ধ্রুপদী সাহিত্য
শ্যামলকৃষ্ণ বসু
১
সুরধ্বনি রামধুন
রাম না জন্মাতেই রামায়ণ। বিশ্ববিদিত এ প্রবচন। এ সেই ত্রেতা যুগের কাহিনী।
দেবর্ষি নারদ একদিন তাঁর ঢেঁকি বাহনে চিত্রকূট পর্বতের স্বর্গীয় দৃশ্য সমন্বিত নন্দনকাননে মহর্ষি বাল্মীকির সাধন কুটিরে এসে পদার্পণ করলেন ‘ নারায়ন’ ‘নারায়ন’ বলে ।
দেবর্ষিকে দেখে মহর্ষি বাল্মীকি তাঁকে জোড়হস্তে আভূমি নত হয়ে সাদরে অভ্যর্থনা জানান।
‘আসুন আসুন মুনিবর। আমার পরম সৌভাগ্য যে আজ এতদিন পরে আমি আপনার দর্শন লাভ করলাম।’
দেবর্ষি নারদ চিত্রকূট পর্বতের স্থান মাহাত্ম্যে এবং সৌন্দর্য মাহাত্ম্যে আনন্দিত হয়ে উঠলেন।
‘অহো মহর্ষি, এ যে এক নন্দনকানন ! সাধন ভজনের জন্য সত্যি এ এক উপযুক্ত স্থান।
মহর্ষি বলে ওঠেন, ‘হে দেবর্ষি, এই মনোরম স্থান আপনিই নির্বাচন করে আমাকে আদেশ করেছিলেন চিত্রকূট পর্বতে আশ্রম গড়ে সাধনমার্গে রত থাকতে।’
মহর্ষি নারদ বলেন, ‘হ্যাঁ সে কথা মনে আছে আমার। তুমি তোমার পূর্বজন্ম হতে যখন ‘রাম’ নাম জপ করে মহর্ষিত্ব প্রাপ্ত হ’লে তারপর আমি নিজেই তোমাকে এই স্থানে অবস্থান করতে বলেছিলাম, এই দেবভূমি সদৃশ সুন্দর চিত্রকূট পর্বতে। তোমার এই আশ্রমে একদিন স্বয়ং শ্রীরামচন্দ্র এবং মাতা জানকী এসে অবস্থান করবেন।’
দেববাক্য কখনো তো যায় না বিফলে। একদিন হয়ত অদূর ভবিষ্যতে সেই মহামহিমময় নরজন্মরূপী শ্রীরামচন্দ্র এই চিত্রকূট পর্বতে তাঁর পদচিহ্ণ এঁকে দিয়ে যাবেন।
মহর্ষি বাল্মিকি এইবার যেন এক আনন্দময় সত্ত্বা হয়ে ওঠেন, ‘অহো কি আনন্দ। হে দেবর্ষি আপনি আমাকে সেই মহামহিমান্বিত ভগবান শ্রী রামচন্দ্রের কথা কিছু বলুন। আমি সেই সর্বগুনসম্পন্ন শ্রীরামচন্দ্রের মহিমা গান শুনতে বড়ই উৎসুক।’
অনন্তর দেবর্ষি নারদ সেই সৌন্দর্যমণ্ডিত চিত্রকুট পর্বতের শোভা অবলোকন করতে করতে মহর্ষি বাল্মীকির সঙ্গে আলাপনরত হলেন। তিনি শ্রীরামচন্দ্রের মহিমা গুনগান করে শোনাতে লাগলেন মহর্ষি বাল্মিকিকে। দেবর্ষি নারদ আপন অন্তরে ডুব দিয়ে বলতে থাকেন, ‘আহা,মহর্ষি, কি ভাবে ব্যক্ত করি সে কথা আপনাকে। সে মধুর স্মৃতি যেন আমার মানসপটে আঁকা হয়ে রয়েছে সোনার জলছবিতে।’
মহর্ষি বাল্মিকি বুঝলেন মহামুনী তাঁর স্মৃতি অবগাহনে এক আনন্দময় স্বত্তা হয়ে উঠেছেন।
দেবর্ষি বলেন,‘অনেকদিন আগে একদিন আমি গিয়েছিলাম বৈকুন্ঠধামে স্বয়ং শ্রীবিষ্ণু সন্নিধানে। পারিজাত পুস্প শোভিত কল্পবৃক্ষের ছায়ায় ঘেরা নৈঃশ্রেয়স কানন। চন্দ্রালোকে আলোকিত সেই আনন্দধাম। পুন্যাত্মা মহাপুরুষদের কন্ঠের সুমঙ্গল গীতে মধুর হয়ে আছে মন্দার বাতাস। কিন্তু সেখানে আমি স্বয়ং শ্রীবিষ্ণুকে দেখতে পেলাম না। স্বয়ং শ্রীময়ী লক্ষ্মীদেবীকেও দেখতে পেলাম না। মাত্র দেখলাম সেখানে বিরাজ করছেন আনন্দময় চারমূর্তি। তাঁরা ধনুর্ধর, হাস্যময় এবং নয়নাভিরাম। আর সেখানে রয়েছেন শ্রীলক্ষ্মীর মত মনোরমা এক নারী।
আমি ব্যাখ্যা না পেয়ে পরম বিস্মিত হয়ে ছুটে গেলাম কৈলাসে দেবাদিদেব মহাদেব এর কাছে এবং জিজ্ঞাসা করলাম, ‘হে দেবাদিদেব, গোলোকে আজ চতুর্ভুজ নারায়নকে আমি দেখতে পেলাম না ! ’
দেবাদিদেব মহাদেব মহাপ্রসন্ন এক হাসি হেসে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কি দেখলেন তবে মহামুনী ?’
