এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

This entry is part 14 of 14 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৫ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৬ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৭ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৮ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৯ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১০ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা – দশম পর্ব

১১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

আমার মৃত‍্যু অবধারিত ছিল।নিজের মৃত‍্যুদূতকে স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছিলাম আমি।অবশেষে ওরা একজন বৈদ‍্য ডেকে আনল। সেই তথাকথিত আম জনতার বৈদ‍্য। তিনি আমাদের পারিবারিক চিকিৎসকও ছিলেন এবং নিজেই বললেন, “আমি তোদের সবাইকে বড় করেছি।”
মাথায় একখান হলদেটে পাগড়ি, আর মুখে লম্বা দাড়ি নিয়ে তিনি গৃহে প্রবেশ করলেন এবং সগর্বে জানালেন যে তিনি নাকি আমার ঠাকুর্দাকে যৌনশক্তি বর্ধক ওষুধ দিয়েছিলেন, আমাকে রকেটের বীজ আর মিছরি খাইয়েছিলেন, আর আমার পিসিকে খাইয়েছিলেন ক্যাসিয়ার নির্যাস।
যাই হোক, আমার বিছানার পাশে বসে, নাড়ি দেখে, জিভ পরীক্ষা করে নিদান দিলেন, গাধার দুধ আর বার্লির রস। আর দিনে দু’বার মেস্তিক আর আর্সেনিক দিয়ে ধোঁয়া নিতে হবে। দাইমার হাতে একখান লম্বা প্রেসক্রিপশন দিয়ে গেলেন।অদ্ভুত সব নির্যাস আর তেল;হাইসপ, খড়ের তেল, যষ্টিমধুর নির্যাস, কর্পূর, মেইডেনহেয়ার, ক্যামোমাইল তেল, হাঁসের চর্বি, তিসির বীজ, ফার গাছের বীজ,এমন আরও কত কী।
দিনে দিনে আমার অবস্থার অবনতি ঘটতে লাগল।
শুধু আমার দাইমা,যে কিনা তারও দাইমা ছিল,ধূসর চুলের সেই বুড়ি, আমার বিছানার পাশে এক কোণে বসে থাকত। সে আমার কপালে জলপটি দিত, ভেষজ ওষুধ দিত, আর আমার শৈশবের গল্প শোনাত।আমার আর সেই নষ্টমেয়েটির গল্পও বলত।
সে বলত, আমার স্ত্রীর বাম হাতের নখ খাওয়ার অভ্যাসটা নাকি একেবারে ছোটোবেলার। কখনও কখনও সে গল্প বলত। যেহেতু গল্পগুলো আমার শৈশবের সঙ্গে জড়িত, তাই আমি অনুভব করতাম,আমার বয়স যেন কমে যাচ্ছে, আমি আবার শিশু হয়ে যাচ্ছি।
সে বলত, যখন আমি খুব ছোট ছিলাম, আমি আর আমার স্ত্রী নাকি একই দোলনায় ঘুমাতাম , দু’জনের জন‍্যে একটিই বড় দোলনা। সেই গল্পগুলোর কিছু অদ্ভুত ঘটনাও তখন আমার কাছে খুব স্বাভাবিক মনে হতো।
এই অসুখ আমার জন্য এক নতুন জগৎ তৈরি করেছিল,একটা অচেনা, অস্পষ্ট জগৎ, যা ভরা ছিল এমন সব ছবি, রঙ আর আকাঙ্ক্ষায়, যা কোনো সুস্থ মানুষ কল্পনাও করতে পারে না। আর সেই কারণেই এই গল্পগুলোর ঘটনাবলির পরিবর্তন আমাকে এক অদ্ভুত আতঙ্ক আর নেশায় আচ্ছন্ন করত।
আমার মনে হতো, আমি আবার শিশু হয়ে গেছি।
এই মুহূর্তে, যখন আমি লিখছি, তখনও আমি সেই একই অনুভূতিগুলো অনুভব করছি। সেগুলো অতীতের নয়।বর্তমানের।
সম্ভবত প্রাচীন মানুষের কাজ, চিন্তা, কামনা আর অভ্যাস।এইসব গল্পের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে এসেছে, আর জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ একই কথা বলেছে, একই যৌন আচরণ করেছে, আর একই রকম শৈশবের মুখোমুখি হয়েছে।
তাহলে কি পুরো জীবনটাই একটা প্রহসন নয়?একটি অবিশ্বাস্য, বোকামিতে ভরা গল্প?
আমি কি নিজেই আমার এই অবিশ্বাস্য কাহিনি লিখছি না?আমার নিজের গল্প?আমার অতীত!সেই আদি ও অকৃত্রিম গল্প।যে গল্প আদপে কথকের মানসিকতা ও বংশগতির লক্ষণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত তারই অপূর্ণ ও অপ্রাপ্ত আকাঙ্খার প্রকাশ।
আমি শৈশবের মত নিরবচ্ছিন্ন আরামদায়ক শান্তির ঘুম ঘুমোতে চাইছিলাম।ঘুম থেকে ওঠার পর আমার গালদুটো কষাইয়ের দোকানের মাংসের মত লাল হয়ে থাকবে।তপ্ত শরীরে আমি অনর্গল কাশতে থাকব।ভয়ানক ঘোরালো কাশি।অথচ তার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে না শরীরে।প্রতিদিন ভোরবেলা কষাইয়ের দোকানে ভেড়ার মৃতদেহ বয়ে আনা ক্লান্ত অশ্বের কর্কশ শ্বাসের মত সেই কাশির শব্দ।
আমার স্পষ্ট মনে আছে,চারিদিকে তখন ঘুরঘুট্টি অন্ধকার।কয়েক মুহূর্তের জন‍্যে আমি কোমায় চলে গিয়েছিলাম।ঘুমিয়ে পড়ার আগে আমি নিজের সঙ্গে কথা বলেছিলাম।সেই মুহূর্তে আমি অনুভব করলাম আমি যেন একটা শিশুর মত অবস্থায় দোলনায় শুয়ে আছি।যদিও সেই ঘরে সকলেই ঘুমিয়ে ছিল তবু আমার মনে হল কেউ যেন আমার শয‍্যার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে!ভোর হওয়ার একটু আগের সেই অদ্ভুত সময়,যখন একজন অসুস্থ মানুষ মনে করে, জীবন যেন এই পৃথিবীর সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।আমার বুক জোরে ধড়ফড় করছিল, কিন্তু আমি ভয় পাইনি।আমার চোখ খোলা থাকলেও সেই নিকষ অন্ধকারে আমি কিছুই দেখতে পাইনি।কয়েকটা মুহূর্ত পেরিয়ে গেল তারপর একটা অসম্ভব চিন্তা আমায় পেয়ে বসল ‘হয়ত সেই এসেছে!’ঠিক তক্ষুণি একটা বরফ শীতল হাত আমার জ্বরতপ্ত কপাল স্পর্শ করল।

আমি কেঁপে উঠলাম।দু-তিনবার নিজেকে প্রশ্ন করলাম,
“এটা সেই মৃত্যুদূতের হাত নয় তো?”তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।সকালে জেগে উঠে শুনলাম,আমার ধাত্রী বলছে, তার মেয়ে (অর্থাৎ আমার স্ত্রী, সেই নারী) এসেছিল, আমার মাথাটি তার কোলে নিয়ে শিশুর মতো দোলাচ্ছিল।হয়তো তার ভেতরে মাতৃত্ববোধ জেগে উঠেছিল।আমি তখনই মরে যেতে চেয়েছিলাম।হয়তো তার গর্ভের সন্তানও মারা গিয়েছিল।না কি জন্ম হয়েছিল? আমি জানি না।

এই ঘর,যা ক্রমশ কবরের মত সংকীর্ণ ও অন্ধকার হয়ে উঠছিল সেই ঘরেই আমি তার জন্য অপেক্ষা করতাম।কিন্তু সে আর আসেনি।আমার এই অবস্থার জন্য কি সে দায়ী নয়?বিষয়টা মসকরা নয় কিন্তু!তিন তিনটে বছর।না না দু বছর চারমাস!সময়ের আর কোনো অর্থ নেই!দিন, মাস সবই অর্থহীন হয়ে গেছে।কারণ, কবরস্থ মানুষের কাছে
সময় তার তাৎপর্য হারায়। এই ঘরটাই ছিল আমার জীবন আর চিন্তার কবর।বাইরের পৃথিবীর মানুষ, তাদের ভন্ডামো,হইহট্টগোলের শব্দ,সবই আমার কাছে অর্থহীন, অচেনা।
আমার শয‍্যাশায়ী দশায় আমি যেন নিজের মধ্যেই একটা আলাদা জগৎ হয়ে উঠেছিলাম।সেখানে হইহট্টগোলের স্থান ছিল না।
এক রহস্যময় জগৎ, যেখানে আমি প্রতিটি কোণ, প্রতিটি অন্ধকার খুঁটিয়ে দেখতাম।রাতের সেই সীমানায় নিদ্রা ও জাগরণ মাঝখানে আমি স্বপ্ন দেখতাম। মুহূর্তেই আমি অন্য এক জীবনে প্রবেশ করতাম!অন্য এক বাতাসে শ্বাস নিতাম!
এভাবে আমি নিজের কাছ থেকেই পালাতে চাইতাম।
চোখ বন্ধ করলেই আমার ভেতরের কল্পনার ছবি আবার ফিরে আসত।আমার ইচ্ছে ব‍্যতিরেকেই তারা আসা যাওয়া করত।আমি সেগুলোর বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলাম না।কারণ আমি তখন ঘুমিয়ে ছিলাম।
নীরবে এবং স্থিরভাবে আমি সেই ছবিগুলোকে আলাদা করতাম।তাদের পৃথক করতাম।আর তখনই বুঝলাম,আমি কোনোদিনই নিজেকে সেভাবে চিনতে পারিনি।আর এই পৃথিবীও যথেষ্ট অর্থপূর্ণ নয়।

(চলবে)

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

পুরাণ ও কাব্য : কল্পনার সাংস্কৃতিক বুনন

This entry is part 14 of 14 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

This entry is part 14 of 14 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ – নবকুমার দাস ১ : সিন্ধু–সরস্বতী থেকে গঙ্গা ২

Read More »