ভারতের মন্দির : শিল্প, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির সম্মিলন

ভারতের মন্দির : শিল্প, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির সম্মিলন

ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ - নবকুমার দাস

১ : সিন্ধু–সরস্বতী থেকে গঙ্গা

২ : সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতার সমকালীন সর্বভারতীয় স্রোতধারা

৩ : বেদের বাণী থেকে পৌরাণিক ভারত

৪ : আরণ্যক থেকে বেদান্ত  : অন্তর্জগতের অভিযাত্রা

৫ : মৌর্য–গুপ্ত যুগ : ভারতীয় সভ্যতার আত্ম-অনুসন্ধান

৬ : গুপ্তোত্তর ভারত

৭ : ভারতে বসন্ত 

৮ : ধর্মরাজনীতি ও সম্রাট অশোক

৯ : সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ : উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের মিলন

১০ : সংস্কৃত সাহিত্য : ভারতীয় চিন্তার ভাষা

ভারতের মন্দির : শিল্প, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির সম্মিলন

নবকুমার দাস

প্রাচীন স্থাপত্যশাস্ত্রে বলা হয়েছে, “দেবালয়ো নাম দেবস্য আয়তনম্, লোকানাং চ সংস্কারভূমিঃ।”
— দেবালয় দেবতার আবাস, আবার মানুষের সংস্কৃতির ক্ষেত্র।

এই কারণেই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠা মন্দিরগুলির মধ্যে যেমন স্থাপত্যের বৈচিত্র্য রয়েছে, তেমনি রয়েছে সাংস্কৃতিক ঐক্যের সূক্ষ্ম সূত্র। মধ্য ভারতের খাজুরাহো স্মারকসমূহ, ওড়িশার কোনার্ক সূর্য মন্দির, দক্ষিণ ভারতের মীনাক্ষী আম্মান মন্দির বা বৃহদীশ্বর মন্দির -এসবের পাশাপাশি উত্তর-পূর্ব ভারতের মন্দির সংস্কৃতিও এই বৃহৎ ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অসম, ত্রিপুরা ও মণিপুরের মন্দিরসমূহ ভারতীয় ধর্মীয় সংস্কৃতির এক ভিন্নতর মাত্রা প্রকাশ করে, যেখানে আর্য ধর্মীয় আচার, লোকায়ত বিশ্বাস, তান্ত্রিক সাধনা এবং উপজাতীয় ঐতিহ্য একত্রে মিশেছে।

ভারতীয় মন্দিরের ধারণা কেবল স্থাপত্যের নয়; এটি এক মহাজাগতিক প্রতীক। প্রাচীন স্থাপত্যগ্রন্থ যেমন মানসার ও ময়মত-এ মন্দিরকে ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিরূপ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। গর্ভগৃহকে ধরা হয় মহাবিশ্বের কেন্দ্র, যেখানে দেবতার উপস্থিতি মানব ও বিশ্বচেতনার সংযোগ স্থাপন করে। মহানারায়ণ উপনিষদ শাস্ত্রে বলা হয়েছে – “যত্র বিশ্বং ভবত্যেকনীডম্।” – যেখানে সমগ্র বিশ্ব এক নীড়ে পরিণত হয়।

[ মহানারায়ণ উপনিষদ একটি বৈদিক শাস্ত্র, যা মূলত কৃষ্ণ যজুর্বেদের অন্তর্গত, যদিও কখনও কখনও একে অথর্ববেদের সঙ্গেও সম্পর্কিত বলা হয়। এটি একটি বৈষ্ণব উপনিষদ, যেখানে পরম সত্য (ব্রহ্ম)-এর স্বরূপ নারায়ণ (বিষ্ণু)-র সঙ্গে অভিন্ন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই গ্রন্থে ধর্মতত্ত্ব, বিশ্বতত্ত্ব এবং আধ্যাত্মিক সাধনার বিভিন্ন দিকের সমন্বয় ঘটেছে। বৈদিক যুগের পরবর্তী পর্যায়ের প্রধান উপনিষদগুলির মধ্যে এটি অন্যতম।]

উত্তর ভারতে প্রধানত যে মন্দির স্থাপত্য দেখা যায় তাকে বলা হয় নাগর শৈলী। এই শৈলীর বৈশিষ্ট্য- উঁচু শিখর , খাড়া উল্লম্ব রেখা, মণ্ডপের ধারাবাহিকতা | এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ মধ্য ভারতের খাজুরাহো স্মারকসমূহ। চন্দেলা রাজাদের নির্মিত এই মন্দিরগুলি কেবল ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এগুলি মধ্যযুগীয় ভারতের শিল্প-চেতনার বিস্ময়কর নিদর্শন। ভাস্কর্যগুলিতে দেবতা, অপ্সরা, নৃত্যশিল্পী এবং মানবজীবনের নানা রূপ একত্রে ফুটে উঠেছে।

ওড়িশার ওড়িশার কোনার্ক সূর্য মন্দির ভারতীয় স্থাপত্যের এক অনন্য সৃষ্টি। ১৩শ শতকে রাজা নরসিংহদেব I এই মন্দির নির্মাণ করেন। সূর্যের রথের আকারে নির্মিত এই মন্দিরে রয়েছে, বিশাল পাথরের চাকা, ঘোড়ার ভাস্কর্য , সূক্ষ্ম অলংকরণ এই স্থাপত্যে সময়, মহাজাগতিক গতি এবং ধর্মীয় প্রতীক একত্রিত হয়েছে।

দক্ষিণ ভারতের মন্দির স্থাপত্য সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রীতি অনুসরণ করে। এই শৈলীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হল বিশাল গোপুরম বা প্রবেশ টাওয়ার। মাদুরাইয়ের মীনাক্ষী আম্মান মন্দির এই শৈলীর এক মহিমান্বিত উদাহরণ। গোপুরমগুলির গায়ে হাজার হাজার রঙিন মূর্তি—যা দেবতা, পুরাণ, প্রাণী ও লোকজ প্রতীককে একত্রে উপস্থাপন করে।

চোল যুগের স্থাপত্য তামিলনাড়ুর বৃহদীশ্বর মন্দির দক্ষিণ ভারতের স্থাপত্য ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ১১শ শতকে প্রথম রাজরাজা চোল এই মন্দির নির্মাণ করেন। গ্রানাইট পাথরে নির্মিত এই মন্দিরের বিমানা প্রায় ৬৬ মিটার উঁচু—যা সেই সময়ের প্রযুক্তিগত দক্ষতার অসাধারণ নিদর্শন। কর্ণাটকের হোয়সালেশ্বর মন্দিরে দেখা যায় উত্তর ও দক্ষিণ স্থাপত্যশৈলীর এক অপূর্ব মিশ্রণ। হোয়েসালা শিল্পীরা সাবানপাথরে যে সূক্ষ্ম ভাস্কর্য নির্মাণ করেছেন, তা ভারতীয় শিল্পের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

ভারতের মন্দির ঐতিহ্যের আলোচনায় উত্তর-পূর্ব ভারতকে বাদ দিলে চিত্র অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এই অঞ্চলের মন্দিরগুলি প্রায়ই তান্ত্রিক সাধনা, লোকায়ত বিশ্বাস এবং ব্রাহ্মণ্য ধর্মীয় আচারকে একত্রে ধারণ করেছে। অসমের নীলাচল পাহাড়ে অবস্থিত কামাখ্যা মন্দির ভারতের প্রসিদ্ধ শক্তিপীঠ দেবী কামাখ্যার উপাসনাকেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত। ভারতীয় শক্তিপূজার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ও এই মন্দির তান্ত্রিক সাধনার জন্য সুপরিচিত। মন্দিরে দেবীর প্রতীক হিসেবে পূজিত হয় একটি প্রাকৃতিক শিলা—যা নারী শক্তির প্রতীক। প্রাচীন কালিকাপুরাণে কামাখ্যা তীর্থের উল্লেখ রয়েছে। অসমে আরও উল্লেখযোগ্য উমানন্দ মন্দির (ব্রহ্মপুত্র নদীর দ্বীপে), হয়গ্রীব মাধব মন্দির (হাজো) | এই মন্দিরগুলিতে হিন্দু ও বৌদ্ধ ঐতিহ্যের মিল দেখা যায়।

ত্রিপুরার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মন্দির হল ত্রিপুরা সুন্দরী মন্দির। ১৫০১ সালে ত্রিপুরার মানিক্য বংশের অন্যতম প্রখ্যাত রাজা ধন্য মানিক্য উনকোটির মতো ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও বিশেষত ত্রিপুরা সুন্দরী মন্দির মন্দির নির্মাণ করেন। তাঁর শাসন ত্রিপুরার সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের বিশেষ বিকাশ ঘটে। এই মন্দির শক্তিপীঠ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ত্রিপুরার মন্দির স্থাপত্যে দেখা যায়, – বাংলা আঞ্চলিক ছাদরীতি, উত্তর-পূর্ব ভারতের লোকশিল্প , ব্রাহ্মণ্য ধর্মীয় প্রতীক |

মণিপুরের মন্দির সংস্কৃতি প্রধানত বৈষ্ণব ভক্তিধারার সঙ্গে যুক্ত। ইম্ফলেরশ্রী গোবিন্দজী মন্দির এই অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মন্দির। ১৮শ শতকে মণিপুরের এক বিশিষ্ট রাজা ভাগ্যচন্দ্র মণিপুরে বৈষ্ণব ধর্মের প্রসার এবং মণিপুরী নৃত্যশৈলীর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাজা ভাগ্যচন্দ্র বৈষ্ণব ধর্মকে রাজধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। এর ফলে মণিপুরে কৃষ্ণভক্তি ও রাসলীলা নৃত্য ঐতিহ্য বিকশিত হয়। এই মন্দির সংস্কৃতি স্থানীয় মেইতেই ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে এক অনন্য ধর্মীয় সংস্কৃতি তৈরি করেছে।

ভারতের বহু অঞ্চলে মন্দিরের ধারণা এসেছে লোকায়ত ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে। উপজাতীয় সমাজে পাহাড়, বৃক্ষ, নদী, পাথর এসবকেই দেবতার প্রতীক হিসেবে পূজা করা হত। নৃতত্ত্ববিদ Verrier Elwin দেখিয়েছেন যে এই লোকায়ত ধর্মীয় বিশ্বাসই পরে মূলধারার হিন্দু ধর্মের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

ভারতীয় মন্দির স্থাপত্যের প্রভাব ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়িয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। কম্বোডিয়ার Angkor Wat এবং ইন্দোনেশিয়ার Prambanan Temple তার উজ্জ্বল উদাহরণ। এই স্থাপত্যে ভারতীয় পুরাণ, দেবতা এবং মন্দির রীতির স্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়।

প্রাচীন ভারতে মন্দির ছিল – সঙ্গীতের বিদ্যালয়, নৃত্যের মঞ্চ, নাট্যকলার কেন্দ্র | প্রাচীন ভারতের এক বিখ্যাত গ্রন্থ নাট্যশাস্ত্র, যা নাট্য, নৃত্য ও সঙ্গীতকলার মূল তত্ত্ব ও নিয়ম নিয়ে রচিত। এর রচয়িতা হিসেবে ঋষি ভরত মুনির নাম উল্লেখ করা হয়। নাট্যশাস্ত্র অনুসারে দেবতার সামনে নৃত্য পরিবেশন ছিল এক ধরনের উপাসনা। মন্দির অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল- ভূমিদান, কৃষি ও কারুশিল্পের সঙ্গে মন্দিরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।

ভারতের মন্দিরগুলি কেবল ধর্মীয় স্থাপত্য নয়; এগুলি একটি সভ্যতার বহুমাত্রিক প্রকাশ। উত্তরের নাগর শিখর, দক্ষিণের দ্রাবিড় গোপুরম, পূর্ব ভারতের সূর্য মন্দির, পশ্চিম ভারতের ঐতিহাসিক তীর্থ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের তান্ত্রিক ও বৈষ্ণব মন্দির – সব মিলিয়ে ভারতীয় মন্দির সংস্কৃতি এক বিশাল সাংস্কৃতিক মানচিত্র। এই মন্দিরগুলি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ভারতীয় সভ্যতা আসলে এক সংলাপের সভ্যতা, যেখানে বহু ঐতিহ্য মিলিত হয়ে সৃষ্টি করেছে এক বৃহৎ সাংস্কৃতিক ঐক্য।

ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ - নবকুমার দাস

১০ : সংস্কৃত সাহিত্য : ভারতীয় চিন্তার ভাষা

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি