এক দৃষ্টিহীন পেঁচা
ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস
কাহিনিকার: সাদেঘ হেদায়েত
বঙ্গানুবাদ : সুপর্ণা বোস
দ্বাবিংশতি পর্ব
সেই সময়ে বাস্তব জগৎ আমাকে ত্যাগ করেছিল, আর আমি বাস করতাম এক আলোকিত পৃথিবীতে।যা এই বাস্তব পৃথিবী থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। আমি নিজেই নিজেকে ভয় পেতাম। সবাইকে ভয় পেতাম। নিঃসন্দেহে এই ভয় আমার অসুস্থতার কারনেই। যা আমার চিন্তাশক্তি ও শরীর দুটোকেই দুর্বল করে দিয়েছিল। এমনকি আমার ঘরের জানলা দিয়ে যখন ওই কাবাড়িওলা আর কসাইটাকে দেখতাম, তখনও আমার কেমন জানি ভয় করত! ওদের চেহারা, হাবভাবে এমন কিছু একটা ছিল যা ভীতিপ্রদ। যদিও স্পষ্টভাবে আমি কিছুই বলতে পারব না।
দাইমার সেই কথাটা আমাকে আরও ভীত করেছিল। সে পবিত্র নবীদের নামে শপথ করে বলেছিল, সে নাকি মাঝরাতে ওই কাবাড়িওলাকে আমার স্ত্রীর শোবার ঘরে ঢুকতে দেখেছে। দরজার আড়াল থেকে সে নাকি আমার স্ত্রীকে নিজে মুখে বলতে শুনেছে,“তোমার স্কার্ফটা খুলে ফেলো!”
আরও আশ্চর্য ব্যাপার হলো, পরশু কিংবা তরশু, যখন আমি চিৎকার করে উঠেছিলাম আর আমার স্ত্রী আধখোলা দরজার আড়াল থেকে উঁকি দিয়েছিল, তখন আমি নিজের চোখে তার গালে সেই বৃদ্ধের নোংরা, হলদে, পচা দাঁতের দাগ দেখেছিলাম!সেই দাঁত, যার ফাঁক দিয়ে কোরআনের আরবি আয়াত ঝরে পড়ত।
প্রথম থেকেই সন্দেহ হয়,আমার বিয়ের পর থেকেই কী কারণে লোকটি আমাদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াত এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেখানে দাঁড়িয়েই থাকত? সে কি এই বেশ্যার জন্যই পৃথিবীর সবকিছু ত্যাগ করেছিল?
আমার মনে আছে, সেদিন আমি তার পসরা দেখতে গিয়ে মাটির কলসিটির দাম জিজ্ঞেস করেছিলাম। তার স্কার্ফের আড়াল থেকে দুটো পচা দাঁত আর কুষ্ঠরোগে গলিত ঠোঁট দেখা যাচ্ছিল। সে এমন এক অট্টহাসি হেসেছিল, যা শুনে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে দিল। তারপর বলেছিল,
_তুমি কেনার আগে দেখে নেবে না? এই কলসিটার তেমন কোনো দাম নেই, হে যুবক। নিয়ে যাও! আশা করি এটা তোমার সৌভাগ্য বয়ে আনবে!”
“এই কলসিটার তেমন কোনো দাম নেই। আশা করি এটা তোমার সৌভাগ্য বয়ে আনবে” এই কথাগুলো বলার সময় তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত খমক ছিল।
আমি পকেট থেকে দুই দিরহাম আর চার পেশিজ বের করে তার পসরার এক কোণে রেখে দিলাম। সে আবার সেই ভয়ঙ্কর হাসিটা হাসলো, যা শুনে শিউরে উঠলাম। লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যেতে চাইলাম। দুহাতে মুখ ঢেকে বাড়ি ফিরে এলাম।
তার সামনে সাজানো জিনিসপত্রগুলো থেকে মরচেধরা, বাতিল জিনিসের গন্ধ বেরোচ্ছিল!যেন জীবনের বাতিল জিনিসগুলোকেই সে প্রদর্শন করতে চেয়েছিল, অথবা হয়তো সে শুধু সেগুলো সাজিয়েই রেখেছিল। সে নিজেও কি বৃদ্ধ, পরাজিত এবং পরিত্যক্ত ছিল না?
তার পসরার প্রতিটি বস্তুই ছিল নিস্প্রাণ, নোংরা এবং জীর্ণ। তবু সেই পসরার মধ্যে এক অদ্ভুত স্থায়ী প্রাণশক্তি ছিল, ছিল গভীর অর্থবহ কিছু বিন্যাস। এই মৃত বস্তুগুলো আমার উপর জীবিত মানুষের চেয়েও বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিল।
দাইমা আমাকে এবং অন্যদের বলে বেড়াচ্ছিল যে বৃদ্ধটি আমার স্ত্রীর শোবার ঘরে যায়। এক নোংরা ভিখারির সঙ্গে শয্যাসঙ্গী হওয়া! দাইমা আরও বলেছিল যে আমার স্ত্রীর মাথায় উকুন হয়েছে এবং সেসব সাফ করতে সে স্নানাগারে যায়।
স্নানাগারের বাষ্পময় দেয়ালে সে কেমন ছায়া ফেলত? হয়তো এক কামনাময়, নিজের প্রতি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী একটা ছায়া পড়ত।
তবে সব মিলিয়ে, এবার আমি আমার স্ত্রীর রুচিকে পুরোপুরি নিন্দা করতে পারলাম না। কারণ ওই পুরনো জিনিসপত্রের ফেরিওয়ালা সাধারণ, অশ্লীল এবং বর্ণহীন কোনো পুরুষ ছিল না!সেইসব ষাঁড়সদৃশ পুরুষদের মতো নয়, যারা কেবল যৌনতার অদম্য আকাঙ্ক্ষা দিয়ে বোকা নারীদের আকর্ষণ করে।
বৃদ্ধটির মাথা ও মুখে জমাট বেঁধে থাকা দুর্ভাগ্যের স্তরগুলো, আর তার সমগ্র সত্তা থেকে নির্গত গভীর বিষাদ তাকে এক আধিদৈবিক মর্যাদা দিয়েছিল। সে নিজে তা জানুক বা না জানুক, সে যেন ছিল সৃষ্টিরই এক প্রকাশ, সৃষ্টিরই এক প্রতিনিধি।
যাই হোক, আমি আমার স্ত্রীর গালে সেই দুটি পচা দাঁতের দাগ দেখেছিলাম,যে দাঁতের আড়াল থেকে আরবি আয়াত বেরিয়ে আসত। সেই নারীর গালে, যে আমাকে কখনও গ্রহণ করেনি, আমাকে অপমান করেছে, অথচ এসবের পরেও আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম!যদিও সে আমাকে একবারের জন্যও তার গালে চুম্বন করতে দেয়নি!
আমি যখন নাকাড়ার সেই ব্যথিত সুর শুনলাম তখন সূর্যের আলো হলদেটে ফ্যাকাশে হয়ে এসেছে।সেই শব্দ খানিকটা যেন করুণ আর্তি অথবা মিনতির মত শোনাচ্ছিল যা অন্ধকার বা কোনো প্রাচীন কুসংস্কারের ভয়কে পুনরায় জাগিয়ে তুলত।সেই সঙ্কটজনক মুহূর্তের কথা আগে থেকেই ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল।আমি তারই অপেক্ষায় ছিলাম।আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত জ্বালা করছিল।দমবন্ধ হয়ে আসছিল।আমি বিছানায় গিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলাম। জ্বরের তীব্রতায় আমার দৃষ্টি এমনভাবে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল যে সবকিছুই স্বাভাবিকের চেয়ে বড় আর ঝাপসা মনে হচ্ছিল। ছাদ যেন নিচে নামার বদলে আরও উঁচু হয়ে গেছে। জামাকাপড় শরীরের ওপর অসহ্য চাপ সৃষ্টি করছিল।
হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই আমি বিছানায় উঠে বসলাম এবং বিড়বিড় করে বললাম,
এটাই সীমা… আর সহ্য করা যায় না… তারপর চুপ করে গেলাম। একটু পরে বিদ্রূপের ভঙ্গিতে, কিন্তু স্পষ্ট ও জোরে নিজেকেই বললাম, এটা হলো…
তারপর যোগ করলাম,
_আমি একটা বোকা!
আমি যা বলছিলাম তার অর্থের দিকে মোটেও মনোযোগ ছিল না; কেবল নিজের কণ্ঠের কম্পন শুনে আনন্দ পাচ্ছিলাম। হয়তো একাকীত্ব দূর করার জন্য নিজের ছায়ার সঙ্গেই কথা বলছিলাম।
ঠিক তখনই অবিশ্বাস্য একটি ঘটনা ঘটল। দরজা খুলে গেল, আর সেই বেশ্যা আমার ঘরে প্রবেশ করল।
অবশ্যই, মাঝে মাঝে সে আমার কথাও ভাবত। এজন্য আমার কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত! অন্তত এটুকু বোঝা গেল যে সেও জানে আমি বেঁচে আছি, আমি কষ্ট পাচ্ছি, এবং ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
কৃতজ্ঞ হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট কারণ ছিল। তবু আমি জানতে চাইতে চাই যে,সে কি জানে যে আমি তার জন্যই মরছি? যদি জানত, তাহলে আমি শান্তি ও আনন্দের সঙ্গে মরতে পারতাম। পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ হিসেবে মরতাম।।
( চলবে )



