১৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

This entry is part 13 of 20 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৫ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৬ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৭ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৮ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৯ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১০ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা – দশম পর্ব

১১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৫ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৬ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৭ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৮ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

 ১৯ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২০ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

বঙ্গানুবাদ: সুপর্ণা বোস

এয়োদশ পর্ব


আমার পিসিই আমায় লালন পালন করে বড় করেছেন।তাঁর কপালের কাছে কয়েক গাছি পাকাচুল। লম্বা গড়ন। তার মেয়ে মানে সেই বেশ‍্যাটা যাকে আমি এখন স্ত্রী বলি,সে আর আমি একসঙ্গে এই বাড়িতেই বড় হয়েছি ।
জ্ঞানত পিসিকে আমি মায়ের মতই দেখেছি, তাঁকে ভালোবেসেছি। এতটাই ভালোবেসেছি যে পরে, তাঁর সঙ্গে সাদৃশ্যের জন্যই, আমি তাঁর মেয়েকে বিয়ে করি।অর্থাৎ আমার পালিতা বোনকে। হয়তো বলা উচিত, আমাকে বিয়ে করতেই হয়েছিল।
মেয়েটি নিজেকে মাত্র একবারই আমার কাছে সমর্পণ করেছিল। সেই মুহূর্ত আমি কোনোদিন ভুলব না। ঘটনাটা ঘটেছিল তার মায়ের মৃত্যুশয্যার পাশে।
সেদিন গভীর রাত। আমি পায়জামা পরে, শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে মৃতার ঘরে ঢুকেছিলাম। বাড়ির সবাই তখন ঘুমিয়ে। ঘরে দুটো কর্পূরের বাতি জ্বলছিল। শয়তান যাতে দেহে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য মৃতার পেটের ওপর রাখা ছিল কোরান।
আমি যখন তার মুখের কাপড় সরালাম, দেখলাম,আমার পিসি, তার চিরচেনা মর্যাদা ও আকর্ষণ নিয়ে শুয়ে আছেন। মনে হচ্ছিল, তার মুখ থেকে সব পার্থিব ভাবনা মুছে গেছে।এক অদ্ভুত শ্রদ্ধা জাগানো অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে সেই মুখে। যেন মৃত্যু খুব স্বাভাবিক, খুব সহজ একটি ঘটনা। তার ঠোঁটের কোণে শুকিয়ে আছে এক বিদ্রূপাত্মক হাসি।
আমি তার হাতে চুমু খেয়ে ঘর থেকে বেরোতে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি—আমার বর্তমান স্ত্রী, সেই মেয়েটি, ঘরে ঢুকেছে। সে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, নিজের দিকে টেনে নিল, আর প্রবল আবেগে চুম্বন করল তার নিজের মৃত মায়ের সামনেই।
আমি এতটাই লজ্জিত হয়ে পড়েছিলাম যে মাটিতে মিশে যেতে চাইছিলাম। কী করব বুঝতে পারছিলাম না। মৃতদেহের বেরিয়ে থাকা দাঁত যেন আমাদের উপহাস করছিল। তার স্থির হাসিটা যেন বদলে যাচ্ছে।
অজান্তেই আমিও তাকে জড়িয়ে ধরলাম, চুমু খেলাম।
ঠিক তখনই পাশের ঘরের পর্দা সরিয়ে ঢুকলেন আমার পিসির স্বামী।মেয়েটির বাবা। তার কাঁধ ঝুঁকে ছিল, গলায় একটি স্কার্ফ।তিনি বিকট হাসিতে ফেটে পড়লেন।যে হাসি আমার শরীর কাঁপিয়ে দিল। তার কাঁধ কাঁপছিল প্রবলভাবে। তিনি আমাদের দিকে তাকালেন না। আমি চাইছিলাম মাটির ভেতর ঢুকে যেতে। যদি পারতাম, সেই মৃতদেহকেও চড় মারতাম।ওভাবে তাকিয়ে থাকার জন্য। কী লজ্জা!
আমি দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম।এই মেয়েটির কারণেই। হয়তো সে এই দৃশ্যটাই তৈরি করেছিল আমাকে বিয়ে করতে বাধ্য করার জন্য।
আমরা পালিতা ভাইবোন হয়েও, পরিবারের সম্মান রক্ষার জন্য আমাকে তাকে বিয়ে করতে হয়েছিল। শোনা যেত, সে নাকি কুমারী ছিল না!অন্যেরা ইঙ্গিত করত, কিন্তু আমি কখনো জানতাম না, জানতেও পারিনি।
বিয়ের রাতে, আমরা যখন একা, আমি যতই অনুরোধ করি, সে আমাকে গ্রহণ করল না, পোশাকও খুলল না। শুধু বলল,
“মাসের সঠিক সময় নয় এটা ।”
সে আমাকে কাছে আসতে দিল না। বরং আলো নিভিয়ে, ঘরের এক কোণে গিয়ে শুয়ে পড়ল।একটা উইলো গাছের মত কেঁপে উঠেছিল সে।যেন একটা ড্রাগনের সঙ্গে তাকে কোনো অন্ধকূপে নিক্ষেপ করেছে কেউ!হয়ত বিশ্বাস করবেন না, সে আমাকে নিদেনপক্ষে তার গালেও একখানি চুম্বন করতে দেয়নি কখনো।পরের রাতগুলোতেও সেই প্রথম রাতের মতই একইভাবে আমি মেঝেতে শুয়েছি;আমি কিছু অন‍্যরকম সাহসও দেখাইনি।বাকি রাতগুলোও আমি তার থেকে দূরে উল্টোদিকের মেঝেতে শুয়ে কাটিয়েছি।কেউ বিশ্বাস করবে?টানা দু মাস।না না বরং দু মাস চার দিন আমি তার থেকে দূরে শুয়ে থেকেছি। কিছু বলার সাহসটুকুও দেখাতে পারিনি।চার মাস এবং চার দিন আমি তার থেকে দূরে ঘুমিয়েছি, তার কাছে যাওয়ার সাহস করিনি।

সে ইতিমধ্যেই তার হৃত- কৌমার্যের একটি প্রমাণ ঠিক করে রেখেছিল। আমি জানি না সেটি আদৌ সত‍্যি ছিল কি না!একটি রুমাল, যাতে সে হয়ত পায়রার রক্ত ছিটিয়েছিল, নয়ত সেই রুমাল যা সে প্রথম মিলনের রাতে ব্যবহার করেছিল।আমি এটাও জানি না, সে কেন এতদিন ধরে সেটি রেখে দিয়েছিল এবং এখন আমাকে বিদ্রূপ করার জন্য ব্যবহার করছিল। তবে আমি জানি, যারা আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছিল, তারা চোখ টিপে ইঙ্গিত বিনিময় করেছিল। আমি নিশ্চিত, তারা মনেমনে বলেছিল, “সে নিশ্চয়ই গত রাতে সব জেনে গেছে!” আমি কিছু না শোনার ভান করেছিলাম। তারা আমার ওপর হাসছিল!আমার নির্বুদ্ধিতার ওপর হাসছিল আর তাতেই আমার মধ্যে একদিন সবকিছু লিখে ফেলার এক দৃঢ় সংকল্প জন্ম নিচ্ছিল।
যখন আমি আবিষ্কার করলাম যে তার একাধিক প্রেমিক আছে, এবং যে সে আমাকে পছন্দ করে না কারণ এক মোল্লা দু-একটি আরবি বাক্য উচ্চারণ করে তার স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে তাকে আমার কর্তৃত্বের অধীনে দিয়েছে, তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম তাকে জোর করে নিজের করে নেব। আমি সেই সিদ্ধান্ত কার্যকরও করলাম। কিন্তু অনেক ধস্তাধস্তির পর সে উঠে চলে গেল, আর আমি বাধ্য হলাম শুধু তার বিছানায় গড়াগড়ি খেয়ে তার ওম আর গন্ধ উপভোগ করেই রাত কাটাতে। সেটাই ছিল একমাত্র রাত,আমি গভীরভাবে নিদ্রামগ্ন হয়েছিলাম। তারপর থেকে সে অন্য ঘরে ঘুমাত।
সাধারণত সন্ধ্যেবেলা যখন আমি বাড়ি ফিরতাম, সে তখনও বাইরে থাকত। আমি বুঝতেও পারতাম না সে বাড়িতে আছে কি না। সত‍্যি বলতে কি,আমি জানতেও চাইতাম না, কারণ আমি নিঃসঙ্গতা আর মৃত্যুর জন্যই যেন দণ্ডিত ছিলাম। হয়ত অবিশ্বাস‍্য শোনাবে, কিন্তু সেই সময় আমি যেকোনো মূল্যে তার প্রেমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করতাম। কেউ বিশ্বাস করবে না। কিন্তু যখনই বুঝতাম যে সে কারও প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে, আমি অপমান সহ্য করে বিনয়ের সঙ্গে তাকে অনুসরণ করতাম, তার মন জয় করার চেষ্টা করতাম, তোষামোদ করতাম—শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গে পরিচয় করে তাকে আমার স্ত্রীর কাছে নিয়ে আসতাম। জানো তার প্রেমিকরা কারা ছিল? একজন নাড়িভুঁড়ি বিক্রেতা, একজন আইনজ্ঞ, একজন কলিজা বিক্রেতা, প্রধান ম্যাজিস্ট্রেট, একজন বিচারক, একজন ব্যবসায়ী এবং একজন দার্শনিক। যদিও তাদের নাম ও পদবি ভিন্ন ছিল, তারা সবাই তাদের পেশা শিখেছিল সেই লোকটির কাছ থেকে যে সেদ্ধ ভেড়ার মাথা বিক্রি করত। সে আমার চেয়ে ওই সব পুরুষদেরই বেশি পছন্দ করত।

স্ত্রীকে হারানোর ভয়ে আমি নিজেকে আশ্চর্যজনকভাবে ছোট করে ফেলেছিলাম; এমনকি তার প্রেমিকদের আচরণ, নীতিবোধ আর আকর্ষণীয় ভঙ্গি অনুকরণ করার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি হয়ে উঠলাম এক করুণ দালাল, নির্বোধদের উপহাসের পাত্র। আমি কীভাবে ওই সাধারণ লোকদের আচরণ শিখব? এখন বুঝতে পারি,সে তাদের ভালোবাসত কারণ তারা নির্লজ্জ, দুর্গন্ধময় নির্বোধ ছিল। তার ভালোবাসা ছিল নোংরামি আর মৃত্যুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
আমি কি সত্যিই তার সঙ্গে শোওয়ার জন্য আগ্রহী ছিলাম? তার বাহ্যিক সৌন্দর্য কি আমাকে আকর্ষণ করত? নাকি আমার প্রতি তার ঘৃণা? নাকি তার কৃত্রিম ভঙ্গি? নাকি তার মায়ের প্রতি আমার আজীবনের ভালোবাসা? নাকি এই সবকিছুর মিশ্রণ? না, আমি জানি না!তবে একটা জিনিস জানি, এই নারী, এই বেশ্যা, এই ডাইনি আমার আত্মার মধ্যে, আমার অস্তিত্বের গভীরে এক বিষ ঢেলে দিয়েছিল—এক এমন বিষ, যা শুধু আমাকে বাধ‍্য করেনি তাকে আকাঙ্খা করতে, বরং আমার শরীরের প্রতিটি অণুকেও তার শরীরের অণুর জন্য ব‍্যাকুল করে তুলেছিল। তারা যেন তার জন্য হাহাকার করত।
আমার প্রবল ইচ্ছে ছিল, আমি যেন কোনো জনমনিষ‍্যিহীন হারিয়ে যাওয়া দ্বীপে থাকি। আমি চাইতাম—একটা ভূমিকম্প, ঝড় বা ঘূর্ণিঝড় এসে আমার দরজার বাইরে থাকা সেইসব মানুষদের ধ্বংস করে দিক, যারা আনন্দে জীবন কাটাচ্ছিল—যাতে শুধু সে আর আমি বেঁচে থাকি। আমি চেয়েছিলাম, আমরা একসঙ্গে একটি রাত কাটাই, তারপর একে অপরের বুকে মাথা রেখে মরে যাই। সেটাই যেন আমার জীবনের, আমার অস্তিত্বের চূড়ান্ত পরিণতি।
যেন আমার যন্ত্রণা যথেষ্ট ছিল না, আমি অসুস্থ হয়ে পড়লাম; এক চলমান মৃতদেহের মতো আমি সব কাজকর্ম ছেড়ে দিলাম এবং বাড়ির মধ্যেই বন্দি হয়ে গেলাম। আমাদের গোপন বিষয়টি কেউ জানত না। আমার বৃদ্ধ ধাত্রী,যে আমার ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলার সঙ্গী ছিল—সেও ওই নারীর পক্ষ নিয়েছিল এবং আমাকে দোষারোপ করত। সে বলত, “এই বেচারি মেয়েটা কীভাবে এই পাগল স্বামীর সঙ্গে থাকে?” আমি চারপাশে, আমার পেছনে এই ধরনের কথা শুনতাম। আর তারা ভুলও বলত না। আমার অসহায়তার মাত্রা ছিল অবিশ্বাস্য।

প্রতিদিন আমি ক্ষয়ে যাচ্ছিলাম। আয়নায় নিজের দিকে তাকালে দেখতাম, আমার গাল কসাইয়ের দোকানের মাংসের মতো লাল হয়ে গেছে। শরীর জ্বরে পুড়ে যায়, আর চোখে এক ক্লান্ত, বিষণ্ণ অভিব্যক্তি জেগে থাকে। এই নতুন অবস্থা আমাকে যেন এক অদ্ভুত মত্ততায় ডুবিয়ে দিচ্ছিল।

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা ১৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

বিশ্বকে বাংলায় চেনার জানলা মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

This entry is part 13 of 20 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

This entry is part 13 of 20 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর পথযাত্রী …সৃষ্টির

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

বিশ্বকে বাংলায় চেনার জানলা মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

This entry is part 13 of 20 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

This entry is part 13 of 20 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর পথযাত্রী …সৃষ্টির

Read More »