এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

This entry is part 12 of 12 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৫ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৬ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৭ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৮ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা – দশম পর্ব

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

কিছুকাল পর আমার বাবা এক কুমারী মেয়ের প্রেমে পড়লেন।বুগাম দাসী নাম্নী সেই মহিলা লিঙ্গ-মন্দিরের নর্তকী ছিলেন।মেয়েটির কাজ ছিল যে কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে লিঙ্গমন্দিরের বিগ্রহের সামনে নৃত‍্য প্রদর্শন করা আর মন্দিরের খেয়াল রাখা।সেই অলিভ ত্বকের মেয়েটি খুবই সহৃদয়া ছিল।তার পাতিলেবুর আকারের স্তন,দীর্ঘ বাঁকা চোখ,সরু জোড়াভুরুর মাঝে সে একটি লাল টিপ পরত।

এখন আমি ওই বুগাম দাসীকে আমার মা হিসেবে কল্পনা করি।নৃত‍্যপরায়ণা।সেতার ড্রাম,ল‍্যুট, শিঙা ও করতালের সঙ্গে পরিমিত ছন্দবদ্ধ সঞ্চালনা।সে একটা সোনার জরির কাজ করা রঙিন সিল্কের শাড়ি পরেছিল।পোশাকটা ঘাড়ের কাছে উন্মুক্ত ছিল। অনন্ত রাত্রির মত তার ঘন কালো কেশদাম।যার ওপর সে একটা ব্রোকেডের ফিঁতে জড়িয়েছিল।যেটা তার মাথার পিছনে গিঁট দেওয়া ছিল।হাতের কব্জি এবং পায়ের গোছেও গয়না পরেছিল।নাকে পরেছিল একটি সোনার বলয়।তার চোখদুটি আয়ত, বাঁকা, ঘনকালো ও বাঙ্ময়।দাঁতগুলি চমৎকার।তিনি একটি একঘেয়ে করুণ সুরের সঙ্গে নেচে চলেছিলেন।একজন অর্ধনগ্ন মানুষ সেটি বাজাচ্ছিলেন।সেই সঙ্গীতের ভিতর জমানো ছিল কী এক রহস‍্য জাদু!কুসংস্কার,কামবাসনা আর ভারতীয়দের দুঃখগাথা। সঠিক মুদ্রা ও পায়ের কাজের সঙ্গে বুগাম দাসী যেন ফুলের পাপড়ির মত নিজেকে মেলে ধরছিল।কাঁধ ও বাহু ঝাঁকিয়ে কখনো বেঁকেচুরে নৃত‍্যবিভঙ্গ সৃষ্টির পর আবার স্বাভাবিকতায় ফিরে আসছিল সে।এই সঙ্কেতধর্মী বিভঙ্গ এবং নির্বাক বাঙ্ময়তার প্রভাব পড়েছিল আমার বাবার ওপর।তার ঘামের কটু ঝাঁঝালো গন্ধ মিলেমিশে গিয়েছিল চাঁপার সুবাসের সঙ্গে।চন্দনতেল সেই কামার্ত দৃশ‍্যটিকে ক্রমশ জোরালো করে তুলেছিল।
কোনো দূরবর্তী দেশের গাছের নির্যাসের গন্ধের সঙ্গে মিশে সেই সুবাস যেন অবদমিত বিস্মৃতপ্রায় সংবেদনাকে জাগিয়ে তোলে।—ওষুধের বাক্সের গন্ধ, নার্সারিতে রাখা ভারতীয় ভেষজের গন্ধ, প্রাচীন অর্থপূর্ণ আচার-অনুষ্ঠানে ভরা অজানা তেলের গন্ধ—হয়তো আমার বাড়ির তৈরি আরকের মতোই কোনো গন্ধ। এই সবকিছুই নিশ্চয়ই আমার বাবার সুপ্ত ও দমিত স্মৃতিগুলোকে জাগিয়ে তুলেছিল।

আমার বাবা বুগম দাসীর প্রেমে এতটাই ডুবে গিয়েছিলেন যে তিনি সেই নর্তকীর ধর্ম গ্রহণ করেন এবং লিঙ্গপন্থে যোগ দেন। কিন্তু মেয়েটি গর্ভবতী হতেই তাকে মন্দিরের সেবা থেকে বহিষ্কার করা হয়।

আমার জন্মের কিছুদিন পরেই, আমার কাকা বারাণসী থেকে ফিরে এলেন। তার পছন্দ ও প্রেমের অনুভূতি ছিল আমার বাবার মতোই, তাই তিনিও আমার মায়ের গভীর প্রেমে পড়লেন এবং তাকে প্রলুব্ধ করতেও সফল হলেন। বাবার সঙ্গে তার বাহ্যিক ও অন্তর্গত সাদৃশ্য তাকে এই কাজে সাহায্য করেছিল। যখন এই সম্পর্কের কথা প্রকাশ পেল, তখন আমার মা দুজনকেই ত্যাগ করার হুমকি
দিলেন যতক্ষণ না তারা একটি কালসাপের প্রতিযোগিতার মধ‍্যে দিয়ে যাচ্ছেন।প্রতিযোগিতার নিয়ম অনুযায়ী,যে বেঁচে থাকবে, বুগাম দাসী তারই হবে।
এই পরীক্ষায় আমার বাবা ও কাকাকে একটি অন্ধকূপের মধ‍্যে বন্দি করা হয়েছিল। সেই ঘরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল একটি কালসর্প। ধারণা ছিল, যাকে সাপ কামড়াবে, সে চিৎকার করবে; তখন সাপুড়ে দরজা খুলে অন্যজনকে বাঁচাবে। আর বুগাম দাসী হবে সেই বেঁচে থাকা মানুষটির।
বন্দি হওয়ার আগে, আমার বাবা বুগাম দাসীকে অনুরোধ করেছিলেন মন্দিরের পবিত্র আচার সম্পন্ন করতে এবং শেষবারের মতো তার সামনে নৃত্য করতে। সে রাজি হয়েছিল। প্রদীপের আলোয়, সাপুড়ের বাঁশির সুরে সে নাচতে শুরু করল। অর্থবহ, সুষম ও খানিকটা ছেনাল ধরনের ভঙ্গীতে নাচ করছিল।একটি কালসাপের মতো শরীর পেঁচিয়ে, মোচড় দিয়ে।
তারপর আমার বাবা ও কাকাকে সেই বিশেষ ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া হল, যেখানে কালসাপটি ছিল। কিন্তু প্রত্যাশিত যন্ত্রণার চিৎকার শোনা গেল না বরং শোনা গেল এক অদ্ভুত গোঙানি, আর তার সঙ্গে এক শিউরে ওঠা উন্মাদের হাসি।
দরজা খোলা হলে, আমার কাকা বেরিয়ে এলেন। সবাই বিস্মিত।তার মুখ যেন একেবারে বুড়িয়ে গেছে, যন্ত্রণায় বিকৃত। তিনি শুনেছিলেন সাপের হিসহিস শব্দ, তার শরীরের কুণ্ডলী পাকানোর শব্দ ; দেখেছিলেন তার গোল, দুষ্ট চোখ, বিষাক্ত দাঁত; আর দেখেছিলেন তার দেহ,একটি ছোট মাথা, লম্বা গলা, যার শেষে চামচের মতো ফোলা অংশ।
ভয় ও আতঙ্কে উন্মাদ হয়ে, চুল সাদা হয়ে যাওয়া অবস্থায়, তিনি সেই ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।
শর্ত অনুযায়ী, বুগাম দাসী তাকে দেওয়া হল। কিন্তু থেকে গেল এক ভয়ংকর সত্য—এই মানুষটি হয়তো আমার বাবা, কিংবা আমার কাকা। যে বেঁচে ফিরেছে, সে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছে, উন্মাদ হয়ে গেছে, নিজের সন্তানকেও চিনতে পারছে না। তবুও সবাই ধরে নিল, সে আমার কাকাই।
এই গল্পের সঙ্গে কি আমার জীবনের কোনো সম্পর্ক নেই? সেই ভয়াবহ হাসির প্রতিধ্বনি, সেই পরীক্ষার আতঙ্ক—এসব কি আমাকে প্রভাবিত করেনি?
এরপর থেকে আমি হয়ে গেলাম একেবারে অপরিচিত, বাড়তি বোঝা।
শেষ পর্যন্ত, আমার কাকা—অথবা বাবা—তার ব্যবসার কাজে, বুগাম দাসীকে সঙ্গে নিয়ে রেয় শহরে ফিরে গেলেন। আমাকেও সঙ্গে নিয়ে গিয়ে, আমার পিসির জিম্মায় রেখে দিলেন।
আমার দাইমা বলতেন, বিদায়ের সময় আমার মা আমার জন্য একটি বেগুনি রঙের মদের পাত্র পিসির কাছে রেখে গিয়েছিলেন। সেই মদের মধ্যে নাকি মিশিয়ে দেওয়া ছিল নাগ-সাপের বিষ।
আর কী-ই বা হতে পারে সন্তানের জন্য তার রেখে যাওয়া স্মৃতি—এই বেগুনি মদ, যা চিরন্তন প্রশান্তি চিতে পারে! হয়তো সে নিজের জীবনকেও আঙুরের মতো চেপে, সেই মদের মতোই আমাকে দিয়ে গেছে—সেই একই বিষ, যা আমার বাবাকে মেরেছিল।
এখন আমি তার সেই উপহারের মূল্য বুঝতে পারি।
আমার মা কি বেঁচে আছেন? হয়তো এই মুহূর্তেই, যখন আমি লিখছি, তিনি ভারতের কোনো অজ গাঁয়ের ময়দানে নাচছেন—মশালের আলোয়, এক নাগ-সাপের মতো শরীর পেঁচিয়ে, মোচড় দিয়ে যেন সত‍্যিই কোনো নাগসাপ তাকে দংশন করেছে।তিনি নারী শিশু এবং কিছু অর্ধনগ্ন পুরুষ দ্বারা পরিবৃত ছিলেন।আর এক কোণে বসে আছে আমার বাবা।অথবা কাকা!পলিত কেশ ন‍্যুব্জদেহ নিয়ে, তাকিয়ে আছে তার দিকে।
তাকে দেখতে দেখতে যেন তার পুনরায় মনে পড়ে যাচ্ছে সেই অন্ধকার কারাগারের কথা।মনে পড়ছে সাপের হিসহিস শব্দ, তার শরীরের ঘর্ষণ, উঁচু করে তোলা মাথা, ঝলমলে চোখ, ফণা মেলে ধরা গলা, আর তার পেছনে ধূসর রেখা!যেন একজোড়া চশমার মতো দাগ।
যাই হোক, আমি তখন দুধের শিশু, যখন আমাকে তুলে দেওয়া হয়েছিল সেই দাইমার হাতে।যিনি আমার পিসতুতোবোনকেও মানুষ করছিলেন, সেই বেশ‍্যা রমণী, যে এখন আমার স্ত্রী।

(চলবে )

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

“…সৃষ্টির শেষ রহস্য,ভালোবাসার অমৃত”- নবনীতা দেব সেন

This entry is part 12 of 12 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

This entry is part 12 of 12 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর পথযাত্রী …সৃষ্টির

Read More »