পিগম্যালিয়ন

পিগম্যালিয়ন

দ্বিতীয় অঙ্ক

পরের দিন সকাল ১১টা

উইম্পল স্ট্রিটে হিগিন্সের গবেষণাগার। এটি দোতলার এক প্রশস্ত ঘর, যার জানালা দিয়ে সরাসরি রাস্তা দেখা যায়। মূলত বৈঠকখানা হিসেবে নির্মিত হলেও, এখন সেটি বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণার এক অভিনব কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ঘরের পেছনে হলঘরের দিকে খোলা জোড়া দরজা। ভেতরে ঢুকতেই ডানদিকের কোণায় দেয়াল ঘেঁষে সমকোণে রাখা দুটি লম্বা ফাইল-ক্যাবিনেট চোখে পড়ে। তাদের মাঝখানে একটি সমতল লেখার টেবিল, আর সেই টেবিল যেন ধ্বনিবিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর জগৎ।

টেবিলের উপর সাজানো রয়েছে একটি ফোনোগ্রাফ, একটি ল্যারিঙ্গোস্কোপ, বেলো লাগানো ছোট ছোট অর্গান পাইপের সারি, গ্যাস প্লাগের সঙ্গে রবারের নল দিয়ে যুক্ত বার্নারসহ গান শেখানোর জন্য ব্যবহৃত বিশেষ ল্যাম্পচিমনি, নানা আকারের টিউনিং-ফর্ক, মানুষের মাথার অর্ধেক অংশের জীবন-আকারের একটি ছেদনচিত্র যেখানে কণ্ঠনালীর গঠন স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে, এবং ফোনোগ্রাফে ব্যবহারের জন্য মোমের সিলিন্ডারে ভরা একটি বাক্স। সব মিলিয়ে জায়গাটি যেন কোনো বিজ্ঞানীর পরীক্ষাগার এবং শিল্পীর কর্মশালার এক অদ্ভুত মিশ্রণ।

ঘরের আরও ভেতরেএকই পাশে, রয়েছে একটি ফায়ারপ্লেস। তার পাশে রাখা আরামদায়ক চামড়ার চেয়ার ও কয়লার ঝুড়ি ঘরটিকে এক ধরনের উষ্ণতা ও স্বাচ্ছন্দ্যের আবহ দিচ্ছে। ফায়ারপ্লেসের উপরের তাকের উপর একটি ঘড়ি স্থিরভাবে সময় জানিয়ে চলেছে। ফায়ারপ্লেস আর ফোনোগ্রাফ টেবিলের মাঝখানে খবরের কাগজ রাখার একটি স্ট্যান্ড।দরজার বিপরীত পাশে, দর্শনার্থীর বাঁদিকেরয়েছে অগভীর ড্রয়ারওয়ালা একটি আলমারি। তার উপরে রাখা টেলিফোন ও টেলিফোন ডিরেক্টরি যেন আধুনিক নগরজীবনের উপস্থিতির কথা মনে করিয়ে দেয়। সেই কোণ থেকে শুরু করে পাশের দেয়ালের অধিকাংশ জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশাল পিয়ানো। তার কিবোর্ডটি দরজা থেকে সবচেয়ে দূরের দিকে, আর বাজানোর জন্য লম্বা বেঞ্চটি পুরো কিবোর্ড জুড়ে বিস্তৃত। পিয়ানোর উপর ফল, মিষ্টি এবং বিশেষ করে চকলেটে ভর্তি একটি বাটি রাখা—যেন কঠোর গবেষণার মাঝেও কিছুটা বিলাসী আনন্দের ইঙ্গিত।

ঘরের মাঝখানটা প্রায় ফাঁকা। কয়েকটি চেয়ার ছাড়া বিশেষ আসবাব নেই। দেয়ালজুড়ে ঝুলছে খোদাই করা ছবি—অধিকাংশই পিরানেসির স্থাপত্যচিত্র ও মেজোটিন্ট প্রতিকৃতি। কোনো রঙিন চিত্রকর্ম নেই; সবকিছুতেই এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক সংযম ও রুচিশীলতার ছাপ।

এই সময় পিকারিং টেবিলের পাশে বসে আছেন। তিনি কিছু তাস এবং নিজের ব্যবহৃত একটি সুরশলাকা টেবিলের উপর নামিয়ে রেখেছেন। অন্যদিকে হিগিন্স তাঁর কাছেই দাঁড়িয়ে, খোলা থাকা দুই-তিনটি ফাইলের ড্রয়ার বন্ধ করছেন। সকালের উজ্জ্বল আলোয় তাঁকে প্রায় চল্লিশ বছরের এক বলিষ্ঠ, প্রাণোচ্ছল ও আকর্ষণীয় পুরুষ বলে মনে হয়। তাঁর পরনে পেশাদার মানুষের মতো একটিসাদা লিনেন কলারওয়ালা কালো ফ্রক-কোটএবং কালো সিল্কের টাই তাঁর ব্যক্তিত্বকে আরও দৃঢ় ও মার্জিত করে তুলেছে।

হিগিন্সের স্বভাব সম্পূর্ণ বিজ্ঞানমনস্ক। যেকোনো বিষয়কে যদি বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ বা অধ্যয়ন করা যায়, তবে তার প্রতি তাঁর প্রবল কৌতূহল ও গভীর আগ্রহ জন্মায়। কিন্তু সেই আগ্রহের মধ্যেই মানুষের অনুভূতি—নিজের হোক বা অন্যের—প্রায়শই তাঁর কাছে গৌণ হয়ে পড়ে।আসলে বয়স ও শারীরিক গঠন বাদ দিলে, তিনি অনেকটা এক দুরন্ত ও বেপরোয়া শিশুর মতো। কোনো নতুন বিষয় তাকে উত্তেজিত ও কৌতূহলী করে তোলে; আবার একই সঙ্গে তিনি উচ্চস্বরে, নির্দ্বিধায় এবং প্রায় নির্মম স্পষ্টতায় নিজের মত প্রকাশ করেন। ফলে তাকে অনিচ্ছাকৃত ঝামেলা বা বোকামি থেকে দূরে রাখতে যেন সবসময় সতর্ক নজরদারি দরকার হয়।

মেজাজ ভালো থাকলে তিনি বন্ধুত্বপূর্ণ ভঙ্গিতে ধমক দেন, ঠাট্টা করেন; কিন্তু কিছু তার মনমতো না হলেই মুহূর্তের মধ্যে বিরক্ত, খিটখিটে এবং ঝড়ের মতো উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। তবু তাঁর মধ্যে কোনো ভণ্ডামি বা কুটিলতা নেই। তিনি সম্পূর্ণ অকপট ও বিদ্বেষহীন মানুষ। সেই কারণেই তাঁর সবচেয়ে অযৌক্তিক আচরণও শেষ পর্যন্ত বিরক্তির বদলে এক ধরনের আকর্ষণ সৃষ্টি করে।

হিগিন্স [শেষ ড্রয়ারটি বন্ধ করতে করতে] :এই তো, মনে হচ্ছে পুরো প্রদর্শনীটাই দেখানো হয়ে গেল।

পিকারিং :সত্যিই বিস্ময়কর! তবে স্বীকার করতে হবে, এর অর্ধেকও আমি পুরোপুরি বুঝতে পারিনি।

হিগিন্স :আপনি চাইলে কোনো অংশ আবার দেখাতে পারি।

পিকারিং [উঠে ফায়ারপ্লেসের কাছে গিয়ে আগুনের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে] :না না, এখন আর নয়। আজ সকালের জন্য আমার মস্তিষ্ক যথেষ্ট ভরে গেছে।

হিগিন্স [তার পাশে এসে দাঁড়িয়ে] :তাহলে শব্দ শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন?

পিকারিং :ঠিক তাই। ভীষণ মানসিক চাপের কাজ। আমি নিজেকে বেশ গর্বিত ভাবতাম, কারণ আমি চব্বিশ রকম স্বরধ্বনি আলাদা করে উচ্চারণ করতে পারি। কিন্তু আপনার একশো ত্রিশটা স্বরধ্বনি তো আমাকে সম্পূর্ণ হার মানিয়ে দিল। এদের বেশিরভাগের মধ্যেই আমি কোনো পার্থক্য ধরতে পারি না।

হিগিন্স [হেসে, পিয়ানোর ওপর রাখা মিষ্টির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে] :ওসব অভ্যাসের ব্যাপার। প্রথমে কেউই পার্থক্য শুনতে পায় না। কিন্তু একবার কানে সুর বসে গেলে দেখবেন, প্রত্যেকটা ধ্বনি ‘ক’ আর ‘খ’-এর মতো স্পষ্ট আলাদা মনে হবে।

এই সময় দরজার কাছে মিসেস পিয়ার্স উঁকি দিলেন। তিনি হিগিন্সের গৃহপরিচারিকা।

হিগিন্স :কী ব্যাপার?

মিসেস পিয়ার্স [দ্বিধাগ্রস্ত, যেন কিছুটা বিস্মিত] :একজন যুবতী আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান, স্যার।

হিগিন্স :একজন যুবতী! সে আবার কী চায়?

মিসেস পিয়ার্স :তিনি বলছেন, কেন এসেছেন সেটা জানলে আপনি নাকি খুশিই হবেন। দেখতে খুবই সাধারণ ধরনের মেয়েস্যার,একেবারে সাধারণ। আমি প্রথমে তাকে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পরে মনে হলো, হয়তো আপনি আপনার ওই যন্ত্রপাতিতে তার গলা পরীক্ষা করতে চাইবেন। আপনি তো মাঝে মাঝেই অদ্ভুত অদ্ভুত লোকজনের সঙ্গে দেখা করেন। মনঃে হয় আমি কোনো ভুল করিনি, স্যার। করলেও আপনি নিশ্চয়ই আমাকে ক্ষমা করবেন…

হিগিন্স :ওহ্, ঠিক আছে, মিসেস পিয়ার্স। মেয়েটার কি কোনো মজার উচ্চারণ আছে?

মিসেস পিয়ার্স :মজার বলছেন! ভয়ানক রকমের, স্যার। আমি বুঝতেই পারি না আপনি এসব শুনে কী আনন্দ পান।

হিগিন্স [পিকারিংয়ের দিকে ফিরে উৎসাহভরে] :চমৎকার! এবার যন্ত্রটা চালু করা যাক। ওকে ভেতরে আনুন, মিসেস পিয়ার্স।

[তিনি দ্রুত নিজের কাজের টেবিলের দিকে গিয়ে ফোনোগ্রাফে ব্যবহারের জন্য একটি মোমের সিলিন্ডার তুলে নেন।]

মিসেস পিয়ার্স [অর্ধেক অনিচ্ছায়] :ঠিক আছে, স্যার। তবে পরে কিন্তু বলবেন না আমি আপনাকে সাবধান করিনি।

[তিনি নিচে নেমে যান।]

হিগিন্স [উত্তেজিতভাবে পিকারিংকে] :এটা সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার। আমি আপনাকে দেখাব কীভাবে আমি উচ্চারণের রেকর্ড তৈরি করি। ওকে আগে কথা বলাব। তারপর বেলের “ভিজিব্‌ল স্পিচ”-এ ওর উচ্চারণ লিখে নেব। এরপর বিস্তৃত রোমান লিপিতে তা নথিভুক্ত করব। তারপর ফোনোগ্রাফে রেকর্ড করব, যাতে আপনি যখন খুশি লিখিত প্রতিলিপি সামনে রেখে তার গলা শুনতে পারেন।

ঠিক তখনই মিসেস পিয়ার্স ফিরে এলেন।

মিসেস পিয়ার্স :এই যে, স্যার—যুবতীটি এসেছে।

ফুলওয়ালি মেয়েটি বেশ আড়ম্বরপূর্ণ ভঙ্গিতে ঘরে প্রবেশ করল। তার মাথার টুপিতে গোঁজা রয়েছে তিনটি অসস্ট্রীচের পালক—একটি কমলা, একটি আকাশি নীল, আর একটি উজ্জ্বল লাল। তার অ্যাপ্রনটি আজ প্রায় পরিষ্কার, আর পুরোনো জীর্ণ কোটটাকেও যত্ন করে কিছুটা গোছানো হয়েছে। তার এই করুণ অথচ আত্মগর্বে ভরা উপস্থিতি—দারিদ্র্যের মাঝেও নিজের মর্যাদা ধরে রাখার সরল প্রচেষ্টা—পিকারিংয়ের মনে এক ধরনের সহানুভূতির সঞ্চার করল। তিনি অনিচ্ছাসত্ত্বেও একটু সোজা হয়ে দাঁড়ালেন।

কিন্তু হিগিন্স সম্পূর্ণ আলাদা প্রকৃতির মানুষ। নারী ও পুরুষের মধ্যে তিনি তেমন কোনো সামাজিক পার্থক্য অনুভব করেন না। যখন তিনি কাউকে ধমক দিচ্ছেন না বা উত্তেজনায় আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করছেন না, তখন নারীদের সঙ্গে তাঁর ব্যবহারটা অনেকটা এমন এক শিশুর মতো, যে নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য ধাত্রীর কাছে আবদার করে।

হিগিন্স [হঠাৎ মেয়েটিকে চিনে ফেলে, বিরক্ত ও হতাশ স্বরে] :আরে! এ তো সেই মেয়েটা, যার কথা আমি গত রাতে লিখেছিলাম। ওর আর কোনো দরকার নেই। লিসন গ্রোভের উচ্চারণের যত রেকর্ড আমার দরকার, সবই আমার কাছে আছে। আর এর জন্য আমি নতুন একটা সিলিন্ডার নষ্ট করব না।

[মেয়েটির দিকে হাত নেড়ে]

চলে যাও! তোমাকে আমার দরকার নেই।

ফুলওয়ালি :এত বেয়াদবি করবেন না। আমি কী জন্য এসেছি, সেটা তো এখনও শুনলেনই না।

[মিসেস পিয়ার্সের দিকে ফিরে, যিনি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন]

তুমি কি ওনাকে বলেছ আমি ট্যাক্সি করে এসেছি?

মিসেস পিয়ার্স :কি সব আজেবাজে কথা বলছ! তোমার কী মনে হয়, মিস্টার হিগিন্সের মতো একজন ভদ্রলোকের কাছে এতে কিছু যায় আসে তুমি কীসে করে এসেছ?

ফুলওয়ালি :ওহ্, বেশ গর্ব তো! উনি নিজেই তো লোককে জ্ঞান দিতে ভালোবাসেন—আমি কিন্তু শুনেছি। যাই হোক, আমি এখানে কারও দয়া চাইতে আসিনি। আর আমার টাকা যদি ওনার কাছে যথেষ্ট ভালো না লাগে, তাহলে আমি অন্য কোথাও চলে যেতে পারি।

হিগিন্স :কিসের জন্য যথেষ্ট ভালো?

ফুলওয়ালি :আপনার জন্যই যথেষ্ট ভালো। এখন যদি আপনি একটু…আপনি তো জানেনই, তাই না? আমি শিখতে এসেছি—সত্যিই শিখতে। আর তার জন্য টাকা দিতেও এসেছি। তাই আমাকে হেলাফেলা করবেন না।

হিগিন্স [ভীষণ বিস্মিত হয়ে] :বাহ্!

[একটু হাঁপিয়ে উঠে]

তাহলে আমি এখন আপনাকে কী বলব বলে আশা করছেন?

ফুলওয়ালি :আপনি যদি সত্যিই ভদ্রলোক হতেন, তাহলে আগে আমাকে বসতে বলতেন। আমি কি আপনাকে বলিনি যে আমি আপনার কাছে কাজের কথাই বলতে এসেছি?

হিগিন্স :পিকারিং, বলুন তো—আমরা কি এই জিনিসটাকে বসতে বলব, নাকি সোজা জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দেব?

ফুলওয়ালি [ভয়ে ছুটে পিয়ানোর কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে, আতঙ্কে ঘুরে] :আ-আ-আ-আওও-ওও!

[অভিমানভরা কণ্ঠে]

আমি যখন যে-কোনো ভদ্রমহিলার মতোই দাম দিতে প্রস্তুত, তখন আমাকে “জিনিস” বলা চলবে না।

কিছুক্ষণ ঘর নিস্তব্ধ হয়ে থাকে। ঘরের অন্য প্রান্ত থেকে হিগিন্স ও পিকারিং বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে।

পিকারিং [নরম স্বরে] :আচ্ছা বলো তো, তুমি কী চাও?

ফুলওয়ালি :আমি আর টটেনহ্যাম কোর্ট রোডের মোড়ে দাঁড়িয়ে ফুল বিক্রি করতে চাই না। আমি একটা ফুলের দোকানে ভদ্রমহিলার মতো কাজ করতে চাই। কিন্তু আমি যদি ভদ্রভাবে কথা বলতে না পারি, তাহলে কেউ আমাকে নেবে না। উনি নিজেই বলেছিলেন যে উনি আমাকে শেখাতে পারবেন। তাই আমি এখানে কারও দয়া চাইতে আসিনি। আমি টাকা দিতে প্রস্তুত। অথচ উনি আমার সঙ্গে এমন ব্যবহার করছেন যেন আমি একটা আবর্জনা।

মিসেস পিয়ার্স :তুমি এত বোকা আর অজ্ঞ হলে কী করে? তোমার কী সত্যিই মনে হয়, মিস্টার হিগিন্সকে শেখানোর জন্য টাকা দেওয়ার ক্ষমতা তোমার আছে?

ফুলওয়ালি :কেন থাকবে না? আমি যেমন জানি শিক্ষার দাম কত, আপনিও তেমনই জানেন। আর আমি টাকা দিতে রাজি আছি।

হিগিন্স :কত দিতে পারবে?

ফুলওয়ালি [বিজয়ীর ভঙ্গিতে তার দিকে ঘুরে] :এই তো! এখন ঠিকমতো কথা বলছেন। আমি তো ভাবছিলাম, গত রাতে আমার দিকে যা ছুঁড়ে দিয়েছিলেন, তার কিছুটা ফেরত পাওয়ার আশাতেই আপনি এত উৎসাহী।

[চোখ টিপে প্রায় ফিসফিসিয়ে]

আপনি কিন্তু একটু নেশায় ছিলেন, তাই না?

হিগিন্স [কঠোর গলায়] :বসুন।

ফুলওয়ালি :ওহ্, যদি আপনি আমার কথা পছন্দ করে থাকেন—

হিগিন্স [হঠাৎ গর্জে উঠে] :বসো!

মিসেস পিয়ার্স [কঠিন স্বরে] :বসো, মেয়ে। যা বলা হচ্ছে তাই করো।

[তিনি হিগিন্স ও পিকারিংয়ের মাঝখানে, ফায়ারপ্লেসের কাছে গালিচার ওপর রাখা একটি চেয়ার টেনে আনেন এবং মেয়েটিকে বসার ইঙ্গিত করে তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকেন।]

ফুলওয়ালি :আ-আ-আ-ওও… উউ!

[সে আধা-বিরক্ত, আধা-বিস্মিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে।]

পিকারিং [অত্যন্ত ভদ্রভাবে] :আপনি কি বসবেন না?

লিজা [সঙ্কোচভরে] :বসলে কিছু মনে করবেন না তো?

[সে ধীরে বসে পড়ে। পিকারিং আবার ফায়ারপ্লেসের কাছে ফিরে যান।]

হিগিন্স :তোমার নাম কী?

ফুলওয়ালি :লিজা ডুলিটল।

হিগিন্স [গম্ভীর ভঙ্গিতে ছড়ার সুরে] :“এলাইজা, এলিজাবেথ, বেটসি আর বেস,

পাখির বাসা খুঁজতে গিয়েছিল বনদেশ—”

পিকারিং [সঙ্গে যোগ দিয়ে] :“ওরা পেল এক বাসা, তাতে চারটি ডিম—”

হিগিন্স :“প্রত্যেকে নিল একটা করে, তবু রইল তিন!”

[দুজনেই নিজেদের রসিকতায় হো হো করে হেসে ওঠে।]

লিজা :ওহ্, এসব বোকার মতো কথা বন্ধ করুন তো!

মিসেস পিয়ার্স :ভদ্রলোকদের সঙ্গে এভাবে কথা বলা উচিত নয় তোমার।

লিজা :তাহলে উনারাও আমার সঙ্গে একটু ভদ্রভাবে কথা বলুন না কেন?

হিগিন্স ঃ ঠিক আছে, এবার কাজের কথায় আসা যাক। এই পাঠগুলোর জন্য তুমি আমাকে কত দিতে চাও?

লিজা :ওহ্, আমি কিন্তু জানি কী ঠিক দাম। আমার এক বান্ধবী একজন আসল ফরাসি ভদ্রলোকের কাছে ঘণ্টায় আঠারো পেন্স দিয়ে ফরাসি শেখে। এখন, আপনি তো আমাকে আমার নিজের ভাষাই শেখাবেন। তাই ফরাসি শেখানোর মতো এত দাম আপনি চাইতে পারেন না। আমি এক শিলিংয়ের বেশি দেব না। নেবেন তো নিন, না হলে থাক।

হিগিন্স [ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে, পকেটের চাবি ও কয়েন ঝনঝন করতে করতে] :জানো পিকারিং, ব্যাপারটা কিন্তু এত সোজা নয়। যদি এই এক শিলিংকে শুধু এক শিলিং না ভেবে, মেয়েটার আয়ের অনুপাতে বিচার করো, তাহলে এটা একজন কোটিপতির ষাট-সত্তর গিনি দেওয়ার সমান।

পিকারিং :সে আবার কীভাবে?

হিগিন্স :হিসাব করো। একজন কোটিপতির দৈনিক আয় ধরো দেড়শো পাউন্ড। আর এই মেয়েটা দিনে আয় করে মোটে আড়াই শিলিং।

লিজা [আত্মসম্মানে আঘাত পেয়ে] :কে বলল আমি শুধু—

হিগিন্স [তাকে থামিয়ে] :তাহলে দেখো, সে আমাকে একটা পাঠের জন্য তার পুরো দিনের আয়ের প্রায় দুই-পঞ্চমাংশ দিতে চাইছে। একজন কোটিপতির ক্ষেত্রে সেই অনুপাত দাঁড়ায় প্রায় ষাট পাউন্ডের মতো।

[হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে]

দারুণ! একেবারে অসাধারণ! জীবনে এত বড় প্রস্তাব আমি কখনও পাইনি!

লিজা [আতঙ্কে উঠে দাঁড়িয়ে] :ষাট পাউন্ড! এ কী বলছেন আপনি? আমি তো আপনাকে কখনও ষাট পাউন্ড দিতে চাইনি! আমি এত টাকা কোথায় পাব?

হিগিন্স :চুপ করো!

লিজা [কেঁদে ফেলে] :কিন্তু সত্যিই আমার কাছে এত টাকা নেই… ওহ্—

মিসেস পিয়ার্স :কেঁদো না, বোকা মেয়ে। বসো। কেউ তোমার টাকা কেড়ে নেবে না।

হিগিন্স :আর যদি এই নাক সিঁটকানো কান্নাকাটি বন্ধ না করো, তাহলে কেউ তোমাকে ঝাঁটার ডান্ডা দিয়ে ঠেলে বের করে দেবে। বসো!

লিজা [ধীরে ধীরে বসতে বসতে, ফোঁপাতে ফোঁপাতে] :আ-আ-আ-আউ… উউ…

আপনাকে ঠিক আমার বাবার মতো মনে হচ্ছে।

হিগিন্স :আমি যদি তোমাকে শেখানোর দায়িত্ব নিই, তাহলে আমি তোমার দুই বাবার চেয়েও ভয়ঙ্কর হব।

[সে নিজের রেশমি রুমালটি এগিয়ে দেয়]

এই নাও।

লিজা :এটা আবার কীসের জন্য?

হিগিন্স :তোমার চোখ মুছতে কাজে লাগবে। আর মুখের যেখানেই জল বেরোয়, সেটা মুছতে। মনে রাখবে—ওটা হলো রুমাল, আর এটা হলো জামার হাতা। যদি সত্যিই ফুলের দোকানের ভদ্রমহিলা হতে চাও, তাহলে দুটোর ব্যবহার গুলিয়ে ফেলবে না।

লিজা সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। যেন সে বুঝতেই পারছে না, তাকে অপমান করা হচ্ছে নাকি শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে।

মিসেস পিয়ার্স :মিস্টার হিগিন্স, ওর সঙ্গে এভাবে কথা বলে কোনো লাভ নেই। ও আপনার কথা বুঝতেই পারছে না। আর আপনি অন্যায়ও করছেন—ও মোটেও ওভাবে হাতা দিয়ে নাক মোছে না।

[তিনি রুমালটি তুলে নিতে যান।]

লিজা [দ্রুত কেড়ে নিয়ে] :এই! ওটা আমাকে দিন। উনি এটা আমাকে দিয়েছেন, আপনাকে না।

পিকারিং [হেসে] :ঠিকই তো। যেহেতু হিগিন্স ওকে দিয়েছেন, এখন এটা ওরই সম্পত্তি।

মিসেস পিয়ার্স [অসহায় বিরক্তিতে] :আপনার এটাই প্রাপ্য, মিস্টার হিগিন্স।

পিকারিং :হিগিন্স, ব্যাপারটা কিন্তু সত্যিই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। রাষ্ট্রদূতের গার্ডেন পার্টির সেই পরিকল্পনার কথা কী বলছিলেন? আপনি যদি সত্যিই এই মেয়েটাকে সেখানে একজন ডাচেস বলে চালিয়ে দিতে পারেন, তাহলে আমি স্বীকার করব—আপনিই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক।

আমি বাজি ধরছি আপনি পারবেন না। আর পুরো পরীক্ষার খরচ আমিই দেব। ওর সব পড়াশোনার খরচও আমার।

লিজা :ওহ্, আপনি তো সত্যিই ভালো মানুষ! ধন্যবাদ, ক্যাপ্টেন!

হিগিন্স [লোভাতুর কৌতূহলে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে] :ব্যাপারটা সত্যিই প্রলোভনসঙ্কুল… কী আশ্চর্য রকম নিচুস্তরের উচ্চারণ! আর কী ভয়ঙ্কর অপরিষ্কার—

লাইজা [প্রচণ্ড অপমানে চিৎকার করে] :আহ্-আহ্-আহ্-আহ্-ওওও!

আমি নোংরা নই! এখানে আসার আগে আমি মুখ আর হাত ধুয়ে এসেছি—সত্যিই ধুয়েছি!

পিকারিং :হিগিন্স, শুধু তোষামোদ করে কিন্তু তুমি ওর মন জয় করতে পারবে না।

মিসেস পিয়ার্স [কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে] :ওভাবে বলবেন না, স্যার। একটা মেয়ের মন জয় করার অনেক পথ আছে। আর মিস্টার হিগিন্সের মতো সেটা আর কেউ পারে না—যদিও উনি সব সময় অন্তর থেকে তা বলেন কি না, সে নিয়ে সন্দেহ আছে। তবে আমি আশা করি, স্যার, আপনি মেয়েটাকে কোনো বোকামিতে উৎসাহ দেবেন না।

হিগিন্স [ভাবনাটা মাথায় আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতেই উত্তেজিত হয়ে] :জীবনটাই বা কী? কয়েকটা অনুপ্রাণিত বোকামির সমষ্টি ছাড়া আর কিছু নয়! আসল কৌশল হলো—কখন সেই বোকামি করতে হবে তা চিনে নেওয়া। সুযোগ কখনও হাতছাড়া করতে নেই; এমন সুযোগ বারবার আসে না।

[লিজার দিকে আঙুল তুলে]আমি এই লেজ-উঁচু রাস্তার মেয়েটাকে একেবারে ডাচেস বানিয়ে ছাড়ব!

লিজা [এই ধারণায় আতঙ্কিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে] :আহ্-আহ্-আহ্-আউ… উউ!

হিগিন্স [ক্রমশ উন্মত্ত উৎসাহে] :হ্যাঁ! ছয় মাস—না, তিন মাসই যথেষ্ট, যদি ওর কান ঠিকমতো সুর ধরতে পারে আর জিভটা দ্রুত চলে। আমি ওকে যে-কোনো জায়গায় নিয়ে গিয়ে যা খুশি তাই বলে চালিয়ে দিতে পারব।

আমরা আজ থেকেই শুরু করব। এখনই! এই মুহূর্তে!

[মিসেস পিয়ার্সকে উদ্দেশ্য করে]

ওকে নিয়ে যান আর পরিষ্কার করুন। অন্য কিছুতে কাজ না হলে মাঙ্কি ব্র্যান্ড সাবান দিয়ে ঘষে ময়লা তুলুন। রান্নাঘরে আগুন জ্বলছে তো?

মিসেস পিয়ার্স [প্রতিবাদ করতে গিয়ে] :জ্বলছে, কিন্তু—

হিগিন্স [গর্জে উঠে] :ওর সব জামাকাপড় খুলে পুড়িয়ে ফেলুন! হোয়াইটলি বা অন্য কোথাও ফোন করে নতুন কাপড় আনান। যতক্ষণ না আসে, ততক্ষণ ওকে বাদামি কাগজে জড়িয়ে রাখুন!

লিজা :আপনি কোনো ভদ্রলোক নন! এসব কথা বলার সাহস কী করে হয় আপনার? আমি একটা সম্মানিত মেয়ে—আর আমি আপনার মতো লোকদের খুব ভালো করেই চিনি!

হিগিন্স :এখানে তোমার লিসন গ্রোভের ভণ্ডামি চলবে না, যুবতী। তোমাকে ডাচেসের মতো ব্যবহার করতে শিখতে হবে।

[মিসেস পিয়ার্সকে]

ওকে নিয়ে যান। বেশি ঝামেলা করলে মেরে ফেলবেন!

লাইজা [ভয়ে ছুটে পিকারিং ও মিসেস পিয়ার্সের মাঝখানে আশ্রয় নিয়ে] :না! আমি পুলিশ ডাকব! আমি সত্যিই ডাকব!

মিসেস পিয়ার্স :কিন্তু ওকে রাখার মতো কোনো ঘর তো আমার কাছে নেই।

হিগিন্স :তাহলে ময়লার ঝুড়িতেই ফেলে রাখুন!

লাইজা :আ-আ-আ-আ-ওওও!

পিকারিং :আরে হিগিন্স! একটু যুক্তিবাদী হও।

মিসেস পিয়ার্স [দৃঢ় কণ্ঠে] :আপনাকে সত্যিই একটু যুক্তি দিয়ে চলতে হবে, মিস্টার হিগিন্স। আপনি সবসময় এভাবে ঝড়ের মতো সবাইকে চাপা দিয়ে চলতে পারেন না।

এই ধমকে হিগিন্স কিছুটা শান্ত হয়ে আসে। যেন প্রবল ঝড় বয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ এক কোমল, প্রশান্ত বাতাস ঘরজুড়ে নেমে আসে।

হিগিন্স [হঠাৎ সম্পূর্ণ বদলে গিয়ে, অত্যন্ত মার্জিত ও পেশাদার ভঙ্গিতে] :আমি কি সত্যিই কারও উপর দিয়ে চলেছি? আমার প্রিয় মিসেস পিয়ার্স, আমার প্রিয় পিকারিং—আমি তো কাউকে আঘাত করার কথা ভাবতেই পারি না। আমি শুধু বলতে চেয়েছি, আমাদের এই অসহায় মেয়েটির প্রতি একটু সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত। জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের জন্য তাকে প্রস্তুত করা, তাকে উপযুক্ত করে তোলা—এটাই তো আমাদের কর্তব্য। যদি আমি আমার কথা ঠিকভাবে প্রকাশ করতে না পেরে থাকি, তার কারণ একটাই—আমি ওর বা আপনাদের কোমল অনুভূতিতে আঘাত দিতে চাইনি।

হিগিন্সের এই নাটকীয় পরিবর্তনে লাইজা কিছুটা আশ্বস্ত হয় এবং ধীরে ধীরে আবার নিজের চেয়ারে ফিরে বসে।

মিসেস পিয়ার্স [পিকারিংয়ের দিকে তাকিয়ে] :বলুন তো স্যার, এমন মানুষ আপনি কখনও দেখেছেন?

পিকারিং [হাসতে হাসতে] :না, মিসেস পিয়ার্স—কখনও না!

হিগিন্স [অবাক হয়ে] :এবার আবার কী হলো?

মিসেস পিয়ার্স :ব্যাপার হলো, স্যার, আপনি যেন সৈকত থেকে একটা নুড়ি কুড়িয়ে আনার মতো করে একটা মেয়েকে তুলে আনতে পারেন না।

হিগিন্স :কেন পারব না?

মিসেস পিয়ার্স :কেন নয়! আপনি তো ওর সম্পর্কে কিছুই জানেন না। ওর পরিবার আছে কি না, বাবা-মা কে, সে বিবাহিত কি না—কিছুই জানেন না।

হিগিন্স :ওহ্, এ তো চমৎকার কথা!

[লাইজার দিকে তাকিয়ে]

মেয়েটা নিজেই যেমন বলে—“ “Nonsense!” বিবাহিত! তুমি কি জানো না, ওই শ্রেণির একজন নারী বিয়ের এক বছরের মধ্যেই এমন জীর্ণ হয়ে যায় যে তাকে পঞ্চাশ বছরের ক্লান্ত শ্রমিকের মতো দেখায়?

লিজা :আমাকে আবার কে বিয়ে করবে?

হিগিন্স [হঠাৎ এক নাটকীয় কোমল স্বরে, যেন মঞ্চে বক্তৃতা দিচ্ছেন] :হে ঈশ্বর, লিজা! আমার কাজ শেষ হওয়ার আগেই তোমার প্রেমে পড়ে কত পুরুষ যে গুলি করে আত্মহত্যা করবে, তাতে রাস্তাঘাট ভরে যাবে!

মিসেস পিয়ার্স :এসব একেবারে বাজে কথা, স্যার। আপনি ওর সঙ্গে এভাবে কথা বলতে পারেন না।

লাইজা [হঠাৎ দৃঢ়ভাবে উঠে দাঁড়িয়ে] :আমি চলে যাচ্ছি। লোকটার মাথা খারাপ! আমি কোনো পাগলের কাছে শিখতে চাই না।

হিগিন্স [নিজের নাটকীয় বাগ্মিতা যে মেয়েটির উপর কোনো প্রভাব ফেলল না, তাতে গভীরভাবে আহত হয়ে] :ওহ্, তাই নাকি! আমি পাগল?

বেশ, মিসেস পিয়ার্স—ওর জন্য নতুন জামাকাপড়ের আর দরকার নেই। ওকে বের করে দিন।

লিজা [পিছু হটে, আতঙ্কে ফিসফিস করে] :না-আহ… আমাকে ছোঁয়ার কোনো অধিকার আপনার নেই।

মিসেস পিয়ার্স ঃদেখলে তো, বেয়াদবি করলে কী হয়?

[দরজার দিকে ইঙ্গিত করে]

এই দিকে আসো।

লাইজা :ধ্যাৎ!

লাইজা [প্রায় কান্নায় ভেঙে পড়ে] :আমার কোনো নতুন জামাকাপড় লাগবে না। আমি ওগুলো নিতামই না!

[সে রুমালটা ছুঁড়ে ফেলে দেয়]

নিজের জামাকাপড় আমি নিজেই কিনতে পারি।

হিগিন্স [চতুরভাবে রুমালটা তুলে নিয়ে, দরজার দিকে যেতে থাকা লাইজাকে থামিয়ে] :

তুই একেবারে অকৃতজ্ঞ মেয়ে। তোকে নর্দমা থেকে তুলে এনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে একজন ভদ্রমহিলা বানাতে চাইছি, আর এটাই তার প্রতিদান!

মিসেস পিয়ার্স :থামুন, মিস্টার হিগিন্স। আমি এসব হতে দেব না। আসলে দোষ আপনারই।

[লিজার দিকে]

বাড়ি ফিরে যাও, মেয়ে। তোমার বাবা-মাকে বলো, তারা যেন তোমার একটু ভালোভাবে যত্ন নেয়।

লিজা :আমার কোনো বাবা-মা নেই। তারা বলেছিল আমি নিজের রোজগার করার মতো বড় হয়ে গেছি, তারপর বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।

মিসেস পিয়ার্স :তোমার মা কোথায়?

লিজা :আমার মা নেই। যে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল, সে ছিল আমার ষষ্ঠ সৎমা। কিন্তু আমি তাদের ছাড়াও বাঁচতে পারি। আর আমি একটা ভালো মেয়ে—সত্যিই ভালো।

হিগিন্স :তাহলে এত হাঙ্গামার কী আছে? মেয়েটা তো কারও কোনো কাজে লাগবে না—আমাকে ছাড়া।

[সে মিসেস পিয়ার্সের দিকে এগিয়ে গিয়ে মিষ্টি গলায়]

আপনি ওকে দত্তকও নিতে পারেন, মিসেস পিয়ার্স। একটা মেয়ে থাকলে আপনার বেশ মজাই লাগবে, আমি নিশ্চিত। এখন আর ঝামেলা করবেন না। ওকে নিচে নিয়ে যান, আর—

মিসেস পিয়ার্স :কিন্তু ওর ভবিষ্যৎ কী হবে? ওকে কি কোনো টাকা দেওয়া হবে? একটু ভেবে দেখুন, স্যার।

হিগিন্স :ওহ্, যা দরকার দিন না। সংসার খরচের খাতায় লিখে রাখবেন।

[অস্থির ভঙ্গিতে]

টাকা দিয়ে ও কী করবে? ওর খাওয়া-দাওয়া আর জামাকাপড় তো থাকছেই। টাকা পেলেই বরং মদ খেতে শুরু করবে।

লিজা [ক্ষুব্ধ হয়ে তার দিকে ফিরে] :ওহ্, আপনি একটা পশু! এটা একেবারে মিথ্যে কথা। কেউ কোনোদিন বলতে পারবে না যে আমি মদ খাই।

[সে আবার নিজের চেয়ারে ফিরে গিয়ে জেদী ভঙ্গিতে বসে পড়ে।]

পিকারিং [হাসতে হাসতে, তবু মৃদু ভর্ৎসনার সুরে] :হিগিন্স, তোমার কি কখনও মনে হয় না যে এই মেয়েটারও অনুভূতি আছে?

হিগিন্স [লিজার দিকে সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে] :ওহ্ না, আমার তো তা মনে হয় না। অন্তত এমন কোনো অনুভূতি নেই, যা নিয়ে আমাদের খুব মাথা ঘামাতে হবে।

[হেসে লিজার দিকে]

তাই তো, লিজা?

লিজা :

আমারও অনুভূতি আছে—আর সবার মতোই আছে।

হিগিন্স [পিকারিংয়ের দিকে ফিরে, চিন্তিত স্বরে] :

সমস্যাটা দেখতে পাচ্ছ?

পিকারিং :

কোন সমস্যা?

হিগিন্স : ওকে দিয়ে ব্যাকরণের কথা বলানোর জন্য। শুধু উচ্চারণ শেখালেই তো হবে না।

লিজা : আমি ব্যাকরণ নিয়ে কথা বলতে চাই না। আমি একজন ভদ্রমহিলার মতো কথা বলতে চাই।

মিসেস পিয়ার্স : দয়া করে আসল কথায় আসুন, মিস্টার হিগিন্স। আমি জানতে চাই, মেয়েটি এখানে কোন শর্তে থাকবে। সে কি কোনো মজুরি পাবে? আর আপনার শিক্ষা শেষ হলে তার ভবিষ্যৎ কী হবে? আপনাকে একটু ভবিষ্যতের কথাও ভাবতে হবে।

হিগিন্স [অস্থিরভাবে] : আমি যদি ওকে আবার নর্দমায় ফেলে দিই, তাহলে ওর কী হবে—সেটাই বলুন, মিসেস পিয়ার্স।

মিসেস পিয়ার্স : সেটা ওর নিজের ব্যাপার, আপনার নয়, মিস্টার হিগিন্স।

হিগিন্স : বেশ, আমার কাজ শেষ হলে আমরা ওকে আবার নর্দমায় ফিরিয়ে দিতে পারি। তখন সেটা আবার ওর নিজের ব্যাপার হয়ে যাবে। সুতরাং এতে কোনো সমস্যা নেই।

লিজা : আহ্! তোমার মধ্যে কোনো অনুভূতি নেই। তুমি নিজেকে ছাড়া আর কারও কথা ভাবো না। [সে উঠে দাঁড়ায় এবং দৃঢ় কণ্ঠে বলে] আর না, আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আমি চলে যাচ্ছি। [দরজার দিকে এগিয়ে যায়] সত্যিই, তোমার লজ্জা হওয়া উচিত।

হিগিন্স [পিয়ানোর ওপর থেকে একটি চকোলেট ক্রিম তুলে নিয়ে, চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক নিয়ে] : এই নাও, লিজা, একটু চকোলেট খাও।

লিজা [থেমে, কিছুটা প্রলুব্ধ হয়ে] : আমি কী করে জানব এর মধ্যে কী আছে? শুনেছি তোমাদের মতো লোকেরা মেয়েদের মাদক খাইয়ে দেয়।

[হিগিন্স পকেট থেকে ছুরি বের করে চকোলেটটি দু’ভাগ করে। এক ভাগ নিজে খেয়ে ফেলে এবং অন্য অংশটি লাইজার দিকে বাড়িয়ে দেয়।]

হিগিন্স : বিশ্বাস করো, লিজা। আমি এক ভাগ খেলাম, তুমি আর এক ভাগ খাও।

[লিজাকিছু বলতে যায়, কিন্তু হিগিন্স চকোলেটের টুকরোটি তার মুখে ঢুকিয়ে দেয়।]

হিগিন্স : তুমি প্রতিদিন বাক্সে বাক্সে, ব্যারেলে ব্যারেলে চকোলেট পাবে। এগুলো খেয়েই দিব্যি বেঁচে থাকবে। কেমন?

লিজা [চকোলেট গলায় আটকে প্রায় দমবন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেটি ফেলে দিয়ে] : আমি এটা খেতাম না। কিন্তু আমি এতটাই ভদ্র যে মুখ থেকে বের করে ফেলতেও পারলাম না।

হিগিন্স : শোনো, লিজা। আমার মনে হয় তুমি বলেছিলে, তুমি ট্যাক্সিতে করে এসেছ?

লিজা : তাতে কী হয়েছে? ট্যাক্সিতে চড়ার অধিকার আমারও আছে, যেমন অন্য সবার আছে।

হিগিন্স : অবশ্যই আছে, লিজা। আর ভবিষ্যতে তুমি যত খুশি ট্যাক্সিতে চড়তে পারবে। প্রতিদিন শহরের এদিক-ওদিক ট্যাক্সিতে ঘুরে বেড়াবে। ভাবো তো, কী দারুণ জীবন হবে!

মিসেস পিয়ার্স : মিস্টার হিগিন্স, আপনি মেয়েটিকে নানা লোভ দেখিয়ে প্রলুব্ধ করছেন। এটা মোটেই ঠিক নয়। ওর ভবিষ্যতের কথাও তো ভাবতে হবে।

হিগিন্স : এই বয়সে ভবিষ্যৎ! আহা, কী হাস্যকর কথা! ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার সময় তখনই আসে, যখন মানুষের সামনে আর কোনো ভবিষ্যৎই অবশিষ্ট থাকে না। না, লিজা, তুমি বরং ভদ্রমহিলাদের মতো আচরণ শেখো—নিজের ভবিষ্যতের কথা নয়, অন্যের ভবিষ্যতের কথা ভাবো। আর জীবন মানেই হলো চকোলেট, ট্যাক্সি, সোনা আর হীরের স্বপ্ন দেখা।

লিজা : না, আমি সোনা-হীরা কিছুই চাই না। আমি সৎ ও ভালো মেয়ে হিসেবেই থাকতে চাই।

[সে আবার বসে পড়ে, নিজেকে সংযত ও মর্যাদাবান দেখানোর চেষ্টা করে।]

হিগিন্স : লিজা তুমি মিসেস পিয়ার্সের তত্ত্বাবধানে যথেষ্ট ভালোই থাকবে। তারপর একদিন তোমার বিয়ে হবে সেনাবাহিনীর এক সুদর্শন অফিসারের সঙ্গে—যার থাকবে রাজকীয় গোঁফ। সে হবে কোনো অভিজাত পরিবারের সন্তান। তোমাকে বিয়ে করার জন্য তার পরিবার প্রথমে তাকে ত্যাগ করবে, কিন্তু পরে তোমার সৌন্দর্য আর সরলতায় মুগ্ধ হয়ে সবাই তোমাকে মেনে নেবে।

পিকারিং : মাফ করবেন, হিগিন্স, কিন্তু এবার সত্যিই আমাকে কথা বলতে হচ্ছে। মিসেস পিয়ার্স একদম ঠিক বলেছেন। এই মেয়েটি যদি ছয় মাসের জন্য নিজেকে আপনার হাতে তুলে দেয়, তবে সে কী করতে যাচ্ছে, তা স্পষ্টভাবে বোঝার অধিকার তার আছে।

হিগিন্স : সে আবার কী বুঝবে? ও তো কিছুই বোঝে না! আর সত্যি বলতে কী, আমরা নিজেরাই কি সবকিছু বুঝে করি? মানুষ যদি সব কাজের ফল আগে বুঝতে পারত, তবে হয়তো কোনো কাজই করত না।

পিকারিং : খুব চতুর কথা, হিগিন্স, কিন্তু তাতে বাস্তববোধের অভাব আছে।

[লিজার দিকে তাকিয়ে]

মিস ডুলিটল—

লিজা [অপ্রস্তুত ও অভিভূত হয়ে] : আহ্… আহ্… আউ…!

হিগিন্স : দেখলেন তো! লিজার মুখ থেকে এইটুকুই বের করা যায়—‘আহ্… আহ্… আউ…!’ ওকে যুক্তি বোঝানোর কোনো মানে নেই। আপনি একজন সামরিক অফিসার; নিশ্চয়ই জানেন, এদের আদেশ দিতে হয়, ব্যাখ্যা নয়।

[এবার হিগিন্স লিজার দিকে ঘুরে যেন তাকে নির্দেশ দিচ্ছেন।]

লিজা, আগামী ছয় মাস তোমাকে এখানেই থাকতে হবে। শিখতে হবে কীভাবে ফুল বিক্রেতা মেয়ের মতো নয়, বরং এক ভদ্রমহিলার মতো কথা বলতে হয়। যদি তুমি ভদ্র মেয়ের মতো আচরণ করো এবং যা বলা হবে তা মেনে চলো, তবে তুমি সুন্দর ঘরে থাকতে পারবে, ভালো খাবার পাবে, চকোলেট খেতে পারবে, ট্যাক্সিতে চড়তে পারবে।

কিন্তু যদি অলসতা করো বা অবাধ্য হও, তবে তোমাকে রান্নাঘরের পেছনের অন্ধকার কোণে ঘুমাতে হবে—যেখানে কালো পোকামাকড় ঘোরাফেরা করে। আর মিসেস পিয়ার্স তোমাকে ঝাঁটার ডান্ডা দিয়ে শাসন করবেন।

ছয় মাস পরে তোমাকে সুন্দর পোশাক পরিয়ে গাড়িতে করে বাকিংহাম প্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে যদি রাজা বুঝতে পারেন যে তুমি প্রকৃত ভদ্রমহিলা নও, তবে পুলিশ তোমাকে ধরে নিয়ে যাবে টাওয়ার অফ লন্ডনে, আর অন্য ফুলওয়ালিদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য তোমার শাস্তি হবে ভয়ংকর।আর যদি কেউ তোমার আসল পরিচয় ধরতে না পারে, তবে তুমি ভদ্রমহিলার মর্যাদায় নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ পাবে—নিজের একটি দোকান খোলার জন্য কিছু টাকাও দেওয়া হবে।কিন্তু যদি তুমি এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দাও, তবে তুমি হবে এক অকৃতজ্ঞ ও অবাধ্য মেয়ে—আর স্বর্গের দেবদূতারাও তোমার জন্য দুঃখ করবেন।

[পিকারিং-এর দিকে ফিরে]

এখন বলুন তো, পিকারিং—এবার কি আপনি সন্তুষ্ট?

[মিসেস পিয়ার্সের দিকে তাকিয়ে]

আমি কি এর চেয়ে আরও পরিষ্কার ও ন্যায্যভাবে ব্যাপারটা বোঝাতে পারতাম, মিসেস পিয়ার্স?

মিসেস পিয়ার্স [ধৈর্য সহকারে] : আমার মনে হয়, এবার আমাকে বলতে দিন।

মিসেস পিয়ার্স : মেয়েটির সঙ্গে একান্তে শান্তভাবে কথা বলুন। আমি সত্যিই জানি না, আমি ওর দায়িত্ব নিতে পারব কি না কিংবা এই ব্যবস্থায় সম্মতি দেওয়া উচিত কি না। আমি জানি, আপনি ইচ্ছে করে ওর কোনো ক্ষতি করতে চান না। কিন্তু আপনি যখন মানুষের উচ্চারণ আর ভাষা নিয়ে নিজের অদ্ভুত আগ্রহে মেতে ওঠেন, তখন সেই মানুষগুলোর কী হতে পারে—অথবা আপনার নিজের কী হতে পারে—সেসব নিয়ে আপনি ভাবেনও না, পরোয়াও করেন না।

এসো, লিজা।

হিগিন্স : আচ্ছা, ঠিক আছে। ধন্যবাদ, মিসেস পিয়ার্স। ওকে আগে বাথরুমে নিয়ে যান।

লিজা [সন্দেহ আর অনিচ্ছা নিয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়] : আপনি একটা আস্ত গুণ্ডা। আমার ভালো না লাগলে আমি এখানে এক মুহূর্তও থাকব না। কাউকে আমাকে মারধর করতে দেব না। আমি কখনো বাকিংহাম প্যালেসে যেতে চাইনি—একদমই না। আর পুলিশের সঙ্গে আমার জীবনে কখনো কোনো ঝামেলা হয়নি। আমি একটা ভালো মেয়ে।

মিসেস পিয়ার্স : এত তর্ক কোরো না, মেয়ে। তুমি ভদ্রলোককে ঠিক বুঝতে পারছ না। আমার সঙ্গে এসো।

[তিনি দরজার কাছে গিয়ে এলিজার জন্য দরজা খুলে ধরেন।]

লিজা [বেরিয়ে যেতে যেতে একনাগাড়ে বলতে থাকে] : আমি যা বলছি, ঠিকই বলছি। আমার মাথা কেটে ফেললেও আমি রাজার কাছে যাব না। যদি জানতাম কী বিপদে জড়াতে যাচ্ছি, তাহলে কখনো এখানে আসতাম না। আমি সারাজীবন ভালো মেয়েই ছিলাম। আমি তো ওঁকে একটা কথাও বলতে চাইনি। তাঁর কাছে আমার কোনো ঋণও নেই। এসবের কিছুই আমি পরোয়া করি না। কেউ আমাকে ঠকাতে পারবে না। আর আমারও অনুভূতি আছে—সবার মতোই আছে—

[মিসেস পিয়ার্স দরজাটি বন্ধ করে দেন। এলিজার কণ্ঠস্বর ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়।]

[পিকারিং আগুনের চুল্লির পাশ থেকে উঠে একটি চেয়ারের কাছে আসেন। চেয়ারের পেছনে দুই হাত রেখে, পা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে তিনি হিগিন্সের দিকে তাকান।]

পিকারিং : সরাসরি প্রশ্ন করছি বলে ক্ষমা চাইছি, হিগিন্স। নারীদের ব্যাপারে আপনার চরিত্র কি সত্যিই ভালো?

হিগিন্স [বিরক্ত ভঙ্গিতে] : নারীদের ব্যাপারে “ভালো চরিত্রের” কোনো পুরুষকে কি আপনি কখনো দেখেছেন?

পিকারিং : হ্যাঁ, দেখেছি। প্রায়ই দেখেছি।

হিগিন্স [একগুঁয়ে ভঙ্গিতে পিয়ানোর উপর উঠে বসে] : আমি কিন্তু দেখিনি। আমার অভিজ্ঞতা বলছে, যেই মুহূর্তে কোনো মহিলাকে আমি বন্ধুত্বের জায়গা দিই, তখনই সে ঈর্ষাকাতর, খুঁতখুঁতে, সন্দেহপ্রবণ আর অসহ্য হয়ে ওঠে। আর যেই মুহূর্তে আমি কোনো মহিলার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হই, আমিও স্বার্থপর আর কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে পড়ি।

মহিলারা মানুষের জীবনটাকেই ওলটপালট করে দেয়। আপনি যখন তাঁদের নিজের জীবনে ঢুকতে দেন, তখন দেখবেন—তিনি একদিকে টানছেন, আর আপনি আরেকদিকে।

পিকারিং : যেমন? কোন দিকে?

হিগিন্স [অস্থির ভঙ্গিতে পিয়ানো থেকে নেমে হাঁটাহাঁটি করতে করতে] : ওহ, সেটা ঈশ্বরই জানেন! আমার মনে হয়, প্রত্যেক মানুষই নিজের মতো করে বাঁচতে চায়। মহিলারা নিজেদের জীবন যাপন করতে চান, পুরুষরাও তাই। কিন্তু বিপদটা হয় তখনই, যখন দু’জনেই একে অপরকে নিজের পথে টেনে আনতে চায়। একজন যেতে চায় উত্তরে, আর অন্যজন দক্ষিণে। তখন পথ আলাদা হয়ে যায়, মনও আলাদা হয়ে যায়।

হিগিন্স : আর তার ফল কী জানেন? শেষ পর্যন্ত দু’জনকেই এমন এক পথে চলতে হয়, যেটা দু’জনেরই অপছন্দ। যেন দু’জনেই পূর্ব দিকের বাতাসকে ঘৃণা করে, অথচ ভাগ্যের চাপে পূর্ব দিকেই হাঁটতে বাধ্য হয়।

[তিনি গিয়ে পিয়ানোর বেঞ্চে বসেন।]

তাই দেখছেন, আমি আজও এক চিরকালের অবিবাহিত মানুষ। আর সম্ভবত জীবনভর তাই-ই থেকে যাব।

পিকারিং [গম্ভীরভাবে উঠে দাঁড়িয়ে] : আরে হিগিন্স, তুমি তো বুঝতেই পারছ আমি কী বলতে চাইছি। যদি আমাকে এই পুরো ব্যাপারের সঙ্গে জড়িত থাকতে হয়, তাহলে ওই মেয়েটার প্রতি আমিও নিজেকে দায়ী মনে করব। আমি শুধু নিশ্চিত হতে চাই যে, তার অসহায় অবস্থার কোনো সুযোগ নেওয়া হবে না।

হিগিন্স : কী বলছেন! ওই মেয়েটার ব্যাপারে! না না, নিশ্চিন্ত থাকুন।

[তিনি উঠে দাঁড়িয়ে ব্যাখ্যা করতে শুরু করেন।]

দেখুন, সে এখানে একজন ছাত্রী হিসেবেই থাকবে। আর ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক পবিত্র না হলে শিক্ষা দেওয়াই অসম্ভব। আমি বহু ধনী আমেরিকান মহিলাকে ইংরেজি উচ্চারণ শিখিয়েছি—যাঁরা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারীদের মধ্যে পড়েন। কিন্তু আমার কাছে তারা যেন কাঠের পুতুলের মতোই। আমিও যেন একটা কাঠের ব্লক। এসব ব্যাপারে আমার মনে কোনো আবেগই জাগে না।

[এসময় মিসেস পিয়ার্স দরজা খুলে ভেতরে আসেন। তাঁর হাতে লিজার পুরোনো টুপিটি। পিকারিং চুপচাপ গিয়ে আগুনের পাশের আরামকেদারায় বসেন।]

হিগিন্স [উৎসাহভরে] : এই তো, মিসেস পিয়ার্স! সব ঠিকঠাক তো?

মিসেস পিয়ার্স [দরজার কাছে দাঁড়িয়ে] : মিস্টার হিগিন্স, যদি অনুমতি দেন, আমি আপনাকে একটা কথা বলতে চাই।

হিগিন্স : অবশ্যই, অবশ্যই। ভেতরে আসুন।

[তিনি এগিয়ে আসেন।]

ওটা কিন্তু পুড়িয়ে ফেলবেন না, মিসেস পিয়ার্স। কৌতূহলের জিনিস হিসেবে আমি ওটা রেখে দিতে চাই।

[তিনি টুপিটা হাতে নেন।]

মিসেস পিয়ার্স : সাবধানে ধরবেন, স্যার। মেয়েটিকে আমাকে কথা দিতে হয়েছে যে টুপিটা আমি পোড়াব না। তবে সত্যি বলতে কী, ওটা কিছুক্ষণ ওভেনে রাখাই ভালো—অবস্থাটা খুবই শোচনীয়।

হিগিন্স [তাড়াতাড়ি টুপিটা পিয়ানোর ওপর রেখে] : ওহ্! ধন্যবাদ। আচ্ছা, আপনি কী বলতে চাইছিলেন?

পিকারিং : আমি কি কোনো অসুবিধা করছি?

মিসেস পিয়ার্স : না স্যার, মোটেই না।

[হিগিন্সের দিকে তাকিয়ে]

মিস্টার হিগিন্স, আমি শুধু অনুরোধ করব—মেয়েটির সামনে আপনি কী বলছেন, সে ব্যাপারে একটু সতর্ক থাকুন।

হিগিন্স [কিছুটা কঠোর সুরে] : নিশ্চয়ই! আমি তো সবসময়ই খুব সতর্কভাবে কথা বলি। কিন্তু আপনি আমাকে এ কথা বলছেন কেন?

মিসেস পিয়ার্স [শান্ত ও স্থিরভাবে] : না স্যার, সবসময় তা নয়। আপনি যখন কিছু হারিয়ে ফেলেন, বা একটু রেগে যান, তখন আপনার মুখের ভাষা আর ভদ্র থাকে না।

আমার সামনে এসব কোনো ব্যাপার নয়—আমি তো বহুদিন ধরে অভ্যস্ত। কিন্তু ওই মেয়েটির সামনে আপনার এমন ভাষা ব্যবহার করা একেবারেই উচিত হবে না।

হিগিন্স [অসন্তুষ্ট ও বিস্মিত হয়ে] : কী আশ্চর্য কথা! আমি তো কখনো গালিগালাজ করি না! বরং এই অভ্যাসটা আমি ভীষণ অপছন্দ করি। আপনি আসলে কী বোঝাতে চাইছেন?

মিসেস পিয়ার্স [সম্পূর্ণ নির্বিকারভাবে] : আমি ঠিক সেটাই বোঝাতে চাইছি, স্যার—আপনি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি গালাগালি করেন। আপনার তিরস্কার বা কটু কথা আমার গায়ে লাগে না, কারণ আমি সেসব শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।

মিসেস পিয়ার্স : “ব্লাডি”, “হোয়াট দ্য ডেভিল”, “হোয়ার দ্য ডেভিল”, “হু দ্য ডেভিল”—এই ধরনের কথাগুলোই বলছি, স্যার।

হিগিন্স : কী আশ্চর্য! মিসেস পিয়ার্স, আপনার মুখে এই ভাষা মানায়?

মিসেস পিয়ার্স [শান্ত কিন্তু দৃঢ় স্বরে] : আমি নিজে এসব বলতে চাই না, স্যার। কিন্তু একটা বিশেষ শব্দ আছে, যেটা আমি অনুরোধ করব আপনি যেন আর ব্যবহার না করেন। মেয়েটি একটু আগে নিজেই শব্দটা বলেছে—কারণ বাথটাবের জল খুব গরম ছিল। শব্দটা “বাথ” শব্দের মতো একই অক্ষর দিয়ে শুরু হয়।

সে তো এর চেয়ে ভালো কিছু জানে না। ছোটবেলা থেকে তার মায়ের মুখেই এই ভাষা শুনে এসেছে। কিন্তু অন্তত আপনার মুখ থেকে যেন সে এই শব্দ না শেখে।

হিগিন্স [গর্বভরে] : মিসেস পিয়ার্স, আমি কখনো ওই শব্দ ব্যবহার করেছি—এমন অভিযোগে নিজেকে দোষী বলতে পারি না।

[মিসেস পিয়ার্স স্থির চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকেন। হিগিন্স একটু অস্বস্তি ঢাকতে বিচারকের মতো গম্ভীর ভঙ্গি করে যোগ করেন]

অবশ্য খুব চরম এবং যুক্তিসঙ্গত উত্তেজনার মুহূর্ত বাদ দিলে।

মিসেস পিয়ার্স : আজ সকালেই তো, স্যার, আপনি আপনার বুট, মাখন আর ব্রাউন ব্রেড—সবকিছুর সঙ্গে সেই শব্দ জুড়ে দিয়েছিলেন।

হিগিন্স : ওহ্, তাই নাকি! ওটা তো নিছক শব্দের অনুপ্রাস মাত্র, মিসেস পিয়ার্স। একজন কবির পক্ষে এমনটা স্বাভাবিক।

মিসেস পিয়ার্স : আপনি যাই বলুন না কেন, স্যার, আমি শুধু চাই মেয়েটি যেন আবার ওই ভাষা না শেখে।

হিগিন্স : আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে। আর কিছু?

মিসেস পিয়ার্স : জি স্যার, আরও আছে। এই মেয়েটির ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা আর অভ্যাসের ব্যাপারে আমাদের খুব কঠোর হতে হবে।

হিগিন্স : অবশ্যই। একদম ঠিক কথা। ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

মিসেস পিয়ার্স : আমি বলতে চাইছি, ও যেন নোংরা কাপড় পরে না থাকে, কিংবা জিনিসপত্র এদিক-ওদিক ছড়িয়ে না রাখে।

হিগিন্স [গম্ভীর ভঙ্গিতে তাঁর দিকে এগিয়ে এসে] : ঠিক তাই! আমিও তো সেই কথাই বলতে চাইছিলাম।

[তিনি পিকারিংয়ের দিকে ঘুরে দাঁড়ান, যিনি পুরো কথোপকথনটা বেশ উপভোগ করছিলেন।]

দেখছেন তো, পিকারিং—এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলোই আসল। “পয়সার যত্ন নিলে পাউন্ডের যত্ন আপনাআপনিই হয়ে যায়”—এই প্রবাদ শুধু টাকার জন্য নয়, মানুষের ব্যক্তিগত অভ্যাসের ক্ষেত্রেও একেবারে সত্যি।

[তিনি এমন ভঙ্গিতে চুল্লির সামনে দাঁড়ান যেন সব যুক্তিতেই তিনি জয়ী।]

মিসেস পিয়ার্স : ঠিক আছে স্যার। তাহলে আপনাকেও একটা অনুরোধ করি—আপনি যেন ড্রেসিং-গাউন পরে প্রাতরাশের টেবিলে না আসেন। আর অন্তত ওটাকে ন্যাপকিনের মতো ব্যবহার না করেন।আর যদি দয়া করে একই প্লেটে সব রকম খাবার একসঙ্গে না খান, এবং হাতের পোরিজের সসপ্যানটা পরিষ্কার টেবিলক্লথের ওপর না রাখেন, তাহলে মেয়েটার সামনে সেটা একটা ভালো উদাহরণ হবে।আপনি তো জানেন, গত সপ্তাহেই জ্যামের মধ্যে থাকা মাছের কাঁটায় আপনার প্রায় দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল।

হিগিন্স [চুল্লির সামনে থেকে সরে আবার পিয়ানোর দিকে যেতে যেতে] : আমি হয়তো কখনো কখনো অন্যমনস্ক হয়ে এসব করে ফেলি… কিন্তু সেগুলো তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়।

হিগিন্স : কিন্তু আমি তো এসব ইচ্ছে করে করি না, অভ্যাসবশতও নয়।

[হঠাৎ বিরক্ত হয়ে ওঠেন।]

যাই হোক, আমার ড্রেসিং-গাউনটা থেকে বেনজিনের এমন জঘন্য গন্ধ বেরোচ্ছে যে সহ্যই হয় না।

মিসেস পিয়ার্স : নিশ্চয়ই গন্ধ বেরোচ্ছে, মিস্টার হিগিন্স। কিন্তু আপনি যদি অন্তত হাত মুছতে একটু সতর্ক হতেন—

হিগিন্স [অধৈর্য হয়ে চিৎকার করে] : ওহ্ আচ্ছা আচ্ছা! ভবিষ্যতে তবে হাত চুলেই মুছে নেব!

মিসেস পিয়ার্স : আশা করি আপনি কিছু মনে করেননি, স্যার।

হিগিন্স [নিজের ভেতর এমন অস্বস্তি অনুভব করে যেন নিজেই বিস্মিত] : না না, মোটেই না। আপনি ঠিকই বলেছেন, মিসেস পিয়ার্স। মেয়েটির সামনে আমাকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। আর কিছু বলার আছে?

মিসেস পিয়ার্স : ঠিক আছে স্যার। আপনি বিদেশ থেকে যে জাপানি পোশাকগুলো এনেছেন, সেগুলোর কিছু কি মেয়েটিকে দেওয়া যায়? সত্যি বলতে কী, ওর পুরোনো কাপড় আর পরানো সম্ভব নয়।

হিগিন্স : অবশ্যই। আপনার যা ভালো মনে হয় করুন। আর কিছু?

মিসেস পিয়ার্স : না স্যার। ধন্যবাদ।

[তিনি বেরিয়ে যান।]

হিগিন্স [পিকারিংয়ের দিকে ফিরে] : জানো পিকারিং, ওই মহিলা আমাকে নিয়ে কী অদ্ভুত ধারণা পোষণ করেন! আসলে আমি তো খুবই লাজুক আর ভীরু স্বভাবের মানুষ। অন্য ছেলেদের মতো আমি কখনো নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ বা অসাধারণ বলে ভাবতে পারিনি। অথচ উনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে আমি ভীষণ খামখেয়ালী, কর্তৃত্বপরায়ণ আর হুকুম চালানো ধরনের মানুষ! সত্যিই বুঝতে পারি না, উনি এমন ভাবেন কী করে।

[এসময় মিসেস পিয়ার্স আবার ফিরে আসেন।]

মিসেস পিয়ার্স : স্যার, দয়া করে শুনুন—ঝামেলা শুরু হয়ে গেছে। নিচে আলফ্রেড ডুলিটল নামে এক ময়লাওয়ালা আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। সে বলছে, তার মেয়ে আপনার কাছে আছে।

পিকারিং [চমকে উঠে দাঁড়িয়ে] : উফ্! এবার বুঝি সত্যিই বিপদে পড়া গেল।

[তিনি চুল্লির পাশ থেকে একটু সরে দাঁড়ান।]

হিগিন্স [এক মুহূর্ত দেরি না করে] : ওই লোকটাকে উপরে পাঠিয়ে দাও।

মিসেস পিয়ার্স : ঠিক আছে, স্যার।

[তিনি বেরিয়ে যান।]

পিকারিং : লোকটা হয়তো অতটা খারাপ নয়, হিগিন্স।

হিগিন্স : বাজে কথা! অবশ্যই সে এক নম্বরের বদমাশ।

পিকারিং : সে যাই হোক, আমার আশঙ্কা হচ্ছে তাকে নিয়ে আমাদের কিছু সমস্যায় পড়তে হতে পারে।

হিগিন্স [আত্মবিশ্বাসের হাসি নিয়ে] : না না, আমি তা মনে করি না। যদি কোনো ঝামেলা হয়ও, সেটা তারই হবে—আমার নয়। আর তাছাড়া, লোকটার কাছ থেকে বেশ মজার কিছু কথা শোনার আশা করছি।

পিকারিং : মেয়েটির ব্যাপারে?

হিগিন্স : না না, আমি তার কথাবলার ধরন নিয়ে বলছি।

পিকারিং : ওহ্, তাই!

[এসময় দরজার কাছে এসে দাঁড়ান মিসেস পিয়ার্স।]

মিসেস পিয়ার্স : ডুলিটল এসেছেন, স্যার।

[তিনি দরজা খুলে আলফ্রেড ডুলিটলকে ভেতরে ঢুকতে দেন এবং নিজে সরে যান।]

আলফ্রেড ডুলিটল একজন মধ্যবয়স্ক কিন্তু শক্তসমর্থ ময়লাওয়ালা। তাঁর গায়ে পেশার উপযোগী মলিন পোশাক, মাথায় একটি পুরোনো টুপি যার পেছনের অংশ গলা আর কাঁধ ঢেকে রেখেছে। তাঁর মুখের রেখাগুলো স্পষ্ট, রুক্ষ হলেও আকর্ষণীয়। তাঁকে দেখে মনে হয়—ভয় বা বিবেক, কোনোটাই যেন মানুষটিকে খুব একটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তাঁর কণ্ঠস্বর জোরালো এবং আবেগপূর্ণ; যেন জীবনে কখনো নিজের অনুভূতি লুকিয়ে রাখার প্রয়োজন পড়েনি। এই মুহূর্তে তাঁর ভঙ্গিতে আহত আত্মসম্মান আর জেদী দৃঢ়তার মিশ্র ছাপ।

ডুলিটল [দরজার কাছে দাঁড়িয়ে, দুই ভদ্রলোকের মধ্যে কে হিগিন্স তা বুঝতে না পেরে] : প্রফেসর হিগিন্স?

হিগিন্স : এই যে আমি। সুপ্রভাত। বসুন।

ডুলিটল : সুপ্রভাত, গভর্নর।

[সে বেশ রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে পড়ে।]

আমি একটা খুব গুরুতর ব্যাপারে এসেছি, গভর্নর।

হিগিন্স [পিকারিংয়ের দিকে ঘুরে] : হ্যানসলো অঞ্চলের উচ্চারণ। মা সম্ভবত ওয়েলশ ছিলেন—আমার তাই মনে হচ্ছে।

[ডুলিটল বিস্ময়ে মুখ হা করে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু হিগিন্স যেন নিজের বিশ্লেষণেই মগ্ন।]

হিগিন্স : তো বলো, ডুলিটল, কী চাও?

ডুলিটল [ভয় দেখানোর সুরে] : আমি আমার মেয়েকে চাই। এটাই চাই। বুঝলেন?

হিগিন্স : নিশ্চয়ই চাইবে। তুমি তো ওর বাবা। তবে কি ভেবেছ, অন্য কেউ ওকে নিতে মুখিয়ে আছে? তোমার মধ্যে যে এখনও সামান্য পারিবারিক টান বেঁচে আছে, সেটা দেখে ভালো লাগছে। ও উপরে আছে—যাও, নিয়ে যাও।

ডুলিটল [আতঙ্কে চমকে উঠে দাঁড়িয়ে] : কী বললেন!

হিগিন্স : বললাম, ওকে নিয়ে যাও। তুমি কি ভেবেছ আমি তোমার মেয়েকে নিজের কাছে রেখে দেব?

ডুলিটল [তাড়াতাড়ি প্রতিবাদ করে] : আরে না না, একটু শুনুন তো, গভর্নর! এভাবে কি চলে? একজন গরিব মানুষের সুযোগ নেওয়া কি ভদ্রতার মধ্যে পড়ে? মেয়েটা তো আমার। এখন সে আপনার বাড়িতে। তাহলে আমার পাওনাটা কোথায়?

[সে আবার বসে পড়ে।]

হিগিন্স : তোমার মেয়ের এত সাহস যে সে নিজেই আমার বাড়িতে এসে বলেছে তাকে ঠিকমতো কথা বলতে শেখাতে, যাতে সে ফুলের দোকানে কাজ পেতে পারে। এই ভদ্রলোক আর আমার গৃহপরিচারিকা—দু’জনেই সব সময় এখানে উপস্থিত ছিলেন।

[হঠাৎ কড়া স্বরে]

তোমার সাহস হয় কী করে এখানে এসে আমাকে ব্ল্যাকমেল করতে? নিশ্চয়ই তুমিই ওকে ইচ্ছে করে এখানে পাঠিয়েছ!

ডুলিটল [তাড়াতাড়ি প্রতিবাদ করে] : না গভর্নর, এমন কথা নয়।

হিগিন্স : নিশ্চয়ই তাই। তা না হলে আপনি জানলেন কী করে যে মেয়েটি এখানে আছে?

ডুলিটল : একজন মানুষকে এভাবে ফাঁসানো ঠিক নয়, গভর্নর।

হিগিন্স : পুলিশ কিন্তু ঠিকই আপনাকে ফাঁসাবে। পুরো ব্যাপারটাই একটা সাজানো চক্রান্ত—ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের চেষ্টা!

[তিনি দৃঢ়ভাবে টেলিফোনের দিকে এগিয়ে গিয়ে ডিরেক্টরি খুলতে থাকেন।]

আমি এখনই পুলিশ ডাকছি।

ডুলিটল : আমি কি আপনার কাছে এক পয়সাও চেয়েছি? এই যে ভদ্রলোক আছেন, তাঁকেই জিজ্ঞেস করুন—আমি কি টাকার কথা একবারও বলেছি?

হিগিন্স [ডিরেক্টরিটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ডুলিটলের দিকে ঘুরে] : তাহলে কীসের জন্য এসেছেন?

ডুলিটল [হঠাৎ মিষ্টি ও করুণ গলায়] : আরে গভর্নর, একজন বাবা আর কীসের জন্য আসবে? একটু মানবিক হোন।

হিগিন্স [কিছুটা নরম হয়ে] : তাহলে আপনি ওকে দিয়ে এসব করাননি?

ডুলিটল : ঈশ্বরের দিব্যি, না গভর্নর! বাইবেলের দিব্যি করে বলছি, গত দু’মাস আমি মেয়েটার মুখই দেখিনি।

হিগিন্স : তাহলে জানলেন কীভাবে যে সে এখানে এসেছে?

ডুলিটল [অভিনয়ময় বিষণ্ণ সুরে] : সে কথাই তো বলব, গভর্নর—যদি আমাকে দু’মিনিট কথা বলতে দেন। আমি তো সেই শুরু থেকেই বলতে চাইছি। আমি তো আপনারই অপেক্ষায় বসে আছি।

হিগিন্স [পিকারিংয়ের দিকে ঘুরে উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে] : দেখছেন, পিকারিং? লোকটার মধ্যে বক্তৃতার কী অসাধারণ স্বাভাবিক প্রতিভা! কী চমৎকার ছন্দ—

“বলতে চাইছি… বলতে চাইছিলাম… বলার অপেক্ষায় আছি…”

একেবারে আবেগঘন বক্তৃতা! এটাই ওর ভেতরের ওয়েলশ রক্তের লক্ষণ। আর এই কারণেই ও এত সহজে মিথ্যে বলে আর ফাঁকি দেয়।

পিকারিং : আরে ধুর, হিগিন্স! আমি নিজেও তো পশ্চিম অঞ্চলের মানুষ।

[ডুলিটলের দিকে তাকিয়ে]

ঠিক আছে, আপনি যদি মেয়েটিকে এখানে পাঠিয়ে না থাকেন, তাহলে জানলেন কীভাবে যে সে এখানে আছে?

ডুলিটল : ব্যাপারটা হলো – মেয়েটা একটা ছেলেকে ট্যাক্সিতে তুলে একটু ঘুরতে বেরিয়েছিল। ছেলেটা তাদের বাড়িওয়ালির ছেলে। আসলে সে সুযোগ খুঁজছিল—আরেকবার মেয়েটার সঙ্গে দেখা করার।যখন সে শুনল যে আপনি লিজাকে এখানে থাকতে দিতে রাজি হয়েছেন, তখন সে তাকে নিজের জিনিসপত্র আনতে বাড়ি পাঠায়। সেই সময় লং একর আর এন্ডেল স্ট্রিটের মোড়ে আমার সঙ্গে ছেলেটার দেখা হয়।

হিগিন্স : ওহ্, বুঝেছি—পানশালায়?

ডুলিটল : গরিব মানুষের ক্লাব বলতে পারেন, গভর্নর। আমি সেখানে গেলে দোষটা কোথায়?

পিকারিং : হিগিন্স, লোকটাকে অন্তত নিজের গল্পটা শেষ করতে দিন।

ডুলিটল : ছেলেটা আমাকে সব খুলে বলল। এখন আপনিই বলুন, একজন বাবা হিসেবে তখন আমার কর্তব্য কী ছিল? আমি ছেলেটাকে বললাম, “যা, আমার মেয়ের জিনিসপত্র নিয়ে আয়।”

পিকারিং : কিন্তু আপনি নিজে গিয়ে আনলেন না কেন?

ডুলিটল : আরে গভর্নর, বাড়িওয়ালি কি আমাকে সেগুলো বিশ্বাস করে দিতেন? উনি সেই ধরনের মহিলা নন। উল্টে ছেলেটাকেই আগে একটা পেনি গুঁজে দিতে হয়েছে—ছোট্ট শয়তানটা না নিলে নড়তেই চাইছিল না। আমি তো সব করেছি শুধু আপনাকে খুশি করার জন্য, আর আপনার কাছে নিজেকে একটু মান্যগণ্য করে তোলার জন্য। এইটুকুই।

হিগিন্স : কী কী মালপত্র ছিল?

ডুলিটল : ওহ্, বেশ কিছু ধনরত্ন ছিল, গভর্নর! একটা বাদ্যযন্ত্র, দু-একটা ছবি, সামান্য কিছু গয়না আর একটা পাখির খাঁচা। জামাকাপড়ের কথা অবশ্য ও নিজেই বলেছিল যে সেগুলোর দরকার নেই। এখন বলুন তো, একজন বাবা হিসেবে আমি আর কী ভাবতে পারতাম?

হিগিন্স : অর্থাৎ আপনি ভেবেছেন, মেয়েটাকে কোনো ভয়ংকর বিপদ থেকে উদ্ধার করতে হবে—তাই তো?

ডুলিটল [স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে] : একদম ঠিক ধরেছেন, গভর্নর। আপনি মানুষ চিনতে পারেন।

পিকারিং : কিন্তু যদি ওকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ারই ইচ্ছে থাকে, তাহলে ওর জিনিসপত্র আনালেন কেন?

ডুলিটল : আমি কি একবারও বলেছি যে ওকে নিয়ে যেতে এসেছি? বলেছি নাকি?

হিগিন্স [দৃঢ় গলায়] : আপনি এখনই ওকে নিয়ে যান।

[তিনি চুল্লির পাশে গিয়ে ঘণ্টা বাজান।]

ডুলিটল [দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে] : না না, গভর্নর, এমন কথা বলবেন না। আমি আমার মেয়ের সম্মান নষ্ট করতে চাই না। বলতে পারেন, ওর জীবনে একটা নতুন সুযোগ এসেছে—

[এসময় মিসেস পিয়ার্স দরজা খুলে দাঁড়ান।]

হিগিন্স : মিসেস পিয়ার্স, ইনি লিজার বাবা। তিনি ওকে নিয়ে যেতে এসেছেন। দয়া করে মেয়েটিকে তাঁর হাতে তুলে দিন।

[তিনি এমন ভঙ্গিতে পিয়ানোর দিকে ফিরে যান যেন পুরো বিষয়টি থেকে নিজেকে সরিয়ে ফেলতে চান।]

ডুলিটল : না না, ব্যাপারটা ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে। শুনুন তো—

মিসেস পিয়ার্স : কিন্তু উনি তো ওকে নিয়ে যেতে পারেন না, মিস্টার হিগিন্স! আপনি নিজেই তো বলেছিলেন ওর পুরোনো জামাকাপড় পুড়িয়ে ফেলতে।

ডুলিটল : সেই কথাই তো বলছি! আমি কি আর মেয়েটাকে রাস্তা দিয়ে একটা সার্কাসের বাঁদরের মতো ঘোরাতে পারি?

হিগিন্স : আপনিই তো বলেছিলেন যে আপনার মেয়েকে চান। তাহলে নিয়ে যান। জামাকাপড় না থাকলে বাইরে গিয়ে নতুন কিনে দিন।

ডুলিটল [হতাশ হয়ে] : যে পোশাক পরে ও এসেছিল, সেগুলো গেল কোথায়? আমি পুড়িয়েছি, না আপনার গৃহপরিচারিকা?

মিসেস পিয়ার্স [আত্মসম্মানের সঙ্গে] : আমি এই বাড়ির গৃহপরিচারিকা, স্যার। আপনার মেয়ের জন্য নতুন পোশাকের ব্যবস্থা করেছি। সেগুলো এলে আপনি ওকে নিয়ে যেতে পারবেন। ততক্ষণ আপনি রান্নাঘরে অপেক্ষা করতে পারেন। এদিকে আসুন।

[ডুলিটল খুব চিন্তিত মুখে তাঁর সঙ্গে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে যায়। তারপর হঠাৎ থেমে ইতস্তত করে। শেষে ধীরে ধীরে ফিরে এসে গোপন ভঙ্গিতে হিগিন্সের কাছে কথা বলতে শুরু করে।]

ডুলিটল : শুনুন গভর্নর… আপনি আর আমি—আমরা তো দুনিয়াদার মানুষ, তাই না?

হিগিন্স : ওহ্! দুনিয়াদার মানুষ! তাই নাকি?

[মিসেস পিয়ার্সের দিকে]

আমার মনে হয়, আপনি এখন যেতে পারেন।

মিসেস পিয়ার্স : আমারও তাই মনে হয়, স্যার।

[তিনি মর্যাদার সঙ্গে বেরিয়ে যান।]

পিকারিং : এখন বলুন, মিস্টার ডুলিটল।

ডুলিটল [পিকারিংকে সম্মান দেখিয়ে] : ধন্যবাদ, গভর্নর।

[হিগিন্সের দিকে ফিরে, যিনি পিয়ানোর বেঞ্চে বসে আছেন]

আসলে ব্যাপারটা হলো, গভর্নর, আপনাকে আমার কেমন যেন ভালো লেগে গেছে। আর আপনি যদি সত্যিই মেয়েটাকে রাখতে চান, তাহলে ওকে আবার বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমি খুব একটা মরিয়া নই। একটা সমঝোতা হতে পারে।মেয়েটা, একজন যুবতী হিসেবেদেখতে মন্দ নয়। কিন্তু মেয়ে হিসেবে—মানে সংসারের বোঝা হিসেবে—ওর খুব একটা দাম নেই। তাই সোজাসুজি কথাই বলছি। আমি শুধু একজন বাবার ন্যায্য অধিকার চাইছি। আর আপনার মতো ভদ্রলোক নিশ্চয়ই আশা করবেন না যে আমি মেয়েকে একেবারে বিনা দামে ছেড়ে দেব। কারণ আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে আপনি যথেষ্ট ভালো মনের মানুষ।তাহলে বলুন—আপনার কাছে পাঁচ পাউন্ড আর এমন কী? আর আমার কাছে এলিজার মূল্যই বা কতটুকু?

[সে বিচারকের মতো গম্ভীর ভঙ্গিতে নিজের চেয়ারে বসে পড়ে।]

পিকারিং : আমার মনে হয়, ডুলিটল, আপনার জানা উচিত—মিস্টার হিগিন্সের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ সৎ।

ডুলিটল : অবশ্যই, গভর্নর। যদি আমার মনে হতো তা নয়, তাহলে আমি পঞ্চাশ পাউন্ড চাইতাম।

হিগিন্স [রাগে বিস্ফোরিত হয়ে] : কী বলছ তুমি! এই নির্দয় বদমাশ! তুমি কি বলতে চাইছ, পঞ্চাশ পাউন্ড পেলে নিজের মেয়েকেই বিক্রি করে দিতে রাজি?

ডুলিটল : সাধারণ অবস্থায় হয়তো করতাম না। কিন্তু আপনার মতো একজন ভদ্রলোককে সাহায্য করার জন্য অনেক কিছুই করা যায়, গভর্নর—এ কথা আমি নিশ্চয়ই বলতে পারি।

পিকারিং : আপনার কি কোনো নৈতিকতা বলে কিছু নেই, মশাই?

ডুলিটল [একেবারে নির্লজ্জ স্বীকারোক্তির ভঙ্গিতে] : নৈতিকতা রাখার সামর্থ্যই তো নেই, গভর্নর। আমি গরিব মানুষ। আপনারাও যদি আমার মতো গরিব হতেন, তাহলে আপনাদেরও নৈতিকতা বলে কিছু থাকত না।

তবে তার মানে এই নয় যে কারও কোনো ক্ষতি হবে। আমি শুধু বলছি—যদি লিজা এই ব্যাপার থেকে কিছু পায়, তাহলে আমিই বা কেন কিছু পাব না?

হিগিন্স [দ্বিধাগ্রস্তভাবে] : সত্যি বলতে কী, পিকারিং, আমি বুঝতে পারছি না কী করা উচিত। নৈতিকতার দিক দিয়ে দেখলে এই লোকটাকে একটা পয়সাও দেওয়া উচিত নয়। কিন্তু তবুও, ওর দাবির মধ্যে একটা কাঁচা অথচ অদ্ভুত ধরনের ন্যায়বোধ আছে বলে মনে হচ্ছে।

ডুলিটল : এই তো, গভর্নর! আমি তো সেটাই বলছি। একজন বাবার হৃদয়ের কথাই তো বলছি।

পিকারিং : আমি আপনার অনুভূতিটা বুঝতে পারছি বটে, কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক বলে মনে হচ্ছে না।

ডুলিটল : না গভর্নর, ওভাবে বিচার করবেন না। আগে ভেবে দেখুন আমি কী ধরনের মানুষ। আমি হলাম সেই “অযোগ্য গরিব”দের একজন। সমাজ আমাদের এভাবেই চেনে।জানেন, এর মানে কী? এর মানে হলো, সারাজীবন আমাকে মধ্যবিত্তদের নৈতিকতার বক্তৃতা শুনে যেতে হয়। যদি কখনো কোনো সুযোগ আসে, আর আমি তাতে সামান্য কিছু চাই, তখনই বলা হয়—

“আপনি এর যোগ্য নন, তাই এটা আপনার প্রাপ্য নয়।”

কিন্তু আমার প্রয়োজন কি কোনো “যোগ্য” মানুষের চেয়ে কম? বরং বেশি। আমি কম খাই না, বরং বেশি পান করি। আমি আনন্দ চাই, গান চাই, বাদ্যযন্ত্র চাই—কারণ আমি একজন চিন্তাশীল মানুষ। মন খারাপ হলে মানুষের একটু আনন্দের দরকার হয়।কিন্তু দেখুন, যোগ্য মানুষদের কাছে যেটার দাম নেওয়া হয়, আমার কাছ থেকেও ঠিক সেই দামই নেওয়া হয়। তাহলে এই মধ্যবিত্ত নৈতিকতা আসলে কী? গরিবকে কিছু না দেওয়ার এক চমৎকার অজুহাত ছাড়া আর কিছুই নয়।

তাই আমি আপনাদের—দু’জন ভদ্রলোককে—অনুরোধ করছি, আমার সঙ্গে এই ভণ্ডামির খেলা খেলবেন না। আমি সোজাসুজি কথা বলছি। আমি নিজেকে ভালো বা যোগ্য প্রমাণ করার চেষ্টা করছি না। আমি অযোগ্য—আর অযোগ্য হয়েই থাকতে চাই। কারণ এটাই আমার সত্যি স্বভাব।এখন বলুন তো, আপনারা কি একজন মানুষের স্বভাবের সুযোগ নিয়ে তার নিজের মেয়ের দামটুকুও মেরে দেবেন? যে মেয়েকে সে নিজের ঘাম ঝরিয়ে মানুষ করেছে, খাইয়েছে, পরিয়েছে—যতদিন না সে আপনাদের মতো ভদ্রলোকদের চোখে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে?

পাঁচ পাউন্ড কি খুব বেশি দাবি? আমি প্রশ্নটা আপনাদেরই হাতে ছেড়ে দিলাম।

হিগিন্স [উঠে দাঁড়িয়ে পিকারিংয়ের দিকে এগিয়ে] : পিকারিং, আমরা যদি এই লোকটাকে তিন মাসের জন্য প্রশিক্ষণ দিতে পারি, তাহলে সে হয় মন্ত্রিসভার মন্ত্রী হবে, নয়তো ওয়েলসের কোনো জনপ্রিয় ধর্মপ্রচারক!

পিকারিং : এ ব্যাপারে আপনার কী মত, ডুলিটল?

ডুলিটল : না গভর্নর, ওইসব আমার জন্য নয়—আপনাকে ধন্যবাদ। আমি সব ধর্মপ্রচারক আর প্রধানমন্ত্রীদের কথা শুনেছি। কারণ আমি একজন চিন্তাশীল মানুষ, আর রাজনীতি, ধর্ম কিংবা সমাজসংস্কার—সবই আমার কাছে অন্য আমোদ-প্রমোদের মতোই আগ্রহের বিষয়।

কিন্তু আমি আপনাকে বলছি, যেভাবেই দেখুন না কেন, ওসব একটা জঘন্য জীবন।

আমার নীতি হলো—“অন্যায় দারিদ্র্যই শ্রেয়।” সমাজের নিচু তলা থেকে ওপরে ওঠার যে লড়াই, তার মধ্যেই জীবনের আসল স্বাদ আছে। আমার রুচি অনুযায়ী, ওই টানাপোড়েনের মধ্যেই জীবনের একটু ঝাঁঝ, একটু উত্তেজনা লুকিয়ে আছে।

হিগিন্স : আমার মনে হয়, আমাদের লোকটাকে পাঁচ পাউন্ড দেওয়াই উচিত।

পিকারিং : আমার ভয় হচ্ছে, ও এই টাকার অপব্যবহার করবে।

ডুলিটল : না গভর্নর, ঈশ্বরের দিব্যি, আমি তা করব না। নিশ্চিন্ত থাকুন—আমি এই টাকা জমিয়ে রেখে ভদ্রলোকদের মতো অলস জীবন কাটাব না। সোমবারের মধ্যেই এর এক পয়সাও থাকবে না। তারপর আবার আগের মতোই খেটে খেতে হবে, যেন জীবনে কোনোদিন এত টাকা চোখেই দেখিনি।এই টাকা আমাকে ধনী বানাবে না—আপনি সে বিষয়ে নিশ্চিত থাকতে পারেন। এটা শুধু আমার আর আমার সঙ্গিনীর জন্য একটু আনন্দের সুযোগ এনে দেবে। আমরা আনন্দ করব, অন্যদেরও কিছু উপকার হবে, আর আপনি এই ভেবে খুশি থাকতে পারবেন যে টাকাটা একেবারে বিফলে যায়নি। এর চেয়ে ভালো খরচ আর হতে পারে না।

হিগিন্স [পকেটবই বের করে ডুলিটলের দিকে এগিয়ে এসে] : দারুণ কথা! তাহলে চলুন, ওকে দশ পাউন্ড দেওয়া যাক।

[তিনি দুটো পাঁচ পাউন্ডের নোট এগিয়ে দেন।]

ডুলিটল : না গভর্নর, দশ পাউন্ড আমার জন্য বেশি হয়ে যাবে। এত টাকা থাকলে মানুষের মনে বিচক্ষণতা ঢুকে যায়, আর তারপর সুখ বিদায় নেয়।

আমি যতটুকু চেয়েছি, ঠিক ততটুকুই দিন—না এক পয়সা বেশি, না এক পয়সা কম।

পিকারিং : আপনি ওই মহিলাকে বিয়ে করে নিচ্ছেন না কেন? এই ধরনের অনৈতিকতারও তো একটা সীমা থাকা উচিত।

ডুলিটল : তাকে গিয়ে সেই কথাটাই বলুন, গভর্নর! আমি তো রাজি আছি।

কিন্তু কষ্টটা সব আমারই। তার উপর আমার কোনো অধিকার নেই। আমাকে তার মন জুগিয়ে চলতে হয়, উপহার কিনে দিতে হয়, রঙিন পোশাক কিনে দিতে হয়।

আমি ওই মহিলার একরকম দাস হয়ে আছি—শুধু এই কারণে যে আমি তার বৈধ স্বামী নই। আর সেও সেটা ভালো করেই জানে।

আমাকে বিয়ে করতে দেখলে বুঝতেন কী বিপদ!

আমার কথা শুনুন, গভর্নর—এলাইজাকে এখনই বিয়ে করুন, যখন সে এখনও তরুণী, সরল, আর পৃথিবীর ভালো-মন্দ পুরো বোঝে না। নইলে পরে আফসোস করবেন।

অবশ্য বিয়ে করলে সেও পরে আফসোস করবে। তবে তাতে আপনার সুবিধাই বেশি—কারণ আপনি পুরুষ। আর নারীজাত তো সুখী হতে জানেই না।

হিগিন্স : পিকারিং, আমরা যদি এই লোকটার কথা আর এক মিনিটও শুনি, তাহলে পৃথিবীর সব বিশ্বাসই হারিয়ে ফেলব।

[ডুলিটলের দিকে তাকিয়ে]

আপনি তো পাঁচ পাউন্ডই চেয়েছিলেন, তাই না?

ডুলিটল : আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ, গভর্নর।

হিগিন্স : নিশ্চিত তো, দশ পাউন্ড নেবেন না?

ডুলিটল : এখন না, গভর্নর। অন্য কোনো সময় হলে ভেবে দেখা যেত।

হিগিন্স [একটি পাঁচ পাউন্ডের নোট হাতে দিয়ে] : এই নিন।

ডুলিটল : ধন্যবাদ, গভর্নর। সুপ্রভাত।

[সে তাড়াতাড়ি দরজার দিকে এগিয়ে যায়, যেন যুদ্ধজয়ের লুট নিয়ে পালাতে উদগ্রীব। কিন্তু দরজা খুলতেই সে থমকে দাঁড়ায়। সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক অপূর্ব পরিচ্ছন্ন ও সুশ্রী তরুণী—সাধারণ নীল সুতির জাপানি কিমোনো পরা। তাকে দেখে যেন মুহূর্তের জন্য চিনতেই পারে না।]

[লিজার চুল ছোট ছোট সাদা জুঁই ফুল দিয়ে সুন্দরভাবে সাজানো। তার সঙ্গে আছেন মিসেস পিয়ার্স। ডুলিটল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকায় তিনি ভদ্রভাবে সরে দাঁড়ান এবং ক্ষমা চান।]

ডুলিটল : মাফ করবেন, মিস।

জাপানি পোশাক পরা তরুণী : কী! আপনি কি নিজের মেয়েকেই চিনতে পারছেন না?

[ঘরের সবাই একসঙ্গে বিস্ময়ে চিৎকার করে ওঠে।]

ডুলিটল : আরে! এ তো লিজা!

হিগিন্স : এ আবার কী! এটা লিজা!

পিকারিং : বাপরে!

লিজা [নিজের পোশাক ও সাজের দিকে তাকিয়ে কিছুটা লজ্জা, কিছুটা আনন্দ নিয়ে] : আমাকে কি খুব বোকা বোকা লাগছে না?

হিগিন্স : বোকা?

মিসেস পিয়ার্স [দরজার কাছ থেকে সতর্ক করে] : মিস্টার হিগিন্স, দয়া করে এমন কিছু বলবেন না যাতে মেয়েটি নিজেকে নিয়ে অহংকারী হয়ে ওঠে।

হিগিন্স [তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে] : ওহ্, ঠিক ঠিক। আপনি একদম ঠিক বলেছেন, মিসেস পিয়ার্স।

[লিজার দিকে তাকিয়ে]

হ্যাঁ, তোমাকে ভীষণ বোকা দেখাচ্ছে।

মিসেস পিয়ার্স : আরে না স্যার!

হিগিন্স [আরও নিজেকে শুধরে নিয়ে] : মানে… অত্যন্ত বোকা!

লিজা [হাসিমুখে নিজের পুরোনো টুপিটা তুলে নিয়ে মাথায় পরে] : টুপিটা পরলে কিন্তু আমাকে বেশ ভালোই লাগে।

[সে টুপিটা মাথায় দিয়ে বেশ ফ্যাশনেবল ভঙ্গিতে ঘর পেরিয়ে ফায়ারপ্লেসের দিকে হাঁটে।]

হিগিন্স : এ তো দেখি একেবারে নতুন ফ্যাশন! অথচ এটা তো ভয়ানক হাস্যকর লাগার কথা!

ডুলিটল [বাবার গর্বভরা বিস্ময়ে] : বাহ্ গভর্নর, আমি তো ভাবতেই পারিনি যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হলে মেয়েটাকে এত সুন্দর দেখাবে। সত্যি, ও তো আমার গর্বের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে!

লিজা [উচ্ছ্বাসভরে] : আমি আপনাদের বলছি, এখানে পরিষ্কার হওয়াটা কত সহজ! ট্যাপে যখন খুশি গরম আর ঠান্ডা জল পাওয়া যায়। নরম উলের তোয়ালে আছে। আর তোয়ালে রাখার স্ট্যান্ডটা এত গরম যে ছুঁলেই আঙুল পুড়ে যাবে।নিজেকে ঘষেমেজে পরিষ্কার করার জন্য নরম ব্রাশ আছে, আর আছে প্রিমরোজ ফুলের গন্ধওয়ালা কাঠের সাবানের বাটি। এখন বুঝতে পারছি, ভদ্রমহিলারা কেন সবসময় এত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে। তাদের কাছে স্নান করা একটা আনন্দের ব্যাপার।আমাদের মতো গরিব মানুষদের কী কষ্টে ধোয়ামোছা করতে হয়, সেটা যদি তারা একবার দেখত!

হিগিন্স : তোমার বাথরুমটা ভালো লেগেছে জেনে আমি খুশি।

লিজা : না, মোটেই ভালো লাগেনি। আর কে কী ভাবল, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। মিসেস পিয়ার্স সব জানেন।

হিগিন্স : কী হয়েছে, মিসেস পিয়ার্স?

মিসেস পিয়ার্স [সম্পূর্ণ নির্বিকার ভঙ্গিতে] : ওহ্, তেমন কিছু নয়, স্যার। খুব বড় কোনো ব্যাপার নয়।

লিজা : আমার তো ভীষণ ইচ্ছে করছিল ওটা ভেঙে ফেলি। আমি বুঝতেই পারছিলাম না, নিজের মুখের দিকে কোন দিক থেকে তাকাব! শেষে আমি আয়নার ওপর একটা তোয়ালে ঝুলিয়ে দিয়েছিলাম।

হিগিন্স : কিসের ওপর?

মিসেস পিয়ার্স : আয়নার ওপর, স্যার।

হিগিন্স : ডুলিটল, আপনি দেখছি মেয়েটাকে ভীষণ কড়াভাবে মানুষ করেছেন।

ডুলিটল : আমি! আরে না গভর্নর, আমি তো ওকে খুব একটা শাসনই করিনি। মাঝে মাঝে দু-একটা বেতের বাড়ি দিয়েছি, এই যা। দোষটা আমার ঘাড়ে চাপাবেন না।ও এসবের সঙ্গে অভ্যস্ত নয়, বুঝলেন তো। তবে দেখবেন, খুব তাড়াতাড়িই আপনার এই সহজ-সরল অভ্যাসগুলো শিখে ফেলবে।

লিজা : আমি একটা ভালো মেয়ে এবংআমি জানি সেটা। আর আমি কোনো “সহজ-সরল” স্বভাব শিখব না।

হিগিন্স : লিজা, তুমি যদি আর একবার বলো যে তুমি ভালো মেয়ে, তাহলে তোমার বাবা তোমাকে সঙ্গে করে বাড়ি নিয়ে যাবে।

লিজা : ও আমাকে নিয়ে যাবে না। তুমি আমার বাবাকে চেনো না। ও এখানে এসেছে শুধু তোমার কাছ থেকে কিছু টাকা আদায় করে মদ খাওয়ার জন্য।

ডুলিটল : তা টাকা আর কী কাজে লাগে বলো তো? গির্জার দানবাক্সে ফেলার জন্য নাকি?

[এলাইজা জিভ বের করে বাবাকে বিদ্রূপ করে। ডুলিটল এতটাই রেগে যায় যে পিকারিং তাড়াতাড়ি দু’জনের মাঝে এসে দাঁড়ান।]

ডুলিটল : আমার সঙ্গে বেয়াদবি করবে না। আর এই ভদ্রলোকের সঙ্গেও এমন ব্যবহার কোরো না। নইলে কিন্তু আমার কাছ থেকে শক্ত জবাব পাবে। বুঝেছ?

হিগিন্স : যাওয়ার আগে আর কোনো উপদেশ আছে, ডুলিটল? ধরো, পিতৃসুলভ আশীর্বাদ-টাশীর্বাদ?

ডুলিটল : না গভর্নর, আমি অতটা বোকা নই যে নিজের ছেলেমেয়েদের শাসন করতে যাব। ওসব ছাড়াই ওদের সামলানো যথেষ্ট কঠিন।

তবে যদি লিজার চরিত্র উন্নত করতে চান, তাহলে চাবুক ব্যবহার করতে পারেন—সেটা আপনার ইচ্ছা।

বিদায়, ভদ্রমহোদয়গণ।

[সে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়ায়।]

হিগিন্স [গম্ভীরভাবে] : দাঁড়ান। আপনার নিয়মিত মেয়েকে দেখতে আসা উচিত। এটা আপনার কর্তব্য। আমার ভাই একজন পাদ্রী—তিনি চাইলে আপনাকে এ বিষয়ে উপদেশও দিতে পারেন।

ডুলিটল [কৌশলে এড়িয়ে গিয়ে] : নিশ্চয়ই, গভর্নর। আমি আসব। অবশ্য এই সপ্তাহে নয়—একটু দূরে কাজ আছে। তবে পরে নিশ্চয়ই আসব।

শুভ অপরাহ্ন, ভদ্রমহোদয়গণ। শুভ অপরাহ্ন, ম্যাডাম।

[সে সম্মানের সঙ্গে মিসেস পিয়ার্সকে টুপি খুলে অভিবাদন জানায়। মিসেস পিয়ার্স অবশ্য সেই ভদ্রতাকে প্রায় উপেক্ষাই করেন এবং বেরিয়ে যান। ডুলিটল তখন হিগিন্সের দিকে চোখ টিপে এমন ভঙ্গি করে যেন দু’জনেই একই কঠোর স্বভাবের নারীর অত্যাচারে জর্জরিত, তারপর সেও বেরিয়ে যায়।]

লিজা : ওই বুড়ো মিথ্যুকটাকে বিশ্বাস কোরো না। একজন পাদ্রীর চেয়ে বরং একটা বুলডগকে ওর পেছনে লাগানো সহজ হবে। চল্লিশ বছরেও তুমি ওকে আর দেখতে পাবে না।

হিগিন্স : আমি কিন্তু ওকে যেতে দিতে চাইনি, লিজা। তুমি চেয়েছিলে?

লিজা : একদম না। আমি চাই না ওকে আর কোনোদিন দেখতে। সত্যিই না। ও আমার জন্য একটা লজ্জা। কাজকর্ম না করে সারাদিন ধুলো জমিয়ে বসে থাকে।

পিকারিং : ওর পেশা কী, লিজা?

লাইজা : অন্যের পকেট থেকে টাকা বের করে নিজের পকেটে ঢোকানো—এটাই ওর আসল পেশা। আসলে ও শ্রমিকের কাজ করতে পারে, আর মাঝে মাঝে শরীরচর্চার মতো করে একটু কাজও করে, তখন ভালোই টাকা কামায়।

তুমি কি এখন থেকে আমাকে “মিস ডুলিটল” বলবে না?

পিকারিং : মাফ করবেন, মিস ডুলিটল। কথাটা মুখ ফসকে বেরিয়ে গিয়েছিল।

লিজা : ওহ্, কিছু মনে করিনি। শুধু শুনতে খুব ভদ্র ভদ্র লাগছিল।

আমার খুব ইচ্ছে করছে একটা ট্যাক্সি নিয়ে টটেনহ্যাম কোর্ট রোডের মোড়ে যাই আর সেখানকার মেয়েগুলোকে একটু দেখিয়ে আসি। আমি ওদের সঙ্গে কথাই বলতাম না—শুধু দাঁড়িয়ে থাকতাম, আর ওরা জ্বলে মরত।

পিকারিং : তার চেয়ে বরং অপেক্ষা করো, যতক্ষণ না আমরা তোমার জন্য সত্যিই ফ্যাশনেবল কিছু পোশাক কিনে দিই।

হিগিন্স : আর একটা কথা মনে রেখো—জীবনে একটু উন্নতি করেছ বলে পুরোনো বন্ধুদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়। এটাকেই বলে নাক-উঁচু ভাব।

লিজা : আমি আশা করি, তুমি এখন আর ওদের আমার বন্ধু বলছ না। সুযোগ পেলেই ওরা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করেছে, অপমান করেছে। এখন আমারও ইচ্ছে করছে একটু শোধ তুলি।তবে যদি সত্যিই সুন্দর পোশাক পাওয়া যায়, তাহলে আমি অপেক্ষা করতে রাজি। আমার খুব নানা রকম পোশাক পরতে ইচ্ছে করছে।

মিসেস পিয়ার্স বলছেন, দিনের পোশাকের আলাদা, আবার রাতে শোবার জন্যও আলাদা পোশাক থাকবে। কিন্তু আমার তো মনে হয়, যেটা সবাইকে দেখানো যায় না, তার জন্য টাকা খরচ করাই বৃথা। তাছাড়া শীতের রাতে ঠান্ডা কাপড় পরে ঘুমানোর কথা ভাবতেই পারি না।

[এসময় মিসেস পিয়ার্স ফিরে আসেন।]

মিসেস পিয়ার্স : এই যে, এলিজা। নতুন পোশাকগুলো এসেছে। পরে দেখবে এসো।

লিজা [উচ্ছ্বাসে চিৎকার করে] : আহ্—উহ্!

[সে আনন্দে ছুটে বেরিয়ে যায়।]

মিসেস পিয়ার্স [তার পেছনে যেতে যেতে] : আরে, এভাবে দৌড়ে যেও না, মেয়ে!

[তিনি দরজাটা বন্ধ করে দেন।]

হিগিন্স : পিকারিং, আমরা কিন্তু একটা ভীষণ কঠিন কাজ হাতে নিয়েছি।

পিকারিং [দৃঢ় গলায়] : হ্যাঁ, হিগিন্স—সত্যিই নিয়েছি।

( চলবে )

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

২৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা ১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা ২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা ৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা ৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা ৫ :

Read More »

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »