ধ্রুপদী সাহিত্য : ভজ মন রাম চরণ - শ্যামলকৃষ্ণ বসু
ধ্রুপদী সাহিত্য
১৭
পূর্বকথা
রাজা দশরথের একমাত্র রাণী, যিনি কোশল রাজার কন্যা, তিনি কৌশল্যা। তিনি প্রধানা মহিষী। কিন্তু রাণী কৌশল্যা কোন সন্তানের জন্ম দিয়ে উঠতে পারেননি এখনও। রাজা দশরথ নিতান্ত অপুত্রক। তাই রাজা দশরথ উত্তর দেশে কেকয় রাজ্যে গিয়ে গিরিরাজ নগরের রাজা অশ্বপতির কাছে তার কন্যা কৈকেয়ীর পাণি গ্রহনের অনুমতি চান। পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা।
কেকয় রাজ অশ্বপতি বললেন,‘কিন্তু,মহারাজা দশরথ তোমার প্রধানামহিষী তো একজন আছেন । আমার কন্যা কৈকেয়ী এ ক্ষেত্রে তোমার দ্বিতীয় রাণী হবেন। সে বেশ ! কিন্তু তাঁর গর্ভে যখন পুত্র হবে ?
এ প্রশ্ন উত্তরাধিকারের, এই প্রশ্ন সিংহাসনের। সংসারে এ বড় কুটিল প্রশ্ন , জটিল সমাধান।
রাজা দশরথ বললেন, ‘উত্তম, যদি কৈকেয়ীর গর্ভে সন্তান হয় সেই সন্তান সিংহাসনের নিশ্চয়ই উত্তরাধিকার হতে পারবে। এবং তখন আপনার কন্যা কৈকেয়ীই হবেন রাজমাতা।
‘ উত্তম ! তুমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তবে ?’ – অশ্বপতি জিজ্ঞাসা করেন।
রাজা দশরথ বলেন, ‘ আমি নিশ্চয়ই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ আপনার কাছে !’ -এবং তখন কেকয়রাজ অশ্বপতির সেই শর্তে রাজা দশরথ কেকয় রাজের কন্যা কৈকেয়ীকে বিবাহ করে অযোধ্যায় নিয়ে এসেছিলেন।

বড় রানী কৌশল্যা। কোশল রাজ্যের অধিপতি রাজা কুশলের কন্যা কৌশল্যা। মেজ রানি কৈকেয়ী। কৈকেয়ীকে নিয়ে রাজ্যে ফিরে আসার সময় রাজা কেকয় তার কন্যার সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন একজন দাসী। দাসী মন্থরা । সে আকৃতিগত ভাবে ছিল কুব্জা। তাই কুঁজি মন্থরা। বলতেই হয় সেকালেও পিতার চিন্তা ছিল শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে কন্যার যেন কোনরকম কষ্ট না হয়। তাই কন্যার সঙ্গে একটি দাসীর আগমন।
তা রানী কৈকেয়ীর আর কাজ কি? তিনি থাকতেন পায়ের উপরে পা তুলে। কুঁজি মন্থরাই তাঁর সকল কাজ দেখাশোনা করত বৈকি।
কৌশল্যা আর কৈকেয়ী তারা তো দুই সতীনি। তবে তাদের মধ্যে ভাবভালোবাসা ও ঠিক যতটা আবার মন কষাকষিও তাঁদের ততটা। কৈকেয়ীর দেমাকে মাটিতে পা পড়ে না। তিনি যে মহারাজা দশরথের যুবতী ভার্যা।
বড় রানী কৌশল্যা রাজা দশরথের প্রধানা মহিষী হলে ও রাজা যে কৈকেয়ীর রূপমুগ্ধ। মহারানী কৌশল্যার অন্তর দগ্ধ হলে ও কিছু বলতে পারেন না। পুরুষ মানুষ কখন যে কোন দিকে ঢলে থাকবেন কে বলতে পারে। যখন যখন কৈকেয়ী বিরূপ হয়েন তখন তখন মহারাজা হয়ত কৌশল্যার ভবনে এসে দুই এক দিন থেকে যান ।
কৌশল্যা থাকেন তার পুজাআচ্চা নিয়ে। মহারাজের মঙ্গল কামনায় মন্দিরে হরপার্বতীর পুজা করে সেই ফুল এনে রাজার মাথায় ছোঁয়ান।
কৌশল্যা আসলে মহারাজের মহা আশ্রয়স্থল। তাঁর ঘরকন্নায় রাজা দশরথ যেন অতুল সুখ ও শান্তি পান। কৌশল্যা যিনি ভার্যা, তিনি সখী, তিনি সেবা দাসী ,ভগিনী ও মাতার ন্যায় তিনি স্নেহশালিনী। তিনি অতুল শান্তিদায়িনী।
তিনি রাজার জন্মদিনে রাজার মঙ্গল কামনায় মন্দিরে পূজা দিয়ে দানধ্যান করেন । রাজাকে সুগন্ধী চালের পায়েসান্ন প্রস্তুত করে খাওয়ান। রাজাকে দিয়ে হর পার্বতীর মাথায় জল ঢালান।
রানী কৈকেয়ী পুজাআচ্চা নিয়ে বিশেষ চিন্তিত নয়। তার ঘুম ভাঙতে বেলা হয়। তিনি হাই তুলে কুব্জীকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘ রাজা কি মহলে চলে গেছেন? ‘ – হ্যাঁ মহারাজা সেই প্রভাতেই শয্যা ত্যাগ করে নিজ কাজে চলে যান। কৈকেয়ীর তখন ও আলস্য কাটে না। তিনি রাজার সোহাগী রানী কি না?
রাজা প্রভাতে উঠে পুষ্পউদ্যানে গিয়ে নিজ হাতে পুজার জন্য পুষ্পচয়ন করেন। কৌশল্যার সাজিতে পুষ্প ভরে দেন। কৌশল্যার কুশল জিজ্ঞাসা করেন। – তারপর স্নানাদি সারেন। কৌশল্যার পুজায় অংশ নেন।
অন্তঃপুরের মধ্যে থাকেন দুই মহারানী। কাজ আর কি! রাজসুখ আর রাজমহিমা ভোগ। খাও দাও। সোনার পালংকে শুয়ে থাকো। যখন সখ হল দুই সতিনী মিলে একটু বিন্তি খেলা গেলো।
রাজা দশরথ সুখেই রাজ্যশাসন করছেন। তবে মনে একটাই অসুখ তাদের কোন সন্তানাদি হয়ে উঠছে না। রাজা দশরথ মনে মনে ভাবলেন কেন না আর একটা বিবাহ সম্পন্ন করা যায়। কিন্তু সে কথা তো ভাঙলে চলবে না। আসলে সিংহল রাজ সুমহিত্রর কন্যা সুমিত্রা পরমা সুন্দরী। সুমিত্রার রূপের কথা শুনে রাজা পরম হরষিত। কিন্তু ঘরে যে দুই রানী। কি উপায়ে তবে যান তিনি? মন্ত্রণা দাতারা মন্ত্রণা দিল, যান তবে দেশভ্রমনের ছলে। আসলে ছল বল কৌশল সংসারীকে করে রেখেছে চঞ্চল। অতএব অভিসন্ধি পূরণে বাধা কোথায় ? দেশভ্রমনে যাওয়া যেতেই পারে।
দূত এসেছে আমন্ত্রণ নিয়ে সিংহল রাজার কাছ থেকে। দূত বলেন, ‘মহারাজা দশরথ , আমাদের সিংহল দেশের রাজা আপনার হাতে কন্যা সমর্পণ করতে উৎসুক।’
আসলে সব পিতাই কন্যার বিবাহ দিতে চান একজন শ্রেষ্ঠ পাত্রের সঙ্গে। তদুপরি সখ্যতা রাখতে গেলে ও বড় ঘর,শ্রেষ্ঠ বর আর শক্তিধরের সাথে সম্পর্ক রাখাই শ্রেয়।
রাজা দশরথ সসাগরা ধরনীর অধিপতি। তাই আর ছোটখাটো রাজাকে কে আর আমন্ত্রণ করে। অতএব রাজা দশরথ সিংহল রাজের আমন্ত্রনে তাঁর বিবাহযোগ্যা কন্যার সুযোগ্য পাত্র মনোনীত হয়ে মনে মনে বেশ হরষিত হলেন । দূতকে কথা দিলেন তিনি সিংহল রাজ্যে যাবেন।
রাজা যাবেন রাজ্য ছেড়ে বাইরে। কথাটা তো গোপনীয় কিছু নয়। কিন্তু কোথায়? দুই রানী জানতে চাইলেন, মহারাজ যাচ্ছেন কোথায়, কোনখানে , কত দূরে ?
রাজা দশরথ তাঁর দুই রানীর সকাশে হাইতুলে আড়মোড়া ভেঙে বলে উঠলেন, ‘না: যাই কটা দিন একটু ঘুরে আসি কোথাও , এই মানে একটু দেশ ভ্রমণে।’ -আহা, তবে রানীরা আর কি বা জিজ্ঞাসা করবেন ?
