১৯ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

 ১৯ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

This entry is part 19 of 19 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৫ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৬ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৭ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৮ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৯ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১০ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা – দশম পর্ব

১১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৫ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৬ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

 ১৯ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

যে মুহূর্তে চোখ বুজেছি, একটা আবছা জগৎ আমার সামনে মূর্ত হয়ে উঠল।আমার নিজের সৃষ্ট পৃথিবী। আমার চিন্তা ও পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ একটা পৃথিবী।জাগৃতির পৃথিবী যেখানে কোনো বাধাই আমার ভাবনাকে আগল দিতে পারবে না।স্থান ও কালের ধারণা গুরুত্ব হারিয়েছে।আমার অস্তিত্বের গভীর থেকে উঠে আসা কামনা- রহিত এই অনুভূতি ছিল আমার সুপ্ত প্রয়োজনগুলির ফসল যা আমার সম্মুখে কিছু অবিশ্বাস্য, অথচ একান্তই স্বাভাবিক রূপ ও ঘটনার সৃষ্টি করল।
যখন জেগে উঠলাম তখনও নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দিহান ছিলাম!স্থান কালের জ্ঞান ছিল না।মনে হচ্ছিল যেহেতু সব স্বপ্নই আমার নিজের তৈরি তাই তাদের বিশ্লেষণও আমার জানা।রাত গভীর হলে ঘুম এসে গেল।মনে হল কোনো এক অজানা শহরের বাতাস টেনে নিচ্ছি বুক ভরে আর হেঁটে বেড়াচ্ছি শহর জুড়ে। সেখানকার ঘরবাড়িগুলির অদ্ভুত জ‍্যামিতিক আকার।প্রিজম, কোণ বা ঘনকের মত।তাদের অন্ধকার নীচু জানালাগুলি কালো লিলির লতায় আচ্ছন্ন।অধিবাসীরা কোনো অজানা রোগে মারা গেছে যেন।তারা প্রস্তরীভূত হয়ে গেছে এবং তাদের মুখ থেকে দু ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে এসে পড়েছে তাদের পোশাকে।যাকেই স্পর্শ করছি তার মুথা ভেঙে পড়ে যাচ্ছে মাটিতে!তারপর আমি একটা কষাইয়ের দোকানে পৌছলাম।একজন লোককে দেখে মনে হল সে ছেঁড়া ন‍্যাকড়া আর হাড়ের কারবারি।আমাদের বাড়ির সামনেই বসে ছিল।মাথায় একটা মাফলার আর হাতে লম্বা হাতলের ছুরি।সে রক্তচক্ষু নিয়ে আমার দিকে চেয়ে ছিল।যেন তার চোখের পাতাগুলো কেটে ফেলা হয়েছে।যখন তার হাত থেকে ছুরিটা কেড়ে নেবার চেষ্টা করলাম তখন তার মাথাটা গড়িয়ে পড়ে গেল।একটা লোককে দেখলাম সে খুব ভয়ার্তভাবে জায়গাটা পার হয়ে যাচ্ছিল।আমিও পালাবার অভিপ্রায়ে রাস্তা ধরে ছুটতে লাগলাম।যাদেরকে দেখলাম সকলেই প্রস্তরীভূত।আমার পিছনে তাকাতে ভয় করছিল।আমি আমার শশুরবাড়িতে ফিরে এসে দাওয়ায় আমার বাচ্ছা শ‍্যালকটিকে দেখততে পেলাম।আমি কুকিদুটো তাকে দেবার জন‍্যে পকেট থেকে বার করে তার মাথা স্পর্শ করতেই মাথাটে খসে পড়ে গড়িয়ে গেল।আমি চিৎকার করে জেগে উঠলাম।তখনও চারপাশটা ধোঁয়াশা।আমার বুক ধড়ফড় করছিল।ঘরের ছাদটা যেন আমার বুকের ওপর চেপে আসছিল।দেয়ালগুলো যেন খুব মোটা হয়ে গেছে আর আমার বুকটা যেন এখুনি ফেটে যাবে।এক মুহূর্তের জন‍্যে চোখের দৃষ্টি নিভে এলো।ভয়ানক!কড়ি বর্গাগুলোর দিকে চেয়ে রইলাম।বিমগুলো বারম্বার গুনতে গুনতে যখন জোর করে চোখদুটো বন্ধ করেছি তখনই দরজা খোলার শব্দ পেলাম।ন‍্যানি এসে ঢুকল।আমার ঘরদোর সাফসুতরো করবে।আমার জন‍্যে জলখাবার এনেছে সেটা দোতলায় রেখে এলো।আমি সিঁড়ি দিয়ে উঠে গিয়ে ব‍্যালকনিতে বসলাম।আমি সেখান থেকে ছেঁড়া কাপড় আর হাড়ের কারবারিকে দেখতে পেলাম না যে আমার ঘরের ঠিক সামনেই বসতো তবে আমার বাঁদিকের সেই কসাইটাকে দেখতে পেলাম।ওর কাজবাজ এইসব আরকি!জানলা দিয়ে যেটুকু দেখলাম তাতেই বেশ ভয় ধরে গেল!

লোকটাকে কেমনজানি হাস‍্যকর আর গরীব দেখাচ্ছিল যেন সে আদপেই কসাই নয় স্রেফ অভিনয় করছে!দুটো রোঢ়গ্ন কালো ঘোড়ার দুদিকে দুটি করে ভেড়ার মৃতদেহ।ঘোড়াগুলো প্রচন্ড কাশছিল।শুখনো কাশি।কসাইটা ওর তেলচুকচুকে হাতে গোফে তা দিল খানিক তারপর একজন ক্রেতার দৃষ্টি নিয়ে ভেড়াগুলোকে জরিপ করল তারপর বেশ কসরত করেই ভেড়াদুটোকে দোকানের ভিতরে নিয়ে গিয়ে হুকে ঝুলিয়ে দিল।ভেড়ার পায়ে এমনভাবে হাত বোলাচ্ছিল যেন সোহাগ করছে।গত রাতে যখন সে তার স্ত্রীর শরীরের সঙ্গে খেলছিল তখনও হয়ত সে এই ভেড়াদুটোর কথাই ভাবছিল।অথবা তাকে মেরে বেচে দিলে কত টাকা লাভ হতে পারে সেটাই যে ভাবছিল না কে বলতে পারে!

পরিচ্ছন্ন হয়ে গেলে ঘরে ফিরে এলাম।একটা ভীতিপ্রদ সিদ্ধান্ত নিলাম!লম্বা হাতলের ছুরিটা মিটসেফের ভিতরে টিনের কৌটো থেকে খুঁজে বার করে শার্টের হাতার প্রান্ত দিয়ে তার ব্লেডটা পরিস্কার করলাম এবং ছুরিটা রাখলাম আমার বালিশের নিচে।এই সিদ্ধান্তটা অনেক আগে একবার নিয়েছিলাম।কিন্তু আজ কসাইটার ভেড়ার পায়ে ওভাবে হাত বোলানো কাটা এবং ওজন করার দৃশ‍্যটা আমার মধ‍্যে ওকে নকল করার ইচ্ছাটাকে পুনর্জীবিত করল। এই আনন্দ অনুভব করাটা আমার জন‍্যে জরুরী হয়ে পড়ল।
জানলা দিয়ে আকাশ দেখলাম ঘন নীল।সেখানে পৌঁছতে হলে একটা মস্তবড় সিঁড়ি চাই।দিগন্ত ঢাকা পড়ে গিয়েছিল মারাত্মক একপ্রকার ঘন হলদে রঙের মেঘে।শহরের বুকের ওপর ভার হয়ে জমে ছিল।

আবহাওয়াটা ছিল ভয়ংকর, অথচ এক অদ্ভুত নেশা জাগানো। কেন জানি না, নিজেকে মেঝের দিকে ঝুঁকে পড়তে দেখলাম। এমন আবহাওয়ায় আমার সবসময় মৃত্যুর কথাই মনে হয়!কিন্তু এখন, যখন রক্তমাখা মুখ আর হাড্ডিসার হাতওয়ালা মৃত্যু নিজেই আমার গলা চেপে ধরেছে তখন আমিও আমার সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে চাইলাম। অনেক আগেই স্থির করেছিলাম, সেই বেশ্যাটাকেও সঙ্গে নিয়ে যাব, যাতে আমার মৃত্যুর পর সে বলতে না পারে, “ঈশ্বর ওর প্রতি দয়া করুন, ও তো যথেষ্ট কষ্ট পেয়েছে!”

