ধ্রুপদী সাহিত্য
শ্যামলকৃষ্ণ বসু
[ অযোধ্যাকান্ড ১ ]
।৪।
মন্থরা নামে সে দাসী
অদ্য প্রভাতে অযোধ্যানগরী ব্রাহ্মমুহূর্তে জেগে উঠেছে। নগরবাসী আজ উৎসবের আনন্দে বুঝি আর আলস শয়নে কালাতিপাত অনুচিত জ্ঞানে সকলেই শয্যাত্যাগ করে প্রস্তুত হয়ে নিয়েছেন আসন্ন উৎসবের কারনে।
রাজপ্রাসাদের নহবতের সানাইয়ের প্রভাতী রাগালাপে নগরবাসি সুনন্দিত হয়ে উঠতে থাকে মনে মনে। প্রভাতের প্রথম অরুন আলোয় উৎসব নগরী এখন ক্রমে ক্রমে উদ্ভাসিত হয়ে উঠতে থাকে। পক্ষী কুজনে আর রাগিণীর গুঞ্জনে তখন আকাশ বাতাস পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
প্রাসাদের উপর হতে দেখা যায় রাজপথ চন্দন জলে সিক্ত। কমল উৎপল আকীর্ণ এবং ধ্বজ পতাকায় নগর সুশোভিত।
নগরের প্রতি গৃহ ফুলের মালা এবং ধ্বজ পতাকায় সাজানো। মন্দিরে মন্দিরে আলপনা। ব্রাহ্মণেরা মালা চন্দন পড়ে মন্ত্র পাঠ করতে করতে চলেছেন মন্দিরের দিকে। রাজপথে এই প্রভাতেই কাতারে কাতারে নানা রঙের সব মিছিল। হাতির পিঠে জরির হাওদা। নিশান উড়িয়ে চলেছে সোনার রথ আর যুদ্ধের ঘোড়া। শাঁখ বাজছে বাজনা বাজছে। নগরবাসীগন মোদক এবং মাল্য হাতে দেবালয় হতে দেবালয়ে গমনাগমন করতে ব্যস্ত। কোথাও বেদপাঠ কোথাও বাদ্যধ্বনি এক আনন্দময় পরিবেশ গড়ে তুলেছে। নগরবাসী সকলে অতিশয় হৃষ্ট। ওই দেখা যায় রাম জননী কৌশল্যা এই প্রভাতে কত সে স্বর্ণমুদ্রা এবং অন্যান্য কত কত দ্রব্য সামগ্রী দান ধানে ব্যস্ত।
আর ঠিক তখন কেকয় ভবনের অলিন্দে এসে দাঁড়ায় কৌতুহলী দাসী মন্থরা।
রাণী কৈকেয়ী পিত্রালয় হতে এনেছিলেন এক কুব্জা দাসী। নাম তাঁর মন্থরা। অন্দরমহলের সকলেই তাকে দেখে বিরক্ত হয় । কিন্তু রাজদাসী। তাই সবাই তাঁকে যথা সম্ভব এড়িয়েই চলে।
মন্থরা এই সুন্দর প্রভাতে উৎসবমুখর নগরের দৃশ্য দেখে চমৎকৃত হয়ে ওঠে এবং বড়রাণী কৌশল্যাকে মন্দিরের চত্বরে বসে সকল গরীব দুঃখী কে দানধ্যানে রত দেখে জিজ্ঞাসু হয়ে ওঠে ।
মন্থরা কৌতুহলী হয়ে কিয়ৎদ্দুরে দণ্ডায়মান এক ধাত্রীকে দেখে জিজ্ঞেস করে, ‘হ্যাঁগা বাছা, রাম জননী সবাইকে এত এত ধন দান করছেন কেন ? নগরে আজ কিসের আনন্দ?’
ধাত্রী সে হর্ষে বিদীর্ণ হয়ে বলে ওঠেন,‘ ওম্মা, সেও জানো না বুঝি ? আজ যে সকলের নয়নের মনি দশরথ পুত্র রাম সিংহাসনে অভিষিক্ত হবেন। আজ তাই তো অযোধ্যানগরী আনন্দমগন।’
মন্থরা বুঝি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারে না। রাম রাজা হবে? এই তো সেই পরম প্রার্থিত সময়। আজ এই সময়কে হেলায় হারানো নয় এখন। মন্থরা তখনই কৈকেয়ীর শয়নগৃহের দিকে দ্রুত ধাবিত হয়।
কৈকেয়ী তখন রাজশয্যায় আলসে বিলাসে অর্ধশায়িতা। এ হলো কৈকেয়ীর শয়ন কক্ষ। দশরথের বিলাস মঞ্জিল। সৌন্দর্যে ঐশ্বর্যে ঝলমল করছে। শিল্পীর স্বপ্নলোকের মায়া দিয়ে গড়া রাজার নিভৃত কানন।
সোনার পালঙ্কে শায়িতা কৈকেয়ী। বাতায়ন পথে পুষ্প উদ্যানের শোভা। চৈত্রদিনের বসন্ত বাতাসে কৈকেয়ী অলস বিশ্রামে অর্ধনিদ্রিতা। এমন সময় আচমকা ‘হায় হায়’ করতে করতে ঘরে এসে দাঁড়ায় দাসী মন্থরা।
রাজা দশরথ যখন কৈকেয়ীকে বিবাহ করে আনেন তখন কৈকেয়ীর পিতা রাজা অশ্বপতি কন্যার সঙ্গে যৌতুক হিসাবে এই কুরুপা কুব্জা দাসী মন্থরাকে প্রেরন করেছিলেন। এ এক স্বাভাবিক প্রথা। দাসীর প্রয়োজনেই দাসী প্রেরন। কন্যার কষ্ট লাঘব করতে দাসী প্রেরন। সে অন্ধ না নুব্জ্যা কে বিচার করে। আর দাসী যখন তার তো গুন কেউ বিচার করতে বসে না। সে ভারবাহী এক জীব। কিন্তু মন্থরা হল কৈকেয়ীর প্রধান মন্ত্রনাদাতা। রাজার কাছে কখন কি চাইতে হবে মন্থরাই স্মরন করিয়ে দেয় বৈ কি ! কৈকেয়ী মন্থরার উপরে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল । সে যেন তাঁর বুদ্ধির খাতক। নচেৎ কৈকেয়ী মাত্র আরামে গা ডুবিয়ে থাকেন আর যত চিন্তা মন্থরার উপরে সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকেন। মন্থরা আজ তাই এমন সংবাদ জানাতে কৈকেয়ীর কাছে ছুটে আসে।
‘ওমা, কি সর্বনাশ হয়ে গেল গো ‘ – মন্থরা এক বিচিত্র উৎকন্ঠা তুলে কৈকেয়ীর কাছে এসে দাঁড়ায়।
কৈকেয়ী আলসিত ভাবে শুয়ে আছেন। কুব্জার রঙ্গে কৌতুকে জিজ্ঞেস করেন,‘কেন রে , তোর আবার কি হলো লা কুব্জী ?’
কুব্জি ছদ্মদুঃখে প্রবলবেগে কৈকেয়ীকে সজাগ করার চেষ্টা করে,‘ আঃ মরন ! আমার আবার কি হবে? যা হবার তা তো তোমার হ’ল। কোন আহ্লাদে যে এখনো শুয়ে আছো এমন উৎকন্ঠাহীন হয়ে! ঘোর বিপদ মেজরাণী , তোমায় শোন বলি।’
কৈকেয়ী নিতান্ত বিরক্ত হয়ে বলে ওঠেন, আ: কি জ্বালা। ওরে কি হয়েছে কি , তা আমাকে বলবি তো?’
কুব্জি বলে,‘বলবো আর কি ? ওরে মুঢ়, ওঠো,ওঠো,এখনো তুমি শুয়ে আছ ? দেখো, আজ সারা অযোধ্যা তোমায় বঞ্চিত করে কত আনন্দে মেতে আছে।’
কৈকেয়ী চক্ষুমুদে কৌতুক স্বরে বলে ওঠেন, ‘ কেন রে , আমার কি কোন অমঙ্গল ঘটেছে ?’
