এক দৃষ্টিহীন পেঁচা
কাহিনিকার: সাদেঘ হেদায়েত
বঙ্গানুবাদ: সুপর্ণা বোস
ষোড়শ অধ্যায়
সহসা দৃশ্যটা অর্থবহ হয়ে উঠল!আমার মনে পড়ে গেল ‘ফরবরদিন’র এয়োদশ দিনে আমার শাশুড়ি মায়ের সঙ্গে আমি আর সে এখানে এসেছিলাম।যদিও আমি খুব স্পষ্ট করে মনে করতে পারি না সেদিন এই সাইপ্রাস গাছের নিচে আমরা ঠিক কতক্ষণ হুটোপুটি করেছিলাম!তবে এটা বেশ মনে আছে যে সেদিন আরোখানিকটা পরে শিশুদের একটা দল এসেছিল আর আমরা সবাইমিলে লুকোচুরি খেলছিলাম।এক সময় তাকে আর না দেখতে পেয়ে খুঁজতে খুঁজতে সুরেন নদীর তীরে গিয়ে দেখি ‘সে’ সুরেননদীর জলে পড়ে গেছে!আমরা সকলে মিলে তাকে জল থেকে টেনে তুলে এই সাইপ্রাস গাছটার নিচে নিয়ে আসি।সেখানে সে যাতে তার ভিজে জামাকাপড় বদল করতে পারে তাই কাপড় দিয়ে একটু আড়াল তৈরি করা হয়েছিল।তা সত্বেও আমি সাইপ্রাস গাছের পিছন থেকে তার নগ্ন দেহ দেখেছিলাম।সে তার বাঁহাতের তর্জনী চিবোতে চিবোতে হেসেছিল।তাকে একটা সাদা গাউন পরতে দেওয়া হয়েছিল এবং ভেজা সূক্ষ্ম কালো রেশমের পোশাকটি শুকোবার জন্যে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
আমি সেই সাইপ্রাস গাছের নিচে ধুলোর ওপর শুয়ে পড়লাম।জলের শব্দ বিচ্ছিন্নভাবে স্বপ্নের ভিতর এক অবোধ্য বিড়বিড়িনির মত লাগছিল।আমি উষ্ণ স্যাঁতস্যাঁতে বালির মধ্যে হাত ডুবিয়ে খানিকটা ভেজা বালি মুঠোয় নিয়ে এভাবে কচলাতে লাগলাম যেন কোনো মেয়ের আঁটোসাঁটো শরীরের মাংস।হয়ত যাকে একটু আগেই জল থেকে তুলে পোশাক বদলানো হলো তারই!
জানিনা কেন আমি আবার আমার শশুরবাড়ির দরজায় ফিরে এলাম!তাঁর ছোটোছেলে অর্থাৎ আমার ছোটো শ্যালক দাওয়ার ওপর খেলা করছিল।সে অবিকল তার দিদির মত দেখতে! তুর্কমেনীয় তেরছা চোখ,উঁচু হনু এবং গমের দানার মত গায়ের রং। কামোদ্দীপক নাক ও রোগা কঠিন মুখাবয়ব।ছেলেটি সেখানে বসে আপনমনে বাঁহাতের তর্জনী চিবোচ্ছিল।আমি তাকে কাছে ডেকে পকেট থেকে কুকিজদুটো বের করে তার হাতে দিয়ে বললাম, তোমার শাজুন এটা তোমার জন্যে দিয়েছে।সে তার নিজের মায়ের পরিবর্তে তার দিদি অর্থাৎ আমার স্ত্রীকে শাজান বলে ডাকত।সে তার তুর্কমেনীয় বাঁকা চোখে সন্দেহের দৃষ্টিতে আমার হাতে ধরা কুকি দুটোর দিকে তাকালো! আমি দাওয়ার ওপর বসে পড়ে তাকে কোলে টেনে জাপ্টে ধরলাম।তার শরীর উষ্ণ।পায়ের ডিমের অংশ অবিকল আমার স্ত্রীর মতই।স্বভাবটাও তার মতোই নিস্পৃহ ধরনের!
অথচ ঠোঁটদুটি বাপের মত।যদিও বাপের ঠোঁট দেখলে যেমন একপ্রকার বিরক্তির উদ্রেক হয়,ওর ক্ষেত্রে সেটাই বেশ আকর্ষণীয়!তার আধেক খোলা ঠোঁট যেন এখুণি কোনো দীর্ঘ উষ্ণ চুম্বন সমাপ্ত করে উঠেছে!আমি তার স্ফুরিত ঠোঁটে চুমু খেলাম।সেই অনুভূতি খানিকটা যেন আমার স্ত্রীর ঠোঁটে চুমু খাবার সমতুল।তার ঠোঁটের স্বাদ, শশার প্রান্তের সেই তেতো স্বাদের মতই।সম্ভবত আমার স্ত্রীর ঠোঁটের স্বাদও এমনই হবে।
সেই মুহূর্তেই আমি তার বাবাকে দেখতে পেলাম।সেই ঝুঁকেপড়া বৃদ্ধ মানুষ।গলায় একখানা স্কারফ জড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল।আমাকে গ্রাহ্য না করেই নিজেরমত বেরিয়ে গেল।যেতে যেতে এমনভাবে কাঁধ ঝাঁকিয়ে হাসছিল যা শুনলে যেকারোরই গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাবে!আমার এতো লজ্জা করছিল,মনে হচ্ছিল হে ধরণী দ্বিধা হও!আকাশের সূর্য তখন অস্তাচলের পথে।আমি বাড়ির দিকে এভাবে দৌড়োলাম যেন নিজের কাছ থেকেই ছুটে পালাচ্ছি!কারোর বা কোনোকিছুর দিকে তাকাইনি;এটা অনেকটা যেন কোনো অচেনা অজানা শহরে বেড়ানোর মত;বিচ্ছিন্ন কিছু জ্যামিতিক আকারের বাড়িঘর আর তাদের পরিত্যক্ত কালো জানলাগুলো আমাকে ঘিরে ধরেছিল।মনে হচ্ছিল কোনো জ্যান্ত প্রাণীই ওই সাদা দেয়ালের ঘরগুলোর মধ্যে আর বাস করে না।কেবল একটা ফ্যাকাশে আলোর রেশ ছিল।সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ব্যাপার যেটা ঘটছিল, যখনই চাঁদ এবং সেই সাদা দেয়ালের মাঝখানে দাঁড়িয়েছি তখনই একটা দীর্ঘ ও ঘন কবন্ধ ছায়া পড়ছির সেই সাদা দেয়ালের গায়ে!আমার মস্তকবিহীন ছায়া!শুনেছিলাম,যদি কারোর কবন্ধ ছায়া পড়ে তাহলে বুঝতে হবে বছর খানের মধ্যেই তার মৃত্যু আসন্ন।ভীত সন্ত্রস্ত আমি নিজের ঘরে আশ্রয় নিলাম।আমার নাক থেকে রক্ত পড়ছিল।বেশ অনেকটা রক্ত বেরিয়ে যাওয়ার পর অচৈতন্য হয়ে বিছানায় পড়ে রইলাম।নানি আমার পরিচর্যা করছিলেন।
বিছানায় লুটিয়ে পড়ার আগে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেয়েছিলাম;ক্লিষ্ট আবছা নিষ্প্রাণ মুখ!এতো আবছা যে আমি নিজেকেই চিনতে পারিনি!বিছানায় উঠে মাথা থেকে পা পর্যন্ত কম্বল মুড়ি দিয়ে দেয়ালের দিকে ফিরে শুয়ে পড়েছিলাম।তারপর গুটিশুটি মেরে চোখ মুজে শুয়ে নিজের দুর্ভাগ্যজনক ভয়ানক নিয়তির সূক্ষ্ম ছায়ার স্মৃতি রোমন্থন করতে লাগলাম ঘোরগ্রস্থের মত।আমি সেই অবস্থায় পৌঁছে গেলাম যেখানে জীবন এবং মৃত্যুর চেতনা পরস্পরের সীমা লঙ্ঘন করে!যেখানে ভাঙাচোরা ছায়াগুলো ক্রমশ আকার নিতে শুরু করে!নিহত নিশ্চিহ্ন অবদমিত কামনারা বেঁচে ওঠার তাগিদে আর্তনাদ করে!মুহূর্তের জন্যে নিজেকে পার্থিব জগৎ থেকে ছিঁড়ে নিয়ে এক অনন্ত প্রবাহের মধ্যে বিলুপ্ত করলাম! বহুবার নিজের মনে বিড়বিড় করলাম,’মৃত্যু!ওগো মৃত্যু কোথায় তুমি?’ এটা আমাকে কিছুটা শান্ত করল এবং আমার চোখ বুজে এলো।
চোখ বোজার পর আমি নিজেকে মোহাম্মাদিয়া স্কোয়ারে খুঁজে পেলাম!সেখানে একটা মস্তবড় ফাঁসিকাঠ প্রস্তুত ছিল।এক ফাঁসুড়ে বেশ উদ্বিগ্নভাবে আমার ঘরের একেবারে মুখোমুখি বসে ছিল।ফাঁসিকাঠের ঠিক নিচেই কয়েকজন মোদোমাতাল ও রক্ষীরা বসে মদ্যপান করছিল।আমি আমার শাশুড়িকে দেখলাম।রাগে গনগন করছিল তার মুখ।রেগে গেলে আমার বউয়ের মুখখানাও অমন হয়ে ওঠে।ঠোঁট ফ্যাকাশে,চোখ গোল! তিনি ভিড়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি করে লাল পোশাক পরিহিত ফাঁসুড়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছিলেন আর চিৎকার করছিলেন, “এটাকেও ঝুলিয়ে দাও…”
এই দুঃস্বপ্ন দেখে ভয়ে আমি ঘুম ভেঙে লাফিয়ে উঠলাম!জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছিল! শরীর ঘামে ভিজে!এবং গাল দুটো জ্বলছিল তাপে! এই দুঃস্বপ্নের কবল থেকে নিজেকে বাঁচাতে আমি বিছানা থেকে উঠে জল খেলাম, মুখ ও মাথায় জল ছেটালাম এবং আবার শুয়ে পড়লাম। কিন্তু ঘুম আর এলো না!
প্রায়ান্ধকার ঘরের ভেতর কুলুঙ্গিতে রাখা জলের কলসির দিকে তাকিয়ে রইলাম। মনে হচ্ছিল, যতক্ষণ কলসিটা ওইখানে আছে, আমি ঘুমোতে পারব না। এক ভিত্তিহীন ভয় আমাকে গ্রাস করেছিল,যেন কলসিটা ঠিক পড়ে যাবে। এটা ঠেকাতে আমি বিছানা থেকে উঠে সেটাকে ঠিকঠাক করে রাখতে গেলাম, কিন্তু কোনো অজানা প্রণোদনায় আমার হাত ইচ্ছে করেই সেটাকে আঘাত করতেই কলসিটা পড়ে চুরমার হয়ে গেল।
যাই হোক, যখন আমি চোখ মিটকে আবার ঘুমোতে চেষ্টা করলাম, মনে হলো আমার নানি জেগে উঠে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি কম্বলের নিচে হাত মুঠো করে ধরলাম, কিন্তু কিছুই অস্বাভাবিক ঘটল না। একরকম অচেতন অবস্থায় আমি সামনের দরজা খোলার শব্দ শুনলাম, তারপর নানির চটি পায়ে হেঁটে বাইরে যাওয়ার শব্দ পেলাম!সে রুটি আর চিজ কিনতে গেল। কিছুক্ষণ পরে দূর থেকে এক ফেরিওয়ালার ডাক শুনতে পেলাম,“তুঁত ফল পিত্তের জন্য ভালো!”
হ্যাঁ, যেমনটা হয় চারিপাশে সেই ক্লান্তিকর জীবন আবার শুরু হয়ে গেল। আলো ক্রমশ বাড়ছিল। যখন আমি চোখ খুললাম, দেখলাম পুকুরের জলে প্রতিফলিত সূর্যের আলো আমার ছাদের ওপর কাঁপছে; দেয়ালের একটি ছিদ্র দিয়ে তা ঘরে ঢুকে এসেছে।
এখন আগের রাতের স্বপ্নটা দূরের ও অস্পষ্ট মনে হচ্ছিল।যেন বহু বছর আগে শৈশবে দেখা কোনো দৃশ্য।
নানি যখন আমার সকালের খাবার নিয়ে এল, তার মুখটা অদ্ভুত ও হাস্যকর হয়ে গিয়েছিল। সেটা লম্বা ও পাতলা, যেন কোনো জাদুর আয়নায় বিকৃত হয়েছে বা কোনো ভারে নিচের দিকে টেনে নামানো হয়েছে।
যদিও নানি ভালো করেই জানত হুঁকোর ধোঁয়া আমার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, তবুও সে আমার ঘরেই ধূমপান করত। সে ধূমপান না করলে যেন থাকতেই পারত না। নানি তার বাড়ি, তার পুত্রবধূ আর তার ছেলে সম্পর্কে এত কথা বলেছিল যে, সে আমাকে যেন তার নিজস্ব বাসনাময় জীবনের এক অংশীদার বানিয়ে ফেলেছিল। কী নির্বুদ্ধিতা!
কখনো কখনো, কোনো কারণ ছাড়াই, আমি নানির বাড়ির লোকজনের জীবন নিয়ে ভাবতাম। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, অন্যদের জীবনযাপন আর তাদের সুখ-আনন্দের সবকিছুই আমার বিবমিষা জাগাত।
সুস্থ, সাধারণ মানুষদের জীবনের সঙ্গে,যারা ভালো আছে, ভালো ঘুমোয়, সঙ্গমে তৃপ্তি পায়, যাদের মুখে কখনো মৃত্যুর ছায়া ভেসে ওঠেনি,তাদের সঙ্গে আমার মতো একজনের কী সম্পর্ক থাকতে পারে? আমি তো জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি, এবং জানি, ধীরে ধীরে, বেদনাদায়কভাবে আমার মৃত্যু সমাসন্ন।।