দেশভ্রমন তো রাজা মহারাজাদের এখন তখন এর ব্যাপার। এই তো, কখনো ইন্দ্রপুরীতে যাচ্ছেন ইন্দ্রের কাছে । কখনো অমরাবতীতে তো কখনো অলকাপুরীতে। তবে এবার কোন দেশে?
রাজা বললেন, ‘যাই এবার একটু দক্ষিন দেশে, সিংহল সুমাত্রা ইত্যাদি ঘুরে আসতে। সিংহল রাজ একটু পদধুলি চেয়ে ডেকে পাঠিয়েছেন বুঝলে কি না রাণীগণ ! ‘ – রাজা আর বিয়ের কথাটা ভাঙ্গলেন না ।
এবার বললেন, ‘এই কয়দিন রাজ্যের ভার দিয়ে যাচ্ছি রাজমন্ত্রী সুমন্ত্রকে। তোমরা দুজনে ও একটু সব দিকে খেয়াল রেখো।’
রাজা যাবেন দেশভ্রমনে। রথ সাজলো ঘোড়া সাজলো। কাড়া নাকাড়া বেজে উঠলো।পাঁচ ঘোড়ার সজ্জিত রথে রাজা আসীন হলেন। রথ ছুটল বায়ু বেগে আকাশ মার্গে।
একজন শুধু বাতাস শুঁকে বললে, ‘উহুঁ আমার কেমন সন্দেহ হচ্ছে। রাজা এত তড়িঘড়ি গেলেন যে কোথায় ?’
আসলে, সে হল কুঁজী ! রানী কৈকেয়ীর পিতৃ গৃহের বিশ্বাসী বাঁদি। রানী কৈকেয়ীর বড় প্যারের পাত্রী । মন্থরা দাসী। তবে মুখে সে বলল না কিছুই কৈকেয়ীকে। রাজা দশরথ যদি বিয়েটিয়ে করেই আসে তাতে আর বলার কি আছে ? সে তো হর হামেশাই লোকে বিয়ে করছে একশোটা। কিন্তু তাঁর নিজের দুই রাণীদের ও তো কিছু বলে গেলো না ! যাকগে সে তো তাদের পারিবারিক ব্যাপার । তবে কথা তো আর চাপা থাকবে না চিরদিন ! তখন দেখা যাবে !
রথ ছুটল সিংহলের দিকে। সিংহল রাজ এগিয়ে এসে রাজা দশরথকে পাদ্য অর্ঘ্য দিয়ে পরম সমাদরে বরণ করলেন। সুমিত্রা নন্দিনী তাঁর পরম আদরের কন্যা। সুমিত্রা যেন রূপের বন্যা। রাজা দশরথ কন্যার রূপে মোহিত হয়ে গেলেন। সিংহল রাজ বললেন,মহারাজ কয়েকটা দিন পরে বিবাহ বাসর করি। এসে যখন পড়েছেন কটা দিন বিশ্রাম করুন । একটু যাত্রা পথের বিষম ক্লান্তি মোচন করুন । এদিকে কৃষ্ণ পক্ষ গিয়ে শুক্ল পক্ষ পড়ুক ।
রাজা দশরথ সন্মত হতে পারলেন না । রাজ্যে অনেক কাজ । তাই শীঘ্র বিবাহ সম্পন্ন হোক ।
পরদিবস গোধূলি লগ্নে রাজা দশরথ সিংহল রাজের কন্যা সুমিত্রার পাণি গ্রহণ করলেন । যেমন রূপবতী কন্যা তেমন রূপবতী বর। কৃষ্ণপক্ষেই তবে বিবাহ সম্পন্ন হল।
রাজা দশরথ এবার তার নববিবাহিতা বধূ সুমিত্রাকে নিয়ে অযোধ্যা রওনা দিলেন রথে উপবেশন করে।
ত্ব রা করি বিভা সারি রাজা দশরথ
যান ফিরে অযোধ্যায় নববধূ লয়ে
দিব্যরথে চড়ি তাঁরা চলিতে চলিতে
রাজা বুঝি রূপ মোহে অবস হইয়ে।।
সুমিত্রার রূপে রাজা হইয়া মোহিত
আলিঙ্গন করেন তারে রথের উপরে
শৃঙ্গার করেন রাজা হইয়া বিবস।
উদ্দাম পুরুষ তবে নারী কি করে ?
কালরাত্রি না উচিত নারী সম্ভাষণ
প্রীত তবে না থাকে নারী ও পুরুষে
স্ত্রী পুরুষ দুজনে না রাখে সংহতি
শতরূপ শতপ্রেম থাকে না সে বশে ।। [ স্বরচিত ]
রথারুঢ় রাজা দশরথ অযোধ্যা প্রত্যাবর্তনকালে রথবিহারে তিনি সদ্য বিবাহিতা বধুর রূপমোহে নিতান্ত অসংযমবশতঃ সঙ্গযাপন করে ফেললেন যাহা শাস্ত্রমতে একান্তই নিয়মবিরুদ্ধ। সামাজিকভাবেও তা হয় অতীব দূষণীয়। কারন বিবাহের পরদিন সে হয় কালরাত্রি ।
বাসি বিয়ার পরদিন হয় কালরাতি।
স্ত্রী পুরুষ একঠাঁই না থাকে সংহতি ॥
কালরাত্রে যে নারীকে করে পরশন।
সেই স্ত্রী দুর্ভাগা হয় না হয় খণ্ডন। [কৃত্তিবাস ]
নববিবাহিতা ছোট রানী সুমিত্রাকে নিয়ে রাজা দশরথ অযোধ্যায় পদার্পণ করলেন। দুই রাণী অবাক হয়ে গেলেন। এ কি? এ কোন অভাবিত খেয়াল মহারাজ দশরথের। তবে বলার কিছু নেই। তিনি যাদৃশ ইচ্ছা তাদৃশ কর্ম করার অধিকার রাখেন। তিনি অনেকানেক বিবাহ করিতে পারেন। কেহই তাহাকে বাধা দিতে পারেন না। এ রাজ্যের রাজা এখনো পুত্রহীন হয়ে রয়েছেন। এ যে এক বিষম লজ্জা, এক বিব্রত পরিস্থিতি, এক বিচিত্র সমস্যা। তিনি রাজা। রাজার বয়স নয় হাজার বৎসর । তিনি চিন্তিত হয়ে আছেন ভবিষ্যতে তিনি কাহাকে এই রাজ্যের ভার দিয়ে যাবেন? তবে তিনি যদি বর্তমান রাণীদের কাছে তাঁর এই বিবাহ ইচ্ছা জানাতেন তাতে কি রাণীগন অসুখী হতেন ? তাঁরা কি মহারাজা দশরথকে এই তৃতীয় বিবাহে বাধা দিতেন? নিশ্চই না।
মহারাজা দশরথ দোর্দণ্ড প্রতাপ মহীতলে। তিনি ইক্ষ্বাকু বংশের রাজা। তিনি তার রাজত্বের ভার কার হাতে তুলে দিয়ে যাবেন ভবিষ্যতে এ এক বিরাট প্রশ্ন হয়ে আছে কোশলরাজ্যবাসীর কাছে ও? এ প্রশ্ন যে বার বার এসে ধাক্কা দিচ্ছে এই রাজ্যের রাজ পরিবারে রাজতন্ত্রে। সাধারন মানুষের মধ্যে ও একটাই জিজ্ঞাসা রাজার এখনো কোন পুত্র হল না? এ প্রশ্ন কি আর রাজা দশরথের মনে আলোড়ন তোলে না? তিনি ও যে ভাবিত। কিন্তু তিনি এই মনোব্যাথা বলবেন কাকে ? মনে মনে ভাবছেন কুলগুরু বশিষ্ঠের সাথে এই বিষয়ে আলোচনা করে দেখা দরকার।
দুই রাণী সুমিত্রার রূপ দেখে চমকে ওঠেন। পুরুষের চোখে এই রূপ পরম প্রার্থীত। এই রূপ কোন পুরুষ অগ্রাহ্য করতে পারেন না কখনো।
কৈকেয়ীর কানে কানে কুব্জী বলে,‘ আমি তখনই বুঝে ছিলাম রাজা নিশ্চয়ই কোন কুমারীর হৃদয়হরণ করতে যাচ্ছেন। কিন্তু হায়, তিনি বলে গেলেন না তোমাদের দুই রানীর একজন কে ও? ও মা। শেষে কি না রানীদের ও এত অবিশ্বাস !’
কৈকেয়ী বলেন, ‘ কি আর বলব বল কুঁজী। রাজার পুত্র নেই। নয়ত , দেখ , রাজা আমাকে কত ভালোবাসেন।’
কুব্জী বলে, ‘ আহা যিনি তোমার সতীন হলেন, তাঁর কুল কি , শীল কি, বলি সে কথা সে বার্তা কেউ কি জানে ? দেখে কি মনে হয় বড় কোন রাজার মেয়ে ? নাম শুনেছো সে কোন দেশের , কোন রাজার পুত্রি ইনি ?
কৈকেয়ী বলেন, ‘ কত শত রাজা আছে। কাকে জানি বল ? তবে রূপ আছে বড়। তাতে নাই কোন সন্দেহ ! কি বল ?
কুব্জী ধিক্কার জানিয়ে বলে,’ আহা , কি কথা ? বলি ওই রূপ দেখেই ভুলে গেলে চলবে ? কথা শোনো ! সামলে রেখো রাজাকে। রূপ বড় কম না।’
রাজা দশরথ রথ হতে ছোট রানীকে হাত ধরে নামাতে নামাতে বলে ওঠেন,‘এসো সুমিত্রা, তোমাকে স্বাগতঃ আজ আমার এই কোশলরাজ্যে, এই পবিত্র অযোধ্যা নগরে। এই দেখো, এখানে তোমাকে স্বাগত জানাতে এসেছেন, এনারা আমার দুই রাণী। এই যে মহারানী কৌশল্যা এবং এই যে ইনি রানী কৈকেয়ী। কই রানী কৌশল্যা ! হ্যাঁ, এসো এসো কৈকেয়ী, তোমরা দুজনে এঁকে সাদরে বরণ করে নাও। এঁকে আমি ছোট রানী করে আনলাম আমার অযোধ্যা রাজ্যে।
শাঁখ বাজল, উলু পড়ল। রাজার তিন শত রানী রাজঅঙ্গনে আলতা জল ঢেলে ছোট রাণী সুমিত্রাকে বরন করে নিলেন ।
রাজা দশরথ বললেন, ছোট রানী আমি পুত্রাকাংখি। আমার এই বিশাল রাজত্বের ভার আমি কাকে দেবো সেই নিয়ে আমি খুবই চিন্তায় আছি। তুমি জানো তাই আমি তোমাকে বিবাহ করে এনেছি। স্বাগতম আমার এই ঐশ্বর্যময় মহান রাজ্যে ।
রাজমন্ত্রী রাজ পারিষদ পুরনারীগন ছোটরাণীর অভ্যর্থনা করলেন।
রাজা দশরথ এইবার তাঁর দুই রানী কৌশল্যা ও কৈকেয়ীর সঙ্গে সুমিত্রার পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমার ছোট রানী সুমিত্রা, এই যে ইনি, কৌশল্যা, কোশল রাজকন্যা, তোমার বড় ভগিনীর মত, আমার প্রধানা মহিষী। আর এই যে ইনি, কেকয় রাজার কন্যা, আমার পাট রাণী , কৈকেয়ী , তোমার বোনের মত। এবার তোমরা নিজেরা পরিচয় আদি সেরে নাও । আমি রাজসভায় গিয়ে বসি তবে ? রাজ্যের যে এখন মহাসংকট ! ’
রাজা দশরথ তার পূর্বতন দুই রানীর সাথে সুমিত্রার পরিচয় করিয়ে দিয়ে চলে গেলেন রাজসভায়। সেখানে বসবে এখন জরুরী মন্ত্রনা সভা।
তবে সুমিত্রা, সদ্য স্বামীর ঘরে এসে তাঁর দুই সতীনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যার পর নাই অস্বস্তিতে পড়েছিলেন নিশ্চয়ই। দুই সতীন কৌশল্যা কৈকেয়ী এক্ষনে ছোট রানী সুমিত্রার রূপ দেখে হয়ে উঠলেন বিরস বদন। সুমিত্রার রূপে রাজা যে মোহিত হয়ে পড়বেন তা নারীর অভিজ্ঞ চোখ অনুমান করে নিতে কতক্ষণ ?
দুই রানী এবার মনে মনে তাদের সতীন ছোটরানী সুমিত্রার জন্য মনে মনে কি হরগৌরীর পূজা করতে করতে ‘সুমিত্রা দুর্ভাগিনী হোক’ এই বর চেয়ে বসলেন? অসম্ভব কি? রাজা যদি তখন রানীদের অনুমতি নিয়ে যেতেন হয়তো ছোট রাণী সুমিত্রা এমন হতমান হতেন না। দুই রানী হরগৌরীর পূজা করতে করতে মন থেকে এই বর চাইলেন ‘রাজা যেন না চায় সুমিত্রার ভিতে ‘ ।
একেই বলে ভাগ্য। সকল সতীনের মাঝে সুমিত্রা সুন্দরী। লোকের তাই বিস্ময়, এমন সুন্দরী স্ত্রী , হয়ত এনার ও পুত্র হয়নি বলে এমন দুর্ভাগিনী হয়ে পড়লেন। লোকসমাজে ও রানী সুমিত্রাকে নিয়ে তাই এক বিষাদ ছড়িয়ে পড়ল। কালরাত্রি দোষে যে এমন পরমাদ। রাজা দশরথ রাত্রিদিন কৈকেয়ীর কাছে পড়ে থাকেন। মহারাজা দশরথ প্রাণের অধিক যে কৈকেয়ীকেই দেখেন। কিন্তু তাঁরা সকলেই রাজার স্ত্রী।
তবে পুত্র হয় না বলে রানীদের মনে ও যেমন দুঃখ ভরা, রাজার মনে ও সুখ নেই তেমন। একদিন কুলগুরু বশিষ্ঠ দেবকে রাজা দশরথ তাঁর মনের দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন,‘ গুরুদেব, আমার এত বড় সাম্রাজ্য। উত্তরে যার হিমালয় দক্ষিনে তাঁর সমুদ্র। এত বড় রাজ্যের ভার আমি কার হাতে দিয়ে যাব গুরুদেব। আমার জীবনে পুত্র সুখ কি সম্ভব হবে না?
বশিষ্টদেব তখন রাজা দশরথকে এক পুত্রযজ্ঞ অনুষ্ঠান করতে উপদেশ দিলেন।
রাজা পুত্রযজ্ঞ সম্পন্ন করতে মনস্থ করলেন। তাই তিনি অঙ্গদেশ হতে ঋষ্যশৃঙ্গ মুনিকে এনে এক বিশাল পুত্রযজ্ঞ সম্পন্ন করালেন। আকাশবানী হ’ল, স্বয়ং নারায়ন মর্ত্যভুমিতে এই পুন্য অযোধ্যানগরীতে মহারাজ দশরথের আলয়ে জন্ম নেবেন।
[আদিকান্ড ১ ]
১৮
একজন অবতারের জন্ম কথা
রাবন হয়ে উঠলেন অদম্য এবং অপরাজেয়। রাবন হয়ে উঠলেন প্রবল। তাঁর অত্যাচারে সকল দেবগন গন্ধর্বগণ মানবগন ঋষিমুনিগন এবং সিদ্ধগন সকলে কেঁপে উঠলেন।
রক্ষ যক্ষ ঋষি মুনি দেব ও গন্ধর্ব ,
স্বর্গমর্ত্য পাতালে,যে আছেন যেখানে ।।
তিনলোক ত্রিভুবন উঠিল কাঁপিয়া
দেবগন হাত জোড়েন নারায়ন সন্নিধানে ।।
রক্ষ রক্ষ জনার্দন কৃপাময় হরি,
জগতের নাথ তুমি রক্ষা করো সবে ।।
ব্রহ্মা বরে রাবণ সে যে মহা অত্যাচারী,
না যায় সহন তাঁহার অত্যাচার এবে।।
পৌলস্তের নাতি সে বিশ্বশ্রবা নন্দন ,
অজেয় ব্রহ্মার বরে রক্ষরাজ রাবণ ।।
ঘোর অত্যাচারী তিনি, বাস লঙ্কাপুরে্
দেব নর আতংকিত, শুনুন, হে নারায়ন।। [স্বরচিত ]
দশরথ যখন তার পুত্রকামনা জ্ঞাপন করেছিলেন কুলগুরু বশিষ্ট্যের কাছে তখন সেই সময় বশিষ্ট্যদেব স্মরণ করেন একটি অদ্ভুত ঘটনা যা তিনি ধ্যানযোগে জেনেছিলেন।
একবার সকল দেবতারা সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার শরনাপন্ন হয়ে বললেন, ‘ভগবন, লংকাধিপতি রাক্ষসরাজ রাবণ আপনার প্রসাদে বলদৃপ্ত হয়ে আমাদের চরম উৎপীড়ন করছে। সেই দুষ্ট যাহাতে বিনস্ট হয় হে বিধাতা আপনি তাঁর উপায় স্থির করুন।’
ব্রহ্মা উত্তর করলেন, ‘ হে দেবগন, রাবন আমার কাছে এই বর চেয়েছিল, যে , গন্ধর্ব যক্ষ ও রাক্ষসের হাতে তাঁর মরণ হবে না । আমি ও তাঁকে সেই বর দিয়েছি। সে অবজ্ঞা বশে মানুষের নাম করেনি । সেই মনুষ্যই তাঁকে বধ করবে। স্বয়ং নারায়ন মর্ত্যে মনুষ্য জন্ম নিয়ে সেই রাক্ষসকে সবংশে নাশ করবেন। আসুন আমরা এখন ভগবান বিষ্ণুকে স্মরন করি। ‘
অতঃ সকল দেবতাগনে ক্ষীরোদ সাগরে গিয়ে তখন ভগবান বিষ্ণুকে স্মরন করলেন।
এই যুক্তি করিয়া যতেক দেবগণ।
ক্ষীরোদ সমুদ্রে গেলা যথা নারায়ণ ॥
সকল দেবতা গিয়া দাণ্ডাইল কুলে।
দেখিল যেমন মেঘ ভাসিছে সলিলে ॥
শুইয়া আছেন হরি অনন্ত উপরে’।
বাহুকী সহস্র ফণা তদুপরে ধরে।
চারি মুখে ব্রহ্মা তবে করেন স্তবন।
কত নিদ্রা যান প্রভু দেব নারায়ণ।
পদতলে লক্ষ্মীদেবী করিছেন স্তুতি।
অনন্ত শয্যায় শুইয়া আছেন শ্রীপতি ॥ [কৃত্তিবাস ]
দেবতাদের আবাহনে তখন শঙ্খচক্রগদাপাণি শ্রীবিষ্ণু তাঁর যোগনিদ্রা হতে জাগ্রত হলেন। তিনি দেবগণকে জিজ্ঞাসা করলেন , ‘ কি সংকট ! কি হেতু আপনাদের আগমন ?’
দেবগন স্তব করে তাঁকে বললেন, ‘প্রভু , সংকট ভীষণ! হে বিষ্ণুদেব ত্রিলোকের হিত কামনায় আমরা আপনাকে একটি কার্য্যের ভার সম্প্রদান করতে ইচ্ছা করি। অনাথের নাথ আপনি করুন পরিত্রাণ। বিশ্বশ্রবা মুনির পুত্র রাজা দশানন এর অত্যাচারে ত্রিলোক বাসী ভীত কম্পিত !’ ।
নারদ বললেন, ‘ প্রভু, রাবন বধার্থে মহীতলে আমরা আপনার লীলা প্রত্যক্ষ করতে ইচ্ছা করি ! ‘
ব্রহ্মা বললেন, ‘ অযোধ্যাপতি দশরথের হ্রী শ্রী ও কীর্তি তুল্য তিন জন মহিষী আছেন। তুমি চার অংশে বিভক্ত হয়ে সেই তিন মহিষীর গর্ভে জন্ম গ্রহন কর এবং মনুষ্য রূপে অবতীর্ণ হয়ে দেবতার অবধ্য রাবণকে বধ কর। সেই রাক্ষস লংকার রাবন সকলের উপরে অত্যাচার করছে। তাঁর নিধনের জন্য আমরা তোমার শরনাপন্ন হয়েছি ।
দেবতাদের আহ্বানে নারায়ন শ্রীবিষ্ণু সকল চিন্তিত দেবতাদের উদ্দ্যেশ্যে বলে উঠলেন, ‘ বেশ , তোমরা ভীত হয়ো না। আমি রাবনকে সবংশে সংহার করব। আমি জন্ম নেবো দশরথের ঘরে। আমার হাতের শঙ্খ চক্র গদা এবং শেষনাগ আমার অন্য ভাইগন হয়ে জন্ম নেবেন এবং আপনারা সকল দেবতারা শক্তিমান বানর হয়ে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করবেন। কারণ রাবনের উপরে একটি দৈবী অভিশাপ আছে , যে , সে বানর কর্তৃক ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।’
তখন দেবগন মুহুর্মুহুর শংখধ্বনি করলেন।
তাই মুনি বশিষ্ট সেই ধ্যানদৃষ্ট সম্ভাবনাকে স্মরনে রেখে তখন রাজা দশরথকে সস্নেহে পুত্রেস্টি যজ্ঞ করতে আদেশ করলেন এবং সেই যজ্ঞের হোতা করতে বললেন ঋষ্যশৃঙ্গ মুনিকে। ’
আর তখন বশিস্টদেবের ইচ্ছায় ঋষ্যশৃঙ্গের উপদেশে রাজা দশরথ এক পুত্রেষ্টি যজ্ঞ করেছিলেন মর্ত্যভূমে অযোধ্যা নগরে।
ধর্মরক্ষার কারণে ঈশ্বর জন্ম নেন এই মর্ত্যভূমে। সকল দেবতার শরণে স্বয়ং নারায়ন যখন এইবার মনুষ্য জন্ম স্বীকার করলেন তখন লক্ষীদেবী শেষনাগের উপরে বিশ্রামরত শ্রীবিষ্ণুকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ হে দেব , আপনি যখন অবতার হয়ে জন্ম নেবেন পৃথিবীমন্ডলে , আমি তখন কতদিনে আপনার দর্শন পাব আমাকে বলুন ?’
নারায়ন বলেন,‘ দেবী কমলা, অবধান কর, পৃথিবীমন্ডলে আমি যখন জন্ম নেব অযোধ্যানগরে রাজা দশরথের ঘরে, শুন প্রিয়ে, তুমিও তখন আমার অনুগমন করবে রাজা জনকের গৃহে ! ‘
লক্ষীদেবী জিজ্ঞাসু হলেন, ‘ সে কি সংবাদ প্রভু ? ’
দেব নারায়ন বললেন, ‘ দেবী, তখন পৃথিবী মন্ডলে জনকরাজার ঘরে তুমিও জনকের কন্যা হয়ে জন্মগ্রহণ করবে। আমি সেই জনকরাজার গৃহে গিয়ে তোমার পানিগ্রহণ করব। তারপর সবংশে রাবণকে ধ্বংস করে পৃথিবীমন্ডলে পুন: শান্তি প্রতিষ্ঠা করে আমরা দুজনেই আবার এই বৈকুন্ঠ ধামে এই ক্ষীরোদ সাগরে প্রত্যাবর্তন করব।
দেব জনার্দন এর কাছে লক্ষ্মীদেবী এবার জানতে চাইলেন, ‘ ভগবন, আমার জানতে ইচ্ছে করছে, কে এই রাবণ ? কি তাঁর স্বরুপ ?’
নারায়ণ এবার লক্ষ্মীদেবীকে সেই কথা সবিস্তারে বললেন। তিনি লক্ষীদেবীকে শোনালেন লংকাধিপতি রাক্ষসরাজ রাবনের কথা। তাঁর বিষম অত্যাচারের কথা। তাঁর ভয়ে দেবতাদের বিষম আতংকের কথা। দেবনারায়ন স্বয়ং লক্ষ্মীদেবীকে বললেন সেই বিবরণ।
পৌলোস্তের নাতি সে বিশ্বস্রবার নন্দন
রাক্ষসের ঘরে জন্ম লয় যে রাবণ ।।
ব্রহ্মার বর পাইয়া সে হয়েছে দুর্জয়
আপনি বর দিয়া ব্রহ্মা আপনি পায় ভয় ।।
ব্রহ্মার বরে রাবণ অমিত শক্তি ধরে ,
কারণে অকারণে দেব সনে যুদ্ধ করে ।।
ব্রহ্মার পাইয়া বর লংঘে ব্রহ্মার বচন
স্বর্গস্থানে আসিয়া খেদায় সে দেবগন ।।
দেবকন্যা বলে ধরি জাতি নাশ করে
কত অপমান সে দেবতাগনে করে ।।
ব্রহ্মা দিয়াছে বর রাবনের তরে ,
সবংশে মারিবে তারে নর ও বানরে ।। [কৃত্তিবাস ]
নারায়ন তখন লক্ষ্মীকে আশ্বাস দেন, তিনি এইবার রাবনকে সংহার করতে অযোধ্যায় রাজা দশরথের পুত্র হয়ে জন্ম গ্রহন করবেন।
নারায়ন বললেন, ‘ দেবী আমি তাই জন্ম লব দশরথের ঘরে সেই অযোধ্যা নগরে।’
অতঃ শ্রীবিষ্ণু রাজা দশরথের পুত্রত্ব স্বীকার করলেন।
তখন ব্রহ্মা আনন্দে সকল দেবগণকে বললেন, ’ হে দেবগন, করুন অবধান, আপনারা সকলে বিষ্ণুর সহায়স্বরূপ বহু বীর সৃষ্টি কর। ঋক্ষ রাজ জাম্বুবান তিনি পূর্বেই আমার মুখ হতে উৎপন্ন হয়েছে। এখন আপনারা সকলে যতেক গন্ধর্ব এবং যক্ষী , মুখ্য অপ্সরা, বিদ্যাধরী , যক্ষ প্রভৃতি তোমরা সকলে ধরাধামে বানর প্রজাতির সৃস্টি কর।’
তখন ব্রহ্মার ইচ্ছায় দেবগন এবং ঋষিগন এবং সিদ্ধগন, এবং সকল বিদ্যাধরগন, যক্ষগন সকলে অতএব বানর প্রভৃতি সৃষ্টি করলেন। তখন ইন্দ্র বালীকে, সূর্যদেব সুগ্রীবকে, বৃহস্পতি তারককে, কুবের গন্ধমাদনকে, বিশ্বকর্মা নলকে, অগ্নি নীলকে, অশ্বিনীকুমারদ্বয় মৈন্দ ও দ্বিবিদকে, বরুণ সুষেনকে এবং পর্জন্য শরভকে সৃস্টি করলেন। আর বজ্রতুল্য দৃঢ়কায়, গরুড় তুল্য বেগবান, বানরগনের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বুদ্ধিমান ও বলবান হনুমানকে পবনদেব বায়ু তাঁর প্রবল শক্তি দিয়ে জন্ম দিলেন। নারায়ন ধরাধামে জন্ম নেবেন আর তাই মর্ত্যলোকে যেন মহাচঞ্চলতা লক্ষিত হল।
আজ এখন এই যজ্ঞ ভূমিতে রাজা দশরথের পুত্রেস্টি যজ্ঞে এই ধরাধামে একজন অবতার পুরুষের জন্ম হতে চলেছে। আকাশমার্গে এক্ষনে দৈববানী হয়, ‘ মহারাজা দশরথ কর অবধান, আপনা হেন যিনি পুন্যবান , সেই আপনার ঘরে স্বয়ং দেব নারায়ন আপনার পুত্র হয়ে জন্ম নেবেন এই ধরাধামে। ‘
বশিষ্ঠাদি দ্বিজগণ ঋষ্যশৃঙ্গকে পুরোবর্তি করে শাস্ত্র অনুসারে যজ্ঞের সকল কর্ম আরম্ভ করলেন। অনন্তর মুনি ঋষ্যশৃঙ্গ অথর্বউক্ত মন্ত্রে যথাবিধি পুত্রীয়েস্টি অর্থাৎ পুত্র কামনায় যজ্ঞ আরম্ভ করলেন।
ঋষ্যশৃঙ্গ হোম ক্রিয়া করলেন। হোতৃগণ মন্ত্র দ্বারা দেবগনকে আহ্বান করে যথাযোগ্য হবির্ভাগ প্রদান করলেন। যজ্ঞাগ্নি উত্তম রূপে প্রজ্জ্বলিত হলে তিনি এবং অন্য সব ঋষিগন বেদমন্ত্র পাঠ করতে থাকেন। রাজা দশরথ হোমাগ্নিতে ‘স্বহা’ মন্ত্রে বারংবার ঘৃতাহুতি দিতে থাকেন। ঋষ্যশৃঙ্গ মুনি এইবার মন্ত্রদ্বারা দেবগনকে আহ্বান করেন যজ্ঞভাগ গ্রহণ করতে এবং সেই হেতু প্রার্থনা করেন যজ্ঞকারী যজমানকে পূত্রবর দিয়ে আশীর্বাদ করতে।
অনন্তর সেই যজ্ঞভুমির যজ্ঞাগ্নি থেকে এক মহাকায় মহাবল রক্তাম্বরধারী শুভলক্ষন সম্পন্ন দিব্যআভরনে ভূষিত এক দৈবীপুরুষের আবির্ভাব হলে যজ্ঞকারী ঋষি মুনীগন তখন জয়জয়কার করে উঠলেন। তাঁর আকার দীপ্ত অনলশিখার তুল্য। তাঁর গাত্রবর্ণ তপ্তকাঞ্চন সদৃশ। তিনি তাঁর হস্তে রজতাবরন যুক্ত একপাত্র পায়েস নিয়ে আবির্ভূত হলেন যজ্ঞঅগ্নি মাঝে। সেই সে পুরুষ যার গাত্রবর্ণ তপ্তকাঞ্চন সদৃশ, যাহার আকার দীপ্ত অনলশিখার তুল্য, সেই সে দৈবীপুরুষ , তিনি এইবার যজ্ঞকারী রাজা দশরথের হাতে তাঁর হস্তধৃত সেই পায়েসভান্ড তুলে দিয়ে বলে উঠলেন,‘ রাজন , অবধান করুন , আমি প্রজাপতি প্রেরিত পুরুষ। আমি আপনার স্ত্রীদের নিমিত্ত এই পবিত্র দৈবী সুগন্ধযুক্ত পায়েস আনয়ন করেছি। আপনি এখন এই পায়েস আপনার তিনজন স্ত্রী‘কে গ্রহন করতে বলুন। স্বয়ং নারায়ন আপনার ঘরে আবির্ভূত হতে চলেছেন ।’ – এবং এই আকাশবানী করে তিনি অন্তর্হিত হলেন। ‘
তখন যজ্ঞকারী মুনীগন প্রবল শঙ্খ ধ্বনি করলেন। তখন বায়ুমণ্ডলে বিশাল আন্দোলন অনুভুত হ’ল। তখন গগনমন্ডলে বজ্রগর্ভ মেঘ সঞ্চার হ’ল। তখন পৃথিবীমন্ডলে দেবতাদের আশীর্বাদ বৃষ্টি ধারায় বর্ষিত হ’ল।
মহারাজা দশরথ সেই দেবদত্ত হিরন্ময়পাত্র অতঃ মস্তকে গ্রহণ করলেন এবং সেই পায়েস তিনি তাঁর তিন স্ত্রী’কে প্রদান করলেন। অতঃ যজ্ঞ হতে উত্থিত সেই দৈবি অনুগ্রহীত চরু রাজা দশরথ তাঁহার তিনরানীকে গ্রহন করতে বললেন। এই চরু তিনরাণী গ্রহণ করলে তারা পুত্রবতী হবেন। সেই এক পাত্র পায়েসান্ন তাহলে তিন রানীর মধ্যে কি ভাবে সমান ভাগে বন্টন করা হবে ?
রাজা দশরথ যজ্ঞভাগের সেই পবিত্র পায়েসের দুই অর্ধেক এবার তাঁর বড় রানী কৌশল্যা এবং পাট রানী কৈকেয়ীর হাতে তুলে দিলেন। রাজার কাছে এবার ছোট রাণী সুমিত্রা পায়েশ আগ্রহ করলেন। রাজা এবার দুই রানীকে তাদের অংশ হতে ছোট রাণী সুমিত্রাকে সেই যজ্ঞভাগ তুলে দিতে আগ্রহ করলেন।
তখন রানী কৌশল্যা এবং রানী কৈকেয়ী তাদের স্ব স্ব অংশ হতে অর্ধপরিমান পায়েসান্ন দুজনে দুই অংশ তুলে দিলেন রানী সুমিত্রার হাতে।
আর যাই হোক রাজার তিনরানী। তাঁরা পুত্রবতি হতে সমান দাবিদার। এখানে কোন বিরোধ না সম্ভবে।
কৌশল্যা বললেন ছোট রাণী সুমিত্রাকে, ‘ এই দিলাম অর্ধঅংশ আমা অংশ হতে ,
তোমার পুত্র যেন হয় আমার পুত্রের সাথী ।।
এইবার কৈকেয়ী ও বলে উঠলেন সতিনী সুমিত্রাকে, ‘ আমা হতে এই অংশ দিলাম লও হাতে
আমা পুত্রের দোসর হোক তব পুত্র তেমতি ।।’
ছোটরানী সুমিত্রা তাঁর দুই সতিনীর অংশ হতে অর্ধ অর্ধ অংশ লাভ করলেন ।
এখন অপেক্ষা সেই পরম মুহূর্তের যখন ইক্ষ্বাকু বংশের রাজকুলে নব অতিথিদের আবির্ভাব ঘটবে দশ মাস দশ দিন পরে এই অযোধ্যা নগরে ।
স্বয়ং নারায়ণ এবার তাঁর কথা রাখলেন। তিনি চারঅংশে দশরথের চারপুত্র হয়ে জন্ম নিলেন অযোধ্যা নগরীতে। বড়রানী কৌশল্যার গর্ভে জন্ম নিলেন রাম সেই চৈত্রের নবমী তিথিতে পুনর্বসু নক্ষত্রে। তিনি হলেন দশরথের জ্যেষ্ঠ পুত্র। দ্বিতীয় রানী কৈকেয়ীর গর্ভে জন্ম নিলেন রাজার দ্বিতীয় পুত্র ভরত ঠিক তার একদিন পরে পুষ্যা নক্ষত্রে। আর ছোট রানী সুমিত্রা জন্ম দিলেন তাঁর দুই সন্তানের অশ্লেষা নক্ষত্রে। লক্ষণ ও শত্রুঘ্ন। সারা অযোধ্যা নগরী এইবার ভাসল আনন্দসাগরে। দেবলোকে হতে থাকে দুন্দুভিধ্বনি এবং আকাশ হতে পুষ্পবৃষ্টি বর্ষিত হ’ল। রাজা দশরথ রাজ্যবাসীকে সেই আনন্দে অকাতরে রাজভান্ডার হতে প্রভুত শস্য এবং গাভী এবং স্বর্ণ ও রজত ইত্যাদি দান করলেন। স্বয়ং কুলগুরু বশিষ্টদেব রাজপুত্রগনের নামকরণ করলেন রাম লক্ষণ ভারত শত্রুঘ্ন। রাজা দশরথ আনন্দসাগরে ভাসতে লাগলেন ।
এক্ষনে রাজা দশরথ ঋষ্যশৃঙ্গ মুনির কাছে তাঁর সবিশেষ কৃতজ্ঞতা জানালেন।-‘মুনীবর আমি অশেষ কৃতজ্ঞ আপনার হাতে আমার পুত্রেস্টী যজ্ঞ সম্পাদনের জন্য।’
ঋষ্যশৃঙ্গ বিদায়ের আগে রাজা দশরথকে বললেন, ‘রাজা তুমি আর এগারো বছর বাঁচবে। এই পুত্র তোমার সংসারী হবে না। সে হবে বনবাসি। তুমি পুত্র শোক পাবে। এ কথা আমি বলছি না। তোমার কপালে এই সংবাদ লেখা আছে । ‘
রাজা দশরথ ঋষ্যশৃঙ্গ মুনির কথা শুনে চিন্তায় পড়েন । মনে পড়ে অন্ধমুনির সেই শাপ ,
পুত্র ব্যসন জং দু:খং যদে তন্মম সাং প্রতম
এবং ত্বং পুত্র শোকেন রাজন কালং করিষ্যাসি।। [বাল্মিকি ]
রাজা ভাবতে না চাইলে ও কেমন করে যেন তাঁর মনের মধ্যে শুধু এই কথারই প্রতিধ্বনি ওঠে থেকে থেকে।
রাজা বললেন, ‘ ঈশ্বরের ইচ্ছা মেনে নিতেই হবে। ঋষিবর আশীর্বাদ করুন সংকটে যেন ধর্মচুত্য না হই কোন ভাবে। ‘
ঋষ্যশৃঙ্গ বলেন, ‘ স্বয়ং নারায়ন এসেছেন তোমার ঘরে। তার যত্ন কর। তার মুখ শশী তোমার পুন্য কর্মের ফল।’
রাম বড় হচ্ছেন। চার শিশু তাদের মায়ের কোল আলো করে বসে আছে। সকলে রামের মুখচন্দ্রিমা দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে ।
চন্দ্র কলা বর্ধিত যেমন দিনে দিনে
সেই রূপ লাবন্য বাড়িল চারি জনে
এক বিষ্ণু চারি ভাই মায়ার কারণ
রাম দেখি দশরথ ভাবেন মনে মন ।। [ কৃত্তিবাস ]
ঐ যে শিশু রামচন্দ্র, ঐ দেখ, দেখ, কি সুন্দর হামাগুড়ি দিচ্ছে। মায়ের কোলে গড়াগড়ি যাচ্ছে। কখনো সে মায়ের কোলে আবার কখনো পিতার কোলে। মুখে তাদের আধো আধো বোল। মুখচন্দ্রাননে অমৃত বচন। প্রকাশিত মন্দ মন্দ হাসিতে ঐ ছোট্ট কয়েক দশন।
বশিস্টমুনি বলেন, ‘রাজা, দেখো, ওই যে তোমার পুত্র রামচন্দ্র ওই আসছে হেলে দুলে। ধরো ধরো, ধরো তাঁকে। কঠিন মাটিতে পড়ে গিয়ে সে যেন ব্যাথা না পায়।
রাজা দশরথ হাসতে হাসতে কোলে তুলে নেন তাঁর আদরের ছোট্ট শিশু শ্রীমান রামচন্দ্রকে। অন্য তিন পুত্র তিন রানীর কোলে শোভা পাচ্ছে নবতিপর চন্দ্রের মতো। তাঁরা যে তাঁর অংশ। এই জন্মে তাঁর সহোদর ভরত এবং লক্ষন এবং শ্ত্রুঘ্ন , তাঁরা নারায়নের সেই শঙ্খ সেই চক্র আর সেই শেষনাগ।
অশ্বমেধ যজ্ঞ সমাপ্ত হলে নিমন্ত্রিত রাজারা, অন্যান্য অতিথিবৃন্দ এবং সকল মুনীগন এবং ঋষ্যশৃঙ্গ মুনি ও নিজ নিজ দেশে ফিরে গেলেন গোলকধাম হতে শ্রীবিষ্ণুর আবির্ভাবের মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠান শেষে ।
[আদিকান্ড ১ ]
১৯
লংকাধীশ রাবণ
ত্রিকুট পর্বতের উপরে অবস্থিত লংকাদ্বীপ। লঙ্কাধীশ রাবণের স্বর্ণালঙ্কা। হরিদবর্ণ তৃনাচ্ছন্ন ভূমি । বিশাল বিশাল বৃক্ষশোভিত বিরাট বনরাজী। সরল কর্নিকার কুটজ কদম্ব প্রভৃতি বৃক্ষশোভিত সুন্দর উদ্যানবাটি। হংস কারন্ডব সমাকীর্ণ পদ্ম উৎপল শোভিত সরোবর। পরিখা ও প্রাকারে বেষ্টিত। বিশ্বকর্মা নির্মিত এই লঙ্কাপুরী আকাশস্থ দেবপুরীর ন্যায় রমণীয়। এই লঙ্কাপুরী দুর্গম ও সুরক্ষিত। এই লঙ্কা রাক্ষস রাজা রাবণের লঙ্কা। এই লঙ্কা জয় করা দেবগনের অসাধ্য। এই লঙ্কা রাবণের স্বর্ণলঙ্কা। এ এক অজেয় পুরী। সেখানে সমুদ্রবায়ু সজোরে প্রবাহিত হচ্ছে। কিংকিনীর ধ্বনি সহকারে রক্ষকুলধ্বজ উপরি রক্ষরাজের জয় পতাকা সেই বায়ুহিল্লোলে পতপত করে উড়ছে। লঙ্কার দ্বারসমুহ স্বর্ণময়। সোপানরাজি বৈদুর্য রচিত। সর্বস্থান দীপালোক ও জোছনায় উদ্ভাসিত।
লঙ্কার রাজপথ সুপ্রশস্ত ও কুসুমাকীর্ণ। ভবনসমূহ শুভ্র মেঘবর্ণ এবং পদ্ম ও স্বস্তিকের আকারে নির্মিত। কোথাও মধুর সংগীত, কোথাও ভূষণের নিক্কন, কোথাও গম্ভীর সিংহনাদ আর কোথাও বা শোনা যাচ্ছে গুরুগম্ভীর বেদপাঠ ।
রাক্ষস সৈন্যগন কল্পিত যুদ্ধমহড়ায় ব্যস্ত। রাক্ষস বীরগন পরস্পর কুস্তি প্রতিস্পর্ধায় ব্যস্ত। কোথাও বৃহৎ বৃহৎ বৃক্ষকান্ড হাতে নিয়ে দুই রাক্ষসবীর পরস্পরের প্রতি প্রতিস্পর্ধা প্রদর্শন করতে ব্যস্ত। বর্মধারী রাক্ষস প্রহরীরা রাজপথে শূল ও মুষলহাতে সদাই প্রহরারত।
স্বয়ং লংকেশ্বর রাবণরাজ আজ স্বর্ণলঙ্কার বিরাট মুক্তমঞ্চ হতে রক্ষসেনাদের কুঁচকাওয়াজ এবং যুদ্ধমহড়া প্রত্যক্ষ করতে বসেছিলেন। মুক্তমঞ্চের সামনে এক বিশাল উন্মুক্ত উদ্যান। সেই উদ্যান লংকার যতেক রক্ষসেনা আর রাক্ষস জনগণে পরিপূর্ণ।
পাত্রমিত্রঅমাত্য এবং সভাসদগণসহ রক্ষরাজ রাবণ এক মনে বসে প্রতিস্পর্ধী যত রাক্ষসকুল বীরপুঙ্গবদের প্রতিস্পর্ধা প্রত্যক্ষ করছেন। এমত সময়ে হঠাৎ সেই কর্মচঞ্চল ক্ষনে আচম্বিতে রক্ষকুলরাজ লংকাপতি রাবণের শিরস্থ স্বর্ণমুকুট তাঁর কোলের উপরে গড়িয়ে পড়ে। রাজা দশানন হতচকিত হয়ে পতনোন্মুখ সেই রাজমুকুটকে দুই হাত বাড়িয়ে ধরতে গিয়ে ও ধরতে পারেন না। সভাসদগণ অকস্মাৎ এ হেন ঘটনায় বিমুঢ় হয়ে পড়ে। তাঁরা আতঙ্কিতভাবে হৈহৈ করে ওঠে। রাক্ষস জনতা ও উদ্বেগে আকুল হয়ে বিভিন্ন বিচিত্র যত ধ্বনি তোলে।
আজ শুভনবমী তিথিতে স্বয়ং নারায়ণ যখন রাজা দশরথের ঘরে অযোধ্যানগরীতে জন্ম নিলেন আর ঠিক তখনই স্বর্ণলঙ্কায় লঙ্কাধীশের মস্তকোপরি সুসজ্জিত মুকুট রাবণরাজার মস্তক হতে কেমন করে ভূমিতলে পতিত হয়ে গড়াগড়ি খেতে থাকে। দশাননের শরীরে কেমন একরকম কম্পন অনুভূত হয়। একি অদ্ভুত ঘটনা। এ কিভাবে সম্ভব ?
এমত সময়ে আকাশ হতে বিনা মেঘে এ কেমন মুহুর্মুহুর বজ্রপাত হতে থাকে। উপস্থিত রাক্ষস জনতা সকলে চমকে ওঠে। তারা সকলে ছত্রভংগ হয়ে পড়ে।
আর তখন লংকাতটের অদুরে বনরাজী মধ্যে দৃশ্যমান এক বিশাল শালবৃক্ষে হঠাৎ এক বজ্রপাত হতেই সেই বিশাল মহীরুহু ভীষণ রকমে অগ্নিময় হয়ে ওঠে। সকল রাক্ষস জনগণ এবং লঙ্কাবাসীগণ ভয়ে বিব্রত হয়ে পড়ে।
রাক্ষস রাজা রাবণ স্বয়ং প্রত্যক্ষ করেন এক বিশাল শালপ্রাংশ মহাবলী ভীষণদর্শন এক দৈবীপুরুষ গম্ভীর কণ্ঠে ঘোষণা করলেন,
শুন হে রক্ষকুল রাজ রাবণ ,
তোমারে মারিতে জন্ম নিলেন আপনি নারায়ন।
অযোধ্যা নগরে তিনি দশরথের ঘরে ,
নররূপে জন্ম নিলেন রক্ষিতে ধরিত্রীরে। [স্বরচিত ]
এই মতো ঘোষণা করে সেই শালপ্রাংশু মহাভুজ দৈবীপুরুষ এবার অন্তর্হিত হলেন।
রাক্ষসরাজ রাবন এবার যেন চোখে এক কুহেলিকা দেখতে থাকেন। এ তিনি কাকে দেখলেন? কি যেন এক জলদ্গম্ভীর ঘোষণা শুনলেন। আকাশ হতে বজ্রধ্বনিময় এক ভীষণ আকাশবাণী শ্রবনে লংকাধিপতি রাবন বিস্মিত হয়ে ভাবতে থাকেন অনেক কথা। তিনি তো ভুল কিছু শোনেননি। কিন্তু সে কি করে সম্ভব ! কোন মানুষ তো তাঁকে বধ করতে পারবে না। তিনি যে স্বয়ং ব্রহ্মার বরে দেবদানব যক্ষরক্ষ সকলের অবধ্য। মনুষ্যকে তো তিনি তৃণজ্ঞান করেন। তার থেকে কোন বিপদকে তো তিনি সম্ভব বলে মনেই করেন না এবং তিনি তা কোনভাবেই গ্রাহ্য করেন না।
দশমুন্ড রাবণ তপস্যা করে চলেছেন পাঁচহাজার বছর ধরে। কঠিন তপস্যা।
রাবণ যিনি ঋষি বিশ্বশ্রবার পুত্র। পুলস্তের পৌত্র। ব্রহ্মার প্রপৌত্র। সেই রাবন ব্রহ্মার কাছ থেকে ও বর নেবেন। তবে তার আগে তিনি মহাশৈব দশানন তাঁর পরমপুজ্য দেবাদিদেব মহাদেবের কাছে শক্তির বর চাইবেন।
রাবণ তপস্যায় বসে আছেন যুগ যুগ ধরে। দশমুন্ড রাবণ প্রচন্ড উগ্রস্বভাব বিশিষ্ট। শিবের দয়া পেতেই তাঁর এই উগ্র তপস্যা।
তাঁর ধ্যানাসনের চারপাশে চার চারটি পর্বত। ওই যে চার চারটি পর্বত, সেই পর্বতে পর্বতে জ্বলছে ধুনীর মত আগুন।
চতুর্দিকে প্রজ্জ্বলিত অগ্নির সেই তেজ এবং শিরোপরি প্রবল সূর্যের তেজ যে কোন তপস্বীর ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটিয়ে দিতে সক্ষম। কিন্তু রক্ষরাজ রাবণ এক্ষনে তপ: সিদ্ধ হতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
এর আগে ও এক হাজার বছর রাবণ শিবের তপস্যা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন। এত কাল দেবাদিদেব মহাদেব রক্ষরাজ রাবনের তপস্যায় কোন সাড়া দেননি। সেই হেতু রাবণ ক্রমে অধৈর্য্য হয়ে পড়েছেন। যে কোন মুল্যে আরাধ্যদেব শিবকে তুষ্ট করাটাই রাবণের লক্ষ্য।
রক্ষরাজ রাবণ এবার এক শানিত অস্ত্র হাতে নিয়ে তাঁর দশ মুন্ড হতে একটি মুন্ডু স্বহস্তে কেটে নিয়ে অগ্নিতে আহুতি দেন তাঁর আরাধ্য দেব শিবের সাধনায় সফল হতে।
আবার এক হাজার বছর চলে যায়। রাবণ এবার নয় মুন্ড হতে আবার একখানি মুন্ড কেটে অগ্নিতে আহুতি দেন তপস্যায় সিদ্ধ হতে। এমনি করে পরবর্তী নয় হাজার বছরে রাবণ তার নয়টি মাথা অগ্নিতে আহুতি দিলেন সেই অসম্ভব সাধনায় সিদ্ধি লাভ করতে। কিন্তু না, রাবণ তার আরাধ্য দেব শিব শম্ভুর কোন সাড়া পেলেন না ।
অবশেষে দশ হাজার বৎসর শেষে রাবণ যখন তার দশম মস্তক নিজ স্কন্ধ হতে বিযুক্ত করে হোমাগ্নিতে আহুতি দিতে উদ্যত হ্তেই সেই চরমমুহূর্তে স্বয়ং দেবাদিদেব মহাদেব এবার রাবণের সন্মুখে আবির্ভূত হয়ে তাঁর একনিষ্ঠ ভক্ত রাক্ষসরাজ রাবণকে বিরত হতে বললেন। -’ বৎস রাবণ, আমি তোমার তপস্যায় প্রসন্ন হয়েছি। বল তুমি কি বর চাও।’
রাবণ প্রার্থনা করলেন, ‘ হে প্রভু, হে দেবাদিদেব, হে শিবশংকর, যদি আপনি আমার তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে থাকেন তাহলে আপনি আমায় বর দিন !’
শিবশম্ভু বললেন, ‘ বেশ, কি তোমার আকাঙ্ক্ষা !’
দশানন এইবার দৃপ্ত আগ্রহে উদ্দাম আবেগে বলে ওঠেন , ‘ হে কৈলাশবাসি দেবাদিদেব, আমি আমি আমি চাই এক অসীম শক্তি। আমি তাই আপনার তপস্যায় দশহাজার বৎসর এই তপ্ত কটাহে বসে সাধনায় মগ্ন আছি। আপনি আমাকে সেই শক্তি দিন যাহাতে এই পৃথিবীতে আমি অসীম শক্তির অধিকারী হতে পারি ! ‘
দেবাদিদেব মহাদেব তাঁর এই উগ্রভক্তের আবেদন ফেরাতে পারলেন না। তিনি বর দিলেন, ‘তথাস্তু‘ ! আমি বর দিলাম, আমার ভক্ত রাবন অসীম শক্তিধর হবে। আমি আমার একনিষ্ঠ ভক্ত রাবনকে আমার প্রিয় পাশুপত অস্ত্র ‘চন্দ্রহাস’ প্রদান করলাম। এই নাও রাবন, ধর এক পাশুপত । তবে এই অস্ত্রের অপপ্রয়োগ করলে তা তৎক্ষণাৎ আমার হাতে ফিরে আসবে ।স্মরন রেখো !’ – এবং এই কথা বলে ভগবান শিব তাঁর সেই অস্ত্র এইবার রাবনের হস্তে প্রদান করলেন।
রক্ষরাজ দশানন সেই অমোঘ অস্ত্র হাতে পেয়ে অসীম শক্তিধর হলেন। কিন্তু তাহাতেই তিনি ক্ষান্ত হলেন না। তিনি আরো কিছু পেতে লোলুপ হলেন। কি সেই আকাঙ্ক্ষা ? এইবার রক্ষরাজ আকাঙ্ক্ষা করলেন এক এবং অদ্বিতীয় বর, যাহা সকলের আকাঙ্ক্ষিত সেই অমরত্বের। তিনি অসীম শক্তিধর হয়েছেন। কিন্তু অমরত্ব না হলে যে তিনি কুবের এর সমান হতে পারবেন না। অতএব তিনি এক্ষনে পিতামহ ব্রহ্মার কাছ থেকে সেই বর লাভের উদ্দেশ্যে এক কঠিন তপস্যা শুরু করলেন। হাজার বৎসরের তপস্যায় সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা ও এবার তার ভক্ত রাবনের সামনে এসে আবির্ভূত হলেন।
পিতামহ ব্রহ্মা এক্ষনে মধুরস্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বলো বৎস রাবন, তুমি কি বর আকাংখা ক’র ?
রাবণ বিনা দ্বিধায় বলে ওঠে , পিতামহ ব্রহ্মা, যদি আপনি আমার তপস্যায় প্রীত হয়ে থাকেন তাহলে আপনি আমার ইচ্ছা পূর্ণকারী বর দিন, আমি যেন অমরত্ব লাভ করতে পারি।’
অমরত্ব ! সে কি ! কিন্তু এ যে অসম্ভব ! – পিতামহ ব্রহ্মা ভীষণ সংকটে পড়লেন রাবনের এ হেন প্রার্থনায়। এঁকে অমরত্বের বর দেওয়া অর্থ স্বর্গরাজ্যের সমূহ বিপদ। তাই মধুরস্বরে তিনি এক্ষনে রাবণকে বলে ওঠেন, ’ রাবন আমি কাহাকে ও অমরত্ব দিতে পারি না। তুমি অন্য কোন বর চাও । দ্রুত বলো বৎস। কালক্ষেপ ক’রো না ।’
রাবন চিন্তায় পড়ে যায়। আর কি বর সে চাইতে পারে। সময় বিক্ষেপে পিতামহ ব্রহ্মা অন্তর্হিত হয়ে গেলে আবার তাহলে আরো কয়েক হাজার বৎসর ধরে তপস্যা করতে হবে সমুচিত বর লাভের জন্য।
হঠাৎ রাবন এর মনে হল, তবে কেন না আমি সেই বর চাই যাহাতে আমার মৃত্যু কোন দেবদৈত্য রক্ষযক্ষ দানবগন্ধর্ব কিংবা কিন্নর অসুর কারো হাতেই না হয় ! ইহাও একরকম অমরত্ব বলা যায় !
অতএব আর বিন্দুমাত্র কালক্ষেপ না করে লঙ্কাপতি রাবন পিতামহ ব্রহ্মার কাছে এইবার সেই বর চেয়ে বসলেন যাহা অমরত্বের নামান্তর! রাবন এইবার পিতামহ ব্রহ্মাকে বললেন, ‘ হে পিতামহ এমনই যদি আপনার ইচ্ছে তবে আমাকে কেন না সেই বর দিন যাহাতে আমি স্বর্গে মর্ত্যে পাতালে কোন দেব দৈত্য রক্ষ যক্ষ দানব গন্ধর্ব কিন্নর অসুর সকলের কাছে অবধ্য হই। কেহই আমাকে কোনভাবে বধ করতে না পারে। মানুষকে আমি তৃনজ্ঞান করি। তাঁর কথা আর ধর্তব্যের মধ্যে নিলাম না।‘ এইবার পিতামহ ব্রহ্মা বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন। এমন বর দানের ফল কি হতে পারে তা অকল্পনীয়। তথাপি এমন প্রবল ভক্তের জন্য এইটুকু বর দিতেই হয়। আরতো এখন তাঁর আবেদন ফেরানো সম্ভব নয় ! এমন ভক্তকে অমরত্ব না দেওয়া যাক সে অবধ্য না হওয়ার আবেদন করেছে মাত্র এবং তাহা ও মনুষ্যকে কোন গুরুত্ব না দিয়ে ? বেশ তাই হোক ! আর তেমন আবেদন মঞ্জুর করা যেতেই পারে ! আর একবার বর দিলে তাহা স্বতঃই অলঙ্ঘ্যনীয় এবং অপরিবর্তনীয় প্রতি শর্তে !
অতএব এক্ষনে পিতামহ ব্রহ্মা তাঁর আবেদনে সন্মত হয়ে এবার তাঁর দক্ষিনহস্ত উত্তোলিত করে, ‘তথাস্তু বৎস‘ বলে অন্তর্হিত হলেন।
এইবার লংকাধীশ রাবণ ব্রহ্মার বর পেয়ে প্রবল অহংকারে এক অমানুষিক উল্লাসে এবং আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে এক ভীষণ হুংকার ছাড়লেন। সেই হুংকারে সারা পৃথিবীতে এক ভীষণ শিহরণ অনুভুত হল। হিমালয় কম্পমান হয়ে উঠল। সাগর উত্তাল হয়ে উঠল। জীবজগত প্রচন্ড বিস্ময়ে শিহরিত হয়ে উঠে এক ভীতিপ্রদ আতংকে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল গগন মণ্ডলের দিকে। রাবন মনে মনে অসীম শক্তিধর হবার কল্পনায় অধীর হয়ে উঠলেন।
কিন্তু আজ হঠাৎ এই অসময়ে এ কি এক অশুভ আকাশবানী ধ্বনিত হল এই লঙ্কাপুরীর আকাশে বাতাসে ।
স্বয়ং ব্রহ্মা এবং মহেশ্বরের আশীর্বাদে তিনি যে অজেয় , তিনি যে অমর। স্বয়ং নারায়ন তবে কেন নরজন্ম নেবেন তাঁকে বধিতে ?
বৈকুন্ঠ সম্পদ রাম দশরথ ঘরে
জন্ম নিলেন রাবন বধার্থ এ সংসারে।
এমন অদ্ভুত আকাশবাণী শুনে বিচলিত হয়ে ওঠে তাঁর মন। রাক্ষসরাজ রাবণ এবার ডাক দিয়ে আনালেন লংকার সর্বজ্ঞ জ্যোতিষীকে।
সর্বজ্ঞ জ্যোতিষী খড়ি বাঁট করে রাজা দশাননকে বলে ওঠে, ‘ হে রক্ষরাজ, আমার অপরাধ না যদি ধরেন, গণনায় দেখা যাচ্ছে আগামীতে ভীষণ অশুভ লক্ষন। স্বয়ং নারায়ন নররূপে অবতীর্ণ হয়েছেন এই ধরনীতে। সেই নরনারায়ন একদিন হবেন আপনার ভীষণ বৈরী।’
রাক্ষসরাজ রাবণ এক্ষনে ভীষণ রকমে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। হুংকার দিয়ে ডাক দেন সেনাপতি ধুম্রাক্ষকে, ‘ ধুম্রাক্ষ তুমি শুনলে ! কি ভীষণ ষড়যন্ত্র আমার বিরুদ্ধে রচিত হয়েছে স্বর্গের দেবলোকে ?’
সেনাপতি ধুম্রাক্ষ আজ পরিশ্রান্ত কুচকাওয়াজ পরিচালনা করতে। তিনি ভেবে পান না এতে তাঁর কি করনীয় ? কিন্তু সে কথা বলাটা খুব একটা সমীচীন হয় না। অতঃ রাক্ষসরাজ রাবনের ক্ষোভকে প্রশমিত করতে বিচক্ষন সেনাপতি ধুম্রাক্ষ এক্ষনে বলে ওঠে,‘ হে লংকেশ্বর রাবন, ত্রিভুবনে আপনার রক্ষকুল সেনার মত এত পরাক্রমী সেনা আর কাহারোই নেই। তাঁহারা কাহাকেও ভয় পায় না। আপনার আদেশে রক্ষসেনারা সন্মুখ সমরের জন্য প্রস্তুত।’
রাবণ এবার হুংকার দিয়ে ওঠেন, ‘কোথায় খর দূষণ ? খর ও দূষণ কে বলো আমার সামনে এসে দাঁড়াতে। লঙ্কাপুরীর রাক্ষস কুলের সকলের কপালে এক দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ে। সবাই তটস্থ।
খর ও দূষণ রাবনের দুই বৈমাত্রেয় ভাই। দুই ভাই তখন ব্যস্ত ছিল এক পালিত সারমেয়র বাঁকা লেজ সোজা করার নেশাতে। সে কি আর এত সহজে সোজা হয় ?
রাবণের তলব শুনে উৎকণ্ঠিত দুই ভাই এসে হাজির সঙ্গে সারমেয় কোলে নিয়ে।
রাবণ বলেন,‘ খর ও দূষণ, তোমার আমার ভাই , আমার স্বজন। আমি আদেশ করছি তোমাদের, তোমরা সাগরকুলে গিয়ে থানা দাও। কেউ যেন কোন ভাবে লঙ্কায় প্রবেশ না করতে পারে। তোমরা চতুর্দিকে নজর রাখবে আমার শত্রুর সন্ধানে ।‘
খর ও দূষণ বলে, ‘যথা আজ্ঞা মহারাজ।’
রাবণ বললেন, ‘ যাও ‘।
লংকেশ্বর রাবন ! তিনি ভয় পেয়েছেন আকাশবাণী শ্রবনে। তিনি অনুধাবন করতে পেরেছেন নরনারায়ণ নেমে এসেছেন এই ধরাধামে। তাঁর কুলায় কালপুরুষ। মৃত্যুর প্রহর গোনার শুরু। তিনি ভাঙবেন কিন্তু নত হবেন না।
[আদিকান্ড ১ ]


