এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

This entry is part 9 of 9 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৫ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৬ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৭ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৮ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

কাহিনিকার: সাদেঘ হেদায়েত

বঙ্গানুবাদ: সুপর্ণা বোস

নবম পর্ব

নিজেকে এতখানি অকর্মণ্য হতভাগা বলে মনে হয়নি কখনো! তবু এক প্রকার প্রচ্ছন্ন আত্মগ্লানির কারণে একইসঙ্গে এক ধরনের অযৌক্তিক ও বিজাতীয় সুখ অনুভব করছিলাম। অনুভব করছিলাম, আমার সঙ্গেই আছেন এক প্রাগৈতিহাসিক সহযন্ত্রণাভোগী এক প্রাচীন চিত্রকর! যিনি এই পাত্রটির গায়ে এঁকেছিলেন সেই বিশেষ ছবিটি।তিনি কি আমার সহ-দুখী নন? তিনিও কি দুঃখের প্রতিটি পর্ব পার করে আসেননি? যা আমি এখন পার করছি! এতদিন পর্যন্ত আমি নিজেকে সংসারের সকল প্রাণীদের মধ্যে তুচ্ছতম বলে মনে করতাম। কিন্তু আজ থেকে অনুভব করলাম কোন একটা সময়ে ওই পাহাড়ের কোলে, ধ্বংসপ্রাপ্ত বসতির মধ‍্যে সেই সব মানুষজন বসবাস করতেন যাঁদের শরীরের হাড় পচে গিয়েছিল এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অনু পরমানুও কালো লিলি ফুলে পর্যবসিত হয়েছিল। আমার ধারণা, তাঁদের মধ্যেই বাস করতেন সেই আর্ত চিত্রকর। তাঁদের মধ্যেই কোন একজন ছিলেন সেই দুর্ভাগা কলম- খাপের চিত্রকর। ঠিক আমারই মত। এখন আমি অনুভব করেছি, বা বলা যায়, আমার বোধগম্য হয়েছে যে, তিনিও ঠিক আমারই মত দুটি দীর্ঘ কালো চোখের ভিতর গলে যাচ্ছিলেন এবং জ্বলে যাচ্ছিলেন। এই অনুভব আমাকে খানিকটা স্বস্তি দিল।অবশেষে আমি আমার আঁকা ছবিটি সেই পাত্রের উপর আঁকা চিত্রটির পাশে নামিয়ে রাখলাম। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে আগুনের পাত্রটি তৈরি করতে লাগলাম। যখন চারকোলগুলো গনগনে হয়ে উঠল, জারটিকে সেই আগুনের মধ্যে ফেলে দিলাম এবং সেই আগুন- পাত্রটিকে আমার আঁকা চিত্রটি সামনে স্থাপন করলাম। মাথার ভিতরে এলোমেলো ভাবনাগুলোকে গুছিয়ে নেওয়ার জন্য আমি বেশ কয়েকবার আফিম এ টান দিয়েছিলাম! তারপর মগ্ন হয়ে চিত্রটির দিকে চেয়ে রইলাম।কেবলমাত্র আফিমের ধোঁয়াই পারে আমার ভাবনাগুলোকে সুস্থিত করে উদ্বেগ কিছুটা কমিয়ে আনতে। অবশিষ্ট আফিমের সব ধোঁয়াটুকু পান করে ফেললাম এই ভেবে যে,এই মাদক আমার সমস্ত কষ্ট দূর করে আমার চেতনাকে আচ্ছন্নতার অবগুন্ঠনের ভিতর নিয়ে যাবে! কিন্তু সে কি আমাকে জন্মান্তরের সেই কুয়াশাময় ঘনঘোর স্মৃতির অবশেষ থেকে মুক্তি দিতে পারে? ধীরে ধীরে আমি সেই তুরীয় অবস্থা প্রাপ্ত হলাম এবং আমার চৈতন্য অদ্ভুত মনোমুগ্ধকর অবস্থায় উপনীত হলো! আমি আধো ঘুম আধো জাগরণের মধ্যে খানিকটা কোমার মত অবস্থায় পৌঁছে গেলাম।

এতক্ষণে মনে হল যে আমার বুকের সেই ভারটা যেন লাঘব হয়েছে। অভিকর্ষের কোন নিয়মই এখন আর আমার ওপর লাগু হচ্ছে না! এখন আমি আমার সেই অতিকায় মুগ্ধকর ভাবনাগুলির সঙ্গেই অবলীলায় বেলাগাম ভেসে বেড়াতে পারছি। এক প্রকার ও ব‍্যাক্ষাতীত সুখ আমার আপাদমস্তক চালিয়ে গেল। আমি এমন কি,নিজের শরীরের ভার থেকেও মুক্ত হয়ে এক রোমাঞ্চকর মনোরম রং ও আকৃতির বোবা দুনিয়ায় ভ্রমন করতে লাগলাম। এক সময় আমার ভাবনার গাড়ি বাধাপ্রাপ্ত হলো এবং এই রঙ ও আকৃতির দুনিয়া অদৃশ্য হয়ে গেল। একপ্রকার অদৃশ্য ইথারো সোহাগ- সুখের স্রোতে ডুবে যেতে লাগলাম! আমি, নিজের হৃদস্পন্দন শুনতে পারছিলাম!এমনকি শিরায় প্রবাহিত রক্তের স্রোতও অনুভব করতে লাগলাম। সে ভারি গুরুতর নেশাগ্রস্থ দশা।

আমি মনেপ্রাণে সমস্ত কিছু ভুলে থাকতে চাইছিলাম জড়ের মতই ।অচিরেই আমার ইচ্ছা পূর্ণ হল। যদি সেই প্রকার জড়ত্বের অবস্থা আদৌ সম্ভব হয় এবং সেই অবস্থা সহন করা যায়! যখন আমার চোখ বন্ধ হবে ঘুমের অধিক কোন ঘুমে,তারা পৌঁছে যাবে এক প্রকার পরম শূন্যতায় যেন আমি নিজেই নিজের অস্তিত্ব টের পাবোনা যদি এমন সম্ভবপর হয়! আমার অস্তিত্ব যেন ঘন কালীর ভিতর গুলে মিলে যাবে! কোন সুরের ভেতর,অথবা কোন রং দ্বারা আলোকরশ্মির ভিতর, যদি এই রং- আকৃতি ক্রমশ বিপুল হয়ে ওঠে এবং বেড়েই চলে যতক্ষণ না সেই আকৃতি ভেঙে গিয়ে আকৃতি বিহীন হয়ে যায়!

ক্রমশ শ্লথ।এক ধরনের অসাড়তা আমাকে গ্রাস করে নিল।এক আরামপ্রদ ক্লান্তিবোধ।এক প্রকার সূক্ষ্ম তরঙ্গ আমার শরীর থেকে নির্গত হচ্ছিল।আমি অনুভব করছিলাম আমার জীবন যেন ফিরতি পথে হাঁটছে।পর্যায়ক্রমে বিগত জীবনের ঘটনাক্রম এবং পূর্বস্মৃতির অবলুপ্ত শৈশব আমার চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো। পর্যবেক্ষণের অধিক সেই দেখা; আমি সেই স্মৃতির অংশ হয়ে উঠলাম। প্রতিটি মুহূর্তে তাদের অনুভব করতে পারছিলাম আর ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছিলাম শৈশব থেকে যৌবনের দিকে। হঠাৎ আমার ভাবনাগুলো ঝাপসা ও অন্ধকার হয়ে গেল; মনে হল আমার অস্তিত্ব যেন একটা আংটার ওপর ঝুলে পড়েছে; সহসা অতল অন্ধকার একটা কুয়োর ভেতর আটকে পড়লাম; আবার তখনই সেই আংটা থেকে খসেও পড়লাম; বাধাহীন ভাবে ধ্বসে এবং খসে পড়ছিলাম আমি; সে যেন এক অনন্ত রাত্রির ভেতর অনিঃশেষ পতন; তারপর একটা কুয়াশার পর্দা আমার চোখের ওপর নেমে এলো! আমি সবকিছু থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। জ্ঞান ফিরলে নিজেকে একটা ছোট্ট ঘরের ভেতর আবিষ্কার করলাম; অদ্ভুত অবস্থানে আবার একইসঙ্গে সেটা স্বাভাবিকও ছিল।

আমি যেন এক নতুন বিশ্বে জেগে উঠলাম।যেখানকার জীবন যাপন ও কার্যকলাপ সবই আমার খুব পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ। আমার এতোই চেনা পৃথিবী যে আমি সেখানে নিজের পূর্ব জীবনের বাড়িরও মতই স্বাচ্ছন্দ‍্য বোধ করতে লাগলাম।এক অর্থে, এ ছিল আমার পূর্বজীবনেরই প্রতিধ্বনি, কিংবা প্রতিবিম্ব। ভিন্ন এক জগৎ হয়েও এটি আমার বড়ই কাছের ও প্রাসঙ্গিক ছিল; মনে হল, আমি যেন আমার স্বীয় উপাদানেই ফিরে এসেছি। আমি পুনর্জন্ম নিলাম এক প্রাচীন জগতে,যা আমার কাছে আরও ঘনিষ্ঠ ও আরো স্বাভাবিক।

ভোর হয়ে আসছিল আমার গৃহের মাঝখানে একটি চর্বির বাতি জ্বলছিল। ঘরের কোণে একটি তোষক পাতা ।আমি ঘুমাতে পারছিলাম না কিছুতেই।গরম লাগছিল খুব।আমার চাদর ও গলায় জড়ানো মাফলার রক্তে ভিজে গিয়েছিল। আমার হাত দুটিও রক্তাক্ত ছিল; অস্থিরতা ও উত্তেজনার মধ্যেও, রক্তের চিহ্ন মুছে ফেলার ইচ্ছের চেয়েও শক্তিশালী,এমনকি ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে ধরা পড়ার ভয়ের চেয়েও শক্তিশালী, একটি অনুভূতি আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। আসলে বহুদিন ধরেই আমি ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে ধরা পড়ার অপেক্ষায় ছিলাম! আমি কুলুঙ্গিতে রাখা বিষাক্ত মদের পেয়ালাটি এক চুমুকে শেষ করে ফেলতে চাইছিলাম।
সবটুকু লিখে রাখাটা আমার জন‍্যে প্রায় বাধ‍্যতামূলক হয়ে পড়ল।আমি আমার আত্মাকে লাঞ্ছনাকারী অন্তর্গত পাষন্ডটিকে টেনে বার করে আনতে চাইছিলাম।আমি সেই সবটুকু লিপিবদ্ধ করতে চাইছিলাম যা এতদিন বলতে চেয়েও বলতে পারিনি।মুহূর্তের দ্বিধাগ্রস্থতা কাটিয়ে আমি আলোটা কাছে টেনে নিলাম ও এভাবে লিখতে শুরু করলাম |

( চলবে )

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৮ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি