রঞ্জন চক্রবর্ত্তী
মহৎ সাহিত্য কি সুনির্দিষ্ট মূল্যবোধের উপর প্রতিষ্ঠিত হতেই হবে ?
পৃথিবীতে যে কোনও সাহিত্যকর্মেরই একটি বিশেষ মূল্য আছে, যা আমরা ব্যক্তিগত বোধের বা চেতনার দ্বারা উপলব্ধি করি। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সমাজ ও পারিপার্শ্বিক যেমন পাল্টায়, তার সঙ্গে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ধারণাও পাল্টায়। একে আমরা মূল্যবোধের বিবর্তন বলতে পারি। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সব সময় যে সমাজের সর্বস্তরেই মূল্যবোধের আমূল বদল হয়েছে একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে স্রষ্টার মূল্যবোধ যে সৃষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে আছে, তা অনেক-ক্ষেত্রেই সর্বজনমান্য নয়। তবে একথা বলা যায় সমগ্র পৃথিবীর পরিপ্রেক্ষিতে সমাজ-সভ্যতার গতিপ্রকৃতি বিগত একশো বছরে অতি দ্রুত পাল্টেছে এবং শিল্পসাহিত্যের ইতিহাসে তার গ্রাফও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পতনশীল। কারণ আধুনিক কালে মানুষ যেভাবে সময়ের পিছনে দৌড়েছে তাতে সৃজনশীলতা কিছুটা হলেও হ্রাস পেয়েছে এবং গুণগত মানের নিরিখে জীবনযাত্রায় ছন্দপতন সূচিত হয়েছে। সাহিত্যিকরা আধুনিক যুগের বিভিন্ন সমস্যাগুলিকেই গল্পে, উপন্যাসে, কবিতায় তুলে ধরতে চেয়েছেন। সামগ্রিকভাবে তাঁরা মানুষের নৈতিকতা ও মূল্যবোধের সনাতন প্রশ্নগুলোকেই আবার পাঠকের দরবারে হাজির করেছেন।
জীবন-নাট্যের বিভিন্ন অঙ্কে বিষয়-ঘটনা-তত্ত্বের বৈচিত্র্যের মধ্যে অজস্র গল্প লুকিয়ে আছে। ছোটগল্পের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী ও’হেনরি-র ‘দ্য লাষ্ট লীফ’ এর সার্থক উদাহরণ। শহরে ভয়ঙ্কর শীতের রাতে নিউমোনিয়া ঢুকে পড়ছে, অনেকে আতঙ্কে মারা যাচ্ছে। গল্পের নায়িকাও নিদারুন অবসাদে সেই রোগে আক্রান্ত হয়ে মরে যাবার কথা ভাবছে। তার মনে এই ধারনাটা জাঁকিয়ে বসছে যে ঘরের সামনের নিষ্পত্র গাছটার শেষ পাতাটা ঝরে গেলেই সে মারা যাবে। কিন্তু গল্পের শেষে আমরা দেখি সে মারা যাচ্ছে না, কারণ বার্মান নামক এক ব্যর্থ শিল্পী শীতের রাতে বৃষ্টিতে ভিজে সেই পাতাটাকে সকলের অজান্তে দেয়ালে এঁকে রেখেছে। অবশ্য এর ফলে শিল্পী নিজে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এদিকে আসল পাতাটির ঝরে যাওয়ার অনেক দিন পরেও তা মেয়েটির চোখে থেকে গেল। পরে সে তার বান্ধবী মারফৎ বার্মানের আত্মত্যাগের কথা জানতে পারে।
ও’হেনরি-র “আফটার টোয়েন্টি ইয়ারস” গল্পটি পৃথিবীর সাহিত্যপ্রেমী মানুষরা কোনওদিনই ভুলবেন না। পৃথিবীতে যতদিন বন্ধুত্ব ও ভালবাসা থাকবে ততদিন এই গল্পও থাকবে। দু’জন বন্ধুর মধ্যে কথা হয়েছিল যে কুড়ি বছর পরে তাদের এক বিশেষ জায়গায় দেখা হবে। তার পর দু’জনের জীবনের গতিপথ আলাদা হয়ে যায় এবং তারা দু’দিকে চলে যায়। আবার কুড়ি বছর বাদে একই জায়গায় তাদের দেখা হয়। এখন দুজনের একজন পুলিশ অফিসার, অন্যজন অপরাধী। ইতিমধ্যে তাদের চেহারায় অনেক পরিবর্তনও হয়েছে। কিন্তু বন্ধু বন্ধুই থেকে যায়। সে নিজে অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে না, অন্য একজন কর্তব্যরত অফিসারকে দিয়ে কাজটা করিয়ে চিরকুটে তার ‘পরিচয়’ জানিয়ে দিয়ে।
জেমস জয়েসের ‘দি সিস্টারস’ ছোটগল্পেও এই ভালোবাসার কথা আছে, আর আছে ছোট্ট জয়েসের শোনা ‘প্যারালিসিস’ কথাটা। এখানে লেখক একটি নামহীন বালক ও এক অক্ষম পাদ্রীর সম্পর্ক তুলে ধরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন চার্চের ফাদারের অনুতাপ পরে মনোরোগে, মানসিক যন্ত্রণায়, শেষে শারীরিক অসুস্থতায় পরিণত হয়। তাঁর এক বোনের মাধ্যমে জানা যায় চার্চের পাত্রটা ফাদারের হাত থেকে পড়ে ভেঙে গেলে অসহ্য মনোবেদনায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং মারা যান। জয়েস এই মনোবৃত্তির সার্থকতার বিষয়টা সম্ভবত বুঝতে পারেননি। কারণ প্রথম পুরুষে বর্ণিত ‘অ্যারাবি’ গল্পে কিশোর জয়েসের মঙ্গনের বোনের প্রেমে পড়ার ঘটনাটি ধর্মে এবং প্রতীতিতে যুক্ত হয়ে তার মনে যে আত্মিক বাতাবরণের সৃষ্টি করে, তা সে ধরে রাখতে পারে না। ফলে সেই স্বপ্ন-সহবাস ভেঙে যায়।
এইচ. ই. বেটস্-এর ‘দ্য অক্স’ গল্পেও ভালোবাসার কথাই আছে। লেখক শুনিয়েছেন গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র শ্রীমতি থার্লো-র স্বামীর অস্বাভাবিক জীবনযাপন, মৃত্যু ও পরিশেষে সন্তানকে মানুষ করার সামর্থ্য না থাকায় তাকেও আত্মীয়ের হাতে তুলে দেওয়ার কাহিনি। তখন সেই মহিলার জীবনে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না, শুধু তাঁর সাইকেলটা ছাড়া। বেটস-এর এই গল্পের সাংকেতিক তাৎপর্য অসাধারণ। তিনি এখানে শ্রীমতি থার্লো-র সঙ্গে সাইকেলের যে সম্পর্ক তার তুলনা করেছেন ভারবাহী জীবের সঙ্গে গাড়ির সম্পর্কের। গল্পকার এখানে ইঙ্গিতে বুঝিয়েছেন আসলে শ্রীমতি থার্লো-ই হলেন সেই ভারবাহী জীব। তাঁর সাইকেল হল চিরন্তন একঘেয়েমীর প্রতীক, যার হাত থেকে তিনি কোনওদিন বেরোতে পারেননি। সাইকেল চালানোটা যখন বলদের গাড়ি টানার মতোই কষ্টকর হয়ে ওঠে, যন্ত্রণা তখন ভারী হয়ে যায়।
নিউজীল্যাণ্ডের লেখক সি. কে. স্টিড তাঁর উপন্যাস ‘ম্যানসফিল্ড’-এ যে কাহিনি শুনিয়েছেন তাতে এটাই প্রমাণিত হয় যে ক্যাথারিন ম্যানসফীল্ড তার অনুভূতির সম্বন্ধে নিশ্চিত ছিল না। একথা তাঁর ‘দ্য ফ্লাই’ গল্পের ক্ষেত্রেও হয়ত প্রযুক্ত হতে পারে। এইচ. ই. বেটস-এর ক্ষেত্রে সেটা কতটা যুক্তিযুক্ত তা বিচার করার আগে যেটা ভাবার বিষয় সেটা হল গল্পের crisis যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয়েছে কি না। এখানে সেই মহিলার মূল্যবোধ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না, যে দারিদ্রের কঠিন পরিহাসে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। সেটা মানবিকতার বিচারে প্রত্যাশিতও হতে পারে না। কিন্তু সমাজ যেখানে নিষ্করুণ সেখানে আত্মত্যাগের প্রশ্ন থেকেই যায়, অন্ততঃ সন্তানের ভালর খাতিরে।
ছোটগল্পে মূল্যবোধের প্রশ্নে অ্যালেন গিলক্রিস্টের দু’টি গল্পের উল্লেখ করা যেতে পারে – ‘লাইট ক্যান বি বোথ ওয়েভ অ্যান্ড পার্টিকেল’ এবং ‘দ্য ম্যান হু কিক্ড ক্যানসারস অ্যাস’। প্রথমটায় একটি আমেরিকান মেয়ে একটি চীনা ছেলের প্রেমে পড়ে। দুজনেই তখন ছাত্র। পরে বিয়ের প্রশ্ন উঠলে মেয়েটি তার বাবা-মাকে তা জানায়। গল্পের শেষটায় মেয়েটির বাবা ছেলেটিকে দাবা খেলায় আমন্ত্রণ জানায়। এ এমন একটা চ্যালেঞ্জ যার কোনও পরিণতি নেই। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার (তা সে নিজের সাথে হোক বা অন্যের সাথেই) মানসিকতা থাকলে জীবনের চলার পথে এগিয়ে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে যায়। এখানে আলো হচ্ছে একটা স্রোত, যা আসলে ভালোবাসা বা প্রেম। তার মধ্যে আমরা হচ্ছি অসংখ্য কণা। আলো জানে না কার ধর্ম কী, অথবা কার গায়ের রঙ কালো আর কার সাদা। তার কাজ ভালোবাসাকেই আলোকিত করা। কিন্তু পরিবর্তিত সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে প্রেমের পরের ধাপে মিলন বোধহয় ততটা সহজ নয়। এই প্রসঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার লেখিকা হেলেন গার্নারের ‘দ্য ডার্ক, দ্য লাইট’ গল্পটির কথাও ভাবা যেতে পারে। গিলক্রিস্টের অন্য গল্পটায় ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষটির কেমো নেওয়ার পরে যা অবস্থা হয় তা অত্যন্ত করুণ। সে হাসপাতালে থাকতে চায় না, বাইরে বেরোতে চায়। আসলে সে স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ছেলেটি সকলের চোখ এড়িয়ে সেখান থেকে পালিয়ে বীয়ার পাবে ঢুকে যায়, মজা করে – প্রকৃত অর্থেই সে ক্যানসারকে পাত্তা দেয় না। এই গল্প পড়লে সেই চিরকালীন সত্যটাই উঠে আসে – ‘Man can be destroyed but not defeated’।
জীবনের প্রতি, মানুষের প্রতি ভালবাসা না থাকলে গল্প কখনওই সত্য হয়ে ওঠে না। এডগার অ্যালান পো-এর ‘দ্য ফল অব দ্য হাউস অব্ আশার’-এ সেই ভালোবাসার কথাই আছে – এ হল ভাই-বোনের ভালোবাসা যা শুধু হৃদয়ের প্রবৃত্তি হয়ে থেকে গেল। ডি. এইচ. লরেন্স লিখেছেন অতিমাত্রায় বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গীই অন্তিমে তাদের রক্তশূন্য করে দিয়েছে। যেহেতু ভালবাসা ছিল, সেহেতু আবেগের সাথে শুধু প্রবৃত্তির স্পন্দনে একসময় তাদের বাঁচা অসহ্য হয়ে উঠলে একজন আরেকজনকে হত্যা করে। সত্যিই এ এক অসহনীয় জীবনযাপন! এই জাতীয় গল্পের ধারাবাহিকতা কত লেখকের লেখাতেই না উঠে এসেছে, যার শুরু কিন্তু সেই ‘দ্য কাস্ক অব্ অ্যামোন্টিলাডো’ বা ‘উইলিয়াম উইলসন’-এর লেখকের হাতেই।
নৈতিকতার (বা মানবিকতার) প্রশ্নে সমারসেট মমের ‘মিস্টার নো-অল’ গল্পটির কথা মনে আসে। এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রটিকে জাহাজের সবাই সবজান্তা বলে উপহাস করত, কিন্তু সে তা-ই ছিল। এখানে চ্যালেঞ্জ ছিল একটা কন্ঠহার, সেটা মুক্তোর কিনা তা সে বলে দিয়েছিল। পরে সত্যি-মিথ্যে যাচাই হল বাজির টাকা আর চিঠিতে। লোকটি ভেবেছিল একজন মানুষ কেনই বা নিউইয়র্কের মতো শহরে তার সুন্দরী স্ত্রীকে ফেলে রেখে অন্য শহরে যেতে পারে। কিন্তু সে হারের বিষয় কিছুই বলে নি যেহেতু মহিলাও তার অপরাধ স্বীকার করেছিল গোপনে।
ম্যাক্সিম গোর্কির ‘দ্য ব্লু-আইড্ লেডি’ গল্পের নীল নয়না যুবতীটি তার বাচ্চাদুটি’র জন্য অন্য শহরে মেলার টিকিট চাইতে আসে। সে পথে নামে শরীরের বিনিময়ে দু’পয়সা রোজগার করবার জন্য যেহেতু তার আর কেউই নেই। কনস্টেবল প্রথম প্রথম ঘোরতর আপত্তি জানালেও পরে তার দুঃখের মোহে পড়ে যায়। এই গল্পে আরও কিছু বিষয় আছে; কিন্তু মেয়েটি টিকিট পায়, বাচ্চা দুটোকে জিনিসপত্র ও খাবার দাবার কিনে দেয়, জাহাজে ওঠে। কনস্টেবল বুঝতে পারে সে মিথ্যে বলেনি। রুটি-রুজির ব্যাপারে মেয়েটি হয়ত অন্য কিছুও করতে পারত, কিন্তু এটা বাস্তব ঘটনা-নির্ভর গল্প বলেই মনে হয়। আন্তন চেখভের ‘ফিয়াঁসে’ গল্পে নাদিয়া নামক মেয়েটি আর্টিস্ট শাসা-র প্রেমে পড়ে, তার সাথে চলে যায় এবং প্রতারিত হয়ে ফিরে আসে। এরকম ঘটনা সাহিত্যে বা জীবনে কম ঘটে না। তবু তার মা-ই তাকে জীবনে বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যটি জানিয়ে দেয় – তা হল রামধনুর সাতটি রঙে জীবনকে দেখা আর তাকে বিশ্লেষন করা।
আমেরিকান লেখিকা শার্লে জ্যাকসনের ‘আফটার ইউ মাই ডিয়ার আলফন্সে’ গল্পে আমরা পাই এক মায়ের কথা, যে তার ছেলের বন্ধুকে প্রথম বার দেখছে। দুই কিশোর জনি ও বয়েড পরস্পরের বন্ধু, একজন অন্যের বাড়িতে খেলাধুলা করতে ও সময় কাটাতে আসে। কিন্তু জনির মা শ্রীমতি উইলসন ছেলের বন্ধুটি আফ্রিকান-আমেরিকান জেনে কেবলই তার পরিবারের কথা ভাবেন। তিনি ছেলের গরমের জামা-কাপড়গুলো বন্ধুটিকে দেন তার দরকার লাগতে পারে বলে, আর প্রায়ই সেকথা মনে করান। পুরো গল্পটাতেই এই মহিলার আচরণের সঙ্গে মূল্যবোধের প্রশ্নটি জড়িয়ে আছে। এই প্রসঙ্গে শার্লে জ্যাকসনের আরও দু’টি গল্পের নাম করব – ‘ফ্লাওয়ার গার্ডেন’ এবং ‘দ্য লটারি’।
ওয়ালেসের ‘দ্য ম্যান হু হেটেড হেমিংওয়ে’ গল্পে লেখকের যে মিলিটারি অফিসারটির সাথে আলাপ হয় সে আসলে আর্নেস্ট হেমিংওয়েকে ঘৃণা করে। লেখক এতে অবাক হলেও তার সাথে আলাপ চালিয়ে যান, প্রসঙ্গক্রমে ওঠে তাঁর স্পেনের ওপর লেখা ‘ফর হুম দ্য বেল টোল্স’-এর কথা। সে ব্যাপারে তাঁকে শুনতে হয় সমস্ত ঘটনাই অবাস্তব, তিনি জানেন না বা সে সব দেখেননি, স্পেনের ব্যাপারেও কিছু জানেন না, ইত্যাদি। এই কথাগুলো লেখক হিসেবে সে মোটেই বরদাস্ত করতে পারে না। ওয়ালেস গল্পের শেষে জানিয়েছেন হেমিংওয়ে সেই মার্কুইস যাঁর দীর্ঘ ছায়া পৃথিবীর সব মার্কুইসকেই শেষমেষ ঢেকে ফেলে। অন্য কারও সাথে তাঁর তুলনা করা যায় না।
রাশিয়ার মহাসাহিত্যিক লিও তলস্তয়ের বেশ কয়েকটি গল্পে মানুষের জীবনে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের কথা আছে। ‘দ্য ডেথ অব ইভান ইলিচ’, ‘হাও মাচ ল্যাণ্ড ডাজ এ ম্যান নিডস’, ‘আ প্রিজনার ইন দ্য ককেশাস’ বা ‘থ্রি কোয়েশ্চেনস’ প্রভৃতি গল্প বিশ্বসাহিত্যের সম্পদ বললেও অত্যুক্তি হয় না। তাঁর ‘থ্রি কোয়েশ্চেন্স’ গল্পের নীতিকথা মনে করলে তা যে আজকের ক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধের দিনেও কতখানি বাস্তবানুগ সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই তিনটি প্রশ্ন আমাদের চেতনে-অবচেতনে আজও ক্রিয়াশীল না থাকলে পৃথিবীর যাবতীয় দৈনন্দিন কাজগুলো সমাধা করা কখনওই সম্ভব হত না।
হেমিংওয়ের ‘দ্য ব্যাটলার’-এ কিশোর নিক্ অ্যাডমস্-কে পাওয়া যায়। দুটো মানুষের মধ্যে দেখা হচ্ছে, তাদের কথা-বার্তা হচ্ছে; তারপর আধুনিক জীবনের কিছু গূঢ় ব্যাপার সে জেনে ফেলছে। সেই লোকটার কথাও রয়েছে যে সব সময় তার সঙ্গী অসুস্থ অথচ লড়াকু মানুষটার সাথে লড়ছে। কিন্তু কেন? এই কেনর উত্তর ভাবতে ভাবতেই নিক্ তাদেরকে ফেলে তার নিজের পথে চলে যাচ্ছে। হেমিংওয়ের আর একটি গল্প ‘এ ডেজ ওয়েট’-এ রয়েছে ভ্রান্ত ধারনার বিরুদ্ধে লড়াই। এই গল্পের অসুস্থ ছেলেটি ডাক্তারের মুখে শরীরের যে তাপমাত্রা শুনেছে তা ফারেনহাইট স্কেলের। কিন্তু সে ফারেনহাইটের স্কেলের জ্বরকে সেন্টিগ্রেডের বলে ভুল করে বিমর্ষ হয়ে মৃত্যুর কথা ভেবেছে। পরিশেষে তার বাবাই তাকে ভুলটা ধরিয়ে দেয় – তবে এর জন্য ২৪ ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়।
অ্যামেরিকান সাহিত্যে সাদা-কালো গাত্রবর্ণের সম্পর্ক-সংঘাত-সমঝোতার বিবর্তনের মধ্য দিয়ে জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বিষয়গুলি যেভাবে উঠে এসেছে তা সত্যিই অবাক করার মতো। তবু ম্যুরিয়েল স্পার্ক-এর মতো আধুনিক লেখকের কলমে কখনও অবিচারের বস্তুগত উপস্থাপনা আমাদের সিনিসিজমে আক্রান্ত করে না। তাঁর একটি গল্পের নাম ‘দ্য কার্টেন ব্লোন বাই দ্য ব্রীজ’, যেখানে ঘরের কাছাকাছি কোনও কৃষ্ণাঙ্গ তরুণকে ঘোরাঘুরি করতে দেখে তার মতলব সন্দেহজনক ভেবে ফেলা হয় এবং পর্দাটা হাওয়ায় উড়ে গেলে তার স্ত্রীর সন্তানকে গুলি করছে ধরে নেওয়া হয়। আকস্মিকভাবে মূল্যবোধের স্খলন ঘটলে তার প্রতিকার কি ভালোবাসা? লেখক এর উত্তর জানান না।
এইলীন হুইলার তাঁর ‘আ টাইম টু ডাই’ গল্পে দেখিয়েছেন এক ব্যক্তি ব্যবসায় ডুবে গিয়ে অন্য এক ধনী প্রেমিকার সাথে সম্পর্কে লিপ্ত হয়ে তার ব্যবসাকে স্বস্থানে আনার পরিকল্পনা করে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সে ফ্ল্যাটে টাইম-বোমা রেখে তার স্ত্রীকে কায়দা করে হত্যা করতে চেয়েছিল। কিন্তু নিয়তির পরিহাসে বোমা বিস্ফোরণে তার স্ত্রী বেঁচে যায় এবং সে নিজের দামী ফ্ল্যাটটাকেই অপ্রত্যাশিত ভাবে চোখের সামনে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখে। তার জীবনের প্রথম এবং চরমতম ভুল কাজের ফলে তার জীবন চূড়ান্তভাবে বিপর্যস্ত হয়ে যায়। মানুষ হয়ত সাধ করে হঠকারী সিদ্ধান্তে আসে না, এই হঠকারীতায় ভরা পৃথিবীই তাকে অস্থির জীবনযাপনে বাধ্য করায়, যেখানে শুধু বেঁচে থাকাটাই হল আশু-কর্তব্য।
মানুষের জীবনে মূল্যহীনতার বিষয়ে রোয়াল্ড দাল্-এর ‘পয়জন’ গল্পটি মনে আসে। হ্যারি পোপ কম্বল গায়ে বই পড়তে পড়তে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। তার বন্ধু টিম্বার উডস দেখা করতে এলে সে বলে বই পড়াকালীন তার কম্বলের নীচে একটা বিষধর সাপ ঢুকে গেছে। কথাটা বন্ধুকে বিশ্বাস করাতে সফল হলে একজন ভারতীয় হাতুড়ে ডাক্তারকে ধরে নিয়ে আসা হয়। সে কম্বলের চারপাশ দিয়ে ক্লোরোফর্ম স্প্রে-র দ্বারা সাপটাকে অবশ করে যেটাকে সরিয়ে ফেলার পরিকল্পনার কথা জানালে দুজনেই রাজি হয়। কিন্তু ক্লোরোফর্মের গন্ধে ঘর ভরে গেলে তিনজনেরই মাথা ঘুরতে থাকে। যখন কম্বলটা সরানো হয় তার ভিতরে কিছুই পাওয়া যায় না, আর বন্ধুটিও রেগে গিয়ে ডাক্তারকে জাত তুলে গালিগালাজ করে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় বের করে দেয়। গল্পের প্রেক্ষিতে আসল বিষটা বোধহয় এখানেই, সাপটা কেবল উপলক্ষ্য মাত্র। রোয়াল্ড দাল্ অনেকটা হেমিংওয়ের মতোই গল্পে মন্তব্য করেন না, বোঝার ভারটা পাঠকের ওপর ছেড়ে দেন।
জীবনে মূল্যবোধ ও মূল্যহীনতা সংক্রান্ত বিষয় ছোটগল্পে বিভিন্নভাবে ঘুরে-ফিরে এসেছে – কোথাও অপ্রত্যাশিত ভাবে তো কোথাও অবিশ্বাস্য ভাবে। এ প্রসঙ্গে সমারসেট মম্-এর ‘দ্য ফ্যাক্ট্স অব লাইফ’ গল্পটার উল্লেখ করব। এই গল্পে একটি ছেলে যখন টেনিস প্রতিযোগীতার জন্য অন্য শহরে যাচ্ছে তখন তার বাবা তাকে কতকগুলি উপদেশ আগে-ভাগে দিয়ে রাখছে – যেমন জুয়া না খেলা, কোনও মেয়ের সাথে জড়িয়ে না পড়া, ইত্যাদি। তাতে করে শেষে দেখা যাচ্ছে ছেলেটি জুয়ায় জিতে, জীবনসঙ্গিনীকে পেয়ে এবং ট্রফি লাভ করে – অর্থাৎ প্রতিটি ব্যাপারেই বিজয়ী হয়ে ফিরে আসছে। একদিকে ছেলে যেমন বাবার কথা অগ্রাহ্য করে বারণ করা সবকিছুই করছে, তেমনই অন্যদিকে বাবা তার ছেলের প্রতি যে উদ্বিগ্নতা দেখাচ্ছে তা-ও কিছুতেই অস্বাভাবিক বলা যাবে না। ছেলেটির দুঃসাহস যেন জীবনের চেনা ছকটাই উলটে দিল।
অষ্ট্রিয়ান গল্পকার হার্বাট কুনরের ‘প্রোগ্রাম’ গল্পটি আদতে ভয়ানক। এখানে সমাগত দর্শকের সামনে স্টেজে একটা সুন্দরী মহিলাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে আসা হচ্ছে। মহিলাকে নিয়ে আসছে একটা দশাসই চেহারার লোক যে তাকে স্টেজের ওপর ফেলে জামাকাপড় ছিঁড়ে ভয়ঙ্কর ভাবে ধর্ষণ করছে। ধর্ষণ-পর্ব সমাপ্ত হওয়ার পরে ম্যানেজার এসে জানাচ্ছেন এটা নাটক নয়, বাস্তব। নাটকের পাত্র-পাত্রী ক্লান্ত হওয়ার দরুণ তাদের আর সামনে আনা যাচ্ছে না। সুতরাং দর্শকমন্ডলী এবার গোটা ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করতে করতে যে যার বাড়ি ফিরে যেতে পারেন। উপস্থাপনার নিরিখে গল্পটি নিঃসন্দেহে অভিনব। অন্যদিকে জন স্টেইনবেক তাঁর ‘মাইস এন্ড মেন’-এ লেনি আর ফার্মের মালকিনের সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে দেখিয়ে দেন যে, কিছু মানুষ সুন্দরকে বাঁচাতে বা তাকে লালন করতে জানে না, মেরেই ফেলে। এই গল্পটি পড়ে মনে প্রশ্ন জাগে – যা কিছু সুন্দর তাকে কারা নষ্ট করতে চায়, এবং কেনই বা চায়?
প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে লেখা মার্ক টোয়েনের ‘হাউ আই এডিটেড অ্যান এগ্রিকালচারাল পেপার’ একটি স্যাটায়ারধর্মী রচনা, যা বিষয়গতভাবে অভিনব। এখানে সংবাদপত্রের মূল সম্পাদক ছুটিতে যাওয়ায় গল্পের কথককে সাময়িকভাবে একটি সংখ্যার সম্পাদনা করতে দেওয়া হয়েছে। তাঁর কাজ কৃষি বিষয়ে একটি সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লেখা, যদিও সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তিনি যা লিখেছেন তা ছেপে বেরনোর পর সবাই বলছে যে ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে না। যেমন তিনি লিখেছেন আলু চাষ করার কথা, আলু গাছে অত্যন্ত সাবধানে ওঠা, অত্যন্ত সাবধানে একটা একটা করে আলু পাড়া, ইত্যাদি। এভাবে পুরো লেখাটায় তিনি ভিন্ন ভিন্ন ফসল চাষের ক্ষেত্রে হাস্যরস পরিবেশন করেছেন। মূল সম্পাদক তা পড়ে যখন প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন তাতে বোঝা যাচ্ছে তিনি হাসছেন অথচ চূড়ান্তভাবে ক্ষিপ্ত। পরিশেষে কথক সম্পাদককে জানাচ্ছেন তাঁর লক্ষ্য হল রচনায় অভিনবত্ব আনা, যাতে পত্রিকা একঘেয়ে বা ক্লিশে না হয়ে ওঠে। অন্যদিকে নর্ম্যান মেইলারের ‘দ্য হোয়াইট নিগ্রো’ মূলগতভাবে প্রবন্ধ হলেও তাতে ছোটগল্পের উপাদান আছে। তিনি স্বভাবসিদ্ধ দক্ষতায় একটা অদ্ভুত এবং অস্বস্তিকর ব্যাপারকে হাস্যকর করে তুলেছেন। যেমন তাঁর লেখার অংশবিশেষ রেকর্ড করে কোনও অনুষ্ঠানে তা বাজিয়ে শোনানোর সময় দেখা যায় তিনি যখন কথা বলছেন তখন গলাটা হঠাৎ রেকর্ডারের যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য একনায়কের মতো হয়ে উঠছে, যেন তিনি জনতার সামনে হিটলারের মতো বজ্রনির্ঘোষে ভাষন প্রদান করছেন।
মেইলার যদি তাঁর ‘Deer Park’ উপন্যাসের নাট্যরূপ দিতে পারেন তাহলে সাহিত্যের অন্যান্য ধারায় তো এরকম করা সম্ভব – অর্থাৎ একই লেখার গোত্রবদল করা যেতেই পারে। এভাবে অনেক নাটকেরই গল্পরূপ দেওয়া সম্ভব, উদাহরণ হিসেবে টেনেসী উইলিয়াম্স-এর ‘দ্য গ্লাস মীনেজারি’ কিংবা ইউজিন ও’নীল রচিত ‘দ্য হেয়ারি এপ’ নাটকদু’টির কথা বলা যায়। দুটোই যেহেতু সাংকেতিক এবং অভিব্যক্তিমূলক রচনা; তাই ছোটগল্পে সেই বিশেষ দিকগুলি ফুটিয়ে তোলার বিষয়টা রয়েছে। আবার ওয়ারেন ওয়াটউড্-এর ‘লেডি লাভারলিজ চ্যাটার’-এর স্ক্রিপ্ট অংশটা খন্ডে-খন্ডে একটা অতুলনীয় ছোটগল্পের উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। এভাবেই আমরা ধাপে-ধাপে উত্তর আধুনিক ‘speculative fictional’ ছোটগল্পেও এসে পড়তে পারি। যেমন জর্জ ম্যাকবেথ তাঁর ‘ফাস্ট কার ওয়াশ’-এ দেখিয়েছেন গাড়ি ধোওয়ার ব্যাপারটা কী মর্মান্তিক ভাবে হাস্যকর ও ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে উঠতে পারে যদি তার যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের দিকে খেয়াল না করা যায়। এই গল্পে লেখক গাড়ি ধোয়ার পুরো ব্যাপারটা যেভাবে ধাপে ধাপে বিভিন্ন পর্যায়ে তুলে ধরেছেন তা বিস্ময়ের উদ্রেক করে, পাশাপাশি উপস্থাপনাও অনবদ্য। কিন্তু ডি. এম. থমাসের ‘সিকিং-এ স্যুটেবল ডোনার’-কে কী বলা যেতে পারে? এতে সাধারণ গল্প-আখ্যান নেই, আছে মানব-মনের নিগূঢ় যন্ত্রনার কথা।
আধুনিক কালে সমাজিক, রাজনৈতিক, আধ্যাত্মিক, ধর্মীয় প্রভৃতি সব ক্ষেত্রেই অবক্ষয় সূচিত হলেও মানুষের অন্তর্নিহিত নৈতিকতা ও মূল্যবোধের দিকটা থেকেই যায়। এই ধরনের চিন্তা ভাবনার কিছু দিক মার্সেল প্রুস্তের ‘দ্য ডেথ অব বেরগত্’-এ পাওয়া যায়, যা লেখকের সর্বশেষ রচনা। মনে রাখতে হবে কোনও রচনা বর্ণনামূলক না হলেও তা গল্প হতে পারে, অন্তত যেখানে লেখক রচনার গোত্র নির্দেশ করছেন না। যেমন ডি. এইচ. লরেন্স ‘স্নেক’ বা ‘ব্যাট’-কে কবিতাই করেছেন, যদিও তা গদ্যে লেখা যেতে পারত। তবু রচনার গোত্র বিচরে ছোটগল্প আলাদাই। Non-narrative ছোটগল্পের প্রসঙ্গে কাফ্কার অনেক গল্পই উল্লেখযোগ্য। যেমন তাঁর ‘ট্রি’ গল্পটিকে কতভাবেই না ব্যাখ্যা করা করা যেতে পারে! Non-narrative গল্প সাহিত্যে নতুন নয় কিছু, কিন্তু যখন তা অস্তিত্বের চরম প্রয়োজনীয়তাকে অবধারিতভাবে পাঠকের সামনে মেলে ধরে তখন সেটা আধুনিক alienation থেকে উত্তর-আধুনিক alienation-এ চলে আসে। সেখানে ঘটনার ঘনঘটা নেই, আছে রহস্যময়তা, মিস্টিসিজম, আধ্যাত্মিকতা ও মনস্ত্বাত্বিক প্রকাশ। এই ধরনের গল্পে সংকট ঘনীভূত হয় অস্তিত্বের বিপন্নতায়, যা কাফকা ছাড়া বোর্হেসও দেখিয়েছেন (উদাহরণ – ‘দ্য সার্কুলার রুইনস’ ছোটগল্পটি)।
সাহিত্যে পোস্টমডার্ণ alienation প্রসঙ্গে আরও দু’জনের কথা আসতে পারে – রেমন্ড কার্ভার এবং সি. সি. স্যাক্লটন। কার্ভারের ‘ক্যাথেড্রাল’ এবং স্যাকলটনের ‘দ্য আলটিমেট কনস্ট্রাকশন’ গল্পদু’টি শিল্পরূপের দিক থেকে চূড়ান্ত কল্পনা ও মেটাফোরের উদাহরণ হলেও প্রতিদিনকার জীবনের বাস্তব। আবার alienation প্রসঙ্গ বাদ দিলে যে দুটো গল্পের কথা মনে আসে তা হল অ্যানেইস নিন-এর ‘বার্থ’ এবং ‘জ সুই লো প্লুস মালাদ্ দ সুররিয়ালিস্ত’। প্রথমটির উপজীব্য সন্তান জন্মানোর দীর্ঘ কষ্টদায়ক ও শ্বাসরুদ্ধকর প্রক্রিয়া, এবং সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরই যন্ত্রণার মধ্যে প্রশান্তি – একটা লাইনও যেখানে বাদ দেওয়ার নয়। দ্বিতীয় গল্পটায় কথক ক্লান্ত, যেখানে পথে আলাপ হওয়া বৃদ্ধ ব্যক্তিটি থেকে থেকেই কোন গর্ত দেখে দাঁড়িয়ে পড়ছে পাতাল খুঁজতে।
ছোটগল্প কখনও কখনও সাংকেতিক হলেও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বাদ দিয়ে রিয়ালিস্টিকালি ভাবলে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের দায়ভার কার ওপর বর্তায় সেটা বিচার করা জরুরী। যেমন জন স্টেইনবেক-এর ‘ক্রিসেনথীমামস্’-এ যে ক্রাইসিস তুলে ধরা হয়েছে তা কেবল তাঁর হাতেই সম্ভব। আরও অনেক দীর্ঘ পরিসরে একই জটিলতায় আক্রান্ত হতে হয়, যখন গাত্রুদ স্টেইন-এর ‘অ্যাজ আ ওয়াইফ হ্যাজ আ কাউ : আ লাভ স্টোরি’ রচনাটি স্মরণে আসে। আবার নার্গিস দেলাল-এর ‘দ্য ন্যুড্’ গল্পে চিরকালীন নারী তার মনস্তাত্বিক জটিলতা-সহ হাজির। লো হিল-এর ‘মাই বেস্ট ফ্রেন্ডস্ গার্ল’ গল্পে দুজন মেয়ের শারীরিক ভালবাসার কথা তীব্রভাবে হাজির যেখানে সময়ের প্রেক্ষিতে অবধারিতভাবেই ধর্ষকাম ও মর্ষকামের প্রবেশ ঘটেছে। এই সমস্ত আধুনিক-উত্তরাধুনিক জটিলতা পেরিয়ে আমরা যদি অন্যদিকে তাকাই তাহলে পাই মার্ক টোয়েনকে, পাই বার্নাড শ’ কে, আর পাই জে. সি. স্কুয়্যারকে। মার্ক টোয়েনের ‘দ্য ওয়েদার’ প্রবন্ধটি (expository) রম্যরচনা কিংবা হাস্যরসাত্মক গল্প হিসেবে নেওয়া যেতে পারে। এখানে নিউ ইংলন্ডের অদ্ভুত আবহাওয়ার কথা বলা হয়েছে – লেখাটা পড়লে বোঝা যায় আবহাওয়া বলতে তিনি তীর্যকভাবে কত কি বলতে চেয়েছেন! জর্জ বার্নাড শ’-এর ‘আ সানডে অন দ্য সারে হিল’ গল্পে তিনি পাহাড়ে যেতে চান না, তবু তাঁকে অনুনয় করা হলে সেখানে যান। কিন্তু তাঁকে নানা সমস্যার (যেমন বৃষ্টি) সম্মুখীন হতে হয়। তিনি নেমে এসে জানাচ্ছেন পাহাড়ে উঠে লাভ নেই, কারণ সেখানে কিছুই নেই। পুরো রচনাটা পড়লে বোঝা যায় শ’ নিজের মতো করে লেখার আমেজ পাঠকের জন্য রেখে দিয়েছেন। তাঁর আর একটি গল্প ‘দ্য ব্ল্যাক গার্ল ইন সার্চ অব গড’ আমাদের জটিল প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। আসলে একটা গল্প’ ‘reflective’ হোক বা ‘narrative’, কিংবা ‘descriptive’ হোক বা ‘subjective’ – তাকে গল্পের মতো করে বলার কায়দা কিংবা পাঠককে দিয়ে তা পড়িয়ে নেওয়ার মধ্যেই লেখকের কৃতিত্ব লুকিয়ে আছে। এই ধারণার উপর দাঁড়িয়েই জর্জ সণ্ডার্স বলেছেন – “When you read a short story, you come out a little more in love with the world around you.”


