আলোর পথযাত্রী - বিতস্তা ঘোষাল
বিতস্তা ঘোষাল
আলোর পথযাত্রী-৫
২০১২ এর ১০ জানুয়ারি ‘অনুবাদ পত্রিকা’র মেলে একটি চিঠি আসে। প্রেরক ড. কর্তার সিং দুগ্গল, তিনি জানতে চেয়েছেন তাঁর ‘Mircle and other stories- এর যে বাংলা অনুবাদবইটি বেরবার কথা তা কবে প্রকাশিত হচ্ছে? আমি তৎক্ষণাৎ প্যাপিরাসের কর্ণধার অরিজিৎ কুমারকে ফোন করি, তিনি জানান নিশ্চিত ভাবেই ২৭জানুয়ারি বইমেলায় বেরিয়ে যাবে। পূর্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আরও দু’দিন হাতে নিয়ে তাঁকে জানিয়ে দিই ৩০-শে নিশ্চিত।
এবার ফোন আসে, ‘অপেক্ষায় আছি, বেরলেই পাঠিয়ে দেবেন’। বইটি আর পাঠানো হয়নি। কারণ আমার অনুবাদকৃত ‘নির্বাচিত কর্তার সিং দুগ্গল” যেদিন প্রকাশিত হয় তার তিনদিন আগে ২৬ জানুয়ারি ২০১২,তিনি অন্য কোনও অজানা গ্রহে নতুন গল্প-নাটক-উপন্যাস-কবিতা লিখতে চলে গেছিলেন স্থায়ীভাবে, যেখানকার ঠিকানা আমি জানতে পারিনি আজও।
তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়ের যোগসূত্র অরিজিৎ কাকু একদিন আমায় বললেন, ‘অনুবাদ পত্রিকার সম্পাদক, অথচ নিজে কোনও অনুবাদ করো না কেন?’ আমি খুবই বিব্রতভাবে বলেছিলাম ‘সেভাবে ভারতীয় সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত নই। ঘটনাচক্রে এই দায়িত্বভার নিতে হয়েছে। তা বলে অনুবাদ করার মতো গুরু দায়িত্ব নেবার সামর্থ্য আমার নেই, তাছাড়া কাদের গল্প করব তাও বুঝে উঠতে পারি না।’
সেদিন তিনি আমায় পাঁচজন প্রথিতযশা লেখকের কথা বলেছিলেন, মান্টো, ইসমত চুগতাই, কর্তার সিং দুগ্গল, কমলা দাস, মামনি রয়সাম গোস্বামী। এরপর আমি সাহিত্য অকাদেমির তৎকালীন আঞ্চলিক অধিকর্তা শ্রী রামকুমার মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে এই লেখকদের বই পড়তে চাই। রামকুমারবাবু আমায় পাঁচজনেরই বইয়ের কথা বলে বলেন, ‘দুগ্গল সাহেব এখনও লিখে চলেছেন, আপনি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন’। তিনিই আমায় দুগ্গল সাহেবের দিল্লির ঠিকানা ও ফোন নাম্বার দেন। আমি এঁনাদের লেখা পড়তে শুরু করি এবং ক্রমশ উপলব্ধি করি দুগ্গল সাহেবের লেখা কোথাও যেন আমায় গভীর ভাবে টানছে। সহজেই রিলেট করতে পারছি। কারণ ভাষার সহজ উপস্থাপনা ও সরল বাক্যবিন্যাস।
সালটা ২০০৯। পারিবারিক কারণে প্রায়ই দিল্লি যাই।এইবার সনাতনকে দুগ্গল সাহেবের সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে বলি আমার জন্য। সনাতন তখন ভাগ্যক্রমে ন্যাশানাল বুক ট্রাস্টের সঙ্গে যুক্ত এবং দুগ্গল সাহেব এর আগে দীর্ঘদিন সেখানে কর্মরত ছিলেন। তিনি আমায় পরদিন বিকেল পাঁচটায় সময় দেন ওঁনার বাড়িতে।
নির্ধারিত সময়ে পৌঁছে বেল বাজানো মাত্র তিনিই দরজা খোলেন, পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলে বলেন, ‘কেমন আছেন আপনি? বহুদিন পর দেখা হল।’
কথাটা শুনে আশ্চর্য হই। কারণ তাঁর সঙ্গে ইতিপূর্বে আমার কখনো সাক্ষাৎ হয়নি, এমনকি কথাও নয়। একটু হতবাক হয়েই বলে ফেলি ‘আপনি আমায় চেনেন? আমি তো কখনো…’ কথাটাঅপূর্ণই থেকে যায়, কারণ তার আগেই তিনি বলেন, ‘এ জন্মে না হলে নিশ্চিত ভাবেই আগের জন্মে … তাই এসেছেন প্রাণের টানে।’ তাঁর আন্তরিকতায় ও হিউমার সেন্স দেখে মুগ্ধ হয়ে যাই, এবং তারপর আমাদের মধ্যে তাঁর লেখা বই ও তার অনুবাদ নিয়ে কথা হয়।আমার ইতিমধ্যে তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে শুনে বলেন, এত অল্প বয়সে বই বেরিয়ে গেছে! এতো দারুণ খবর। কথায় কথায় এও জানান বাবার সঙ্গে তাঁর যথেষ্ট পরিচয় ছিল এবং অনুবাদ পত্রিকায় তাঁর লেখা অনুবাদ হয়ে প্রকাশিতও হয়েছে। সে সব কপি তাঁর কাছে আছে। তারপর জানান শীঘ্রই তাঁর একটি বই ইংরেজিতে প্রকাশিত হতে চলেছে। তিনি সেটা আমায় পাঠিয়ে দেবেন। ভালো লাগলে আমি সেখান থেকে অনুবাদ করতে পারি।
ফিরে এসে কাকুকে তা জানালে তিনি বলেন লিখিত অনুমতি পত্র নিয়ে নিতে। আমি তাঁকে মেল করি। তিনি উত্তর দেন, এমনিতে কোনও আপত্তি, টার্ম-কন্ডিশন এমনকী টাকা দেওয়ারও ব্যাপার নেই। নতুন প্রজন্ম অনুবাদ করতে চাইছেন তাতেই খুশি। কিন্তু প্রতিটি অনুবাদ তাঁকে পাঠাতে হবে। তিনি যথাযথ মনে করলে তবেই আমি কাজটা করতে পারব। এটাই একমাত্র শর্ত।আর এটাও মনে করিয়ে দেন সাহিত্য অকাদেমি থেকে তাঁর যে অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে আমি অনুবাদ করাকালীন একবারও তা দেখতে পারব না। এবং সেই গল্পগুলো না করাই ভালো।
তারপর তিনি সদ্য প্রকাশিত বইটি পাঠিয়েছেন। আমি দু’বছর ধরে তাঁর গল্প অনুবাদ করি ও তাঁকে পাঠাই, যেটা যেভাবে কারেকশন করতে বলেন সেটাও করে আবার পাঠাই।কখনো কখনো তাঁর বাড়িতে চলে যাই, দোভাষীর মাধ্যমে আমার অনুবাদ পড়ে শোনাই। আশ্চর্য ভাবে যে গল্পগুলো আমি পছন্দ করি সেগুলো পূর্ব অনূদিত বইটিতে ছিল না। ফলে আমি তা না দেখলেও অসুবিধা হয়নি।শেষ পর্যন্ত ২০১১-এর জানুয়ারিতে তিনি আমাকে বই প্রকাশের অনুমতি দেন ও জানান অনুবাদ গল্পগুলো বেশ মনোগ্রাহী ও পাঠযোগ্য হয়েছে বলেই তাঁর বিশ্বাস, এবং শুভেচ্ছাও জানান।
আমাদের মধ্যে এই সময় প্রায়শই প্রচুর গল্প হত,দেশ ভাগ, তাঁদের জীবন বদলে যাওয়া, রান্না খাওয়া ও গান নিয়ে। তিনি লোকসংগীত ভালো বাসতেন, নিজে গাইতেনও।আমি তখনও নাচের অনুষ্ঠান একেবারে বন্ধ করে দিইনি।রবীন্দ্র ভারতীর লোকনৃত্যের শিক্ষক বটু পালের কাছে দীর্ঘদিন তালিম নিয়েছি।ফলে একটা কমন বিষয় কাজ করেছিল। দিল্লিতে গেলেই তাঁর কাছে চলে যেতাম। এবং জমিয়ে আড্ডা হত।
এবার আসি তাঁর সম্পর্কে। পাঞ্জাবি সাহিত্যের অন্যতম প্রবাদপুরুষ দুগ্গাল সাহেবের জন্ম, ১ মার্চ ১৯১৭ সালে পাকিস্তানের ধামিয়ালে। দেশভাগের পরে তিনি জলন্ধর, দিল্লি ও হায়দরাবাদে দীর্ঘদিন থেকেছেন, জন্মসূত্রে পারিবারিক যে পরিমণ্ডলে তিনি বড়ো হয়েছিলেন এবং কর্মসূত্রে তিনি যেভাবে অবিভক্ত ও বিভক্ত ভারত ও পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন, সেসব অঞ্চলের মানুষের সুখ-দুঃখ, বদলে যাওয়া সমাজ, অর্থনীতি, ধর্মীয় মনোভাবের আড়ালে মানবতার দ্বি-খণ্ডিত যে মুখগুলো তিনি দেখেছিলেন সেগুলোই পরবর্তী কালে তাঁর লেখা গল্প-নাটক-কবিতা-উপন্যাস ও সিনেমায় উঠে এসেছে।
অবশ্য গল্পের জগতে তিনি বিচরণ করতেন সেই শিশু বয়স থেকেই, এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন: একা একা বসে আমি ভাবনার জগতে হারিয়ে যেতাম- বাতাসে দুর্গ বানাতাম- পরীদের সঙ্গে গল্প করতাম, দেখতাম ভয়ংকর ঝড়, বিদ্যুতের ঝলকানি, অবিশ্রান্ত বৃষ্টি, বন্যায় ভেসে যাচ্ছে কুঁড়েঘর, বাড়ি। আমি আদিবাসীদের বাজনার শব্দ, মাদলের বোল, পায়ের লয় শুনতে পেতাম, তলোয়ার ও অস্ত্রের ঝংকার, ডাকাতি, লুঠতরাজ, ধর্ষণ-ধর্ষিত-ধর্ষক সব দেখতাম, আর তারপর যখন ডাকাত বাচ্চাকে ধরে নিয়ে গিয়ে তার ঝোলায় ভরতো, তখন আমি দেখতাম বাচ্চাটা আসলে আর কেউ নয়, আমিই…। তখন আমি ভয় পেয়ে তীক্ষ্ণ চিৎকার করতে শুরু করলে বাড়ির সকলে আমার বিছানার চারপাশে গোল করে ঘিরে ধরত।… মা আমায় কোলে নিয়ে এক নাগাড়ে সৎ নাম ‘শ্রীওয়াগুরু’-র স্তব বলে যেতেন।
প্রত্যেকের ছোটোবেলাতেই এইরকম একটা জগৎ থাকে। কিন্তু বড়ো হবার সঙ্গে তা নেহাতই স্বপ্ন হিসাবেই থেকে যায়। দুগ্গাল সাহেব এখানেই ব্যতিক্রম। তাঁর সেইসব স্বপ্নের চরিত্ররা ডানা মেলে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
থানার দারোগা জিওন সিং-দুগ্গল ও সাতওয়ান্ত কৌরের সন্তান কর্তার সিং দুই মেয়ের পর পরিবারের একমাত্র ছেলে সন্তান হওয়ার সুবাদে ছোট থেকেই যথেষ্ট আদরে বড় হয়েছিলেন। তাঁর নিজের কথায়: ‘I was greatly spoilt…, pampered a lot, the male child of petty bourgeoisic of the early twentieth century!! তাঁর জন্মের পরই তাঁর পিতার প্রমোশন হওয়ায় সবরকম বিলাসিতা ও স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গেই তিনি বেড়ে ওঠেন, সেই যুগে যে সময় টফি বা খেলনা বাচ্চাদের কাছে নিতান্তই দুর্লভ, সেখানে তিনি তা পর্যাপ্ত ভাবেই পেতেন, তা সত্ত্বেও একটু বড়ো হয়ে গুরুদুয়ারে যাওয়ার পর যে বিষয়টি তাঁকে সবচেয়ে আকর্ষিত করেছিল ও পরবর্তীকালে তাঁর জীবনদর্শনকেও প্রভাবিত করেছিল তা হল: Truth is Supreme; above truth is the truthful living.
এই সময়ের আরও একটি উপলব্ধি তাঁর সারাজীবনকে গভীরভাবে পথ দেখিয়েছিল। তিনি যে গ্রামে ছোটোবেলায় বাস করতেন সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় ছিল মুসলিম, রাজা, জমিদার, গ্রামের চৌকিদার, বোর্ডে গ্রামের প্রতিনিধি… সকলেই ছিলেন মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত, তা সত্ত্বেও হিন্দু ও শিখদের প্রতি তাঁদের আন্তরিকতা,বিশেষ সুযোগ সুবিধার দিকে লক্ষ্য রাখা, শ্রদ্ধা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সবরকম সহযোগিতা- এই বিষয়গুলি তাঁকে বুঝিয়েছিল হিন্দু-মুসলিম-শিখ… ধর্ম যাই হোক না কেন আসলে মনুষ্যত্ব ও মানবতাই সবচেয়ে বড়ো ধর্ম। ভারত-পাকিস্তান স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হলে দেশ ভাগের এই তীব্র ক্ষত নিয়ে লাহোর থেকে পাকাপাকি ভাবে ভারতে চলে আসার পর তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে বলেছেন: ‘Where was the communal divide which led to carnage during pertition riots? It was evidently a creation of the misled politicians of the day in their guest for power whether it were Hindus or Muslims’
পরবর্তীকালে তিনি সকলের বিরাগভাজন হয়েও বিয়ে করেন তাঁর মুসলিম বান্ধবী আয়েষাকেই। তাঁকে এর জন্য শুনতে হয় তিনি কমিউনিস্ট এবং তাঁর স্ত্রী কমিউনিস্ট যাঁর সঙ্গে নাকি পাকিস্তানের সংযোগ আছে। এই সময় তিনি জলন্ধর থেকে প্রায় বাধ্য হয়েই শিশু পুত্রকে নিয়ে চলে আসেন দিল্লিতে, দিল্লিতেও তাঁকে বারবার পুলিশ ও প্রশাসন থেকে জেরা করা হয়, থাকার সমস্যা গুরুতর হয়ে ওঠে। এমনকি সেই সময় তাঁর লেখা বইয়ের কপিরাইট বাবদ যে চেক তিনি পান তাও ইনটেলেজেন্সি ডিপার্টমেন্ট নিয়ে নেয় এবং সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার দপ্তরের সেক্রেটারি তাঁকে জানিয়ে দেয় কোনো লেখা ও বই প্রকাশ করতে হলে তার পাণ্ডুলিপি অতি অবশ্যই সরকারকে জমা দিয়ে তার অ্যাপ্রুভাল করাতে হবে।
এই যন্ত্রণাদায়ক ও অপমানদায়ক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি আরও উপলব্ধি করেছিলেন ধর্ম আসলে মানুষের মনে ফাটলই ধরায় এবং রাজনীতিবিদরা সেই ফাটলের মূলে। এবং এই উপলব্ধি থেকেই তাঁর একাধিক লেখায় সম্প্রীতি ও মানবতার ধর্মের কথাই তুলে ধরেন।
যাইহোক, স্কুলে পড়ার সময় থেকেই হিন্দি-উর্দু বই পড়ার বাইরেও তাঁর মধ্যে ইংরেজি বই পড়ার আগ্রহ বেড়ে ওঠে। তিনি আমাকে বলেছিলেন; তাঁর এই আগ্রহ ও পড়ার নেশা দেখে স্কুলের প্রধান শিক্ষক তিনি যাতে ক্যান্টনমেন্ট বাজার থেকে যে কোনও বই নিয়ে পড়তে পারেন ও তার বই কেনার বিল যাতে স্কুলে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, বইয়ের প্রতি তাঁর ‘an undying love’ এর জন্ম তখন থেকেই।
গর্ডন মিশনে পড়ার সময় তিনি নিজের বিষয়ের বাইরে পার্সি ও দর্শন পড়ার সুযোগ পান, এবং এটাই পরবর্তীকালে তাঁর লেখক হবার পথকে প্রশস্ত করেছিল বলে, তিনি বারবার উল্লেখ করেছেন, এই সময়ই তিনি, ‘The Gordonian’ ম্যাগাজিনের পাঞ্জাবি বিভাগের আমন্ত্রিত সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব নেন, একই সঙ্গে কলেজের পাঞ্জাবি শিক্ষার নির্দিষ্ট কোনও শিক্ষক না থাকায় পড়ানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। পাঞ্জাবি কবি হিসাবে তিনি এই সময় থেকেই পরিচিত ও জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করেন।
এই সময়ের দু’টি ঘটনা তাঁকে তীব্র ভাবে প্রভাবিত করে। প্রথমটি সরোজিনী নাইডুর সঙ্গে সাক্ষাৎ। পাঞ্জাবিতে কবিতা লেখেন শুনে তিনি খুব আগ্রহের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘It is now the time to fight and throw out the British… we need the support of the country’s youth, you must grid up your loins…’ এই বিষয়টি তাঁকে লেখার ক্ষেত্রে বিশেষ উৎসাহ জুগিয়েছিল।
আরেকটি হল এই সময় তিনি দেবেন্দ্র সত্যার্থীকে পান যিনি তাঁকে লোক সংগীতের প্রতি আগ্রহী করে তোলেন। পরবর্তীকালে তিনি পাঞ্জাবি লোকসংগীতকেই তাঁর গবেষণার বিষয় হিসাবে নেন ও অনুভব করেন এইলোকসংগীত আসলে তাদের নিজেদের ‘virtual autobigraphy’, যেখানে উঠে এসেছে তাদের বীরত্বের কথা, সাহসীকতার কথা, যুদ্ধের কথা, প্রেম-বিরহ-ভালোবাসা-জীবনের কথা।
প্রাথমিক পর্যায়ে কবি হিসাবে প্রসিদ্ধি পেলেও, ছাত্র থাকাকালীন তাঁর প্রথম সংকলিত বই ‘swer sar’ 1941, (Day Dawn) যেটি পাঞ্জাবি ছোটগল্পের মাইলস্টোন বা ‘Land mark, হয়ে ওঠে, চারমাসের মধ্যে বইটি নিঃশেষিত হয়ে যায় ও সেই বইয়ের টাকায় বেরোয় তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘kandhe kandhe’ (Brink of the Bank) ।যদিও তাঁর প্রথম নিজের লেখায় অনেকটাই জুড়ে ছিল যৌনতা ও নগ্নতা। এই পর্যায়ের উল্লেখযোগ্য লেখা ‘Pipul patian, (1942), Kudi Kahani Kardi gai, (1943) (She con-tinued her tale) প্রমুখ।
দেশভাগের আগের ও পরের নিষ্ঠুরতা, সামাজিক অস্থিরতা, যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে পরবর্তী সংকলনগুলিতে। এই পর্যায়ে তিনি লেখেন ‘Dangar (The Animal, 1947), Ag Khan Wale(The fine eaters, 1948), Nawan Ghar (The new house, 1950 প্রভৃতি।
পরবর্তী পর্যায়ে তাঁর বিখ্যাত সংকলন Karamat (The miracle, 1957), Par-Maire (In Younder fields, 1961) প্রমুখ।
এই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে তাঁর একটি গভীর আত্ম উপলব্ধির কথা যা তিনি নিজেও তাঁর আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন, ভগৎ সিং-এর ফাঁসি হয়ে গেছে সে সময়, মাতৃ-ভূমির স্বাধীনতার জন্যে প্রতিদিন প্রভাতফেরী হচ্ছে। গান্ধীজী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য অনুরোধ করছেন, ও অহিংস আন্দোলনের কথা বলছেন, কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের তাতে কোনও হেলদোল নেই। ‘sarkar’ চাইছে যেকোনও মূল্যে স্বাধীনতা। কোনও আত্মত্যাগই তাঁদের কাছে দুর্লভ নয়। নারী-পুরুষ-যুবক-বৃদ্ধ-হিন্দু-মুসলিম-শিখ সবাই এই মুক্তিযুদ্ধে মাতৃমন্ত্রে দীক্ষিত। এই সময় ‘sakas’ তাদের মনোবল বৃদ্ধির জন্য অনেক অলৌকিক গল্প শোনাত, দুগ্গলের মাও তাঁকে শুনিয়েছিলেন গুরু নানকের গল্প। অলৌকিক শক্তির অধিকারী গুরুনানক কিভাবে পাথর চেপে ধরে জল বের করে শিষ্যকে পান করিয়েছিলেন সেই জল। সেই গল্প তাঁর মনে এমনভাবে গেঁথে গেছিল যে তিনি এই বিষয়টিকে নিয়েই পরবর্তীকালে রচনা করেন তাঁর সবচেয়ে আলোচিত গল্প ‘The Miracle’ |
কলেজ ছাড়ার পর তিনি AIR লাহোরে যোগ দেন ও রেডিওর জন্যে নিয়মিত নাটক লেখেন, প্রফেসনাল আর্টিস্ট ও নাটকের জন্য প্রয়োজনীয় সাউন্ড সিস্টেম তৈরির দিকে মনযোগ দেন। তিনি পরবর্তীকালে বলেছেন এটাই ছিল তাঁর জীবনের সেরা অবদান। অল ইন্ডিয়া রেডিও-এর অধিকর্তা হবার পর তিনি ন্যাশনাল বুক ট্রাস্টের মুখ্য অধিকর্তা হন। ১৯৯৭ সালে তিনি রাজ্যসভার নির্বাচিত সদস্য ও প্ল্যানিং কমিশনের অ্যাডভাইসারও ছিলেন।
তিনিপঞ্জাবি, উর্দু, ইংরেজি এই তিন ভাষাতেই একাধিক গল্প, কবিতা, নাটক, উপন্যাস লিখেছেন। তাঁর লেখা একাধিক ভাষাতেও পৃথিবীব্যাপী অনুবাদ হয়েছে। ১৯৮৮-তে পদ্মভূষণ ও ২০০৭-এ সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পান। এছাড়াও পান গালিব পুরস্কার, ভারতীয় ভাষা পরিষদ পুরস্কার, ভাই মোহন সিং ভেদ পুরস্কার এবং সোভিয়েত ল্যান্ড পুরস্কার। এছাড়াও ১৯৮৪ ও ২০০৫-এ তিনি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো ছিলেন।
আধুনিক পাঞ্জাবি সাহিত্যের প্রাণপুরুষ হিসাবে অমৃতা প্রীতম, সন্ত সিং শেখন, গুরুবখ সিং-এর সঙ্গে একই সারিতে বসানো হয় কর্তার সিং দুগ্গালকেও। তাঁর মূল্যায়ন করতে গিয়ে প্রসিদ্ধ পাঞ্জাবি সাহিত্যিক দলিপ কৌর তিওয়ানা বলেছেন:” Despite having knowledge of many languages, he choose Punjabi, His Commitment is evident from the fact that when he was an MP, he used his funds to establish four Panjabi Bhawans.”
আরেক প্রবাসী পাঞ্জাবি কবি অমরজিৎ চন্দন বলেছেন : ‘He belonged to the pre-1947 writers generation mostly dominated by upper class Sikh Khatri pothoharis, They had all the opportunitis…his short ‘karamaat’ is one of the top ten Punjabi short stories’
আসলে দুগ্গল সাহেবের মূল্যায়ন শুধু একটি গল্প বা কবিতা বা উপন্যাস দিয়ে হওয়ার নয়, তাঁর ব্যাপ্তি জীবনের প্রতিটি পদে প্রতিটি ছন্দে যা তাঁর লেখাকে মানুষের হৃদয়ের গভীরে পৌঁছে দিয়েছে।এখানেই লেখকের সার্থকতা।আর আমার কাছে এক আলোকিত ইটারনাল ভালোবাসা, যা এ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রয়ে যাবে।



