অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা - তৃষ্ণা বসাক
পর্ব – ১৫
অনুবাদকের কথা
বিখ্যাত অনুবাদক শ্যামল ভট্টাচার্যের মুখোমুখি তৃষ্ণা বসাক
বাংলা ভাষার অন্যতম বিশিষ্ট অনুবাদক শ্যামল ভট্টাচার্য দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পাঞ্জাবি, রাজস্থানি, ডোগরি-সহ বিভিন্ন ভারতীয় ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে চলেছেন। তাঁর অনুবাদে যেমন রয়েছে ভাষার প্রতি গভীর নিষ্ঠা, তেমনই রয়েছে ভারতীয় সংস্কৃতির বহুমাত্রিক বোধ। তাঁর অনুবাদক-জীবন, ভাষা-অভিজ্ঞতা, সাহিত্যভাবনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বললেন কবি, কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক তৃষ্ণা বসাক।

তৃষ্ণা- প্রথমেই জানতে চাইব আপনার শৈশব, পরিবার, স্কুল, আর আপনার অনুবাদক হবার পেছনে কে বা কোন কোন ঘটনার প্রেরণা রয়েছে।
শ্যামল ঃ অনুবাদক হওয়ার পেছনে ছোটবেলায় দক্ষিণ ত্রিপুরার নতুনবাজার প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আমার মায়ের সহকর্মী তেলেগু ডাক্তার চেরি আংকেলের বাড়িতে আন্টির তৈরি ইডলি – ধোসা খাওয়ার ভূমিকা থাকতে পারে। তারপর থেকে সারাজীবন ধরেই আমি দক্ষিণ ভারতীয় খাবার সবচাইতে বেশি ভালবাসি। (আমার স্ত্রীও সব ধরণের দক্ষিণ ভারতীয় রান্না শিখে নিয়েছে।) আর খুব ছোটবেলায় যতনবাড়িতে ডম্বুর জলবিদ্যুৎ প্রকল্প আবাসন এলাকায় প্রাইমারি স্কুলের পাশে জলের ট্যাঙ্ক টিলায় যে মেয়েটি ‘আই লাভ ইউ’ বলেছিল, সে ছিল ওড়িয়া। জানি না আজ সে কোথায় আছে! আমার ছোটবেলায় গল্প শুনিয়ে ভাত খাওয়ানোর জন্য আমার দিদিমা ও মামাদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। আমি সৌভাগ্যবান। এতে নিশ্চিতভাবেই তাঁদেরও উপকার হয়েছে। স্নায়ুবিজ্ঞানীরা মনে করেন, গল্প বলার মাধ্যমে আমাদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন কোষ জেগে ওঠে। এবং অনেক ক্ষেত্রেই শ্রোতা গল্পটিকে নিজের অভিজ্ঞতা, নিজের ভাবনা দিয়ে একেবারে নিজের অংশ বানিয়ে নেয়। মানে, একেবারে মন- বাক্সের ভেতরের খোপে গল্পটি অবলীলায় ঢুকে যায়। আমরা যখন গল্প বলি আর শুনি তখন আমাদের মস্তিষ্ক থেকে ডোপামিন, অক্সিটোসিনের মতো রাসায়নিক নির্গত হয়। ডোপামিন আমাদের কাজ করার ইচ্ছাশক্তি বাড়িয়ে তোলে। আমাদের করে আরও মনোযোগী। অন্য দিকে অক্সিটোসিনের মতো রাসায়নিক করে তোলে আরও সংবেদনশীল, আরও সহমর্মী। অর্থাৎ গল্পটির সঙ্গে শ্রোতা খুব সহজেই একাত্ম হয়ে যায় এবং ব্যক্তিগতভাবে জড়িয়ে পড়ে গল্পের ঘটনাগুলোর সঙ্গে। যে শিশুর জীবনে গল্প শোনানোর কেউ নেই সে অভাগা। আর যে মা বাবা তাঁদের ছেলেমেয়েকে গল্প না পড়ে শুধু পড়ার বই পড়তে বলেন, তাঁরা অজান্তেই নিজেদের ভবিষ্যতকে বৃদ্ধাশ্রমের দিকে ঠেলে দেন।
ছোটোবেলায় মামাবাড়ির উঠোনে মেজমামা, ছোটোমামা, বাবলুমামারা গোল্লাছুট কিম্বা দাড়িয়াবান্দা খেলতো, আমার বয়স তখন বছর তিনেক। তখন একদিন আকাশে উড়োজাহাজ দেখে চেঁচিয়ে বলেছিলাম –পেইন, পেইন! ছোটোমামা আমাকে বলেছিল, পেইন মানে ব্যথা, আর এইটা এরোপ্লেন – এ ই আর ও পি এল এ এন ই – এরোপ্লেন। এভাবে শেখা এই ‘এরোপ্লেন’ আর ‘পেইন’ ই আমার শেখা আদি ইংরেজি শব্দ। পরবর্তী জীবনে বিমানবাহিনিতে ২০ বছর চাকরির পেছনে ওই প্রথম শেখা শব্দ দু’টির কোনও ভূমিকা আছে কিনা জানি না। তবে অনুবাদক হওয়ার পেছনে যে ঘটনা দায়ী সেটা অবশ্যই বিমানবাহিনীতে যোগ দেওয়া, আর ত্রিপুরায় বাংলা মাধ্যমের ছাত্র হিসেবে বড়ো হওয়ায়, ভাঙা ভাঙা ইংরেজি বলতে পারলেও হিন্দি একদম বলতে না পারা, এমনকি সেখানে গিয়ে প্রমিত উচ্চারণে বাংলাটাও না বলতে পারার জন্যে আমার উচ্চারণ নিয়ে বাঙালি বন্ধুদের হাসাহাসি আমার মধ্যে একটা জেদ তৈরি করে দেয়। আমি বাঙ্গালিদের সঙ্গে কম মিশে অন্য ভাষাভাষী ট্রেইনিদের সঙ্গে বেশি মিশতাম, নিবিড়ভাবে ওদের উচ্চারণভঙ্গী লক্ষ্য করতাম। ওদের গালিগুলো শিখতাম। সবার আগে আমি ভারতের সব ভাষার গালি শিখেছি। কাজেই প্রথম শেখা শব্দ ‘পেইন’ , ‘এরোপ্লেন” এর ট্রেনিং সেন্টারে পশ্চিমবঙ্গের ছেলেদের হাসিঠাট্টাই আমার প্রধান প্রেরণা। যে কোনও ভাবে ভাষার ক্ষেত্রে তাঁদেরকে অতিক্রম করাই ছিল আমার মূল উদ্দেশ্য।
২ তৃষ্ণা – আমার পরের প্রশ্ন এই যে পরিবার ছাড়া কে বা কারা আপনাকে অনুবাদ করতে সবচেয়ে উৎসাহ দিয়েছেন ?
পাঞ্জাবি সাহিত্য আমাদের দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ সাহিত্য,সে ভাষায় অনেক মহান লেখক আছেন। আপনার সবচেয়ে প্রিয় সাহিত্যিক কে এবং কেন তিনি প্রিয়? এখনো পর্যন্ত কাদের কাদের লেখা অনুবাদ করেছেন?
শ্যামল ঃ পরিবারের কেউ অনুবাদে উৎসাহ দেয়নি। সেরকম প্রেক্ষিতই তৈরি হয়নি চাকরিসূত্রে বাইরে গিয়ে অন্যান্য অনেক ভাষা শিখেছি ঠিকই, কিন্তু সেই জ্ঞান দিয়ে কোনওমতে সেসব ভাষার মানুষের সঙ্গে ভাবের আদানপ্রদান করতে পারলেও, অনুবাদ করার কথা মাথায় আসেনি। এই চিন্তা প্রথম আমার মাথায় ঢোকান কবি সন্তোষ রায় ও রামেশ্বর ভট্টাচার্য ১৯৮৩ সালে, এবং সেটা পোক্ত করেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর সূত্রে পরিচয় হওয়া ‘অনুবাদ পত্রিকার সম্পাদক বৈশম্পায়ন ঘোষাল। তখন আমি এয়ারফোর্সে চাকরি পেয়েছি। প্রথমবার ছুটিতে বাড়ি গিয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত আমার গল্পগুলি একটা ফাইলে ভরি।রামনগর আট নম্বর রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে প্রগতি রোডের মুখে সুনীতি প্রেসে একজন ছুঁচলো দাড়িওয়ালা ৩০-৩৫ বছর বয়সী মানুষকে দেখতে পেয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, ওখানে বই ছাপানো হয় কিনা?
ভদ্রলোক বলেন, হয়, কিসের বই?
আমি বলি, গল্পের বই, আমার নিজের লেখা গল্প, নানা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
ভদ্রলোক সাগ্রহে বলেন, দেখি!
আমি ফাইল খুলে একটার পর একটা গল্প দেখাতে থাকি। ভদ্রলোক বলেন, রেখে যাও, পড়ে দেখি!
আমি ইতস্ততঃ করে বলি, আমি এখানে বসি, আপনি পড়েন, আসলে আমার কাছে কোনও কপি নেই তো!
আমার দ্বিধা দেখে ভদ্রলোক হেসে ফেলেন। আমাকে বসতে বলেন। তখনই একজন লম্বা আর দুজন মাঝারি উচ্চতার মানুষ সেখানে এসে উপস্থিত হন। ভদ্রলোক তাঁদেরকে বেঞ্চে বসতে বলে আমাকে একটা গল্প পড়ে শোনাতে বলেন। আমি তাঁদেরকে ইমপ্রেস করতে রাজ্যভিত্তিক প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরষ্কার পাওয়া ‘সোনার ধ্বস’ গল্পটি পড়ে শোনালাম। পড়া শেষ করতেই লম্বা লোকটি ও আরেক ফর্সা ভদ্রলোক সমস্বরে বলে উঠলেন, বাহ!
দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক তখন অন্যদের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন। ওরা ছিলেন কবি সন্তোষ রায়, কৃত্তিবাস চক্রবর্তী আর রামেশ্বর ভট্টাচার্য। আর তিনি নিজের পরিচয় দিলেন – নকুল রায়। নকুলদা আমাকে আরেকটি গল্প পড়ে শোনাতে বললেন, তারপর আরেকটি। এভাবে পরপর সাতটি গল্প পড়ে শোনানোর পর নকুলদা বললেন, ধুস, কোনটাই গল্প হয়নি, সব কাহিনি, কাহিনি….!
আমি শুনে হাঁ করে গেলাম। আমি জানতাম, ছোট কাহিনিকে গল্প বলে আর বড়ো কাহিনিকে উপন্যাস! আর এই ভদ্রলোক বলছেন, এগুলি গল্প হয়নি, কাহিনি হয়েছে!
রামেশ্বরদা আমাকে বললেন, তোমাকে অনেক পড়তে হবে, আধুনিক সাহিত্য পড়ো। তারপর বই প্রকাশের কথা ভেবো।
সন্তোষদা বললেন, এখানে নকুলদা ছাড়া আমাদের কারও কোনও বই এখনও বেরোয় নি।
কৃত্তিবাসদা মাথা নেড়ে বললেন, পড়তে হবে ভাই, পড়তে হবে!
আমি মনে মনে ভাবি, বৃথাই এতটা সময় নষ্ট করলাম! তখন আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে। আমি পত্রিকাগুলো ফাইলে পুরে বাড়ি ফেরার কথা ভাবি।
তখনই নকুলদা বললেন, আমি কিন্তু বলিনি যে বই বের করো না! প্রেসের এই চেয়ারে বসে একথা আমি বলতেই পারিনা। আচ্ছা, তোমরা বলো শ্যামলের এই গল্পগুলোতে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য কী?
রামেশ্বরদা বলেন, ঘিলুর গন্ধ নেই, অসহায়, দরিদ্র, নিপীড়িত মানুষের জন্য দরদ আছে!
তাঁর জবাবের অর্ধেকটা বুঝে কিছুটা ভালো লাগে। কিন্তু ঘিলুর গন্ধ নেই কথাটা বুঝতে পারি না।
সন্তোষদা বলেন, ঠিক বলেছেন রামেশ্বর। এই অল্পবয়সে সে যতটাই দেখেছে ও পড়েছে ও বুঝেছে, তার চাইতে বেশি করে বলার প্রবণতা রয়েছে!
কৃত্তিবাসদা বলেন, বেশি করেই আছে, বাক্যগঠনে নিজস্বতা আছে!
নকুলদা তখন কত কপি ছাপা হলে কতটাকা খরচ হবে, ইত্যাদি বললেন। আমি ভেবে বললাম, তিনশো কপি করাবো, কিন্তু সাতদিনের মধ্যে চাই। দশদিন পরেই আমার কর্মস্থলে ফিরে যাওয়া! নকুলদা তখনই একটি রসিদে সমস্ত হিসেব ও ডেলিভারির তারিখ লিখে নিচে নিজে সই করলেন, আমার সই নিলেন, রামেশ্বরদা, সন্তোষদা আর কৃত্তিবাসদার সইও নিলেন। আর তক্ষুনি কম্পোজিটরকে ফাইলটা ধরিয়ে দিয়ে বললেন, আর্জেন্ট!
তারপর বাড়ি ফেরার পথে আট নম্বর পথ ধরে আমার সঙ্গে হেঁটে হেঁটে ফিরলেন সন্তোষদা ও রামেশ্বরদা। পরবর্তী সাতদিন আমার জীবনে লেখক হয়ে ওঠার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এই কয়েকজন অগ্রজ কবি। পরদিন থেকেই তাঁদের পাশাপাশি কবি নকুল দাশ, মাধব বণিক, শুভেশ চৌধুরী, সুবিনয় রায়রাও নানা আড্ডায় যোগ দেন। আমি তাঁদের আড্ডায় বসে জানতে পারি যে, তাঁরা প্রত্যেকেই গ্রুপ সেঞ্চুরি সাহিত্য গোষ্ঠীর সদস্য। তাঁরা মিলেমিশে দ্রুত আমার বইয়ের প্রুফ দেখে দেন। দেখতে দেখতে গল্পগুলির নানা দিক নিয়ে আলোচনা সমালোচনা করেন। আর পড়া হয় অসংখ্য কবিতা। তাঁদের লেখা কবিতা, ‘ধ্বনিপ্রান্তর’ ও ‘পূর্বমেঘ’ পত্রিকায় প্রকাশের জন্য আসা দীনেশ দাস, মণিভূষণ ভট্টাচার্য, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শক্তিপদ ব্রহ্মচারী, তুষার রায়, একরাম আলি, দেবী রায়, নবারুণ ভট্টাচার্য, নির্মল হালদারদের কবিতা। এই আড্ডা আমার সমগ্র অস্তিত্বে এক অসাধারণ অনুরণন সৃষ্টি করে। আমার মূল্যবান ছুটির দিনগুলি কোনও আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে না গিয়ে আমি তাঁদের সঙ্গে আড্ডাতে মেতে থাকি। আর প্রতিদিন দু’বেলা বাড়ি ফেরার সময় রামেশ্বরদা আর সন্তোষদার সান্নিধ্য আমাদের ঋদ্ধ করে। আর তারপর ৬ষ্ঠ দিনেই আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘চিলতে দাগ’ প্রকাশিত হয়। লিনো কেটে প্রচ্ছদ এঁকেছেন নকুলদা স্বয়ং। পেছনের মলাটে তিনিই একটি ছোটো ভূমিকা লিখে দেন। উপরোক্ত কবিরা কেউ তখনও চাকরিটাকরি পাননি। প্রতিদিনের আড্ডায় একবার চা আমি খাওয়াতাম, আরেকবার সবাই মিলে চাঁদা দিয়ে চা আনাতেন। কিন্তু দু’ টাকা দামের আমার সেই বইটি প্রত্যেকে সেদিন কিনে নিয়েছিলেন। আমি গিয়ে সবার জন্য রসোগোল্লা কিনে আনলে