ভজ মন রাম চরণ

ভজ মন রাম চরণ

ধ্রুপদী সাহিত্য : ভজ মন রাম চরণ - শ্যামলকৃষ্ণ বসু

ভজ মন রাম চরণ

ভজ মন রাম চরণ

[ আদিকান্ড ২ ]

| ১ |

রাজকুমারগণের শিক্ষা

সূর্যবংশীয় চার রাজকুমার। তাঁরা দশরাত্মজ। রাম লক্ষণ। ভরত শত্রুঘ্ন। ছন্দ প্রকরনে যেমন চলন চারভাইতে ঠিক তেমনই মিলন। যেখানে রাম সেখানে লক্ষণ। যেখানে ভরত সেখানেই শত্রুঘ্ন। তারা পরস্পর ফুলধনু হাতে খেলা করে বেড়ায়। তাদের চপলতা এবং বালকোচিত কর্মকান্ড সকলের প্রীতি উৎপাদন করে।  

চারভাই তাঁরা প্রাসাদঅঙ্গনে আপন মনে নিজেরা শিকার শিকার খেলে বেড়ায়। তারা তীর ধনুক নিয়ে তীরন্দাজি করার চেষ্টা করে। তারা রাজপ্রাসাদের মধ্যে যতেক রাজকীয় কর্মকান্ড  চাক্ষুস করে আর ঠিক তেমনই রাজা প্রজা মন্ত্রী সেনাপতি হয়ে তেমনই অনুকরনীয় খেলা খেলে। রাম কখনো রাজা হয়ে সিংহাসনে আসীন হয়। শত্রুঘ্ন হয় সেনাপতি। ভরত হয় মুনিবর। আর লক্ষণ সিংহাসনের পিছনে দাঁড়িয়ে চামর ব্যজন করে। রাজকুমার চতুষ্টয় রাজপুরীর যতেক মন্ত্রী অমাত্যদের পুত্রদের সাথে মিলেমিশে তাঁরা তাদের বালকোচিত অনেক রকমের খেলা খেলে যা দেখে সকলেই বেশ আনন্দ উপভোগ করে। তারা সকলে মিলে হোম করে। যজ্ঞ করে। রাজপুরীর মন্দিরের অনুকরণে তাঁরা চারভাই শিবপার্বতীর পূজা করে। এ সবই তাদের  বালক বয়সের খেলা।

চার রাজকুমার ক্রমে পঞ্চমবর্ষীয় হয়ে উঠেছেন। এখন তাদের শিক্ষাদানের সময়। তারা তো রাজপুত্র। তাদের রাজকীয় শিক্ষায় গড়ে তুলতে হবে। 

রাজা দশরথ মনে মনে ভাবেন , রাজকুমারদের শিক্ষার ভার দিতে হবে এমন একজনের কাছে যিনি তাদের রাজকীয় শিক্ষায় গড়ে তুলবেন। রাজকুমারদের শাস্ত্র ও শস্ত্রে পারদর্শী করে তুলবেন। তারা বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করবে। তারা রাজকার্য্য শিখবে। তারা ন্যায় সাংখ্য কাব্য দর্শন শিখবে। 

রাজা দশরথ বশিষ্ট্যমুনির কাছে চার রাজকুমারের শিক্ষার জন্য আবেদন করলেন,’ মুনিবর, আমার অনুরোধ, রাজপুত্রদের আপনি শিক্ষাদানের ভার নিন। চার রাজকুমার রাম লক্ষণ ভরত শত্রুঘ্নকে আপনি রাজমহত্বের শিক্ষা প্রদান করুন। ‘

বশিষ্ট্যদেব এইবার রাজা দশরথকে বলেন, ‘ রাজন, এ অতি আনন্দের কথা। আমি চার রাজপুত্রকে ব্রাহ্মণত্বের শিক্ষা দান করব।’

রাজা দশরথ  কিঞ্চিৎ অবাক হলেন এবং বলে উঠলেন,‘ কিন্তু মুনিবর আমি রাজা দশরথ। আমার পুত্ররা ভবিষ্যতের একজন সুশিক্ষিত রাজা হয়ে গড়ে উঠবে সেটাই আমার কাম্য। আর আমার পুত্ররা তো ব্রাহ্মণ পদবাচ্য কেহই নয়! তারা বর্ণে ক্ষত্রিয়।’

বশিষ্ঠদেব বললেন,’ মহারাজ, আমি বলি শুনুন, পূজা আদি কর্ম ব্রাহ্মণ জাতির ধর্ম। আর আমি চাই রাজকুমারদের ব্রাহ্মণ্য বর্ণ বিশিষ্ট করে তুলতে। মানব চতুঃবর্ণ বিশিষ্ট মনের অধিকারী। গুণ অনুসারে মনুষ্য চারবর্ণে বিভক্ত। শূদ্রবর্ণ, সেবক জাতি। বৈশ্যবর্ন যাহার ব্যবসা ধর্ম। ক্ষত্রিয়বর্ন যিনি, তিনি শাসন কর্মকারি। কিন্তু ব্রাহ্মণ্যবর্ণ যিনি, তিনি একজন তপস্বী, যিনি সত্যকারের একজন অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মানব হয়ে ওঠেন। তিনি ভবিষ্যৎ অনুমান করতে সক্ষম। তিনি হ’ন একজন দ্রস্টাপুরুষ। রাম একজন দ্রস্টা হয়ে উঠবেন। সেইতো শিক্ষার প্রকৃত গুন।

দশরথ বুঝতে পারেন ঋষিবর বশিষ্ট্যই  হবেন রাজকুমার চতুঃষ্টয়ের প্রকৃত শিক্ষক। প্রকৃত শিক্ষা ছাড়া মানুষ উচ্চকর্ম এবং ঐশী শক্তিসম্পন্ন গুণময় সত্তা হতে উঠতে পারে না।

বশিষ্ট্যদেব বললেন,‘ মহারাজ , মানবের মানসিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির শিক্ষাই বড় শিক্ষা।’

রাজা দশরথ এবার হাতজোড় করে বলেন, ‘হে মুনিবর, আপনিই হবেন আমার পুত্রদের প্রকৃত গুরু ! আজ হতে আপনি চার রাজপুত্রর শিক্ষার ভার নিন। রাজকুমারদের প্রকৃত শিক্ষায় আপনি আলোকিত করে তুলুন।’ 

বশিষ্ট্যদেব হাত তুলে সম্মতি জানালেন, ‘ তথাস্তু ।’ 

রাজা দশরথ সমুচিতকালে চাররাজকুমারের চূড়াকরণ সম্পন্ন করে পঞ্চমবর্ষে বিদ্যাশিক্ষার্থে রাজকুমারদের গুরুগৃহে প্রেরন করলেন। অত: বশিষ্ট্যদেবের গৃহে রাজকুমারদের শিক্ষা শুরু হ’ল। বশিষ্ট্যদেব প্রযত্নপূর্বক রাজকুমারগনকে শিক্ষাদান করতে শুরু করলেন।

রাজপুত্রগন দুই বৎসরের মধ্যে বর্ণপরিচয় হতে ‘ক’ ‘খ’ আঠার ফলা বানান প্রভৃতি ও অষ্ট শব্দ পাঠ করতে শিখলেন। তাঁরা শব্দ ও বাক্য গঠন শিক্ষা সমাপন করে ব্যাকরন আদি অধ্যয়ন করতে শুরু করলেন। এই বার বালকদের দশমবর্ষ বয়ঃক্রমকালে উপনয়নাদি সংস্কার ও সম্পন্ন হল। অতএব কুমারগন এক্ষনে মন্ত্র উচ্চারণ ও হোম যজ্ঞাদি ক্রিয়াকর্ম শিক্ষালাভ করলেন। তাঁরা বেদমন্ত্র পাঠ করতে ও শিখলেন। বশিস্টদেব তাদের বেদমন্ত্র পাঠ করান, 

          যঃ পৃথিব্যাং তিষ্ঠন পৃথিব্যা অন্তরো 

    যং পৃথিবী ন বেদতে আত্মহন্তরযাম্যমৃতঃ।। [উপনিষদ]

  ‘বৎসগন অবধান কর, 

          যিনি পৃথিবীতে বিদ্যমান 

          অথচ পৃথিবী যাহাকে জানেন না, 

           তিনি অন্তর্যামী।  

          তিনি অমৃত, তিনি আত্মা।   

          ‘সর্বং খল্লিদং ব্রহ্ম। তজ্জলানিতি শান্ত উপাসিত।  [ উপনিষদ] – বৎস , সকলই ব্রহ্ম। তাহাকে শান্ত রূপে উপাসনা করিতে হয়। বৈদিক ঋষিগণ এই শান্তি-বিধৃত শক্তিরই ধ্যান করেছেন।  ওঁম তৎসত।

রাজকুমারগনও  এক্ষনে একই সাথে একই সুরে গুরু বশিষ্ট্যদেব সাথে উচ্চারন করেন ,’ ওঁম তৎসৎ’ ।

আইস ,আমরা এক্ষনে জগতের মাতা পিতা স্বয়ং দেবী পার্বতী ও পরমেশ্বরকে বন্দনা করি। 

শব্দ ও অর্থের সম্বন্ধ নিত্য। শব্দ ব্যতিরেকে অর্থের এবং অর্থ ব্যতিরেকে শব্দের জ্ঞান হয় না।

বৎসগন জগতের মাতা পিতা পার্বতী ও মহেশ্বর সেইরূপ নিত্যসংশ্লিষ্ট । উমা নিখিল শব্দসম্ভারের ধাত্রী এবং মহাদেব সমগ্র অর্থরূপ বিশ্বকে ধারণ করে আছেন।

এই বিশ্বসৃষ্টির মূলে  আছে  ‘শব্দ’ -পরা বাক। পরাবাক অর্থ হলো বাক বা শব্দের সর্বোচ্চ ও অতীন্দ্রিয় রূপ। এটি সৃষ্টির আদি এবং অবিনশ্বর চৈতন্যময় অবস্থা, যা কোনো সাধারণ শব্দ বা রূপের অতীত। এখান থেকেই সমস্ত শব্দ, ভাষা এবং জগৎ সৃষ্টি হয়েছে। পরাবাক: এটি মূলাধার চক্রে বা নাভিমূলে অবস্থিত এক পরম ও নীরব চৈতন্য। এটি সম্পূর্ণ অব্যক্ত ও অস্পর্শনীয়            

অতঃ রাজকুমারগন ক্রমে ক্রমে দ্বাদশবর্ষে পদার্পণ করিলেন।  

বশিষ্ট্যদেব এক্ষণে চার রাজকুমারকে সূর্য্যবংশ সম্বন্ধে অবগত করতে তখন বললেন, ‘ প্রিয় বৎস্যগণ, আমি এখন তোমাদের নিকট বিশাল সূর্যবংশ কথা বর্ণনা করব।’  – অবধান কর। 

রাজকুমারগন বললেন, ‘  যথা আজ্ঞা , গুরুদেব ।’

বশিষ্ট্যদেব বলতে থাকেন ,’ বৎসগন, অবধান ক’র, বৈবস্বত মনু নামে প্রসিদ্ধ একজন পৃথিবীর আদিম অধিপতি ছিলেন। তিনি বেদসমূহের আদিভূত প্রণবের ন্যায়। তিনি সপ্তম মনু অর্থাৎ মাননীয়। এই বৈবস্বত মনু হলেন সূর্য এবং সংজ্ঞার পুত্র। একে সাবর্নী বলে ও উল্লেখ করা হয়।  ইনি উক্ত নামেই অষ্টম মনু অর্থাৎ মাননীয় হইবেন। ইক্ষ্বাকু ছিলেন সূর্য বংশের প্রথম রাজা। সূর্যবংশ তৎপরে ইক্ষ্বাকু বংশরুপে পরিচিত হয়ে পড়ে।

সেই  ইক্ষ্বাকু বংশে দিলীপ নামে এক রাজা জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ক্ষত্রিয়ধর্ম স্বকার্য সাধনের উপযোগী শরীর পরিগ্রহ করেছিলেন। তিনি স্বীয় বল এবং তেজ: প্রভাবে সুমেরু পর্বতের ন্যায় শাস্ত্রজ্ঞান বিরাজিত ছিলেন। তাঁর আকৃতির অনুরূপ প্রজ্ঞা, তাহার প্রজ্ঞার অনুরূপ শাস্ত্রজ্ঞান এবং সেই মহান রাজার শাস্ত্রজ্ঞানের অনুরূপ কর্মানুষ্ঠান ছিল এবং তিনি সকল অনুষ্ঠানের অনুরূপ ফলপ্রাপ্ত হতেন। তিনি সমুদ্রের ন্যায় ভীষণ তেজঃপূর্ণ প্রতাপাদি ও  তিনি দয়াদাক্ষিণ্য আদি কমনীয় রাজগুনে রমণীয় ছিলেন। মহারাজা দিলীপ ‘মনু’ উক্ত পদ্ধতিতে প্রজা শাসন করিতেন। তিনি প্রজাগনের উন্নতির জন্য তাহাদের নিকট হতে ‘কর’ গ্রহণ করিতেন, যথা স্বয়ং সূর্যদেব সহস্রগুণ জলপ্রদানের নিমিত্তেই এই পৃথিবী হইতে জল আকর্ষণ করে থাকেন। তিনি নিরপেক্ষভাবে গুণের সমাদর করতেন। গুণী ব্যক্তির তিনি সমাদর করতেন । তিনি শত্রু কি মিত্র তাহা কখনোই বিচার করতেন না।’

এই বিশাল সূর্যবংশ বিশাল গুনশালী এবং পবিত্র এবং জগৎবিখ্যাত। কুমারগণ, অবধান ক’র, তোমাদের পূর্বপুরুষ দিলীপ এবং তস্য পুত্র রঘু প্রভৃতি উদারচেতা রাজা ও মন্বস্বীগন এই সূর্যবংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বাল্মিকী চ্যবন প্রভৃতি প্রাচীন পন্ডিতগন এই সূর্যবংশের বর্ণনা করেছেন। সূর্যবংশীয়গন সমুদ্র পর্যন্ত পৃথিবীর অধিশ্বর ছিলেন।  

ইক্ষ্বাকু রাজন্যবর্গ আজন্ম পরিশুদ্ধ। তাহারা অধ্যবসায়ী। তাই ইস্পিত ফলপ্রাপ্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা তাদের  কর্তব্যকর্মে নিযুক্ত  থাকতেন। সমুদ্র পর্যন্ত  বিস্তৃত ছিল তাহাদের  শাসন। তাহারা সার্বভৌম ও ঐশ্বর্যশালী ছিলেন। তাহাদের রথের গতি স্বর্গ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। বর্ণাশ্রম বিধি অনুসারে তাহারা অগ্নিতে আহুতি প্রদান করতেন। তারা  প্রার্থীদের  প্রার্থনা পূরণ করতেন। দুস্টের দমন ও শিষ্টের পালন তাদের রাজধর্ম। 

সূর্যবংশীয় নৃপতিগন সৎপাত্রে বিনিয়োগের জন্য অর্থসঞ্চয় করতেন। তাঁরা ভোগবিলাসে কখনোই কোনরূপ অর্থ নস্ট করতেন না। তাঁরা ছিলেন সত্যবাদী এবং মিতভাষী। তাঁরা অপ্রয়োজনীয় বাগাড়ম্বর পরিহার করে চলতেন। সপ্তদ্বীপা রত্নপ্রসু ধরিত্রির তারা একছত্র সম্রাট ছিলেন। যশোলাভের জন্য তারা মাত্র যুদ্ধ করতেন।  

সূর্যবংশীয় নৃপতিগন শৈশবে ব্রহ্মচর্যাশ্রমে বিদ্যাভাস করতেন। যৌবনে গৃহস্ত আশ্রমে বিষয় ভোগ করতেন ।  বার্ধক্যে বানপ্রস্থাশ্রমে মুনিগনের ন্যায় জীবনযাপন করতেন এবং অন্তিম বয়সে তাঁরা ধ্যানযোগে পরমাত্মার চিন্তায় শরীর ত্যাগ করতেন। 

তাহারা যথাবিধি অগ্নিতে আহুতি প্রদান করতেন। কামনা অনুসারে যাচকগণকে অর্চনা করতেন। অপরাধ অনুসারে দণ্ডবিধান করতেন। তারা যথাকালে কর্মানুষ্ঠান করতেন। তারা বিতরণের নিমিত অর্থসঞ্চয় করতেন। তারা সত্যের নিমিত্ত মিতভাষী থাকতেন। তারা যশোলাভের জন্য জয়লাভের ইচ্ছা করতেন।  বৎসগন, আমি এক্ষনে আমার জ্ঞানমতে তোমাদের সকলের সমক্ষে  রঘুবংশীয় রাজগণের বংশকীর্তন করছি।’

প্রথম কুমার রাম অতঃ জিজ্ঞাসেন, ‘ গুরুদেব, সূর্যবংশ হতে ইক্ষ্বাকু বংশ যদি, তবে রঘুবংশীয় কিরূপ ?’  

বশিষ্ট্যদেব কহিলেন, ‘ উত্তম প্রশ্ন । শোনো বৎস ! রাজা দিলীপ এর পুত্রের নাম ছিল রঘুবর। তিনি তোমার প্রপিতামহ। তিনি হয়ে উঠেছিলেন তাঁর পিতার ন্যায় গুণসম্পন্ন একজন দানবীর রাজা। তাঁর নাম হতেই এই ইক্ষ্বাকু বংশ তৎপরে  রঘুবর এর পরিচয়ে অবশেষে রঘুবংশ হয়ে উঠল। বৎসগন, এ এক মহান বংশ কথা। ক্রমে রঘুবর বড় হয়ে উঠলেন এবং যৌবনে পদার্পণ করলেন এবং তিনি শস্ত্র ও শাস্ত্রে পন্ডিত হয়ে উঠলেন। রাজা দিলীপ তার পুত্র রঘুকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করলেন। 

রাজা দিলীপ তাঁর জীবনের শততম অশ্বমেধ যজ্ঞের ইচ্ছা করলেন। শততম অশ্বমেধ যজ্ঞে ইন্দ্রত্ব পদপ্রাপ্তি হয়। তিনি তাঁর পুত্র রঘুর হাতে অশ্বমেধ যজ্ঞের নির্দিষ্ট এক সুন্দর অশ্বের ভার দিলেন। রঘু তাঁর সৈন্য সমভিব্যাহারে সেই অশ্বকে নিয়ে দেশ প্রদক্ষিনে গেলেন। কিন্তু একদিন হঠাৎই সেই অশ্ব কোথাও সম্পূর্ণ নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। 

              অশ্ব হারাইয়া ভাবে দিলীপ নন্দন

          ইন্দ্র বিনা ঘোড়া মোর লবেন কোন জন ? [কৃত্তিবাস ]

এইবার রঘু তাঁর তৎপরতায় অশ্ব অপহরনকারী দেবরাজ ইন্দ্রকে পথিমধ্যে ঘোড়া সমেত ঘিরে ফেললেন এবং  হুংকার দিয়ে বলে উঠলেন, ‘ দেবরাজ এ আপনার অত্যন্ত অন্যায়। আপনি কেন আমার পিতার অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়া চুরি করে আমার পিতার যজ্ঞের বিঘ্ন করতে উদ্যত হয়েছেন। ইহা আপনাকে শোভা পায় না। আপনি আমাদের যজ্ঞের ঘোড়াকে ফিরিয়ে দিন।’

ইন্দ্র বললেন, ‘তোমার পিতা মহারাজ দিলীপ আমার ইন্দ্রত্বলোপ করতে প্রয়াসী হয়েছেন। তিনি তার শততম অশ্বমেধ যজ্ঞ করে আমার ইন্দ্রত্ব খর্ব করবেন। এ  অসম্ভব ! আমি এই অশ্বকে ছেড়ে দিতে পারি না।

যুবরাজ রঘু বললেন, ‘  বেশ , তবে রণং দেহী !’

