ধ্রুপদী সাহিত্য
শ্যামলকৃষ্ণ বসু
৭
রাম গুণবান

এই সেই চিত্রকূট পর্বত। মনোরম বনরাজি সুউচ্চ পর্বতরাজি এবং বহমানা মন্দাকিনি নদীর পার্শ্বে মহর্ষি বাল্মিকী তার আশ্রম গড়ে তুলেছেন। কুলু কুলু জলধারার শব্দ আর মৃদুমন্দ সমীরন যেন এক প্রগাঢ় শান্তি ছড়িয়ে রেখেছে আশ্রম প্রাঙ্গনে।
দেবর্ষি নারদ আজ এসেছেন চিত্রকূটে বাল্মিকি মুনির আশ্রমে সাক্ষাৎ অভিলাষে এবং তারা এক্ষনে উভয়ে আলাপন রত।
মহর্ষি বাল্মীকি দেবর্ষি নারদকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘মুনিবর আপনি মহাতপস্বী ও নিত্যবেদাদি পাঠরত। আপনার আশীর্বাদে আমি রামনাম জপ করে সাধনস্তরে উন্নীত হয়েছি, সে একমাত্র আপনার দয়ায়। আপনি আমাকে মাত্র ‘রাম‘ নাম জপ করতে আদেশ করেছিলেন। প্রভু আমি জানতে ইচ্ছা করি, কে রাম ? তিনি কোন মহাত্মা ! আপনি আমাকে তাঁর কথা কিছু বলুন ! ‘
দেবর্ষি আনন্দিত চিত্তে বলে উঠলেন,‘ অহো, বড় আনন্দিত হলাম মহর্ষি আপনার কথায়। আপনি শুনতে চেয়েছেন প্রভু শ্রীরাম এর কথা যে নাম আপনি সর্বদা জপ করে থাকেন। আজ এই শুভ মুহূর্তে আমি আপনাকে তাঁর কথা বলছি শুনুন।
রাম গুনবান। তিনি সর্বগুণান্বিতা। তিনি মহাবীর, ধর্মজ্ঞ, সত্যভাষী, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
তিনি সচ্চরিত্র এবং সকল প্রাণীর হিতসাধনকারী।
তিনি বিদ্বান, কর্মদক্ষ এবং প্রিয়দর্শন।
তিনি ক্রোধজয়ী , অদোষদর্শী এবং যুদ্ধে ক্রূদ্ধ হলে তাকে দেখে দেবতারা ও ভীত হয়ে পড়েন।
তাঁর মধ্যে সমগ্র গুনলক্ষী রূপ ধরে আছেন।
মহর্ষি, শুনুন, এমন গুনবান পুরুষ দেবতাদের মধ্যে ও দুর্লভ।
দেবেশ্বপি ন পশ্যামি কশ্চিদেভির গুনৈরজুতম
শ্রুয়ত্বাং তু গুমৈরেভিরজুক্ত নর চন্দ্রমা ।। [বাল্মীকি ]
তিনি ইক্ষাকু বংশজাত স্বয়ং শ্রীরামচন্দ্র। যে রামচন্দ্রের কথা আমি আপনাকে বলতে বসেছি।
দেবগনে না দেখি আমি এমত গুনবান
নর মধ্যে চন্দ্র তিনি শ্রীরাম ধীমান ।। [স্বরচিত ]
মহর্ষি বললেন , ‘অহো, আমি সেই নরচন্দ্রমার দর্শন অভিলাষী দেবর্ষি ! ‘
দেবর্ষি বলতে থাকেন, ‘ মহর্ষি শুনুন, তিনি সংযত আত্মা , মহাবলবান। তিনি কান্তিমান, তিনি ধৈর্যশীল এবং জিতেন্দ্রিয়।
তিনি সুবুদ্ধিমান, নীতিজ্ঞ এবং বাগ্মী। তাঁর গাত্রবর্ণ সুস্নিগ্ধ। তিনি তেজস্বী। সত্যপালনে তিনি অটল প্রতিজ্ঞ।’
মহর্ষি বললেন, ‘ আমি সেই নরচন্দ্রমার ভজনা করি।’
দেবর্ষি বললেন, ’ মহর্ষি, অবধান করুন , ইক্ষ্বাকুবংশের রাজা অযোধ্যা নরেশ দশরথের পুত্ররূপে স্বয়ং রামচন্দ্র জন্মগ্রহন করবেন। তিনি বিষ্ণুর অংশ সম্ভূত। পৃথিবীর পাপ ও অসুর বিনাশ করে ধর্মরাজ্য সংস্থথাপনার্থে স্বয়ং নারায়ন আসবেন নররূপে এই ধরনীতে।
তাঁর আজানু লম্বিতবাহু, প্রশস্ত ললাট, উন্নতশির, শঙ্খের মতো গ্রীবা,পদ্মপলাশ তাঁর আঁখি।
তিনি কান্তিমান বুদ্ধিমান ধীর সমদর্শী।
তিনি ধর্মজ্ঞ, শাস্ত্রজ্ঞ, সত্যসন্ধ, যশস্বী ও জ্ঞানী।
তিনি শুদ্ধাচারী, বিনীত এবং স্থিরচিত্ত।
তিনি আকাশের মত মহান, হিমালয়ের মতো অটল, সমুদ্রের মতো গম্ভীর।
পূর্ণচন্দ্রের মতো তাঁর শোভা। অগ্নির মতো প্রজ্বলন্ত তাঁর বীর্য।
অসীম ক্ষমায় তিনি পৃথিবীর মতো।
ধরিত্রি ত্রাস রাবনকে তিনি ধ্বংস করে সকলকে ভয় মুক্ত করবেন।’
দেবর্ষি নারদ রামের জীবনকথা বর্ণনা করতে থাকেন।
বাল্মিকির অন্তরে রামের জীবনকথা রণিত হতে থাকে। তিনি স্বপ্নবৎ ভূমিতে বিচরন করতে থাকেন এবং বলে ওঠেন, ‘ অহো, এ কি অপূর্ব কথা মুনিবর। আমার জীবন ধন্য হয়ে গেলো।’
দেবর্ষি বলেন,’রাম নাম মহামন্ত্র। উমাপতি মহেশ এই মন্ত্র জপ করেন। এই নাম চতুর্বর্গ ফলপ্রদ। ওই নাম স্বয়ং রামের চেয়েও রাম নাম শ্রেষ্ঠ। নামীর চেয়ে নাম বড়। এই নামের মাহাত্ম্য বেদের সমান । ‘ বেদৈশ্চ সন্মিতম।’ শুনুন বলি তাঁর কথা !
সূর্যবংশে দশরথ হবেন নরপতি।
রাবণ বধিতে জন্মিবেন লক্ষ্মীপতি ॥
শ্রীরাম লক্ষণ আর ভরত শত্রুঘন ।
তিন গর্ভে জন্মিবেন এই চারি জন ॥
সীতাদেবী জন্মিবেন জনকের ঘরে।
ধনুর্ভঙ্গপণে তাঁর বিবাহ তৎপরে ॥
পিতার আজ্ঞায় রাম যাইবেন বন।
সঙ্গেতে যাইবেন জানকী ও লক্ষ্মণ।।
সীতারে হরিয়া লবে লঙ্কার রাবণ।
সুগ্রীব সনে কিস্কিন্ধ্যায় হইবে মিলন ॥
হনুমান আনিয়া দিবেন সন্ধান সীতার।
বানর সেনা লয়ে তবে সীতার উদ্ধার ॥
দশ মুণ্ড বিশ হাত মারিয়া রাবণ।
অযোধ্যায় রাজা তবে হইবেন নারায়ণ ॥ [কৃত্তিবাস ]
মহর্ষি বাল্মীকি এক মনে শুনে চলেছেন রামের মাহাত্ম্য ও জীবন কথা।
দেবর্ষি নারদ এক্ষনে মহর্ষি বাল্মিকিকে প্রত্যাদেশ করেন।
যেই রাম নাম হইতে হইলা পবিত্র
সেই গ্রন্থ রচ গিয়া রামের চরিত্র ।।
সরস্বতী বসিবেন তোমার জিহবাতে
হইবে কবিতা রাশি তোমার মুখেতে ।। [ কৃত্তিবাস ]
মহর্ষি বাল্মিকি দেবর্ষি নারদের কথা শুনে মোহমুগ্ধভাবে বলে ওঠেন, ‘যথা আজ্ঞা মান্যবর। আমি এই রামকথা কীর্তন করতে নিশ্চয়ই সচেস্ট হব।‘
দেবর্ষি নারদ এইবার বাল্মিকির কাছে বিদায় গ্রহণ করে আকাশপথে হরিগুন গান গাইতে গাইতে দেবলোকে যাত্রা করলেন। ঋষি বাল্মীকি মুগ্ধবৎ ভাবিত হয়ে রইলেন নাম এবং নামীর সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করতে।
৮
শ্লোক ভবতুঃ

মহর্ষি বাল্মিকি রামকথা শুনে অবধি যেন স্বপ্নভূমিতে বিচরন করতে থাকেন এবং মনে মনে রামকথা কীর্তন করতে থাকেন ।
সমগ্র চিত্রকুট এর আকাশ বাতাস ও যেন রামগুনগানে মুখর হয়ে উঠেছে।
সেদিন সে এক সুন্দর সকাল। মহর্ষি বাল্মীকি তাঁর শিষ্য ভরদ্বাজ সমভিব্যাহারে তমসা নদীতে স্নানার্থে গমন করেছেন। তমসার জল স্বচ্ছ ও রমণীয়। বাল্মিকী পরমানন্দে স্নান অবগাহন সারলেন। স্নান শেষে রাম নাম জপ করতে করতে মহর্ষি দেখিতে পান অদূরে এক জোড়া ক্রৌঞ্চ ও ক্রৌঞ্চী পরস্পর প্রেমালিঙ্গনে আবদ্ধ হয়ে বিচরণশীল ও মধুর কুজনরত।
আহা কি সুন্দর পক্ষীদুটি। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই একটি ব্যাধ শিকার সন্ধানে হঠাৎ কোথা হতে আবির্ভূত হয়ে প্রেমালিঙ্গনে আবদ্ধ সেই ক্রৌঞ্চ ক্রৌঞ্চী দুটির মধ্যে পুরুষ ক্রৌঞ্চটিকে হত্যা করে বসে। আর সেই ক্রৌঞ্চী শরবিদ্ধ রক্তাক্ত ক্রৌঞ্চর চারপাশে করুণস্বরে রোদন করতে থাকে।
চমকে ওঠেন বাল্মিকী মুনি। এ কি ভীষণ ক্রূরতা ব্যাধের !
ব্যাধ কতৃক নিহত পক্ষীকে সেই অবস্থায় দেখে মুনিবরের হৃদয় করুণায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি ব্যাধকে বিনা কারনে এমন নিষ্ঠুর কর্ম করতে দেখে হাহাকার করে ওঠেন এবং ঠিক সেইক্ষনে তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ব্যাধের এমন অনৈতিক কর্মের জন্য হঠাৎ করেই অভিসম্পাত করে বসলেন,
মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ ।
যৎ ক্রৌঞ্চ মিথুনাদেকমবধীঃ কাম মোহিতম ।।
* * * * * * * * *
ওরে রে নিষাদ, কি হেতু বধিলি ,
প্রেম বিমোহিত ক্রৌঞ্চ মিথুনে ।
অবধান করো, ওরে ওরে মূঢ় ,
শান্তি পাবি না তুই ও জীবনে।। [স্বরচিত ]
* * * * * * * * * *
হঠাৎ এমন এক ছন্দময় শ্লোক আবৃত্তি করেই মহর্ষি যেন স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তিনি ভাবলেন এ আমি কি বললাম! এ যেন কেমন একরকম ছন্দোময় বাণী স্বয়ং উচ্চারিত হয়ে পড়েছে আমার জিহ্বায় ?
তিনি শিষ্য ভরদ্বাজকে বলে উঠলেন, বৎস ভরদ্বাজ ! এ কি অদ্ভুত ! এ এ এ আমি হঠাৎ কি বলে ফেললাম? এ কেমন এক ছন্দময় ভাব যেন এক ছন্দময় কথায় প্রকাশিত হয়ে পড়লো আমার অন্তর হতে?’
শিষ্য ভরদ্বাজ প্রশংসা সুচক স্বরে বলে ওঠে,‘ গুরুদেব একটি সুন্দর ছন্দময় বানী আপনার শ্রীমুখ হতে অনায়াসেই প্রকাশিত হয়ে পড়েছে । এমন তো আগে কখনো আপনি বলেন নি !’
‘ তাই তো ! ‘ – মহর্ষি বলেন,
‘ প্রেম বিমোহিত ক্রৌঞ্চ মিথুনে,
বধিল নিষাদ শর সন্ধানে ,
ক্ষুব্ধ হৃদয় সেই সে লগনে
উচ্চারিল তবে কি কথা কে জানে !’ [স্বরচিত ]
মহর্ষি এইবার তাঁর মুখ নিঃসৃত এহেন উচ্চারিত শ্লোকের বিষয়ে চিন্তা করতে করতে নিজ আশ্রম এ প্রত্যাবর্তন করলেন। মনে মনে তিনি সেই ছন্দ সেই বাণীকে বারংবার আবৃত্তি করতে থাকেন।
মনোরম চিত্রকূট পর্বতের কি সুন্দর শোভা। বহমান গোদাবরী। সুউচ্চ পর্বতরাজি। ফুল-ফল প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে দেখতে বাল্মিকী আপন ভাবনায় মগ্ন হয়ে থাকেন। কিন্তু মনের মধ্যে যেন থেকে থেকে বারে বারে সেই ক্রৌঞ্চীর আর্তবিলাপ ধ্বনিত হতে থাকে।
সন্ধ্যা সমাগত প্রায়। বাল্মিকী সন্ধ্যা প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত করলেন। এইবার আচমন সেরে সান্ধ্যতপে মনকে নিয়োজিত করলেন। মনের মধ্যে শুধু ‘রাম’ এবং ‘রাম’ এবং ‘রাম এবং ‘রাম’। সেই শ্রীরামকথা। দেবর্ষি নারদ হতে শ্রুত স্ত্রী সীতার জন্য শ্রীরামচন্দ্রের ক্রন্দন যেন কানের মধ্যে গুঞ্জিত হয়ে চলেছে। প্রিয়বিচ্ছেদে কি মনুষ্য কি প্রাণী, কি ভগবান সবাই ব্যথিত হন। এই বিচ্ছেদ ব্যথা, এইরূপ যে বিয়োগ বেদনা তা হতেই কি উচ্চারিত হয় ছন্দ ও সুর?
এমন সময়ে সমস্ত কুটির আলোকিত করে পরমেশ্বর ব্রহ্মা বাল্মীকির সাক্ষাতে আবির্ভূত হলেন। মহর্ষি বাল্মীকি পিতামহ ব্রহ্মাকে এমন অকস্মাৎ আবির্ভূত দেখতে পেয়ে অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন এবং করজোড়ে স্তব করে তাঁকে প্রণাম করলেন। অন্তরের অন্তঃস্থলে সেই ক্রৌঞ্চীর বিলাপ তাঁর মন এবং অন্তরাত্মাকে ব্যথিত করে রেখেছে। পূর্ব উচ্চারিত সেই শ্লোকটি এখন আবার মনের মধ্যে ভেসে উঠল।
মহর্ষি বাল্মীকি বলেন,‘ হে পিতামহ ব্রহ্মা আমি আপনার দর্শন পেয়ে কৃতার্থ।’
অন্তর্যামী ব্রহ্মা এবার বাল্মিকীকে বলে ওঠেন, ‘মহর্ষি , আমি জানি, আজ এক ভীষণ ব্যথায় পরিপূর্ণ তোমার অন্তর। আমার ইচ্ছা অনুসারেই তোমার মনের অন্তঃস্থলে উদগত এবং উচ্চারিত হয়েছে যে বাণী, তা তোমাকে চিরকাল এক মহান কবির সম্মান প্রদান করবে। বাগদেবী তোমার জিহ্বায় অধিষ্ঠান করেছেন। তোমার শোকাহত অন্তর হতে যে ছন্দবদ্ধ তন্ত্রীলয় সমন্বিত বাক্য নির্গত হয়েছে তা শ্লোক বলে জেনো।’
শোকারতস্য প্রবৃত্ত মে শ্লোক ভবতুঃ। – তোমার শোকার্ত হৃদয় থেকে প্রকাশ হয়েছে এই শ্লোক।
মহর্ষি বাল্মিকি ব্রহ্মার বাক্য অনুধাবন করার প্রয়াস পাচ্ছেন।
অন্তর্যামী ব্রহ্মা বাল্মিকীকে বলতে থাকেন,‘ তোমার ওই ছন্দোবদ্ধ বাক্য ধরাধামে ‘পুণ্যশ্লোক‘ নামেই খ্যাত হবে। মহর্ষি আমার ইচ্ছা আপনি শ্রীরামচন্দ্রের সমগ্র চরিত্র বর্ণনা করুন। দেবর্ষি নারদ যে ভাবে আপনাকে ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের কথা বর্ণনা করেছেন আপনি সেই রকম ভাবেই ধর্মাত্মা, ধীমান,সদা ধেয়, ভগবান শ্রী রামচন্দ্রের বৃত্তান্ত এই পৃথিবীতে প্রচার করুন। এ আমার ইচ্ছা।’
বাল্মীকি বলেন, ‘হে পরমপিতা, আমি সেই বিরাট পুরুষের কথা কতটুকুই বা বলতে পারি ? আমি তো সেই জগত পুরুষের সমস্ত কথা সম্পূর্ণরূপে বিদিত নই। তবে আপনার কৃপা হলে আমি নিশ্চয়ই শ্রীরামচন্দ্রের কথা জগৎ লোকের জন্য শ্লোকবদ্ধ করতে পারি।’
অন্তর্যামী ব্রহ্মা বলে ওঠেন,‘ পুন্যবর বাল্মীকি, আমার বরে আপনি যা বিদিত বা অবিদিত আছেন সে সমস্তই বিদিত হবেন। যে কথা ব্যক্ত কিংবা এখনো অব্যক্ত, সীতার সম্বন্ধে যা বলা হয়েছে, আর যা বলা হয় নি, সেই সবই তুমি প্রকাশ কর। এই কাব্যে আপনার কোন বাক্য মিথ্যা হবে না। শ্রীরামচন্দ্রের পুন্যকথা মনোরম শ্লোকগাথায় রচনা করুন।
যাবৎ স্থাস্যন্তি গিরয়ঃ সবিতশ্চ মহীতলে
তাবদ রামায়ণ কথা লোকেসু প্রচরিস্যতি।। [বাল্মীকি ]
যতদিন এই পৃথিবীতে পর্বতসমূহ এবং নদীসমূহ বহমান থাকবে ততদিন এই সংসারে রামায়ণ কথা প্রচারিত থাকবে এবং আমার ইচ্ছায় মহামুনী বাল্মীকি তোমার কীর্তি অমর হয়ে থাকবে এই ভুবনে।’
বাল্মীকি এইবার করজোড়ে ব্রহ্মাকে বললেন,‘ভগবান এ আপনার অশেষ কৃপা। আমি আমার সাধ্যমতো রামকথা বর্ণনা করার প্রয়াস করব।’
এইবার অন্তর্যামী ব্রহ্মা বলে উঠলেন,‘ যত কাল আপনার রচিত শ্রীরামচন্দ্রের লীলাকাহিনী প্রচারিত থাকবে ততকাল আপনিও ঊর্ধ্বও অধঃ লোকে তথা ব্রহ্মলোকে বিরাজ করবেন।’ – এবং এই কথা ঘোষণা করেই ভগবান ব্রহ্মা অন্তর্হিত হলেন।
ব্রহ্মার আশীর্বাদে বাল্মিকির সকল সত্তা রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল। তিনি ধ্যানাসনে যোগমগ্ন হলেন । ক্রমে ক্রমে তাঁর অন্তরে ব্রহ্মার কৃপায় যোগ দৃষ্টিতে রামচন্দ্রের সমস্ত জীবন কাহিনী উদ্ভাসিত হয়ে উঠতে থাকল। মহর্ষি সুপ্তোত্থিতের মত জেগে উঠে বসলেন। এইবার তিনি ভরদ্বাজ প্রমুখ শিষ্যদের কে আহবান করলেন। শিষ্যদের কাছে তিনি ক্রৌঞ্চ বধের ঘটনা বললেন এবং তাদের শোনালেন সেই স্বতোৎসারিত ছন্দবদ্ধ শ্লোকটি।
শিষ্যগণ এইবার বাল্মীকি মুনির সঙ্গে একসাথে সেই শ্লোকটি সুর ও তাল সমন্বয়ে বারবার গান করতে লাগলেন। চারটি সমান অক্ষর যুক্ত পাদে এবং প্রতি পাদে আটটি অক্ষর, ক্রমান্বয়ে তা গীত হওয়ায় যেন এক মাধুর্য প্রাপ্ত হয়ে পড়ল। এই মাধুর্যই কাব্যরস।
এইবার মহর্ষির অন্তঃকরণে এই চিন্তাই জাগরিত হল, এইরূপ শ্লোকের দ্বারা আমি শ্রী রামচন্দ্রের মহিমা বর্ণন করতে পারি । ব্রহ্মা যখন অভয় দিলেন তবে তা সম্পন্ন করতে কোন অন্যথা হবার কথা নয়। তিনি এবার সেই কথা ভরদ্বাজ ও অন্যান্য শিষ্যগনের নিকট আনন্দ সহকারে জ্ঞাপন করলেন। বললেন,‘আমি এই রকম শ্লোকের দ্বারা শ্রী রামচন্দ্রের মহিমা বর্ণন করতে ইচ্ছা করি। ঈশ্বরের তেমনই আদেশ। ’
ভরদ্বাজ এবং অন্য শিষ্যরা সকলেই হর্ষ সহকারে মহর্ষিকে ‘ সাধু সাধু ‘ বলে উৎসাহিত করে উঠলেন।
মহর্ষি বাল্মীকি এইবার দেবর্ষি নারদ এর মুখে রামচন্দ্রের উপাখ্যান যেমন শুনেছিলেন সেই শ্রুত কাহিনী হ’তে ধ্যান যোগে আরো মূলবিষয় অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হলেন। তারপর এক শুভদিনে এক শুভমুহূর্তে পূর্বাশ্য পূর্বক কুশাসনে কৃতাঞ্জলি হয়ে উপবেশন করে মহর্ষি বাল্মীকি বিধি অনুসারে আচমনান্তে রামায়ণ কাহিনী লিখতে শুরু করলেন।
সরযূ নদী তীরে অযোধ্যা নগরে
সূর্যবংশী রাজা এক রাজত্ব করেন ।
দশরথ নামে রাজা মহাপরাক্রমী ,
তিন রানী লয়ে তিনি সুখেই আছেন ।। [স্বরচিত ]


