পিগম্যালিয়ন

পিগম্যালিয়ন

ভূমিকা

একজন ধ্বনিবিজ্ঞানের অধ্যাপক

‘পিগম্যালিয়ন’ নাটকটি পড়ার পর বোঝা যাবে এর জন্য কোনো ভূমিকার প্রয়োজন নেই, বরং এর জন্য একটি পরিশিষ্ট প্রয়োজন, যা আমি যথাসময়ে যোগ করেছি। আমি লক্ষ্য করেছি ইংরেজদের তাদের নিজেদের ভাষার প্রতি কোনো শ্রদ্ধাবোধ নেই, এবং তারা তাদের সন্তানদেরও এই ভাষায় কথা বলতে শেখাবে না। তারা ইংরেজি বানান এতটাই জঘন্যভাবে লেখে যে, এর সঠিক উচ্চারণ কেউ নিজে থেকে শিখতে পারে না। একজন ইংরেজের পক্ষ নিয়ে কথা বললেই অন্য কোনো না কোনো ইংরেজ তাকে ঘৃণা বা অবজ্ঞা করবে। জার্মান এবং স্প্যানিশ ভাষা বিদেশিদের জন্য সহজবোধ্য হলেও ইংরেজি ততটা নয়।এমনকি ইংরেজদের কাছেও সহজবোধ্য নয়। আজ ভাষা সংস্কারেরইংল্যান্ডের জন্য একজন উদ্যমী ধ্বনিতত্ত্ব অনুরাগী মানুষ প্রয়োজন। আর সে কারণেই আমি এমন একজনকে এই নাটকের নায়ক বানিয়েছি যিনি বিগত বহু বছর ধরে নির্জনে ক্রন্দন করে চলেছেন।

আঠারোশ সত্তরের দশকের শেষভাগে যখন আমি ধ্বনিতত্ত্বের প্রতি আকৃষ্ট হই, তখন মেলভিল বেল আর বেঁচে ছিলেন না। তবে আলেকজান্ডার জে. এলিস তখনও জীবিত ছিলেন এবং ধ্বনিতত্ত্ব জগতে একজন শ্রদ্ধেয় প্রবীণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর বড় ও আকর্ষণীয় মাথাটি সবসময় একটি মখমলের টুপিতে আবৃত থাকত, আর জনসমক্ষে সেই টুপি পরে থাকার জন্য তিনি এক ধরনের অভিজাত ভঙ্গিতে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। ধ্বনিতত্ত্বের আরেক অভিজ্ঞ গবেষক  হলেন এলিস এবং টিটো পাগলিয়ার্দিনি। তাঁদের প্রতি সহজেই সকলের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জন্মাত।

কিন্তু তরুণ হেনরি সুইট ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বভাবের। এলিসদের মতো কোমল ও মধুর ব্যক্তিত্ব তাঁর মধ্যে ছিল না। প্রচলিত ধ্যানধারণা ও সাধারণ মানসিকতার মানুষের প্রতি তাঁর মনোভাব ছিল অনেকটা ইবসেন বা স্যামুয়েল বাটলারের মতো তীক্ষ্ণ ও আপসহীন। ধ্বনিবিজ্ঞানে তাঁর অসামান্য প্রতিভা ছিল। আমার বিশ্বাস, এই বিদ্যায় তিনি ছিলেন সবার সেরা। এর ফলে তাঁকে সহজেই উচ্চ মর্যাদা ও সরকারি স্বীকৃতির তিনি প্রাপ্য ছিলেন। এমনকি তাঁর গবেষণাকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষমতা তাঁর ছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত সমাজব্যবস্থা ও তথাকথিত বিদ্বজ্জনদের প্রতি তাঁর তীব্র অবজ্ঞা সেই পথ রুদ্ধ করেছিল। কারণ সেই সময়ে অধিকাংশ শিক্ষিত মানুষ ভাষার ধ্বনিগত দিকের চেয়ে গ্রিক ভাষার চর্চাকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন।

একসময়, যখন সাউথ কেনসিংটনে ইম্পেরিয়াল ইনস্টিটিউট নির্মিত হচ্ছিল এবং জোসেফ চেম্বারলেইন সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধির স্বপ্ন বাস্তবায়নে ব্যস্ত ছিলেন, তখন আমি এক খ্যাতনামা মাসিক পত্রিকার সম্পাদককে অনুরোধ করেছিলাম হেনরি সুইটকে দিয়ে ধ্বনিবিজ্ঞানের সাম্রাজ্যিক গুরুত্ব নিয়ে একটি প্রবন্ধ লেখাতে। সম্পাদকও শেষ পর্যন্ত রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু সুইটের লেখা যখন এসে পৌঁছাল, তখন দেখা গেল সেটি আসলে ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের এক অধ্যাপকের বিরুদ্ধে তীব্র ব্যঙ্গ ও কটাক্ষে ভরা একটি আক্রমণাত্মক রচনা। সুইটের ধারণা ছিল, ওই পদে একজন ধ্বনিবিজ্ঞানী ছাড়া অন্য কারও থাকারই অধিকার নেই। ফলে প্রবন্ধটি মানহানিকর হওয়ায় তা প্রকাশ করা সম্ভব হলো না এবং আমাকে তা ফিরিয়ে দিতে হল। সেই সঙ্গে সুইটকে জনসমক্ষে পরিচিত করে তোলার আমার দীর্ঘদিনের আশাটিও ভেঙে গেল।

অনেক বছর পরে যখন প্রথমবার তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়, তখন আমি বিস্মিত হয়ে লক্ষ করলাম যে, একসময়ের সুদর্শন ও আকর্ষণীয় সেই যুবক কেবল তীব্র অবজ্ঞা ও বিদ্রোহী মানসিকতার প্রভাবে নিজের চেহারা ও ব্যক্তিত্বকে এমনভাবে গড়ে তুলেছেন যে, তিনি যেন অক্সফোর্ড এবং তার সমস্ত প্রথার এক জীবন্ত প্রতিবাদে পরিণত হয়েছেন। সম্ভবত তাঁর নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁকে সেখানে ধ্বনিবিজ্ঞানের রিডার পদে নিয়োগ করা হয়েছিল।

ধ্বনিবিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ মূলত তাঁর ছাত্রদের হাতেই ন্যস্ত ছিল, কারণ তারা সবাই ছিল তাঁর একনিষ্ঠ অনুরাগী। অথচ সুইট নিজে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম বা বাধ্যবাধকতার মধ্যে আবদ্ধ থাকতে চাইতেন না। তবু এক অদ্ভুত অক্সফোর্ডীয় অহংকারে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টিকে আঁকড়ে ধরে ছিলেন। আমার বিশ্বাস, তাঁর রেখে যাওয়া লেখাপত্রের মধ্যে এমন অনেক ব্যঙ্গাত্মক রচনা রয়েছে, যা হয়তো পঞ্চাশ বছর পরেও খুব একটা ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি না করেই প্রকাশ করা সম্ভব হবে।

তবে তাঁকে রাগী মানুষ ভাবা ঠিক হবে না। বরং তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ বিপরীত স্বভাবের; কিন্তু নির্বুদ্ধিতি তিনি একেবারেই সহ্য করতে পারতেন না। যারা তাঁকে ঘনিষ্ঠভাবে চিনতেন, তারা নিশ্চয়ই আমার নাটকের তৃতীয় অঙ্কে উল্লেখিত সেই “পেটেন্ট শর্টহ্যান্ড”-এর প্রসঙ্গটি বুঝতে পারবেন। সুইট পোস্টকার্ড লেখার সময় এই বিশেষ সংক্ষিপ্তলিপি ব্যবহার করতেন, যা ক্ল্যারেনডন প্রেস থেকে প্রকাশিত সাড়ে চার শিলিং মূল্যের একটি ম্যানুয়াল থেকে শেখা যেত। মিসেস হিগিন্স যে পোস্টকার্ডগুলোর কথা বলেছেন, সেগুলো ছিল অনেকটাই সুইটের লেখা পোস্টকার্ডের মতো।

আমি প্রায়ই এমন কিছু সংকেতধ্বনি পড়ে তার অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করতাম—যা একজন ককনি উচ্চারণ করত “zerr” বলে, আর একজন ফরাসি বলত “seu”। তারপর বিভ্রান্ত হয়ে সুইটকে জিজ্ঞেস করতাম, এর মানে আসলে কী। তিনি তখন আমার নির্বুদ্ধিতার প্রতি সীমাহীন অবজ্ঞা প্রকাশ করে জানাতেন যে, এর অর্থ “Result” ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না; কারণ ওই ধ্বনির সঙ্গে মিলিয়ে অর্থপূর্ণ আর কোনো শব্দ ইংরেজি ভাষায় নেই।

পৃথিবীর প্রায় সব ভাষার ক্ষেত্রেই এই সমস্যার প্রাসঙ্গিকতা ছিল। কিন্তু সাধারণ ও কম দক্ষ মানুষের জন্য আরও সহজ ও বিস্তৃত নির্দেশনার প্রয়োজন—এই সত্যটি মেনে নেওয়ার ধৈর্য সুইটের ছিল না। তাঁর উদ্ভাবিত “কারেন্ট শর্টহ্যান্ড”-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ভাষার প্রতিটি ধ্বনিকে অর্থাৎ স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ উভয়কেই—নিখুঁতভাবে প্রকাশ করা। এর বিশেষত্ব ছিল, কয়েকটি সহজ ও পরিচিত আঁচড়ের মাধ্যমেই সমস্ত ধ্বনি লেখা সম্ভব হতো। হাতকে জটিল কোনো ভঙ্গিতে চালাতে হতো না; বরং স্বাভাবিক ও সহজ গতিতে, সুবিধাজনক কোণে দ্রুত চিহ্নগুলো টেনে নেওয়াই যথেষ্ট ছিল।

এই কারণেই পদ্ধতিটি ছিল অত্যন্ত চমৎকার, স্পষ্ট ও বৈজ্ঞানিক। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সুইট এটিকে কেবল একটি পূর্ণাঙ্গ ধ্বনিলিপি হিসেবেই রাখেননি; তিনি এটিকে শর্টহ্যান্ড হিসেবেও ব্যবহারযোগ্য করতে চেয়েছিলেন। আর সেই অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষাই তাঁর নিজস্ব ব্যবহারিক পদ্ধতিকে এতটাই জটিল ও দুর্বোধ্য করে তোলে যে, তা একসময় প্রায় সাংকেতিক লিপিতে পরিণত হয়।

আসলে তাঁর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজি ভাষার জন্য একটি নিখুঁত, সুস্পষ্ট ও বৈজ্ঞানিক লিপি নির্মাণ করা। এই ইংরেজি ভাষা মহান হলেও বানান ও উচ্চারণের অসংগতির কারণে অত্যন্ত বিশৃঙ্খল। কিন্তু জনপ্রিয় পিটম্যান শর্টহ্যান্ড পদ্ধতির প্রতি তাঁর প্রবল অবজ্ঞাই তাঁকে সেই মূল লক্ষ্য থেকে সরিয়ে দেয়। তিনি বিদ্রূপ করে পিটম্যান পদ্ধতিকে “পিটফল” বলতেন। অথচ পিটম্যানের সাফল্যের মূল রহস্য ছিল তার সুসংগঠিত প্রচারব্যবস্থা। পিটম্যান শেখানোর জন্য ছিল সাপ্তাহিক পত্রিকা, সস্তা পাঠ্যবই, অনুশীলনী খাতা, বক্তৃতার প্রতিলিপি এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের পরিচালিত বিদ্যালয়।

সুইট সেই ধরনের কোনো সংগঠিত প্রচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেননি। তিনি যেন সেই পৌরাণিক সিবিলের মতো, যিনি ভবিষ্যদ্বাণীর পাতাগুলো একে একে ছিঁড়ে ফেলতেন, কারণ মানুষ সেগুলোর মূল্য বুঝত না। তাঁর চার শিলিং ছয় পেন্স দামের ম্যানুয়ালটি—যার অধিকাংশই তাঁর নিজের লিথোগ্রাফ করা হস্তাক্ষরে লেখা এবং যার কোনো প্রকাশ্য বিজ্ঞাপনও কখনো দেওয়া হয়নি, এটি নীরবেই টিকে ছিল। হয়তো কোনো একদিন কোনো শক্তিশালী প্রকাশনা সংস্থা সেটিকে গ্রহণ করবে এবং দ্য টাইমস যেভাবে এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা-কে জনপ্রিয় করেছিল, তেমনভাবেই জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেবে। কিন্তু ততদিন পর্যন্ত এটি পিটম্যানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে পারবে না।

আমি নিজে জীবনে তিনবার এই পদ্ধতির বই কিনেছি এবং বহুবার তা শেখারও চেষ্টা করেছি। তবুও আজ আমি যে শর্টহ্যান্ডে লিখছি, তা পিটম্যান পদ্ধতিই। কারণ আমার সচিব সুইটের লিপি পড়তে পারেন না; তাঁকে পিটম্যানের বিদ্যালয়েই প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছিল। ফলে, যেমন থারসাইটিস বৃথাই এজাক্সকে তিরস্কার করেছিল, তেমনই সুইটও বৃথাই পিটম্যানকে বিদ্রূপ করেছিলেন। তাঁর সেই তীব্র ব্যঙ্গ হয়তো তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষোভকে শান্ত করেছিল, কিন্তু তা তাঁর নিজের পদ্ধতির জন্য কোনো জনপ্রিয়তা বয়ে আনতে পারেনি।

পিগম্যালিয়নের হিগিন্স চরিত্রটি হেনরি সুইটের সরাসরি প্রতিরূপ নয়। এলিজা ডুলিটলকে নিয়ে যে দুঃসাহসিক পরীক্ষায় হিগিন্স অংশ নেয়, বাস্তবে সুইটের পক্ষে তেমন কিছু কল্পনাও করা কঠিন ছিল। তবুও নাটকটির নানা স্থানে সুইটের ব্যক্তিত্ব ও চিন্তার কিছু স্পষ্ট ছায়া লক্ষ করা যায়। হিগিন্সের স্বভাব ও আচরণ নিয়ে সুইট সম্ভবত প্রবল আপত্তি তুলতেন; তাঁর রাগের তীব্রতা এমন ছিল যে, রূপক অর্থে বলা যায়, তিনি যেন টেমস নদীতেই আগুন ধরিয়ে দিতে পারতেন।তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, পেশাগত ক্ষেত্রে তিনি সমগ্র ইউরোপে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। সেই কারণেই তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের তুলনামূলক অখ্যাতি এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাঁর প্রতিভার যথাযথ স্বীকৃতি না পাওয়া বিদেশি ভাষাবিদদের কাছে এক রহস্যের মতো মনে হতো।

তবে এ নিয়ে আমি অক্সফোর্ডকে দোষ দিতে চাই না। আমার বিশ্বাস, বিশ্ববিদ্যালয় তার শিক্ষকদের ও সদস্যদের কাছ থেকে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক শিষ্টাচার প্রত্যাশা করতেই পারে, এবং সেই প্রত্যাশা মোটেও অযৌক্তিক নয়। আমি খুব ভালোভাবেই বুঝি, যে ব্যক্তি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ করেন, যাকে সমাজ যথাযথ মূল্য দেয় না, তাঁর পক্ষে সেইসব মানুষের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন—যারা তাঁর বিষয়টিকে তুচ্ছ মনে করে এবং অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ করেও সমাজে উচ্চ আসন দখল করে থাকে। অনেক সময় তারা মৌলিক প্রতিভা বা প্রকৃত যোগ্যতা ছাড়াই সম্মান ও প্রতিষ্ঠা লাভ করে।কিন্তু তবুও সত্য এই যে, যদি কোনো ব্যক্তি নিজের প্রতিভার জোরে অন্যদের প্রতি ক্রোধ ও অবজ্ঞা প্রকাশ করেন, তাহলে তিনি তাদের কাছ থেকে শ্রদ্ধা বা স্বীকৃতির প্রত্যাশা করতে পারেন না।

পরবর্তী প্রজন্মের ধ্বনিবিজ্ঞানীদের সম্পর্কে আমার জ্ঞান খুব সীমিত। তাঁদের মধ্যে একজন হলেন রাজকবি, যার কাছ থেকে হয়তো হিগিন্স চরিত্রটি তার মিল্টনসুলভ সহানুভূতির কিছু বৈশিষ্ট্য পেয়েছে। তবে এখানেও আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির প্রতিকৃতি আঁকার দাবি আমি করছি না।তবুও, যদি এই নাটক সাধারণ মানুষের মধ্যে এতটুকু সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারে যে ধ্বনিবিজ্ঞানী বলেও এক শ্রেণির মানুষ আছেন, এবং বর্তমান ইংল্যান্ডে তাঁদের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি, তাহলে আমি মনে করব নাটকটির উদ্দেশ্য সফল হয়েছে।

আমি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, ‘পিগম্যালিয়ন’ শুধু দেশে নয়, সমগ্র ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাতেও বিপুল সাফল্য অর্জন করেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, নাটকটি ইচ্ছাকৃতভাবেই শিক্ষামূলক, আর এর বিষয়বস্তুকে অনেকে অত্যন্ত নীরস বলে মনে করেন। সেই কারণেই আমি বিশেষ আনন্দ পাই সেইসব তথাকথিত বিদ্বানদের ভুল প্রমাণ করতে, যারা সবসময় বলে বেড়ান যে শিল্পের কাজ কখনো শিক্ষা দেওয়া নয়। বরং আমার বিশ্বাস, প্রকৃত শিল্পের অন্যতম প্রধান কাজই হলো মানুষকে শিক্ষিত করা।

এছাড়া, যাঁরা উচ্চারণগত দুর্বলতার কারণে জীবনে নানা বাধার সম্মুখীন হন এবং বহু সম্মানজনক পেশা থেকে বঞ্চিত থাকেন, তাঁদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য আমি বলতে চাই—অধ্যাপক হিগিন্স যে ফুলবিক্রেতা মেয়েটির মধ্যে পরিবর্তন আনেন, তা মোটেও অসম্ভব বা অবাস্তব নয়। আধুনিক সমাজে এমন অসংখ্য নারী-পুরুষ আছেন, যারা নিজেদের মাতৃভাষা বা আঞ্চলিক উচ্চারণ বদলে নতুন ভাষা ও নতুন উচ্চারণ আয়ত্ত করেছেন। থিয়েটার ফ্রঁসেজে রুই ব্লাস নাটকে স্পেনের রানীর ভূমিকায় অভিনয় করা এক নারীও ছিলেন সাধারণ কনসিয়ার্জের মেয়ে। তাঁর সাফল্য প্রমাণ করে যে ভাষা ও উচ্চারণ মানুষকে সামাজিক অবস্থান পরিবর্তনের সুযোগ করে দিতে পারে।তবে এই পরিবর্তনের কাজটি অবশ্যই বৈজ্ঞানিক উপায়ে করতে হবে। নচেৎ ফল উল্টো হতে পারে। ধ্বনিতত্ত্বের জ্ঞান ছাড়া কোনো ব্যক্তি যখন তথাকথিত উচ্চশ্রেণির ইংরেজি অনুকরণ করতে যান, তখন তা প্রায়শই অত্যন্ত কৃত্রিম ও হাস্যকর শোনায়। বরং একটি স্বাভাবিক ও অকৃত্রিম বস্তির উপভাষা তার চেয়ে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য।

এই অসম্ভব বিষয় নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে যাওয়া যেমন ঝুঁকিপূর্ণ তেমনি এই নাটকের বাংলা অনুবাদ করতে যাওয়াও দুঃসাহসিকতার পরিচায়ক। তবু সাহিত্য পিপাসু পাঠক যদি রসসমৃদ্ধ হন সেই কারণে এই প্রচেষ্টা।

                                                                    অরিজিতা দাস

প্রথম অঙ্ক

রাত ১১টা ১৫ মিনিট, কভেন্ট গার্ডেন

গ্রীষ্মের এক প্রবল বর্ষণমুখর রাত। চারদিকে ট্যাক্সির হুইসেল যেন উন্মাদের মতো অবিরাম বেজে চলেছে। পথচারীরা বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে বাজারের দিকে এবং সেন্ট পল গির্জার বারান্দার নিচে আশ্রয় নিচ্ছে। সেখানে ইতিমধ্যেই কয়েকজন মানুষ জড়ো হয়েছে। তাদের মধ্যে আছেন এক ভদ্রমহিলা ও তাঁর মেয়ে (ক্লারা), দুজনেই সান্ধ্য পোশাকে সজ্জিত। সবাই উৎকণ্ঠা ও বিরক্তি নিয়ে ঝরঝর করে নামা বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আছে। কেবল একজন লোকই অন্যদের থেকে আলাদা—সে সবার দিকে পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে একটি নোটবুকে দ্রুত কিছু লিখে চলেছে।

গির্জার ঘড়িতে পৌনে একটা বাজল।

ক্লারা [মাঝখানের দুই স্তম্ভের ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে, বামদিকের স্তম্ভের কাছে] :আমার তো হাড় পর্যন্ত ঠান্ডায় জমে যাচ্ছে। ফ্রেডি এতক্ষণ কী করছে? ওকে তো কুড়ি মিনিট আগে পাঠানো হয়েছে ট্যাক্সি আনতে।

মা [মেয়ের ডানদিকে দাঁড়িয়ে] :অতক্ষণ হয়নি বোধহয়। তবে এর মধ্যেই ওর একটা ট্যাক্সি জোগাড় করে ফেলার কথা ছিল।

এক পথচারী [ভদ্রমহিলার ডানদিকে] :সাড়ে এগারোটার আগে কোনো ট্যাক্সি পাওয়া কঠিন, ম্যাডাম। কারণ থিয়েটার শেষ হলে লোকজন একসঙ্গে ফিরতে শুরু করবে।তারা সবাইতো ট্যাক্সি নেবার জন্য ব্যস্ত হবে।

মা :কিন্তু যে করেই হোক আমাদের একটা ট্যাক্সি চাই। আমরা কি আর সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি? কী সমস্যায় না পড়লাম!

পথচারী :আরে ম্যাডাম, এতে আমার তো কোনো দোষ নেই।

ক্লারা :ফ্রেডির যদি সামান্য বুদ্ধিও থাকত, তাহলে থিয়েটারের দরজাতেই একটা ট্যাক্সি ধরে ফেলত।

মা :আহা, বেচারা ছেলেটা আর কীই বা করতে পারত একা একা?

ক্লারা :অন্য সবাই তো ট্যাক্সি পেয়েছে। ও কেন পেল না?

এই সময় ফ্রেডি সাউদাম্পটন স্ট্রিটের দিক থেকে দৌড়ে এসে বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচলেও সে আগে থেকেই ভিজে একাকার। গির্জার নীচে দাঁড়িয়ে ফেড্রি জল ঝরতে থাকা ছাতাটা বন্ধ করে। সে বছর কুড়ির এক যুবক, সান্ধ্য পোশাক পরা, তার পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ভিজে গেছে।

ক্লারা :কী হলো? কোনো ট্যাক্সি পেলি না?

ফ্রেডি :টাকা দিয়েও একটা ট্যাক্সি পাওয়া যাচ্ছে না।

মা :ওহ, ফ্রেডি! নিশ্চয়ই কোথাও একটা পাওয়া যেত। তুমি ঠিকমতো খোঁজই করোনি।

ক্লারা :সত্যিই অসহ্য ব্যাপার! তুমি কি চাও আমরা নিজেরাই বেরিয়ে গিয়ে ট্যাক্সি খুঁজে আনব?

ফ্রেডি :আমি তো বললামইসব ট্যাক্সি ব্যস্ত। বৃষ্টিটা এমন হঠাৎ করে নামল যে কেউ প্রস্তুত ছিল না। তাই সবাই ট্যাক্সির জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। আমি একদিকে চ্যারিং ক্রস পর্যন্ত গিয়েছিলাম, আর অন্যদিকে প্রায় লুডগেট সার্কাস পর্যন্ত; কিন্তু সব ট্যাক্সিই যাত্রী নিয়ে চলে গেছে।

মা :তুমি কি ট্রাফালগার স্কোয়ারে খুঁজেছিলে?

ফ্রেডি :হ্যাঁ, মাওখানেও একটাও ছিল না।

ক্লারা :সত্যিই খুঁজেছিলি তো?

ফ্রেডি :আমি তো চ্যারিং ক্রস স্টেশন পর্যন্ত গিয়েছিলাম। তুই কিচাইছিস আমি হেঁটে হ্যামারস্মিথ পর্যন্ত চলে যাব?

ক্লারা :তুমি আসলে মন দিয়েই চেষ্টা করোনি।

মা :তুমি সত্যিই খুব অযোগ্য, ফ্রেডি। আবার যাও, আর একটা ট্যাক্সি না পেয়ে ফিরবে না।

ফ্রেডি :তাহলে তো আমি শুধু শুধু আরও ভিজব।

ক্লারা : তাহলে আমাদের কী হবে? আমরা কি এই ঠান্ডা হাওয়ায়, গায়ে প্রায় কোনো গরম কাপড় না নিয়ে, সারারাত এখানে দাঁড়িয়ে থাকব? একেবারে স্বার্থপর শুয়োর!

ফ্রেডি :আচ্ছা আচ্ছা, যাচ্ছি তো!

[সে ছাতাটি খুলে স্ট্র্যান্ডের দিকে দৌড়ে যায়। কিন্তু ঠিক সেই সময় আশ্রয়ের খোঁজে ছুটে আসা এক ফুলওয়ালির সঙ্গে তার ধাক্কা লাগে। সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটির হাত থেকে ফুলের ঝুড়ি মাটিতে পড়ে যায়। ঠিক তখনই এক ঝলক তীব্র বিদ্যুৎ আকাশ চিরে নেমে আসে, আর তার পরপরই প্রচণ্ড বজ্রধ্বনি চারদিক কাঁপিয়ে তোলে।]

ফুলওয়ালি :এই যে মশাই! চোখে দেখে হাঁটতে পারেন না নাকি?

ফ্রেডি :মাফ করবেন।

[সে আর দাঁড়ায় না, তাড়াতাড়ি চলে যায়।]

ফুলওয়ালি [মাটিতে ছড়িয়ে পড়া ফুল কুড়োতে কুড়োতে] :ধুর। সর্বনাশ! আমার দশটা বেগুনি ফুল একেবারে পিষে দিল!

[সে স্তম্ভের নিচে, ভদ্রমহিলার ডান পাশে বসে ফুলগুলো আবার ঝুড়িতে গুছিয়ে রাখতে থাকে।]

মেয়েটি দেখতে মোটেও আকর্ষণীয় নয়। তার বয়স আঠারো কিংবা কুড়ির বেশি হবে না। মাথায় একটি ছোট কালো রঙের নাবিকদের মতো টুপি, যেটা লন্ডনের ধুলো আর ধোঁয়ায় এতটাই মলিন হয়ে গেছে যে বোঝাই যায় বহুদিন তা পরিষ্কার করা হয়নি। তার চুলের অবস্থাও শোচনীয়—যেন দীর্ঘদিন জল-সাবান ছোঁয়নি। ধূসরাভইঁদুরের রঙের মতো সেই চুলের রংকে স্বাভাবিক বলা কঠিন।তার পরনে একটি পুরোনো কালো কোট, যা প্রায় হাঁটু পর্যন্ত নেমে এসেছে এবং কোমরের কাছে আঁটসাঁট। নিচে বাদামি রঙের স্কার্ট ও একটি মোটা অ্যাপ্রন। পায়ের বুটজোড়াও অতিরিক্ত ব্যবহারে প্রায় ক্ষয়ে গেছে।তবুও বোঝা যায়, সে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু আশেপাশের ভদ্রমহিলাদের তুলনায় তাকে বেশ অগোছালো ও অপরিচ্ছন্ন দেখায়। তার মুখশ্রী খুব খারাপ নয়; বরং পরিবেশ ও দারিদ্র্যের ছাপই তাকে এমন দেখিয়েছে। আর স্পষ্ট বোঝা যায়, তার একজন দাঁতের ডাক্তারের সাহায্য অত্যন্ত প্রয়োজন।

মা :তুমি কী করে জানলে আমার ছেলের নাম ফ্রেডি?

ফুলওয়ালি :ওহ্, তাই জানতে চান? একজন ভদ্রমহিলার ছেলে যদি একটু সাবধানে হাঁটত, তাহলে একটা গরিব মেয়ের ফুলগুলো এভাবে নষ্ট হতো না। এখন বলুন তো, আপনি কি ফুলগুলো নেবেন?

[এখানে লেখক ক্ষমা চেয়ে জানিয়েছেন যে, মেয়েটির আঞ্চলিক উচ্চারণ ধ্বনিভিত্তিক বর্ণমালা ছাড়া ঠিকভাবে প্রকাশ করা কঠিন; কারণ তা লন্ডনের বাইরের মানুষের কাছে দুর্বোধ্য হয়ে উঠবে।]

ক্লারা:মা, ওর কথায় কান দিও না। কী অসভ্য মেয়ে!

মা :একটু থামো তো, ক্লারা। তোমার কাছে কোনো পেনি আছে?

ক্লারা :না। আমার কাছে শুধু ছয় পেনির একটা কয়েন আছে।

ফুলওয়ালি [আশা নিয়ে] :আমি কিন্তু আপনাকে ছয় পেনির খুচরো দিতে পারব, ম্যাডাম।

মা : ক্লারা ওটা আমাকে দাও।

[ক্লারা অনিচ্ছাভরে কয়েনটি এগিয়ে দেয়।]

মা :এই নাও, তোমার ফুলগুলোর দাম।

ফুলওয়ালি :অনেক ধন্যবাদ, ম্যাডাম।

ক্লারা :ওকে দিয়ে বাকি টাকাটা ফেরত নাও। এই ফুলগুলোর দাম এক পেনির বেশি নয়।

মা :চুপ করো, ক্লারা।

[ফুলওয়ালির দিকে তাকিয়ে]

বাকিটা তুমি রেখেই দাও।

ফুলওয়ালি :ওহ্, অনেক ধন্যবাদ, ম্যাডাম।

মা :এবার বলো তো, তুমি ওই যুবকের নাম কী করে জানলে?

ফুলওয়ালি :আমি তো জানতামই না।

মা :কিন্তু আমি তো শুনলাম তুমি ওকে ফ্রেডি বলে ডাকছিলে। আমাকে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা কোরো না।

ফুলওয়ালি [আহত গলায়] :আমি আপনাকে ফাঁকি দেব কেন? আমি তো ওকে ফ্রেডি বা চার্লি বলে ডেকেছি, যেমন ভদ্রলোকদের সঙ্গে ভদ্রভাবে কথা বলার সময় অনেকে বলে থাকে।

[সে আবার ঝুড়ির পাশে বসে পড়ে।]

ক্লারা :ছয় পেনিটা একেবারে জলে গেল! সত্যিই মা, তুমি ফ্রেডিকে এই ঝামেলা থেকে বাঁচাতে পারতে।

[সে বিরক্ত হয়ে স্তম্ভের আড়ালে সরে যায়।]

ঠিক তখনই সামরিক চেহারার এক বয়স্ক ভদ্রলোক দ্রুত দৌড়ে এসে আশ্রয় নিলেন। তাঁর ছাতা থেকে টপটপ করে জল পড়ছে। ফ্রেডির মতো তিনিও হাঁটু পর্যন্ত ভিজে গেছেন। তাঁর পরনে সান্ধ্য পোশাকের ওপর হালকা ওভারকোট। ক্লারা সরে যাওয়ায় খালি হয়ে যাওয়া জায়গাটিতেই তিনি দাঁড়ালেন।

ভদ্রলোক :উফ্! কী ভয়ানক বৃষ্টি!

মা :ওহ্ স্যার, আপনার কি মনে হয় এটা শিগগির থামবে?

ভদ্রলোক :আমার তো তা মনে হয় না। বরং কয়েক মিনিট আগে থেকে আরও জোরে নামছে।

[তিনি ফুলওয়ালির পাশের পাথরের ধাপে পা তুলে দাঁড়ালেন এবং ঝুঁকে প্যান্টের ভেজা প্রান্ত গুটিয়ে নিলেন।]

মা :হায় হায় কি হবে এবার! আমরা বাড়ি ফিরবো কি করে?

[তিনি হতাশ মুখে মেয়ের কাছে ফিরে গেলেন।]

ফুলওয়ালি [সামরিক ভদ্রলোকের সঙ্গে ভাব জমাতে চেষ্টা করে] :বৃষ্টি যখন আরও জোরে নামে, তখন বুঝতে হবে শেষের দিকেই এসেছে। তাই মন খারাপ করবেন না, ক্যাপ্টেন, একটা ফুল কিনে নিন না গরিব মেয়েটার কাছ থেকে।

ভদ্রলোক :দুঃখিত, আমার কাছে কোনো খুচরো নেই।

ফুলওয়ালি :আমি খুচরো দিতে পারব, ক্যাপ্টেন। ভদ্রলোকদের জন্য সবসময়ই ব্যবস্থা থাকে।

ভদ্রলোক :একটা সোভরিনের খুচরো দিতে পারবে? আমার কাছে এর চেয়ে ছোট কিছু নেই।

ফুলওয়ালি :

আরে না, স্যার! আমার কাছ থেকে একটা ফুল কিনুন না, ক্যাপ্টেন। আমি আড়াই শিলিংয়ের মতো খুচরো দিতে পারব। এই ফুলটা মাত্র দু’পয়সা।

ভদ্রলোক :আচ্ছা আচ্ছা, এত বিরক্ত কোরো না তো।

[পকেট হাতড়াতে হাতড়াতে]

সত্যিই আমার কাছে কোনো খুচরো নেই… দাঁড়াও, এই নাও—তিন আড়াই শিলিং। যদি তোমার কোনো উপকারে আসে।

[তিনি অন্য স্তম্ভের দিকে সরে যান।]

ফুলওয়ালি :ধন্যবাদ, স্যার।

[সে খানিকটা হতাশ—কারণ ফুল বিক্রি না হলেও কিছু টাকা তো পেল।]

এক পথচারী [চুপিসারে ফুলওয়ালিকে] :সাবধান! এর বদলে ভদ্রলোককে একটা ফুল দাও। দেখছ না, পেছনে একটা লোক দাঁড়িয়ে তোমার সব কথা লিখে নিচ্ছে।

[সঙ্গে সঙ্গে সবার চোখ ঘুরে যায় সেই নোটবুক হাতে দাঁড়ানো লোকটির দিকে।]

ফুলওয়ালি [ভয়ে চমকে উঠে] :আমি কিন্তু কোনো অন্যায় করিনি! ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলেছি বলে আমাকে দোষ দেওয়া যাবে না। ফুটপাথের বাইরে দাঁড়িয়ে ফুল বিক্রি করার অধিকার আমার আছে।

[প্রায় উন্মত্তের মতো চারদিকে তাকিয়ে]

আমি ভদ্র ঘরের মেয়ে—ঈশ্বরের কসম! আমি শুধু উনাকে একটা ফুল কিনতে বলেছি, এর বেশি কিছু বলিনি।

[চারপাশে হঠাৎ গুঞ্জন ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বেশিরভাগ মানুষই মেয়েটির প্রতি সহানুভূতিশীল, যদিও কেউ কেউ তার বাড়াবাড়ি রকম আতঙ্ককে একটু বিরক্তির চোখেও দেখছে।]

বয়স্ক ও শান্ত স্বভাবের কয়েকজন তাকে সান্ত্বনা দিতে এগিয়ে আসে—

“আচ্ছা আচ্ছা, এত চেঁচামেচি কোরো না।”

“কে তোমাকে কিছু বলেছে?”

“কেউ তোমার ক্ষতি করবে না।”

“এই মেয়েশান্ত হও।”

“এত ভয় পাচ্ছ কেন?”

কেউ তার পিঠে হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে।

অন্যদিকে, অধৈর্য কিছু লোক বিরক্ত হয়ে বলে ওঠে—

“চুপ করবে?”

“এত নাটক করার কী আছে?”

“হয়েছে, এবার থামো!”

আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কৌতূহলী কিছু মানুষ, আসল ঘটনা না জেনেই, শুধু গোলমাল শুনে একে অপরকে জিজ্ঞেস করতে থাকে—

“কী হয়েছে?”

“কী ব্যাপার?”

চারপাশে আরও লোক জড়ো হতে লাগল, আর তাদের প্রশ্ন ও কৌতূহলে হইচই আরও বেড়ে উঠল।

“কী হয়েছে?”

“এত গোলমাল কেন?”

“মেয়েটা কী করেছে?”

“কাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে?”

“ওই লোকটা কে?”

কেউ বলল—

“ও নাকি ভদ্রলোকের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে!”

আরও কেউ ফিসফিস করে উঠল—

“একজন গোয়েন্দা নাকি ওকে নজরে রেখেছে!”

এইসব কথাবার্তায় ফুলওয়ালি মেয়েটি আরও ভয় পেয়ে গেল। আতঙ্কিত ও অসহায়ভাবে কাঁদতে কাঁদতে সে ভিড় ঠেলে সেই সামরিক ভদ্রলোকের কাছে পৌঁছে গেল।

ফুলওয়ালি :ওহ্ স্যার, ওনাকে আমার বিরুদ্ধে কিছু বলতে দেবেন না। আপনি বুঝতে পারছেন না, এতে আমার কী সর্বনাশ হতে পারে! ভদ্রলোকদের সঙ্গে কথা বলেছি বলে ওরা আমার চরিত্র নিয়ে কথা তুলবে, আমাকে রাস্তা থেকে তাড়িয়ে দেবে।

এই সময় নোটবুক হাতে লোকটি সামনে এগিয়ে এল। বাকিরাও তার পেছনে ভিড় করল।

নোট-লেখক :এই এই, কী সব আজেবাজে বলছ? কে তোমাকে আঘাত করছে, হ্যাঁ? তুমি আমাকে কী মনে করেছ?

এক পথচারী :আরে না না, উনি ভদ্রলোক মানুষ। ওনার জুতোর দিকেই তাকান!

[নোট-লেখকের দিকে ফিরে]

মেয়েটা ভেবেছিল আপনি পুলিশের গুপ্তচর।

নোট-লেখক [কৌতূহলী হয়ে] :পুলিশের গুপ্তচর! সেটা আবার কী?

পথচারী [বিপাকে পড়ে] :মানে… ওই যে… পুলিশের হয়ে খবর জোগাড় করে, একরকম গুপ্তচরই বলতে পারেন।

ফুলওয়ালি :আমি বাইবেলের কসম খেয়ে বলছি, আমি একটা ভুল কথাও বলিনি!

নোট-লেখক [কঠোর অথচ ঠাট্টার ভঙ্গিতে] :

আচ্ছা আচ্ছা, এবার চুপ করো তো! আমাকে কি পুলিশের লোক বলে মনে হয়?

ফুলওয়ালি [তবু পুরো আশ্বস্ত নয়] :তাহলে আপনি আমার সব কথা লিখে নিচ্ছিলেন কেন? আমি কী করে জানব আপনি ঠিক লিখেছেন কি না? আমার সম্পর্কে যা লিখেছেন, সেটা আমাকে দেখান।

[নোট-লেখক তার খাতাটা খুলে মেয়েটির নাকের সামনে ধরল। চারপাশের লোকজনও কাঁধের ওপর দিয়ে উঁকি মেরে পড়ার চেষ্টা করছে।]

ফুলওয়ালি :এ আবার কী! এ তো কোনো ঠিকঠাক লেখা না। আমি তো কিছুই পড়তে পারছি না।

নোট-লেখক :আমি কিন্তু পড়তে পারি।

[সে মেয়েটির উচ্চারণ হুবহু নকল করে পড়ে শোনাল]

“উত্সাহিত হোন, ক্যাপ্টেন; এবং একটি দরিদ্র মেয়ের কাছ থেকে একটি ফুল কিনে দিন।

ফুলওয়ালি [আতঙ্কে] :কারণ আমি ওনাকে ক্যাপ্টেন বলেছিলাম! আমি তো কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে বলিনি।

[ভদ্রলোকের দিকে ফিরে]

ওহ্ স্যার, এই কথাটার জন্য ওনাকে আমার বিরুদ্ধে কিছু বলতে দেবেন না। আপনি তো জানেন—

ভদ্রলোক :অভিযোগ? আমি তো কোনো অভিযোগই করছি না!

[নোট-লেখকের দিকে তাকিয়ে]

সত্যি বলতে কী, স্যার, আপনি যদি গোয়েন্দাও হন, তবু আমাকে এই তরুণীর হাত থেকে রক্ষা করার কোনো দরকার নেই। যে কেউই বুঝতে পারে, মেয়েটার কোনো খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না।

ভদ্রলোক :সত্যি বলছি, স্যার, আপনি যদি গোয়েন্দাও হন, তবু এই তরুণীর কাছ থেকে আমাকে রক্ষা করার কোনো প্রয়োজন নেই। যে কেউই বুঝতে পারে, মেয়েটার কোনো খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না।

সাধারণ পথচারীরা [পুলিশি গুপ্তচরবৃত্তির বিরুদ্ধে উত্তেজিত হয়ে] :

ঠিক কথাই তো!

এতে আপনার কী আসে যায়?

নিজের কাজ নিয়ে থাকুন না!

মানুষের কথা লুকিয়ে লিখে বেড়াচ্ছে!

মেয়েটা তো কিছুই করেনি।

ভদ্রলোকের সঙ্গে দুটো কথা বললেই কি অপরাধ?

এখন কি বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতেও মানুষের ভয় পেতে হবে?

[কয়েকজন সহানুভূতিশীল মানুষ ফুলওয়ালিকে শান্ত করে আবার তার আগের জায়গায় বসিয়ে দেয়। সে বসে নিজের কান্না সামলানোর চেষ্টা করতে থাকে।]

এক পথচারী :উনি কোনো গোয়েন্দা নন। একেবারে আস্ত নাক-গলানো লোক!

[নোট-লেখকের জুতোর দিকে ইশারা করে]

দেখুন না বুটজোড়া—একেবারে ভদ্রলোকের চালচলন।

নোট-লেখক [হাসিমুখে তার দিকে ঘুরে] :তা সেলসিতে তোমাদের বাড়ির লোকজন কেমন আছে?

পথচারী [সন্দেহভরে] :আপনাকে কে বলল আমার লোকজন সেলসি থেকে এসেছে?

নোট-লেখক :কেউ বলেনি। ওরাই বলে দিয়েছে।

[ফুলওয়ালির দিকে তাকিয়ে]

আর তুমি এত দূরে এলে কী করে? তোমার জন্ম তো লিসন গ্রোভে।

ফুলওয়ালি [পুরো হতবাক] :ওহ্! লিসন গ্রোভ ছেড়ে এলেই বা কী হয়েছে? ও জায়গাটা তো শুয়োরের থাকারও অযোগ্য ছিল। তার ওপর সপ্তাহে চব্বিশ শিলিং ছয় পেন্স ভাড়া দিতে হতো!

[আবার কেঁদে ফেলে]

ওহ্, কী সর্বনাশ…

নোট-লেখক :তুমি যেখানে খুশি থাকো। শুধু এই কান্নাকাটি বন্ধ করো।

ভদ্রলোক [সান্ত্বনা দিয়ে] :আচ্ছা আচ্ছা, ভয় পেও না। ও তোমার কিছুই করতে পারবে না। তুমি যেখানে খুশি থাকার অধিকার রাখো।

এক বিদ্রূপকারী পথচারী [নোট-লেখক ও ভদ্রলোকের মাঝখানে ঢুকে] :

যেমন ধরুন, পার্ক লেন!

আমি কিন্তু সত্যিই আপনার সঙ্গে আবাসন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে চাই!

ফুলওয়ালি [ঝুড়ির উপর ঝুঁকে, আস্তে আস্তে নিজের মনে] :আমি সত্যিই খারাপ মেয়ে নই…

বিদ্রূপকারী পথচারী [তাকে উপেক্ষা করে] :আচ্ছা বলুন তো, আমি কোথা থেকে এসেছি?

নোট-লেখক [এক মুহূর্ত দেরি না করে] :হক্সটন।

[চারপাশে হাসির রোল ওঠে।]

বিদ্রূপকারী পথচারী [চমকে উঠে] :বাহ্! একদম ঠিক!আপনি তো সত্যিই সব জানেন!

ফুলওয়ালি [আহত গলায়] :আমার ব্যাপারে নাক গলানোর কোনো অধিকার ওর নেই।

পথচারী :অবশ্যই নেই!তুমি এসব সহ্য করবে না।

[নোট-লেখকের দিকে]

শুনুন, যারা আপনাকে কিছু জিজ্ঞেসই করেনি, তাদের সম্পর্কে জানার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে? আপনার ওয়ারেন্ট কোথায়?

আরও কয়েকজন পথচারী [উত্তেজিত হয়ে] :হ্যাঁ, আপনার ওয়ারেন্ট কোথায়?দেখান দেখি!

ফুলওয়ালি :ও যা খুশি বলুক। আমি আর কোনো ঝামেলায় যেতে চাই না।

এক পথচারী :আমাদের কী পায়ের নিচের ধুলো ভাবেন নাকি?

বিদ্রূপকারী পথচারী :ঠিক আছে, তাহলে এই ভদ্রলোকটার কথাই বলুন দেখি—উনি কোথা থেকে এসেছেন?

নোট-লেখক :চেলটেনহ্যাম, হ্যারো, কেমব্রিজ… আর ভারত।

ভদ্রলোক [হাসতে হাসতে] :একদম ঠিক বলেছেন!

[চারদিকে প্রবল হাসি ও বিস্ময়ের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।

“দেখেছ? ঠিক ধরে ফেলেছে!”

“সব জানে লোকটা!”

“ওই ভদ্রলোক কোথা থেকে এসেছে তাও বলে দিল!”

শেষে এক পথচারী কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল—

পথচারী :স্যার, আপনি কি মিউজিক হলে এই কৌশল দেখিয়ে রোজগার করেন?

নোট-লেখক :ভাবনাটা মন্দ নয়। হয়তো কোনোদিন করবও।

এদিকে বৃষ্টি থেমে গেছে। আশ্রয় নেওয়া লোকজনও ধীরে ধীরে সরে যেতে শুরু করেছে।

ফুলওয়ালি [লোকজনের প্রতিক্রিয়ায় আহত ও বিরক্ত হয়ে] :উনি কোনো ভদ্রলোক নন। একটা গরিব মেয়ের ব্যাপারে নাক গলাতে এসেছেন শুধু।

ক্লারা :ফ্রেডি আসলে কী করছে কে জানে! এই ঠান্ডা হাওয়ায় আর একটু দাঁড়িয়ে থাকলে আমার নিউমোনিয়া হয়ে যাবে।

[ভদ্রলোক ভদ্রভাবে স্তম্ভের অন্য পাশে সরে যান।]

নোট-লেখক [নিজের মনে মেয়েটির “নিউমোনিয়া” উচ্চারণটি দ্রুত লিখে নিয়ে] :আর্লস কোর্ট।

ক্লারা [রাগে ফেটে পড়ে] :আপনি কি দয়া করে আপনার এই অসভ্য মন্তব্যগুলো নিজের কাছেই রাখবেন?

নোট-লেখক :আরে! আমি কি সেটা জোরে বলে ফেলেছি? আসলে ইচ্ছে করে বলিনি। মাফ করবেন।

[মায়ের দিকে তাকিয়ে]

আপনার মা নিশ্চয়ই এপসমের দিককার মানুষ?

মা [মেয়ে ও নোট-লেখকের মাঝখানে এসে] :আশ্চর্য! আমি তো সত্যিই এপসমের কাছেই, লার্জলেডি পার্কে বড় হয়েছি।

নোট-লেখক [হাসিতে ফেটে পড়ে] :হা! হা! কী দারুণ নাম! মাফ করবেন।

[মেয়েটির দিকে ফিরে]

আপনাদের একটা ট্যাক্সি দরকার, তাই তো?

ক্লারা :আমার সঙ্গে কথা বলার সাহস করবেন না।

মা :ওহ্ ক্লারা, প্লিজ!

[মেয়েটি বিরক্ত হয়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে মায়ের কথা উড়িয়ে দেয় এবং উদ্ধত ভঙ্গিতে সরে দাঁড়ায়।]

মা [নোট-লেখকের দিকে] :আপনি যদি আমাদের জন্য একটা ট্যাক্সি জোগাড় করে দিতে পারতেন, তাহলে আমরা সত্যিই কৃতজ্ঞ থাকতাম, স্যার।

[নোট-লেখক পকেট থেকে একটি শিস বের করেন।]

মা :ওহ্, ধন্যবাদ!

[তিনি মেয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়ান।]

নোট-লেখক একটি তীক্ষ্ণ শিস বাজালেন।

বিদ্রূপকারী পথচারী :এই তো! আমি জানতাম লোকটা সাদা পোশাকের পুলিশ!

আরেক পথচারী :না না, ওটা পুলিশের শিস নয়। ওটা খেলাধুলার শিস।

ফুলওয়ালি [এখনও নিজের অপমান নিয়ে বিড়বিড় করছে] :আমার চরিত্র নিয়ে টানাটানি করার কোনো অধিকার ওর নেই। আমার চরিত্রও যে কোনো ভদ্রমহিলার চরিত্রের মতোই মূল্যবান।

নোট-লেখক :আপনারা হয়তো খেয়াল করেননি—বৃষ্টি কিন্তু মিনিট দুয়েক আগেই থেমে গেছে।

এক পথচারী :সত্যিই তো! আগে বলেননি কেন? আপনার এসব আজেবাজে কথায় আমাদের সময় নষ্ট হলো।

[সে স্ট্র্যান্ডের দিকে হাঁটতে হাঁটতে চলে যায়।]

বিদ্রূপকারী পথচারী :আমি কিন্তু বলতে পারি আপনি কোথা থেকে এসেছেন। আপনি অ্যানওয়েল থেকে এসেছেন। এখন ওখানেই ফিরে যান!

নোট-লেখক [সংশোধন করে] :হ্যানওয়েল।

বিদ্রূপকারী পথচারী [অতিরঞ্জিত ভদ্রতার ভঙ্গিতে] :ধন্যবাদ, শিক্ষক মহাশয়! হা হা! বিদায়!

[সে বিদ্রূপের সঙ্গে টুপিতে হাত ছুঁইয়ে হেঁটে চলে যায়।]

ফুলওয়ালি :কী ভয় দেখানো লোক রে বাবা! যেন নিজে খুব সাধু!

মা :এখন আবহাওয়াটা বেশ পরিষ্কার হয়েছে, ক্লারা। আমরা হাঁটতে হাঁটতে একটা মোটরবাস ধরতে পারব। চলো।

[তিনি নিজের স্কার্ট একটু গুটিয়ে দ্রুত স্ট্র্যান্ডের দিকে হাঁটতে থাকেন।]

ক্লারা :কিন্তু ট্যাক্সিটা—

[তার মা আর শুনতে পান না।]

ওহ্, কী বিরক্তিকর!

[সে রাগে মায়ের পেছনে চলে যায়।]

এখন সেখানে কেবল তিনজন রইল—নোট-লেখক, সেই ভদ্রলোক এবং ফুলওয়ালি। ফুলওয়ালি ঝুড়ি গুছাতে গুছাতে নিজের দুর্দশা নিয়ে বিড়বিড় করছে।

ফুলওয়ালি :বেচারি মেয়ে! না খেয়ে, দুশ্চিন্তায় দিন কাটানোই যথেষ্ট কষ্টের—তার ওপর আবার এসব ঝামেলা!

ভদ্রলোক [নোট-লেখকের পাশে ফিরে এসে] :যদি কিছু মনে না করেন, জানতে পারি—আপনি এসব কীভাবে বুঝতে পারেন?

নোট-লেখক :খুব সহজ। ধ্বনিবিজ্ঞান। বাক্যবিজ্ঞান। এটাই আমার পেশা, আবার শখও। পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ সেই, যে নিজের শখ দিয়েই জীবিকা নির্বাহ করতে পারে।

আপনি একজন আইরিশ বা ইয়র্কশায়ারের মানুষকে তার উচ্চারণ শুনেই চিনে ফেলতে পারবেন। আর আমি? আমি ছয় মাইল দূরের মানুষের উৎসও ধরে ফেলতে পারি। লন্ডনে তো দুই মাইলের মধ্যেই। কখনও কখনও দুটো রাস্তার ব্যবধানেই।

ফুলওয়ালি :ধুর, লজ্জা করা উচিত ওর! গরিব মানুষের পেছনে লেগেছে!

ভদ্রলোক :কিন্তু এ দিয়ে কি সত্যিই রোজগার হয়?

নোট-লেখক :হুম, বেশ ভালোই হয়। এখন তো নব্য ধনীদের যুগ। কেন্টিশ টাউনে কেউ বছরে আশি পাউন্ড আয় দিয়ে শুরু করে, আর শেষ পর্যন্ত পার্ক লেনে গিয়ে এক লক্ষ পাউন্ডের মালিক হয়। তারা নিজেদের পুরোনো পরিচয় ঝেড়ে ফেলতে চায়; কিন্তু মুখ খুললেই আসল উচ্চারণ সব ফাঁস করে দেয়। আর আমি তাদের শেখাতে পারি কীভাবে সেই উচ্চারণ বদলাতে হয়।

ফুলওয়ালি :ওকে নিজের কাজ করতে দাও আর এই গরিব মেয়েটাকে শান্তিতে থাকতে দাও—

নোট-লেখক [হঠাৎ বিরক্ত হয়ে] :এই যে মহিলা! এই কান্নাকাটি এক্ষুনি বন্ধ করো। না হলে অন্য কোথাও গিয়ে আশ্রয় নাও।

ফুলওয়ালি [দুর্বল প্রতিবাদে] :তোমার যেমন এখানে থাকার অধিকার আছে, আমারও তেমনই আছে—যদি আমি থাকতে চাই।

নোট-লেখক :যে মহিলা এত বিকৃত আর কদর্যভাবে কথা বলে, তার কোথাও থাকার অধিকার নেই—এমনকি বেঁচে থাকারও নয়। মনে রেখো, তুমি একজন মানুষ। তোমার আত্মা আছে, আর স্পষ্টভাবে কথা বলার ঐশ্বরিক ক্ষমতাও আছে। তোমার ভাষা শেক্সপিয়ার, মিল্টন আর বাইবেলের ভাষা। তাই ওখানে বসে অসুস্থ পায়রার মতো গুনগুন আর কোঁকানো বন্ধ করো।

ফুলওয়ালি [পুরো হতভম্ব হয়ে, বিস্ময় ও অপমানের মিশ্র অনুভূতিতে তার দিকে তাকিয়ে, ভয়ে মাথা তুলতেও সাহস পায় না] :আ-আ-আ-আও… আও… উউ!

নোট-লেখক [সঙ্গে সঙ্গে খাতাটা বের করে] :হে ঈশ্বর! কী ভয়ঙ্কর স্বরধ্বনি!

[সে দ্রুত লিখে নিয়ে বইটা সামনে ধরে মেয়েটির স্বরভঙ্গি হুবহু নকল করে পড়ে শোনায়]

আ-আ-আ-আও… আও… উউ!

ফুলওয়ালি [এই অনুকরণ দেখে হেসে ফেলে, যদিও নিজেই বুঝতে পারে না কেন হাসছে] :

ধুর মশাই!

নোট-লেখক :দেখুন তো, এই মেয়েটার ভাঙাচোরা ইংরেজিই ওকে সারাজীবন নর্দমায় ফেলে রাখবে। কিন্তু আমি বাজি রেখে বলতে পারি—মাত্র তিন মাসের মধ্যে আমি এই মেয়েটাকেই রাষ্ট্রদূতের বাগান-সম্ভাষণে একজন ডাচ বাসী বলে চালিয়ে দিতে পারব। শুধু তাই নয়, আমি চাইলে ওকে কোনো ভদ্রমহিলার পরিচারিকা কিংবা দোকানের সহকারী হিসেবেও চাকরি পাইয়ে দিতে পারি—যেখানে আরও নিখুঁত ইংরেজি দরকার।এই কাজটাই আমি করি। ধনী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এর জন্য মোটা পারিশ্রমিক পাই। আর সেই টাকায় আমি ধ্বনিবিজ্ঞানে বিশুদ্ধ বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালাই। অবসরে মিল্টনের ছন্দ নিয়ে কবিতাও লিখি।

ভদ্রলোক :আমিও ভারতীয় উপভাষা নিয়ে কিছু পড়াশোনা করি—

নোট-লেখক [হঠাৎ উৎসাহিত হয়ে] :সত্যি! তাহলে কি আপনি কর্নেল পিকারিংকে চেনেন? যিনি Spoken Sanskrit বইটি লিখেছেন?

ভদ্রলোক :আমিই কর্নেল পিকারিং। আর আপনি?

নোট-লেখক :হেনরি হিগিন্স। Higgins’s Universal Alphabet-এর লেখক।

পিকারিং [উত্তেজিত হয়ে] :অবিশ্বাস্য! আমি তো আপনার সঙ্গে দেখা করতেই ভারত থেকে এসেছি!

হিগিন্স :আর আমি ঠিক করেছিলাম আপনার সঙ্গে দেখা করতে ভারত যাব।

পিকারিং :আপনি কোথায় থাকেন?

হিগিন্স :২৭এ, উইম্পোল স্ট্রিট। কাল আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবেন।

পিকারিং :আমি কার্লটন হোটেলে আছি। বরং এখনই আমার সঙ্গে চলুন। রাতের খাবার খেতে খেতে গল্প করা যাবে।

হিগিন্স :চমৎকার প্রস্তাব!

[দুজন চলে যেতে উদ্যত হন।]

ফুলওয়ালি [পিকারিং পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অনুনয়ের সুরে] :একটা ফুল কিনে নিন না, স্যার। আজ আমার থাকার ঘরের ভাড়াটাও জোগাড় হয়নি।

পিকারিং :দুঃখিত, আমার কাছে সত্যিই কোনো খুচরো নেই।

[তিনি চলে যান।]

হিগিন্স [মেয়েটির কথায় বিস্মিত হয়ে] :মিথ্যুক! একটু আগেই তো বলছিলে তুমি আড়াই শিলিং ভাঙাতে পারবে।

ফুলওয়ালি [হতাশা আর অপমানে উঠে দাঁড়িয়ে] :তোমার মতো লোককে দেয়ালে পেরেক দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা উচিত!

[সে ঝুড়িটা হিগিন্সের পায়ের কাছে ছুঁড়ে ফেলে দেয়]

এই নাও—ছয় পেনি দাও, আর পুরো ঝুড়িটাই নিয়ে নাও!

ঠিক তখন গির্জার ঘড়িতে পৌনে একটা বাজল।

হিগিন্স [হঠাৎ যেন নিজের বিবেকের ধাক্কা খেয়ে, মেয়েটির দারিদ্র্য ও অসহায়তা উপলব্ধি করে] :এটা থাক স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে।

[সে গম্ভীর ভঙ্গিতে টুপি তোলে, তারপর এক মুঠো টাকা মেয়েটির ঝুড়িতে ছুঁড়ে ফেলে পিকারিংয়ের পেছনে হাঁটা দেয়।]

ফুলওয়ালি [একটি আড়াই শিলিং তুলে নিয়ে বিস্ময়ে] :আহ্… উহ্!

[তারপর দু-একটি ফ্লোরিন হাতে নিয়ে]

আ-আ… উহ্!

[আরও কয়েকটি মুদ্রা কুড়িয়ে]

আ-আ-আ… উহ্!

[হঠাৎ একটি হাফ-সোভেরিন হাতে পড়তেই সে স্তব্ধ হয়ে যায়]

আ… আ…!

ঠিক তখনই একটি ট্যাক্সি এসে দাঁড়ায়। ক্লারা তাড়াতাড়ি ভেতরে উঠে দরজাটা জোরে বন্ধ করে দেয়। ট্যাক্সি চলতে শুরু করে।এমন সময় ফ্রেডি দৌড়াতে দৌড়াতে ফিরে আসে।

ফ্রেডি :আরে! এ তো একেবারে মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো ব্যাপার!

 ( চলবে )

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

ভজ মন রাম চরণ

ধ্রুপদী সাহিত্য  শ্যামলকৃষ্ণ বসু ১ সুরধ্বনি রামধুন রাম না জন্মাতেই রামায়ণ। বিশ্ববিদিত এ প্রবচন। এ সেই ত্রেতা যুগের কাহিনী। দেবর্ষি নারদ একদিন তাঁর ঢেঁকি বাহনে

Read More »

পিগম্যালিয়ন

জর্জ বার্নার্ড শ অনুবাদ : অরিজিতা দাস ভূমিকা একজন ধ্বনিবিজ্ঞানের অধ্যাপক ‘পিগম্যালিয়ন’ নাটকটি পড়ার পর বোঝা যাবে এর জন্য কোনো ভূমিকার প্রয়োজন নেই, বরং এর জন্য

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

ভজ মন রাম চরণ

ধ্রুপদী সাহিত্য  শ্যামলকৃষ্ণ বসু ১ সুরধ্বনি রামধুন রাম না জন্মাতেই রামায়ণ। বিশ্ববিদিত এ প্রবচন। এ সেই ত্রেতা যুগের কাহিনী। দেবর্ষি নারদ একদিন তাঁর ঢেঁকি বাহনে

Read More »

পিগম্যালিয়ন

জর্জ বার্নার্ড শ অনুবাদ : অরিজিতা দাস ভূমিকা একজন ধ্বনিবিজ্ঞানের অধ্যাপক ‘পিগম্যালিয়ন’ নাটকটি পড়ার পর বোঝা যাবে এর জন্য কোনো ভূমিকার প্রয়োজন নেই, বরং এর জন্য

Read More »

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি

Read More »