ঠিক সেই সময়, আমার জানালার সামনে দিয়ে একটি কফিন বয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।একটা ভয়ানক সিদ্ধান্ত নিলাম!কফিনটা কালো কাপড়ে ঢাকা।উপরে দুটো মোমবাতি জ্বলছে।’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ র সুর আমার মনোযোগ কেড়ে নিল।দোকানদার আর পথচারীরা নিজেদের কাজ থামিয়ে কফিনের পেছনে সাত পা হেঁটে গেল, তারপর আবার যে যার কাজে ফিরে গেল। এমনকি কসাইটিও একটি ধর্মীয় সৎকর্ম সম্পন্ন করার তৃপ্তিতে সাত পা কফিনের পেছনে হেঁটে এসে আবার নিজের দোকানে ফিরে এলো।তবে সেই কম্বল আর হাড়ের কারবারিটি কিন্তু যেখানে বসেছিল সেখানেই বসে রইল।কোথাও নড়ল না।

সকলের মুখই গম্ভীর আর থমথমে লাগছিল।হয়ত এই শোভাযাত্রাটি তাদের নিজেদের নস্বরতা এবং পরজগতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল। আমার ন‍্যানি যখন আমার জন্য ভেষজ নির্যাস নিয়ে এলো, তখন কপালে গভীর ভ্রুকুটি নিয়ে আঙুলের ফাঁকে জপমালার বড় বড় পুঁতিগুলো ঘোরাচ্ছিল আর মনে মনে প্রার্থনা করছিল। পরে তারস্বরে প্রার্থনা আওড়াতে লাগল ‘আল্লাহুম্মা, সাল্লাহুম্মা…’

সে এমন একখানা ভাব করছিল যেন তাবৎ জীবিত মানুষের কৃত পাপ ক্ষমা করার দায়িত্ব যেন আমার হাতেই ন‍্যস্ত! কিন্তু এই মস্করা আমার ওপর সামান্যতমও প্রভাব ফেলতে পারেনি। বরং আমার বেশ মজাই লাগছিল এই ভেবে যে, অন্তত কিছুক্ষণের জন্য হলেও, মিথ‍্যেমিথ‍্যি হলেও, এই জনতা আমার জগতের মধ্যে অন্তত কয়েকটা মুহূর্ত কাটাচ্ছে।আমার ঘরটাই কি এক কফিন ছিল না? আমার বিছানাটা কি কবরের চেয়েও ঠান্ডা ও অন্ধকার নয়? সেই একই বিছানা, যা আমাকে প্রতিনিয়ত ঘুমের দিকে আহ্বান জানাত! বহুবার আমার মনে হয়েছে আমি যেন একটি কফিনের ভেতরে শুয়ে আছি। রাতে আমার ঘরটা যেন ছোট হয়ে এসে চারদিক থেকে আমাকে চেপে ধরত। কবরের মধ্যে মানুষ যে অনুভূতির ভেতর দিয়ে যায়, এও কি ঠিক তাই নয়? মৃত মানুষের ইন্দ্রিয়গুলোর অবস্থার কথা কি কেউ জানে?

যদিও মৃত্যুর সময় রক্ত সংবহন বন্ধ হয়ে যায়, এবং চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই শরীরের কিছু অংশ পচতে শুরু করে ও আলগা হয়ে যেতে শুরু করে, তবু অনেকক্ষণ পর্যন্ত চুল ও নখ বাড়তেই থাকে। হৃদস্পন্দন থেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কি অনুভূতি ও চিন্তাও শেষ হয়ে যায়, নাকি ক্ষুদ্র রক্তনালিগুলোতে অবশিষ্ট রক্তকে আশ্রয় করে তারা এক অস্পষ্ট জীবন টিকিয়ে রাখে?

মৃত্যুর চিন্তাকে ঘিরে যে অনুভূতি, তা নিজেই ভয়ংকর; সুতরাং, সেই সূত্রে বলা যায়, সত্যিই মৃত হয়ে থাকার অনুভূতি নিশ্চয়ই সবচেয়ে বিভীষিকাময় ও অসহনীয়। কিছু বৃদ্ধ মানুষ আছেন, যাঁরা ঠোঁটে একটুখানি হাসি নিয়ে এমন শান্তভাবে মারা যান যে মনে হয় যেন এক ঘুম থেকে আরেক ঘুমে চলে গেলেন। তাঁরা যেন তেলের প্রদীপের মতো, নীরবে নিজেকে জ্বালিয়ে শেষ করে দেন।



এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি