এক দৃষ্টিহীন পেঁচা
কাহিনিকার: সাদেঘ হেদায়েত
বঙ্গানুবাদ: সুপর্ণা বোস
পঞ্চদশ পর্ব
ফলত, ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল যে এতদিন আমি নিজেকেই ঠিকমত করে চিনতে পারিনি। আর এই পৃথিবীর যে শক্তি ও অর্থ আমি কল্পনা করতাম, তারও তেমন কোনো সত্যতা নেই; সেই সমস্ত শক্তি ও প্রভাব এখন রাতের অন্ধকারে বাতিল হয়ে যাচ্ছে। বরং আমাকে যদি শেখানো হতো রাতের দিকে চোখ মেলে দেখতে, তাকে উপভোগ করতে, তাকে ভালোবাসতে!
এই সময় আমার হাতটি আদৌ আমার নিয়ন্ত্রণে ছিল কি না, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই; আমার মনে হচ্ছিল, যদি আমি আমার হাতটিকে একেবারে নিজের মতো ছেড়ে দিই—কোনো অজানা, অচেনা উদ্দীপনার টানে, আমার কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই,তবে সেটি নিজে থেকেই সচল হয়ে উঠবে।
আমি যদি তাকে ক্রমাগত সচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ না করি, তবে আমার শরীরও অপ্রত্যাশিত কাজ করতে পারে। অনেকদিন ধরেই আমার মনে হচ্ছিল, আমি যেন এক ধরণের জীবন্ত অবক্ষয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। শুধু শরীর নয়, আমার আত্মাও যেন আমার হৃদয়ের বিরোধিতা করছে; তারা সবসময় একে অপরের সঙ্গে অসামঞ্জস্যে লিপ্ত। আমি যেন ক্রমাগত এক অদ্ভুত ভাঙন আর বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম। কখনো এমন চিন্তা আসত, যা আমি নিজেই বিশ্বাস করতে পারতাম না; আবার কখনো করুণা অনুভব করতাম। কিন্তু প্রতিবারই আমার বুদ্ধিবৃত্তি আমাকে ধিক্কার দিত। অনেক সময় কথোপকথনের মাঝখানে, বা কোনো কাজে ব্যস্ত থাকলেও, আমি নানা বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতাম, অথচ আমার মন অন্য কোথাও থাকত। আমি নিজের মধ্যেই ডুবে থাকতাম এবং ভেতরে ভেতরে নিজেকেই দোষারোপ করতাম। আমি যেন এক অবক্ষয় ও ভাঙনের স্তূপে পরিণত হচ্ছিলাম। মনে হয়, আমি এমনই ছিলাম এবং থাকব।এমন অদ্ভুত, অসামঞ্জস্যপূর্ণ মিশ্রণ…
সবচেয়ে অসহনীয় ছিল এই যে, যাদের সঙ্গে আমি বাস করতাম, যাদের দেখতাম, তাদের থেকে আমি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন বোধ করতাম; শুধু এক সামান্য সাদৃশ্য, দূরবর্তী অথচ কাছের এক মিল, আমাদের যুক্ত করে রেখেছিল। আসলে জীবনের পারস্পরিক প্রয়োজনীয়তাই সেই বিস্ময়কে কমিয়ে দিত। কিন্তু যে সাদৃশ্য আমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিত, তা হলো,ওই নীচ লোকগুলিও, আমার মতোই, সেই বেশ্যাকে ভালোবাসত। তারা আমার স্ত্রীকে ভালোবাসত। আর সেও তাদের প্রতিই বেশি আকৃষ্ট ছিল। আমি নিশ্চিত, আমাদের কারও চরিত্রে একটা ত্রুটি ছিল।
আমি তাকে ‘বেশ্যা’ বলেই ডাকি, কারণ এর চেয়ে উপযুক্ত আর কোনো শব্দ নেই। আমি “আমার স্ত্রী” বলতে চাই না, কারণ আমাদের মধ্যে কোনো দাম্পত্য সম্পর্ক ছিল না; তাই এমন শব্দ ব্যবহার করলে আমি নিজেকেই প্রতারিত করব। অনন্তকাল ধরে আমি তাকে এই নামেই ডেকে এসেছি। তাছাড়া, এই নামটির মধ্যে আমার কাছে এক অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল। আমি তাকে বিয়ে করেছিলাম, কারণ সে নিজেই আমার কাছে এসেছিল,ভালোবাসা থেকে নয়, বরং তার কূটচাল আর ভণ্ডামির অংশ হিসেবে। না, সে আমাকে সামান্যও ভালোবাসেনি। আসলে, যে নারী কামনার জন্য একজন, ভালোবাসার জন্য আরেকজন, আর নির্যাতনের জন্য আরেকজনকে চায়—সে কি কখনো একমাত্র একজনকে ভালোবাসতে পারে? আমি জানি না, তার সব পুরুষকে এই শ্রেণিগুলির মধ্যে ফেলা যায় কি না। তবে আমি নিশ্চিত, সে আমাকে বেছে নিয়েছিল নির্যাতনের জন্য। সত্যিই, এর চেয়ে ভালো নির্বাচন সে করতে পারত না। এত কিছুর পরেও আমি তাকে বিয়ে করেছিলাম, কারণ সে তার মায়ের মতো দেখতে ছিল এবং আমার সঙ্গেও তার এক অস্পষ্ট সাদৃশ্য ছিল। এখন শুধু আমি তাকে ভালোবাসতামই না, আমার শরীরের প্রতিটি অণু পরমাণু তাকে কামনা করত।বিশেষ করে শরীরের মধ্যভাগের সেই কণাগুলি। আমি আমার সত্যিকারের অনুভূতিকে ‘ভালোবাসা’, ‘স্নেহ’ বা কোনো দার্শনিকতার আড়ালে ঢাকতে চাই না। আমি কোনো প্রকার আলঙ্কারিক ভাষা পছন্দ করি না। আমার মনে হতো, যেন সাধুদের মাথার চারপাশে যে জ্যোতির্বলয় আঁকা হয়, তেমন এক জ্যোতি আমার শরীরের মাঝখানে বসে আছে; আর সেই অসুস্থ, অস্বস্তিকর জ্যোতিটা তার শরীরের মাঝখানের জ্যোতিকে আকর্ষণ করার জন্য সমস্ত শক্তি উজাড় করে দিচ্ছে।
যখন আমি একটু সুস্থ বোধ করলাম, তখন চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। যেন এক অভিশপ্ত, কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত কুকুর, যে জানে তাকে মরতেই হবে,অথবা সেই পাখিদের মতো, যারা মৃত্যুর আগে নিজেকে আড়াল করে ফেলে।আমি ঠিক করলাম যে আমি গায়েব হয়ে যাব এবং নিজেকে হারিয়ে ফেলব।খুব ভোরে উঠে কুলুঙ্গি থেকে দুটো বিস্কুট বার করে নিলাম এবং নিশ্চিত হলাম যে, আমাকে কেউ দেখে ফেলেনি।তারপর বাড়ি থেকে দে দৌড়!আর যে যন্ত্রণা আমাকে জাপ্টে ধরেছিল তার থেকেও!
কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য ছাড়াই বহু রাস্তা পার হলাম, আর বিমূঢ়ভাবে হেঁটে চললাম সেই জনতার পাশে, যাদের লোভী মুখ অর্থ আর কামনার পেছনে ছুটছে। আসলে তাদের দেখার দরকার ছিল না; একজনই যথেষ্ট ছিল বাকিদের প্রতিনিধিত্ব করতে। তারা যেন সবাই এক বিশাল মুখ,যার শেষে পেটের গহ্বর, আর তারও শেষে এক যৌনাঙ্গ।
হঠাৎ নিজেকে অনেক হালকা আর চটপটে মনে হলো; আমার পায়ের পেশিগুলো এক অদ্ভুত গতি ও তৎপরতায় কাজ করছিল, যা আমার কল্পনারও বাইরে ছিল। মনে হচ্ছিল, জীবনের শৃঙ্খল থেকে আমি মুক্ত হয়ে গেছি। আমি কাঁধ ঝাঁকালাম,শৈশবের সেই স্বাভাবিক ভঙ্গি, যখন কোনো কাজ বা দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেতাম।
উদীয়মান সূর্য তীব্র তাপে জ্বলছিল। আমি একটা নির্জন ও ফাঁকা রাস্তায় পৌঁছালাম। পথে দেখলাম কিছু ধূসর বাড়ি।অদ্ভুত, একক জ্যামিতিক আকৃতি বিশিষ্ট: ঘনক, প্রিজম, শঙ্কু আকৃতির বাড়ি, যাদের নিচু, অন্ধকার জানালা; জানালায় কোনো পাল্লা নেই, আর বাড়িগুলোকে অস্থায়ী ও পরিত্যক্ত মনে হচ্ছিল। মনে হলো, সেখানে কোনো জীবিত প্রাণীর বাস নেই।
সোনার ছুরির মতো সূর্য দেয়ালের ছায়ার প্রান্তগুলো কেটে নিয়ে যাচ্ছিল। পুরনো, সাদা রঙ করা দেয়ালের মধ্যে বন্দী রাস্তাগুলো যেন নিজের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে নিচ্ছিল। চারপাশে নিস্তব্ধতা,যেন প্রকৃতি উত্তপ্ত চরাচরের নীরবতার কোনো পবিত্র নিয়ম মেনে চলছে। চারদিকে এমন রহস্য ভর করে ছিল যে, আমার ফুসফুস বাতাস টানতেও সাহস পাচ্ছিল না।
হঠাৎ বুঝতে পারলাম, শহরের ফটক আমি পেছনে ফেলে এসেছি। সূর্যের তাপ আমার শরীর থেকে যেন হাজার মুখ দিয়ে ঘাম শুষে নিচ্ছে। প্রখর রোদে মরুভূমির ঝোপঝাড় হলুদ রঙ ধারণ করেছে। আকাশের গভীর থেকে জ্বরগ্রস্ত চোখের মতো সূর্য সেই নিস্তব্ধ, প্রাণহীন দৃশ্যের ওপর তার দহন ছড়িয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু এই অঞ্চলের মাটি ও উদ্ভিদের এক বিশেষ গন্ধ ছিল,এতই তীব্র যে তা শ্বাস নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে শৈশবের কথা মনে করিয়ে দিল। সেই সময়ের কাজকর্ম ও কথাবার্তা যেন গতকালের মতো স্পষ্ট মনে পড়ে গেল। যেন হারিয়ে যাওয়া এক জগতে পুনর্জন্ম নিলাম।এক মনোরম ঝিমধরা অনুভূতি হলো। এই অনুভূতি, যেন প্রাচীন মিষ্টি মদের মতো নেশাময়, আমার শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ল, আমার অস্তিত্বের গভীরে পৌঁছে গেল। আমি যেন কাঁটা, পাথর, গাছের কাণ্ড, বুনো থাইমের ছোট গাছগুলোর সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেলাম। গাছপালার পরিচিত গন্ধ চিনতে পারলাম।
আমি অতীতের কথা ভাবতে শুরু করতেই,আমার সেই বহু দূরের দিনগুলো,কী অদ্ভুতভাবে, সেই স্মৃতিগুলো আমার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে লাগল; তারা যেন নিজস্ব জীবনে আলাদা হয়ে বেঁচে আছে। আমি শুধু এক নির্বাসিত, অসহায় সাক্ষী!এক গভীর ঘূর্ণাবর্ত আমাকে সেই মধুর স্মৃতিগুলো থেকে আলাদা করে রেখেছে। সেই দিনের তুলনায় আজ আমার হৃদয় শূন্য; ঝোপঝাড় হারিয়েছে তাদের জাদুকরী গন্ধ, সাইপ্রাস গাছগুলোর মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে, পাহাড়গুলো আরও রুক্ষ। আমি আর সেই আগের সত্তা নই; আর যদি সেই সত্তাকে সামনে এনে তার সঙ্গে কথা বলি, সে আমার কথা মোটেও শুনবে না, আমার কথা বুঝবেও না। তার মুখ চেনা লাগবে, কিন্তু সে আমি নয়।এমন কি আমার কোনো অংশও নয়।
পৃথিবী যেন এক শূন্য, বিষণ্ণ প্রাসাদে পরিণত হয়েছে। আমার বুকে এক অদ্ভুত অস্থিরতা ভর করল,যেন খালি পায়ে সেই প্রাসাদের সব কক্ষ ঘুরে দেখতেই হচ্ছে। একের পর এক সংযুক্ত ঘর পেরোচ্ছি, কিন্তু প্রতিটি ঘরের শেষে সেই বেশ্যাই আমার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। একে একে দরজাগুলো নিজের থেকেই আমার পেছনে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দেয়ালের কম্পমান ছায়াগুলো, যাদের কোণ মুছে গেছে, যেন নারী-পুরুষ কালো ক্রীতদাসদের মতো আমাকে পাহারা দিচ্ছে।
সুরেন নদীর কাছে পৌঁছাতেই সামনে এক শুকনো, অনুর্বর পাহাড় দেখা দিল। সেই পাহাড়ের রুক্ষ অবয়ব আমাকে আমার ধাত্রীমাতার কথা মনে করিয়ে দিল, যদিও তাদের মধ্যে কোনো স্পষ্ট মিল খুঁজে পেলাম না। পাহাড়ের পাশ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে পাহাড়বেষ্টিত এক ছোট, মনোরম জায়গায় পৌঁছালাম।সেখানকারর মাটি কালো লিলি ফুলে ঢাকা, আর পাহাড়ের ওপর ছিল মোটা কাদামাটির ইট দিয়ে তৈরি এক উঁচু দুর্গ।
ক্লান্ত বোধ করে সুরেন নদীর তীরে, এক প্রাচীন সাইপ্রাস গাছের নিচে বালির ওপর বসে পড়লাম। জায়গা ছিল জনমনিষ্যিহীন!যেন আগে কেউ কখনো এখানে আসেনি। হঠাৎ দেখলাম, গাছের আড়াল থেকে একটি বালিকা বেরিয়ে এসে দুর্গের দিকে হাঁটছে। তার গায়ে ছিল খুব পাতলা, হালকা বুননের কালো পোশাক।সম্ভবত রেশমের। বাম হাতের তর্জনী কামড়াতে কামড়াতে সে নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে হাঁটছিল। মনে হলো, তাকে আগে কোথাও দেখেছি, চিনি; কিন্তু দূরত্ব আর প্রখর রোদের কারণে বুঝতে পারলাম না,ক হঠাৎ সে অদৃশ্য হয়ে গেল।
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম; সামান্য নড়াচড়াও করতে পারছিলাম না। কিন্তু এবার আমি তাকে নিজের চোখে দেখেছি সে আমার সামনে দিয়ে হেঁটে গিয়ে মিলিয়ে গেল। যতই চেষ্টা করি, মনে করতে পারলাম না সে বাস্তব ছিল, না কি আমার কল্পনা! আমি কি তাকে স্বপ্নে দেখেছিলাম, না জাগ্রত অবস্থায়। আমার মেরুদণ্ডে এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল, আর মনে হলো পাহাড়ের দুর্গের সব ছায়া যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে আর সেই মেয়েটি যেন সেই প্রাচীন রেএএ নগরের কোনো এক বাসিন্দা।।
(চলবে )