কুব্জি বলে, ‘সে আর আমি কি বলব ! তোমার বিপদ উপস্থিত হয়েছে। ঘোর বিপদ! তুমি কি জানো আজ রামের অভিষেক সম্পন্ন হতে চলেছে ?’
কৈকেয়ী এক্ষণে আনন্দে সোনার পালঙ্কে উঠে বসেন। উৎফুল্ল স্বরে জিজ্ঞাসা করেন,‘ তাই ! ওম্মা, আমার রামের আজ অভিষেক? রামচন্দ্রের অভিষেক ? কুব্জি তোকে আমি যে কি উপহার দেব? রাম আর ভরতে আমি কোন প্রভেদ দেখি না। মহারাজ রামকে যুবরাজ্যে অভিষিক্ত করবেন তাতে আমি খুব,খুব,খুবই আনন্দিত। কুব্জি তোকে আমি কি পারিতোষিক প্রদান করি বলতো আজ এ সুমধুর প্রভাতে এত সুন্দর এক সংবাদ দিয়ে আমার ঘুম ভাঙাতে? এই আমি যাই এখন স্নান আদি সেরে নুতন বসন পরি। আজ আমার রামচন্দ্রের অভিষেক বলে কথা। মহারাজাকে আমি বলব তিনি কেন আমাকে আগে বলেননি এই কথা ? – কি বল ?
কুব্জী অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। ভেবে পায় না কি করে কৈকেয়ীর মোহনিদ্রা নিপাত করা যায়। কৈকেয়ী এক্ষণে শারদীয় চন্দ্রলেখার ন্যায় প্রফুল্লমুখে শয্যা হতে উঠে বসলেন।
কুব্জি বলে ওঠে,’হায় অভাগিনী। তুমি নিজের প্রকৃত অবস্থা বুঝছ না ! তুমি মহাবিপদে পড়েও হৃষ্ট হয়ে আছো? রাম রাজা হবে এই সংবাদে তুমি এত খুশি ?’
কৈকেয়ী হেসে ওঠেন,‘ এ মা কুব্জি, কি সব বলছিস তুই আমাকে এই সক্কালে? তোর কি মাথা কিছু খারাপ হল ?
রাম রাজা হলে আমিও আনন্দিত হব। আমি তো চাই রাম রাজা হোক। আমি রাম আর ভরতে কোন প্রভেদ দেখি না।’
রামে বা ভরতে বাহং বিশেষং নোপলক্ষয়ে।
তস্মাৎ তুষটাস্মি যদ রাজা রামং রাজ্যেহভিষেক্ষ্যতি ।। [৭/৩৫ বাল্মিকী ]
আমার কাছে রাম ও যা, ভরত ও তাই। তাঁরা উভয়েই আমার প্রিয়। রামকে আমি ভরত অপেক্ষা ও বেশী স্নেহ করি। রাম ধর্মজ্ঞ, রাম গুণবান, রাম শান্ত, রাম সত্যবাদী। শোন কুঁজি, রামের অভিষেকে আমি খুবই খুশী। সব থেকে বেশী আনন্দ হবে আমার রাম যদি রাজা হয়। ‘
কুঁজী নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। মহারাজ যে রামকে রাজা করবেন, রামকে সিংহাসনে অভিষিক্ত করবেন, কৈকেয়ী তাতে যারপর নাই আনন্দিত ? এ কি অদ্ভুত !
এইবার কুব্জি কপালে করাঘাত করে বলে ওঠে,’ হায় হায় হায়, এ আমি কাকে কি বোঝাতে এলাম। এ তো দেখি নিজের ভালো এক বর্ণও বোঝে না। বেশ বেশ, আমার কি? সপত্নি পুত্রের শ্রীবৃদ্ধি হলে যদি তুমি সুখী হতে পারো তো হবে ! তুমি না রাজার প্রিয় পত্নী?’
কৈকেয়ী বলেন,‘ হ্যাঁ, সে তো সর্বাংশে সত্য। এতে ভুল কোথায়? আমি রাজার প্রিয়পত্নী তো নিশ্চই।’
মন্থরা গর্জে ওঠে, ‘ভুল কথা। এ কথা সর্বাংশে ভুল ! তুমি প্রিয়া নও। তুমি মাত্র রাজার নিকট সুভগার আচরণ পেয়ে থাকো। তবু তুমি সৌভাগ্যের গর্ব কর। তোমার ভর্তা তোমাকে মিষ্ট কথা বলেন। তোমার ভর্তা ধর্মের ভান করেন আর তোমাকে মিষ্ট মিষ্ট অতি সুমিষ্ট কথা বলেন। কিন্তু তিনি দারুণ শঠ। তিনি কার্যক্ষেত্রে তার প্রধানা মহিষী কৌশল্যাকেই সব থেকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। তিনি প্রবঞ্চক। তোমার ভরতকে তিনি মাতুলালয়ে প্রেরণ করে এক্ষনে সবার অগোচরে তিনি রামকে রাজা করতে চলেছেন। কেন, ভরত কি রাজা হতে পারত না? রাজা দশরথের এ কেমন পক্ষপাতিত্ব তোমার সতিনী কৌশল্যার প্রতি ?’
মন্থরার প্ররোচনায় ও কৈকেয়ী দাঁড়িয়ে আছেন শান্ত, নিস্কম্প । তাঁর ঔদার্য তুলনাহীন । তাঁর রূপ যত সুন্দর তাঁর থেকে ও সুন্দর তাঁর হৃদয় । তিনি যে দেবী কৈকেয়ী !
কৈকেয়ী উত্তর দিলেন,‘ “কুব্জা, পোড়ারমুখী এমন মঙ্গলের দিনে উৎসবের বাড়িতে তোর মনে এত খেদ কিসের রে? এত জ্বালা কেন? তুই কী জানিস না, রাম জেষ্ঠ্যপুত্র। সেই জন্য রাম যৌবরাজ্যের যোগ্য। রাম রাজা হলে সবাইকে পিতার তুল্য পালন করবে। কুঁজি তোর তাতে কিসের খেদ? রামের শতবৎসর পরে ভরত নিশ্চয়ই পৈতৃক রাজ্য পাবেন। রাজ্য যদি রামের হয় তবে তা ভরতের ও হবে। ’
মন্থরা বলে,’ভামিনি, মূর্খতা রাখো। তুমি নিজের দুর্দশা হৃদয়ঙ্গম করতে পারছ না। রামের পর তাঁর পুত্রই রাজা হবে। তোমার ভরত রাজ্য পেতেই পারে না। জানো না কি, রাজার সকল পুত্র রাজ্য পায় না। সকলেই রাজ্যে থাকলে মহা অনর্থ হয়। রাম নিষ্কণ্টক রাজ্য পেয়ে ভরতকে নিশ্চয়ই দেশান্তরে অথবা লোকান্তরে পাঠাবে। ভাগ্যবতী রাম জননী কৌশল্যা । তিনি রাজমাতা হবেন। আর, তুমি তার দাসী হয়ে হাতজোড় করে থাকবে। আর তোমার পুত্র ভরত রামের দাস হবে। অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছ কেন ভামিনী ? যাতে তোমার পুত্র এবং তুমি আর সেই সঙ্গে আমি ও যাতে রক্ষা পাই তাঁর উপায় এখনই করো ।
কৈকেয়ী চমকে ওঠেন। এমন কথা তিনি কখনো মনে ভেবেও দেখেন নি। কে চায় সতীনির দাসী হয়ে থাকতে ?
| ৫ |
সোনার পাত্রে তপ্ত গরল
কৈকেয়ী মন্থরার কথা শুনে বুঝি মুহূর্তকালের জন্য বিকল হয়ে গেলেন। পরক্ষনে সম্বিত পেয়ে তিনি এক অবুঝ ক্রীড়নকের মত এবার এক অসহায় স্বরে জিজ্ঞাসা করে ওঠেন,‘ কুঁজী, কি বলছিস তুই এসব? কৌশল্যা রাজমাতা হবেন ! আমি তার দাসী হয়ে হাতজোড় করে থাকব ! আর আমার পুত্র ভরত রামের দাস হবে ! এ এ এ এইসব তুই কি বলছিস কুঁজী ?’
মন্থরা গর্জে ওঠে,‘ওগো গরবীনি রাজরানী, আমি যা বলছি তা ঠিকই বলছি। তুমি পূর্বে সৌভাগ্যের গর্বে তোমার সতীনি কৌশল্যাকে অগ্রাহ্য করতে। এখন কি তিনি তার শোধ তুলবেন না ?’
মন্থরার কথা শুনে কৈকেয়ীর মুখ ক্রোধে রক্তবর্ণ হয়ে উঠলো। আর যাই হোক সতিনীর রক্তচক্ষুর কল্পনা যে কোন নারীর পক্ষে অসহনীয়। কৈকেয়ী আর সইতে পারলেন না। বিবর্ণ মুখে উত্তেজনায় তিনি ঘর্মময় হতে থাকলেন।
মন্থরা তার ক্রুর বিষ ঢালতে লাগলো,‘ জানবে এ সবই রাজনীতি। সেখানে দয়া নেই,মায়া নেই। বন্ধু ও শেষে শত্রু হয়ে যায়। তাই বলছি এখনো সময় আছে। ভালো চাও তো আমার কথা শোনো। নইলে রাম রাজা হয়ে ভরত কে কারাগারে বন্দি করবে। তোমাকে তোমার সতীনের দাসীবৃত্তি করে দিন কাটাতে হবে। এতকাল তুমি যে কৌশল্যার উপর দেমাক দেখিয়েছিলে এইবার সেও তোমার ওপর তার চরম প্রতিশোধ নেবে, কথাটা মনে রেখো। আমার ভয় হচ্ছে ভরত ফিরে এলে তোমার প্রিয় রাম তাঁকে না প্রানে মেরে ফেলে।’
কৈকেয়ী এ হেন বিষবাক্য আর সইতে পারলেন না। প্রবৃত্তির তোড়ে তার মনের স্থৈর্যর বাঁধ ভেঙে পড়ল। মন্থরার কথার চাবুকে তার অন্তর ছটফট করে উঠলো। কশাহত অশ্বের ন্যায় তার মন তখন বিপথে ধাবিত হলো।
কৈকেয়ী চিৎকার করে বলে উঠলেন,‘না, এ হতে পারেনা। আমার ভরতকে কেউ মারতে পারবে না। আমি কারোর পায়ের তলায় থাকবো না। না, আমি রামকে রাজা হতে দেবো না।’
কৈকেয়ীর স্বভাব দুর্বলতা, তাঁর অস্থির চিত্ত লঘুতা তাহাকে নির্মমভাবে বিকৃত করে ফেলল। তাঁর দেবী প্রতিমা স্বরূপকে কুব্জি মন্থরা তাঁর প্রতিহিংসার অভিঘাতে এবং নিপুণ অভিনয়ে ভেঙ্গে খান খান করে ফেলল।
মন্থরা বলে,‘ ভামিনি এই মুহূর্তে রাজার কাছে দুখানা বর চেয়ে নাও। এক বরে রাম বনে যাবে চোদ্দো বৎসরের জন্য। আর এক বরে ভরত রাজা হবে।’
কৈকেয়ী বলে ওঠেন,‘ ঠিক বলেছিস কুব্জি। আজ আমি রাজার দেওয়া দু দুখানা বর এক সাথেই চাইব। এক বরে রাম বনে যাবে চোদ্দো বৎসরের জন্য। আর এক বরে, হ্যাঁ, আর এক বরে ভরত রাজা হবে এই অযোধ্যার ।
কৈকেয়ী সরলা। কৈকেয়ীর হৃদয় সুন্দর। কিন্তু তা গভীর ছিল না। যে তেজ যে ধৃতি যে সামর্থ্য হৃদয়কে অটল রাখে মন্থরার কথায় কৈকেয়ীর সেই আত্মসংযম মুহূর্তে ভেঙে পড়ল।
কৈকেয়ী নির্মম ছিল না। কৈকেয়ী কুটিল ছিল না। কৈকেয়ী ভালো ছিল। ভালো থাকতে ও পারতো। কিন্তু কুটিলা মন্থরার দ্বারা অধর্মের অভিঘাতে পাপের টানে কৈকেয়ীর সেই সরলতা ভেঙে খানখান হয়ে গেল।
কৈকেয়ী রাজা দশরথের অতি মাত্রায় আদর ও প্রশ্রয়ে হয়ে উঠেছিলেন প্রচন্ড উগ্র ও আত্মমভরি এক জন । সেই কুশ্রীতার এক্ষনে প্রকাশ হয়ে পড়ল কুব্জির কুটিল মন্ত্রনাজালে। কৈকেয়ীর চরিত্রের এই আকস্মিক পরিবর্তন অবিশ্বাস্য। সোনার পাত্রে তপ্ত গরল ঢালা হয়ে গেলো।
মন্থরা মনে মনে হাসলেন,’দেব নারায়ন একদিন তুমি আমায় মেরেছিলে, সে কথা আমি ভুলিনি। আজ আমি তোমার চরম সর্বনাশ করব।’
যুগে যুগে বুঝি এই হয়ে আসছে। আগের জন্মের প্রেম অনুরাগ বিরাগ এজন্মে ও সেই রূপ নিয়ে এসে ঘটাচ্ছে এক অন্য ইতিহাস। কুটিলা করুপা কুব্জা এই দাসী মন্থরা। বিকৃত মনের এক বিকৃত আকার। জন্মান্তরের রাক্ষসী প্রতিহিংসা। অযোধ্যার রাজপ্রাসাদের ভিতরে প্রচ্ছন্ন এক বিষবৃক্ষ।
পূর্বজন্মে মন্থরা ছিল অসুররাজ বিরোচনের কন্যা। অসুরদের সঙ্গে দেবতাদের যুদ্ধের সময় দেবতাদের বিমান ও বাহন সব বিরোচনের কন্যা মন্থরা নিজহস্তে প্রতিহত করেছিল। তখন বিষ্ণুর আদেশে ইন্দ্র তাকে বজ্রাঘাতে নিহত করেন।
অতঃ বিরোচন কন্যা এক্ষনে বিষ্ণুর অবতার রামচন্দ্রের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসার জন্য জন্ম নিল মন্থরা হয়ে। আজ মন্থরা তাই প্রতিশোধ নিতে উদ্যত হয়ে উঠেছে তাঁর পূর্বজন্মের অসূয়া নিয়ে।
[কোথাও পাওয়া যায় মন্থরা ছিল তার আগের জন্মে পূতনা রাক্ষসী। আবার মহাভারতের বনপর্বে এবং পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে মন্থরা ছিল দুন্দুভী নামে এক গান্ধর্বি। ]
কৈকেয়ী বলেন,‘কুব্জি তুই আমার পরমহিতৈষি। ভরত এখন প্রবাসে। আর মহারাজা আজই রামকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করতে চলেছেন ? আমি কোন কিছু জানলাম না ? এ কি করে সম্ভব ? না না, এ ভীষণ অন্যায়। কুব্জি তুই রাজ দরবারে সংবাদ প্রেরণ কর যে আমি মহারাজাকে আসতে অনুনয় করেছি।’
মন্থরা বলে, ‘আজ রামের অভিষেক। রাজা আজ নিজেই আসবেন তোমার সঙ্গে দেখা করতে। আমি বলি এই রাজবেশ ছেড়ে, এই সমস্ত বহুমুল্য অলংকার দূরে ছুড়ে ফেলে, এক্ষনি তোমার মলিনবসনে নিজেকে জড়িয়ে রেখে, তুমি পড়ে থাকো গোসা ঘরে বিন্দুমাত্র কোন অন্নজল গ্রহণ না করে। রাজা তোমার অভিমান দেখে ত্রস্ত হয়ে উঠবেন।’
কৈকেয়ী বলেন , ‘ হ্যাঁ হ্যাঁ , আমি আমি গোসা ঘরে পড়ে থাকব এখন !’
মন্থরা বলে, ‘রাজা জিজ্ঞাসা করবেন কেন এমন অভিমান করে আছো রানী? কিসের এত অভিমান প্রিয়তমা ? – তুমি উত্তর দেবে না। ‘
কৈকেয়ী বলেন , ‘ না না আমি কোন উত্তর দেবো না।’
মন্থরা বলে, ‘ ভামিনী , তুমি শুধু ক্রন্দনরতা থাকবে। তোমার অশ্রুজলে তিনি অস্থির হয়ে উঠবেন। তুমি তাঁর প্রাণপ্রিয়া যুবতী ভার্যা। তোমায় রাজা ভীষণ উদ্বেগ নিয়ে জিজ্ঞাসা করবেন কি হয়েছে তোমার? বলো বলো , আমায় বলো আর্য্যা। তুমি কোন কথাই বলবে না। তুমি শুধু রোদন করবে।
কৈকেয়ী বলেন , ‘ আমি শুধুই রোদন করব।’
মন্থরা বলে, ‘ ক্রমে তুমি রাজাকে আগে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নেবে, মহারাজা আমাকে তুমি আজ সেই দুই বর দেবে ব’লো ? ‘
কৈকেয়ী মন্থরার কুমন্ত্রণায় মন্ত্রমুগ্ধ। কুব্জির কথায় অল্পমতি অতি সরলা নারী আজ সত্যই বিবশ। রাজরানী কৈকেয়ী এখন তার দাসীর হাতে ক্রীড়ানক মাত্র। কৈকেয়ী বুঝতে পারেন না এখন তার কি করনীয় ? কিভাবে রাজাকে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নেবেন তার পূর্বপ্রার্থিত সেই ‘দুই বর’ রাজার কাছ থেকে হাতের মুঠোয় পেতে। না,না, কোন তাড়াহুড়া না। এখন শুধু অভিনয়। এক সুনিপুণ অভিনয়ে পাশার দান উল্টে দেওয়া।
কৈকেয়ী বললেন, ’ঠিক বলেছিস কুঁজি। আগে তাঁকে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিতে হবে। তাঁকে পূর্ব কথার জালে তিন সত্য করিয়ে নিতে হবে। তারপর রাজার কাছে দুই বর চেয়ে নিতে হবে। কুঁজি তুই আমায় ছিন্ন বসন দে।’
কুব্জি বলে,’এই নাও তোমার মলিন বসন। যাও এখন বসো গিয়ে গোসাঘরে। শুয়ে থাকো তুমি ভূমি পরে। তুমি রাজার প্রাণপ্রিয়া। তুমি চাইলে রাজা তোমার জন্য প্রাণ পর্যন্ত দিতে পারে। তোমার কথায় রাজা রামকে বনবাসে না পাঠিয়ে পারবেন না। রাজা এতই আসক্ত তোমার উপরে। রাজা তো তোমার কাছে সত্যবদ্ধ হয়ে আছেন। তবে কেন তিনি তোমাকে তোমার মনের মত দুই বর দেবেন না ? নিশ্চয়ই দেবেন।‘
কৈকেয়ী বললেন, ‘কুঁজি, তুই আমার এমন আপনজন আমি আগে বুঝে উঠতে পারিনি। সমস্ত কুঁজিদের মধ্যে তোর মত এত বুদ্ধিমতি এত গুণবতী আমি আগে দেখিনি। তোর ধার আমি একদিন নিশ্চয়ই শোধ করব। আজ রাজাকে দিয়ে সত্যসন্ধ করে আমি রামকে বনে পাঠিয়ে তবেই না হয় স্নান করব, ভোজন করব। কুঁজি তুই রাজাকে সংবাদ প্রেরণ কর।’
কুব্জি বলে, ‘ঐ যে, ঐ তিনি আসছেন তোমার সাথে দেখা করতে। যাও যাও যাও তুমি গোঁসা ঘরে যাও। রাজাকে কি বলবে ভালো করে ভেবে নিও মনে মনে।’
মন্থরার অনর্থকর প্রস্তাব কৈকেয়ী অতঃ হিতকর ব’লে বিশ্বাস করলেন। তিনি এইবার ক্রোধাগারে গিয়ে গায়ের গহনা আদি সব এখানে ওখানে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ছড়িয়ে দিয়ে ভূমিতে শয়ন করলেন এবং কুব্জিকে বললেন,‘ রে কুব্জা, হয় আমি আজ এখানে মৃত্যুবরন করব, সেই সংবাদ তুমি রাজাকে জানাবে, অথবা রাম যাবে দন্ডকারণ্যে এবং ভরত রাজ্য পাবে।’
কুব্জির কুমন্ত্রণায় রাজা দশরথকে নাজেহাল করে দিতে কৈকেয়ী আজ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
| ৬ |
কৈকেয়ীর নির্বন্ধ
আজ রামের অভিষেক হবে এই শুভসংবাদ মহারাজা দশরথ তাঁর প্রিয়পত্নীকে অবজ্ঞাত করতে কৈকেয়ীর ভবন অঙ্গনে পা রাখলেন। মনে মনে তিনি ভাবলেন , ‘অহো, কৈকেয়ী নিশ্চয়ই উদগ্রীব হয়ে রয়েছে দর্শন পেতে। কৈকেয়ী রামকে পুত্রবৎ ভালোবাসে। রামের অভিষেকে কৈকেয়ীর নিশ্চয়ই খুব আনন্দ হবে। কৈকেয়ী রামকে ‘ আমার রামচন্দ্র‘ বলে পুত্রবৎ স্নেহ করেন। কৈকেয়ী রামকে আশীর্বাদ করতে নিশ্চয়ই উন্মুখ হয়ে বসে আছেন। আর কাল বিলম্ব না করে কৈকেয়ীকে সম্ভাষণ করে আসা যাক। রাজসভায় অনেক আলোচনা ও আছে। রামের অভিষেকের সংবাদে ভীষণ ভীষণ খুশি হবে কৈকেয়ী, সে কি আর বলার অপেক্ষা রাখে ? অভিমানীনি কৈকেয়ী। তার সাথে দেখা তো করতেই হবে। প্রিয়পুত্রের রাজ্যভিষেকে সকলের শুভাশিষ যে সর্বাগ্রে কাম্য। রামকে কৈকেয়ী আশীর্বাদ করবেন। না আর দেরি নয়।
কেকয় মহলে ঢুকে রাজা এক্ষণে ‘কৈকেয়ী কৈকেয়ী’ নাম ধরে এ ঘর ও ঘরের দিকে তাকালেন। কিন্তু তিনি কৈকেয়ীকে দেখতে পেলেন না। সহসা নজরে পড়ল কুঁজী মন্থরা আড়াল হতে কেমন একরকম ভাবে তাকিয়ে আছে ! রাজা কিঞ্চিৎ অস্বস্তি বোধ করলেন। মন্থরা তো সহসা এমন ব্যবহার করে না ! সে তো সরে থাকে ! আজ কেন কুব্জি মন্থরা ওখানে ওই আড়ালে দাঁড়িয়ে অমন করে তাকিয়ে আছে ? কি দেখছে ওই কুটিলা দাসী ! – রাজা বিরক্তিত ভাবে অন্যদিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলেন। আজ সকালে কেন যেন মন্থরাকে দেখে রাজা মনে মনে কেঁপে উঠলেন। মনের মধ্যে একটা কেমন কু ডাক দিয়ে ওঠে। এ এক কুটিল চেহারা। কুশ্রী মুখভঙ্গি। জীবন্ত সর্বনাশা অপয়া। কোনোদিন দেখেন না তাকান না কুঁজির দিকে। কুঁজি ও সরে সরেই থাকে রাজাকে দেখলে। কিন্তু আজ যেন কুদর্শনা কুব্জি কেমন এক ভয়ংকর দৃষ্টি মেলে দাঁড়িয়ে আছে ওই থামের আড়ালে ? – কি দুর্ভাগ্য, আজ এমন এক শুভদিনে এ কি অশুভ দর্শন ঘটল কেকয় ভবনে এসে ? ওঃ কি অসহ্য বিরক্তিকর। কিন্তু কিন্তু , কৈকেয়ী কোথায়? সে কোন কক্ষে? তার তো আজ এই সুন্দর সকালে মহারানী বেশে দেখা পাওয়ার কথা। সে তো আজ কোন কারনে বিলম্ব করার মতো নারী নয়। সে তো আজ তাঁর প্রিয় রামচন্দ্রের অভিষেকের সংবাদে উচ্ছ্বসিত উল্লসিত হয়ে থাকার কথা। সে কি আজ কোথাও লুক্কায়িত হয়ে রয়েছেন কৌতুকের ছলে? প্রিয় রাজার সঙ্গে কি আজ এক নুতন দিনের নুতন কৌতুক সুখ উপভোগ করতে চাইছেন ! হয়তো হঠাৎ করে দেখা দিয়ে বলে উঠবেন,‘মহারাজ আজ আমার চন্দ্রহার চাই। আজ আমার রত্নভূষণ চাই। আজ আমার রামচন্দ্রের অভিষেক। আমি সে আনন্দে আজ সসাগরা ধরনীর অধিপতির কাছে কৌস্তভ মনি চাইব না কি? আমি কি এক কল্পবৃক্ষ চাইতে পারি না ? মহারাজ,মহারাজ,আজ কিন্তু আপনাকে আমার আবদার রাখতেই হবে।’ – অহো সে আরো কত শত আবদার। মহারাজ হাসছেন। সে এক উদার এবং প্রাণখোলা হাসি।
‘ হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ। কৈকেয়ী, তুমি আমার প্রিয় রানী। তোমার সব প্রার্থনাই আমি পূরণ করব। তোমাকে অদেয় আমার কিছুই নেই। কহ যদি আমি এনে দিব তোমায় চন্দ্রহার ! চাহ যদি দিতে পারি এনে কৌস্তুভমনি। হাতে তুলে দেব নয় যতেক রত্ন-আভূষণ। কহ যদি এনে দিতে পারি কল্পবৃক্ষ হেন মহার্ঘ উপহার। না, না প্রিয়ে, আকাশের চাঁদ তোমায় এনে দিতে পারব না নিশ্চয়ই। তবে হ্যাঁ, পৃথিবীর সর্ববৈভব যাহা যাহা সম্ভবে আমি তোমায় উপহার দেব। আমি তোমায় না দিতে পারি এমন অদেয় আমার কিছুই নেই। প্রার্থনা কর কৈকেয়ী, প্রার্থনা করো। আজ আমার রামের অভিষেক। রাম রাজা হবে। -কিন্তু , কিন্তু কৈকেয়ী কোথায় ?
দুয়ারে কৈকেয়ীর দ্বাররক্ষিণী খর্বাকৃতি এক দাসী। রাজা জিজ্ঞাসা করলেন,’ কোথায় মহারানী ?’
দাসী সভয়ে বলে, ‘মহারাজ, দেবী ক্রুদ্ধ হয়ে ওই ক্রোধাগারে দ্বাররুদ্ধ হয়ে আছেন ।’
‘ ক্রোধাগারে ? কিন্তু কেন?‘ – রাজা দশরথ অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ভাবে ক্রোধাগারের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং বিচ্ছিন্ন লতার মত ভূপতিতা কৈকেয়ীকে দেখে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ছিন্নলতার মতই ভূলুন্ঠিতা কৈকেয়ী, বিশ্রস্ত বেশবাস , মলিন বসন পরিহিতা , কোন অজানা অভিমানে ধূলিশয্যা নিয়েছেন।
রাজা চমকে ওঠেন। তিনি কৈকেয়ীকে দেখে ‘হা হা হা ‘ করে ওঠেন। -‘একি ? এ কি কৈকেয়ী, কি হয়েছে তোমার ? আজকের এমন শুভদিনে এই গোসা ঘরের ভূমিশয্যায় তুমি এই ভাবে শায়িত হয়ে রয়েছো কেন, বল প্রিয়ে , তুমি কোন অভিমানে পড়ে আছো এখানে ? বলো কৈকেয়ী , শীঘ্র বলো আমাকে ।
কৈকেয়ী উত্তর দেন না। নিপুন এক অভিনয়ে দীর্ঘশ্বাস আর অশ্রুপাতে নিজের মুখখানি দুই বাহুর নীচে লুক্কায়িত করে রাজাকে বিব্রত করে চলেছেন।
প্রান উড়ে যায় রাজা দশরথের। কৈকেয়ীর দুঃখ দেখে অস্থির হয়ে ওঠেন। ভেবে পান না কৈকেয়ীর এই ঘোর বিষাদের হেতু কি !
রাজা জিজ্ঞাসেন,‘ কৈকেয়ী, প্রিয়তমা, কি হয়েছে তোমার ? কেউ কি তোমাকে অপমান করেছেন? তোমার মনে কেউ কি কোন দুঃখ দিয়েছেন অকস্মাৎ?- বলো প্রিয়া আমাকে বলো। প্রিয়ে , আমার যত ধন জন যত আছে এ সবই তো তোমার। তবু কি কারনে তোমার এই অভিমান ? আজ্ঞা করো দেবি, কি চাহ, তাহাই আমি তোমারে করি দান। ওঠো ,দেবী ! এখানে এই ধুলিতে শুয়ে পড়ে কেন আমাকে দুঃখ দিচ্ছ অভিমানিনী ? ‘
কৈকেয়ী কথা বলেন না। এখন যে নিপুন অভিনয় করে রাজাকে বিব্রত করে তুলতে হবে ! রাজাকে দিয়ে যে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিতে হবে পুত্রের জন্য রাজ সিংহাসন আর রামের জন্য বনবাসে নির্বাসন !
রাজা দশরথ বড় কাতর স্বরে বলে ওঠেন, ‘ আহা, যদি অসুস্থ হয়ে থাক তবে রাজবৈদ্যগন তোমাকে সুস্থ করে তুলবেন। দেবী অহেতুক রোদন করো না। শরীরকে কষ্ট দিয়ে ক্ষীন করো না। কৈকেয়ী ওঠো। আমাকে বলো, কি তোমার দুঃখ। কে তোমাকে ব্যাথা দিয়েছে অকারনে? কে তোমার কোন অপ্রিয় কাজ করেছে। আমি তাকেই শাস্তি প্রদান করব তোমার প্রীতার্থে।’
কৈকেয়ী কোন উত্তর দেবেন না বলেই ঠিক করেছেন। কুব্জীর শিখিয়ে দেওয়া মন্ত্রনাকে সুনিপুন অভিনয়ে ফুটিয়ে তুলতে কৈকেয়ী দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
রাজা দশরথ ভুমিতে বসে পড়ে কৈকেয়ীর মাথা কোলে তুলে নেন, ‘ অহোঃ, কৈকেয়ী, তোমার কি চাই ? বলো সে কি এমন বস্তু বা কোন সে মহার্ঘ দ্রব্য ! এক্ষনি আমি তা তোমাকে দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।’
তখন কৈকেয়ী অশ্রু সম্বরন করে প্রেমমুগ্ধ রাজা দশরথকে বললেন,‘ মহারাজ, আমি আপনার প্রিয়পত্নী। কিন্তু সে মান আপনি তো স্মরন রাখেননি আজ? আপনি আমায় অহেতুক কেন দুঃখ দিলেন মহারাজ ? আর , এতেই আমি ভীষণ ভীষণ অভিমানাহত হয়ে পড়েছি আজ।’
রাজা বলেন,‘ আমি তোমায় দুখঃ দিয়েছি ? আহা, কি দুখঃ দিয়েছি কৈকেয়ী, সে কথা আমাকে শীঘ্র বলো প্রিয়ে ! আমি নিশ্চয়ই অতি নিশ্চয়ই তার সত্বর প্রতিকার করব।’
কৈকেয়ী অনুযোগ করলেন,‘মহারাজ আপনি আমাকে কোন কথা না বলে আমার অগোচরে রামের অভিষেকের এর আয়োজন করলেন কেমন করে ? আমাকে কেন আগে বলেননি এ কথা ? আমি কি রামকে রাজা হতে বাধা দিতাম ?’
রাজা কিঞ্চিত চিন্তায় পড়ে যান। এখন কৈকেয়ীর মান ভাঙ্গানো আশু কর্তব্য। তাই তিনি নিজের মান রাখতে কৈকেয়ীকে মধুরস্বরে বলে ওঠেন, ‘কৈকেয়ী, আমি কেন জানাব না তোমাকে সেই কথা? সে তো আনন্দের কথা। সেই কথাই তো তোমাকে বলব বলে আমি এখন এসেছি তোমার কাছে ! – তুমি আমায় ভুল বুঝো না প্রিয়ে। আহা, শোনো, রাজ্যের হাজার কাজে ব্যস্ত আমি। আমি তাই সত্য সত্যই সেই শুভসংবাদ আমি তোমার গোচরীভূত করতে ভুলে গেছি। আসলে , শোনো কৈকেয়ী , যতেক শুভ গ্রহনক্ষত্র সন্মিলনে শুভসময়ের কারনে গুরু বশিষ্ঠদেব রামের অভিষেকের আয়োজনের উপদেশ দিলেন। প্রিয়ে আগামী চৌদ্দবৎসরে এমন শুভক্ষণ আর হবে না। রাণী কৈকেয়ী, শোনো, আহা আমার কথা শোনো , তাই আমার এহেন ব্যস্ততা। বুঝেছি তুমি মনঃকষ্ট পেয়েছো। আহা, বলো , আমাকে বলো কৈকেয়ী , কি চাই তোমার! কৌস্তভমনি কিংবা স্বর্গের পারিজাত কি চন্দ্রহার? রামের রাজ্যাভিষেকের আনন্দে আমি তোমায় না দিতে পারি এমন কিছুই অদেয় নেই আমার কাছে।’
এইবার কৈকেয়ী অশ্রু সম্বরন করলেন। তিনি উঠে বসলেন। রাজার অন্তরাত্মা কি কেঁপে উঠল ?
কৈকেয়ী রাজার হাত ধরে বললেন,‘ মহারাজ আমার মনে একটি বাসনা আছে। আগে প্রতিজ্ঞা করুন আপনি তা পূর্ণ করবেন ? তবেই আমি আপনাকে সে কথা বলতে পারি।’
রাজা স্তব্ধ নিঃশ্বাসে তাঁর উদ্বেলিত হৃৎকম্পনকে অনুভব করতে করতে অভয় দিলেন,’ নিশ্চই কৈকেয়ী। তুমি আমাকে অসংকোচে বলতে পারো তুমি কি চাও। তোমার চেয়ে প্রিয়তম আমার তো আর কেউ নেই শুধু মাত্র রাম ছাড়া। আমার জীবনের অবলম্বনস্বরূপ সেই রামের শপথ করে বলছি, তুমি যা চাইবে আমি তাই দেবো।’
কৈকেয়ী বললেন, ‘ মহারাজ তুমি যে শপথ করে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলে তা ইন্দ্রপ্রমুখ তেত্রিশ দেবতা শুনুন। চন্দ্র সূর্য আকাশ গ্রহ রাত্রি দিন দশ দিক, গন্ধর্ব রাক্ষস নিশাচর প্রানীসমেত এই পৃথিবি ও জগত, গৃহে বিদ্যমান গৃহদেবতাগন এবং অন্যান্য ভূত সমুদয় তোমার কথা শুনুন। সত্যবদ্ধ মহাতেজা ধর্মজ্ঞ সত্যবাদী শুদ্ধস্বভাব গুনত্রয় বিভূষিত রাজা দশরথ আমাকে বর দিচ্ছেন । সব দেবতারা শুনুন। মহারাজা দশরথ আজ আমার নিকট সত্যবদ্ধ হলেন। অষ্টলোক সাক্ষী থাকো। নক্ষত্র ভাস্কর চন্দ্রযোগ তিথি বার এবং রাত্রি দিবা সহ সাক্ষী হও সকল সংসার। একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্য সাক্ষী থেকো। স্থাবর জংঘম সাক্ষী থেকো। আমি আজ মহারাজা দশরথের নিকট বর চাইবার অনুমতি পেয়েছি। আজ আমি আমার প্রার্থিত সেই দুইটি বর প্রার্থনা করব মহারাজের নিকট ।’
কৈকেয়ী এইরূপে রাজা দশরথকে এক্ষনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করে বললেন, ‘ মহারাজা দেবাসুর যুদ্ধের কথা মনে করুন। আপনি যুদ্ধে ভীষণ রকমে আহত হয়েছিলেন। আপনার কলেবর ক্ষত বিক্ষত হয়েছিল সেই যুদ্ধে। আমার সেবা শুশ্রূষায় আপনি সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। মহারাজ স্মরণ করুন , তখন আপনি আমায় বর দিতে চেয়েছিলেন।’
দশরথ স্বীকার করেন,‘ হ্যাঁ, হ্যাঁ , আমার তা স্মরনে আছে বৈকি কৈকেয়ী। আমি তখন তোমায় বর দিতে চেয়েছিলাম।’
কৈকেয়ী বলেন,‘ আমি তখন আপনাকে বলেছিলাম , সেই বর আমি পরে চেয়ে নেবো আপনার কাছে।’
দশরথ বলেন, ‘ হ্যাঁ কৈকেয়ী, সে কথা খুবই সত্য। ‘
কৈকেয়ী বলেন, মহারাজ তারপর আমি আপনার গুহ্যে বিস্ফোটের শুশ্রূষা করে আপনাকে সুস্থ করলাম। আপনি সুস্থ হয়ে তখন ও আর একটি বর দিতে চাইলেন। আমি তখন ও বলেছিলাম সে বর আমি পরে আপনার কাছে নেবো । আমি আপনাকে বলেছিলাম, কুঁজী যবে বর চাহে তবে দিও বর।’
রাজা দশরথ বলেন, ‘ হ্যাঁ, কৈকেয়ী, সে কথা ও সত্য। কৈকেয়ী আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বলো তুমি কি কি বর চাও। আমাকে রাজসভায় যেতে হবে । আমি তোমায় আমার সত্যবদ্ধ দুটি বর দিতে নিশ্চয়ই প্রস্তুত।’
মৃগ যেমন বিনাশের নিমিত্ত পাশবদ্ধ হয় দশরথ তেমনই বাক্যে বদ্ধ হয়ে কৈকেয়ীর বশে এলেন ।
কৈকেয়ী বলে ওঠেন, ‘ মহারাজ আজ তবে তুমি আমায় সেই দুটো বর প্রদান করো।’
দশরথ অধৈর্য্য হয়ে উঠেছেন। তিনি কৈকেয়ীর বাহুপাস হতে এখন মুক্তি চাইছেন। প্রিয়পুত্র রামের মুখ ভেসে উঠছে স্মৃতিপথে। কাল তিনি রামের অভিষেক করবেন কোশল রাজ্যের সিংহাসনে। তার হাতে আজ নব ছত্রদন্ড প্রদান করবেন সকল নর নৃপতি মুনি ঋষি প্রজা সকলের সাক্ষাতে এক আনন্দময় অভিষেক অনুষ্ঠানে। আজ আর তিনি কোন মতেই সময় নষ্ট করতে চান না।
‘হ্যাঁ হ্যাঁ কৈকেয়ী, তুমি বলো আমাকে, তুমি আমার কাছে কি বর চাও ?’
রাজা দশরথের প্রাণপ্রিয়া ভার্যা রানী কৈকেয়ী এখন চেয়ে বসলেন সেই দুটি প্রার্থিত বর।
কৈকেয়ী তখন বললেন,‘মহারাজ দুই বর বলছি শুনুন। অভিষেকের যে আয়োজন হয়েছে তাতে রামের পরিবর্তে ভরতের অভিষেক হ’ক। দ্বিতীয় বর এই যে, রাম চীর অজিন ধারী তপস্বী হয়ে চতুর্দশ বর্ষ দন্ডকারন্যে বাস করুক। ভরতের যৌবরাজ্য নিষ্কণ্টক হ’ক ।
দন্ডক বন যমুনার দক্ষিনস্থ নর্মদা ও গোদাবরীর মধ্যবর্তী এক ভীষণ গহীণ অরন্য। রাজা দন্ডকের পাপে এবং শুক্রাচার্যয়ের শাপে নস্ট হয়ে যাওয়া এককালের মধুমন্তী রাজ্য কালে তা দণ্ডক বনে পর্যবসিত হয়ে গিয়েছিল। কৈকেয়ী সেই দন্ডক বনে রামের বনবাস চেয়ে বসলেন।
কৈকেয়ীর বাক্যে মুহ্যমান হয়ে পড়লেন তিনি। এক্ষণে তিনি চীৎকার করে বলে ওঠেন, ‘ কৈকেয়ী তুমি কি বলছ তা বুঝে দেখো। তুমি কি করে চেয়ে বসলে রামের বনবাস। রাম কে কি করে আমি দন্ডক বনে নির্বাসিত করব ?’
কৈকেয়ী এক্ষনে ভীষণা নাগিনীর মত ফোঁস করে বলে ওঠে, ‘ মহারাজা আপনি সত্যবদ্ধ। ‘
কৈকেয়ীর দারুন বচন শুনে রাজা দশরথ ভাবলেন আমি কি কোন দিবা স্বপ্ন দেখছি ! ব্যঘ্রী দেখলে মৃগের যেমন ভীতি উৎপন্ন হয় দশরথের ও সেই অবস্থা হল। তিনি ব্যাথাতুর ও বিহ্বল হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে লাগলেন এবং ‘ অহো ‘ ধিক ‘ বলে মূর্ছিত হলেন।
দশরথ অনেকক্ষন পরে ধীরে ধীরে সংজ্ঞা লাভ করে উঠে কৈকেয়ীকে বললেন, ‘ রে রে নৃশংসা দুষ্টাচরিত্রা কুলনাশিনি ঘোরপাপিনী, রাম তোমার কি ক্ষতি করেছে , অহো দুষ্টা ! আমিই বা তোমার কি ক্ষতি করেছি কোন কালে ? রাম সর্বদা জননীর তুল্য তোমার সেবা করে। তার এইরূপ অনিষ্ঠ করতে কেন তুমি উদ্যত হয়েছ ? আমি না জেনে তীক্ষ্ণ বিষধরী সর্পীর ন্যায় এই নৃপসুতাকে নিজের বিনাশের নিমিত্ত স্বভবনে এনেছিলাম ! হায় হায় হায় ।
দশরথ হাহাকার করে বলতে লাগলেন,‘ সকল লোকেই রামের গুণকীর্তন করে। কোন অপরাধে এই প্রিয়পুত্রকে আমি ত্যাগ করব ? হায়, রামকে বনবাসে প্রেরন করে আমার মৃত্যু ডেকে আনলে, তুমি এমন কুটিলা? স্বামী নারীর সম্পদ। সেই স্বামীর জন্য আজ বিপদ ডেকে আনতে পারলে ?
চন্ডাল হৃদয়া নির্দয়া কুলটা আজ তোমার ভবনে প্রবেশ করে আমি অপয়া মুখ দেখেছি। আমি তখনি বিপদাশঙ্কা করেছিলাম। কিন্তু হায়রে নিষ্ঠুর মতি নারী, আমি বুঝতে পারিনি যে শেষে তুমি আমাকে নির্দয়ভাবে বধ করতে আমাকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নেবে। হায় হায়রে পুরুষ, অবলা নারী কত নিষ্ঠুর হয় তুমি দেখো। কোন রাজা এভাবে হয় কামিনীর বশ?
আজ আমার হল এই দৃঢ় বিশ্বাস
স্ত্রী’বশ হয় যেজন তাঁর হয় সর্বনাশ। [কৃত্তিবাস]
রাজা কথা বলতে বলতে চেতনা হারিয়ে ফেললেন। কিয়ৎক্ষণ পর আবার সম্বিত ফিরে পেয়ে আবার গর্জে উঠলেন,‘ তুমি পূর্বে বহুবার আমাকে বলেছ তোমার কাছে রাম আর ভরত সমান। তবে সেই রামকে কেন নির্বাসনে পাঠাতে চাইছো এখন? রাম অত্যন্ত সুকুমার । দন্ডকারন্যের দারুণ অরন্যে কি করে সে সেইখানে বাস করবে ? ভরতের চেয়ে ও রাম তোমার অধিক সেবা করে। তাঁর নিন্দা কেউ করেনা। রাম সত্যবাক্যে সকল লোককে,দানে দ্বিজগনকে,শুশ্রূষায় গুরুজনকে, এবং যুদ্ধে ধনুদ্বারা শত্রুগনকে জয় করেছে। কোন লোককে যে অপ্রিয় বাক্য বলে না, তোমার কথায় তাকে আমি কি প্রকারে এমন অপ্রিয় কথা বলব ? ’
কৈকেয়ী এক্ষনে ভীষণা নাগিনীর মত ফোঁস করে বলে ওঠে, ‘ মহারাজ তুমি সত্যবদ্ধ। ছিন্ন করো না সত্যপাস।’
রাজা যেন মুক হয়ে পড়েন। কি সর্বনাশ ! যে কর্ম করতে তিনি এতদিন চিন্তিত ছিলেন, যে কর্ম নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার জন্য মনে মনে প্রস্তুতি নিয়েছেন এতদিন, আজ কৈকেয়ীর কাছে প্রতিজ্ঞা করে এ তিনি কি সর্বনাশ ডেকে আনলেন প্রান প্রিয়া ভার্যার প্রেমের আলিঙ্গনে ? এ তিনি কি রকম সত্যবদ্ধ হলেন ছলনাময়ীর কুটিল ছলনার কাছে? না এ হতে পারে না ।
ব্যাধ যেমন শিকার কে জালের মধ্যে বেঁধে ফেলে আজ কৈকেয়ীর দুরন্ত বচনে রাজা ও তেমনি সেই ছলনাময়ীর জালে ধরা পড়ে গিয়ে ছটফট করতে থাকেন।
রাজা কম্পিত হয়ে উঠে ধীরে ধীরে অচেতন হয়ে পড়লেন। কিয়ৎক্ষন পরে চেতন পেয়ে রাজা ধীরে ধীরে উঠে বসলেন। হাতে ধুলা, গায়ে ধুলা, মুখে ধুলা। চোখে জল। কম্পিত কলেবর। তথাপি অনুনয়ের সুরে তিনি বললেন, ‘কৈকেয়ী আমি বৃদ্ধ হয়েছি। আমি দীনভাবে বিলাপ করছি। তুমি করুণা কর। আমি কৃতাঞ্জলি হয়ে তোমার পাদস্পর্শ করছি। তুমি রামকে রক্ষা করো। আমাকে অধর্মে লিপ্ত করো না। তোমার দুটি পায়ে পড়ে আমি ভিক্ষা চাইছি।’
অস্থির দিশাহারা রাজা পাগলের মত বারবার কৈকেয়ীর পায়ে মাথা কুটে মিনতি করতে লাগলেন। আর দুঃখে শোকে ক্ষোভে লজ্জায় মুহ্যমান হয়ে পড়তে লাগলেন।
দশরথ এইরূপে বিলাপ করছেন। মাঝে মাঝে তাঁর চেতনা লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে এবং শরীর ঘূর্ণিত হতে থাকছে।
কিন্তু কৈকেয়ী সেই একই রকম বিরূপতায় তেমনই তীব্র বিরস বদনে রাজার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন আর ভাবতে লাগলেন রাজা তাকে কতটা প্রবঞ্চনা করতে চেয়েছিলেন। রাজার অশ্রুজলে তিনি কোন ভাবেই ব্যথিত বা দয়াদ্র হলেন না।
কৈকেয়ী অতএব দশরথকে বললেন,‘ ধর্ম বা অধর্ম, সত্য বা অসত্য, যাই কিছুই হোক, মহারাজ তুমি যদি প্রতিশ্রুতি না রাখ তবে আজই তোমার সন্মুখে আমি বিষপান করব। যদি আমাকে একদিন ও দেখতে হয় যে রাম জননীর কাছে লোকে হাতজোড় করছে, তবে তার চেয়ে আমার মরণ ভালো।’
রাজা দশরথ এবার হাহাকার করে ওঠেন,‘ হা কৌশল্যা! আমি তোমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলাম। এই অবিশ্বাসীনি কে বিশ্বাস করে আমি তোমার ও মৃত্যু ডেকে আনলাম। হে ঈশ্বর এ আমি কি করলাম ?’
তখন রুঢ়স্বরে কৈকেয়ী বললেন,‘ হায় সসাগরা ধরনীর অধিপতি মহারাজা দশরথ! প্রতিজ্ঞা করে এখন অনুতপ্ত হয়ে অস্বীকার করতে চাইছেন মহারাজ ? আপনি না ধার্মিক রাজা ? একদিন বর দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে আজ যদি তা রক্ষা না করেন তাহলে আপনি বংশে কলঙ্ক ডেকে আনবেন। আপনি যদি সত্যরক্ষা না করেন তাহলে আপনার সামনে আমি বিষ পান করে আত্মহত্যা করব। আমার সতীনি রাজমাতা হবে, আর আমাকে তাঁর পদতলে থাকতে হবে , এ আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারব না।’
রাজা এক্ষনে এক তীব্র ক্ষোভে বলে উঠলেন,‘ হাঃ কৈকেয়ী, তুমি এত বড় পাপিয়সি? কে তোমাকে এই মত দুর্বুদ্ধি দিয়েছে ? প্রেতলোকের বশীভূত হয়ে এইসব অনৈতিক কথা বলতে লজ্জা করছে না তোমার ? আমি আমার প্রিয়পুত্র রামকে কোন মুখে এমত নিষ্ঠুর কথা বলব। আমি রাম জননী কৌশল্যাকেই বা এই কথার কি জবাব দেবো ? তাঁর তো কোন দোষ নেই ! সে এতকাল মায়ের মমতা, ভগ্নীর স্নেহে এবং দাসীর মতো শুশ্রূষা দিয়ে সাব্ধি স্ত্রীর মত আমার সেবা করেছে। কিন্তু সেই রাম জননী কৌশল্যাকে ও আমি কোনদিন তাঁর যোগ্য সমাদর করিনি শুধু মাত্র পাপীয়সী তোমার জন্য।’
কৈকেয়ী বললেন, ’ মহারাজ আমি আপনার প্রতিশ্রুত দুটি বর চেয়েছি মাত্র। আপনি সে বর না ও দিতে পারেন। সে বর আপনি ফিরিয়ে নিতে পারেন। আমি আবার বলছি, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে যদি তা রক্ষা না করেন তাহলে আপনি ধর্মচুত্য হবেন। মহারাজ, আপনি প্রতিজ্ঞা করে এখন অনুতপ্ত হয়ে অস্বীকার করতে চাইছেন ? লোকের কাছে ধার্মিক বলে নিজেকে পরিচয় দেবেন কি করে? লোকে জিজ্ঞাসা করলে কি বলবেন? তখন কি বলবেন, কৈকেয়ী একদিন আমার প্রাণ বাঁচিয়েছিল, তাঁর দয়ায় আমি আজও বেঁচে আছি ! তাকে সত্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম । কিন্তু তা রক্ষা করিনি ! মহারাজ , আপনিই বংশে কলংক ডেকে আনছেন।’
রাজা দশরথ হাহাকার করে ওঠেন,‘ কৈকেয়ী তুমি বর চাইছ ,কিংবা, নিজের বৈধব্য কামনা করছ ? আমি তোমার রূপে মুগ্ধ হয়েছিলাম। কিন্তু জানতাম না ওই রূপ শুধু বিষ মিশ্রিত সুরা। আমি তোমাকে সতী মনে করেছিলাম কিন্তু আজ দেখছি তুমি দুষ্টাচারিণী। তুমি অসতী ! মূর্খ আমি। এতকাল ফুলের মালা মনে করে ফাঁসির দড়ি গলায় পড়েছিলাম। তুমি আমার স্ত্রী নও। তুমি অবিশ্বাসীনি। তুমি সর্বনাশিনী। তুমি সাক্ষাৎ এক বিষধর কালনাগিনী। আর আমি এ ও বলছি তোমাকে পাপীয়সী, রামের বনবাস যদি ভরতের প্রীতিপ্রদ হয় তাহলে আমার মৃত্যুর পর ভরত যেন আমাকে পিণ্ড জল না দেয়। পাপীয়সী , একদিন অগ্নিসাক্ষী করে তোমার পানিগ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু আজ তোমাকে এবং সেই সঙ্গে তোমার পুত্র ভরতকে আমি ত্যাগ করলাম। হে ইতিহাস তুমি সাক্ষী থেকো, আমি ধিক্কার জানাচ্ছি আমার পুত্র ভরত জননী’কে। নারীজাতির মধ্যে তিনি এক জ্বলন্ত কলংক। তিনি পাপীয়সী। তিনি দুর্মেধা।’
সন্ধ্যা হয়ে এলো। রাজভবনে মঙ্গলারতীর বাদ্য বেজে উঠল। কেকয় মহল নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। রাত গভীর হতে থাকে। বাইরে নক্ষত্র মালিনী নিশা। স্নিগ্ধ চাঁদের কিরন। সুখ স্বপ্নে নিদ্রিত অযোধ্যা। শুধু আর্ত বিনিদ্র রাজা দশরথ। জ্যোৎস্না মণ্ডিত নিশীথ আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি বিলাপ করছেন,‘ হে মঙ্গলময়ী নিশা, আমি করজোড়ে তোমার কাছে প্রার্থনা করি, চিরকাল এমনি করে জগৎকে তোমার অন্ধকারে ঢেকে রাখ। এই কাল রাত্রি যেন ভোর না হয়। প্রভাতের আলো যেন আর না ফোটে। এই ঘৃণা এই লজ্জা এই কলংক যেন প্রকাশ না হয়।‘
ন প্রভাতং ত্বয়েচ্ছামি নিশে নক্ষত্র ভূষিতে ।।
ক্রিয়তাং মে দয়া ভদ্রে ময়ায়ং রচিতোহঞ্জলীঃ।
অথবা গম্যতাং শীঘ্রং নাহ মিচ্ছামি নির্ঘৃণাম।।
নৃশংসা কৈকেয়ীং দ্রস্টুং যৎ কৃতে ব্যসনং মম । [অযোধ্যাকাণ্ড ১৩/১৭-১৯ ]
দশরথ করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন রাত্রির অন্ধকারের দিকে। তার জীর্ণ বুকের মধ্যে দুঃখের সাগর মথিত হচ্ছে। আতুর চিত্তে বিকার গ্রস্থের ন্যায় ছটফট করতে লাগলেন। মোহপাশে আবদ্ধ রাজা সত্যের শৃংখলে বাধা। তাঁর বিবেক আজ লাঞ্ছিত।
পরক্ষনেই উন্মাদের মতো অস্থির কন্ঠে বলে উঠলেন, ‘না না, এই অন্ধকার দূর হোক। এই দুঃস্বপ্ন সরে যাক। এই নির্মম নারী , এই নিষ্ঠুর নির্দয়া নৃশংস কৈকেয়ীকে আমার চোখের সামনে থেকে সরিয়ে নাও। আমার রামের অভিষেক সুসম্পন্ন হোক !’
( চলবে )


