এপিক উপন্যাস : বিশ্বসাহিত্য ও বাংলা সাহিত্য

এপিক উপন্যাস : বিশ্বসাহিত্য ও বাংলা সাহিত্য

বিশ্বসাহিত্যের ধারা - রঞ্জন চক্রবর্ত্তী

১ : বাস্তববাদ ও সাহিত্য : সংশয় ও পথের দিশা

২ : প্রকৃতিবাদ এবং সাহিত্য : ভিন্নতর পথের সন্ধান

৩ : সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ এবং সাহিত্য

৪ : সাহিত্যচিন্তায় বৈচিত্র্য : ডাডাবাদ থেকে অধিবাস্তববাদ

৫ : অস্তিত্ববাদ এবং সাহিত্যদর্শনে অভিনবত্ব

৬ : অ্যাবসার্ডবাদ

৭ : জাদুবাস্তবতা এবং সাহিত্যচিন্তায় অভিনবত্ব

৮ : সাহিত্যে উত্তর-আধুনিকতা

৯ : আধুনিকোত্তর সাহিত্যচিন্তা

১০ :  জনপ্রিয় সাহিত্যের ধারায় স্ট্রিট লিটারেচার

১০ : জনপ্রিয় সাহিত্যের ধারায় স্ট্রিট লিটারেচার

উপন্যাসের বহুমাত্রিক রূপ

এপিক উপন্যাস : বিশ্বসাহিত্য ও বাংলা সাহিত্য

রুশ গদ্যসাহিত্যের আঙিনা

জীবনীসাহিত্য : গদ্যসাহিত্যের বিশেষ শাখা

জীবনীসাহিত্য : গদ্যসাহিত্যের বিশেষ শাখা

জীবনীসাহিত্য : গদ্যসাহিত্যের বিশেষ শাখা

লোকনাটকের উৎসকথা

রূপকথা নিয়ে কিছু কথা

                                            — Thomas Mann : ‘The Magic Mountain’

এপিক উপন্যাস বা ধ্রুবলক্ষণাক্রান্ত উপন্যাস হল সেই ধরণের সাহিত্যকীর্তি যেখানে কাহিনির ঠাসবুনোট বা চরিত্রসৃষ্টি প্রধান নয়। উপন্যাসের মূল কাহিনির বয়ন এবং বিস্তীর্ণ প্রেক্ষাপটে বহু বিচিত্র চরিত্রের আনাগোণা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাকে ছাপিয়ে গিয়ে এই ধরণের উপন্যাসে মুখ্য হয়ে দাঁড়ায় একটি যুগের চিত্র বা একটি ভাবগত দ্বন্দ্বের বিবরণ। তাছাড়াও এর মধ্যে থাকে নানারকম বিপরীতধর্মী চরিত্রের সংঘাত এবং কয়েকটি ভিন্নমুখী ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাত, যা পরিশেষে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে গিয়ে সমাপ্ত হয়। এই সব কিছুর আড়ালে থাকে একটি বিশেষ বক্তব্য (বা message), যা রচনাকে বিশিষ্টতা দান করে। এই মানদণ্ডের নিরিখে বিবেচনা করলে দেখা যায় বিশ্বসাহিত্যে সার্থক এপিক উপন্যাস খুব বেশি রচিত হয়নি।

এপিক ধরণের উপন্যাসের স্রষ্টা হিসেবে রাশিয়ার মহাসাহিত্যিক ফিওদর দস্তয়েভস্কি’র নাম উল্লেখ করা যায়। জীবনের চলার পথে তাঁর নানারকম অভিজ্ঞতা হয়েছে, কঠিন সংঘাতে তিনি আঘাত পেয়েছেন, জীবনের কাঁটার খোঁচায় তাঁর রক্তক্ষরণ হয়েছে। এক সময় তিনি ছিলেন বিদ্রোহী মতবাদের সমর্থক, তবে পরের দিকে রাশিয়ার অর্থোডক্স চার্চ ও জারতন্ত্রের সমর্থক হয়ে পড়েন। যাই হোক, তাঁর সাহিত্যচেতনা ও শিল্পবোধ কখনই হ্রাসপ্রাপ্ত হয়নি, বরং উত্তরোত্তর তা আরও পরিশিলীত হয়েছে। অসাধারণ চরিত্রচিত্রণ তাঁর উপন্যাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, এক্ষেত্রে বিশ্বের যে কোনও ঔপন্যাসিককে তিনি পিছনে ফেলে দেবেন। এই দিকপাল কথাসাহিত্যিক মানবচিত্তের বিভিন্ন অনুভূতি ও উপলব্ধিকে অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে ভাষারূপ দিয়েছেন, মানুষের দ্বৈত-সত্ত্বার মনস্তাপের শিল্পরূপ ফুটিয়ে তুলেছেন। ‘ক্রাইম অ্যাণ্ড পানিশমেন্ট’, ‘দ্য ইডিয়ট’ প্রভৃতি উপন্যাসে মানুষের মনের যে গভীরতম স্তরে তিনি অবলীলায় ডুব দিয়েছেন অপর মহান রুশ সাহিত্যিক লেভ তলস্তয় পর্যন্ত সেখানে পৌঁছাতে সক্ষম হন নি।

দস্তয়েভস্কি’র ‘দ্য ব্রাদারস কারামাজভ’ একটি সার্থক এপিক উপন্যাস। এই উপন্যাস এমন একটি বিরল সাহিত্যকীর্তি যা মানুষের অন্তর্জগতের গভীরে অবগাহন করে ভাল ও মন্দের কৃত্রিম সীমারেখা সম্বন্ধে যাবতীয় ছকে বাঁধা যান্ত্রিক ধারণাকে একেবারে ভেঙে-চুরে দেয়। উপন্যাসটি পাঠ করে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলেছিলেন —  “The Karamazov Brothers made a powerful impression on me. It is one of those books which smash the mechanical ideas of man’s inner world and of the frontiers between good and evil.” বড় ভাই আইভান কারমাজভের চরিত্র থেকে ধারণা পাওয়া যায় মানুষের সত্ত্বা কত জটিল হতে পারে বা কত রহস্যঘন পথে যেতে পারে। পাশাপাশি ছোট ভাই আলিয়সার চরিত্রে ফুটে উঠেছে সৎ, সুন্দর ও কল্যাণের আর্তি। সবোপরি সমগ্র উপন্যাসটিতে split personality যেভাবে আলো-আঁধারির খেলার মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে তার তুলনা মেলা ভার।

বিশ্বসাহিত্যের সর্বাধিক প্রসিদ্ধ উপন্যাসগুলির অন্যতম রউস মহাসাহিত্যিক লেভ তলস্তয়ের মহাকাব্যিক রচনা ‘ওয়ার অ্য়াণ্ড পীস’। ইতিহাসকে ভিত্তি করে লিখিত এই সুবৃহৎ উপন্যাসটিতে অনেক চরিত্রের দেখা মেলে। নেপোলিয়নের রাশিয়া অভিযানকে কেন্দ্র করে এর কাহিনি আবর্তিত হয়েছে। যুদ্ধের আধারে লেখক এখানে রাশিয়ার তিনটি অভিজাত পরিবারের (বেজুকভ, ভোলকোনস্কি ও রস্টভ) মানুষদের জীবনের আলেখ্য রচনা করেছেন। কাহিনীর মহাকাব্যিক বিস্তার এবং সামাজিক জীবনের ভাষাচিত্র অঙ্কণ — উভয়ক্ষেত্রেই তলস্তয় অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করেছেন।

তলস্তয় যেমন ‘ওয়ার অ্যাণ্ড পীস’ উপন্যাসে রাশিয়ার ইতিহাসের একটি পর্যায়ের আলেখ্য রচনা করেছেন তেমনই নিজের কিছু বক্তব্যও রেখেছেন। সেই বক্তব্যের মূলত দু’টি অভিমুখ। এক দিকে তিনি প্রকারান্তরে যুদ্ধের অসারতার কথা বলেছেন। আবার অন্যদিকে বলতে চেয়েছেন আক্রমণকারী যতই সৈন্যবল বা অস্ত্রবলে বলীয়ান হোক না কেন, আক্রান্ত পক্ষের দেশপ্রেম প্রবলভাবে জাগরুক হলে পৃথিবীর সেরা বাহিনীও তার কাছে পরাজিত হয়। নেপোলিয়নের শক্তিশালী বাহিনীর বিপরীতে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে রুশ সেনাপতি কুটুজভের ভরসা ছিল অকৃত্রিম দেশপ্রেমের শক্তি। মস্কোর প্রান্তে এসে নেপোলিয়নের অজেয় ফরাসি বাহিনী বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল।

রোমাঁ রোলাঁর লেখনীপ্রসূত ‘জাঁ ক্রিস্তফ’ উপন্যাসের বহিরঙ্গে জনৈক সঙ্গীতজ্ঞের জীবনের কথা বলা হয়েছে, অন্তরঙ্গে সেই সূত্রে বিধৃত হয়েছে ফরাসী ও জার্মান সংস্কৃতির আত্মিক ঐক্যের তত্ত্ব। সঙ্গীতশিল্পী জাঁ ক্রিস্তফের চরিত্রটি যেন জার্মান সঙ্গীতগুণী বিঠোফেনের প্রতিরূপক। জাঁ ক্রিস্তফের জীবন উদ্দামতার পাশাপাশি সৃষ্টিশীলতার প্রতীক, বিপরীতক্রমে তার বন্ধু অলিভিয়ারের চরিত্র মানবপ্রীতি ও সহনশীলতার সংমিশ্রণে উজ্জ্বল। এই দু’টি চরিত্র মিলিতভাবে একটি অখণ্ড জীবনাদর্শের বৃত্ত পূর্ণ করেছে। আরও গভীরে গেলে দেখা যাবে এই দু’টি চরিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে লেখক বলতে চেয়েছেন জার্মান ও ফরাসী সংস্কৃতি একে অপরের পরিপূরক। এছাড়া উপন্যাসটির অপর বিশেষত্ব হল এখানে ইউরোপীয় সঙ্গীতের বিবর্তনের ইতিবৃত্ত যেভাবে বিস্তৃত আকারে বর্ণনা করা হয়েছে তা থেকে মনে হতে পারে এটি সঙ্গীতের কোষগ্রন্থ। ‘জাঁ ক্রিস্তফ’ এপিক উপন্যাস বলেই রোমাঁ রোলাঁ এভাবে নিজের বক্তব্য বলতে পেরেছেন।

নোবেলজয়ী ইংরেজ সাহিত্যিক জন গলসোয়ার্দি রচিত ‘দ্য ফরসাইট সাগা’ সর্ব অর্থেই একটি এপিক উপন্যাস। ফরসাইট পরিবারের একাধিক প্রতিনিধির চরিত্রচিত্র অঙ্কনের মাধ্যমে লেখক উচ্চবিত্ত সমাজের শ্রেণীগত অর্থলিপ্সার বাস্তব ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন। সোমস ফরসাইট হল একটি আদ্যন্ত বৈষয়িক মানুষ। প্রকৃতপক্ষে সে প্রবল বৈশ্য মনোবৃত্তির দ্বারা পরিচালিত, যদিও সমাজের শ্রদ্ধা পাওয়ার জন্য চিত্র-সংগ্রাহকের ভেক ধরেছে। শিল্পের প্রতি তার কৃত্রিম আকর্ষণ আসলে অন্তরের বণিকবৃত্তি আড়াল করার প্রচেষ্টা। সত্যিকারের শিল্পপ্রেমী না হলেও সমাজের উপরমহলে সে শিল্পরসিক হিসেবে পরিচিত। তবে সোমসের আসল স্থুল রূপটি তার স্ত্রী আইরিনের কাছে গোপন থাকে না। সংবেদনশীল মহিলা আইরিন সূক্ষ্ম অনুভূতির অধিকারিণী, সে বিদ্রোহ করে পতিকে ছেড়ে যায়।

বিংশ শতাব্দীর জার্মান সাহিত্যের সর্বাপেক্ষা প্রভাব বিস্তারকারী রচনাগুলির মধ্যে অন্যতম হল টমাস মানের উপন্যাস ‘দ্য ম্যাজিক মাউন্টেন’ (প্রকাশকাল ১৯২৪)। এই উপন্যাস প্রকৃতপক্ষে একটি হাসপাতাল-আবাসের রূপকে রোগগ্রস্ত জার্মান সভ্যতার সমালোচনা। জার্মান জঙ্গীতন্ত্রের আসল রূপটি সাহিত্যিক মানের চোখে অনেক আগেই ধরা পড়েছিল। হিটলারের জার্মানি ত্যাগ করে তিনি আত্মরক্ষা করেছিলেন। আলোচ্য উপন্যাসটি রিয়ালিজমের সঙ্গে গভীরতর সাংকেতিক অর্থের সংমিশ্রণ। এরকম জটিল বিন্যাসের ফলে উপন্যাসটি এপিকধর্মী এবং পাঠকের কাছে এর অন্তর্নিহিত অর্থ বোঝা কিঞ্চিৎ কঠিন মনে হতে পারে, সমগ্র রচনাটি খুঁটিয়ে পড়লে তবেই তার পক্ষে ঘটনার ক্রমিক বিন্যাসের তাৎপর্য অনুধাবন করা সম্ভব।

রুশ সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য এপিক উপন্যাসগুলির মধ্যে আছে লেভ তলস্তয়ের ‘আনা কারেনিনা’ এবং মিখাইল শলোকভের ‘অ্যাণ্ড কোয়ায়েট ফ্লোজ দ্য ডন’। তলস্তয় নিজেই বলেছিলেন ‘আনা কারেনিনা’ তাঁর প্রথম প্রকৃত উপন্যাস। সমালোচকদের মতে এই রচনাটি রিয়ালিস্ট ও মডার্নিস্ট উপন্যাসের মাঝে যোগসূত্র রচনা করেছে। শলোকভের চার খণ্ডে সমাপ্ত এপিক উপন্যাসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন, রুশ বিপ্লবের কালে ও রাশিয়ায় গৃহযুদ্ধের সময় ডন নদীর কসাকদের জীবন ও সংগ্রাম বর্ণিত হয়েছে। এই মহান সাহিত্যকীর্তিটির জন্য তিনি ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

ফরাসী সাহিত্যের অঙ্গনে বালজাকের ‘La Comedie humaine’ (১৯২৯-১৯৪৮) একটি বহুল আলোচিত রচনা। এটি হল সর্বমোট ৯১টি সমাপ্ত এবং ৪৬টি অসমাপ্ত রচনার সংকলন, উপন্যাস ও গল্পগুলি পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। রোমাঁ রোলাঁর লেখনীপ্রসূত ‘দ্য সোল এনচ্যান্টেড’ সমালোচকদের বিচারে এপিক উপন্যাসের অভিধায় ভূষিত। একটি নারীর জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র তিনটি (অ্যানেট, সিলভি ও মার্ক) নিজের বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। মার্কিন সাহিত্যের ভাণ্ডারে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হেরম্যান মেলভিলের ‘মবি ডিক’। ডি. এইচ. লরেন্স বলেছিলেন এই বইটি হল ‘one of the strangest and most wonderful books in the world.’

নোবেলজয়ী পোলিশ সাহিত্যিক হেনরিক সিনকুইজ রচিত ‘কুয়ো ভাদিস: এ ন্যারেটিভ অব দ্য টাইম অব নীরো’ (যা সাধারণভাবে ‘কুয়ো ভাদিস’ নামে পরিচিত) হলপ্রকৃত অর্থেই একটি মহাকাব্যিক উপন্যাস। এখানে লেখক লিসিয়া নামক এক খ্রিস্টান তরুণী এবং মার্কাস ভিনিসিয়াস নামক একজন রোমানের মধ্যে গড়ে ওঠা প্রেমের কাহিনি বলেছেন। উপন্যাসের পটভূমি রোম শহর, যখন নীরো সম্রাটের সিংহাসনে আসীন। আরও একজন নোবেলজয়ী পোলিশ সাহিত্যিক ভাদিস্ল রেমঁর লেখনীপ্রসূত ‘দ্য পিজ্যান্টস’ একটি বিশ্ববিখ্যাত এপিক উপন্যাস। চার খণ্ডে সমাপ্ত এই উপন্যাসটি লিখতে সময় লেগেছিল সাত বছর। প্রতিটি খণ্ড কৃষকের জীবনের এক একটি ঋতুকে (শরৎ, শীত, বসন্ত এবং গ্রীষ্ম) উপস্থাপিত করে। এরকম বিভাগ আসলে মানবজীবনের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পককে দ্যোতিত করে।

ফিনল্যাণ্ডের সাহিত্যে এপিক উপন্যাসের উদাহরণ ফ্রানস এমিল সিলানপা রচিত ‘মীক হেরিটেজ’। তিনিই ফিনল্যাণ্ডের প্রথম নোবেলজয়ী সাহিত্যিক। আইসল্যাণ্ডের সাহিত্যসম্ভারে এপিক উপন্যাস হল নোবেলজয়ী সাহিত্যিক হলডোর ল্যাক্সনেস রচিত ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট পিপল’। এই উপন্যাসের উপজীব্য হল বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের আইসল্যাণ্ডের দরিদ্র কৃষকদের জীবনসংগ্রাম। এছাড়া যুগোস্লাভ সাহিত্যে এপিক উপন্যাসের উদাহরণ হল নোবেলজয়ী সাহিত্যিক ইভো আন্দ্রিচ রচিত ‘দ্য ব্রিজ অন দ্য ড্রিনা’। সার্বো-ক্রোয়েশিয়ান ভাষার লিখিত এই ঐতিহাসিক উপন্যাসটির কাহিনি চার শতাব্দী জুড়ে বিস্তৃত এবং সর্ব অর্থেই মহাকাব্যিক এর ব্যাপ্তি। আইরিশ সাহিত্যিক জেমস জয়েসের অমর সৃষ্টি ‘ইউলিসিস’ উপন্যাসটিকে মডার্নিস্ট সাহিত্যের অন্যতম সেরা নিদর্শন হিসেবে গণ্য করা হয়। সমালোচক ডিক্লান কীবার্ড অভিমত প্রকাশ করেছেন  — “Before Joyce, no writer of fiction had so foregrounded the process of thinking.”

বাংলায় যে উপন্যাসগুলি রচিত হয়েছে তার মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’, ‘দেবী চৌধুরাণী’ ও ‘সীতারাম’ উপন্যাসত্রয়ীকে একত্রে এপিকধর্মী বলা যেতে পারে। প্রতিটি উপন্যাসের ঘটনার ধারা আলাদা এবং চরিত্রগতভাবেও তারা পৃথক। কিন্তু বক্তব্যের দিক থেকে বিচার করলে অনেকটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। উপন্যাস তিনটির কাহিনির বিস্তার এবং চরিত্রচিত্রণের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্রের অনুশীলন তত্ত্বের আদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল হিন্দুধর্ম তথা হিন্দু পারিবারিক আদর্শের মহিমা বর্ণনা। এই আদর্শ প্রচারের উদ্দেশ্য নিয়েই তিনি ত্রয়ী উপন্যাসের পরিকল্পনা করেছিলেন। আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, একই কেন্দ্রীয় বক্তব্যের সূত্রে উপন্যাস তিনটি গাঁথা আছে। সে দিক থেকে ধরলে বঙ্কিমের ট্রিলজি অখণ্ডভাবে এপিক উপন্যাস রূপে বিবেচিত হতে পারে।

প্রকৃতপক্ষে বাংলা সাহিত্যের জগতে অদ্যাবধি শ্রেষ্ঠ এপিক উপন্যাস রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’। ঘটনার ব্যাপ্তি, বক্তব্যের সাহিত্যিক উপস্থাপনা এবং চরিত্র সৃষ্টির বৈচিত্র্যের দিক থেকে এই উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ চরম ক্ষমতা প্রদর্শন করেছেন। একদিকে যেমন তিনি যুগের ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন, তেমনই অন্যদিকে সামাজিক অনুভবের প্রসারতার সীমাকে অতিক্রম করে গিয়েছেন। বিশ্বসাহিত্যের উল্লেখযোগ্য এপিক উপন্যাসগুলির তালিকায় ‘গোরা’ নিঃসন্দেহে উপরের দিকে থাকবে।

শরৎচন্দ্রের উপন্যাসগুলির মধ্যে ‘শ্রীকান্ত’ (চার খণ্ড একত্রে) এপিকরূপে বিবেচিত হতে পারে। তবে এপিক উপন্যাসের একটা বড় বৈশিষ্ট্য এখানে অনুপস্থিত, এই উপন্যাসে যুগের ছবি ফুটে ওঠেনি। আগাগোড়া কাহিনীটি পুরুষ ও নারীর পারস্পরিক প্রেমজ সম্পর্কের চড়াই-উৎরাই বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের আরোহণ-অবরোহণের মধ্যে আবর্তিত হয়েছে। কিন্তু শরৎচন্দ্রের উপন্যাসচতুষ্টয়ে কোথাও নর-নারীর ব্যক্তিগত প্রেমকে ছাপিয়ে গিয়ে একটি যুগ প্রতিফলিত হয়নি। তা ছাড়া এখানে লেখকের বক্তব্যও সুস্পষ্টরূপে পাওয়া যায় না। এর ফলে যথার্থ এপিক উপন্যাসের চরিত্রলক্ষণ এখানে অনুপস্থিত। চরিত্রলক্ষণের দিক থেকে বিচার করলে শরৎচন্দ্রের যে রচনাটির এপিক উপন্যাসের শ্রেণীভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল সেটি হল ‘শেষ প্রশ্ন’। কিন্তু এখানেও ঔপন্যাসিকের সুস্পষ্ট বক্তব্যের অভাব রয়েছে। বরং তার জায়গায় আছে বিভিন্ন মতের সংঘাত ও তর্কের বাতাবরণ। আবার এই মতের সংঘাতের পিছনে কোনও বিশেষ আদর্শগত পটভূমিকাও খুঁজে পাওয়া না। তা ছাড়া উপন্যাসটির মধ্যে কোথাও জীবনের কোনও বিশেষ দিকের বিস্লেষণধর্মী আলোচনা বা সেই সংক্রান্ত কোনও প্রশ্নের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা নেই। তাই সব দিক থেকে বিচার করলে ‘শেষ প্রশ্ন’-কে এপিক উপন্যাসের শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত করা যায় না।

অন্নদাশঙ্কর রায়ের ‘সত্যাসত্য’ উপন্যাসটি এপিকের মর্যাদা পেতে পারে। ছয় খণ্ডে সমাপ্ত উপন্যাসটিতে দু’টি সুনির্দিষ্ট ভাবধারার সংঘাত পরিস্কারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তা ছাড়া উপন্যাসটির সর্বাঙ্গে যুগলক্ষণ ফুটে উঠেছে। বাদল চরিত্রটির মাধ্যমে ইউরোপীয় ভোগবাদ ও নাস্তিক্য প্রদর্শিত হয়েছে, পক্ষান্তরে সুধী চরিত্রটিতে ভারতীয় আস্তিক্য, সহনশীলতার আদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে। এই দুই বিপরীতধর্মী আদর্শের দ্বন্দ্ব কাহিনির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করেছে। উপন্যাসের নায়িকা উজ্জয়িনীর চরিত্রটি লেখক অসাধারণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। কিন্তু ‘সত্যাসত্য’ উপন্যাসটি ঘরে-বাইরে বা গৃহদাহের মত ত্রিকোণ প্রেমের কাহিনি নয়। এর কেন্দ্রস্থলে আছে ভাবগত দ্বন্দ্ব। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালের ইউরোপ এবং ভারতবর্ষের দৃষ্টিকোণের বৈপরীত্যকে কেন্দ্র করে এই দ্বন্দ্বের ভাষাচিত্র আঁকা হয়েছে। উৎকেন্দ্রিক ও চঞ্চল বাদল যুদ্ধক্লান্ত ইউরোপের অস্থিরতার প্রতিভূ। আর সংযত ও স্থিতধী সুধীর চরিত্রে দেখা যায় ভারতীয় প্রেম ও ক্ষমার আদর্শের প্রতিফলন। উজ্জয়িনীর চরিত্রটি হল এই দু’টি বিপরীত আদর্শের সংঘাতে জর্জরিত বিংশ শতকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকের ভারতীয় মানসিকতার প্রতিরূপক।

কালান্তরের কথাকার তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের ‘হাঁসুলিবাঁকের উপকথা’ উপন্যাসটি এপিক লক্ষণাক্রান্ত। এতে গ্রামের উপান্তে নতুন শিল্পপ্রকল্প প্রতিষ্ঠার সূত্র ধরে উপন্যাসের আদলে তিন প্রকার সংঘাত প্রতিফলিত হয়েছে — প্রথমত নবধনিকতন্ত্রের সঙ্গে ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততন্ত্রের সংঘাত,  দ্বিতীয়ত নতুন শিল্পোদ্যোগের সঙ্গে কৃষিভিত্তিক পুরনো জীবনধারার সংঘাত. তৃতীয়ত আধুনিকতার সঙ্গে প্রাচীনতার সংঘাত। গ্রামের মানুষরা যে চিরাচরিত জীবনধারায় অভ্যস্ত কারখানার বাঁশী তাকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। চরিত্রচিত্রণেও লেখক মুন্সীয়ানা দেখিয়েছেন। কাহারদের মোড়লস্থানীয় বনোয়ারীকে তিনি পুরনো জীবনধারার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত করেছেন, কাহার যুবক করালীর মধ্যে যুগপরির্বতনের প্রতিরূপ এঁকেছেন, সুচাঁদ বুড়ী চরিত্রটির দ্বারা আদিমতার সংস্কার মনে করিয়ে দিয়েছেন। তাঁর ‘গণদেবতা’ ও ‘পঞ্চগ্রাম’ একত্রে এপিক উপন্যাস বলে বিবেচিত হওয়ার দাবী রাখে। ‘ধাত্রীদেবতা’ সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য।

বনফুলের দু’টি উপন্যাস ‘স্থাবর’ ও ‘জঙ্গম’ একত্রে এপিক অভিধায় ভূষিত হতে পারে। গঠনগত দিক থেকে বিচার করলে উপন্যাসদ্বয়ের কাহিনি অংশ মানবসভ্যতার বিবর্তন ও অগ্রগতির প্রতিরূপকে গড়ে উঠেছে। তবে বনফুলের রচনায় মানবিকতার আবেদনের থেকে শিল্পনৈপুণ্য অপেক্ষাকৃত বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। তা সত্বেও উপন্যাসদু’টিতে এপিকের লক্ষণ আছে। এ ছাড়া সতীনাথ ভাদুড়ির অসামান্য সৃষ্টি ‘ঢোঁড়াই চরিতমানস’ বা অদ্বৈত মল্লবর্ধনের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ এপিক বলে বিবেচিত হতে পারে।

ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ত্রয়ী উপন্যাস ‘অম্তঃশীলা’, ‘আবর্ত’ ও ‘মোহনা’ একত্রে এপিক উপন্যাস রূপে বিবেচিত হতে পারে। এগুলি ‘চৈতন্যের স্রোত’ বা ‘চেতনাপ্রবাহ’ (অর্থাৎ ‘stream of conscious’) তত্ত্বের সাহিত্যরূপ। সেই সঙ্গে ধ্রুপদী রূপের উপন্যাসগুলিতে যুগচিত্রও বেশ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তবে বিভিন্ন উপাদানের আনুপাতিক বিশ্লেষণে দেখা যায় ধূর্জটিপ্রসাদের উপন্যাসগুলিতে মননশীলতার আতিশয্য সাহিত্যরসের তুলনায় অনেকটাই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে, এই কারণে সাহিত্যরসের কিঞ্চিৎ হানি হয়েছে মনে হয়। সঞ্জয় ভট্টাচার্যের ‘মৌচাক’ ও ‘রাত্রি’ উপন্যাসদুটিও ‘চেতনাপ্রবাহ’ তত্ত্বের আধারে প্রতিষ্ঠিত। এখানেও বুদ্ধির ছাপ বেশি, মানবিকতার রূপায়ণ তুলনায় কম। এর ফলে লেখকের মনের স্বাভাবিক সহানুভূতি কিছুটা চাপা পড়ে গিয়েছে।

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘উপনিবেশ’ উপন্যাসটি দক্ষিণবঙ্গের সমু্দ্রবেষ্টিত চরগুলি মানুষের বসতিতে ভরে যাওয়ার কাহিনি। বিমল মিত্রের ‘সাহেব-বিবি-গোলাম’ উপন্যাসটি এপিক গুণসম্পন্ন, এতে কলকাতার বিগত দিনের বাবু কালচারের আমলের যুগচিত্র সার্থকভাবে পরিস্ফুট হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকটি উপন্যাসকে তর্কসাপেক্ষে এপিক বলা যেত পারে। এর মধ্যে পড়বে অন্নদাশঙ্কর রায়ের ‘রত্ন ও শ্রীমতী’, গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্যের ‘ইস্পাতের স্বাক্ষর’, দীপক চৌধুরীর তিন খণ্ডে সম্পূর্ণ ‘পাতালে এক ঋতু’, মনোজ বসুর ‘বন কেটে বসত’, বিমল মিত্রের ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ ও ‘বেগম মেরী বিশ্বাস’ এবং সমরেশ বসুর ‘গঙ্গা’ প্রভৃতি উপন্যাস।

এপিক উপন্যাসের কিছু ধ্রুপদী বা চিরায়ত বৈশিষ্ট্য আছে। একটি উপন্যাসকে এপিক পদবাচ্য হতে হলে তার মধ্যে কাহিনির আধারে মননশীলতা, বুদ্ধির দীপ্তি ও সাহিত্যরসের সমানুপাতিক মিশ্রণ থাকা দরকার। উপন্যাসকে এপিকের স্তরে উন্নীত করতে হলে লেখককে ঘটনার সংঘাত ও চরিত্রের দ্বন্দ্ব প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি যুগজীবনের ছবি ফুটিয়ে তুলতে হবে। সর্বোপরি সমগ্র রচনাটিতে লেখকের সুনির্দিষ্ট বক্তব্য পরিব্যাপ্ত থাকতেই হবে। শুধুমাত্র আয়তনে বড় হলে কিংবা ঘনসন্নিবদ্ধ জটিল বা যৌগিক প্লট থাকলেই একটি উপন্যাস এপিকের লক্ষণাক্রান্ত হয় না। আবার মূল কাহিনির সঙ্গে শাখা-প্রশাখায় বিন্যস্ত উপকাহিনীর নিপুণ সন্নিবেশ ঘটলেই তা এপিক হয় না। শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমের মতই এপিক উপন্যাস রচনা করতে গেলে লেখককে জীবনের গভীরে অবগাহন করতে হয়। যে কারণে ইউলিসিস উপন্যাসে জেমস জয়েস বলেছেন — “The supreme question about a work of art is out of how deep a life does it spring.”

বিশ্বসাহিত্যের ধারা - রঞ্জন চক্রবর্ত্তী

উপন্যাসের বহুমাত্রিক রূপ রুশ গদ্যসাহিত্যের আঙিনা

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

বিশ্বকে বাংলায় চেনার জানলা মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

This entry is part 13 of 19 in the series বিশ্বসাহিত্যের ধারা – রঞ্জন চক্রবর্ত্তী আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

বিশ্বকে বাংলায় চেনার জানলা মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

This entry is part 13 of 19 in the series বিশ্বসাহিত্যের ধারা – রঞ্জন চক্রবর্ত্তী আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর

Read More »

২০ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

This entry is part 13 of 19 in the series বিশ্বসাহিত্যের ধারা – রঞ্জন চক্রবর্ত্তী এক দৃষ্টিহীন পেঁচা ১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা ২ :

Read More »