শুভাশিস ঘোষ
বাঙালি জাতিসত্তার উদযাপনের দিন পয়লা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষের গুরুত্ব, কার্যকারিতা ইত্যাদি নিয়ে যত বিতর্কই থাক না কেন, এ প্রশ্নে সম্ভবত নেই কোনো বিতর্কের অবকাশ। বাঙালির বাসভূমি আজ খণ্ডিত। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্পে তার মনোভূমি আজ বহুধাবিভক্ত। তার মনোজগতে অসংখ্য মত আর পথের চাষবাস। তার জীবনযাত্রায় আজ অসংখ্য সংস্কৃতির প্রভাব। ভাষায়, পোশাকে, খাদ্যাভাসে লেগেছে আন্তর্জাতিকতার ছোঁয়া। তার চিন্তায়, চেতনে, মননে লেগেছে বিশ্বায়নের হাওয়া। বাঙালির বাঙালিত্বটা যে কী, তা সম্ভবত এক কথায় প্রকাশ আজ অসম্ভব। হাতে গোণা কয়েকটি বিষয় অবশ্য আছে, যা আজও বাঙালির আইকন হিসেবে গ্রাহ্য হয়। বাড়ির দেওয়ালে রবীন্দ্র নজরুলের ছবি, যেকোনো অনুভবে রবীন্দ্রনাথের গানের মতো কিছু বিষয় এখনো আঁকড়ে থাকার চেষ্টা আছে বাঙালির। তবে তা কত দিন থাকবে, সে নিয়েও আছে ঘোরতর সংশয়। তবে তার মাঝেও রয়ে গেছে একটি দিন। যা বাঙালি জাতিসত্তা প্রকাশের দিন। তার উদযাপনের দিন। সে আমাদের পয়লা বৈশাখ।
তবে সেখানেও আছে বিস্তর গোল। আছে পঞ্জিকার ভিন্নতা। ভারত ভূখণ্ডের বাঙালির কাছে বঙ্গাব্দের পঞ্জিকা মতেই পালিত হয় পয়লা বৈশাখ। এক সময় অখণ্ড ভারতের সব বাঙালির রীতিতে সেটাই ছিল। কিন্তু বাঙালি যখন ভাগ হয়েছে, তার সবকিছুই হয়েছে বাঁটোয়ারা। বর্ষবরণ টাই বা হবে না কেন ? তাই ওপার বঙ্গের পয়লা বৈশাখও নির্ধারিত হয় গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের নির্দেশে। বাংলাদেশের পয়লা বৈশাখ পালিত হয় ১৪ এপ্রিল। তাই বেশিরভাগ সময়েই মেলে না দুই বাংলার নববর্ষের উদযাপন। গোদা বাংলায় বলতে গেলে, ওপারে ১৪ এপ্রিল, এপারে ১ লা বৈশাখ বাঙালির বর্ষবরণ।
দেশ ভাগের পর প্রাথমিক অবস্থায় পূর্ব পাকিস্তানে কিন্তু বাংলা নববর্ষ পালনের তেমন খুব একটা ইতিহাস পাওয়া যায় না। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের সময় থেকেই শুরু হয় বাঙালি আত্মপরিচয় সম্পর্কে নতুন জিজ্ঞাসা। তারা পর্যায়ক্রমে শুরু করেন সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞানের সন্ধান। তাদের মধ্যে তীব্র হয়ে ওঠে পরিত্যক্ত সাংস্কৃতিক আচার-অনুষ্ঠান পুনরুজ্জীবনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। সে সময়ই ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে পহেলা বৈশাখ সরকারি ছুটি ঘোষণার ঘটনাটি বাঙালি জাতীয়বাদকে সামনে নিয়ে আসার সুযোগ তৈরি করে। মানুষের কাছে ভাষাগত প্রশ্নে ‘বাঙালি’ পরিচয়টিও হয়ে ওঠে পরিষ্কার। সরকারি ছুটি ঘোষণার মধ্যে দিয়ে পহেলা বৈশাখ দিনটি জাতিধর্মনির্বিশেষে সৃষ্টি করে অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকশিত হওয়ার সুযোগ।
১৯৬১ সালে সেনাশাসক আইয়ুব খানের অঙ্গুলি নির্দেশে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনে নিষেধাজ্ঞা এবং ১৯৬৬ সালে পাকিস্তানি বেতারে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধ করা, এ দুটি ঘটনা মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমান সম্প্রদায় কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি, বরং তাদের স্বাধীন সাংস্কৃতিক পরিচয় খুঁজে বের করার ইচ্ছা তীব্রভাবে অনুভব করে। আত্মপরিচয়ের এই বাসনা আরো স্পষ্ট রূপ নেয় বিংশ শতাব্দীর পাঁচ ও ছয়ের দশকজুড়ে। তখন পয়লা বৈশাখের উৎসবকে অর্থবহ করার ক্ষেত্রে 'ছায়ানট'ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাদের উদ্যোগেই ১৯৬৭ সালে ঢাকার রমনা বটমূলে প্রথম অনুষ্ঠিত হয় সংগীতায়োজন এবং পরবর্তী সময়ে এই সংগীতায়োজনকে ঘিরে রমনা পার্কে বৈশাখী মেলার আয়োজন।
স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর বিংশ শতাব্দীর আশির দশকের শেষদিকে একে আরো মহৎ উচ্চতায় পৌঁছে দেয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। সবার মঙ্গল কামনাই ছিল মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্দেশ্য। সেখানে রাক্ষসকে স্বৈরশাসকের প্রতিরূপ হিসেবে দেখানো হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাত্র-শিক্ষকদের সার্বিক তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এই শোভাযাত্রার পথচলা শুরু ১৯৮৯ সালে। সত্যিকার অর্থে পহেলা বৈশাখ উৎসবে মঙ্গল শোভাযাত্রা যোগ করে নতুন মাত্রা।
প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন বাংলাদেশে বাঙালি জাতিসত্তার এক অসাম্প্রদায়িক উদযাপনের দিন হিসেবে পয়লা বৈশাখ হয়ে ওঠে বঙ্গজীবনের অঙ্গ। ভারত ভূখণ্ডের বাঙালিদের মধ্যে নববর্ষের যে অনুষঙ্গগুলো প্রচলিত ছিল, তা মূলত ধর্মীয় আচারের মোড়কে এক লোক-পার্বণ। তার সঙ্গে জুড়ে ছিল হালখাতা, লক্ষ্মী-গণেশের পুজো, শ্রীকৃষ্ণের গোষ্টযাত্রা ইত্যাদি। বর্ষশেষের চড়ক, শিবের গাজন ইত্যাদিও জুড়ে থাকত সে উৎসবে। সে উৎসব ধর্মীয় মোড়কে পালিত হওয়ার কারণে এ বঙ্গের বা ভারতীয় বাঙালি মুসলমানের কাছে পয়লা বৈশাখ 'বাঙালির উৎসব' হয়ে ওঠেনি কখনো।
নতুন শতাব্দীতে বেশ কিছু সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে আজ পয়লা বৈশাখকে ধর্মীয় গণ্ডির বাইরে বের করে আপামর বাঙালির সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। শহরাঞ্চলে তার কিছুটা প্রভাব অবশ্যই পড়ছে, তবে গ্রামীণ বঙ্গে হাঁটতে হবে অনেকটা পথ। সেখানে আজও পয়লা বৈশাখ হিন্দুর পার্বণ হিসেবেই রয়ে গেছে।
বাংলা নববর্ষের দিনক্ষণ নিয়ে যেমন টানাপোড়েন আছে, তেমনই বেশ কয়েক বছর যাবত এর ইতিহাস নিয়েও শুরু হয়েছে টানাটানি। এদেশে যেমন নিত্যনতুন মনগড়া গল্পগাথা, লোককথাকে ইতিহাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ঘৃণ্য চক্রান্ত চলছে সর্বব্যাপী, তারই অঙ্গ হিসেবে একদল আবিষ্কার করেছে বাংলা নববর্ষের সঙ্গে শশাঙ্কের যোগ। এ উৎপাতও বেশ ভয়ের। মোঘল আমলে মূলত খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে সম্রাট আকবরের আমলে বঙ্গদেশে সৌর বর্ষ মোতাবেক যে বঙ্গাব্দের প্রচলন হয়েছিল ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে বা ৯৬৩ হিজরিতে , সে বর্ষপঞ্জিই আজকের বাংলা পঞ্জিকা। তা নিয়ে যুক্তিবাদী বাঙালির মধ্যে কোনো গোল থাকার কথা নয়। অন্তত এ বিষয়ে মেঘনাথ সাহার মতামতকে যেকোনো রাজনীতির কারবারির ওপরে রাখাই সমীচীন।
এ বঙ্গে বাঙালির উৎসব পার্বণে আগে কোনোদিনও লাগেনি সাম্প্রদায়িকতার ছোঁয়া। সত্যনারায়ণের পুজোতে সত্যপীরের পাঁচালি পড়া হয় এই বাংলাতেই। সুন্দরবনে বনবিবির থানে লক্ষ্মী বাউরি আর রুকসানা বিবিরা সিন্নি চড়ায় এক সঙ্গে। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার জয়রামপুর শিব মন্দিরে নীল ষষ্ঠীর সকালে হাজার হাজার শিবভক্ত অপেক্ষা করে থাকেন কখন কালো আলখাল্লা পরা ফকির এসে জ্বালাবে বাতি, তবেই শুরু হবে শিবের পুজো। পীরের দরগার সেই ফকির যাদের মাথায় বুলিয়ে দেন শ্বেত চামর , তাঁরা মনে করেন, পেলেন শিবের আশীর্বাদ। সেই বাংলায় বাঙালির নিজস্ব উৎসব নববর্ষ কেন হয়ে থাকবে নিছক হিন্দুর পার্বণ ? কেন বাংলাদেশের মতো এপার বাংলার সমস্ত বাঙালির জাতিসত্তা উদযাপনের দিন হয়ে উঠবে না ?