প্রত্যেকে খুব খুশি হয়ে খেয়ে আমাকে মানবদরদী লেখক হওয়ার আশীর্বাদ করলেন। তারপর চাঁদা তুলে সেদিন চায়ের সঙ্গে সিঙ্গারা এসেছিল। সেসব স্মৃতি আমি আজও ভুলিনি। দু’দিন পর আমি কর্মস্থলে ফিরে যাই। কিন্তু সঙ্গে নিয়ে যাই অনেক ইন্ধন। এর মধ্যে সবচাইতে বড়ো ইন্ধন ছিলো আমি বিশ্বসাহিত্যের কী কী বই পড়বো, ভারতীয় সাহিত্যের কী কী বই পড়বো – তাঁর একটা বিশাল তালিকা, তালিকার প্রথম দিকটা নকুলদার হাতে লেখা, আর বাকিটা রামেশ্বরদার হাতে লেখা। ইনপুট দিয়েছেন বাকি সবাই। আমিও পরবর্তী সাত আট বছর ধরে কিছু বই কিনে, আর বাকিগুলো ভারতের নানা প্রান্তের বিভিন্ন গ্রন্থাগার থেকে সংগ্রহ করে পড়ি। ক্লাশ এইট থেকে নেহরু চিলড্রেন্স লাইব্রেরির সদস্য থাকায় বাংলা শিশুকিশোর সাহিত্য ও কিছু বিদেশি কিশোর সাহিত্য আমার আগেই পড়া ছিল। কিন্তু এই তালিকা আমার লেখক হয়ে ওঠার পথে এক বিরাট সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আর এই কবিরা হয়ে ওঠেন আমার পরমাত্মীয়। নকুলদা আমার হাতে তাঁর পরিচিত বিখ্যাত লেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের জন্য চিঠি লিখে দেন। তাঁর সঙ্গে ‘আজকাল’ পত্রিকা অফিসে দেখা করে আমার সদ্যপ্রকাশিত বই ও নকুলদার একটি বইয়ের দুই কপি করে দিয়ে যেতে বলেন। এই বই দিতে গিয়ে সেই ১৯ বছর বয়সে আমি সন্দীপনদার ফিচলেমির শিকার হয়েছিলাম। যাইহোক, সেটা অন্য প্রসঙ্গ। সেদিন সন্দীপনদাই আমাকে কলেজ স্ট্রীট কফি হাউসে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন অনুবাদ পত্রিকার সম্পাদক বৈশম্পায়ণ ঘোষালের সঙ্গে। ফলস্বরূপ পরের বছর ‘অনুবাদ পত্রিকা’য় ছাপা হল রাজস্থানী কবি যুগল পরিহারের দুটি কবিতা ‘অঙ্গুঠা কাটিয়োড়া হাত’ ও ‘ক্যাকটাস’। তখন থেকে অনুবাদ শুরু।
৩ তৃষ্ণা এই যে এত অনুবাদ করেছেন, এর পেছনে কি কোন বিশেষ পরিকল্পনা কাজ করেছে? মানে বলতে চাইছি, কেউ ঠিক করতে পারেন আমি শুধু নারীদের সাহিত্য অনুবাদ করব, বা দলিত সাহিত্য অনুবাদ করব, কারণ শুনতে পাই এর জন্য প্রকাশক পাওয়া একটু সহজ। তো আপনি কি বাজারে চলবে এমন কোন বিষয় বা লেখক অনুবাদের জন্যে এযাবত বেছেছেন? নাকি সেসব না ভেবে আপনার বিচারে যাঁরা মহান লেখক, তাঁদের লেখাই নির্বাচন করেছেন, যাঁদের অনুবাদ বাঙালি পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া উচিত মনে হয়েছে? মোট কথা জানতে চাইছি, আপনার লেখক নির্বাচনের মাপকাঠি কী? কর্তার সিং দুগগলকে বা মোহন ভাণ্ডারীকে কেন বাছলেন? পাঞ্জাবি ছাড়াও আপনি রাজস্থানী, ও ডোগরী থেকেও অনুবাদ করেন। সেই শুরুটাই বা কী করে হল?
