জিজীবিষা
ধারাবাহিক উপন্যাস
সুরঞ্জিত সরকার
সপ্তদশ পর্ব
পুলিশের বিশাল বাহিনী, সাইবার ক্রাইম এবং সুমন্ত-কল্যাণ অবিনাশের পুরনো চটকলের আস্তানার কাছে গিয়ে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। অবিনাশ পালানোর কোনো পথ না পেয়ে অবশেষে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। তাকে হাতকড়া পরিয়ে যখন গাড়িতে তোলা হচ্ছে, তখন তার চোখে কোনো অনুশোচনা নেই, বরং এক হার না মানা শয়তানি হাসি।
এদিকে তদন্তের স্বার্থে বড়বাবু পাশের বাড়ির প্রতিবেশী শম্ভু বাবু এবং ইন্দ্র বাবুকে থানায় ডেকে জেরা শুরু করেন। তাদের বয়ান থেকে এক হাড়হিম করা তথ্য বেরিয়ে আসে।
জেরার চোটে শম্ভু বাবু হাত জোড় করে ভয়ে ভয়ে বলছেন, “স্যার, পূরবী বৌদি মারা যাইবার পর থেকেই বাড়িটা যেন নরক হয়ে উঠেছিল। আমরা রাতের বেলা দেখতুম কত অপরিচিত পোলা-মাইয়্যারা ওইখানে আইসতো। কান্নার আওয়াজ পাইতাম, কিন্তু অবিনাশের গুণ্ডাদের ভয়ে মুখ খোলার সাহস পাইনি।”
ইন্দ্র কাকু পাশ থেকে বলে উঠল, “ঠিক বলেছেন শম্ভুদা। প্রায়ই দেখতাম মাঝরাতে মাতালদের আনাগোনা। অবিনাশ লোকটা এমন ত্রাস তৈরি করেছিল যে পাড়ার কেউ প্রতিবাদ করতে গেলেই তাকে শাসানো হতো। কতবার কত খদ্দের বাড়িটা কিনতে এল, কিন্তু ওদের চ্যালাগুলো এমন ভূতুড়ে কাণ্ড ঘটাত আর ভয় দেখাত যে লোকগুলো প্রাণ হাতে করে পালাত।”
এই কথা শুনে কল্যাণ ভাবতে ভাবতে বলল, “তার মানে দাদু যখন বাড়িটা কিনেছিলেন, তখন রহমান চাচাকে হুমকি দিয়ে ত্রিশূল বাহিনীর গুন্ডারা কবজটা হাতিয়ে নিয়েছিল যাতে বাড়ির দখল ওদের হাতেই থাকে? আর দাদু দিদা এখানে থাকতে শুরু করার পরেও ওরা মাটির নিচের সেই গোপন ডেরা ব্যবহার করা থামায়নি!”
বড়বাবু সায় দিয়ে বললেন, “একদম ঠিক। শম্ভু বাবু আর ইন্দ্রবাবুর বয়ান থেকে এটা পরিষ্কার যে, অবিনাশ শুধু মাদক নয়, বরং একটা আস্ত হিউম্যান ট্র্যাফিকিং র্যাকেট চালাচ্ছিল পূরবী ভবনের নিচ থেকে। আর ওই মাতালরা ছিল ওর পাহারাদার, যারা বাইরের লোকের নজর অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিত।”
সুমন্ত পাশ থেকে দৃঢ় গলায় বলল, “অবিনাশকে এমন সাজা দিতে হবে বড়বাবু, যাতে ওর প্রতিটি অপরাধের জবাব পাওয়া যায়। আজ আমাদের বাড়িটা ধসে পড়লেও পাড়াটা একটা বড় অভিশাপ থেকে মুক্তি পেল। এরপর মেহেদিপুরের শিমুল সরকারকে ধরতে পারলে আরো অনেক কঠিন সত্য বেরিয়ে আসবে। “
পুলিশের থার্ড ডিগ্রি জেরার মুখে বেশিক্ষণ টিকতে পারল না অবিনাশ। তার দম্ভ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল যখন বড়বাবু তাকে কাটা মানিকের মুখোমুখি বসালেন।
বড়বাবু অবিনাশের কলার চেপে ধরে জানতে চাইল, “বল! এই সবকিছুর পেছনে আসল মাথাটা কে? এই ড্রাগ আর দেহ ব্যবসার নেটওয়ার্ক সীমান্ত পেরিয়ে কোথায় যায়?”
অবিনাশ ফাঁপা গলায় বলল, “স্যার, আমি তো কেবল একটা ঘুঁটি। এই সবকিছুর চালিকাশক্তি হলো ঢাকার ‘ত্রিশূল বাহিনী’। আর তাদের মূল পান্ডা হলো শিমুল সরকার। ওপার বাংলায় বসেই ও পুরো সিন্ডিকেটটা নিয়ন্ত্রণ করে। পূরবী ভবনের নিচে যে কঙ্কালগুলো পেয়েছেন, ওগুলো শিমুল সরকারের অবাধ্য হওয়া মানুষদের দশা।”
সুমন্ত স্তম্ভিত হয়ে বলল, ” এই নামটা শোনার অপেক্ষায় ছিলাম। শিমুল সরকার! তার মানে এটা সত্যিই কেবল স্থানীয় কোনো অপরাধ নয়, রীতিমতো একটা আন্তর্জাতিক চক্রের কাজ! বড়বাবু, এই শিমুল সরকারের নাগাল পাওয়া কি সম্ভব?”
বড়বাবু ফোন হাতে নিয়ে বললেন, “শিমুল সরকার পুলিশের খাতায় অনেকদিন ধরেই ওয়ান্টেড। তবে অবিনাশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শিমুল এখন সীমান্তের খুব কাছেই কোথাও অবস্থান করছে নতুন কোনো চালের জন্য। ওপার বাংলার পুলিশের সাথে আমাদের যোগাযোগ চলছে।”
কল্যাণ বলতে লাগল, “বড়বাবু, অবিনাশের ফোন রেকর্ড থেকে যদি শিমুল সরকারের বর্তমান লোকেশনটা পাওয়া যায়, তবে হয়তো ওকে সীমান্ত পেরোনোর আগেই ধরা যাবে। শিমুল সরকার ধরা পড়লে এই ‘ত্রিশূল বাহিনী’র শেকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব হবে।”



