ঊর্ণনাভ
ধারাবাহিক উপন্যাস
শ্যামলী রক্ষিত
অর্থকষ্ট, মহামারির অনিশ্চয়তা, সম্পর্কের টানাপোড়েন আর না-বলা অপরাধবোধ—সব মিলিয়ে এক নিঃশব্দ আবেগের অধ্যায় উর্ণনাভ-এর পনেরো নম্বর পর্ব।
মালবিকা বুঝতে পারে, দিপালীর মাইনে বাড়ানোর দাবির পেছনে নিশ্চয়ই রয়েছে জীবনের কঠিন বাস্তবতা। কিন্তু নিজের সীমিত আয়, কমতে থাকা সুদের টাকা আর সংসারের হিসাব তাকে অসহায় করে তোলে। অন্যদিকে দিপালীও নিজের আচরণের জন্য ভেতরে ভেতরে দগ্ধ। বহু বছরের বিশ্বাস, নির্ভরতা আর আত্মীয়তার সম্পর্ক কি তবে অর্থের চাপে ভেঙে যাবে ?
এই অধ্যায়ে করোনা-সময়ের মধ্যবিত্ত জীবনের অনিশ্চয়তা যেমন ধরা পড়েছে, তেমনি উঠে এসেছে দুই নারীর গভীর মানবিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম টানাপোড়েন। কথার চেয়ে বেশি কথা বলে নীরবতা, আর হিসাবের খাতার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে মানুষের প্রতি মানুষের মায়া।
একটি মাইনে বাড়ানোর অনুরোধ কীভাবে দুই মানুষের মনোজগতে ঝড় তোলে, সেই হৃদয়স্পর্শী কাহিনিই অপেক্ষা করছে এই পর্বে।
পঞ্চদশ অধ্যায়
গভীর চিন্তায় পড়ে গেল মালবিকা!
দিনদিন ব্যাংক, পোস্ট অফিসের অবস্থা যা হচ্ছে, এইটুকু টাকায় সংসার চালানোই মুশকিল! সুদের হার যেভাবে বছর বছর কমছে, কী যে করবে তার ঠিক নেই। কাজের লোকজন রাখার ক্ষমতা আর থাকবে না। নিজেদের কাজ নিজেদেরকেই করতে হবে। এছাড়া আর কিছু করার নেই। ওই তো ওইটুকু টাকা! ইনকাম তো কিছু নেই।
নিচে যে ভাড়াটে ছেলেটি ছিল, ফার্স্ট ওয়েবের সময়ই চলে গেছে। দু-চারটে জিনিসপত্র রেখে গেছে। বলেছে, “দিদি, আপনার ঘর কেউ নিলে আপনি দিয়ে দেবেন। আমাকে একটা ফোন করবেন। আমি কোনও বন্ধুকে পাঠিয়ে জিনিসগুলো নিয়ে যেতে বলে দেব। বাড়িতে মা একা থাকে তো, তাই চলে যাচ্ছি। এসব মিটে গেলে আমি ফিরে আসব। তখনও যদি আপনার ঘর ফাঁকা থাকে তো আমিই নেব, দিদি।”
কবে এখন পরিস্থিতি ঠিক হবে, তবে তো ভাড়া!
এদিকে দু-চারটে টিউশনি করত আশপাশের বস্তির ছেলেদের। সেও গেছে। এখন ভরসা বলতে ওই সুদের টাকাটুকু। কিন্তু এভাবে সুদের হার কমতে কমতে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে কে জানে!
এদিকে বাজারদর যা বাড়ছে, জিনিসে হাত দিতেই ভয় করছে।
দিপালীর তো দোষ নেই। স্বাভাবিক! অন্যান্য বাড়িতেও যদি বেশি মাইনে পায়, তাহলে কেন শুধু শুধু কম মাইনেতে কাজ করবে? আর সেই বা করবে কেন? কাজে রাখতে হলে ন্যায্য পয়সা দিয়েই রাখতে হবে। নাহলে ছাড়িয়ে দেবে।
যত কষ্টই হোক, এবার থেকে সে নিজেই সমস্ত কিছু করবে। দিপালীকে বলে দেবে অন্য বাড়িতে কাজ দেখে নিতে। ওর তো কাজের অভাব হবে না। কত লোক ওকে কাজে রাখতে চায়! ঠিক কোনও না কোনও বাড়িতে কাজ পেয়ে যাবে।
তার পক্ষে কোনওভাবেই মাইনে বাড়ানো সম্ভব নয়। এমনিতেই মাসে মাসে বারোশো করে দিতে হয়। এরপর বাড়ানো মানে দেড় হাজার টাকার কমে হবে বলে মনে হয় না।
দিপালীকে সে কথাই বলবে বুঝিয়ে। এছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই।
দিপালী যদি কম মাইনেতেও করতে চায়, তাহলেও ওকে আর বেঁধে রাখবে না মালবিকা। ওর মনে যখন হয়েছে, তখন হয় ওর মাইনে বাড়াতে হবে, নয়তো আর কাজে রাখা চলবে না। এছাড়া অন্য কোনও অপশন নেই।
মালবিকা খুব চিন্তায় পড়েছে। দেখা যাক কী করতে পারবে।
তবে একটা ব্যাপারে তার খুব ধন্দ লাগছে। আজ হঠাৎ করে এরকম রাগী রাগী মুখ করে কেন বলল মাইনে বাড়ানোর কথা?
