২৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

This entry is part 23 of 26 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৫ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৬ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৭ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৮ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৯ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১০ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা – দশম পর্ব

১১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৫ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৬ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৭ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৮ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

 ১৯ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২০ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২৫ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস 

ত্রিবিংশতি পর্ব

সেই নারী ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে আমার সমস্ত অন্ধকার চিন্তাভাবনা উবে গেল। তার সত্তা থেকে বিচ্ছুরিত কোনো অদৃশ্য রশ্মি, অথবা তার ভাবভঙ্গির মধ্যে থাকা কোনো আশীর্বাদের স্পর্শ আমাকে সান্ত্বনা দিল।

সে বেশ স্বাস্থবতী গোলগাল যুবতী। গায়ে ধূসর রঙের মোটা দু ফেরতা চাদর। ভ্রু প্লাক করে নতুন করে গাঢ় রঙে আঁকা, গালে কৃত্রিম তিল, মুখে সাদা পাউডার ও লালিমা, আর চোখের পাতায় কাজল।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, সে সম্পূর্ণ সাজগোজ করে আমার ঘরে ঢুকেছিল। তাকে জীবনে সন্তুষ্ট বলেই মনে হচ্ছিল।

নিজের অজান্তেই সে বাঁ হাতের তর্জনীটি মুখে দিল।

এই কি সেই কোমল ভদ্রমহিলা? সেই সূক্ষ্ম, অলৌকিক মেয়ে, যে কুঁচকানো কালো পোশাক পরত? যে সুরেন নদীর তীরে আমার সঙ্গে লুকোচুরি খেলত? সেই শিশুসুলভ, স্বাধীন ক্ষণিকা!যার প্রলুব্ধকর পায়ের পেশি স্কার্টের আড়াল থেকে দেখা যেত?

এতদিন যখনই তাকে দেখেছি, বুঝতে পারিনি যে সে-ই সেই স্বর্গীয় মেয়ে। কিন্তু এখন যেন আমার চোখের সামনে থেকে কোনো পর্দা সরে গেল।

কেন জানি না, হঠাৎ কসাইখানার সামনে ঝুলে থাকা ভেড়াগুলোর কথা মনে পড়ল। তাকে দেখতে লাগল এক টুকরো চর্বিহীন মাংসের মতো।

তার জন্মগত আকর্ষণের সমস্ত চিহ্ন যেন হারিয়ে গিয়েছিল।

সে এখন এক পরিণত, গম্ভীর, প্রসাধনময় নারী।জীবনের চিন্তায় নিমগ্ন এক নারী।এক সম্পূর্ণ নারী।আমার স্ত্রী।

ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে আমি উপলব্ধি করলাম যে আমার স্ত্রী বড় হয়ে গেছে, পূর্ণবয়স্ক হয়েছে, অথচ আমি রয়ে গেছি শিশু।

সত্যি বলতে, তার মুখের দিকে তাকাতে আমার লজ্জা করছিল। বিশেষ করে তার চোখের দিকে।

সে নিজেকে সকলের কাছে সমর্পণ করেছে, শুধু আমার কাছে নয়।

আমার একমাত্র সান্ত্বনা ছিল তার শৈশবের অস্পষ্ট স্মৃতি!যখন তার মুখ ছিল সরল ও শিশুসুলভ, যখন সে ছিল এক অস্পষ্ট, ক্ষণস্থায়ী সত্তা…

তখনও তার মুখে সেই পুরনো জিনিসপত্রের ফেরিওয়ালার দাঁতের কোনো চিহ্ন ছিল না!না, সে তখনকার সেই মানুষটি ছিল না।

_এখন কেমন আছ?সে ব্যঙ্গের সুরে জিজ্ঞেস করল।

আমি ঝাঁঝিয়ে উঠলাম

_তুমি কি স্বাধীন নও? যা খুশি তাই তো করছ! আমার স্বাস্থ্যের খবর নিয়ে তোমার কী আসে যায়?

সে জোরে দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে গেল। একবারও ফিরে তাকাল না।

আমি যেন পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে, জীবিত মানুষের সঙ্গে কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। যে নারীকে আমি সম্পূর্ণ অনুভূতিহীন বলে মনে করতাম, সে আজ আমার কথায় আহত হয়ে ফিরে গেল!

কতবার যে ইচ্ছে হয়েছে উঠে তার কাছে যাই, তার পায়ে পড়ে ক্ষমা চাই! সত্যি বলতে, আমার কান্না পাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, যদি কাঁদতে পারি, তাহলে অনুশোচনার তীব্রতা কিছুটা কমবে, নিজেকে একটু হালকা লাগবে।

কত মিনিট, কত ঘণ্টা, না কত শতাব্দী কেটে গেল—আমি জানি না।

আমি ছিলাম সেই উন্মাদের মতো, যে নিজের দুঃখেই মত্ত হয়ে ওঠে।

আমি যে উন্মত্ত অবস্থার মধ্যে ছিলাম, তা মানুষের বোধগম্যের বাইরে। সেই অভিজ্ঞতা কেবল আমিই অনুভব করতে পারতাম!এমন এক অবস্থা, যা দেবতাদের নাগালেরও বাইরে, যদি সত্যিই দেবতা বলে কিছু থেকে থাকে।

সেই মুহূর্তে আমি আবিষ্কার করলাম, আমি সত্যিই শ্রেষ্ঠ।

আমি জনতার ঊর্ধ্বে, দৃশ্যমান জগতের ঊর্ধ্বে উঠে গিয়েছি। এমনকি মনে হচ্ছিল, মানবকামনার সন্তান যে দেবতারা, তাদেরও আমি অতিক্রম করে গেছি।

আমি নিজেই এক দেবতা হয়ে উঠেছিলাম!বরং দেবতার চেয়েও বৃহত্তর কেউ।কারণ নিজের ভেতরে আমি অনুভব করছিলাম এক অনন্ত, অসীম প্রবাহ।

কিন্তু সে ফিরে এলো।

আমি যেমন নিষ্ঠুর ভেবেছিলাম, সে তেমন ছিল না।

আমি উঠে দাঁড়ালাম, তার পোশাকের প্রান্তে চুম্বন করলাম, কাশতে কাশতে ও কাঁদতে কাঁদতে তার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়লাম।

আমি আমার মুখ তার পায়ের পেশিতে ঘষতে লাগলাম। বারবার তাকে তার আসল নামে ডাকলাম!সেই নামের ধ্বনির মধ্যে যেন এক বিশেষ অনুরণন ছিল।

কিন্তু যখন আমি তার পা জড়িয়ে ধরেছিলাম,যার স্বাদ ছিল তিক্ত, নরম,কষা, ঠিক শসার শেষ প্রান্তের তিক্ততার মতো তখনও আমার হৃদয়ের গভীরে, একেবারে অন্তঃস্থলে, আমি বারবার বলছিলাম—

_বেশ্যা… বেশ্যা…

আর কেঁদেই চলেছিলাম।

সময়ের জ্ঞান পুরোপুরি লুপ্ত হয়েছিল। পরে যখন সম্বিত ফিরল, দেখলাম সে চলে গেছে।

একই ভঙ্গিতে, যেভাবে আমি আফিমের ধোঁয়াটে আগুনের পাশে বসে থাকি!অথবা যেভাবে সেই পুরনো ফেরিওয়ালা তার পসরা সামনে রেখে বসে থাকে,সেভাবেই আমি চর্বির প্রদীপের সামনে বসেছিলাম।

এক ক্ষণিক মুহূর্তের জন্য আমি মানবজাতির সমস্ত মাদকতাময় আনন্দ, সমস্ত সোহাগ এবং সমস্ত যন্ত্রণার পূর্ণ অভিঘাত অনুভব করলাম।

আমি নিস্তব্ধ হয়ে প্রদীপের ওপর ঝুঁকে ছিলাম। কালো ধোঁয়ার কণা, যেন কালো তুষারের ফোঁটার মতো, আমার হাত ও মুখ ঢেকে দিচ্ছিল।

ঠিক তখনই আমার দাইমা একবাটি বার্লি আর মুরগির পোলাও নিয়ে ঘরে ঢুকল।

আমাকে দেখে সে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল, পিছিয়ে গেল, আর হাত থেকে থালা ও আমার রাতের খাবার পড়ে গেল।

অন্তত তাকে ভয় দেখাতে পেরেছি,এতে আমার আনন্দ হলো।

আমি উঠে দাঁড়ালাম, সলতের কাঁচি দিয়ে প্রদীপের সলতে ছেঁটে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

মুখে জমে থাকা কালো কালি আরও ঘষে মাখলাম।

কী ভয়ংকর মুখ!

আমি চোখের নিচের চামড়া টানলাম, ঠোঁটের কোণ দুটো বিকৃত করলাম, গাল ফুলিয়ে তুললাম, দাড়ির আগা ওপরে তুললাম এবং পাকিয়ে দিলাম।

নানারকম মুখভঙ্গি করতে লাগলাম।

আমার মুখ অসংখ্য ভয়াবহ এবং হাস্যকর রূপ ধারণ করতে পারত।

আমি এই মুখগুলো চিনতাম, অনুভবও করতাম, তবু সেগুলো আমার কাছে মজার মনে হচ্ছিল।

এগুলোই ছিল আমার অন্তর্নিহিত মুখ।

খুনি, ভয়ঙ্কর এবং হাস্যকর সব মুখোশ, যেগুলোকে আমি আঙুলের একটুখানি স্পর্শে এক রূপ থেকে আরেক রূপে বদলে দিতে পারতাম।

নিজের মধ্যে আমি দেখতে পেলাম সেই বৃদ্ধ কোরান পাঠকের প্রতিচ্ছবি, কসাইয়ের প্রতিচ্ছবি, এবং আমার স্ত্রীর প্রতিচ্ছবি।

মনে হচ্ছিল, তাদের প্রত্যেকেরই একটি করে ছবি আমার ভেতরে বাস করে, অথচ তাদের কোনোটিই প্রকৃতপক্ষে আমার নয়।

( চলবে )

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা ২৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

সীমান্তহীন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখায় অনুবাদ

This entry is part 23 of 26 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

This entry is part 23 of 26 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা – তৃষ্ণা বসাক ১ : অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

সীমান্তহীন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখায় অনুবাদ

This entry is part 23 of 26 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

This entry is part 23 of 26 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা – তৃষ্ণা বসাক ১ : অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও

Read More »

২ : কালের প্রহরী

শুভাশিস ঘোষ একটি বাড়ির চোখ দিয়ে দেখা দুই শতাব্দীর ইতিহাস, মানুষের জীবন ও সময়ের নির্মম পরিবর্তনের কাহিনি পর্ব : দুই তিন রোজকার মতো সকাল-সকাল ঘোষালবাড়িতে

Read More »