বিবেক চট্টোপাধ্যায়
তুলনামূলক সাহিত্যের জানালা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ নাটকের নন্দিনী এবং জর্জ বার্নার্ড শ-এর ‘সেন্ট জোয়ান’ নাটকের জোয়ান—বাহ্যিক রূপ ও ঐতিহাসিক পটভূমিতে ভিন্ন হলেও, অন্তরের গূঢ় মনস্তত্ত্বে তারা এক অনন্য মোহনায় এসে মিলেছে।

নন্দিনী যক্ষপুরীর নির্মম বাস্তবতায় পা রেখেছিল তার হৃদয়ের মানুষ রঞ্জনের সন্ধানে, কিন্তু সেখানে এসে যখন সে প্রত্যক্ষ করে যে মানুষের রক্ত ও ঘামে গড়ে ওঠা এক সোনার খনি, যেখানে মানুষ আর মানুষ নেই, কেবল এক একটি সংখ্যায় পরিণত হয়েছে—তখন তার ব্যক্তিকেন্দ্রিক মনস্তত্ত্বে এক বিরাট রূপান্তর ঘটে। যক্ষপুরীর নেপথ্য নায়ক মকররাজ যখন তাকে কেবল এক খণ্ড সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে দেখতে চায়, তখন নন্দিনী নিজের অস্তিত্বের মহিমা ঘোষণা করে রাজাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়: “আমি তোমাকে একটুও ভয় করিনে। তোমার ওই জালের আড়ালে তুমি মানুষ নও, তুমি একটা মস্ত দ্রুত।” তার ব্যক্তিগত প্রেম তখন আর চার দেওয়ালের মোহময় আচ্ছন্নতায় আটকে থাকে না, তা হয়ে ওঠে যক্ষপুরীর সমস্ত শোষিত, অন্ধকারে নিমজ্জিত মানুষের মুক্তির আকুলতা। অন্যদিকে, জোয়ানও গ্রামীণ জীবনের শান্ত, স্নিগ্ধ পরিধিতে নিজের ঘরকন্না নিয়ে সুখে থাকতে পারত, কিন্তু তার মনস্তত্ত্ব চালিত হতো পরাধীন ফ্রান্সের সাধারণ মানুষের কান্নায় আর তীব্র অপমানে। সে তার অন্তরের অলৌকিক ‘ঐশ্বরিক বাণী’ বা ‘ভয়েস’ (Voices)-কে নিজের ব্যক্তিগত অলীক কল্পনা মনে করেনি, বরং তাকে সমগ্র ফরাসি জাতির মুক্তির এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব হিসেবে কাঁধে তুলে নিয়েছিল। চার্চ ও রাজশক্তি যখন তার এই অন্তরের ডাককে উন্মাদনা বলে উড়িয়ে দিতে চায়, তখন জোয়ান তার প্রবল সামস্তিক আত্মবিশ্বাসে গর্জে উঠে রবার্টকে বলে: ” I am not a daredevil…. I am a servant of God. And I am going to the King, and to the French people, to save them.” নিজের নারীত্ব, সংসার বা ব্যক্তিগত জীবনের সমস্ত সম্ভাবনাকে বিসর্জন দিয়ে সে হয়ে উঠেছিল নিপীড়িত সমষ্টির একমাত্র কণ্ঠস্বর।
এই দুই চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক শক্তির উৎস কোনো প্রথাগত রাষ্ট্রনীতি, সামরিক শিক্ষা বা প্রাতিষ্ঠানিক কূটনীতি নয়; তা হলো তাদের ভেতরের এক সংক্রামক, আদিম ও অনাবিল প্রাণশক্তি। যক্ষপুরী হলো এমন এক অন্ধ যান্ত্রিক ব্যবস্থা যা সোনা খননের আদিম লোভে মানুষকে যন্ত্রের পুতুলে পরিণত করে। সেখানে সব কিছু নিয়মের লৌহশৃঙ্খলে বাঁধা, যেখানে নির্মম সর্দারেরা চাবুক চালায় আর গোঁসাইরা ধর্মের আফিম দিয়ে মানুষের চেতনাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখে। এই প্রাণহীন মরুর বুকে নন্দিনী যেন এক পশলা বসন্তের হাওয়া, এক ঝলক চৈত্র-পূর্ণিমার আলো। তার গলার রক্তকরবীর মালা এবং জীবনের সহজ আনন্দ যক্ষপুরীর কৃত্রিমতাকে প্রতিনিয়ত বিদ্ধ করে। সে কোনো রণকৌশল বা বিপ্লবের ইশতেহার নিয়ে আসেনি, কিন্তু তার উপস্থিতির সহজ আলোই বিশু পাগলকে গান ফিরিয়ে দেয়। যক্ষরাজ যখন মৃত সোনার অহংকারে মত্ত, তখন নন্দিনী তাকে প্রকৃতির সজীবতা আর যৌবনের অমল শক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলে: “তোমার এই মরা ধনের তলায় কত কান্নায় পৃথিবী ভিজে আছে তা তুমি জানো না। কিন্তু আমার রঞ্জনের হাতের ছোঁয়ায় এই শুকনো ধুলোও সোনা হয়ে ওঠে, সে খাঁচার সোনা নয় – তা হলো প্রাণের আনন্দ।” ঠিক একইভাবে, জোয়ান যখন ফ্রান্সের হতাশায় ডুবে যাওয়া রাজপুত্রের দরবারে এসে দাঁড়ায়, তখন তার ঝুলিতে কোনো যুদ্ধবিদ্যার সনদ ছিল না, কিন্তু তার ভেতরের অদম্য আত্মবিশ্বাস এবং তীব্র জীবন-প্রবাহ ফরাসি বাহিনীকে এক জাদুকরী শক্তিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। জোয়ানকে লড়াই করতে হয়েছিল দুটি অতি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে—একদিকে সামন্ততান্ত্রিক রাজশক্তি এবং অন্যদিকে ক্যাথলিক চার্চের প্রাচীন গোঁড়ামি। জোয়ান ছিল শ-এর ভাষায় এক ‘ভিজুয়ালাইজার’ বা দূরদর্শী, যার মনস্তত্ত্ব চার্চের মধ্যস্থতা ছাড়াই ঈশ্বরের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে পেরেছিল। রাজদরবারের পণ্ডিত ও অভিজাতরা যখন তাকে অলীক তত্ত্বে বাঁধতে চায়, তখন সে সটান ভাষায় তার সহজাত দর্শনের জানান দেয়: “Minding your own business is like minding your own body; it’s short and small. But minding the kingdom’s business is like minding your soul; it’s long and great.” তার এই উক্তি তৎকালীন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ভিতকে এক চরম মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কা দিয়েছিল।
স্বৈরাচারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এই দুই নারীর প্রতিবাদের ধরণ ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত দৃঢ় এবং আপসহীন। নন্দিনীর প্রতিবাদ প্রথম দিকে কোনো সশস্ত্র সংগ্রাম ছিল না, তা ছিল নান্দনিক ও মনস্তাত্ত্বিক। সে স্বৈরাচারী ব্যবস্থার নেপথ্য নায়ক যক্ষপুরীর রাজাকে ভয় পায় না, বরং তার জানালার জালের কাছে গিয়ে দাঁড়ায় পরম সাহসে। রাজাকে সে বারে বারে মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির সহজ নিয়ম ও প্রেমকে অস্বীকার করে মৃত সোনা জমানোর এই দম্ভ আসলে এক চরম দেউলিয়াত্ব। সে মকররাজকে আহ্বান জানায় অবরুদ্ধ খাঁচা থেকে মুক্ত আকাশে বেরিয়ে আসার জন্য: “আজকে পৌষের গান গাইছে মাঠের মানুষ, তুমি কেন এই অন্ধকারের গুহায় বসে আছ? ভেঙে ফেলো এই খাঁচা, বাইরে এসে দেখো মানুষ কত সুন্দর।” কিন্তু নাটকের শেষাংশে যখন সর্দারেরা কাপট্যের আশ্রয় নিয়ে রঞ্জনকে হত্যা করে এবং কিশোরের রক্ত ঝরায়, তখন নন্দিনীর সেই কোমল মনস্তত্ত্ব এক রুদ্র ও প্রলয়ঙ্করী রূপ ধারণ করে। সে সমস্ত ভয়কে জয় করে সশরীরে মরণ-যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং খোদ রাজাকে বাধ্য করে নিজের তৈরি জালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে। অন্যদিকে, জোয়ানের প্রতিরোধ ছিল প্রথম থেকেই অত্যন্ত প্রত্যক্ষ, রণমুখী ও সক্রিয়। সে পুরুষালি পোশাক পরিধান করে, তরবারি হাতে যুদ্ধক্ষেত্রে পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সেনাবাহিনীকে নেতৃত্ব দেয়। স্বৈরাচারী ইংরেজ আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে তার লড়াই ছিল যেমন সামরিক, তেমনি চার্চের বিচারালয়ে দাঁড়িয়ে ইনকুইজিশন (Inquisition)-এর মুখোমুখি হয়ে তার লড়াই ছিল তীব্র মনস্তাত্ত্বিক। চার্চ যখন তাকে ডাইনি বা ধর্মদ্রোহী বলে আজীবন অন্ধকূপে বন্দি রাখার নিদান দেয় এবং পরে আগুনে পুড়িয়ে মারার ভয় দেখায়, তখনও সে তার অন্তরের সত্য থেকে এক চুলও নড়েনি। লোহার শৃঙ্খলে বন্দি হয়ে ধুঁকে ধুঁকে বাঁচার চেয়ে সে আগুনের লেলিহান শিখায় মৃত্যুকে বেছে নিয়ে বিচারকদের উদ্দেশ্যে তীব্র ধিক্কার দিয়ে বলে: “Bread has no savour for me, water no taste, if I may not go out where the fields are, and look at the sky… I could let the fire have me before I would take that kind of life.” এই অনমনীয় উচ্চারণ স্বৈরাচারী ধর্মীয় ও political ব্যবস্থার মুখে এক পরম চপেটাঘাত।
এই দুই চরিত্রের মনস্তত্ত্বে এমন এক পবিত্রতা ও অলৌকিক সৌন্দর্য রয়েছে যা তাদের চারপাশের পুরুষতান্ত্রিক ও হিংস্র সমাজকে আমূল বদলে দিতে সাহায্য করে। নন্দিনী যক্ষপুরীর পুরুষদের কামনার বস্তু নয়, বরং এক পরম শুদ্ধতার প্রতীক। তার সংস্পর্শে এসে বিশু পাগল তার জীবনের হারিয়ে যাওয়া গান খুঁজে পায়, কিশোর তার সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিতে পেরে ধন্য হয়, এমনকি অধ্যাপকও তার জটিল শাস্ত্র ফেলে প্রকৃতির সহজ সত্যকে বুঝতে শুরু করে। সবচেয়ে বড় রূপান্তর ঘটে মকররাজের; নন্দিনীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবই রাজা বুঝতে পারে যে সে ক্ষমতার যে চূড়ায় বসে আছে, তা আসলে এক অন্ধকার খাঁচা। জোয়ানের ক্ষেত্রেও আমরা দেখি, যখন সে অলিয়ঁসের যুদ্ধে যায়, তখন কট্টর ও নিষ্ঠুর সেনারাও তার পবিত্রতা দেখে অনুপ্রাণিত হয়। ডানইসের মতো বীর যোদ্ধারা তার অলৌকিক রণকৌশল ও বিশ্বাসের কাছে মাথা নত করে। বার্নার্ড শ দেখাইলেন যে, জোয়ানের সৌন্দর্য তার বাহ্যিক অবয়বে নয়, তার ভেতরের নিষ্কলুষ ও অদম্য দেশপ্রেমের মধ্যে ছিল, যা স্তিমিত ফরাসি জাতিকে এক লহমায় জাগিয়ে তুলেছিল।
এই দুই জীবন-নাট্যের সমাপ্তি ও চরিত্র দুটির পরিণতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক বার্তা বহন করে। ‘রক্তকরবী’র শেষে নন্দিনী তার জীবনের সবচেয়ে বড় অবলম্বন রঞ্জনকে হারায়। কিন্তু এই ব্যক্তিগত শোক তাকে ভেঙে ফেলে না, বরং তার মনস্তত্ত্বকে এক নতুন উচ্চতায়, এক মহিমান্বিত উত্তরণে নিয়ে যায়। সে রঞ্জনের রক্তে নিজের হাত রাঙিয়ে, জালের ভেতরের রাজাকে সাথে নিয়ে জালের বাইরের সর্দারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে অবলীলায় ডাক দেয়: “আজকে উৎসবের দিন, রঞ্জনের রক্তে আমার রক্ত মিশেছে। এসো রাজা, এবার তোমার ওই জালের বেড়াজাল এক সাথে ছিঁড়ে ফেলি।” নন্দিনী সশরীরে হারিয়ে যায়, কিন্তু যক্ষপুরের লোহার জাল ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়ে; বাতাসে ধ্বনিত হয় পৌষের পাকা ধানের গান। তার বাহ্যিক পরাজয়ের মাঝেই ঘটে মানবিক আদর্শের চূড়ান্ত জয়। ‘সেন্ট জোয়ান’ নাটকেও জোয়ানকে ধর্মদ্রোহিতার অপরাধে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। কিন্তু শ-এর নাটকের বিশেষত্ব হলো এর উপসংহার বা এপিলগ। জোয়ানের মৃত্যুর পঁচিশ বছর পর চার্চ তাকে নির্দোষ ঘোষণা করে এবং পরে তাকে ‘সেন্ট’ বা সাধু উপাধি দেওয়া হয়। জোয়ানের মনস্তত্ত্ব মৃত্যুর পরেও তার হত্যাকারীদের তাড়া করে ফেরে। কিন্তু শ অত্যন্ত বাস্তবনিষ্ঠভাবে দেখিয়েছেন, পৃথিবী এখনও জোয়ানের মতো পবিত্র ও দূরদর্শী মানুষদের গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত নয়। তাই নাটকের একেবারে শেষলগ্নে জোয়ানের আকুল প্রার্থনা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বিবেককে নাড়া দিয়ে ওঠে: “O God that madest this beautiful earth, when will it be ready to receive Thy saints? How long, O Lord, how long?” স্বৈরাচারী ব্যবস্থা তাকে পুড়িয়ে মারলেও তার ভেতরের এই অবিনাশী প্রাণশক্তিকে মারতে পারে না।
পরিশেষে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথের নন্দিনী এবং বার্নার্ড শ-এর জোয়ান—উভয়েই নিজ নিজ নাট্যকারদের গভীরতম জীবনদর্শনের শ্রেষ্ঠ ফসল। নন্দিনী যেখানে যান্ত্রিক সভ্যতার করাল গ্রাসের বিরুদ্ধে ‘অ্যানিমা’ বা চিরন্তন সৃজনশীল নারীশক্তির প্রতীক, জোয়ান সেখানে মধ্যযুগীয় অন্ধকারের বিরুদ্ধে ‘লাইফ ফোর্স’ বা বিবর্তনকামী প্রাণশক্তির প্রতীক। তারা দুজনেই প্রমাণ করেছে যে, স্বৈরাচার ও যান্ত্রিকতার অন্ধকার যতবারই মানবসভ্যতাকে গ্রাস করতে আসবে, ততবারই রক্তকরবীর রক্তিম আভা আর অলিয়ঁসের অগ্নিশিখা হয়ে এই অবিনাশী মনস্তত্ত্বের নারীরা মানুষের মুক্তির দূত হিসেবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবেন।


