জিজীবিষা
সুরঞ্জিত সরকার
দশম পর্ব
থানা থেকে বেরিয়ে ভোরের আলোয় যখন সুমন্ত ও কল্যাণ কৈপুকুরের বাড়ির সদর দরজায় এসে দাঁড়াল, তখন তাদের চোখেমুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ও উত্তেজনার ছাপ। বাড়িতে পা দিয়েই তারা যেন এক দীর্ঘস্থায়ী অভিশাপ থেকে মুক্তি পেল।
বাড়িতে ঢুকেই সুমন্ত দেখল মা ঠাকুরঘরে প্রদীপ জ্বালছেন। সুমন্ত কাছে গিয়ে ধপ করে বসে পড়ে বলল, “মা, সব রহস্য ফাঁস হয়ে গেছে! পূরবী ভবনের সেই কুৎসিত মাদকচক্র থেকে শুরু করে ওপার বাংলার মেহেদিপুরের সেই বিশ্বাসঘাতকতা—সব এখন পুলিশের হাতে।”
পূর্ণা দেবী ডায়েরির সেই শিমুল সরকারের কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি জানতেন এই বন্ধুত্বের আড়ালে কোনো বিষ লুকিয়ে আছে, যা আজ জিজীবিষার নকশায় ধরা পড়ল।
সুমন্ত ড্রয়িং রুমে গিয়ে নিজের ফোনটা বের করে স্ত্রী সুনীপাকে কল করল। সুনীপা তখন উদ্বেগে ছটফট করছিল। ফোন তুলতেই সুমন্ত উত্তেজিত গলায় বলল, “সুনীপা, শুনলে তুমি অবাক হবে! আমরা শুধু ঠাকুমার ডায়েরি উদ্ধার করিনি, সরকার বংশের কলঙ্কিত ইতিহাসটাও ধুয়ে মুছে দিলাম। পূরবী ভবনের তিনতলায় গোপন কুঠুরিতে দ্বিতীয় নীল পাথরটা পাওয়া গেছে। আর সৌরীশদা ওটা বাজেয়াপ্ত করেছে।”
সুনীপা ওপার থেকে রুদ্ধশ্বাসে বলল, “তাহলে শিমুল কাকু আমাদের এতো বড় শত্রু? তিনি দাদুর সম্পত্তি আর ওপার বাংলার সব সোনা-গহনা হাতিয়ে নিয়েছেন? দাদু কি ঠিক আছেন?”
সুমন্ত আশ্বস্ত করে বলল, “দাদু এখন অনেকটা শান্ত। তিনি বুঝেছেন যে তাঁর হারিয়ে যাওয়া বন্ধু শিমুল আসলে ‘ত্রিশূল’ সংগঠনের মাথা।”
কল্যাণ পাশ থেকে ফোনটা নিয়ে সুনীপাকে বলল, “তুমি বিশ্বাস করবে না, ঠাকুমা পূরবী দেবী নিজে আজ আমাদের পথ দেখিয়েছেন। ওপার বাংলার মেহেদিপুরের সেই পৈতৃক ভিটেয় যাওয়ার তোড়জোড় চলছে। সৌরীশবাবু ইন্টারপোলের মাধ্যমে ঢাকা পুলিশের সাথে যোগাযোগ করছেন।”
দাদু অতীশ জানলার ধারে বসে বাইরের কৈপুকুরের শান্ত প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তিনি পূর্ণা ও সুনীপার (ফোনে) উদ্দেশ্যে বললেন, “জিজীবিষার নকশাটা আজ সার্থক হলো। আমার নাতিরা আজ শুধু সম্পদ নয়, সরকার বংশের মান-মর্যাদা রক্ষা করতে শিখেছে। শিমুলকে এবার আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে।”
অতীশ ধীর গলায় বলতে শুরু করলেন, “তোরা আজ যাকে অপরাধী সংগঠন হিসেবে দেখছিস, সেই ‘ত্রিশূল’ একসময় অন্যরকম ছিল। আমার বড়দা যতীশ আর শিমুল—ওরা দুজনেই ছিল এর নিবেদিতপ্রাণ সদস্য। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এই গুপ্ত সংগঠনের বীরত্বগাথা আজও অনেকের অজানা। ওরা ব্রিটিশদের চোখে ধুলো দিয়ে অস্ত্র পাচার করত, গোপন সভা করত।”
সুমন্ত অবাক হয়ে বলল, “তার মানে এই সংগঠনটা কোনোকালে দেশপ্রেমিক ছিল?”
অতীশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “হ্যাঁ, ছিল। কিন্তু ক্ষমতা আর অর্থ মানুষের চরিত্র বদলে দেয়। দেশভাগের সময় যখন সব ওলটপালট হয়ে যাচ্ছিল, শিমুল আমাকে বার বার বলেছিল, ‘অতীশদা, তুমি মেহেদিপুরে যেও না, ওখানে দাঙ্গা লেগে তোমাদের সব বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সেখানে গেলে তোমাকে ওরা মেরেই ফেলবে।’ আমি সরল বিশ্বাসে ওকে বিশ্বাস করেছিলাম। প্রাণের ভয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে এপারে চলে এলাম।”
কল্যাণ উত্তেজিত হয়ে বলল, “তার মানে দাদু, শিমুল কাকা তোমাকে ভয় দেখিয়ে ওপার থেকে সরিয়ে দিয়েছিল যাতে সে একাই সব ভোগ করতে পারে? মেহেদিপুরের বাড়ি কি তবে আদৌ পোড়েনি?”
দাদু মাথা নিচু করে বললেন, “এখন বুঝতে পারছি, সবটাই ছিল ওর সাজানো নাটক। ডায়েরির নকশা আর সৌরীশবাবুর তদন্ত প্রমাণ করছে যে মেহেদিপুরের সেই বাড়ি আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে এবং সেখানে আমাদের সরকার বংশের সব সম্পদ শিমুল কুক্ষিগত করে রেখেছে।”
অতীশ আরও বললেন, “বড়দা যতীশ যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তবে দেখতেন তাঁর স্বপ্নের ‘ত্রিশূল’ আজ মাদকচক্র আর দেহব্যবসার আখড়ায় পরিণত হয়েছে। শিমুল সেই পবিত্র সংগঠনকে কলুষিত করেছে।”
পূর্ণা দেবী আঁচলে চোখ মুছে বললেন, “বাবা, তার মানে আপনি এতগুলো বছর এক মিথ্যে আতঙ্কে কাটিয়ে দিলেন?”
সুমন্ত উঠে দাঁড়িয়ে দাদুর হাত ধরল। “দাদু, আর ভয় নেই। শিমুল কাকু তোমাকে প্রাণনাশের ভয় দেখিয়েছিল, কিন্তু এবার আমরা সেই ভয়কে জয় করব। জিজীবিষার মানে যদি বেঁচে থাকার ইচ্ছা হয়, তবে সেই ইচ্ছা আজ আমাদের ওপার বাংলায় নিয়ে যাবে। আমরা মেহেদিপুর যাবই।”
এরপর দুজনেই স্নান খাওয়া সেরে ফিরে যাবার জন্য রওনা দিল। দুই ভাই ট্রেনের জন্য স্টেশনে অপেক্ষা করছে। এমনসময় ট্রেনে ওঠার ঠিক আগের মুহূর্তে স্টেশনের অফিসযাত্রীদের ভিড়ের মধ্যে থেকে হঠাৎ অবিনাশ টোটোওয়ালা কল্যাণের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার চোখের চাহনিতে এখন কোনো বশ্যতা নেই, বরং আছে তীব্র ঘৃণা। সে ফিসফিস করে ধমকের সুরে বলল, “পুলিশ ডেকে বড্ড ভুল করলেন দাদাবাবু। সৌরীশবাবু আপনাদের কতদিন বাঁচাবেন? পুলিশের লাঠি তো আমাদের পিঠে পড়ার অভ্যেস আছে, কিন্তু একবার জল ঘোলা হলে কার ঘাড় মটকে যাবে কেউ জানে না। দেখে রাখুন, জল কতদূর গড়ায়!”
কিছু বলার আগেই স্টেশনের ভিড়ে অবিনাশ মিশে গেল।
সুমন্ত নিজের কর্মস্থল কল্যাণপুরে ফিরে গিয়েও শান্ত হতে পারল না। অবিনাশের সেই লাল চোখ দুটো তার চোখের সামনে ভাসছে। সে বুঝতে পারল, অবিনাশ কেবল একজন টোটোওয়ালা নয়, সে ছিল সরকার বাড়ির ওপর নজর রাখার জন্য ত্রিশূল সংগঠনের এক ‘স্লিপার সেল’ বা গুপ্তচর। সে দ্রুত সৌরীশদাকে ফোন করে এই হুমকির কথা জানিয়ে দিল।
ওদিকে কল্যাণ কুমারগঞ্জে নিজের বাড়িতে ফিরে মা পিউকে সমস্ত ঘটনার বিবরণ দিল। পিউ আগে থেকেই সরকার বংশের এই জটিলতা সম্পর্কে জানতেন। তিনি কল্যাণের মুখে অবিনাশের হুমকির কথা শুনে শিউরে উঠলেন। তিনি বললেন, “কল্যাণ, অবিনাশের মতো লোকগুলোই সবচেয়ে বিপজ্জনক। ওরা ঘরের ভেতর থেকে শত্রুতা করে। বাবাকে শিমুলদা যেমন মিথ্যে ভয় দেখিয়েছিলেন, এরাও তোদের ঠিক সেভাবেই আটকাতে চায়।”
পিউ দেবী আরও যোগ করলেন, “জিজীবিষার নকশা তোরা উদ্ধার করেছিস ঠিকই, কিন্তু জিজীবিষার লড়াই এখন তোদের ব্যক্তিগত জীবনেও ঢুকে পড়েছে। শিমুল সরকার ওপার বাংলায় বসে এই গুন্ডাগুলোকে চালনা করছে।” কল্যাণ শক্ত গলায় বলল, “মা, ওরা যত বেশি ভয় দেখাবে, আমরা তত বেশি জেদি হয়ে উঠব। মেহেদিপুর আমাদের যেতেই হবে।”
সেই রাতেই সুমন্ত কল্যাণপুর থেকে কল্যাণকে ফোন করল। জানা গেল, সৌরীশদা খবর পাঠিয়েছেন যে গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজনের বয়ান অনুযায়ী, অবিনাশ টোটোওয়ালাই ছিল পূরবী ভবনের মাদক সরবরাহের প্রধান মাধ্যম। সে এখন পলাতক এবং সম্ভবত সে সুমন্ত বা কল্যাণের কোনো একজনের ওপর হামলা করার ছক কষছে।
( চলবে )