বাড়িতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই ওর মুখ-চোখ দেখেই বুঝতে পেরেছে কিছু একটা হয়েছে।
ডাক্তার দিদিদের সঙ্গে কি কোনও ঝামেলা হয়েছে? নাকি আমাদের বিরুদ্ধে কোনও কানভাঙানি দিয়েছে কে জানে!
ওরা তো বড়োলোক। টাকাপয়সার অভাব নেই। হুট বলতেই মাইনে বাড়াতে পারে। অনেকের চেয়েই বেশি মাইনে দেন ওরা, সেটা মালবিকা জানে। তারপরও এটা-সেটা হাতে দেয় দিপালীকে। পালা-পার্বণেও ভালো-মন্দ খেতে দেয়। বাড়তি টাকাপয়সা দেয়।
ওদের সঙ্গে কি তুলনা চলে?
এমনটাও হতে পারে, ডাক্তার দিদি হয়তো কিছু বলেছে। কী জানি আসলে কী ঘটেছে! স্পষ্ট করে না বললে তো কিছু বোঝা যাবে না।
কৌতূহল হচ্ছে জানার। কিন্তু যতক্ষণ না ও নিজের থেকে কিছু বলছে, ততক্ষণ সমস্ত কৌতূহল চেপে রাখতে হবে। কেননা আগ বাড়িয়ে কিছু জিজ্ঞেস করার অভ্যাস মালবিকার নেই। তাই মনে মনে সে অপেক্ষায় থাকল।
তবু চিন্তা গেল না মন থেকে।
সে জানে, ডাক্তার দিদির বাড়িতে কাজ সেরে তারপর তাদের বাড়িতে আসে দিপালী। বরাবরই তাই করে। ওদের অফিস টাইমে বেরোনো আছে। আগে তো আবার ছেলেটার স্কুল ছিল। সব মিলিয়ে সকালটা খুব বিজি টাইম ওদের।
আর তাদের তো বাড়ির মধ্যেই থাকা। যে কোনও সময়ে করে দিলেই হল। তাই ওদেরটা আগে সময়মতো সেরে দিয়ে তারপর তাদের বাড়ি আসে বরাবর।
এদিকে তাদের দুটো বাড়িতেই কাজ করে। তাই এদিকটা একবারে সেরে রেখে অন্যদিকে যায় সে। একটানে করে দিলে দিপালীর নিজেরই সুবিধে হয়।
এসব নিয়ে তো কোনওদিন কোনও অসুবিধে হয়নি। কোনওদিন ডাক্তারদের কথা, মানে নিন্দে-বাদা কিছুই তো করেনি দিপালীর কাছে। আর দিপালীর সঙ্গে যে সম্পর্ক, তাতেও নিশ্চয়ই মিথ্যে কথা বলবে না তার নামে।
তাহলে গণ্ডগোলটা কোথায় হল? কীই বা হল?
এমন কোনও ঘটনাই ঘটেনি যার ফলে তার উপর ওরা বিরক্ত হবে।
বেশ চিন্তা লাগছিল মালবিকার।
কোনও কোনওদিন দরকার থাকলে দিপালী অন্য বাড়ির কাজ করতে চলে যায়। অন্যদিক সেরে আবার আসে। আসলে তার কাছে কাজে এসে একটু শান্তি পায় ও।
এসেই আগে ফ্যানের তলায় হাঁপ ছেড়ে বসে। গলগল করে পাড়ার খবর, তার ঘরের খবর সব বলে। এমনকি অন্য কাজের বাড়ির দিদিদের কথা, মাদিমাদের কথা—ইত্যাদি সাতসতেরো শেষ হলে একটুচা-বিস্কুট খেয়ে তারপর কাজে হাত দেয়।
এসবের পর বাসন মাজে। বরাবরের এই রুটিন তার।
এখন এই করোনাকালে একটু পাল্টাতেই হয়েছে। এসে নিচের বাথরুমে ঢুকে জামাকাপড় ছেড়ে, হাতে-মুখে সাবান দিয়ে, স্প্রে করে তারপর ওপরে আসে।
আগে দিপালী নিজেই বেশির ভাগ দিন চা করত। এখন মালবিকাই করে চাটা। কোনও কোনওদিন নুন-চিনি-লেবুর সরবতও করে দেয়।
সব মিলিয়ে তাদের সম্পর্কটা মোটেই শুধু কাজের লোকের সীমায় আটকে নেই। একটা আন্তরিক আপনতায় মোড়া আছে আপাত কাজের মেয়ে আর কাজের বাড়ির সম্পর্কের বেড়াজালে।
সেই জায়গা থেকেই দিপালীর হুট করে এমন করে মাইনে বাড়াতে বলতে দেখে মালবিকার একটু খটকা লেগেছিল।
দিপালী কোনওদিন এভাবে কথা বলে না তার সঙ্গে। হঠাৎ কী এমন ঘটল কে জানে!
বাড়িতে ঢুকেই দেখছে ওর মেজাজ খটমট।
যাক গে, এখন আর ওকে কিছু জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। বলার হলে ঠিক নিজের থেকেই বলবে। শুধু শুধু খুঁচিয়ে ঘা করে কোনও লাভ নেই।
দেখি, রান্নাঘর পরিষ্কার হল কি না।
চা-টা চাপাই।
চা তো নয়, পাঁচমিশেলি সিরাপ।
করোনার জন্য শুধু চা খাওয়া তো উঠেই গেছে সবার। এখন আদা, তেজপাতা, এলাচ, লবঙ্গ দিয়ে, তার সঙ্গে চা দিয়ে ফুটিয়ে আরক বানাচ্ছে সবাই। সঙ্গে মধু, তুলসীপাতাও আছে। ফুটিয়ে ফুটিয়ে নির্যাস বার করে রেখে দেয় একটা স্টিলের মগে করে। দিনে দু-তিন বার সেই আরক গরম করে খায়।
এই সময় দিপালীকেও দেয় এক কাপ।
দিপালী খেতে চায় না। নানা না করেছিল। কিন্তু মালবিকাও ওর কথায় কর্ণপাত করেনি।
বলেছে, “বাড়িতে তো তোর করে খাবার সময় হবে না। আমি তো নিজেদের জন্য বানাচ্ছিই। তোকে এক কাপ দিতে পারব না? তুই তো আমাদের সবার জন্য এত করছিস! তোর জন্য না হয় দিদি হিসেবে এটুকু করলাম।”
এরপর আর কিছু বলেনি দিপালী।
নিঃশব্দে আরকের কাপটা নিয়ে চায়ের মতো চুমুক দিয়ে মৌতাত করে খেয়েছিল।
এখন প্রতিদিনই খায় সে।
আজ মনটা এত ভার হয়ে গেছে! ভুলেই গিয়েছিল আরকটা খাবার কথা।
ওদিকে দিপালীও মুখ ভার করে এক এক করে কাজ সারছে।
মালবিকার মনটা বড্ড হুহু করছে আজ।
দিপালী কাজে না এলে বড্ড একা হয়ে যাবে মনের দিক থেকে। সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে দিপালীই তার একমাত্র বন্ধু। তাদের জন্য খুব করে মেয়েটা।
দিপালী কাজে না এলে একদম ভালো লাগবে না।
দিপালীকে কোনওভাবেই দোষ দিতে পারছে না।
তার মনের মধ্যে দুটো জিনিসই খুব তোলপাড় করছে।
এক, সত্যিই সত্যিই দিপালীর মাইনেটা বাড়াতে হবে। কেননা করোনার সময় সত্যিই মার্কেট আগুন হয়ে গেছে। ওকে বললেই তো হবে না। ছেলে-মেয়ে নিয়ে তো ওর সংসারটা চালাতে হবে।
কিন্তু বিষয়টা হচ্ছে, তারও তো হাত-পা ভেঙে কাঁদুনির সার! কোথা থেকেই বা মাইনে বাড়ানোর টাকা পাবে?
যাক গে! এসব পরে ভাববে এখন।
এখন আরকটা তো গরম করে আগে খাওয়া যাক। তারপর অন্য কথা…
(চলবে)