শ্যামল ঃ এতসব ভেবে অনুবাদ করিনা। ওই যে নকুলদা এবং রামেশ্বরদার লিখে দেওয়া তালিকা, সেসব লেখকদের বই পড়তে পড়তে অনেকের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ পরিচয় হয়। ক্রমে তালিকাও আরও দীর্ঘ হতে থাকে। পড়তে থাকি। বিশেষ করে যেখানে যেখানে আমার পোস্টিং ছিল, রাজস্থান, পাঞ্জাব,জম্মু ও কাশ্মীর – সেখানকার সাহিত্যিকদের লেখা বইগুলি, তাঁদের ভাষার ক্লাসিকগুলি। এখন পর্যন্ত যেসব ভাষা শিখেছি, তাঁদের অনেক পত্রিকার আমি নিয়মিত গ্রাহক। সেগুলি পড়ার মাধ্যমে আমার মতে যাঁরা মহান লেখক, তাঁদের লেখাই অনুবাদের জন্য নির্বাচন করেছি। বাংলা থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদের ক্ষেত্রেও আমি সেরা লেখাগুলিকেই বেছেছি। সেজন্যে নিজের লেখা বা সমকালীন কারও লেখা অনুবাদ না করে, অগ্রজদের লেখাই অনুবাদ করেছি।
৪ তৃষ্ণা- এযাবত ঠিক কতগুলি অনুবাদ করেছেন? সবগুলিই কি প্রকাশিত হয়েছে?
শ্যামল ঃ এটা বলা মুশকিল। আমি গোছানো মানুষ নই। তার ওপর যাযাবরের জীবন। ১০-১২ বছর আগে আমাকে নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অধ্যাপক তন্ময় বীর ও তাঁর দুই সহযোগী লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি থেকে এমন অনেক মৌলিক লেখা ও অনুবাদ খুঁজে বের করেছেন, যেগুলি আমি ভুলে গেছিলাম। তেমনি বিতস্তা ঘোষাল আমার অনেক অনুবাদকর্মের হদিশ দিয়েছেন। আবার ‘অনুবাদ পত্রিকা’র অনেক সংখ্যা হারিয়ে গেছে বা নষ্ট হয়ে গেছে বলে সেগুলি উদ্ধার করা যায়নি। বিভিন্ন ভাষা থেকে আনুমানিক ১৫০-১৬০টি গল্প, ২০০-২২৫টি কবিতা, তিনটি উপন্যাস , দুটি নাটক, তিনটি জীবনীগ্রন্থ এবং কর্তার সিংহ দুজ্ঞলের আত্মজীবনী অনুবাদ করেছি। হ্যাঁ, অপ্রকাশিত কিছু নেই। তবে সবকটি গল্প ও কবিতা গ্রন্থিত হয়নি।
৫ তৃষ্ণা- আপনার কোন অনুবাদটির জন্যে লোকে আপনাকে প্রথম চিনেছে এবং কোন অনুবাদটি সবথেকে বাণিজ্য সফল?
শ্যামল ঃ চিনেছে ‘মুখাবয়ব’ পত্রিকার বিশেষ ‘সমকালীন পাঞ্জাবী গল্প’ সংখ্যা। ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত। ৪২টি পাঞ্জাবী গল্পের সংকলন। এর জন্য আমি / আমরা (মুখাবয়ব) জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে বেশ কিছু সম্মান পাই। তাছাড়া আমরা এর জন্য ‘কলিকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি’ পুরষ্কারও পাই। পরে এতে আরও একটি গল্প জুড়ে ত্রিপুরার অক্ষর পাবলিকেশন্স বই হিসেবে ছাপে। এর কয়েকটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। এটা হল প্রথম চেনার গল্প। তারপর যে বইটি আমাকে সাহিত্য অকাদেমি পুরষ্কার এনে দেয়, সেটি আমার অনূদিত পাঞ্জাবি লেখক মোহন ভাণ্ডারীর গল্পগ্রন্থ ‘মুন দী আঁখ’ এর বঙ্গানুবাদ ‘কুমারী হরিণীর চোখ’। তবে সবচাইতে বাণিজ্য সফল হল এনবিটি প্রকাশিত ‘পঞ্চতন্ত্রের গল্প’।
৬ তৃষ্ণা- একটা কথা আছে যে Translation is nothing but a negotiation. পাঞ্জাবি থেকে বাংলা অনুবাদে কি কথাটা খাটে? আপনি কি আক্ষরিক অনুবাদেই বিশ্বাসী? না অনুসৃজনে? আপনার অনুবাদের প্রসেসটা ঠিক কী রকম? প্রথমে আক্ষরিক অনুবাদ, তারপর ভাষাটিকে সুন্দর করার জন্যে অল্প হেরফের, নাকি অন্য কিছু?
শ্যামলঃ মূল লেখার চরিত্র অনুযায়ী অনুবাদের চরিত্র বদলায়। ভারতীয় ভাষার গদ্যের অনুবাদে আক্ষরিক অনুবাদ ও তারপর ভাষা সুন্দর করার জন্য সম্পাদনাই অধিক প্রযোজ্য। ভারতীয় ভাষাগুলির সাংস্কৃতিক প্রেক্ষিতে মিল থাকায় আমরা এই সুবিধা পাই। কিন্তু কবিতা ও নাটকের ক্ষেত্রে অনেক বেশি অনুসৃজন করতে হয়। কোথাও কোথাও উভয় পদ্ধতির মিশ্রণও প্রযোজ্য।
৭ তৃষ্ণা- বাংলা থেকে পাঞ্জাবি অনুবাদও কি করেন? যদি না করেন তবে কেন করেন না? এটাও তো দরকার।
শ্যামলঃ ভাষণ ইত্যাদি অনুবাদ করলেও বাংলা থেকে পাঞ্জাবি সাহিত্যের অনুবাদ করিনি। কারণ এক্ষেত্রে গন্তব্য ভাষায় সাহিত্য অনুবাদের মতো দক্ষতা আমার আছে কিনা তা নিয়ে নিজের মনেই সন্দেহ আছে। বাংলা থেকে হিন্দি ও ইংরেজিতে বেশ কিছু গল্প ও কবিতা অনুবাদ করেছি।
৮ তৃষ্ণা- আপনি ট্রান্সলেটর্স ব্লক কে কীভাবে ডিল করেন? এমন কোন ড্রিম প্রজেক্ট আছে যা আপনি অনেক দিন ধরে করতে চাইছেন?
শ্যামলঃ পড়াশুনার মাধ্যমে। হ্যাঁ, গ্রন্থ সাহিব -এর সুললিত ও সটীক বাংলা অনুবাদ।
৯ তৃষ্ণা- আপনি ভারতীয় সাহিত্য থেকে অনুবাদ করেন। আপনার কি মনে হয়, এই বহুভাষিক দেশে অনুবাদের ভূমিকা অনেকখানি? তার জন্যে কি যথেষ্ট অনুবাদক আছেন? অনুবাদকদের সম্মান ও সাম্মানিক এবং অন্যান্য পরিকাঠামোর ঠিক কতটা অভাব আছে? কীভাবে তা উন্নত করা যায়?
শ্যামলঃ এদেশের বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যকে সুদৃঢ় করতে ও সমস্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যগুলির সংরক্ষণে অনুবাদের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু তার জন্যে যথেষ্ট অনুবাদক নেই। কারণ, অনুবাদকদের সম্মান ও সাম্মানিক এবং অন্যান্য পরিকাঠামোর অভাব সর্বত্র। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত অনুবাদের পাঠ বিরল। এক্ষেত্রে অনেক বেশি সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।
১০ তৃষ্ণা- চাকরির পাশাপাশি অনুবাদ করেছেন, এখন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজের সংগে যুক্ত। পাশাপাশি অনুবাদ কতখানি কঠিন ?
শ্যামলঃ খুব কঠিন। তবে এটি আমার ক্ষেত্রে অন্যভাষার সাহিত্যপাঠের অঙ্গ হয়ে ওঠায়, কখনও বিরক্তির কারণ হয়নি। তবে একটু বেশি সময় লাগে।
১১ তৃষ্ণা- আপনার কোন কোন অনুবাদ সম্মানিত হয়েছে এখনো পর্যন্ত?
শ্যামলঃ ওই একটাই, মোহন ভাণ্ডারীর গল্পগ্রন্থ ‘মুন দী আঁখ’ এর বঙ্গানুবাদ ‘কুমারী হরিণীর চোখ’। পরে ‘ভাষা সংসদ’ -এর ‘সোনালী ঘোষাল সারস্বত সম্মান ২০২৪’ এর ‘বনানী’ সাহিত্যপত্র প্রদত্ত ‘বিষ্ণুপদ শাণ্ডিল্য আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মিলন-২০২৪ অনুবাদ পুরস্কার’ পেয়েছি সামগ্রিক অনুবাদকর্মের জন্য।
১২ তৃষ্ণা- আপনার অনুবাদক জীবনে অনেক অসম্মান প্রত্যাখ্যান আছে, অসৎ প্রকাশক আছে, আবার নিশ্চয় এমন কিছু ঘটনা আছে, যা আজো আপনার কাজের স্পৃহা জাগিয়ে রেখেছে? সেইরকম কিছু স্মরণীয় ঘটনা, পাঠকের ভালবাসার কথা জানতে চাই।
শ্যামলঃ লেখক জীবনে থাকলেও অনুবাদক জীবনে তেমন কোনও অসম্মান প্রত্যাখ্যান নেই, এক্ষেত্রে অসৎ প্রকাশকেরও খপ্পরেও পড়িনি, কারণ অক্ষর পাবলিকেশন্স ছাড়া আমার সব অনূদিত বইয়ের প্রকাশক সাহিত্য অকাদেমি, এনবিটি, সিআইআইএল, কুয়েম্পু ট্রাস্ট ইত্যাদি সংস্থা। বরং কিছু কিছু পাঠকের ভালবাসা অবশ্যই পেয়েছি। তাঁদের কল্যাণে ভারতের নানা প্রান্তে অনেকের বাড়িতে আমার জন্য অবারিত দ্বার, অনেক কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুবাদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বক্তব্য রাখার সৌভাগ্য হয়েছে। ২০১০ সালে বেজিং আন্তর্জাতিক বইমেলায় এনবিটি আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে ঘুরে আসার সৌভাগ্য হয়েছে।
১৩ তৃষ্ণা- আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ এতটা সময় আমাকে দেবার জন্যে। শেষে জানতে চাই আপনার ঠিক কতগুলি অনুবাদের বই আসছে সামনে এবং তাদের প্রকাশক কারা?
শ্যামলঃ আপনি নিজে অত্যন্ত সাবলীল অনুবাদ করেন, তেমনি এই সময়ের একজন নামী সৃষ্টিশীল কবি ও গদ্যকার। আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে আমার ভালই লাগে। সাহিত্য অকাদেমি থেকে ভারতীয় শিশুসাহিত্যের একটি গল্পসংকলন আর এনবিটি থেকে ‘গুরুনানকের বাণী ‘ প্রকাশিত হওয়ার কথা।
১৪ তৃষ্ণা- তরুণ অনুবাদকদের জন্যে আপনি কিছু বলতে চান? কীভাবে তারা এগোতে পারে অনুবাদকে পেশা করে?
শ্যামলঃ তরুণদের সৌভাগ্য যে আজ সময় বদলেছে। অনুবাদের সুযোগও বেড়েছে। অনুবাদ সহায়ক অনেক নতুন প্রযুক্তি বাজারে এসেছে। প্রয়োজন শুধু ভালভাবে উৎস ও গন্তব্য ভাষার সাহিত্য বেশি করে পড়া, সেই ভাষাগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে মেশা, তাঁদের সংস্কৃতিকে ভালভাবে জানা। যে কোনও প্রযুক্তি থেকে বেশি করে এই জানা-ই তাদের সহায়ক হবে।