ইন্দ্র বললেন , ‘তথাস্তু !’  এইবার শুরু হল তুমুল যুদ্ধ রঘুবরের সঙ্গে ইন্দ্রদেবের । 

              দুই জনে বাণ বৃষ্টি যেন জল ঘনে ,
              দুই জনে যুদ্ধ করে কেহ নাহি জিনে ।। [কৃত্তিবাস ]

রঘু তখন পাশুপত বাণে ইন্দ্রদেবকে বন্দী করে যজ্ঞের অশ্বসহ রাজ্যে ফিরলেন এবং সাতদিন ইন্দ্রকে অযোধ্যানগরে বন্দী করে রাখলেন। তখন স্বয়ং ব্রহ্মা এবং সকল দেবগনসহ রাজা দিলীপের কাছে এসে ইন্দ্রের মুক্তি প্রার্থনা করলেন।

রাজা দিলীপ বললেন, ‘ভগবন, আমার অশ্বমেধ যজ্ঞের বিঘ্নে আমি হতমান।’ 

ব্রহ্মা বললেন, ‘ ইন্দ্র তোমার অসমাপ্ত যজ্ঞের ফল প্রদান করবেন।’

ইন্দ্র বললেন,’ রাজন আমি বর দিলাম আপনার যজ্ঞ বিধিপূর্বক সমাপন না হলে ও আপনি এই যজ্ঞের পরম ফলভাগী হবেন।’

                     বিধাতা বলেন রাজা , তুমি পুন্যবান
                    তোমার তনয় রঘু তোমারই সমান ।।
                    আর কি বা বর দিব তোমার রঘুরে
              রঘুবংশ বলি যশঃ ঘুষিবে সংসারে ।। [ কৃত্তিবাস ] 

রাম বললেন, ‘অপূর্ব কথন গুরুদেব !’

বশিষ্ট্যদেব বললেন, ‘ বৎসগন, এ হল তোমাদের পূর্বতন সূর্যবংশীয়দের পুণ্য যশোগাঁথা। রাম, অবধান ক’র, আমি যে যে মাননীয় এবং পূজ্যব্যক্তিগণের গুণকীর্তন করছি তোমরা ও তোমাদের চরিত্রে ও ব্যক্তিত্বে সেই গুণাবলীকে আরোপ করবে এবং তৎপদাঙ্ক অনুসরণ করে তোমাদের আপন আপন চরিত্র এবং ব্যাক্তিত্বকে গুনবান করে তুলতে চেষ্টা করবে। ইহাই শিক্ষা। 

রাম বললেন, ‘ যথা আজ্ঞা গুরুদেব !’

বশিষ্ট্যদেব বললেন, ‘ সকলকে যথাবিহিত সৌজন্য ও সন্মান প্রদান করিবে। তাহাই গুণ এবং তাহাই শিক্ষা এবং তাহাই  বিশিষ্ট পরিবারের পরিচয় !  সকলকে যথাবিহিত সৌজন্য ও সন্মান প্রদান করিলে তাহা শতগুণে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। রাজকুমারগন, তোমরা অবগত হও, পূর্বজন্মের কর্মবাসনা লয়েই আমরা জন্মগ্রহণ করে থাকি। পূর্বজন্মে যে সমস্ত কর্ম করা হয়েছে তাহার সংস্কার বা বাসনা সতীসাব্ধি স্ত্রীর ন্যায় জীবাত্মাকে জন্ম হতে জন্মান্তরে অনুসরণ করে। তাই এই জন্মে যার যে বিষয়ে প্রবণতা দেখা যায় তাহা তাঁর পূর্বজন্মের কৃত কর্মের ফল বলেই আমরা ধরে নিই। সুতরাং জন্মান্তরীণ সংস্কার তেমনই গুঢ়ভাবে আমাদের মধ্যে অবস্থান করে এবং তাহা কেবল ফলের দ্বারাই অনুমেয় হয়ে থাকে।’

প্রথম কুমার রাম এইবার স্বতঃ প্রণোদিতভাবে গুরু বশিষ্ট্যদেবকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘ গুরুদেব এই যে যজ্ঞ, এই যে তপস্যা , ইহা কি মানবের নিজ শক্তি ও সম্পদের আকাঙ্ক্ষার কারণে ?’

বশিষ্ট্যদেব বললেন,‘ অতি উত্তম প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেছ বৎস রাম। এক্ষনে আমি বলি, অবধান ক’র  রাজকুমার !  এই যে যজ্ঞ, এই যে তপস্যা, এতদ সব আমাদের সম্পদ তাহা আমাদের শৌর্যশক্তি বৃদ্ধির কারণে নয়। বরং এই যজ্ঞ এবং এই তপস্যা আমাদের মনের প্রসারতার জন্য। আমাদের স্বার্থকুটিল বদ্ধমনকে মুক্ত করে দেওয়ার চেষ্টাই এহ যজ্ঞ । যত প্রকার ক্ষুদ্রতা নীচতা হতে মনকে মুক্ত করে সেই অসীমের ভাবনায় মনকে উদ্বুদ্ধ করা এবং মনকে অহং হতে আত্মার সন্ধানে রত করা, বৎস সেই সে কর্মই হ’ল যজ্ঞ এবং তাই হ’ল তপস্যা।

রাজপুত্রগন ক্রমে ক্রমে তাহাদের অসাধারন ধীশক্তি ও বিপুলতর পরিশ্রম সহকারে সর্বশাস্ত্রে পারদর্শী  হয়ে উঠলেন। তাহারা চৌদ্দ বৎসরে চতুঃষষ্টি বিদ্যাতে তৎপর হয়ে উঠলেন।

বশিষ্ট্যদেব রাজা দশরথকে বললেন,‘ মহারাজ, আপনার চারপুত্র এক্ষণে সর্বশাস্ত্র বিশারদ ও বিভিন্ন শস্ত্রে পরম পারদর্শি হয়ে উঠেছেন। তাহারা এক্ষনে ষোড়শবর্ষে পদার্পণ করেছেন। তাহারা এক্ষনে আপনার রাজ্য চালনায় আপনার সুযোগ্য সহকারী হয়ে ওঠার যোগ্যতা লাভ করেছে্ন। আপনি তাদের আশীর্বাদ করুন।’

রাজা দশরথ বললেন, ‘গুরুদেব, আমি কৃতার্থ আপনার কাছে। আমার এবং আমার পুত্রগনের বিশেষ সৌভাগ্য যে তাঁরা সকলে আপনার কাছে শাস্ত্র ও শস্ত্রশিক্ষা প্রাপ্ত হয়ে আজ সব দিক হতেই বিশেষ উপযুক্ত হয়ে উঠেছে। আমি আপনাকে যথোপযুক্ত সন্মান দক্ষিনা প্রদান করতে চাই।’

বশিষ্ট্যদেব প্রীত হলেন। সকল পাত্র মিত্র অমাত্যগন সহর্ষে  বলে উঠলেন, ‘ সাধু সাধু ।’

দশরথ এক্ষনে পুত্রদের শিক্ষাগুরু দীক্ষাগুরু এবং যিনি স্বীয় কুলগুরু, সেই বশিষ্ট্যদেবকে কয়েক সহস্র গাভী এবং নানা  যজ্ঞ  উপকরন রাজকুমারগনের হাত দিয়ে পরম শ্রদ্ধাপূর্বক প্রদান করিলেন।

রাজপুত্রগন ষোড়শ বৎসরকাল নিবিষ্ট মনে বশিষ্ট্যদেবের কাছে শিক্ষা লাভ করেছেন। তারা পরমজ্ঞান প্রাপ্ত হয়ে এক্ষনে সকলেই পিতামাতার চোখে উপযুক্ত যুবা হয়ে উঠেছেন।

দশরথ চোখের সামনে পুত্রদের বড় হতে দেখলেন। তাঁরা বেদবেদান্ত অধ্যয়ন করেছেন। তাঁরা চার যুবরাজ এবার যুদ্ধবিদ্যা ধনুর্বিদ্যা এবং রথচালনা সবেতেই খুব পারদর্শী হয়ে উঠেছেন। রাজকুমারগন সকলেই সুরলোক হিতে রত হলেন এবং তাহারা জ্ঞানবান ও গুণবান হয়ে উঠলেন। 

অতঃ তেজস্বী পরাক্রমশালী রাম নির্মল শশাঙ্কের ন্যায় সকলের প্রীতি লাভ করলেন। তিনি পিতা দশরথের সর্বকার্যে অনুরক্ত হলেন। তিনি রাজা দশরথের রাজসভায় বসে রাজকর্ম আলোচনা দেখতে কখনো পাত্র মিত্র অমাত্যদের মধ্যে গিয়ে আসন গ্রহন করতেন। আবার কক্ষনো মন্ত্রীবর সুমন্ত্রর পাশে পরমস্নেহে স্থান পেতেন। তিনি যে রাজপুত্র। তিনি সকলের প্রিয়। অন্যদিকে লক্ষণ বাল্যকাল হতেই সর্বদা রামের প্রিয়কার্য অনুষ্ঠান করতেন এবং তিনি রামের দ্বিতীয় প্রাণতুল্য ছিলেন এবং ভরত ও  শত্রুঘ্নের মধ্যেও সেইরূপ স্নেহসম্বন্ধ স্থাপিত হ’ল।

একদিন রাজা দশরথ পুরোহিত এবং মন্ত্রীদের সঙ্গে পুত্রগনের বিবাহ ব্যাপারে  আলাপনরত। এমত সময় মন্ত্রীবর সুমন্ত্র রাজা দশরথের নিকট সংবাদ নিয়ে এলেন,’ মহারাজ, মহামুনি বিশ্বামিত্র রাজদর্শনে আগমন করতে অভিলাষ জানিয়েছেন।’

দশরথ কিঞ্চিৎ অবাক হয়ে মহামন্ত্রী সুমন্ত্রর দিকে তাকান এবং অতি বিস্মিতভাবে উচ্চারণ করেন, ‘মহামুনি বিশ্বামিত্র ? অহো , সে  যে আমার পরম সৌভাগ্য।’

‘মহামুনি বিশ্বামিত্র!’ কে না চেনেন তাঁকে ! তিনি একজন রাজা এবং একজন অদ্বিতীয় তপস্বী। কৌশাম্বীর রাজা গাধির পুত্র কৌশিক। দুর্ধর্ষ ক্ষত্রিয় নরপতি তিনি। একদা চতুরঙ্গ সেনা নিয়ে গেলেন মৃগয়ায়। পথে ঋষি বশিষ্ট্যদেব এর আশ্রমে অতিথি হলেন। বশিষ্ট্যদেবএর একটি কামধেনু ছিল যা সর্বমনোরথ সম্পন্নকারী এবং যা দেবাসুরের সমুদ্রমন্থন হতে উত্থিত হয়েছিল। কামধেনু এক পবিত্র গাভী,  যাহা সমস্ত কামনা পূরণ করতে পারত।  বশিষ্ট্যদেব  তাঁর কামধেনুর সহায়তায় সকল অতিথিকে আপ্যায়িত করলেন।  কিন্তু রাজা কৌশিক এমন অপূর্ব এক গোধনের লোভে তখন ঋষির কাছে কামধেনুটি চেয়ে বসলেন। বশিষ্ট্যদেব এতে  সন্মত হলেন না। ক্রুদ্ধ কৌশিক তখন জোরপূর্বক সেই কামধেনু অধিকার করতে চেয়ে বশিষ্ট্যদেবকে আক্রমন করে বসলেন। কিন্তু কৌশিকের অস্ত্রশক্তি বশিষ্ট্যদেব এর ব্রহ্মবলের কাছে পরাজিত হল। অপমানিত কৌশিক তখন দিব্যশক্তি আয়ত্ত করতে হিমালয়ে গমন করলেন তপস্যা করতে। তপস্যায় দিব্যশক্তি আয়ত্ত করে তিনি বশিষ্ঠের উপরে প্রতিশোধ নেবেন এই ছিল তাঁর মনোবাসনা। কিন্তু বারবার তাঁর তপস্যার স্খলন হতে থাকল। তথাপি তিনি অদম্য জেদে এবং তাঁর তপস্যায় স্বর্গকে বিচলিত করে তুললেন। তাঁর তপস্যা একদিন সফল হ’ল। এইবার সকল দেবতা তাঁকে ব্রাহ্মনত্বে বরন করে নিলেন। অনেক বাধা পার হয়ে কৌশিক হলেন ব্রহ্মর্ষি। তিনি বিশ্বামিত্র উপাধি লাভ করলেন। বশিষ্ট্যদেব এইবার তাহাকে ‘ ব্রাহ্মন’  বলে আখ্যায়িত করলেন। যে মন্ত্রে ব্রাহ্মন হয় দ্বিজ, সেই ব্রহ্মগায়ত্রীর মন্ত্রদ্রস্টা ঋষি হলেন স্বয়ং বিশ্বামিত্র। কোশলরাজ কিশোর রঘুবংশমনি শ্রীরামচন্দ্র এই ঋষি বিশ্বামিত্রের হাত ধরেই তাঁর কৈশোর হতে শ্যামগৌরব সুখধাম যৌবনে উপনীত হবেন। সেই সংবাদ আগামীতে। 

                                                   [আদিকান্ড ২ ]

| ২ |

সীতা সংবাদ

এক্ষনে বলি শুন সীতার জন্মকথা , 

মিথিলা নগরে সে জনক রাজার দেশে।

যজ্ঞভূমি চষে্ন রাজা যজ্ঞ কারনে হেথা ,

 চষিতে পাইল কন্যা ডিম্বাকৃতি বেশে ।।

চাষভূমে কন্যা পাইল জনক মহাঋষি ,

অযোনিসম্ভবা কন্যা লক্ষী মূর্তিমতী ।

সর্বদিক আলো করি কন্যা সে রূপসী ,

স্বর্গ হতে পুষ্পবৃষ্টি দেবের সংহতি ।।

ঘুম ভাঙ্গে যেন কন্যার হাসি ভরা মুখ

কোলে তুলি ভাবেন জনক এ কন্যা কাহার !

  পুরজন ছিল পাশে পাইল ভারি সুখ 

জনক রাজায় বলেন সবে, এ কন্যা তোমার।।

চলেন রাজা কন্যা লয়ে  এবে নিজ ঘর 

রানীগনে দেখান কন্যার স্বর্গীয় সেই রূপ !

 কন্যা দেখি রানীগন জিজ্ঞাসেন পরস্পর 

কার কন্যা কহ রাজন , ধরে এত রূপ ?

জনক বলেন কন্যা পাইলাম লক্ষ্মী মূর্তিমতী

অযোনিসম্ভবা কন্যা পাইলাম চাষে তথা !

আমা গৃহে আসিলেন কে জানে কোন কৃতি

লাঙ্গলের মুখে জন্ম, নাম দিলাম সীতা।। [স্বরচিত ]

হল্প্রবাহ। হালচাষের উৎসব। বর্ষার প্রারম্ভে বীজবপন করার উদ্যোগ নিতে উৎসুক সকল মিথিলাবাসী। এখন চাষের সময়। নগরের সামান্য দূরে জনবসতির কিছু দূরে পাহাড়ের প্রায় গায়ে অনেকখানি অকর্ষিত ভূমি এবং সেই ভুমির অপরদিকে ঘনঘোর জঙ্গল। জঙ্গলের এ পাশে এক বিশাল ভুখণ্ডকে চাষের উপযোগী করে তোলা হয়েছে। গহন ওই জঙ্গল থেকে চাষের ভূমিকে আলাদা করতে বেড়া দিয়ে চাষের জমি তৈরির উদ্যোগ চলছে। এখনো অন্ধকারময় জগত। মানুষ ঘুমিয়ে থাকলে ও জীবজগত সব জেগে উঠেছে। এই অন্ধকারময় ভোরকে বলা হয় ব্রাহ্মমুহূর্ত। ব্রাহ্মমুহূর্তের দেবতা ইন্দ্র। ব্রহ্মমুহূর্তে ঈশ্বর আরাধনা এক শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত।  

আজ এই ব্রাহ্মমুহূর্তে মিথিলাবাসি সব চাষি প্রজাগন ভূমিপূজন করে কৃষিযজ্ঞের আয়োজনে সকলে এসে জমায়েত হয়েছেন এই বিশাল জঙ্গলের প্রান্তে। এই ঘনঘোর বনভুমির গাছে গাছে বুলবুলি দোয়েলর তীক্ষ্ণ ডাক মুহুর্মুহুর সেই বিশাল চরাচরের নিস্তব্ধতা ভেঙে দিচ্ছে। মধ্যে মধ্যে দূর হতে হরিনের ডাক ও ভেসে আসছে। তারা সব তাকিয়ে দেখছে মানুষের কর্মকাণ্ড।  

এক্ষনে ভূস্বামীগণ এবং ভূমিকর্ষণকারীগন সকলে এসে জমায়েত হয়েছেন সেই ভূমিখন্ডে। এখন মাত্র রাজা জনকের আসার অপেক্ষা। রাজ্যবাসী ভুমিঅধিকারিগন সকলে আজ রাজা জনককে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন সেই উন্মুক্ত প্রান্তরে হল্প্রবাহের উৎসবে। এই বৎসর চাষের জন্য সর্বপ্রথম এই প্রান্তরের জমিতে নিয়মমত লাঙ্গল চষে চাষকর্মের উদ্বোধন করতে আসবেন রাজা জনক। তিনি সকলের প্রিয় ।  

রাজা জনক ভীষণ ধার্মিক মানুষ। তিনি প্রজা অনুরঞ্জক। মিথিলাবাসীর কাছে রাজা জনক ভীষণ ভীষণ এক প্রিয় মানুষ। তিনি রাজ্যবাসির সব সুখদুঃখ আনন্দ বেদনার অংশীদার।  জনক তাহার কূলগত উপাধি। আসলে হ্রস্বরোমার পুত্র জনকের প্রকৃত নাম সীরধ্বজ। কিন্তু তিনি জনক নামেই সুবিদিত। সেই রাজা জনক এসে জমি চাষ করে কৃষিকর্মের উদবোধন করবেন। রাজ্যবাসির কাছে এ এক ভীষণ আনন্দের কথা। এবং সেই কর্মোদ্যোগে একটি নতুন লাঙ্গল স্বর্ণমন্ডিত এক নিড়ানি সহযোগে মাটি চাষ করার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। একজোড়া নয়ন শোভন উন্নত শিং ধ্ববল বর্ণ বলীবর্দ অদ্য এমন অনুন্নত জমিকর্ষণের জন্য আনা হয়েছে। হীরা আর মোতি তাদের নাম। তাদের দেখতেই অনেকে ভীড় করেছে কৌতুহলে।

মিথিলারাজ রাজা জনক এবার বাদ্যঘন্টা তূরীভেরি সমন্বিত ধ্বনির মধ্যে নুতন জমির কাছে এসে দাঁড়ালেন। পুরোহিতগন শুরু করলেন দেব আহবান। জমি পূজা করা হল। 

রাজা জনক এবার নুতন স্বর্ণমন্ডিত নিড়ানী দিয়ে মাটিতে লাঙ্গল প্রোথিত করলেন। এইবার সবার হর্ষ ধ্বনির মধ্যে রাজা সেই অকর্ষিত ভূমি চাষ শুরু করলেন। কঠিন মাটি। অনুর্বর জমি। কয়েকবার কর্ষণের পর মাটি তৈরী হলে অতঃপর তা শুধু বীজ পড়ার অপেক্ষায়। জমির এ প্রান্ত হতে ও প্রান্ত দুই বলদ হীরামোতি ভীষণ স্ফূর্তিতে লাঙ্গল টেনে নিয়ে চলেছে। জমিতে লাঙ্গল দিয়ে মাটি চাষ করতে শুরু করে হঠাৎ এক জায়গায় নিড়ানীর মুখে কিছু একটা অনুভব করে রাজা থমকে দাঁড়ালেন। এ কি দেখছেন ! ছোট ছোট চাঁপার কলির মত আঙ্গুল একটা ডিমের ভেতর থেকে বেরিয়ে রয়েছে। এ কি ! এ যে এক শিশু কন্যা। উপস্থিত সকলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।  কি অদ্ভুত ! এ কি ভাবে সম্ভব? 

রাজা জনক দ্রুত হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে নীচু হয়ে সেই ডিম্বাকৃতি পদার্থ থেকে ভেঙ্গে বার করে আনলেন শিশু কন্যাটিকে। সকলে উদ্গ্রীব হয়ে তাকিয়ে থাকে। নবপ্রভাতকিরনে সমবেত মিথিলাবাসী সকলে এক অদ্ভুত আনন্দে বরণ করে নেয় সেই হলকর্ষণে উঠে আসা ভূমিজাতিকাকে  সহর্ষে ।

রাজা জনক ফুলের মত ফুটফুটে শিশুকন্যাকে দেখে অবাক হয়ে যান। আলোকজ্জ্বল এক অবয়ব। যেন ধরিত্রী কন্যা। সে যেন সত্যি সত্যি অপেক্ষায় ছিল এমন একটি সুন্দর মুহূর্তের। 

রাজা জনক সযত্নে কোলে তুলে নিলেন সেই ধরিত্রি কন্যাকে। আকাশ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে এখন। নুতন ঊষাকাল। 

প্রথম সূর্যের আলো এসে পড়ে তার মুখে। কন্যা কেঁদে ওঠে ‘ওঁয়া ওঁয়া‘ করে। রাজা জনক এক শুদ্ধ বস্ত্র খন্ড হাতে পেয়ে তাই দিয়ে জড়িয়ে ধরেন চন্দ্রাননা স্বর্গীয় প্রভাময়ী শিশুকন্যাকে। অতঃ এক পিতার মমতায় সেই কন্যাকে কোলে জড়িয়ে ধরে শরীরের ওম দিয়ে তাঁকে পরমযত্নে কোলে ধরে মৃদু মৃদু দোলা দিয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে দেখতে থাকেন। 

ভূমিজা কন্যা যেন মুদিত নয়নে হেসে ওঠে ভীষন খুশিতে। একবার সে যেন চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল বুঝি রাজা জনকের মুখের দিকে। যেন কন্যা দেখে নিলো কে তাঁকে পরম মমতায় কোলে তুলে নিয়েছেন ! কেউ যেন খুব যত্নে রেখেছিলো এমন দেবশিশুকে। 

রাজা জনক  অবাক হয়ে ভাবেন,  ‘এ কে ? এ কার কন্যা ? ‘ 

সকলে বলে ওঠেন, ‘মহারাজ, এ ভূমিজা। ধরিত্রি কন্যা। ঈশ্বর আপনার কোলে এই কন্যা সন্তানকে পাঠিয়েছেন। আপনি এর পিতা। আপনি একে পালন পোষণ করুন।’ 

রাজা জনক আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। এমন কন্যার পিতা হওয়া সে যে এক ভীষণ সৌভাগ্যের ব্যাপার।  রাজা সেই ভূমিজাতিকাকে বাহুপাশে তুলে নিলেন বুকের কাছে। স্নেহসিক্ত দৃষ্টিতে সেই দেবকন্যাকে দেখলেন। তারপর সবার সন্মুখে তিনি ঘোষণা করলেন,‘ বেশ,  তবে আমি এই কন্যার জনক হওয়ার গৌরব লাভ করলাম। ‘

তুমুল হর্ষধ্বনির মধ্যে সকলেই সেই আবেদন  অনুমোদন করলেন। 

রাজা জনক আবার ঘোষণা করলেন,  ‘আজ হতে তবে এই কন্যার নাম হোক সীতা। মিথিলার রাজকুমারী মৈথিলি। এঁকে সকলে জানকি ও বলতে পারো। ‘ 

প্রজাবৃন্দ সকলে তুমুল হর্ষধ্বনি করে ওঠেন। সেই সঙ্গে বাদ্যঘন্টা তূরিভেরি আর  শঙ্খধ্বনিতে সেই বনভুমি আকুল হয়ে ওঠে। বনের চিত্রল হরিন বনভূমি মাতিয়ে ডেকে  ওঠে। বনের পক্ষীকুল সকলে আনন্দে কলরবে মেতে উঠল । রাজ্যবাসী  প্রজাগন অতএব সকলে মিলে ভেরী শিঙ্গা বাজাতে শুরু করে। 

পুরোহিতগন মন্ত্র পড়ে পুণ্যবারি  সিঞ্চন করে নবজাতিকাকে অভিনন্দিত করলেন। 

‘ ওং ভুমিজাং বৈদেহী মৈথিলি  

শুভতিথিতে আবির্ভূতা জনক নন্দিনি জানকী সীতা   

লীলয়া বিততং বিশ্বং ।।   

পরম হর্ষ ও আনন্দ উল্লাসের মধ্যে সন্তানহীন রাজা জনক এক্ষনে পরম গর্বিত পিতার পদপ্রাপ্ত হলেন।

অতঃ রাজা জনক সদ্যলব্ধ সেই দেবকন্যাকে কোলে নিয়ে রাজপ্রাসাদে গমনপূর্বক রাজমহিষীদের  সম্মুখে তাকে প্রতিস্থাপন করলেন। 

রাজমহিষীগন অত্যন্ত অবাক হয়ে গেলেন কন্যার রূপ দেখে। তাঁরা রাজা জনককে জিজ্ঞাসা করেন,‘ মহারাজ, এ কি আশ্চর্য ! কোথায় পেলেন এই অপরূপ কন্যাকে ?’

রাজা জনক বললেন,’ ভুমিকর্ষণকালে এই কন্যা উঠে আসে ধরিত্রির বুক হতে হলকর্ষণের ফলকে। লাঙ্গলের ফলকে জন্ম। তাই  আমি এই দেবকন্যার নাম রাখলাম সীতা।’

রাজা জনকের মহিষী সুনয়না বলেন, ‘ অহোঃ , কি সুন্দর ! আমি এই কন্যার নাম দিলাম বৈদেহী।’  

রাজা কুশধ্বজ, যিনি জনক রাজার ভাই , সহর্ষে বলে উঠলেন,‘ আমি এই অযোনিজা কন্যার নাম দিলাম মৈথিলি।’

রাজা কুশধ্বজ এর স্ত্রী বললেন,‘ আমি এই কন্যার নাম দিলাম, ‘জানকী।’

ধরিত্রি কন্যাকে পেয়ে সকলে হরষিত। কত রকম আদরে যে তার মন পাওয়া যেতে পারে তাই নিয়ে সকলের মধ্যে যেন সে এক হর্ষময় প্রতিযোগিতা। 

রাজ্যে যেন আনন্দের বাণ ডাকল। সবাই সেই অপরূপা কন্যাকে দেখতে উৎসুক। তাঁর হাসি, তাঁর কান্না, তাঁর চাহনি, তাঁর ঘুমন্ত রূপ সারারাজ্যে যেন এক হাসিকান্না হীরাপান্নার উৎসব এনে দিল।  সেই ভুমিজা কন্যার হাত ঘুরিয়ে চাঁদকে ডাকা তার পায়ের মলের অপরূপ রুনুঝুন নিক্কন তাঁর চলার ছন্দে ভালো মন্দে  উঠল বেজে তালে তালে।

সবার নয়ন মনি হয়ে উঠলেন জানকী রানী। তিনি বৈদেহী । তিনি মৈথিলি ।

রাজা জনক বলেন, ‘ মহামান্য গনকগন , আপনারা আমার এই অযোনিজা কন্যার ভাগ্যগননা করে দেখুন !’ 

গনৎকার ব্রাহ্মনগন গননা করতে বসলেন ধরিত্রি কন্যার ভাগ্যফল। 

কন্যা সুলক্ষনা। বিদুষী। রাজমহিষী। তবে দৈব এই যে কন্যা হবেন বনবাসী। রাক্ষস কতৃক নিপীড়িতা। সুসংবাদ এই যে তিনি হবেন দুই পুত্রের জননী।

রাজা জনক বলে উঠলেন,‘ এ কি অদ্ভুত গণনা? এ কি প্রলাপ ? না , আবার গণনা হোক। এ কেমন মিশ্র ফল ? কন্যা হবেন বনবাসী ? রাক্ষস কতৃক নিপীড়িতা ? এ কিসের ইঙ্গিত ?’  রাজজ্যোতিষীগণ আবার গণনা  শুরু করলেন। নাঃ এবারে ও সেই একই ফল। নিঃসংশয় নির্ভুল ।

রাজা জনক বড় চিন্তায় পড়ে গেলেন। রানী সুনয়নার সঙ্গে গভীর আলোচনা করলেন। এ যে কন্যা সন্তান। সে কেন হবে বনবাসী ? অসম্ভব। এমন গণনা কে মেনে নিতে পারে ?

রাজা জনক এবার ভূমিজা কন্যা সীতাকে রাজকুল আরাধ্যদেব মহাদেবের চরণে সমর্পণ করলেন।

 ‘হে দেবাদিদেব এ কন্যার ভবিষ্যৎ কি ? আমার সুকর্মে যদি এই কন্যা আমি পেলাম মাতা ধরিত্রির বুক হতে তবে তুমি এঁকে দেখো। এই কন্যা হবে রাক্ষস নিপীড়িতা ?  সে কেমন বিড়ম্বিত ভাগ্য হে দেবাদিদেব ?

রাজা জনকের ধ্যানে মহাদেব প্রকট হলেন। রাজা জনক সীতার জন্ম কথা নিবেদন  করলেন। 

দেবাদিদেব মহাদেব বললেন, ‘ রাজা জনক, স্বয়ং লক্ষীদেবী এই পৃথিবীতে প্রকট হয়েছেন নারায়ণের আদেশে। রাজা জনক, এই নাও,  এই আমার হরধনু। এই হরধনু দেব-দেবতা গন্ধর্ব অসুর সকলের পক্ষেই ভীষণ ভারসম্পন্ন। এই ধনুককে হাতে তোলা সকলের পক্ষে এক ভীষণ শক্তির পরীক্ষা। যে এই হরধনুতে জ্যা রোপণ করতে সক্ষম হবেন, তোমার কন্যা সীতা হবেন তাঁরই। স্বয়ং নারায়ন আসবেন তোমার কন্যা সীতার পাণিগ্রহণ করতে। মর্ত্যলোকে লেখা হতে চলেছে এক ইতিহাস।’

রাজা জনক দেবাদিদেব মহাদেবের বাক্যে অত্যন্ত  আপ্লুত হয়ে গেলেন। কিন্তু এই  কন্যা রাক্ষস কতৃক হবেন নিপীড়িতা , সে কেন ? কি ভাবে তা সম্ভব ?

মহাদেব হাসলেন। তিনি এইবার তাঁর দক্ষিনহস্ত তুলে রাজা জনককে আশ্বস্ত করে বললেন ,’ শুনুন রাজা জনক, স্বয়ং নারায়ন এসেছেন এই ত্রেতা যুগে তাঁর আরব্ধকর্ম সম্পন্ন করতে পৃথিবীতে। তিষ্ঠ রাজন। হত হবেন রাবণ।’ 

ফুলের মালা দীপের আলো ধুপের ধোঁয়ার পিছন হতে রাজা জনক বুঝি কোন অজ্ঞাত ঘটনার আভাষ পেলেন। এই অযোনিজা কন্যা সীতা কি সেই অজ্ঞাত ঘটনার কারন সুত্র? কে জানে ?

এ যেন এক বিশাল ইতিহাস রচিত হতে চলেছে মহাকালের বুকে । 

                                        [আদিকান্ড ২ ]

| ৩ |

দশরথ সকাশে বিশ্বামিত্র

[সর্গ  ১৮ -২১]

একদিন রাজা দশরথ পুরোহিত ও মন্ত্রীদের সঙ্গে পুত্রগনের বিবাহ বিষয়ে আলোচনারত। এমত সময়ে অযোধ্যা প্রাসাদদ্বারে এক ভীষন হট্টগোল উত্থিত হতে শোনা গেল।

বিশ্বামিত্র এসেছেন। সে কি ! ঋষি বিশ্বামিত্র ?  হ্যাঁ , সেই তিনি , স্বয়ং ঋষি বিশ্বামিত্র অযোধ্যায় পদার্পণ করেছেন। দীর্ঘাকায় উন্নত দর্শন বৃষস্কন্ধ সবলবাহু যুগল, দৃপ্তচলন কাষ্ঠপাদুকা পরিহিত। ভীষণ রাগান্বিত মুখমন্ডল, ঋষি বিশ্বামিত্র এসেছেন রাজা দশরথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। তাঁকে ঋষি না বলে একজন ক্ষত্রিয় যোদ্ধা ও বলা যেতে পারে।

তিনি একজন ঋষি হলেও যেন রাজার মতো ভয়ংকর আজ্ঞাকারী। প্রাসাদ দ্বারীদের আদেশ করলেন রাজা দশরথকে তাঁর উপস্থিতি জানাতে। তার দৃষ্টি যেন জ্বলন্ত অঙ্গার।  -‘ রাজা দশরথকে বলো, স্বয়ং বিশ্বামিত্র  এসেছেন তাঁর দর্শনে ।’ 

ভীত সন্ত্রস্ত দ্বার রক্ষীগন সংবাদ দিতে ছোটে রাজসভার দিকে। 

একটা তুমুল হৈ হৈ কান্ড। বিশ্বামিত্র এসেছেন।

ঋষি বিশ্বামিত্র বাস্তবিকই একজন ভীষণ অস্থির এবং অধৈর্য্যবান মানুষ। তিনি দাঁড়িয়ে থেকে ও তাঁর চরণের কাষ্ঠপাদুকা দিয়ে মুহুর্মুহুর ধরণীতলে আঘাত করে চলেছেন। তাঁর পক্ষে যেন মুহূর্তমাত্র বিলম্ব সহ্য হচ্ছে না রাজদর্শনের। 

প্রাসাদদ্বারের দ্বারীরা সকলেই জানে বিশ্বামিত্র মুনিকে। তারা সকলে তাঁকে প্রাথমিক সম্বর্ধনা জানিয়ে রাজার নিকট সংবাদ জ্ঞাপন করতে ছুটেছে। – ‘মুনিবর আপনি একটু অপেক্ষা করুন। আপনি এই বিশ্রাম কক্ষে বসে বিশ্রাম করুন। আমরা এই এক্ষনি মহারাজা দশরথকে আপনার আগমন সংবাদ জানিয়ে আসছি ।  আপনি এই শীতল পানীয় পান করে আপনার শ্রান্তি অপনোদন করুন।‘

ঋষি বিশ্বামিত্র একসময় ছিলেন একজন ক্ষত্রিয় রাজা। পরে তিনি এক ভীষণ তপস্যায় সিদ্ধ হয়ে  ব্রহ্মর্ষিরূপে পরিচিত হন। সে এক বিরাট ইতিহাস। গভীর একাগ্র তপস্যা মানুষকে কোন উচ্চপদে স্থিত করতে পারে তাঁর জীবন্ত উদাহরন ইনি ,  ঋষি বিশ্বামিত্র। 

রাজা দশরথ প্রহরীগনের থেকে সংবাদ পাওয়া মাত্রই রাজসভা থেকে দ্রুত বেরিয়ে এসে পাত্র মিত্র এবং মন্ত্রীবর সুমন্ত্র সহ ঋষি বিশ্বামিত্রকে আন্তরিক  অভ্যর্থনা জানান। – ‘আসুন আসুন মিত্রদেব। আপনার আগমনে আমি ধন্য।  আমার রাজ্যে আপনি স্বাগত । আপনি আমার অভিবাদন গ্রহন করুন।’ 

মুনী বিশ্বামিত্র গাত্রোত্থান করেন , ‘ মহারাজা দশরথ, আমি আপনার দর্শন প্রার্থী !’

সুমন্ত্র বলেন , ‘মুনিবর চলুন রাজ সভাগৃহে। ‘

আসলে বিশ্বামিত্র যে একজন ভীষণ ঋষি। তিনি বিশ্বের মিত্র। তিনি যে একজন কিংবদন্তি এই মর্ত্যলোকে এবং দেবলোকে। সবাই তাঁর ভয়ে কম্পমান।

বিশ্বামিত্র রাজা দশরথকে দেখে খুশি হন। এক্ষনে বলে ওঠেন,‘রাজা দশরথ আমি আপনার কাছে এসেছি এক ভীষণ প্রয়োজনে। আমি তোমার সাহায্যপ্রার্থী।’ 

মুনী বিশ্বামিত্র একটু উগ্রচন্ডা চরিত্রের মানুষ। 

রাজা দশরথ তাই বিশেষ মিষ্টবাক্যে মুনি বিশ্বামিত্রকে জিজ্ঞাসা করেন,‘ বলুন মুনীবর কি ভাবে আপনার সেবা করতে পারি আমি ?’ আপনার পদার্পণে আমার রাজ্য ধন্য হল আজ ।’

মুনি বিশ্বামিত্র এবার রাজা দশরথকে বললেন, ‘ রাজন , আমি তোমার কাছে এসেছি কিছু অভীষ্ট নিয়ে। যদি ব’ল কথা রাখবে তা হলে আমি আমার সবিশেষ ইচ্ছা তোমাকে জ্ঞাপন করব।‘

রাজা দশরথ মনে মনে প্রমাদ গুনলেন। মন্ত্রীবর সুমন্ত্রের দিকে একটু তাকালেন। কে জানে মুনিবর বিশ্বামিত্র এক্ষনে কি বলতে এসেছেন। তবে প্রারম্ভিক ভূমিকা শুনে মনে মনে তেমন কিছু ভেবে পেলেন না যা থেকে বিশেষ কোন দুশ্চিন্তা হতে পারে। হয়ত মুনীবর একটি আশ্রম বানাবার জন্য সাহায্য চাইতে পারেন, বা কোন ভূমিখন্ড যাচ্ঞা করতে পারেন। বা হয়ত মাসাধিক কাল বেদপাঠ এর আয়োজন করতে বলতে পারেন। এ সব কোন ব্যাপার নয়। 

দশরথ হাসি মুখে বলে ওঠেন,‘ হ্যাঁ হ্যাঁ , আপনি বলুন, মুনিবর , কি আপনার ইচ্ছা।’

মুনি বিশ্বামিত্র জিজ্ঞাসা করেন,‘কোথায় তোমার চারপুত্র ? তারা এখন কত বড় হয়েছে ? তাদের কথা এবং তোমার প্রিয়পুত্র রাম এর কথা রাজ্যের লোকে শতমুখে প্রশংসা করে। শুনলাম তারা বিদ্বান হয়েছেন বিনয়ী  হয়েছেন  এবং গুনবান হয়ে উঠেছেন।

মন্ত্রীবর সুমন্ত্র বললেন,’ মুনিবর আপনি যা বললেন তারা তেমনই গুণবান জ্ঞানবান উন্নত চরিত্র বিশিষ্ট হয়ে উঠেছেন। ইহাতে কোন সন্দেহ নাই।’

রাজা দশরথ জিজ্ঞাসা করেন,’ মুনীবর , আপনি নিশ্চিন্তে বলুন আপনার অভীষ্ট কি? আমি হৃষ্টচিত্তে তা সাধন করার চেষ্টা করব।

বিশ্বামিত্র বলেন, ‘ মহারাজ শুনুন, আমি এক যজ্ঞ আরম্ভ করেছি সিদ্ধাশ্রমে। কিন্তু মারিচ ও সুবাহু নামে দুই কামরূপী রাক্ষস এবং সঙ্গে তাদের অনেকানেক অনুচর, তাঁরা  আমার যজ্ঞস্থলে নানা রূপ বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। যজ্ঞ বেদির উপরে তাঁরা মাংস ও রক্তবর্ষণ করে যজ্ঞ নষ্ট করছে। আমি তাদের প্রতিরোধ করতে ভীষণ রকমে অপারগ। ‘

রাজা কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করেন , ‘ আপনার যজ্ঞে বিঘ্ন ? অদ্ভুত ?’ 

বিশ্বামিত্র বললেন , ‘ হ্যাঁ, রাজন , বিষয় ঠিক তেমন । কিন্তু যজ্ঞকালে শাপ দেওয়া অনুচিত। সেই জন্য আমি ক্রোধ সংবরণ করে আছি। আপনি আপনার জ্যেষ্ঠপুত্র রামকে আমার সঙ্গে দিন। সে আমার আশ্রমে দশ দিন থাকবে এবং রাক্ষসদের বিনাশ করে আমার যজ্ঞ রক্ষা করবে। অন্তরের দিব্য প্রভায় রাম তেজস্বী। তার কল্যান হবে। রামের যশ ত্রিলোকবিশ্রুত হবে। আপনার ও মঙ্গল হবে ।

দশরথ বিশ্বামিত্রের কথা শুনে বিস্মিত হয়ে ওঠেন। মন্ত্রীবর সুমন্তর দিকে তাকিয়ে যেন বুঝতে চেষ্টা করেন কি বলা যায় এই উগ্রচন্ড মুনিবরকে। কথা নেই বার্তা নেই, উনি একেবারে রামকে চেয়ে বসলেন ? 

আর যাই হোক রাম মাত্র ষোড়শ বর্ষীয় বালক। এখনো যে সে পরিপূর্ণ যুবক হয়ে ওঠেনি। তাঁকে এই বয়সে রাক্ষসদের সাথে সম্মুখ সমরে পাঠানো সেতো নিতান্তই এক অসম্ভব ব্যাপার। এই কাজ তো দশরথ নিজেই সম্পন্ন করতে পারেন তাঁর সৈন্যসামন্ত দিয়ে ! 

তাই এক্ষণে রাজা দশরথ বিশ্বামিত্র মুনিকে বলে ওঠেন, ‘মুনিবর আপনি তো জানেন,বয়সে রাম এখনো একজন বালক। সে মাত্র ষোড়শবর্ষীয় বালক। রাক্ষসদের সঙ্গে যুদ্ধ করার মতো যোগ্যতা তো তাঁর এখনো হয়ে ওঠেনি। আপনার এমত সংকটে আমি আমার এক অক্ষৌহিনী সেনা নিয়ে গিয়ে স্বয়ং ধনুর্ধারন করে প্রাণপণে রাক্ষসদের বিনস্ট করতে ইচ্ছা করি।‘ 

বিশ্বামিত্র কিঞ্চিৎ গম্ভীর হয়ে পড়েন।  

মন্ত্রীবর সুমন্ত্র এবার বলে ওঠেন,‘মুনিবর , আপনার ইচ্ছা সঙ্গত। কিন্তু  যুবরাজ  রাম এখনো নিতান্ত বালক। সে এখনো খুব ভালোভাবে যুদ্ধবিদ্যা আয়ত্ত করে ওঠেনি। আর তা ছাড়া রাক্ষসরা ভীষণ রকমের কুট যোদ্ধা এবং ছায়া যোদ্ধা। তারা ভীষণ রকমের ক্রুর। তারা সংখ্যায় অসংখ্য। তাঁরা কপট যুদ্ধকারী। তারা মায়া যুদ্ধে নিপুন। তারা যে ভয়ংকর রকমে হিংস্র সে তো আপনি ভালোই জানেন। রাম তো তাদের সমকক্ষ নয় ! ‘

বিশ্বামিত্র শ্বশ্রুগুম্ফে হস্ত প্রলেপন করতে করতে শিরসঞ্চালন করে চলেছেন। অনুমান করা  যায়  তিনি কোন কথাই মন থেকে মেনে নিতে পারছেন না। কিন্তু তিনি এক্ষনে কিঞ্চিৎ নীরব ।

দশরথ বলে ওঠেন, ‘হে মুনিবর যদি নিতান্তই তাকে নিয়ে যেতে চান তবে চতুরঙ্গ সেনার সাথে আমাকেও নিন। হে কৌশিক আমার ষাট হাজার বৎসর বয়স হয়েছে। অনেক কৃচ্ছ সাধনার ফলে রাম জন্মেছে। তাহাকে একলা আপনার সঙ্গে নিয়ে যাওয়া বোধহয়  সমীচীন হয় না। আমার চারপুত্রের মধ্যে রামের প্রতি আমার সমাধিক স্নেহ মুনিবর ! ‘

বিশ্বামিত্র এবার নিতান্ত একটা ‘ হুম’ শব্দ তুলে একটু গুম হয়ে বসে থাকেন। 

দশরথ এবং সুমন্ত্র এবার প্রমাদ গোনেন। বিশ্বামিত্র  যৎকিঞ্চিত উগ্রচন্ডা সকলেই জানেন। 

কিন্তু বিশ্বামিত্র যেন এ সব কথায় তেমন আমল দিলেন না।  শুধু মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, ‘ রাজা দশরথ আপনি জানেন নিশ্চয়ই পৌলস্ত বংশজাত রাক্ষসরাজ রাবণ ব্রহ্মার বরে পরাক্রান্ত হয়ে স্বর্গে মর্ত্যে ত্রিলোকে অত্যাচার করে চলেছেন। তাঁর অনুচর রাক্ষসগণ ত্রিলোকে উৎপীড়ন করে বেড়াচ্ছে। মারিচ এবং সুবাহু , দুই রাক্ষস, তারই আজ্ঞায় আমার যজ্ঞে বার বার বিঘ্ন ঘটিয়ে চলেছে।  আমি নিরস্ত্র ।  এমন অবস্থায় আমি অনেকের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেছি। ‘

দশরথ উত্তর দিলেন, ‘মুনিবর আমি জানি দেবদানব গন্ধর্ব যক্ষ অসুর কেহই যুদ্ধে রাবণের বিক্রম সহ্য করতে পারে না। মানুষের কথা দূরে থাক। রাবণ যুদ্ধকালে বীর্যবানদের বীর্যহরণ করে। অতএব মুনিশ্রেষ্ঠ আমি সসৈন্যে বা আমার পুত্র মনে হয় আমরা কেহই রাবণের সঙ্গে বা তার রাক্ষস সেনাগণের সঙ্গে সামান্য যুদ্ধে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়ে উঠতে পারব না!’

দশরথের মুখ থেকে এমন অদ্ভুত বাক্য শুনে বিশ্বমিত্র ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, ’ রাজন আপনি পূর্বে আমাকে প্রার্থনা পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এখন সেই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করতে চাইছেন ? এই মত আচরণ আমি রঘুবংশীয় রাজাদের কাছে আশা করি না। এমন আচরন কুলের বিনাশকর। রাজা এই যদি তোমার উচিত বোধ হয় তবে আমি যেমন এসেছি তেমনই ফিরে যাই। তুমি প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে সুহৃদগন বেষ্টিত থেকে সুখী হও।

বিশ্বামিত্রের ক্রোধে বসুধা চঞ্চল হয়ে উঠল। দেবগণ ও ভীত হলেন।

তখন কুলগুরু বশিষ্ট্যদেব উঠে দাঁড়িয়ে রাজা দশরথকে বললেন, ’ মহারাজ ত্রিলোকে আপনি ধর্মাত্মা বলে পরিচিত। বিশ্বামিত্রের সঙ্গে এখন আপনি অঙ্গীকার ভঙ্গ করবেন না। রাম অস্ত্রবিদ্যা জানুন বা না জানুন বিশ্বামিত্র রক্ষক হলে রাক্ষসেরা তাঁর বিক্রম সইতে পারবে না। নেহাত তিনি এখন একজন যজ্ঞকারী, এবং রাক্ষসগনের উৎপীড়নে তিনি স্বতঃই বিব্রত। তাই তিনি আপনার কাছে সাহায্যপ্রার্থী হয়ে এসেছেন। আপনার উচিত তাঁর প্রার্থনা পূরণ করা !’

বিশ্বামিত্র বলেন,‘ মহারাজা দশরথ , অবধান করুন। আমি এক আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছি। তার নাম সিদ্ধাশ্রম। সিদ্ধাশ্রমে আমি অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষা দিতে মনস্থ করেছি। মায়াবী রাক্ষসের দল মানুষকে জঙ্গলে প্রবেশ করতে বাধা দিচ্ছে। তারা মানুষকে সেখানে কৃষিকর্ম বা যজ্ঞকর্ম করতে দিতে চায় না। তারা মনুষ্য সংস্কৃতিকে প্রবল বাধা দিতে উদ্যত হয়ে উঠেছে। অরণ্য প্রকৃতির মধ্যে তারা নিজেদের প্রবল আধিপত্য বজায় রাখতে  সচেষ্ট । মানুষ তার নিজের প্রয়োজনে অরণ্য অঞ্চলে ঢুকে যে মানব জীবনের প্রয়োজন মেটাবার কথা ভাবে সেইখানে রাক্ষসগন তাদের মায়াবী প্রভাবে এক ভীষণ  ভয়ের এবং ত্রাসের সঞ্চার করে রাখতে চায়। আমি তাই সমস্ত রাজপুত্রদের মায়াজাদু ভেদকারি শস্ত্রবিদ্যা শিক্ষা দিতে উদ্যোগী হয়েছি।‘

রাজা দশরথ বলেন, ‘ এ তো অতি উত্তম কথা ।’

বিশ্বামিত্র বলেন,’ রাজন, সেখানে আমি এক যজ্ঞ শুরু করেছি। কিন্তু আমার যজ্ঞকালে রাক্ষসরা এসে ভীষণ অত্যাচার শুরু করেছে। আমার যখন যজ্ঞ কর্ম থাকে না তখন রাক্ষসেরা আমার ভয়ে দূরে সরে থাকে।’

এইবার প্রধানমন্ত্রী সুমন্ত্র বললেন, ‘নিশ্চয়ই রাক্ষসদের এই অত্যাচার অসহনীয়। আমার মনে হয় ঋষিবর আমাদের এক অক্ষৌহীনী সৈন্য এ কাজে আপনাকে যথেষ্ট সাহায্য করতে পারবে।’

বিশ্বামিত্র বলেন, ‘না সুমন্ত্র, সৈন্যবাহিনী দেখলে তারা যুদ্ধ শুরু করতে উৎসাহী হয়ে উঠবে। আমি কোন বিশৃঙ্খলা  চাই না। আমি চাই তাদের সমানে সমানে প্রতিহত করে পর্যুদস্ত করতে।’

দশরথ এবং উপস্থিত সকলে  ভীষণ উদ্গ্রীব হয়ে শুনতে থাকেন বিশ্বামিত্রের কথা ।

বিশ্বামিত্র বলে চলেছেন, ‘ আমি উক্ত স্থানে আমার আশেপাশে যে সব রাজা আছেন তাদের কয়েকবার সংবাদ প্রেরন করেছি আমার আশ্রমে এসে রাক্ষসদের বাধা দিতে। কিন্তু সকলেই রাক্ষসগণের ভয়ে ভীত। কেহই রাক্ষসের সাথে যুদ্ধ করতে সাহসী নয়। আর আমি ও যজ্ঞাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকাকালীন রাক্ষসেরা উৎপাত ইত্যাদি ঘটিয়ে থাকে। তাই আমি নিজে ও একরকম অসহায়। আর তাই আমি এসেছি আপনার পুত্র রামকে নিয়ে যেতে রাজা দশরথ। সে আমার সাহায্যকারী হবে মাত্র এই আশায়।’

দশরথ বললেন,‘ মুনিবর আমি আপনার কথা অনুধাবন করতে পারছি । কিন্তু , কিন্তু রাম যে এখনো তত বড় হয়ে ওঠেনি যে কিনা আপনাকে কিছুমাত্র সাহায্য করে উঠতে পারে এই বিষয়ে।  তদুপরি রাক্ষসদের সঙ্গে এই অসম যুদ্ধে অনেক বিঘ্ন অনেক বিপদ !

বিশ্বামিত্র বলেন, ’মহারাজা দশরথ, আপনার পুত্র রাম এর যাহাতে কোন বিঘ্ন বা বিপদ না ঘটে সে জন্য আমি বিশেষ সচেতন থাকব।  বিশেষ করে রাজন আমি জানি রাম বশিস্ট দেবের কাছে অস্ত্র শিক্ষা লাভ করেছে। সে যে বশিস্টের একজন সফল শিষ্য সে সংবাদ ও আমি বিশেষ ভাবে অবগত। ‘

সুমন্ত্র বলেন, ‘রাম মূর্তিমান ধর্ম। বলে ও বিদ্যায় সে সকলের শ্রেষ্ঠ। সে তপস্যার আশ্রয় এবং ধর্মজ্ঞ। তার মহিমা কোন সাধারন  মনুষ্যের অধিগম্য নয় ।

এবার কুলগুরু বশিস্ট তার আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে দশরথকে বলেন,‘ মহারাজা দশরথ এই মহাতেজা বিশ্বামিত্র বহু আশ্চর্য অস্ত্রের অধিকারী। ভূত বা ভবিষ্যৎ কোন কিছুই এনার অবিদিত নয়। ইনি নিজেই রাক্ষসদের দমন করতে একাই অনেক। কেবল আপনার পুত্রের হিতের জন্যই তিনি প্রার্থী হয়ে এসেছেন। আপনি নির্ভয়ে রামকে যেতে দিন।’

রাজা দশরথ এক্ষনে বশিষ্ট্যদেবের বচন শুনে কিঞ্চিৎ স্থিতধী হয়েন। তিনি মনে মনে ভাবেন কিং কর্তব্য ! পুত্র স্নেহ অথবা প্রার্থীর প্রার্থনা, কাহাকে অগ্রাধিকার বাঞ্ছনীয় !  

এইবার মন্ত্রিবর সুমন্ত্র কিঞ্চিত নিম্নস্বরে রাজা দশরথকে বলে ওঠেন, ‘মহারাজ , আপনি এমত চিন্তা করুন, সূর্যকুলবংশ সবার সুপরিচিত। ইক্ষ্বাকুবংশ ভূমন্ডলে সুবিখ্যাত। এই বংশ হতে সবাই ঋষি এবং মুনিদের সবরকম সৌজন্য এবং সাহায্য করতে অঙ্গীকারবদ্ধ।  আজ আচম্বিতে ঋষি বিশ্বামিত্র যখন ভূমণ্ডলের অধিপতি রাজা দশরথের কাছে এমত সাহায্য প্রার্থনা করেছেন, তিনি যখন রামকে তার সঙ্গে নিয়ে যেতে বিশেষ ভাবে আগ্রহী, তখন  এমত প্রয়োজনে রাজি হয়ে যাওয়াই সবিশেষ মঙ্গল। বিশেষতঃ গুরুকুল চূড়ামনি বশিস্টদেব যখন আশ্বাস দিলেন তখন রামের সঙ্গে লক্ষণকে ও  রামের অনুগামী করে পাঠিয়ে দেওয়া যেতে পারে। নচেৎ  মুনি বিশ্বামিত্র অকারণে রুষ্ট হয়ে আবার কোন অযাচিত শাপ বর্ষণ করলে তা রঘুকুলের পক্ষে ভীষণ শিরঃ পীড়ার কারণ হতে পারে।’

রাজা দশরথ সুমন্ত্রের কথা অনুমোদন করলেন, ‘যথার্থ বলেছেন মন্ত্রীবর। বেশ আমি এক্ষণে রাম ও লক্ষনকে মুনি বিশ্বামিত্রের সঙ্গে যেতে দেওয়াই  উচিত বলে সাব্যস্ত করলাম ।

রাজা  দশরথ বলেন, ‘ মুনিবর , বেশ আমি  আপনার কথাই রাখলাম । আমি অবশ্যই রাম এবং লক্ষণ দুই ভাইকে প্রেরণ করব আপনার অনুগমন করতে। যদি আমার দুই পুত্র দ্বারা আপনার কোন উপকার হয় তাহলে আমি নিজেকে ধন্য মনে করব।’

বশিষ্ট্য  এইবার বললেন, ’ মহারাজ, আপনি নির্ভয়ে রামকে যেতে দিন। আপনার পুত্রের হিতের জন্যেই ইনি আপনার নিকট আপনার পুত্র রামকে যাচ্ঞা করতে এসেছেন। ‘ 

বিশ্বামিত্র এক্ষনে বশিস্টদেব এর সমর্থনে শিরঃ সঞ্চালন করেন, ‘ যথার্থ বলেছেন  আপনি গুরু বশিস্ট।’  

বশিষ্ট্যের কথায় আশ্বস্ত হয়ে দশরথ এবার  প্রসন্ন চিত্তে রামকে পাঠাতে সম্মত হলেন। তিনি এবার সানন্দে রামকে অন্তঃপুর থেকে ডেকে পাঠালেন। 

এই প্রথম আমরা সদ্য যুবক অষ্টাদশবর্ষীয় রামকে দেখছি । স্নিগ্ধ লাবণ্য মাখা মুখে জগতের সকল পূণ্য রাশি । পদ্মপলাশ আঁখি। সকল গুনের সকল শক্তির সঞ্চয় ।

বিশ্বামিত্র অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন। -এই তো রাম ! এঁকেই তো তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন। ধ্যানে দেখেছিলেন। মন ছিল গভীর সংকটে। যজ্ঞ করতে যেতেই বার বার রাক্ষসদের থেকে বাধা আসে। বিঘ্ন ঘটে । কারো সাহায্য পাওয়ার কোন উপায় ঞ্ছিল না। মুনি বিশ্বামিত্র ভীষণ অসহায় হয়ে পড়েছিলেন রাক্ষসদের বিঘ্নকারী মায়াবী যুদ্ধে। যজ্ঞকালীন মৌনাবলম্বন থাকতে হয়। যজ্ঞকালে কাহাকে ও কোন প্রকার অভিশাপ দেওয়া অনুচিত। দুর্ধর্ষ মায়াবী রাক্ষসদের প্রতিহত করার মত কোন উপায় তিনি পেয়ে উঠছিলেন না। ভীষণ মুষড়ে পড়েছিলেন বিশ্বামিত্র। কিংকর্তব্য। 

একদিন তিনি স্বপ্নে দেখলেন এক নওলকিশোর। নব দূর্বাদল শ্যাম। পদ্মপলাশ আঁখি রামকে। স্বপ্নে আদেশ পেলেন রাম এর শরন নিতে। তিনি চকিতে সিদ্ধান্ত নিলেন ছুটে আসবেন অযোধ্যায়। রাজা দশরথের পুত্র রামকে নেবেন যজ্ঞ সহায়ের জন্য। নচেৎ এই যজ্ঞ শেষ করা সম্ভব নয়। 

রাম বশিষ্টের শিষ্য। এর থেকে ভালো আর কে হতে পারে? বশিষ্ট্যের জ্ঞান বশিষ্ট্যের মহত্বের বিশ্বামিত্র যে নিজেই একজন ভীষণ প্রশংসক। 

রামের পাশে দাঁড়িয়ে লক্ষণ। কাকপক্ষ ধনুর্ধারী অভিন্ন হৃদয় লক্ষণ। ধ্বনির সঙ্গে যেমন থাকে প্রতিধ্বনি, যশের সঙ্গে যেমন গৌরব, উজ্জ্বল অস্ত্রের সঙ্গে যেমন থাকে তীক্ষ্ণ দীপ্তি, তেমনি রামের পাশে লক্ষণ ছাড়া আর কাকেই বা ভাবা যেতে পারে ? লক্ষণ কাছে না থাকলে রামের ঘুম হয় না। খাদ্যে তার রুচি হয় না। তাই যেখানে রাম সেখানে লক্ষণ।

রাম এবং লক্ষণ দুই ভাই এক্ষনে হাত জোড় করে  ঋষি বিশ্বামিত্রকে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানায়।  

রাজা দশরথ বলেন,‘ রাম, ঋষিবর বিশ্বামিত্র তোমাকে তার সঙ্গে নিয়ে যেতে চান সিদ্ধাশ্রমে তার যজ্ঞ সম্পাদনে সাহায্য করতে। সেখানে রাক্ষসেরা মুনির যজ্ঞে বার বার ভীষণ বিঘ্ন ঘটিয়ে চলেছে। মুনিবরের ইচ্ছা তোমরা দুই ভাই তার সঙ্গে গিয়ে রাক্ষসদের প্রতিহত কর।’

রাম বললেন, ‘বেশ যেমন আপনার আজ্ঞা পিতা মহারাজ। লক্ষন আমার সঙ্গে থাকলে আমি কাহাকে ও ভয় করি না। ‘ 

বিশ্বামিত্র তাদের আলিঙ্গন করে বললেন,‘ রাম আমি তোমার শরনে এসেছি। আমার যজ্ঞ সম্পন্ন করতে তোমার সাহায্য প্রত্যাশা করি। রাক্ষসেরা আমার যজ্ঞ নস্ট করে ভীষণ বিব্রত করে তুলেছে। ‘

রাম বললেন, ‘ পিতা যখন আমাকে আপনার অনুগমন করতে বলেছেন তখন আমি এবং আমার অনুজ  লক্ষন আপনাকে অনুসরন করতে আদিস্ট। ‘

দশরথ বললেন,‘ তোমরা দুই ভাই ঋষি বরের অনুগমন করো। আমার সস্নেহ আশীর্বাদ রইল তোমাদের জন্য।

বশিষ্ট্যদেব বললেন, ‘ সাধু সাধু । নির্ভয়ে যাও তোমরা। কোন ভয় নেই । ঋষি বিশ্বামিত্র তোমাদের রক্ষা করবেন । ‘ – এবং এই বার তিনি মঙ্গল মন্ত্রে রাম লক্ষণকে অভিমন্ত্রিত করলেন। 

রাম লক্ষন এই বার তাদের মাতাগন এবং সকল সভাসদগনের শুভাশিস গ্রহন করলেন ।

এইবার ধনুর্বাণ হাতে বিশ্বামিত্রের সঙ্গে অগ্রসর হতে প্রস্তুত হয় অযোধ্যার দুই রাজকুমার।

বিশ্বামিত্র বলেন, ‘রাজা দশরথ তুমি চিন্তা করো না। আমি তোমার দুই পুত্র রাম লক্ষণকে তোমার কাছে সকুশল ফিরিয়ে দিয়ে যাব।’ 

রাজা দশরথ মুনি বিশ্বামিত্রকে তার অন্তরের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে বলেন, ‘সে বিশ্বাস আমার আছে মুনিবর।  আমি  সূর্যবংশী । ঋষি মুনীর সেবায় আমাদের জীবন সমর্পিত মুনীবর ।’

বিশ্বামিত্র স্বস্তি বাচন উচ্চারন করে বলেন, ‘ জয় হোক রাজা দশরথ তোমার। এসো রাম, এসো লক্ষন আমরা আমাদের পথে এগোই এখন। ওই যে সামনে আমাদের গন্তব্য পথ।’

                             [ আদিকান্ড ২]

ধ্রুপদী সাহিত্য : ভজ মন রাম চরণ - শ্যামলকৃষ্ণ বসু

ভজ মন রাম চরণ

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি