ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ - নবকুমার দাস
প্রশ্ন, সাধনা ও সমন্বয়ের দীর্ঘ সভ্যতাপথ
ভারতের সংস্কৃতি – ৩
নবকুমার দাস
ভারতের সভ্যতা কোনও আকস্মিক বিস্ফোরণ নয়।
সে এক দীর্ঘ সাধনার ফল—নদীর মতো ধীরে ধীরে জমে ওঠা, পথ বদলানো, আবার বহমান থাকা। এই সভ্যতার গভীরে আছে প্রশ্ন, তার উপর আছে সাধনা, আর সর্বশেষে আছে সমন্বয়। সেই কারণেই ভারত কখনও একরৈখিক নয়; সে বহুধাবিভক্ত অথচ অন্তঃসলিলা এক প্রবাহ।
এই দীর্ঘ যাত্রার আদিম স্বর ধ্বনিত হয় বেদের স্তোত্রে, তার মধ্যবর্তী বাঁকে দেখা দেয় শ্রমণ আন্দোলনের প্রশ্নমুখর চেতনা, আর তার পরিণত সাংস্কৃতিক রূপ গড়ে ওঠে পুরাণীয় ভারতের বহুরূপী সমাজে। এই প্রবন্ধ সেই ধারাবাহিক পথচলারই এক মননশীল অনুসন্ধান।
বেদের জগৎ আসলে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের প্রথম সংলাপ। অবশ্যই ভারতীয় সংস্কৃতির প্রথম লিখিত দলিল বেদ। ঋগ্বেদের স্তোত্রগুলি কেবল ধর্মীয় প্রার্থনা নয়—সেগুলি মানুষের বিস্ময়, ভয়, কৃতজ্ঞতা ও অনুসন্ধানের কাব্যিক নথি। সূর্য, অগ্নি, বায়ু, বরুণ—এরা দেবতা হলেও প্রকৃতির শক্তিরই প্রতীক। এখানে মানুষ প্রকৃতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করছে, স্তব করছে, আবার নিজের অবস্থান খুঁজে নিচ্ছে।
ঋগ্বেদের একটি বিখ্যাত উক্তি — “একং সদ্ বিপ্রা বহুধা বদন্তি” এর অর্থ সত্য এক, কিন্তু জ্ঞানীরা তাকে নানা নামে বর্ণনা করেন — এই পংক্তির মধ্যেই নিহিত রয়েছে ভারতীয় সভ্যতার মৌলিক দার্শনিক চরিত্র : বহুত্ববাদ। বেদ কখনও একমাত্র সত্যের দাবিদার হয়নি; বরং বহু দৃষ্টিভঙ্গির সহাবস্থানকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
যজ্ঞ ছিল বৈদিক সমাজের কেন্দ্র। কিন্তু তা কেবল দেবতার উদ্দেশে আহুতি নয়—তা ছিল সামাজিক সংহতির আচার, যেখানে পুরোহিত, গৃহস্থ ও সমাজ একত্রিত হত। জীবন, প্রকৃতি ও সমাজ—এই ত্রয়ীর মধ্যেই বৈদিক বোধের শিকড়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানা রকম প্রশ্ন আরও গভীর হল। ব্রাহ্মণ ও আরণ্যক গ্রন্থে যজ্ঞের আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা দেখা দিল, আর উপনিষদে এসে সেই যজ্ঞ সম্পূর্ণ অন্তর্মুখী হয়ে উঠল। “তত্ত্বমসি” — তুমিই সেই ব্রহ্ম। “অহং ব্রহ্মাস্মি” — আমিই ব্রহ্ম। এখানে দেবতা আর বাইরে নেই; তিনি আছেন মানুষের অন্তরে। আত্মা ও বিশ্ব একাকার। এই চিন্তা পরবর্তী ভারতীয় দর্শনের ভিত্তি নির্মাণ করল।
এই পর্যায়েই দর্শনের নানা ধারা গড়ে ওঠে—ন্যায়, বৈশেষিক, সাংখ্য, যোগ, মীমাংসা, বেদান্ত। এরা বেদকে মান্য করলেও প্রশ্ন করার অধিকার ছাড়েনি।
কিন্তু ভারতীয় সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল—বিরুদ্ধ মতের সহাবস্থান। বৈদিক ধারার পাশাপাশি জন্ম নিল নাস্তিক দর্শন। চার্বাক বলল— প্রত্যক্ষ ছাড়া আর কিছুই সত্য নয়।
আজীবিকরা নিয়তিবাদে বিশ্বাস করল, জৈন ও বৌদ্ধ দর্শন আত্মসংযম ও করুণাকে মুক্তির পথ হিসেবে দেখাল। এই বহুস্বরতা প্রমাণ করে—ভারত কখনও একচোখা সভ্যতা ছিল না। বিতর্কই ছিল তার প্রাণ। দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় দেখিয়েছেন, এই নাস্তিক ধারাগুলি ভারতীয় চিন্তাকে আরও গভীর ও যুক্তিনিষ্ঠ করেছে।
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে গঙ্গা–যমুনা অববাহিকায় শ্রমণ আন্দোলন এই প্রশ্নগুলিকে সামাজিক ও নৈতিক রূপ দিল। গৌতম বুদ্ধ বললেন— “অত্তা হি অত্তনো নাথো” অর্থাৎ নিজেই নিজের আশ্রয়।
মহাবীর অহিংসাকে সর্বোচ্চ নৈতিক আদর্শে উন্নীত করলেন। জন্ম নয়, কর্মই মানুষের পরিচয়—এই ভাবনা সমাজে এক নতুন নৈতিক চেতনার জন্ম দিল।
শ্রমণ আন্দোলন শুধু ধর্মীয় ছিল না; তা ছিল সামাজিক বিপ্লব। নারীদের অংশগ্রহণ, জাতিভেদের সমালোচনা, সহজ জীবনের আদর্শ—সব মিলিয়ে এটি ভারতীয় সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দিল।
এই চেতনার রাষ্ট্রিক প্রকাশ ঘটল অশোকের শাসনে। কলিঙ্গ যুদ্ধের পর তাঁর শিলালিপিতে যে ধর্ম ঘোষিত হল, তা কোনও বিশেষ ধর্ম নয়—তা নৈতিক মানবতাবাদ। সকল সম্প্রদায়ের প্রতি সহিষ্ণুতা, করুণা ও অহিংসা—রাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হয়ে উঠল। রোমিলা থাপার এর মতে, অশোকের ধর্ম ছিল ভারতীয় ইতিহাসে এক অনন্য সামাজিক চুক্তি।
শ্রমণ আন্দোলনের প্রশ্ন বৈদিক সমাজকে আত্মসমালোচনায় বাধ্য করল। তারই ফল পৌরাণিক ভারত। পুরাণ মানে কেবল কাহিনি নয়—তা ইতিহাস, দর্শন, লোকবিশ্বাস ও নৈতিক শিক্ষার এক বিস্তৃত সংকলন। এখানে ঈশ্বর মানুষের ঘরের মানুষ—রাম, কৃষ্ণ, শিব, দুর্গা। ভক্তি হয়ে উঠল ধর্মের কেন্দ্রবিন্দু। বুদ্ধকে বিষ্ণুর অবতার হিসেবে গ্রহণ করা নিছক ধর্মীয় নয়—এ এক সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের কৌশল। রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতে, পুরাণীয় ভারতই ভারতীয় সমাজকে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ঐক্যে বেঁধেছে।
এই পর্যায়ে গুরু–শিষ্য পরম্পরা শক্তিশালী হয়। আশ্রম, মঠ, তীর্থ—সবই জ্ঞানের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এম. এন. শ্রীনিবাস যে সংস্কৃতায়নের কথা বলেছেন, তার মধ্য দিয়ে স্থানীয় সংস্কৃতি বৃহত্তর হিন্দু কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়, আবার নিজের স্বাতন্ত্র্যও বজায় রাখে।
সুতরাং, বেদ প্রশ্ন তুলেছিল, শ্রমণ আন্দোলন সেই প্রশ্নকে তীক্ষ্ণ করেছিল, পুরাণীয় ভারত সেই প্রশ্নকে সমাজের ভাষায় রূপ দিয়েছিল। এই দ্বন্দ্ব, সংলাপ ও সমন্বয়ের মধ্য দিয়েই ভারত আজও বেঁচে আছে। ভারত কোনও একক মতের দেশ নয়—সে এক দীর্ঘ কথোপকথন। নদীর মতো — যেখানে বহু স্রোত এসে মিলেছে, কিন্তু একটাই প্রবাহ।
তথ্যসূত্র :
১. ঋগ্বেদ, উপনিষদ ২. দীঘনিকায়, মজ্ঝিমনিকায় ৩. জৈন আগম সাহিত্য ৪. 4. রোমিলা থাপার — Early India ৫. রামশরণ শর্মা — Ancient India ৬. দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় — Indian Atheism ৭. রাহুল সাংকৃত্যায়ন — বৌদ্ধ দর্শন ৮.নাদিম হাসনাইন — Indian Society ৯. এম. এন. শ্রীনিবাস — Religion and Society among the Coorgs of South India


