ঊর্ণনাভ
ধারাবাহিক উপন্যাস
শ্যামলী রক্ষিত
সপ্তম পর্ব
তুষার চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে চুপ করে বসেছিল ! মনটা অদ্ভূত একটা অশান্তিতে জ্যাম হয়ে গেল সকাল থেকেই ! মিতার এই জমিদারি মেজাজ একদম সহ্য হয় না তার ! জীবনের প্রথম থেকেই তো তাদের বেঁচে থাকাটা একেবারেই অন্য রকম ছিল ! গ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবার তাদের ! বর্ধমান জেলার বিখ্যাত গ্রাম আমদপুর নিঃশঙ্ক ! পাশাপাশি গায়ে গায়ে লেগে থাকা নারী পুরুষের মত একসঙ্গে বসে আছে দুটো গ্রাম ! কোথায় তাদের সীমানা শুরু আর কোথায় শেষ কিছু বোঝা যায় না ! খুব রেষারেষি দুই গাঁয়ে ! কিন্তু সেটা নিজেদের আরো ভালো করে তোলার,উন্নত করে তোলার প্রতিযোগিতা । সেই নিয়ে রক্তারক্তি হিংসাপনা কিছু নেই ! গ্রামের নাম জানতে চাইলে কেউ শুধু নিঃশংক কিংবা আমোদ পুর বলে না ! দুটো গ্রাম একি সঙ্গে জুড়ে নিজেদের গ্রামের নাম বলতে অভ্যস্থ এই গ্রামের সকল বাসিন্দাই ! সেই গ্রামের প্রায় ইশ্বর তুল্য শ্রদ্ধা পেত ঠাকুরদা অবনি মোহন কর ! দেশের একজন বীর সংগ্রামী । স্বাধীনতা সংগ্রামী ! দেশের জন্যে জেল খেটেছেন ! সারাটা জীবন ,গ্রামের গরীব দুঃখী মানুষদের নানান ভাবে সাহায্য করতেন । কিন্তু সব থেকে যে কাজটা নিষ্ঠার সঙ্গে করেছেন তা হল গ্রামের ছেলেদের খেলা ধুলো শরীর চর্চা আর মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে উৎসাহী করতেন ! সকলকে বুঝিয়ে সুজিয়ে ইস্কুলে ভর্তি করতেন । এবং তারা আজ অনেকেই প্রতিষ্ঠিত মানুষ ! কাজটা খুব সহজ ছিল না ! তখন দেশ উত্তাল ! স্বাধীনতা আন্দোলন তুঙ্গে ! চারিদিকের মানুষের মুখে মুখে কানা ঘোসা শোনা যাচ্ছে ইংরেজরা এবার দেশ ছেড়ে যাবে ! এই নিয়ে বড়ো লাটের সঙ্গে ঘনঘন মিটিং হচ্ছে ! ভারত স্বাধীন হতে আর বেশি দেরি নেই ! সেই সময়ই একদিন ঘোষণা হল ভারতবর্ষের স্বাধীনতার কথা ! সে কি উত্তাল দেশের জনগণ ! আনন্দে আত্মহারা মানুষ পথে নেমে এসেছে ! রাতারাতি ঠিক হয়ে গিয়েছিল সব কিছু ! দেশের পতাকা হাতে পথে পথে ঘুরেছে মানুষ ! সে এক অপূর্ব দৃশ্য ! বাবা সেই গল্প যখন বলত চোখ থেকে যেন অপূর্ব একটা আলো গড়িয়ে পড়ত ! বাবার কাছে গল্প শুনেছে তুষার ! বাবা তখন খুব ছোট ! নিম্ন বুনিয়াদি স্কুলে বকুল তলায় একটা বেদি বানানো হয়েছিল ! পরদিন ভোরে উঠে ওখানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে স্বাধীনতা দিবস পালন করা হবে !
ভোরে উঠে প্রচুর ফুল মালা নিয়ে স্কুলে গিয়েছিল ! সেদিনের সেই অভিজ্ঞতার কথা বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন বারবার বলেছেন ! সেই পতাকার স্ট্যান্ডের চারিদিকে গোল করে চুন দিয়ে ব্যারিকেড করে দেওয়া হয়েছে ! স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ছবি রাখা হয়েছে সেই স্ট্যান্ডের কাছে পতাকার নিচে ! গ্রামের লোকজন সবার বাড়িতে বাড়িতে পতাকা উত্তোলন করছে ! আর তাদের সেই নিম্ন বুনিয়াদি স্কুলে কি উচ্ছাস ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে ! সারা দেশ যেন জাতীয় সঙ্গীতের মূর্ছনায় উন্মত্ত ! কী এক অভূত পূর্ব প্রাপ্তির আনন্দে মাতোয়ারা সমগ্র দেশবাসী। সেদিন গ্রামের লোক দাদুর গলাতেও মালা পরিয়েছিল। সারাটা জীবন গ্রামবাসীর কাছে দাদু যেন দেবতার মত ভালোবাসা পেয়েছে ! বাবাও পরবর্তীতে স্কুল টিচার হয়েছেন ! আদর্শ শিক্ষক হবার জন্যে প্রতিটা মুহূর্ত নিজেকে নির্মাণ করেছেন ! সেই বংশের ছেলে তুষার ! মূল্যবোধ , দেশপ্রেম , নৈতিকতা যার রক্তের কোণায় কোণায় বয়ে চলেছে। কত আশা নিয়ে , কত স্বপ্ন নিয়ে পড়তে এসেছিল কলকাতা মেডিকেল কলেজে ! এখনো সে যেন বিশ্বাস করতে পারে না , মিতাকে সে স্বইচ্ছায় বিয়ে করেছে ! এটা কি করে যে সম্ভব হল সে জানে না । তার সঠিক ব্যাখ্যা তার কাছে নেই !
মিতা তো পুরো তার আলাদা মেরুতে বাস করে । বাড়ির কাজের লোকদের চাকর বাকর ছাড়া কিছু ভাবতেই পারে না ! কেন যে ওর মানসিকতার কোনো পরিবর্তন ঘটল না আজও এতটুকু ! নানান দিক থেকে হতাশার হাওয়া এসে তার অস্তিত্বকে যেন মরফিন দেওয়া মৃত প্রাণির মত করে দিচ্ছে ! ছোট বেলায় সরস্বতী পুজোর সময় স্কুলে বিজ্ঞান প্রদর্শনী হত ! স্কুল গেটে বড়ো বড়ো করে লেখা থাকত বিজ্ঞান প্রদর্শনী চলছে । প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় থেকে, সেই প্রদর্শনী ঘরে ঢোকার কি কৌতূহল ছিল ! একটা একটা কাঁচের জারে রাখা থাকত মৃত প্রাণি ! ওখানেই তো প্রথম দেখেছিল গিনিপিগ ! আরো কত রকমের ছোটো ছোটো প্রাণি যে থাকত তাতে ! দেখত আর অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত ! দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবত , কী এমন জিনিস দেওয়া আছে যে বছরের পর বছর এই মৃত প্রাণীগুলো একই রকম ভাবে থেকে গেছে ! বেঁচে নেই তবু টিকে আছে ! অদ্ভূত একটা অনুভূতি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ত সারা শরীর ময়। ওই ঘর থেকে বেরোতেই ইচ্ছা করত না ! ঘন্টার পর ঘন্টা ওভাবেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে ইচ্ছা করত তার। এক সময় উঁচু ক্লাসের বড়ো দাদারা ,বুকে ব্যাচ লাগানো থাকত তাদের , এসে হাত ধরে টানতে টানতে বার করে আনত ! কি জানি আজ হঠাৎ নিজেকে কেন ওই মরফিন দেওয়া মৃত প্রাণি গুলোর মত মনে হচ্ছে । বেঁচে আছে তবু বেঁচে নেই ! শুধু যাহোক করে টিকে আছে !
মাঝে মাঝে খুব মনে হয় এমনটা হবার কথা ছিল না ! সব কিছুই যেন তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঘটেছে ! একটা হিসেবের গন্ডগোল শুধু ! ব্যাস জীবনের ট্রাক লাইন একদম চেঞ্জ হয়ে গেল ! জীবনের প্রতিটা পদক্ষেপে সে উপলব্ধি করেছে একটা চরম সত্য ! সাধারণ মানুষের জীবনে সব চেয়ে গুরুত্ব পূর্ণ বিষয় হল বৈবাহিক সম্পর্ক ! এই জায়গায় যদি কিছু গড়মিল হয় ব্যাস সব তালগোল পাকিয়ে যাবে ! বড়ো অদ্ভুত লাগে তুষারের ! আজও সে বুঝে উঠতে পারে না কিভাবে মিতার সঙ্গে প্রেমটা হল ! নিজের শিক্ষা দীক্ষা রুচি জীবন অভ্যাস কোনো কিছুই মেলে না তার ! ইভেন মিতা যখন তাকে প্রপোজ করে ব্যাপারটা পুরো উড়িয়ে দিয়েছিল তুষার ! মিতার সাজ পোশাক , লাইফ স্টাইল কোনো কিছুই তেমন ভালো লাগত না ! তার ওপর শহরের ধনী পরিবারের মেয়ে মিতা ! তখন প্রাইভেট কারে করে কলেজে আসত হাতে গোণা দু একজন স্টুডেন্ট। মিতা তাদের মধ্যে একজন ! ডিপার্টমেন্ট এর সকলেই তাকে এক ডাকে চিনত। কত ছেলে মিতার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে তখন ! হবে নাই বা কেন ! মিতা দেখতে সুন্দর ! এলিট সোসাইটির মেয়ে ! বাবা বড়লোক ! ছেলেরা তো হামরে পড়বেই ! কিন্তু সেদিকে তার নজর পড়ল না ! সে তখন পথে হল দেরির হিরো ভেবেছে তাকে ! ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট তুষার ! ক্লাসের ফার্স্ট বয় ! তাকেই টার্গেট করেছে ! এবং দিনের পর দিন লেগে থেকে তুষারের সমস্ত অপছন্দকে তুরি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে মিতা ! তারপর দিন দিন সমস্ত নিজস্বতা হারিয়ে গেল মিতার এবং ওর পরিবারের মানুষের আগ্রাসনের কবলে পড়ে যায় সে ! এমন কি নিজের সন্তানও তার শিক্ষা দীক্ষায় মানুষ হয় নি ! মিতা সেই সুযোগ টুকুও দেয় নি তাকে ! একটা অদ্ভুত রসায়নে চিটে গুড়ে আটকানো পিপড়ের মত কাটিয়ে ফেলছে জীবনটাকে ! এরই মধ্যে তার বেঁচে থাকার প্রাণ বায়ু এই আসে পাশের বস্তিতে থাকা গরীব দুঃখী মানুষ জন ! সপ্তায় একদিন করে পাশেই কুমোর পাড়ার বস্তিতে প্রগতি সংঘ ক্লাবে বসে । বাকি দিন গুলো সন্ধ্যার পর থেকে টুক টাক তো দেখে দেয়ই ! সেই সঙ্গে সমস্ত ইমারজেন্সি কেশে আগে তাকে ডেকে নিয়ে যায় ! জীবনের প্রাপ্তি বলতে এটুকুই তার নিজস্ব পাওনা ! যা চেয়েছিল কিংবা যা পাবার কথা ছিল সেই পথে হাঁটা হল না বলে বুকে জমাট দীর্ঘশ্বাস । পাহাড়ের মত বুকে চেপে বসে আছে সেই বেদনা সেই অমলিন কষ্ট ! সেখানে সেই গভীর পাকদণ্ডি ঘুরে ঘুরে তার হৃদয় একটু আলো বাতাসের সন্ধান পেয়েছে এখানে ! এই কুমোরপাড়া পঞ্চাননতলা ,তনুপুকুর মাঠের বস্তির আনাচে কানাচে । গরীব মূর্ঘ অশিক্ষিত সমস্ত কিছু এক করে , তার এই মাকু টানাটানি জীবনের দুয়ারে বেঁধেছে তার খুঁটো ! যেখানে সে অনাবিল বেঁচে থাকার আনন্দে মেতে থাকে ! এটুকু প্রাপ্তি পাথেয় করেই জীবন তরী বইছে তুষার।
(চলবে)