আমি বললাম, ‘হে দেবাদিদেব, আমি সেখানে দেখলাম ধনুর্ধারী চারমূর্তি আর যোগমায়ার ন্যায় কমনীয়া এক দেবীমূর্তি বিদ্যমান।’
কৈলাসপতি শিব বললেন,’ হ্যাঁ, সে তাঁর নয়নমোহন রামরূপ। বৎস নারদ, ভগবান এবার রামরূপে মর্ত্যে অবতীর্ণ হবেন। এ তাঁর সপ্তম অবতার রূপ। তিনি এই ধরনীতে ছয়বার ছয়রূপে এসেছিলেন। মৎস, কূর্ম, বরাহ, নরসিংহ, বামন এবং পরশুরাম হয়ে।
মৎস্য অবতারে কৈলেন বেদের উদ্ধার
কূর্ম অবতারে তিনি স্থাপিলেন সংসার ।।
তৃতীয় অবতারে প্রভু বরাহ রূপ ধরি
বসুন্ধরা ধরিলেন তিনি দশন উপরি ।।
হিরন্যকশিপু সংহারেন তবে নরসিংহরূপে
হইলেন বামন তিনি পঞ্চম অবতারে ।।
বলিকে ছলিয়া লইলেন ত্রিপদ ভুমিরে ।
ষষ্টেতে পরশুরাম হৈলেন ভৃগুপতি
সীতাপতি নিঃক্ষত্রিয় করিলেন বসুমতি ।।
সপ্তমেতে রাম রূপ লইবেন নারায়ন
বধিয়া রাক্ষস তিনি রক্ষিবেন ত্রিভুবন ।। [কৃত্তিবাস ]
এইবার রাম হবেন স্বয়ং নারায়ন এবং লক্ষীদেবী হবেন সীতা। ধরাতলে সত্য ও ধর্ম যখন ক্ষীন হয়ে আসে, বেদমন্ত্র সব যখন বিস্মৃত হতে থাকে তখন ব্রহ্মা ও দেবগন ক্ষীরসাগরের কুলে গিয়ে অখিলভুবনের আশ্রয় সর্বেশ্বর হরির স্তব করতে থাকেন। শ্রীহরি তখন আশ্বাস দেন অচিরেই তিনি চার অংশে বিভক্ত হয়ে জগতে অবতীর্ণ হয়ে পৃথিবীর ভার হরণ করবেন।
মহর্ষি বাল্মিকি একাগ্র হয়ে শুনে চলেছেন রামের মাহাত্ম্য ও জীবন কথা। দেবর্ষি নারদ বলে চলেছেন, ‘ শুনুন বলি, ইক্ষ্বাকু বংশের রাজা দশরথের পুত্ররূপে রামচন্দ্র জন্মগ্রহন করেছেন। তিনি বিষ্ণুর অংশ সম্ভূত। পৃথিবীর পাপ ও অসুর বিনাশ করে ধর্মরাজ্য সংস্থাপনার্থে স্বয়ং নারায়ন এসেছেন নররূপে।
তিনি ভগবান বিষ্ণুর মতো বীর্যবান। চন্দ্রের মতো স্নিগ্ধদর্শন। ক্রুদ্ধ হলে তিনি প্রলয়াগ্নির মতো ভয়ংকর। আবার ধরিত্রি মাতার ন্যায় ক্ষমাশীল।
ক্রমে দেবর্ষিনারদ শ্লোকে সুরে ব্যাখায় মহর্ষির কাছে সেই আদ্যন্তরামায়ন সংক্ষেপে বর্ণনা করে বললেন,‘মহাত্মন, রামায়্নের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কিছুই নাই। নাস্তি রামায়নাৎ পরম। রামায়ন হতে শ্রেষ্ঠ কিছু নাই। রামকথা মন্দাকিনী। চিত্রকূট চিত চারু। [তুলসিদাস]
রামকথা স্বর্গের মন্দাকিনী। চিত্রকূটসম ভক্তের চিত্তে তাহা নিরন্তর প্রবহমান। সত্য ও পুন্যে রামকথা মহিমান্বিত। মহর্ষি বাল্মীকি যেমন চমৎকৃত তেমনি আনন্দিত হলেন সুরধ্বনি রামনাম শুনে।
আজ যিনি মহর্ষি এককালে সেই তিনি ছিলেন একজন দস্যু। নাম ছিল দস্যু রত্নাকর। তিনি ছিলেন প্রচেতা মুনীর পুত্র। সেই প্রচেতার পুত্র ভগবান বাল্মিকী শব্দব্রহ্মের প্রথম প্রকাশ এই রামায়ন-ইতিহাস রচনা করলেন।
( চলবে )



