এক দৃষ্টিহীন পেঁচা
The Blind Owl
কাহিনিকার: সাদেঘ হেদায়েত
বঙ্গানুবাদ: সুপর্ণা বোস
এক দৃষ্টিহীন পেঁচা
পঞ্চবিংশতি পর্ব
সেই রাতের অন্ধকারে যখন তাকে দেখা সম্ভব হচ্ছিল না ততক্ষণে হয়ত আমি ঘটনাটা ঘটিয়েই ফেলতাম যদি না সেই ভয়ংকর হাসির শব্দটা শুনতে পেতাম।পরের দিন সেই বেশ্যার চোখের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারছিলাম না আমি।যেন সেই চোখ আমাকে ভর্ৎসনা করছে।যাইহোক মেঝেতে পড়ে থাকা একটি কাপড় তুলে নিয়ে তড়িঘড়ি বেরিয়ে এলাম সেই ঘর থেকে।ছুরিটা ছুঁড়ে ফেলে দিলাম ছাদে। সেই লম্বা হাতলের ছুরিটা যেটা আমার মাথায় খুন করার ভাবনার জন্ম দিয়েছিল।কসাইদের ব্যবহারের সেই লম্বা হাতলের ছুরিটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যেন নিজেই নিজের থেকে মুক্তি পেলাম।
ঘরে ফিরে এসে দেখলাম হাতে করে নিয়ে এসেছি সেই বেশ্যারই পরণের একখানি পোশাক।তার শরীর আঁকড়ে থাকা একখানি ময়লা জামা।একটা নরম ভারতীয় রেশমের পোশাক।যেটাতে তার গায়ের গন্ধ লেগে ছিল।আর ছিল একটা মৃদু চাঁপাফুলের সৌরভ।তার শরীরের উষ্ণতার জন্যেই হয়ত এখনো এই সৌরভ ভাসছে!তার অস্তিত্বটুকুর কারনেই আমি জামাটা নাকের কাছে নিয়ে সুগন্ধ নিলাম।তারপর দুপায়ের ফাঁকে রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লাম।এতো আরামের ঘুম বোধহয় আমি আগে কখনো ঘুমাইনি।
পরদিন ভোরবেলা বউয়ের চিৎকারে ঘুম ভাঙল।সে তার খোয়া যাওয়া পোশাক নিয়ে তুমুল নাটক জুড়েছিল।বারবার বলছিল, ‘জামাটা একেবারে নতুন ছিল!’ যদিও আমি দেখেছিলাম সে জামার হাতার কাছটা ছেঁড়া ছিল।এমনকি সে জামায় রক্তের দাগ পর্যন্ত দেখেছি।সে জামাটাতো ফেলে দেওয়ারও অধম।আমার মনে হচ্ছিল, তাহলে কি আমার বউয়ের একটা জামার উপরেও আমার অধিকার থাকতে নেই?
ধাইমা যখন আমার জন্যে অখাদ্য দুধ-মধু আর রুটি নিয়ে এলো তখন দেখি সেই জলখাবারের ট্রের একপাশে সেই হাতলওলা ছুরিটা রাখা আছে।সে নাকি সেই ছুরিটা ওই কাবাড়িওলার কাছ থেকে নিয়ে এসেছে।ধাইমা তার চোখের ইশারায় আমাকে আমার বউয়ের ঘরের দিকে দেখিয়ে বলল,’এটা কাজে লাগতে পারে!’ আমি ছুরিটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলাম।এটা সেই ছুরিটাই।ধাইমা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘মেয়ে বলে, ভোরবেলায় আমি নাকি তার পোশাক চুরি করেছি!’
ওমা!সত্যি নাকি?
‘নয়তো কি আমি মিথ্যে বলছি?গতকাল তোমার বউ রক্তের ছিটে দেখেছে…আমরা সকলেই জানি বাচ্ছাটা…ওর বক্তব্য হল…স্নানঘরেই নাকি এমনটা হয়েছে…
একদিন রাতে আমি ওর পিঠ মালিশ করছি, দেখি দুহাতের তাগার কাছে কালশিটে পড়ে আছে।আমাকে দেখিয়ে বলল, ‘আমি অসময়ে ওই কাবাড়িওলার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম…আর তুমি তো জানোই কে আমার এই হাল করতে পারে…’
আচ্ছা!তুমি কি জানো তোমার বউ অনেকদিন থেকেই পোয়াতি?’
