১৩ : ঊর্ণনাভ

১৩ : ঊর্ণনাভ

This entry is part 13 of 13 in the series ঊর্ণনাভ

ঊর্ণনাভ

১ : ঊর্ণনাভ

২ : উর্ণনাভ

৩ : ঊর্ণনাভ

৪ : ঊর্ণনাভ

৫ : ঊর্ণনাভ

৬ : ঊর্ণনাভ

৭ : ঊর্ণনাভ

৮ : ঊর্ণনাভ

৯ : ঊর্ণনাভ

১০ : ঊর্ণনাভ

১১ : ঊর্ণনাভ

১২ : ঊর্ণনাভ

১৩ : ঊর্ণনাভ

ত্রয়োদশ অধ্যায়

সেই থেকে বারান্দায় অন্যমনস্ক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল মালবিকা। মাঝেমধ্যে শরীরের ওপর এক অদ্ভুত অবসাদ নেমে আসে তার। তখন কথা বলতে ইচ্ছে করে না, কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না; শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে কিংবা বসে দূরের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালো লাগে।

জানালার ফাঁক দিয়ে দূরে দেখা যায় জয়চণ্ডী পাহাড়। সেই পাহাড়ের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যে সময় কেটে যায়, মালবিকা নিজেও বুঝতে পারে না। এই অভ্যাস তার আজকের নয়। ছোটবেলা থেকেই।

মা বলতেন, ছোটবেলায় ঘুম ভাঙার পর কিংবা ঘুমোতে যাওয়ার আগে মালবিকা ভীষণ কান্নাকাটি করত। তখন বাবা তাকে কোলে করে জানালার ধারে বসাতেন। দূরের পাহাড় দেখিয়ে গল্প শুরু করতেন।

—ওই যে দেখ, পাহাড়ের গায়ে ছোট্ট ছোট্ট গ্রাম। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে গেছে এক সরু নদী। সেই নদীর ধারে বিরাট রাজপ্রাসাদ। সেখানে থাকে রূপকুমার। কী সুন্দর ঘোড়া ছুটিয়ে সারাদিন পাহাড় আর জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়! ফল খায়, ঝরনার জল খায়, আর খুঁজে বেড়ায় তার রাজকুমারীকে।

মালবিকা বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করত,
—আমাকেই বিয়ে করবে?

বাবা হেসে বলতেন,
—আলবাত করবে। তবে একটা শর্ত আছে।

—কী শর্ত?

—রাজকুমারী কখনও কাঁদবে না। সে শুধু হাসবে। ঘুমোতে যাওয়ার আগে হাসবে, ঘুম থেকে উঠেও হাসবে।

মুহূর্তের মধ্যে কান্না থেমে যেত মালবিকার।

—দেখো বাবা, আমি আর কাঁদব না।

বাবা প্রতিদিন একই গল্প বলতেন, আর মালবিকাও প্রায় প্রতিদিনই কাঁদত। কিন্তু গল্প শুরু হলেই সে যেন দম দেওয়া পুতুলের মতো চুপ করে শুনত।

সেই থেকেই একা দাঁড়িয়ে দূরে তাকিয়ে থাকার অভ্যাস। এখনও যখনই সময় পায়, ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়। পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনের সমস্ত চাপ, সমস্ত ক্লান্তি যেন ধীরে ধীরে গলে যায়।

আজও সে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু আজ পাহাড় তাকে শান্তি দিতে পারছিল না।

ক’দিন ধরেই মাকে নিয়ে তার মন বড় অস্থির। চিকিৎসকেরা প্রায় আশাই ছেড়ে দিয়েছেন। শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ একে একে নিস্তেজ হয়ে আসছে, কিন্তু মন? মন এখনও জেগে আছে। মায়ের চোখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, স্মৃতিগুলো এখনও ভেসে বেড়ায় সেখানে। কখনও চোখের কোণে চিকচিক করে ওঠে জল। মালবিকা কাছে গিয়ে মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, আলতো করে চোখের জল মুছে দেয়। কিন্তু এই মুহূর্তে মায়ের আর কোনও সাড়া নেই।

ভারাক্রান্ত মন নিয়ে সে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েছিল।

ঠিক তখনই ঝাড়ু দিতে দিতে দিপালী বলল,

—দিদি, আমার মাইনেটা এবার একটু বাড়িয়ে দিও।

মালবিকা ফিরে তাকাল।

—সে কী রে! গত বছরই তো বাড়িয়েছি।

দিপালী মৃদু হেসে বলল,

—দেখছ তো দেশের কী অবস্থা। আমাদেরও তো খেয়ে পরে বাঁচতে হবে।

মালবিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

—তা তো ঠিক। কিন্তু বছর বছর মাইনে বাড়ানোও তো সহজ নয়।

দিপালী ঝাড়ু থামাল না।

—আমাদের তো এই গতরটাই পুঁজি, দিদি। পাঁচ-সাতটা বাড়ি করি। করোনার সময় সবাই ঘরে বসে ছিল, আর আমরা দোকান-বাজার, ওষুধ, দুধ, সব এনে দিয়েছি। দুটো পয়সার জন্য নিজের প্রাণটা হাতের মুঠোয় নিয়ে ঘুরেছি। না খেয়ে থাকলে রোগের সঙ্গে লড়ব কী করে?

কিছুক্ষণ থেমে আবার বলল,

—আমরা ভালো থাকার স্বপ্ন দেখি না দিদি। শুধু চাই, খেটে খেতেই যেন মরতে পারি। পরের জন্মে আর মানুষ হয়ে জন্মাতে চাই না। মানুষ হয়ে বাঁচা বড় কষ্টের।

মালবিকা নিঃশব্দে শুনছিল।

দিপালী যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলছিল।

—তুমি বড়লোকের কষ্ট বলো, গরিবের কষ্ট বলো—পৃথিবীতে শান্তিতে আছে এমন একজন মানুষও দেখাতে পারবে? মানুষ তো দূরের কথা, স্বয়ং ঈশ্বরও শান্তিতে থাকতে পারেননি।

মালবিকা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। মনে হল, বিশ্ববিদ্যালয়ের পুঁথিগত দর্শনের চেয়ে এই শ্রমজীবী নারীর জীবনের অভিজ্ঞতা অনেক গভীর। এরা বই লেখে না, তত্ত্ব নির্মাণ করে না; অথচ প্রতিদিন জীবনকে বাঁচতে বাঁচতেই এক নতুন দর্শনের জন্ম দেয়। পরে সেই দর্শনই অন্যেরা নিজেদের ভাষায় লিখে ইতিহাসে নাম করে।

দিপালী হঠাৎ হেসে বলল,

—কী গো দিদি, এমন করে তাকিয়ে আছ কেন? বলো তো, সারাদিন খেটে যদি দু’মুঠো ভাতই না জোটে, তা হলে বেঁচে থেকে লাভ কী? কখনও কখনও মনে হয়, সবাই মিলে বিষ খেয়ে মরলেই হয়। অন্তত এই কষ্টটা থাকবে না।

কথাগুলো শুনে মালবিকার বুক হিম হয়ে গেল।

ঠিক তখনই পাশের ঘরে টেলিভিশনের সংবাদপাঠকের গলা ভেসে এল—

“মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ছিয়াশি বছর…”

অকারণে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল মালবিকার। মায়ের কথা মনে পড়ে গেল।

সে দ্রুত বলল,

—ছি দিপালী! এসব কথা মুখেও আনিস না। তোর কী হয়েছে? তোকে তো কখনও এভাবে কথা বলতে শুনিনি।

দিপালী মাথা নিচু করে রইল।

মালবিকা একটু নরম গলায় বলল,

—আমি যদি মাইনে বাড়াতে না-ই পারি, তুই অন্য বাড়িতে কাজ নে। যেখানে বেশি পাবে, সেখানে কাজ কর। আমি কিছু মনে করব না।

(চলবে)

ঊর্ণনাভ

১২ : ঊর্ণনাভ

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

সামান্যভাবে স্বাধীনতায়, স্বাধীন বেঁচে থাকায়, স্বাধীন একটা যৎসামান্য উনুনও জ্বালানোয় বিশ্বাসার্থী কবি অনুরাধা মহাপাত্র

This entry is part 13 of 13 in the series ঊর্ণনাভ

This entry is part 13 of 13 in the series ঊর্ণনাভ আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর পথযাত্রী …সৃষ্টির শেষ রহস্য,

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

সামান্যভাবে স্বাধীনতায়, স্বাধীন বেঁচে থাকায়, স্বাধীন একটা যৎসামান্য উনুনও জ্বালানোয় বিশ্বাসার্থী কবি অনুরাধা মহাপাত্র

This entry is part 13 of 13 in the series ঊর্ণনাভ

This entry is part 13 of 13 in the series ঊর্ণনাভ আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর পথযাত্রী …সৃষ্টির শেষ রহস্য,

Read More »