আলোর পথযাত্রী - বিতস্তা ঘোষাল
কমলা দাস : একমাত্র ভালোবাসাই পারে পৃথিবীর ক্ষুধা নিবারণ করতে
মালয়ালম ও ইংরেজি সাহিত্যের সাহসী কণ্ঠ কমলা দাস—তাঁর জীবন, সাহিত্য ও ব্যক্তিগত স্মৃতির আলোকে এক আত্মীয়তাসন্ধানী নিবন্ধ লিখলেন বিতস্তা ঘোষাল
একদিন, সময়টা হেমন্তের দুপুর। মোবাইলে একটা কল আসে। বাংলায় অভ্যাসবশত ‘নমস্কার’ বলা মাত্র ওপ্রান্ত থেকে এক পুরুষকণ্ঠ দক্ষিণি উচ্চারণে ইংরেজিতে বলে ওঠেন—
“বিতস্তা ঘোষাল?”
‘হ্যাঁ’ বললে তিনি বলেন—
“Please hold on, Kamala wants to speak with you.”
টিচার্স রুমে বসে তখন চা পান করছিলাম। ‘কমলা’ নামটা শুনেই হার্টবিট বেড়ে গেল। আমি কি ভুল শুনলাম! এই কমলা মানে মালয়ালম লেখিকা কমলা দাস? আমি তাঁকে চিঠি দিয়েছিলাম, তাঁর উত্তরে তিনটে বই পেয়েছি। এখন তিনিই ফোনে!
মুহূর্তের মধ্যেই শুনতে পেলাম—
“Dear Bitasta, কেমন আছো? How is Ghoshal-da?”
আমি উত্তর দেব কী! উনি বাবার কথা জানতে চাইছেন। কিন্তু আমি তাঁকে চিঠি দেওয়ার সময় একবারও বাবার নাম উল্লেখ করিনি। তাহলে জানলেন কী করে! পরমুহূর্তেই মনে পড়ল—অনুবাদ পত্রিকার লেটারহেডে চিঠি পাঠিয়েছি।
বললাম—
“আমি ভালো আছি। আপনি?”
উনি যেন আমার মনের ভাব বুঝতে পারলেন। বললেন—
“Dear, once upon a time I was in Kolkata. বাংলা অল্পবিস্তর মনে আছে। Your father is very familiar with me. অনুবাদ পত্রিকায় আমার প্রথম বাংলা অনুবাদ প্রকাশ হয়েছিল—maybe it was in the 1980s. Now tell me, what can I do for you?”
সংক্ষেপে বললাম। কিন্তু দেখলাম আমি অনুবাদ করব—এটার থেকেও তিনি বেশি উৎসাহী ঘোষালদাকে নিয়ে। আমার একটু অভিমান হল বাবার প্রতি। কত কাঠখড় পুড়িয়ে এনাদের সঙ্গে আমাকে যোগাযোগ করতে হচ্ছে, বাবা যখন চেনেন, তখন একবার বলে দিলেই সব মিটে যেত!
মনের ভাব গোপন রেখেই বললাম—
“বাবা এখন বাইরের জগত থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন, স্পিরিচুয়ালিটি…”
কথাটা শেষ করতে দিলেন না। বললেন—
“এটাই তো কথা ছিল। But you start it, and I know you will do good. Keep in touch.”
একটু চমকে গেলাম। কোনটা ভালো করব! অনুবাদটা?
যাহোক, সেদিনের মতো ফোন রেখে দিলেন। আমি তখনও একটা ঘোরের মধ্যেই রয়েছি।
এবার বলে নেওয়া যাক বাবার কথা এবং আমি কীভাবে অনুবাদের সঙ্গে যুক্ত হলাম। নইলে পাঠক বুঝতে পারবেন না আমার বিস্ময়ের জায়গা।
আমার বাবা বৈশম্পায়ন ঘোষাল ‘অনুবাদ পত্রিকা’র প্রতিষ্ঠাতা। এই কাজের জন্য তাঁকে সারা বিশ্ব ঘুরতে হয়েছে, লেখা এনে অনুবাদ করাতে হয়েছে—কারণ ১৯৭৫ সালে ইন্টারনেট ছিল না। কিন্তু ১৯৯০ সালে তিনি নিজেকে সবকিছু থেকে সরিয়ে নিয়ে অধ্যাত্মসাধনায় মগ্ন হলেন। ২০১৭ পর্যন্ত পত্রিকা বা তাঁর সৃষ্ট ‘ভাষা সংসদ’ নিয়ে আর এতটুকুও উৎসাহী ছিলেন না।
এমনকি আমি যখন কলেজে পড়ানোর ফাঁকে ২০০৫-০৬ সাল থেকে দপ্তরে যাতায়াত শুরু করি, তিনি তাঁর পরিচয় কোথাও দিতে বারণ করেছিলেন। কারণ জানলেই মানুষজন আবার ভিড় করবে—তাঁর সাধনায় বিঘ্ন ঘটবে তাতে।
ফলে আমিও সেই নির্দেশ মেনে চলেছি। আর তাই বাবা ঠিক কাদের সঙ্গে পূর্বপরিচিত ছিলেন, জানার অবকাশ হয়নি।
এ বিষয়ে কিছু বললে বলতেন—
“ওসব পূর্বজন্মের। এ জন্মের নয়।”
তাই আমার পথচলা শুরু হয়েছিল একদম নিজের পরিচয়ে।
অনুবাদ পত্রিকার সূত্রেই ২০০৭ সালে আমি যখন ভারতীয় সাহিত্য নিয়ে কাজ করব বলে স্থির করি, তখন প্যাপিরাস প্রকাশনা সংস্থার কর্ণধার অরিজিৎ কুমার তিনজন বিখ্যাত সাহিত্যিককে নিয়ে কাজ করতে বলেন। এঁরা হলেন পাঞ্জাবি লেখক কর্তার সিং দুগ্গল, অসমিয়া লেখিকা মামণি রায়সম ইন্দিরা গোস্বামী এবং মালয়ালম লেখিকা কমলা দাস।
যেহেতু বাংলায় অসমিয়া গল্পের, বিশেষ করে ইন্দিরা দেবীর অনেক গল্প অনুবাদ হয়েছে, সে-কারণে আমি অন্য দু’জনকে নিয়ে কাজ করব বলে স্থির করি।
সাহিত্য অকাদেমির তৎকালীন সচিব শ্রী রামকুমার মুখোপাধ্যায় আমাকে দুগ্গল সাহেব ও কমলা দাসের ফোন নম্বর ও ঠিকানা দেন। দুগ্গল সাহেব চিঠি পেয়ে অত্যন্ত উৎসাহ নিয়ে আমায় কয়েক দিনের মধ্যেই বই পাঠান এবং জানান—এই বিষয়ে তাঁর কোনও আপত্তি নেই, যদি অনুবাদ ভালো হয়।
অন্যদিকে কমলা ম্যাডামকে লেখার প্রায় সাত মাস পরে ‘Best wishes and blessings’ লেখা দু’টি বই— The Kept Woman and Other Stories এবং My Story— আসে আমার কাছে। খামের ওপর লেখা ছিল—
“Instructed by Kamala Das.”
বই দু’টি পাওয়ার পর ধন্যবাদ জানিয়ে লিখিত অনুমতিপত্র দেওয়ার জন্য যখন চিঠি লিখি, তখন তিনি অসুস্থ। তাঁর সেক্রেটারি ফোনে আমায় জানান—ম্যাডাম সুস্থ হয়ে এই বিষয়ে চিঠি পাঠাবেন।
এর পরই আসে সেই ফোন। এবং তারপর বেশ কয়েকবার।
একদিন বললেন—
“বিতস্তা, তুমি নিজের লেখা লিখছ না কেন?”
আমি বললাম—
“লিখি তো।”
—“কি লেখ?”
—“গল্প, কবিতা…”
তিনি বললেন—
“Okay, but you must write তোমার আত্মজীবনী।”
—“আমার?”—আমি অবাক হই।
তিনি বলেন—
“হ্যাঁ। কারণ আমি জানি তোমার ছোটবেলা বৈচিত্র্যে ভরা হবেই। একটা বড় উপন্যাসের রসদ তোমার নিজের জীবনেই পাবে।”
আমি ইতিমধ্যে তাঁর লেখা The Scent of Bird এবং My Story-র ‘Rule Britannia’ অধ্যায় পড়ে এতটাই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম যে অনুবাদ করে তাঁকে পাঠিয়ে দিই। সেটা ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি।
কেমন লেগেছে জানতে চাইলে মি. বালমূর্তি আমাকে জানান—
“ভাল লেগেছে। অনুবাদ করুন। উনি একটু ভাল হলেই আমরা লিখিত অনুমতিপত্র পাঠাচ্ছি।”
ক্রমশ তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন। মাঝখানে একবারই মাত্র কথা হল। তিনি খুব ধীর স্বরে বললেন—
“অনুবাদ করলে লেখার ওপর দখল বাড়ে। আমিও এক সময় শেলি, পার্ল বাক, রবীন্দ্রনাথ অনুবাদের চেষ্টা করেছি। কিন্তু পাশাপাশি নিজের লেখা লেখো। তুমি লিখবে, আমাকে পাঠিও।”
আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। আমার নিজের অনুবাদ বা লেখা কিছুতেই তখনও এত আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়নি, আর উনি আমাকে নতুন জেনেই বলছেন—পারব! এবং তিনি মানুষটি সাধারণ কোনও ব্যক্তি নন—তিনি কমলা দাস।
জন্ম কেরলের ত্রিসসুর জেলার পুন্নায়ুরকুলমে, ১৯৩৪ সালের ৩১ মার্চ। তাঁর পিতা ভি. এম. নায়ার জনপ্রিয় মালয়ালম দৈনিক ‘মাত্রুভূমি’-র সাবেক ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, আর মা নালাপাত বালামণি আম্মা সুখ্যাত মালয়ালি কবি।
কমলার শৈশব কেটেছে কলকাতায় এবং পুন্নায়ুরকুলমে নালাপাতদের ঐতিহ্যিক ভবনে। কলকাতায় ভি. এম. নায়ার ছিলেন ওয়ালফোর্ড ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা। এ কোম্পানি বিক্রি করত বেন্টলি ও রোলস রয়েস গাড়ি।
মায়ের লেখালেখির গুণ সবটুকুই পেয়েছিলেন কমলা। তবে অল্প বয়সেই, বিশেষ করে কবিতার প্রতি তাঁর আকর্ষণ জন্মায় প্রজ্যেষ্ঠ জেঠু, খ্যাতিমান লেখক নালাপাত নারায়ণ মেননের প্রভাবে।
১৫ বছর বয়সে কমলার বিয়ে হয় ব্যাংক কর্মকর্তা মাধব দাসের সঙ্গে। তাঁর উৎসাহেই মালয়ালম ও ইংরেজি ভাষায় লেখা প্রকাশ করতে থাকেন তিনি।
ষাটের দশকের কলকাতা ছিল শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির উদ্বেলতায় তোলপাড়। সেই বহুবচনের পরিবেশের একজন হয়ে ওঠেন কমলা। ভারতীয় ইংরেজি কবিদের ওই প্রজন্মের নানা পত্রপত্রিকা ও সংকলনে প্রকাশিত হতে থাকে তাঁর লেখা।
কমলা খ্যাতি পান মালয়ালমে ছোটগল্প এবং ইংরেজিতে কবিতা লিখে। একই সময়ে তিনি ছিলেন পাঠকপ্রিয় কলামনিস্ট। নারী প্রসঙ্গ, শিশু পরিচর্যা থেকে রাজনীতি—নানা বিষয়ে লেখা তাঁর কলাম একই সঙ্গে বহু পত্রিকায় প্রকাশিত হতো।
কমলার প্রথম কবিতার বই Summer in Calcutta ভারতীয় ইংরেজি কবিতায় নিয়ে আসে এক নতুন স্বাদ ও অভিজ্ঞতা। প্রেম, প্রবঞ্চনা ও পরিতাপের বেদনা ছিল তাঁর কবিতার প্রধান প্রসঙ্গ। উনিশ শতকীয় ভাষাভঙ্গি, ভাবাবেগ ও প্রেমবিহ্বলতা তখনও জড়িয়ে ছিল ভারতীয় ইংরেজি কবিতায়। কমলা সেই সব ছাঁচ ভেঙে অকপট উচ্চারণে নতুন ভাষা তৈরি করলেন।
যেমন তাঁর দ্বিতীয় কবিতার বই The Descendants-এ নারীকে উদ্দেশ করে বললেন—
“তা-ই তা-ই দাও যা-যা তোমাকে করেছে নারী,
দাও দীর্ঘ চুলের ঘন গহন সুরভি,
দাও স্তনযুগলের মধ্যবর্তী স্বেদ-কস্তুরীর ঘ্রাণ,
দাও ঋতুরক্তের ভয়ের চমক,
আর দাও তোমার যত ক্ষুধা—অন্তহীন…”
এই সোজাসাপটা ভাষার জন্য তিনি তুলনীয় হতে থাকেন ফরাসি লেখিকা মার্গরিট ডিউরাস (১৯১৪–১৯৯৬) এবং আমেরিকান কবি-কথাশিল্পী সিলভিয়া প্লাথ (১৯৩২–১৯৬৩)-এর সঙ্গে।
তিনি লিখেছেন—
“আমার চারপাশে শব্দ, শব্দ আর শব্দ,
তারা পাতার মতো আমার উপর বেড়ে ওঠে।
তারা কখনও নিজেদের ধীর বৃদ্ধি থামাবে বলে মনে হয় না…
কিন্তু আমি নিজেকে বলি—
শব্দ এক উৎপাত, তাদের থেকে সাবধান।
তারা অনেক কিছু হতে পারে—
একটি খাত হতে পারে
যেখানে দৌড়াতে থাকা পা থামাতে হবে;
হয়তো উত্তাল ঢেউয়ের মতো এক সমুদ্র,
জ্বলন্ত বাতাসের একটি বিস্ফোরণ,
অথবা আপনার প্রিয় বন্ধুর গলা কাটতে ইচ্ছুক একটি ছুরি।
শব্দ বিপজ্জনক—
তারা গাছের পাতার মতো আমার উপর লতিয়ে ওঠে,
তাদের আসা বন্ধ হয় না
এক নীরবতা থেকে, কোথাও গভীরে…”
(মূল কবিতা: Words)
তাঁর আত্মকথা Ente Katha ১৯৭২ সালে মালয়ালম ভাষায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় কেরলের সাপ্তাহিক Malayalanadu পত্রিকায়। পরের বছর লেখাটি প্রকাশিত হয় পুস্তকাকারে। একই সময়ে এর ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হয় My Story নামে।
আসলে এই আত্মকথা কমলা ইংরেজিতেই লিখেছিলেন ১৯৭০ সালে। পরে পত্রিকায় ছাপার সময় তিনি নিজেই এর অনুবাদ করেন মালয়ালম ভাষায়।
প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বইটি ব্যাপক প্রশংসা ও সমালোচনা কুড়ায়। তবুও নারীদের লেখা আত্মকথাগুলোর মধ্যে এখনও এর কাটতি সবচেয়ে বেশি।
উপন্যাসের মতো করে লেখা এই বৃত্তান্তে তিনি স্মৃতিচারণ করেছেন শৈশব, কৈশোর, বিয়ে এবং জীবনের নানা অভিজ্ঞতার। একই সঙ্গে তুলে ধরেছেন যন্ত্রণাক্ত আত্মচেতনা অর্জনের বিবরণ।
তবে My Story নিখাদ আত্মকথা নয়—এ কথা পরে স্বীকার করেছেন লেখিকা নিজেই।
কাহিনির শুরু কমলার চার বছর বয়স থেকে। তাঁর জীবনের প্রথম স্মৃতিগুলোর একটি—দক্ষিণ ভারত থেকে কলকাতায় এসে এক কৃষ্ণবর্ণ শিশু ও ছাত্রী হিসেবে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতা।
সেই সময় তাঁর কাজপাগল বাবা তাঁকে খুব বেশি সময় দিতে পারতেন না। এমনকি বাচ্চাকে স্নেহ বা আদর করার সময়ও ছিল না তাঁর। আর মা বেশিরভাগ সময়ই নিজের ঘরে লেখালেখিতে ব্যস্ত থাকতেন। কমলার মনে হত, সে এবং তার ভাই যেন সম্পূর্ণ উপেক্ষিত—তাদের ভালোবাসার মতো কেউ নেই।
ফলে তাঁর দৃঢ় সম্পর্ক তৈরি হয় মূলত দাদার সঙ্গেই। স্কুলজীবনে তাঁর দাদা পড়াশোনায় ভালো হলেও কীভাবে বর্ণবৈষম্যের শিকার হতেন, সেটাও উঠে এসেছে তাঁর আত্মকথায়। শুধু তা-ই নয়—কালো হওয়ার ‘অপরাধে’ স্কুলে বাইরে থেকে কোনও পর্যটক এলে তাঁদের কীভাবে লুকিয়ে রাখা হত, সেই অভিজ্ঞতার কথাও তিনি লিখেছেন।
শৈশবের এই অবহেলিত ও ভালোবাসাহীন বেড়ে ওঠা তাঁর মধ্যে গভীর একাকিত্বের জন্ম দেয়—যা পরিণত বয়সেও তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়।
ঘন ঘন বাড়ি পরিবর্তন—কলকাতা, বম্বে, কালিকট—সম্ভবত তাঁকে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগাত। তাই ছয় বছর বয়সে মাথা-হাত-পা হারানো পুতুলদের নিয়ে লেখা তাঁর কবিতা হয়তো এই শিকড়হীন জীবনকেই প্রতিফলিত করেছিল।
তাঁর বিখ্যাত বড় কাকু, কবি-দার্শনিক নারায়ণ মেনন এবং মা কবি বালামণি আম্মা তাঁকে লেখা নিয়ে কখনও বিশেষ উৎসাহ দেননি। তাঁর নিজের লেখা কবিতা তাই ছিল কান্নাভরা শব্দের আর যন্ত্রণার মিছিল।
সেই সময় যৌনতা আজকের মতো প্রকাশ্য ছিল না। বিয়ের রাতেই স্বামীর সঙ্গে এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই যৌনতার প্রথম পাঠ শুরু হত অনেক মেয়ের। তাঁর ভাই বাইরে পড়তে চলে গেলে তিনি আরও একা হয়ে পড়েন।
বাবা-মা মালাবারে ফিরে যাবেন বলে অতি অল্প বয়সেই কোনও মানসিক প্রস্তুতি ছাড়াই তাঁর বিয়ে ঠিক করে ফেলেন। তাঁর থেকে বয়সে অনেক বড় সেই স্বামী পরিচয়ের প্রথম দিনই তাঁর শরীরের উপর নিষ্ঠুরভাবে অধিকার কায়েম করেন—তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে।
তিনি লিখছেন—
“সেই সময় আমি গভীরভাবে ওঁকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। ওঁর সব অত্যাচার মেনে নিয়েই ওঁকে খুশি করতে চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু শরীর তখনও পুরোপুরি যৌনক্রিয়া সম্পূর্ণ করার মতো হয়ে ওঠেনি। ওর কাছে শরীর নিয়ে বেশি ভাবা ছিল বিরক্তিকর ও বিলাসিতা।
কুমারীত্ব নষ্ট বা যোনিচ্ছেদ অত্যন্ত দ্রুত করার জন্যই উনি খেপেছিলেন—কারণ উনি বাড়ির কাজের লোকের কাছেই এ-রকম শিক্ষা পেয়েছিলেন।
সেখানে আমি ভাবতাম—ভালোবাসা ফুল হয়ে চুলের মধ্যে গোঁজা হবে, সোনালি চাঁদের মতো সারা মুখ স্মিতভাবে উদ্ভাসিত হবে, মধুর হাসি আর মৃদু কথা কানের পাশে গুঞ্জরিত হবে…
শেষপর্যন্ত সমস্ত অনুভূতি ব্যর্থ করে তীব্র যন্ত্রণা, তিক্ততা আর ক্ষোভের মধ্য দিয়ে হঠাৎ আমার কুমারী জীবন থেকে নারীতে রূপান্তর ঘটল।”
এই দাম্পত্য থেকে পালাবার জন্য একসময় তিনি হোস্টেলের এক সমকামী বান্ধবীর আশ্রয়ও নিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত বিয়ে এবং পুরুষের যৌনতাসম্বল ভালোবাসাহীন সম্পর্ক মেনে নিতে বাধ্য হন।
কিন্তু জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি খুঁজে চলেন সত্যিকারের ভালোবাসা।
অনেক পরে তিনি উপলব্ধি করেন—
“It is the immeasurable world inside him that is real. Only the one who had decided to travel inwards will realize that his route has no end.”
১৯৯৯ সালে ৬৫ বছর বয়সে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে তিনি গ্রহণ করেন ‘কমলা সুরাইয়া’ নাম।
ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর রাজ্যের মুসলিম লিগের এমপি, ৩৮ বছর বয়সি সাদিক আলি (আবদুস সামাদ সামদানি)-র সঙ্গে এক সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানে বিয়ে হয় তাঁর। এর এক মাস আগে, ১৪ নভেম্বর, তাঁদের মধ্যে প্রণয়ের সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল।
এই ধর্মান্তর সামাজিক ও সাহিত্যিক মহলে যথেষ্ট বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল। The Hindu পত্রিকা লিখেছিল—ঘটনাটি অন্য কিছু নয়, তাঁর আরেকটি ‘চমক’ মাত্র।
যদিও রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন না, তবু ‘লোকসেবা পার্টি’ নামে এক জাতীয় রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন কমলা। উদ্দেশ্য ছিল দুঃস্থ মাতাদের আশ্রয় এবং ধর্মনিরপেক্ষতার প্রসার।
১৯৮৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে অংশ নিয়ে অবশ্য তিনি সফল হননি।
ব্যক্তিজীবনে তিন পুত্রসন্তানের মা কমলা দাস বহু প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ছিলেন কেরল সাহিত্য অকাডেমির ভাইস-চেয়ারপারসন, কেরল ফরেস্ট্রি বোর্ডের চেয়ারপারসন, কেরল চিলড্রেনস ফিল্ম সোসাইটির প্রেসিডেন্ট, Poet ম্যাগাজিনের সম্পাদক এবং Illustrated Weekly of India-র কবিতা বিভাগের সম্পাদক।
লেখিকা জীবনের প্রথমদিকে চমক দিয়ে নজর কাড়ার প্রবণতা থাকলেও পরে ভারতীয় ইংরেজি কবিতায় গভীর প্রভাব সৃষ্টিকারী সাহিত্যিক হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হন তিনি।
২০০৯ সালে The Times পত্রিকা তাঁকে আখ্যা দেয়—
“আধুনিক ভারতীয় ইংরেজি কবিতার জননী।”
সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন কমলা। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
- এশিয়ান পিইএন অ্যান্থলজি অ্যাওয়ার্ড (১৯৬৪)
- কেরল সাহিত্য অকাডেমি অ্যাওয়ার্ড (১৯৬৯)
- সাহিত্য অকাদেমি অ্যাওয়ার্ড (১৯৮৫)
- এশিয়ান পোয়েট্রি প্রাইজ (১৯৯৮)
- কেন্ট অ্যাওয়ার্ড (১৯৯৯)
- কালিকট বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডি.লিট. (২০০৬)
২০০৯ সালের ৩১ মে পুনের এক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।
পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করা হয় কেরলের রাজধানী তিরুবনন্তপুরমের পালায়াম জুমা মসজিদ প্রাঙ্গণে।
তাঁর মৃত্যুতে আমার ব্যক্তিগত ক্ষতির কথা না বলে তাঁর কবিতা দিয়েই আন্তর্জাতিক নারী দিবসে স্মরণ করি তাঁকে—
“যতক্ষণ না তোমাকে পেয়েছি লিখেছি অনেক,
ছবিও এঁকেছি, হেঁটেছি বন্ধুদের সঙ্গে এলোমেলো…
এখন তোমায় ভালোবেসে বুড়ো কুকুরের মতো
লেজ গুটিয়ে শুয়ে আছে তৃপ্ত জীবন তোমাতে…”
তাঁকে অনেকে নারীবাদী বললেও আমার কাছে তিনি এক স্রষ্টা—যিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন, ভালোবাসা ছাড়া বাঁচা যায় না।
তাঁর মধ্যে দেখি রক্তমাংসের শরীরের বাইরে এক অনশ্বর প্রেম ও কুয়াশাচ্ছন্ন অস্তিত্ব।
মনে হয় লোক ও বস্তুজগত থেকে কল্পলোকের পৃথিবীতে উড়ে যেতে ভালোবাসতেন তিনি।
বারবার উত্তরণই তাঁর পরিচয়।


