিন তিনি শাপ দিলেন, এই সব কন্যারা যদি তাঁর তপস্যাভঙ্গ করেন তবে তাঁরা বিনা সম্ভোগেই গর্ভবতী হয়ে পড়বে।  যে কন্যা তাঁর দৃষ্টিপথে পড়বেন সেই কন্যাই তবে গর্ভবতী হয়ে পড়বেন। এ এক অদ্ভুত অভিশাপ। সেই অদ্ভুত অভিশাপের কথা অনেকেই শুনেছিলেন। তাই তাঁরা সকলে, সেই অপ্সরাগন নাগকন্যা বা গন্ধর্বকন্যা কেহই আর সেই কাননে পদার্পণ করা উচিত মনে করলেন না।

কিন্তু রাজর্ষি তৃণবিন্দুর কন্যা সেই ব্রহ্মশাপের কথা কোনরকম অবগত ছিলেন না। তিনি আপনমনে অনবধানে  সেই তপস্যাস্থলে একা একাই ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন তাঁর গরু এবং গাভীগুলিকে চরাতে এবং তিনি তাদের বারবার ডাকাডাকি করছিলেন। সেই শব্দে মহাতেজা ঋষির নিশ্চয়ই একাগ্রতা ভঙ্গ হয়ে পড়েছিল আর ঋষির শাপে সেই কন্যার শারীর মধ্যে গর্ভলক্ষন সঞ্চার হয়ে পড়ে।  

রাজর্ষি তৃনবিন্দুর কন্যা অবাক হয়ে গেলেন হঠাৎ তাঁর এ হেন শারীরিক পরিবর্তনে। রাজর্ষি তৃণবিন্দুর কন্যা বুঝে পান না , কি ভাবে এ হেন গর্ভসঞ্চার সম্ভবে তাঁর শরীরে। কোন পুরুষ সম্ভোগ বিনা এমন গর্ভসঞ্চার কি সহজে সম্ভব ! তিনি মানসিক ভাবে ভীষণ বিব্রত হয়ে পড়লেন কিন্তু কোন কিছুই স্থির নিশ্চয় করে উঠতে পারেন না। 

অগত্যা এই ভয়াবহ সংকটে রাজর্ষি তৃণবিন্দুর কন্যা তাঁর পিতার  স্মরন নিলেন এবং তাঁর নিজের এমন অস্বাভাবিক দুরাবস্থার কথা পিতার সমক্ষে জ্ঞাপন করলেন। – ‘পিতা আমি এক বিচিত্র সংকটে পতিত হয়েছি। আমি জানি না কি ভাবে সে কথা আপনাকে নিবেদন করি !’

রাজর্ষি তৃনবিন্দু তাঁর কন্যার কথা অনুধাবন করার চেষ্টা করেন, ‘কি হয়েছে কন্যা, কি এমন সংকট ! আমাকে  তোমার কথা বিশদে বুঝিয়ে বলো !’

কন্যা বলেন ,’ পিতা এ কথা আপনাকে বলা অসম্ভব কিন্তু  মাতৃহীনা আমি। তাই আপনাকে বলাই আমার প্রথম কর্তব্য। আমি জানি না আমি কি ভাবে গর্ভধারন করেছি। আমার তেমন কোন সম্ভাবনা ও কিছু মাত্র ছিল না। তথাপি আজ আমি অত্যন্ত বিপদাপন্ন।’

রাজর্ষি তৃণবিন্দু এবার কন্যার এহেন দশায় ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তিনি বললেন , ‘অদ্ভুত ? এ কি রূপে সম্ভব? – বেশ আমাকে একটু ভাবতে দাও পুত্রি!’

রাজর্ষি  এইবার ধ্যানে বসলেন এবং তিনি তাঁর যোগবলে জানতে পারলেন পুলস্ত্যমুনির এ হেন শাপের কথা। অদ্ভুত ! এই শাপের কথা নিশ্চয়ই তাঁর কন্যা অবহিত ছিলেন না।  

রাজর্ষি তৃণবিন্দু কন্যাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘পুত্রি এ হল পুলস্ত্যমুনির শাপ ! যে কন্যা তাঁর তপস্যা ভঙ্গ করবে সেই তবে গর্ভবতী হয়ে পড়বে তাঁর দৃষ্টি বলয়ে। অদ্ভুত , এই শাপের কথা তুমি নিশ্চয়ই  অবহিত ছিলে না ?’  

রাজর্ষি তৃণবিন্দুর কন্যা বিস্মিত হয়ে পিতাকে বলে,‘ না পিতা, আমি এ মত শাপ এর কথা কিছুমাত্র অবগত ছিলাম না। কিন্তু এখন ?’

রাজর্ষি তৃণবিন্দু বলেন, ‘ অস্থির হয়ো না কন্যা !  আমি পুলস্ত্যঋষির সঙ্গে স্বয়ং সাক্ষাৎ করব এবং তোমার এমত লজ্জার কারন নিশ্চয়ই জিজ্ঞাসা করব। পুত্রি, তুমি চলো আমার সঙ্গে মুনীর আশ্রমে যেখানে তিনি তপস্যায় আছেন।’

অতঃ রাজর্ষি তৃণবিন্দু সেই আশ্রমে প্রবেশ করলেন। মহামুনি পুলস্ত্য সমাদরে রাজর্ষি তৃণবিন্দুকে অভ্যর্থনা করলেন।

রাজর্ষি তৃণবিন্দু তখন তাঁর কন্যা সমভিব্যহারে মহামুনি পুলস্ত্যের সমীপে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং তাঁকে বিনীত নিবেদন করলেন,’ মুনীবর, আমি রাজর্ষি তৃনবিন্দু। আমার কন্যা আপনার আশ্রমে গাভীর সন্ধানে এসেছিল এবং তারপর অদ্ভুত ভাবে সে গর্ভবতী হয়ে পড়ে। এ আমার কন্যার বিষম লজ্জার কারন। আমি জানতে পারলাম আপনি এমন শাপ দিয়ে রেখেছেন জনান্তিকে !’    ’

পুলস্ত্য মুনি বললেন, ‘ রাজর্ষি , সে তবে আমার তপোভঙ্গের শাপ।’

রাজর্ষি তৃণবিন্দু বলেন,’ মুনিবর, আপনার তপোভঙ্গের এমন শাপ আমার কন্যা কিছু মাত্র অবহিত ছিল না। সে  নিরপরাধ। সে আপনার আশ্রমে ধেনু খুঁজতে এসে এমনভাবে গর্ভবতী হয়ে পড়েছে। মুনিবর আপনি আমার কন্যার এই লজ্জা নিবারন করুন।’

মহামুনি পুলস্ত্য বললেন , ‘ রাজন , আপনি চিন্তিত হবেন না। আমি আপনার কন্যাকে তবে আপন স্ত্রী রূপে স্বীকার করতে ইচ্ছা করি।’

রাজর্ষি তৃণবিন্দু বললেন, ‘ সাধু সাধু। আপনার প্রস্তাবে আমি সন্মত হলাম।  আমার কন্যা গুনশীল এবং নম্র এবং  সংসারাভিজ্ঞ ।’

মহামুনি পুলস্ত্য এই বলে আশ্বস্ত করলেন, যে, তিনি তাঁর কন্যাকে স্বয়ং স্ত্রী রূপে গ্রহন করছেন। আপনি তবে নিশ্চিন্ত হয়ে ফিরে যেতে পারেন।

অতঃ পুলস্ত্য ঋষি সেই কন্যার গুনাবলি ও আচরনে তুষ্ট হয়ে কন্যাকে বললেন, ‘কন্যা,আমি তোমায় স্ত্রী রূপে স্বীকার করলাম। দেবি তুমি আমা সদৃশ এক পুত্র লাভ করবে। সেই পুত্র পৌলস্ত নামে খ্যাত হবে। যদ্যপি বেদপাঠ শ্রবনকালে তাঁর উৎপত্তি , সেই জন্য তার অপর নাম হবে বিশ্বশ্রবা।’ 

মহামুনী পুলস্ত্যর পুত্র , তাই নাম হল তাঁর পৌলস্ত এবং অপর নাম হল বিশ্বশ্রবা।  বিশ্বশ্রবার বিবাহ হয়েছিল মহামুনি ভরদ্বাজের কন্যা বরবর্ণিনীর সঙ্গে। 

এই বিবাহের ফলে বিশ্বশ্রবার এক বীর্যবান এবং সর্বগুনসম্পন্ন পুত্র ‘ বৈশ্রবন ‘ জন্মগ্রহণ করলেন। তিনি হলেন একজন যক্ষ। 

পৌত্রের শ্রেয়স্করী বুদ্ধি দেখে ঋষি পুলস্ত্য বললেন,‘  বিশ্বশ্রবার পুত্র ধনাধক্ষ্য হবেন।’ 

অতঃ বৈশ্রবনকে তাঁর পিতামহ ঋষি পুলস্ত্য এক্ষনে মহাবনে গিয়ে দ্বিসহস্র বৎসর তপস্যা করতে বললেন।

বৈশ্রবন তাই মহাবনে গিয়ে দ্বিসহস্র বৎসর ব্রহ্মার তপস্যা করলেন। 

তারপর একদিন বৈশ্রবনের তপস্যায় তুস্ট হয়ে পিতামহ ব্রহ্মা স্বয়ং আবির্ভূত হলেন এবং তাঁকে বর দিলেন,‘বৎস, বৈশ্রবন, অবধান ক’র,  যম ইন্দ্র বরুণ এই তিন লোকপাল আমি সৃস্টি করেছি। তুমি আমার বরে চতুর্থ লোকপাল ধনাধিপতি কুবের হলে। এই নাও আমি তোমাকে এই সূর্যসন্নিভ পুষ্পক বিমান উপহার দিলাম। তুমি সুরগনের সমান হও।’ -এই কথা  বলে ব্রহ্মা  অন্তর্হিত হলেন। 

এইবার বৈশ্রবন তাঁর পিতা বিশ্বশ্রবাকে জিজ্ঞাসা বললেন,‘ পিতামহ ব্রহ্মা আমার  জন্য তো কোন বাসস্থান নির্দেশ করেন নি।  পিতা আপনি আমায় বলুন, আমি কোথায় থাকব ?’

বিশ্বশ্রবা তখন পুত্র বৈশ্রবনকে বললেন, ‘পুত্র, দক্ষিন সমুদ্রের তীরে ত্রিকূট নামে এক পর্বত আছে। তার উপরে বিশ্বকর্মা রাক্ষসদের জন্য অমরাবতীর তুল্য রমনীয় লংকাপুরী নির্মাণ করেছেন। বিষ্ণুর ভয়ে রাক্ষসেরা সেই পুরী ত্যাগ করে পাতালে আশ্রয় নিয়েছেন। আমার ইচ্ছা তুমি সেখানেই গমন করো এবং সেথায় স্বচ্ছন্দে বাস কর।’ 

তখন পিতা বিশ্বশ্রবার নির্দেশে অতঃ বৈশ্রবন , যিনি ব্রহ্মার বরে চতুর্থ লোকপাল ধনাধিপতি কুবের বলে গন্য হলেন, সেই তিনি এক্ষনে যক্ষ রক্ষ সকলকে নিয়ে সেই শুন্য লংকাপুরীতে অধিষ্ঠিত হলেন। বহু সহস্র রাক্ষস ও তাঁর আশ্রয়ে সেই লংকাপুরীতে সহর্ষে বাস করতে লাগল। তিনি তাঁর পুষ্পক বিমানে অন্তরীক্ষে ভ্রমন করেন।  পাতালবাসি রাক্ষসেরা তাই দেখে মনে মনে জ্বলতে থাকে। 

      পুষ্পক  বিমানে কুবের বেড়ায় অন্তরীক্ষে
      পাতালে থাকিয়া তাহা রাক্ষসেরা দেখে ।।
        দেখিয়া দ্বিগুন খেদ বাড়িল অন্তরে
        রাক্ষসের স্বর্ণ লঙ্কা কিনা লইল কুবেরে ?  [কৃত্তিবাস ]

রাক্ষসরাজ সুমালী স্বতঃই চিন্তা করেন কি ভাবে কুবেরের হাত হতে সোনার লংকাকে সমূলে ছিনিয়ে নেওয়া যায়। বিশ্বশ্রবার পুত্র পিতৃধন লাভ করেছে এ কথা সত্য। কিন্তু যদি বিশ্বশ্রবার আরো এক পুত্র হয় তবে সে কি  পিতৃধন থেকে বঞ্চিত হবেন ? তাঁর ও নিশ্চই তবে পিতৃঅধিকারে লংকায় আপন অধিকার বর্তায় ! 

