জীবনীসাহিত্য : গদ্যসাহিত্যের বিশেষ শাখা

জীবনীসাহিত্য : গদ্যসাহিত্যের বিশেষ শাখা

বিশ্বসাহিত্যের ধারা - রঞ্জন চক্রবর্ত্তী

১ : বাস্তববাদ ও সাহিত্য : সংশয় ও পথের দিশা

২ : প্রকৃতিবাদ এবং সাহিত্য : ভিন্নতর পথের সন্ধান

৩ : সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ এবং সাহিত্য

৪ : সাহিত্যচিন্তায় বৈচিত্র্য : ডাডাবাদ থেকে অধিবাস্তববাদ

৫ : অস্তিত্ববাদ এবং সাহিত্যদর্শনে অভিনবত্ব

৬ : অ্যাবসার্ডবাদ

৭ : জাদুবাস্তবতা এবং সাহিত্যচিন্তায় অভিনবত্ব

৮ : সাহিত্যে উত্তর-আধুনিকতা

৯ : আধুনিকোত্তর সাহিত্যচিন্তা

১০ :  জনপ্রিয় সাহিত্যের ধারায় স্ট্রিট লিটারেচার

১০ : জনপ্রিয় সাহিত্যের ধারায় স্ট্রিট লিটারেচার

উপন্যাসের বহুমাত্রিক রূপ

এপিক উপন্যাস : বিশ্বসাহিত্য ও বাংলা সাহিত্য

রুশ গদ্যসাহিত্যের আঙিনা

জীবনীসাহিত্য : গদ্যসাহিত্যের বিশেষ শাখা

জীবনীসাহিত্য : গদ্যসাহিত্যের বিশেষ শাখা

পাশ্চাত্যের প্রাচীনতম জীবনীকারদের মধ্যে অন্যতম হলেন কর্নেলিয়াস নেপোস। ৪৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রকাশিত হয় তাঁর রচনা ‘Excellentium Imperatorum Vitae’ (‘Lives of Outstanding Generals’)। তবে পাশ্চাত্যের প্রাচীন ধ্রুপদী সাহিত্যে যাঁকে জীবনী-সাহিত্যের জনক বলে ধরা যেতে পারে তিনি হলেন প্লুতার্ক। গ্রীক ভাষায় লিখিত তাঁর বিখ্যাত ‘Lives of the Noble Greeks and Romans’-এ (যা ‘Parallel Lives’ নামেও পরিচিত) ছেচল্লিশ জন বরেণ্য গ্রীক ও রোমক পুরুষের জীবনী রয়েছে। খ্রিস্টীয় প্রথম শতকের (আনুমানিক ৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) এই কাজটিতে অপরিসীম তথ্যনিষ্ঠা ও সৃজনীশক্তির সাহায্যে তিনি বেশ কয়েকজন মহৎ মানুষের দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন। প্লুতার্কের জীবনীগ্রন্থ এলিজাবেথীয় ইংল্যণ্ডে সাহিত্যরচনার অন্যতম আকরগ্রন্থ হিসেবে সমাদৃত হয়েছিল। বিশেষত শেক্সপীয়ার তাঁর নাট্যরচনার ক্ষেত্রে প্লুতার্কের কাছে ঋণী ছিলেন।

অন্ত্য-মধ্যযুগের সব থেকে বিখ্যাত জীবনীগ্রন্থ হল স্যার টমাস ম্যালোরি লিখিত রাজা আর্থার ও তাঁর নাইটদের জীবনী অবলম্বনে রচিত ‘Le Morte d’Arthur’। এরকমই বিখ্যাত আর একটি গ্রন্থ হল জিওর্জিও ভাসারি-র ‘Lives of the Artists’ (১৫৫০)। ইংল্যণ্ডের বিখ্যাত নারী-পুরুষদের জীবনীর একটি সংকলন হল উইলিয়াম ওল্ডিস সম্পাদিত ‘Biographia Britannica’ (১৭৪৭ – ১৭৬৬)। ভিক্টোরীয় যুগের চিন্তাবিদ ও সাহিত্যিক টমাস কার্লাইল জীবনচরিত লেখক হিসাবে বিশেষভাবে উল্লেখের দাবী রাখেন। তাঁর ‘The Life of John Sterling’ (১৮৫১) এবং ‘Frederick the Great’ (১৮৫৮) দুটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। এর মধ্যে দ্বিতীয় বইটি তাঁর প্রচুর পরিশ্রমের ফসল এবং একটি কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বকে চিহ্নিত করার প্রয়াস। তবে ব্যক্তির চাইতে সমষ্টি এবং সাহিত্যের চাইতে ইতিহাস এখানে বড় হয়ে উঠেছে।

আধুনিক জীবনী-সাহিত্য রচনায় সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন লিটন স্ট্র্যাচি। তিনি নিরাসক্তভাবে, পক্ষপাতমুক্ত হয়ে নির্মোহ দৃষ্টিতে বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনী রচনার ধারার সূচনা করেছিলেন। ১৯১৮ সালে তাঁর ‘Eminent Victorians’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হলে জীবনী রচনার ধারাই পাল্টে যায়। এতদিন পর্যন্ত ধরে নেওয়া হত জীবনীকার সশ্রদ্ধচিত্তে বিখ্যাত ব্যক্তিদের এমন ভাষা-প্রতিকৃতি নির্মাণ করবেন যা হবে মর্যাদামণ্ডিত ও সমীহ উদ্রেককারী। কিন্তু স্ট্র্যাচির আবির্ভাবে এই ভিক্টোরীয় রক্ষণশীলতা ও অর্ধসত্যের চর্চা ভেঙে যায়। তিনি মনে করতেন জীবনীকার তাঁর বিষয় সম্পর্কে আক্রণাত্মক মেজাজে থাকবেন এবং হঠাৎই জীবনের ফাঁক-ফোকরে আলো ফেলবেন। তাঁর অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে ‘Queen Victoria’ (১৯২১), ‘Books and Characters’ (১৯২২), ‘Portraits in Miniature and Other Essays’ (১৯৩১) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এই গ্রন্থগুলি তাঁকে বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ জীবনী-সাহিত্য রচয়িতার স্বীকৃতি দিয়েছে।

বাংলা জীবনী-সাহিত্যের ক্ষেত্রে অনেকে বঙ্কিমচন্দ্রের কৃষ্ণচরিত্র গ্রন্থটিকে আলোচনায় আনতে চান। মধ্যযুগীয় চরিত-সাহিত্যের বিপরীতে তিনি বাংলায় জীবনী রচনাকে নতুন মাত্রা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি দেবতা হিসাবে পরিচিত একটি চরিত্রকে বেছে নিয়েছিলেন, তাই একে আধুনিক জীবনী-সাহিত্যের নিদর্শন বলা যায় না। বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা ঈশ্বর গুপ্ত ও দীনবন্ধু মিত্রের জীবন-বিষয়ক আলোচনায় জীবনচরিত রচনার পক্ষে মূল্যবান উপাদান থাকলেও তিনি পূর্ণাঙ্গ জীবনচরিত রচনায় আগ্রহী হননি। রবীন্দ্রনাথ যদিও রামমোহন, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর প্রভৃতি খ্যাতনামা ব্যক্তির জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত রচনা দ্বারা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন, কিন্তু তিনিও পূর্ণায়ত জীবনী রচনায় হাত দেননি।

একালের সাহিত্যিকদের মধ্যে জীবনী রচনায় আগ্রহ দেখিয়েছিলেন মোহিতলাল মজুমদার। তাঁর ‘বঙ্কিম বরণ’ ও ‘শ্রীমধুসূদন’ কাহিনিমূলক জীবনকথা নয়, বরং তাতে দুই অসামান্য প্রতিভার ভাবজীবনের আলোচনাই প্রাধান্য পেয়েছে। মোহিতলালের আর একটি জীবনচরিত ‘জয়তু নেতাজী’ অবশ্য সেই পর্যায়ে ওঠেনি, কারণ নেতাজীর ভাবজীবনের সঙ্গে কর্মজীবন এখানে ততটা গুরুত্ব পায়নি। মোহিতলালের পরেই জীবনচরিত রচনায় যাঁর নাম করতে হয় তিনি হলেন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত। অনেকটা কথাসাহিত্য রচনার আকর্ষণীয় ঢংয়ে তিনি লিখেছেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জীবনীগ্রন্থ ‘পরম পুরুষ শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ’। পরবর্তীকালে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত আরও যে কয়েকটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেছিলেন সেগুলি হল স্বামী বিবেকানন্দের জীবনী ‘বীরেশ্বর বিবেকানন্দ’, নেতাজীর জীবনী ‘উদ্যত খড়গ’ এবং নজরুলের জীবনী ‘জ্যৈষ্ঠের ঝড়’। এগুলির পাশাপাশি স্বামী সারদানন্দ প্রণীত ‘শ্রীরামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ’ গ্রন্থটিকেও জীবনী-সাহিত্য বলেই গণ্য করতে হবে, যদিও তাতে ভক্তিরসের উপাদান অনেক বেশি।

