১০ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা – দশম পর্ব

১০ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা – দশম পর্ব

This entry is part 10 of 16 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৫ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৬ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৭ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৮ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৯ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১০ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা – দশম পর্ব

১১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৫ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৬ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

কাহিনিকার: সাদেঘ হেদায়েত
বঙ্গানুবাদ: সুপর্ণা বোস

আমি সর্বদাই বিশ্বাস করি, বাক্‌সংযমই প্রকৃষ্ট পন্থা। বিটার্ণ পাখিটির মতই মানুষের উচিত  সমুদ্রের তীর বরাবর পাখা মেলে খানিকটা ওড়া, তারপর একাকী বসে থাকা। কিন্তু এখন আর নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ নেই আমার, কারণ যা ঘটবার নয়, তাই ঘটে গেছে। কে বলতে পারে? হয়তো এখনই, অথবা আর এক ঘণ্টা পর, একদল মদ‍্যপ রাত-প্রহরী আমাকে ধরতে  হাজির হল। আমার এই দেহখানা বাঁচাবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার নেই। রক্তের দাগ মুছে ফেললেও সবকিছু অস্বীকার করার কোনো জায়গাই নেই। ওরা আমাকে স্পর্শ করার আগেই,  ওই মদের বোতল থেকে এক পেয়ালা মদ পান করব; আমার বংশগত ঐতিহ‍্যের মদ, যা আমি নিজেই  কুলুঙ্গিতে রেখে দিয়েছিলাম।

আমি চাই আমার জীবনটাকে মুঠোর মধ্যে ধরতে। এক থোকা আঙুরের মত; তারপর তার নির্যাস, না, তার মদটুকু, ফোঁটায় ফোঁটায় যেন মক্কার পবিত্র ধুলিমিশ্রিত জল,আমার ছায়ার শুকনো গলায় ঢেলে দিতে। যাওয়ার আগে আমার একমাত্র ইচ্ছা, এই ঘরের কোণে বসে যে সব দুঃখ আমাকে যক্ষ্মা বা কুষ্ঠরোগের মতো কুরে কুরে খেয়েছে, সেগুলো কাগজে লিখে রেখে যাই। এতে অন্তত আমার চিন্তাগুলোকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে বা গোছাতে পারব বলে মনে হয়। আচ্ছা!আমি কি একটা উইল লিখতে চেয়েছি?নাহ্ তা কখনোই নয় কারণ আমার এমন কোনো সম্পত্তিও নেই যা সরকার বাজেয়াপ্ত করতে পারে।এমন গভীর কোনো বিশ্বাসও নেই যার ভিত নড়িয়ে দিতে পারে শয়তান।

তাছাড়া, পৃথিবীতে এমন কী আছে যার সামান্যতম মূল্যও  থাকতে পারে আমার কাছে? যাকে সাধারণত “জীবন” বলা হয়, তা আমি ইতিমধ্যেই হারিয়েছি। স্বেচ্ছায় হারিয়েছি।  বরং বলা  ভালো, হারাতেই চেয়েছি। আমি চলে যাওয়ার পর কেউ আমার ছেঁড়াফাটা চিরকূট পড়ল কি পড়ল না, তাতে আমার বিন্দুমাত্র যায় আসে না! আমি লিখছি শুধু এই কারণে যে লিখবার তাগিদ ক্রমশ অপ্রতিরোধ‍্য হয়ে উঠছে।  এখন আরো বেশি করে   চিন্তাগুলোকে  আমার কল্পিত সত্তার কাছে পৌঁছে দেওয়া দরকার, আমার ছায়ার কাছে।সেই অশুভ ছায়ার কাছে।যে ছায়া দেয়ালে ঝুলে আছে প্রদীপের আলোয়।আমার সমস্ত লেখা এভাবে পড়ছে যেন গিলে খাচ্ছে।ওর অনুভবশক্তি হয়ত আমার থেকেও তিক্ষ্ণ!অর্থপূর্ণ কথাগুলি আমি শুধু আমার ছায়ার সঙ্গেই বলতে পারি।সে আমায় বাঙ্ময় করে তোলে।আমায় জানে।নিশ্চিতভাবে বোঝেও।আমি আমার জীবনের নির্যাস তার শুকনো গলায় তেতো মদের মত ফোঁটায় ফোঁটায় ঢেলে দিই।তারপর বলি,’এটাই আমার জীবন।’

গতকাল লোকে আমায় এক বিপর্যস্ত অসুস্থ যুবক হিসেবে দেখেছে আর আজ আমায় দেখছে এক ন‍্যুব্জদেহ বৃদ্ধ হিসেবে।যার পলিত কেশ,জ্বলন্ত চোখ আর কুষ্ঠরোগাক্রান্ত ঠোঁট।আজকাল জানালার বাইরে থাকাতে ভয় করে।ভয় করে আয়না দেখতেও কারণ সর্বত্র নিজের অজস্র প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই।

আমার ঝুঁকেপড়া ছায়ার কাছে আমার জীবন বর্ণনা করতে হলে আমাকে একটি গল্প বলতে হবে। আহা, শৈশবের দিন, প্রেম, সঙ্গম, বিয়ে এবং অজস্র মৃত‍্যু!কত যে গল্প!আদের কোনোটির মধ‍্যেই যেন একবিন্দুও সত‍্যতা নেই!সবই কল্পনাপ্রসূত অভিব‍্যক্তি।

সেই চাঁইটাকে ভেঙ্গে ফেলতে ইচ্ছে করে যদি তার ভেতর কণামাত্র সত‍্য লুকিয়ে থাকে!আমি তো জানি না আমি কোথায়!আমার মাথার ওপর কতখানি আকাশের সামিয়ানা আর পায়ের নিচে কতটুকু নিশাপুর কিংবা বাল্খ অথবা বেনারসের ভূমি।যেকোনো ক্ষেত্রেই আমি কোনোকিছুকেই বিশ্বাস করতে পারি না।অতীতে আমি এতো রকমের পরস্পরবিরোধী বিষয় দেখেছি আর অসঙ্গত কথা শুনেছি যে আজকাল আর কোনোকিছুতেই বিশ্বাস রাখতে পারি না।

আমার চোখ—এই পাতলা অথচ কঠিন বস্তুটি, যার অন্তরালে আত্মার নিবাস —বিভিন্ন বস্তুর ওপর ঘষা খেতে খেতে এমন হয়ে গেছে যে এখন আমি কিছুই বিশ্বাস করি না। বস্তুগুলোর ওজন ও স্থায়িত্ব নিয়েও আমার সন্দেহ হয়—এমনকি এই মুহূর্তের স্পষ্ট ও দৃশ্যমান সত্যগুলোকেও আমি সন্দেহ করি।

ধরা যাক, যদি আমি আমাদের উঠোনের কোণে থাকা পাথরের হামানদিস্তাকে স্পর্শ করে তাকে জিজ্ঞেস করি,

“তুমি কি সত্যিই স্থির ও দৃঢ়?”

যদি সে ‘হ্যাঁ’ বলে উত্তর দেয়, তবু আমি নিশ্চিত নই  তাকে বিশ্বাস করব কি না।

আমি কি সত্যিই একটি পৃথক, স্বতন্ত্র সত্তা? আমি জানি না। কিন্তু এখুনি যখন আমি আয়নায় তাকালাম, নিজেকেই চিনতে পারিনি। নিঃসন্দেহে আগেকার সেই “আমি” এখন মৃত; সে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। তবু আমাদের দুজনের মধ্যে কোনো দৃশ্যমান প্রাচীর নেই।

যাইহোক,আমাকে আমার গল্পটা বলতি হবে। কিন্তু কোথা থেকে শুরু করব সেটাই বুঝতে পারছি না। সমগ্র জীবনই তো গল্প আর কাহিনিতে গাঁথা। আমাকে যেন আঙুরের থোকা চেপে তার রস বের করে চামচে চামচে ঢেলে দিতে হবে এই বৃদ্ধ ছায়ার শুকনো কণ্ঠে।

এই মুহূর্তে আমার সব অস্থির চিন্তা বর্তমানের মধ্যেই আবদ্ধ, তাই কোথা থেকে শুরু করব তা বোঝা কঠিন। আমার চিন্তা কোনো ঘন্টা, মিনিট বা ইতিহাস মানে না। আমার কাছে গতকাল ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা হয়তো হাজার বছর আগের ঘটনার চেয়েও পুরোনো কিংবা কম প্রভাবশালী হতে পারে।

সম্ভবত এত স্মৃতির আবির্ভাবের কারণ এই যে পার্থিব মানুষের জগতের সঙ্গে আমার সব সম্পর্ক এখন ছিন্ন হয়ে গেছে। অতীত, ভবিষ্যৎ, ঘন্টা, দিন, মাস, বছর—সবই আমার কাছে এক হয়ে গেছে।

সারধারণ মানুষের জন‍্যে এই বিভাজনগুলোর মানে আছে। হ্যাঁ, ঠিক সেই শব্দটাই আমি খুঁজছিলাম—র‍্যাববল,দুটো ‘ব’সম্পন্ন র‍্যাববল। অর্থাৎ অতি সাধারণ জনতা। তাদের জীবনে ঋতুর মতোই সীমা ও ভাগ আছে; তারা জীবনের নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে বাস করে।

অন‍্যদিকে আমার জীবন—আমার সমগ্র জীবন—একটাই ঋতু আর একটাই অবস্থার মধ্যে বন্দী। যদিও আমার শরীরের কেন্দ্রে একটানা একটি আগুন জ্বলছে, যা মোমবাতির মতো আমাকে গলিয়ে দিচ্ছে, তবু আমার জীবন যেন চিরশীতল অঞ্চলে, চিরন্তন অন্ধকারের নিবাসী।

আমার জীবন ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে এই চার দেয়ালের মধ্যে, যে দেয়ালগুলো আমার ঘর তৈরি করেছে।আমার জীবন ও চিন্তার চারদিকে এক শক্ত দুর্গের মতো ঘিরে আছে।

না, আমি ভুল বলেছি। আমার জীবন যেন এই তেপায়ার পাশে পড়ে থাকা এক টুকরো কাঁচা কাঠের গুঁড়ির মতো।অন্য একটি জ্বলন্ত কাঠের আগুনে তা দগ্ধ ও কালো হয়ে গেছে, কিন্তু সম্পূর্ণ পুড়েও যায়নি, আবার সবুজ সতেজও নয়।ধোঁয়া আর বাষ্প তার দম বন্ধ করে দেয়।

অন্য  সব ঘরের মতোই আমার ঘরটিও সূর্যে শুকানো ও পোড়া- ইট দিয়ে তৈরি। এটি হাজার হাজার প্রাচীন ঘরের ধ্বংসাবশেষের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ভিতরের দেয়াল সাদা , আর তাতে এক টুকরো শিলালিপি।  ঠিক যেন একটি কবর।

( চলবে ) 

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৯ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা ১১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন  

This entry is part 10 of 16 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

This entry is part 10 of 16 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর পথযাত্রী …সৃষ্টির

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

শঙ্খ ঘোষ এক বৃহত্তর জার্নি অথবা দর্শন  

This entry is part 10 of 16 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

This entry is part 10 of 16 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর পথযাত্রী …সৃষ্টির

Read More »