রাক্ষস সুমালী মনে মনে বলেন,‘ বেশ, আমি তবে বিশ্বশ্রবায় দান দিব আপন দুহিতারে।‘

যেমনই একথা মনে হওয়া তখনই রাক্ষস সুমালি তার পুত্রী কৈকসীকে গিয়ে বললেন,’ কৈকসী তোমার বিবাহযোগ্য যৌবনকাল অতীত হচ্ছে। তুমি পুলস্ত্যমুনির পুত্র মুনিবর বিশ্বশ্রবাকে কেন না পতিত্বে বরণ করো ?’

 কৈকসী তাঁর পিতার অভিপ্রায় বুঝতে চেস্টা করেন , ‘ পিতা আমি আপনার কথা অনুধাবন করতে পারছি না !’ 

রাক্ষসরাজ সুমালী কন্যার কাছে তাঁর অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন, ‘ শোনো কৈকসী, আমার  একান্ত অভিপ্রায়  এবং ধ্যান জ্ঞান  চিন্তা শুধুমাত্র কি রূপে কুবেরের হাত হতে সোনার লংকাকে সমূলে ছিনিয়ে নেওয়া যায়। আমি মনে মনে শুধু সোনার লংকার ধ্যান করে চলেছি পুত্রি ! বিশ্বশ্রবার পুত্র পিতৃধন লাভ করেছে এ কথা সত্য। কিন্তু যদি বিশ্বশ্রবার আরো এক পুত্র হয় তবে সে কি পিতৃধন হতে বঞ্চিত হবেন ? তাঁর ও নিশ্চই তবে পিতৃঅধিকারে লংকায় আপন অধিকার বর্তায় ?’

কৈকসী পিতার কথা অনুধাবন করার চেস্টা করে। আর পরক্ষনে সে যে কথা বিন্দুমাত্র চিন্তা করেনি সেই কথাই পিতার মুখে শুনে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।  এইবার জিজ্ঞাসা করে , ‘ কিন্তু , পিতা , সে কিভাবে ? 

রাক্ষসরাজ সুমালী বলেন,‘পুত্রী আমি চাই তুমি মুনীবর বিশ্বশ্রবার কাছে গিয়ে পুত্র কামনা কর। তবে তাঁর ও তাঁর বৈমাত্রেয় ভাইয়ের মতই সোনার লংকায় সমান অধিকার বর্তায় !’

কৈকসী চিন্তা করেন,‘ এ কথা সত্য।  ইহাতে কোন পাপ নাই। মুনীবর বিশ্বশ্রবার কাছে পুত্র কামনা করাতে তবে কুন্ঠা কিসের ? – এইবার কৈকসী বললেন , ‘বুঝেছি পিতা ! আমি মুনীবর বিশ্বশ্রবার কাছে গিয়ে পুত্র কামনা করব।’

অতঃ কৈকসী তপঃনিরত বিশ্বশ্রবার কাছে উপস্থিত হয়ে অধোমুখে অঙ্গুষ্ঠ দিয়ে পদতলের মৃত্তিকায় তার পায়ের  বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দিয়ে অঙ্কন করতে লাগলেন। এমন প্রদোষকালে একজন নারীর পক্ষে কোন পুরুষের কাছে  দৈহিক কামনা কোন অপ্রাকৃত  কিছু নয়।

বিশ্বশ্রবা মুনি কৈকসীর অভিপ্রায় বুঝতে পারলেন। তিনি তখন কৈকসীকে বললেন,‘ কৈকসী তোমার অভিপ্রায় পুত্রলাভ। কিন্তু এই দারুন প্রদোষকালে গর্ভধারণ করলে তোমার পুত্রগণ দারুন  ক্রূরকর্মা রাক্ষস হবে।’

কৈকসী বললেন, ‘ভগবান আপনার কাছে আমি দুরাচার পুত্র চাই না। আপনি দয়া করুন।’

বিশ্বশ্রবা বললেন, ‘বেশ ! তবে তোমার ইচ্ছা অনুযায়ী কৈকসী, তোমার শেষ পুত্র, আমার বংশানুরূপ ও  ধর্মাত্মা  হবেন।’

কৈকসী বললেন, ‘মুনিবর আমার ইচ্ছা, তারা যেন মহাবলশালী হয়। তাঁরা যেন ত্রিভুবন বিজয়ী হয়।’

বিশ্বশ্রবা বললেন, ‘কৈকসী তোমার ইচ্ছানুযায়ী একমাত্র তোমার জ্যেষ্ঠপুত্র রাবণ ত্রিভুবন বিজয়ী হবে।’

কৈকসী আশ্বস্ত হলেন। যথাকালে কৈকসী এক দারুন রাক্ষসপুত্রের জন্ম দিলেন। এই পুত্র দশগ্রীব। বিংশতি হস্ত। নীলাঞ্জনবর্ণ। ইনি রাবন। তারপরের পুত্র মহাবল কুম্ভকর্ণ এবং তৎপরে এক কন্যা জন্ম নিল। সে বিকৃত আননা লম্বানখরসম্পন্না ভীষণা দর্শন কন্যা  শূর্পণখা। এবং সর্বশেষে জন্ম হল কনিষ্ঠ পুত্র ধর্মাত্মা বিভীষণের। 

আর তারপর রাক্ষস রাজ সুমালীর ইচ্ছা মত এক ইতিহাস সৃষ্টি হল। 

রাবণ তার বৈমাত্রেয় ভাই কুবেরকে লঙ্কা হতে বহিষ্কৃত করে তাঁর পুষ্পক রথ কেড়ে নিলেন।

রাবণ সকলের ত্রাস হয়ে উঠলেন। রাবণ শিবের বরে অসীম শক্তির অধিকারী হলেন এবং ব্রহ্মার বরে সকলের অবধ্য হয়ে পৃথিবীর তিনলোকে অসীম শক্তিধর বলে গণ্য হলেন।

রাবন তাঁর উগ্র তপস্যায় ব্রহ্মাকে তুষ্ট করে বর চাইলেন,‘  পিতামহ , আমি যেন যক্ষরক্ষ পক্ষীনাগ দৈত্যদানব এবং দেবগনের ও অবধ্য হই। অন্য প্রাণীদের কথা ভাবি না। মানুষকে আমি তৃণ জ্ঞান করি।’ 

ব্রহ্মা বললেন, ‘তথাস্তু ।’    

                                 [আদিকান্ড ১ ]

(চলবে )

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

ভারতীয় ভাষার মহাযাত্রা

ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ – নবকুমার দাস ১ : সিন্ধু–সরস্বতী থেকে গঙ্গা ২ : সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতার সমকালীন সর্বভারতীয় স্রোতধারা ৩ : বেদের বাণী থেকে পৌরাণিক ভারত

Read More »

১৫ : ঊর্ণনাভ

ঊর্ণনাভ ১ : ঊর্ণনাভ ২ : উর্ণনাভ ৩ : ঊর্ণনাভ ৪ : ঊর্ণনাভ ৫ : ঊর্ণনাভ ৬ : ঊর্ণনাভ ৭ : ঊর্ণনাভ ৮ : ঊর্ণনাভ

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

ভারতীয় ভাষার মহাযাত্রা

ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ – নবকুমার দাস ১ : সিন্ধু–সরস্বতী থেকে গঙ্গা ২ : সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতার সমকালীন সর্বভারতীয় স্রোতধারা ৩ : বেদের বাণী থেকে পৌরাণিক ভারত

Read More »

১৫ : ঊর্ণনাভ

ঊর্ণনাভ ১ : ঊর্ণনাভ ২ : উর্ণনাভ ৩ : ঊর্ণনাভ ৪ : ঊর্ণনাভ ৫ : ঊর্ণনাভ ৬ : ঊর্ণনাভ ৭ : ঊর্ণনাভ ৮ : ঊর্ণনাভ

Read More »