জীবনীসাহিত্য : গদ্যসাহিত্যের বিশেষ শাখা

জীবনীসাহিত্য : গদ্যসাহিত্যের বিশেষ শাখা

বিশ্বসাহিত্যের ধারা - রঞ্জন চক্রবর্ত্তী

১ : বাস্তববাদ ও সাহিত্য : সংশয় ও পথের দিশা

২ : প্রকৃতিবাদ এবং সাহিত্য : ভিন্নতর পথের সন্ধান

৩ : সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ এবং সাহিত্য

৪ : সাহিত্যচিন্তায় বৈচিত্র্য : ডাডাবাদ থেকে অধিবাস্তববাদ

৫ : অস্তিত্ববাদ এবং সাহিত্যদর্শনে অভিনবত্ব

৬ : অ্যাবসার্ডবাদ

৭ : জাদুবাস্তবতা এবং সাহিত্যচিন্তায় অভিনবত্ব

৮ : সাহিত্যে উত্তর-আধুনিকতা

৯ : আধুনিকোত্তর সাহিত্যচিন্তা

১০ :  জনপ্রিয় সাহিত্যের ধারায় স্ট্রিট লিটারেচার

১০ : জনপ্রিয় সাহিত্যের ধারায় স্ট্রিট লিটারেচার

উপন্যাসের বহুমাত্রিক রূপ

এপিক উপন্যাস : বিশ্বসাহিত্য ও বাংলা সাহিত্য

রুশ গদ্যসাহিত্যের আঙিনা

জীবনীসাহিত্য : গদ্যসাহিত্যের বিশেষ শাখা

‘জীবনী’ বা ‘Biography’ বলতে সাধারণভাবে বোঝায় কোনও ব্যক্তিবিশেষের জীবনবৃত্তান্তকে সুবিন্যস্তভাবে লিপিবদ্ধ করা ও তার চরিত্রের বিশ্লেষণ। আরও বিস্তারিতভাবে বলতে গেলে জীবনচরিতে ব্যক্তির বহির্জীবনের ঘটনাবলীর বিশ্বাসযোগ্য বিবরণের সঙ্গে তার অন্তর্জীবনের দ্বন্দ্বসমূহের প্রতিফলন থাকবে, সেই সঙ্গে থাকবে তার মানসিকতার বিশ্লেষণ। সার্থক জীবনচরিত লিখতে গেলে ব্যক্তির জীবনকে তার সময় ও যুগের প্রেক্ষিতে স্থাপন করে ব্যক্তির সঙ্গে সমষ্টির তথা পারিপাশ্বিকের সম্পর্কও উন্মোচন করতে হয়।  ফ্রাঙ্ক হ্যারিস মনে করেন জীবনচরিত নিছক ব্যক্তিজীবনের ইতিহাসমাত্র নয়। তিনি বলেছেন — “Biography is not only history. It can also be good literature. And in some cases it can even rank with creative literature.” জীবনী-সাহিত্য একদিকে যেমন তথ্যনিষ্ঠ হওয়া প্রয়োজন, তেমনই অন্যদিকে সমগ্র রচনাটির সাহিত্যের রসলোকে উত্তরণ ঘটা প্রয়োজন।

কোনও ব্যক্তিবিশেষের জীবনের যাবতীয় ঘটনা ও বিস্তর তথ্যাদি যোগাড় করলেই তা জীবনচরিত হয় না। এই প্রসঙ্গে প্রখ্যাত জীবনীকার লিটন স্ট্র্যাচি বলেছেন — “A mass of notes and documents is no more a biography than a mountain of eggs on omelette.” জীবনীকারকে এমনভাবে সংগৃহীত তথ্য বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে এবং সাহিত্যরসে জারিত করে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করতে হবে যাতে মানুষটির অন্তর্লোকের বিশ্বাসযোগ্য ছবি ফুটে ওঠে। জীবনীকারের দায়িত্ব হল কোনও ব্যক্তির জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের বহিরঙ্গ ও অন্তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে তার সমগ্র সত্তাকে উদঘাটিত করা। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে তা যেন নিছক ঘটনাবলীর বিবরণে পর্যবসিত না হয়, রচনাকে বর্ণনাশক্তির গুণে সাহিত্যের স্তরে উন্নীত হতে হবে। হেমকেথ পিয়ার্সন বলেছেন, “Biography is the history of lives of individual men — a truthful record of an individual and composed as a work of art. It is the narrative from birth to death, of one man’s life in its outward manifestation and inward working.”

আঁদ্রে ম্যুরোর কথায় প্রকৃত জীবনচরিত হল জীবনের মধ্য দিয়ে একটি মানবাত্মার দুঃসাহসিক অভিযানের আলেখ্য। তাঁর ভাষায় — “Biography is that type of writing which reveals, in narrative form, the outer and inner experience of one personality through another. It is the study and presentment of a human character with its inner conflict of aim and impulse and its outer struggle between circumstance and temperament. In short, it is the faithful portrait of a soul in its adventures through life.” ম্যুরোর এই পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত অর্থবহ। জীবনের নানা ঘটনা ও তথ্যের উপর মানবাত্মার দুঃসাহসিক অভিযানের আলেখ্য নির্মাণ সত্যিই দুরূহ। এটি এমনই এক সৃজনকর্ম যা বিজ্ঞানীসুলভ বিশ্লেষণ ও শৈল্পিক দক্ষতার সার্থক সমন্বয় ব্যতীত প্রায় অসম্ভব। সেই কারণেই লুই মামফোর্ড বলেছেন — “Biography is both a science and an art.” একজন ব্যক্তির জীবনের উপর আলোকপাত করে তার চরিত্রের বিভিন্ন দিকগুলি পাঠকের সামনে তুলে ধরতে গেলে সাহিত্যগুণের সঙ্গে শৈল্পিক দক্ষতা দরকার। জীবনচরিত রচনার কাজটি যে কত কঠিন তা বোঝা যায় প্রখ্যাত জীবনীকার এমিল লুডউইগের কথা থেকে — “To re-create by-gone scenes and figures, to re-animate with movement, proportion and climax the stubborn facts of a man’s or woman’s whole existence, requires a dramatic sense equal if not superior to that of the playwright or a novelist.” এই বক্তব্য অনুযায়ী একজন জীবনীকারকে হতে হবে একাধারে ঔপন্যাসিক, নাট্যকার এবং চিত্রকর;  শুধু জীবনের ঘটনাবলীই নয় তাঁকে জীবনরহস্যকেও উদঘাটিত করতে হবে। বহির্জীবন ও অন্তর্জীবনের সুসমঞ্জস নির্মাণ ও ইতিহাসের শিল্পসম্মত রসায়ন ছাড়া কোনও জীবনচরিতই সার্থক হতে পারে না।

সার্থক জীবনীগ্রন্থের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল :

১. প্রাথমিকভাবে ব্যক্তিজীবনের কথা সতর্কভাবে তথ্যনিষ্ঠার সঙ্গে লিপিবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।

২. জীবনচরিতে ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে সমকালীন সমাজ ও যুগের ইতিহাসের প্রামাণ্য চিত্র থাকতে হবে।

৩. জীবনচরিত নিছক তথ্য ও ঘটনার কালানুক্রমিক বিবরণ নয়। তাতে কথাসাহিত্যের রস ও উপভোগ্যতা থাকা কাম্য। তা না হলে রচনাটি কেবল তথ্যভারে ভারাক্রান্ত হবে, তাতে সাহিত্যরস থাকবে না।

৪. ব্যক্তির জীবনের ভাষাচিত্র এমনভাবে অঙ্কন করতে হবে যাতে রচনা সুখপাঠ্য হয় ও পাঠকরা তা পাঠ করতে উৎসাহিত হন।

৫. জীবনচরিতে কেন্দ্রীয় চরিত্রটির সঙ্গে অন্যান্য চরিত্রগুলির সম্পর্ক ও সংঘাত যেন বিশ্বাসযোগ্যভাবে চিত্রিত হয়।

৬. জীবনীগ্রন্থে কোনও নীতি বা আদর্শ প্রচারের তাগিদে যেন চরিত্রচিত্রণ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। মহৎ ব্যক্তির চরিত্রের সৌন্দর্য যেন পাঠককে মুগ্ধ করতে পারে।

ব্যক্তিজীবনের ইতিহাস জীবনচরিতের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। সে কারণে তাকে তো তথ্যনিষ্ঠ হতেই হবে। কিন্তু জীবনীকার তো নিছক তথ্য-সংগ্রাহক বা chronicler নন। তাঁর লেখায় ব্যক্তিত্বের গভীর দেখার অনুশীলনের ছাপ থাকতে হবে। শুধু তাই নয়, একটি চরিত্রে লেখকের নিজস্ব কল্পনায় রক্তমাংসের সজীবতা আরোপ করতে পারাটাও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পাঠক যদি সেই জীবনের গভীরে প্রবেশ করে তার সমগ্র সত্তাকে নিজের অনুভবের বলয়ে আনতে না পারেন তাহলে জীবনীকারের কাজ ব্যর্থ হয়েছে বলে ধরতে হয়েছে। কেবলমাত্র ঘটনার সারিবদ্ধ বিন্যাসে জীবনী সার্থক রূপ পায় না। এই বক্তব্যের সমর্থনে সমারসেট মমের মন্তব্য উদ্ধৃত করছি — “A biography which is merely anecdotal is not biography at all. An anecdote is indispensable, but to have any real biographical value, an anecdote must reveal the true nature of the man.”

এই প্রসঙ্গেই মনে পড়ে ইংরেজি ভাষায় সব থেকে বিখ্যাত জীবনীগ্রন্থ জেমস বসওয়েলের লেখা স্যামুয়েল জনসনের জীবনচরিত ‘The Life of Samuel Johnson’ (১৭৯১) বইটির কথা। দেশ-কাল নিরপেক্ষভাবে বিচার করলে বসওয়েল যে কাজ করেছেন তা আদর্শ বলে গণ্য হবে। বিশেষ করে তিনি জনসনের জীবনের শেষ কুড়ি বছরের যে ছবি তুলে ধরেছেন তা অবিশ্বাস্য। বসওয়েলের লেখা জীবনচরিতের বৈশিষ্ট্য হল তা একাধারে কাহিনিমূলক এবং তথ্যবহুল। কিন্তু প্রতিটি কাহিনি ও তথ্যাবলীর ভেতর দিয়ে তিনি ব্যক্তি জনসনের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্যসমূহ যেভাবে তুলে ধরেছেন তা আমাদের মনে বিস্ময়ের উদ্রেক করে।

বসওয়েল যাঁর জীবনী লিখেছিলেন সেই স্যামুয়েল জনসন আবার ইংরেজ কবিদের জীবনচরিত লিখেছিলেন। তাঁর সেই বিখ্যাত ‘Lives of the Poets’-এ (১৭৭৯-৮১) আব্রাহাম কাউলে, জন ড্রাইডেন, উইলিয়াম কলিনস, টমাস গ্রে প্রভৃতি ৫২ জন ইংরেজ কবির জীবনী অনবদ্য ভাষায় ও ভঙ্গীতে প্রকাশিত হয়েছে। জনসন জীবনচরিতের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছিলেন — “The business of the biographer is often to pass slightly over those performances and incidents which produce popular greatness, to lead the thoughts into domestic privacies, and display the minute details of daily life, where exterior appendages are cast aside, and men excel each after only by prudence and virtue.” অর্থাৎ জীবনচরিত যাঁকে নিয়ে লেখা হবে তাঁর জীবনের আনুপূর্বিক পরিচয় জীবনীকারকে পেতে হবে। তার পর তিনি কাহিনি এমনভাবে সাজাবেন যাতে মানুষটির বাইরের ও ভেতরের চেহারাটি পাঠকের মনের পর্দায় সমানভাবে প্রতিভাত হয়। সে কারণেই জীবনচরিত রচনা রসোত্তীর্ণ সাহিত্যসৃষ্টি হয়ে উঠতে পারে।

(চলবে )

বিশ্বসাহিত্যের ধারা - রঞ্জন চক্রবর্ত্তী

রুশ গদ্যসাহিত্যের আঙিনা

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

আয়না

কুহেলী ব্যানার্জী একটা প্রচ্ছন্ন হুমকি  ঘুরে বেড়াই বাতাসে। মানুষে মানুষে নিয়ত বিশ্বাসের  সংঘাত।  পথে ঘাটে সর্বত্র  ২১শে আইনের জয়জয়কার।  স্বার্থের পথে হাঁটে যারা  দিগভ্রষ্ট করার

Read More »

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন

This entry is part 15 of 15 in the series বিশ্বসাহিত্যের ধারা – রঞ্জন চক্রবর্ত্তী আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

আয়না

কুহেলী ব্যানার্জী একটা প্রচ্ছন্ন হুমকি  ঘুরে বেড়াই বাতাসে। মানুষে মানুষে নিয়ত বিশ্বাসের  সংঘাত।  পথে ঘাটে সর্বত্র  ২১শে আইনের জয়জয়কার।  স্বার্থের পথে হাঁটে যারা  দিগভ্রষ্ট করার

Read More »

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন

This entry is part 15 of 15 in the series বিশ্বসাহিত্যের ধারা – রঞ্জন চক্রবর্ত্তী আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর

Read More »

জীবনীসাহিত্য : গদ্যসাহিত্যের বিশেষ শাখা

This entry is part 15 of 15 in the series বিশ্বসাহিত্যের ধারা – রঞ্জন চক্রবর্ত্তী বিশ্বসাহিত্যের ধারা – রঞ্জন চক্রবর্ত্তী ১ : বাস্তববাদ ও সাহিত্য

Read More »