স্বামী বিবেকানন্দের জীবন নিয়ে অচিন্ত্যকুমারের আগেই সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার লিখেছিলেন ‘বিবেকানন্দ চরিত’। বিদ্যাসাগরের জীবন নিয়ে লেখা হয়েছিল দু’টি জীবনীগ্রন্থ — চণ্ডীচরণ বন্দোপাধ্যায়ের ‘বিদ্যাসাগর চরিত’ এবং সুবলচন্দ্র মিত্রের ‘বিদ্যাসাগর’। তবে সাহিত্যগুণের বিচারে এগুলিকে ছাপিয়ে গিয়েছে ইন্দ্র মিত্রের লেখা ‘করুণাসাগর বিদ্যাসাগর’। এ ছাড়া বিদ্যাসাগরের জীবন অবলম্বনে লিখেছেন নমিতা চক্রবর্তী এবং সন্তোষকুমার অধিকারী। রাজা রামমোহন রায়ের চরিত্রটিও লেখকদের বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছে এবং তাঁর জীবন নিয়ে অনেকগুলি গ্রন্থ রচিত হয়েছে। নগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন ‘মহাত্মা রাজা রামমোহন রায়’। এছাড়া মণি বাগচি লিখিত ‘রামমোহন’ একটি সুখপাঠ্য রচনা।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক বর্ণময় চরিত্র। তাঁকে নিয়ে প্রথম জীবনীগ্রন্থ লিখেছিলেন যোগীন্দ্রনাথ বসু। এ ছাড়াও মাইকেলকে নিয়ে জীবনীগ্রন্থ লিখেছেন প্রমথনাথ বিশী, শীতাংশু মৈত্র, মণি বাগচি প্রমুখ। পরবর্তীকালে গোলাম মুর্শিদ রচিত ‘আশার ছলনে ভুলি’ মাইকেলের প্রামাণ্য জীবনীগ্রন্থ রূপে স্বীকৃত হয়েছে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম আলোচিত গ্রন্থ প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় রচিত রবীন্দ্রনাথের পূর্ণাঙ্গ জীবনীগ্রন্থ ‘রবীন্দ্রজীবনী’। রবীন্দ্রানুরাগীদের কাছে এটি একটি আকরগ্রন্থ বলে বিবেচিত হয়। রবীন্দ্রনাথের জীবন সংক্রান্ত এই রকমই আরও একটি আকরগ্রন্থ হল প্রশান্তকুমার পালের ‘রবিজীবনী’, যা লেখকের অপরিসীম পরিশ্রমের ফসল।

মধ্যযুগে চৈতন্যদেব ও তাঁর পার্ষদদের নিয়ে অনেকগুলি জীবনীকাব্য রচিত হয়েছিল। এগুলিতে উচ্চস্তরের কাব্যরস থাকলেও এই সব আখ্যানধর্মী কাব্য আসলে মহৎ সন্তজীবনের অলৌকিক মাহাত্ম্যের বর্ণনা, যা মূলত ভক্তিরসাত্মক। চৈতন্যভাগবত, চৈতন্য চরিতামৃত, চৈতন্যমঙ্গল ইত্যাদি নামের জীবনীকাব্যগুলি যতটা প্রশস্তিমূলক ততটা প্রামাণ্য ও ইতিহাসসম্মত নয়। এগুলিকে আধুনিক জীবনী-সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত না করে ‘সন্তজীবনী’ (বা ‘Hagiography’) বলাই ভাল।

(চলবে )

বিশ্বসাহিত্যের ধারা - রঞ্জন চক্রবর্ত্তী

জীবনীসাহিত্য : গদ্যসাহিত্যের বিশেষ শাখা

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন  

This entry is part 16 of 16 in the series বিশ্বসাহিত্যের ধারা – রঞ্জন চক্রবর্ত্তী আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর

Read More »

১৬ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

This entry is part 16 of 16 in the series বিশ্বসাহিত্যের ধারা – রঞ্জন চক্রবর্ত্তী এক দৃষ্টিহীন পেঁচা ১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা ২ :

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন  

This entry is part 16 of 16 in the series বিশ্বসাহিত্যের ধারা – রঞ্জন চক্রবর্ত্তী আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর

Read More »

১৬ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

This entry is part 16 of 16 in the series বিশ্বসাহিত্যের ধারা – রঞ্জন চক্রবর্ত্তী এক দৃষ্টিহীন পেঁচা ১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা ২ :

Read More »

অনুবাদের স্বর্ণযুগ : মধ্যযুগ  

This entry is part 16 of 16 in the series বিশ্বসাহিত্যের ধারা – রঞ্জন চক্রবর্ত্তী অনুবাদ বিষয়ক প্ৰবন্ধমালা – তৃষ্ণা বসাক ১ : অনুবাদের বাদ,

Read More »