আমি হাসতে হাসতে বললাম, কোনো সন্দেহ নেই বাচ্ছাটা ওই কোরাণ কথকের মতই দেখতে হবে।কারণ বাচ্ছাটা যখন পেটে এসেছিল তখন সে ওই কোরাণ কথকের মুখখানাই ভাবছিল।
সে কথা শুনে ধাইমা ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।এমনধারা উত্তর আশা করেনি বোধহয়।এবার আমি ধীরে সুস্থে উঠে কাঁধটা সামান্য ঝাঁকিয়ে লম্বা হাতলওলা ছুরিটা তুলে নিয়ে মিটসেফে রেখে দিলাম।আমার স্যুভেনিরের বাক্সে রেখে ঢাকনা বন্ধ করে দিলাম।
এই বাচ্ছাটা কখনোই আমার হতে পারে না এটা নিশ্চয়ই ওই কাবাড়িওলাটারই বটে।বিকেলবেলা আমার ঘরের দরজাটা খোলাই ছিল আর ওই বেশ্যার ছোটোভাইটা নিজের নখ চিবোতে চিবোতে আমার ঘরে এসে ঢুকল।ওদের দুজনকে ভাই আর বোন হিসেবে পার্থক্য করাই মুশকিল ওরা এতোটাই একরকম দেখতে।ছেলেটির ছোটো সরু চোখ।সরু মুখ আর ভেজা মাংসল ঠোঁট।নির্জীব বাঁকা চোখ ।অদ্ভুত চোখ।চোখে পড়ার মত উঁচু গাল
খেজুরের রঙের অবিন্যস্ত চুল এবং গম রঙের ত্বক।সে হবহু তার দিদির মতই দেখতে।এমনকি তার শয়তানি স্বভাবের লক্ষণও বহন করছে কিছুটা।তার ভাবলেশহীন তুর্কমেনীয় মুখ।এমন এক বোধহীন মুখাবয়ব যা জীবনের নানাবিধ লড়াইয়ের উপযোগী!এমন এক চেহারা যা টিকে থাকার জন্যে সব কিছুই করতে পারে। মনে হয় এদের জন্যে প্রকৃতি যেন বিশেষ কিছু সতর্কতা অবলম্বন করেছে; মনে হয় এই জুটির পূর্বপুরুষেরা রোদ বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে জীবন কাটিয়েছেন এবং প্রকৃতির বিরূপ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন।আর সেই লড়াই তাঁদের কেবল নির্দিষ্ট কিছু পরিবর্তনসহ শারীরিক গড়ন ও অভিব্যক্তিই দেয়নি, বরং জুগিয়েছে টিকে থাকার অদম্য ক্ষমতা, তীব্র আকাঙ্ক্ষা, লোভ ও খিদে।
আমি তার ঠোঁটের স্বাদ জানি।খানিকটা শশার গোড়ার অংশটার মতই তেতো।সে ঘরে ঢুকেই তার সেই আশ্চর্যান্বিত চোখ তুলে আমার দিকে তাকাল।তারপর বলল,’শাজুন বলছিল তুমি খুব শিগগির মরে যাবে আর আমরা তোমার থেকে মুক্তি পাব!আচ্ছা!মানুষ কিভাবে মরে?’
আমি বললাম, ‘তাকে বোলো, আমি অনেকদিন আগেই মরে গেছি’
সে বলল,’শাজুন বলেছে, “যদি আমি বাচ্ছাটা নষ্ট না করে ফেলি তাহলে এই পুরো বাড়ি আমাদের হবে।”
আমি অনিচ্ছাকৃত হাসিতে ফেটে পড়লাম। সেই উৎকট শুকনো হাসি।সেই হাসি যা শুনলে মানুষের গায়ের রোম খাড়া হয়ে যায়।এ হাসির শব্দ যেন আদৌ আমার নয়।বাচ্চাটা ভয়ে ছুটে পালালো ঘর ছেড়ে।
ঠিক সেই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারলাম কসাই কেন ভেড়ার পায়ের লোমের মধ্যে সেই লম্বা হাতলের ছুরিটা সানন্দে মুছছিল। চর্বিহীন মাংস কেটে ফেলার যে আনন্দ,যেখানে জমাট বাঁধা রক্ত পলির মতো স্তরে স্তরে জমে থাকে, আর ভেড়ার শ্বাসনালি থেকে রক্তমিশ্রিত জল টুপটুপ করে ঝরে পড়ে!সেই আনন্দ। কসাইখানার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা হলুদ কুকুরটিও জানে। মেঝেতে পড়ে থাকা গরুর কাটা মাথার ম্লান, স্থির দৃষ্টিও তা জানত। মৃত্যুর ধুলো জমে থাকা চোখওয়ালা ভেড়ার বিচ্ছিন্ন মাথাগুলিও তা জানত। তারা সবাই দেখেছিল। তারাও জানত!
অবশেষে আমি উপলব্ধি করলাম, আমি যেন এক উপদেবতা হয়ে উঠেছি। মানুষের সব তুচ্ছ, ক্ষুদ্র চাওয়া পাওয়ার ঊর্ধ্বে উঠে গেছি। আমার অন্তরে আমি অনুভব করলাম অনন্তের অবিরাম প্রবাহ। অনন্ত কী? আমার কাছে অনন্ত ছিল সুরেন নদীর তীরে সেই বেশ্যার সঙ্গে লুকোচুরি খেলা। তার কোলে মাথা রেখে এক মুহূর্তের জন্য চোখ বুজে থাকা।
হঠাৎ মনে হলো, আমি নিজের সঙ্গেই কথা বলছি। কিন্তু কী অদ্ভুতভাবে! আমি নিজেকে কিছু বলতে চাইছিলাম, অথচ আমার ঠোঁট এত ভারী হয়ে গিয়েছিল যে নড়ছিল না। স্থির ঠোঁট আর নিঃশব্দ কণ্ঠে আমি নিজের সঙ্গেই কথা বলে চলেছিলাম!
এই ঘর,যা প্রতি মুহূর্তে যেন কবরের মতো আরও সংকীর্ণ, আরও অন্ধকার হয়ে উঠছিল,সেখানে রাত এবং তার বিভীষিকাময় ছায়ারা আমাকে ঘিরে ধরেছিল। ধোঁয়াময় চর্বির প্রদীপের সামনে, আমার ভেড়ার চামড়ার পোশাক, গায়ের চাদর আর গলায় জড়ানো স্কার্ফ পরা ছায়াটি নিঃশব্দে দেয়ালে পড়ে ছিল।
আমার সেই ছায়া যেন আমার বাস্তব অস্তিত্বের চেয়েও গভীর, আরও সত্য। মনে হচ্ছিল, সেই বুড়ো,কাবাড়িওলা, কসাই, ধাইমা, আর আমার বেশ্যা স্ত্রী,সবাই যেন আমারই ছায়া; সেই ছায়ারাই আমাকে বন্দি করে রেখেছে। সেই মুহূর্তে আমি যেন এক পেঁচার মতো দেখতে হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমার আর্তনাদ গলায় আটকে যাচ্ছিল; আমি সেগুলো রক্তের জমাট দলার মতো থুথুর সঙ্গে উগরে দিচ্ছিলাম। হয়তো পেঁচারও এমন কোনো ব্যাধি আছে, যা তাকে আমার মতো ভাবতে বাধ্য করে। দেয়ালে পড়ে থাকা আমার ছায়াটি ঠিক পেঁচার মতো কুঁজো হয়ে বসে মন দিয়ে আমার লেখাগুলো পড়ছিল। নিঃসন্দেহে সে সেগুলো বুঝতে পারছিল; একমাত্র সেইই বুঝতে পারত। আড়চোখে যখন নিজের ছায়ার দিকে তাকালাম, তখন আমি ভয়ে শিউরে উঠলাম।
অন্ধকার রাত, নিস্তব্ধ যেমন অন্ধকার আমার সমগ্র জীবনকে ঘিরে রেখেছে। সেই রাতের ভয়াবহ সব ছায়ামূর্তি কখনও দরজা থেকে, কখনও দেয়াল থেকে, কখনও পর্দার আড়াল থেকে আমাকে ঠাট্টা করছিল। কখনও আমার ঘরটি এতটাই ছোটো হয়ে যেথ যে মনে হতো আমি যেন একটি কফিনের ভেতরে শুয়ে আছি। আমার কপালের দুই পাশ জ্বালা করছিল, হাত পা যেন আর নড়তে চাইছিল না। কালো, জীর্ণ বোঝাবাহী ঘোড়ার পিঠে করে কসাইখানায় নিয়ে যাওয়া পশুর মৃতদেহের মতো এক প্রচণ্ড ভার আমার বুকে চেপে বসেছিল।।


