শুভাশিস ঘোষ
ষষ্ঠ পর্ব
দশ
সেযাত্রায় কীভাবে যে কানাইকে ঘরে ফিরিয়ে এনেছিল শম্ভুচরণ, তা সেই সময় ঠিক জানতাম না। কেউ না বললে আর জানবই বা কীভাবে? অনেক বছর পর একদিন শুনেছিলাম সেসব ঘটনা। তখন স্বাধীন দেশ, কানাইচরণেরও বয়স হয়েছে। সে সময় তাকে মেজকত্তা নামেই ডাকে লোকজন।
একদিন বাগানে, সান বাঁধানো ছাউনির নিচে বসে মেজকত্তা গল্প শোনাচ্ছিল একদল ছেলেকে। তখন শুনেছিলাম আদালতে দাঁড়িয়ে শম্ভুচরণের সওয়াল করার ঘটনা। বাপ রে! কোর্টের ভেতরে কী দাপট ছিল বড়খোকার! বিলেতফেরত ব্যারিস্টার বলে কথা। খুব দাপটে সওয়াল করে কোর্ট থেকে জামিন করিয়ে ঘরের ছেলেকে ফিরিয়ে এনেছিল ঘরে।
ফিরিয়ে তো আনল, কিন্তু তারপর সত্যচরণের সেই যে রুদ্র মূর্তি দেখেছিলাম, বাপ রে! ওমনটা তো আগে কখনও দেখিনি। সোজা বলে দিল, “ওই ছেলে ঘোষালবংশের কুলাঙ্গার। মহারানির রাজত্বে বাস করব, আর তার বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ? জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে বিবাদ চলে নাকি? এ বাড়িতে থেকে সাহেবতাড়ুয়ার দলে কাজ করা যাবে না। হয় ওকে দিব্যি করতে হবে যে, জীবনে আর ওসব দেশ উদ্ধারের ধারে-কাছে যাবে না, নয়তো এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। ওকে আমি ত্যাজ্যপুত্র করব।”
তবে শম্ভুচরণ যে এত বিচক্ষণ হয়ে উঠেছিল, তা সেদিন নিজের কানে শুনেছিলাম। একেই বলে শিক্ষার গুণ। তা আবার যে সে শিক্ষা তো নয়, খোদ বিলেত থেকে নিয়ে আসা শিক্ষা। তাই ধীরে ধীরে বাবাকে বুঝিয়ে শান্ত করেছিল সেদিন শম্ভুচরণ। কানাইয়ের সঙ্গেও তো কত রাত পর্যন্ত কী সব আলোচনা করল। ওদিকে গিন্নিমা তো কেঁদেকেটে একশা। তাঁর কথা আর কে শোনে! এ দেশে মেয়েদের কথার মূল্য আর কে বা কবে দিল? নিজের পেটের ছেলেকে কত্তা বলে কি না ত্যাগ করতে হবে! তাতেই তো ঘোষালগিন্নির চোখ ছানাবড়া।
যাই হোক, সেযাত্রায় সত্যচরণের রাগ অবশ্য পড়েছিল। কানাইকে রিপন কলেজে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে বাড়িতে থাকার শর্তে ঠান্ডা হয়েছিল তার মেজাজ। তবে কলেজের পাট চোকালেও রাজনীতির ভূত কানাইয়ের মাথা থেকে নামাতে আর পারল কই?
এগারো
কাজলির বিয়ে ঠিক করেছে বংশী। তেরো বছর পেরোতে চলল, আর যে ঘরে বসিয়ে রাখা যায় না মেয়েকে! প্রতিদিন গিন্নির এই কথা শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছিল বংশী। বাপের মন তো, এত তাড়াতাড়ি পরের ঘরে পাঠাতে কি আর চায়! কিন্তু মা আর কী করবে? পাঁচজনে পাঁচ কথা বলে যে। গৌরবদ্যির ব্যাটাটা নাকি ছোঁকছোঁক করে কাজলির পেছনে। দিনকাল তো খুব ভালো নয়, তাই নিত্য ঠ্যালা মারে বংশীর বউ।
বংশীও ভাবে, কার ঘরে পাঠাবে মেয়েটাকে? কে বা উদ্ধার করবে তাকে? আড়তে কত লোক আসে, কত জায়গা থেকে! ফুরসত পেলেই তাদের কাছে ভালো পাত্রের খোঁজখবর করে। কিন্তু খালি হাতে ওই হা-ঘরে বংশীর মেয়েকে কে বা ঘরে তুলতে চাইবে? তাই বংশীর সেসব খোঁজখবরের ফল আর ফলে না।
মাঝেমধ্যেই ছোটঠাকুর বলে, “ওরে বংশী, অত উতলা হোসনি। যার যখন বিয়ের ফুল ফুটবে, ঠাকুরের ইচ্ছায় ঠিক চার হাত এক হয়ে যাবে। চিন্তা করিস না।”
অবশেষে ঠাকুরের ইচ্ছা হল। নিশ্চিন্তপুরের বিপুল নস্করের বড় ছেলে, চটকলে কাজ করে। বদলির কাজ, কিন্তু হপ্তায় দিন তিনেক কাজ ঠিক জুটে যায়। বিঘে দুয়েক বাপের জমি চাষে বিপুল। বাকি পরের জমিতে, এদিক-ওদিক মজুরি খেটে ঠিক চালিয়ে নেয় সংসার। ছেলের বিয়ে দেবে বলে ভিটেতে একখানা মাটির ঘর তুলছে। ও ঘরে বিচুলি নয়, বিপুলের ইচ্ছে শালকাঠের কাঠামোর ওপরে টালি চাপাবে। নতুন সংসার বলে কথা, কদিন পর মা ষষ্ঠী কৃপা করবে, সে ঘরে কি আর খড়ের ছাউনি চলে নাকি?
তাই গয়নাগাটি নিয়ে বিপুলের কোনো দাবি নেই। মেয়ের বাপ যা দেবে, তাই সই। শুধু একখানা সাইকেল চেয়েছে ছেলের জন্য। মিলে যাতায়াতের সুবিধে হবে। আর লোক খাওয়ানোর খরচখরচা বাদে ঘর ছাইতে যেটুকু লাগে। সব মিলিয়ে তিনশো টাকা পণের দাবি।
ছোটঠাকুরের কাছে কথাটা বংশী পাড়তেই মুখটা পানশে হয়ে গেল সত্যচরণের। বলল, “তোর ঘর থেকে কতটা বার করতে পারবি, বংশী?”
— আমার ঘরে আর কী আছে বলো ঠাকুর? কিছুই তো নেই!
— তাহলে? তুই যে খুব মেয়ের বিয়ের জন্য লাফালাফি করছিস! বলি, মুখ দেখে কি আর বিয়ে হবে? পণের তিনশো টাকা বাদ দিলেও আরও তো খরচখরচা আছে নাকি?
— তা তো আছে ঠাকুর।
— তো? কী করবি এখন?
— কী জানি ঠাকুর! কী করব? আমার তো বাপের জমিজিরেত নেই, আর টাকাপয়সাও নেই। এখন উপায়?
— উপায় কী বলি, বল তো? লোক খাওয়ানোর জন্য না হয় বড় পুকুর থেকে মণখানেক মাছ তুলে নিবি। এক বস্তা চালও না হয় নিয়ে যাস আড়ত থেকে। কিন্তু বাকি সব হবে কীভাবে রে?
— ঠাকুর, তবে কি কাজলির বেটা ভেঙে যাবে?
— আরে, আরেক করিস কী! পাছাড়! পাছাড়!
পা দুটো ছাড়িয়ে নিয়ে সরে বসে সত্যচরণ। মাথায় হাত দিয়ে আড়তের মেঝেতে বসে পড়ে বংশী। ফজলুল মিঁয়াকে ঢুকতে দেখে চোখের কোল বেয়ে দু-ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল তার। এমন দৃশ্য দেখে অপ্রস্তুত হয়ে মিঁয়া বলে উঠল, “কী ব্যাপার, বংশী? কিছু খারাপ খবর নাকি?”
বংশীর উত্তরের অপেক্ষা না করেই সত্যচরণ বলে উঠল, “আরে না, না। খারাপ হতে যাবে কেন? খারাপ নয়, বরং সুখবর। ওর মেয়ে কাজলির বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।”
— বাহ্, এ তো বেশ খুশির খবর! বংশী, মেয়েকে কি চিরকাল নিজের ঘরে রেখে দিবি নাকি? পরের ঘরে তো পাঠাতেই হবে রে। এ নিয়ম কি আর তুই ভাঙতে পারবি নাকি? এ নিয়ে মন খারাপ করতে নেই। যা, মাকে সাজিয়ে আন।
চোখের জল মুছে বংশী উত্তর করল, “না গো মিঁয়া, সেই জন্য মন খারাপ নয়। এখন খরচাপাতির কী হবে, সেই ভেবেই তো হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে গো মিঁয়া।”
একটু চুপ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ফজলুল মিঁয়া। বলল, “তা হিসেব-নিকেশ কিছু করেছিস?”
খাতার ওপর থেকে মুখ তুলে সত্যচরণ বলল, “খরচখরচা কি কম আছে নাকি? শুধু বরপণ দিতেই লাগবে তিনশো টাকা। তারপর বিয়ের খরচ, লোকজন খাওয়ানো মিলিয়ে অন্তত হাজার টাকার ধাক্কা। আমি আর কত টানতে পারব, বলো তো? তুমি তো সবই জানো মিঁয়া, এই ফাগুনেই তো বাড়িতে বড় কাজ হবে। বড়খোকার বিয়েতে কি কম খরচ আছে নাকি? মেয়ের বাপের কলকাতায় বিশাল নুনের গোলা, যশোরে পৈতৃক জমিদারি। এস্টেটের আয় নাকি যশোরের যত জমিদার আছে, সবার ওপরে। বুঝতেই পারছ, সেই বাড়ি থেকে মেয়ে আনতে হলে কী পরিমাণ খরচখরচা আছে। তাই আমি বলেছি, মণখানেক মাছ, এক বস্তা চাল নিয়ে যাবি। বাকিটা দেখ এদিক-ওদিক থেকে।”
ফজলুল মিঁয়ার কপালে ভাঁজ পড়ল। একটু মাথা নেড়ে বলল, “ঠিক আছে বংশী, আমিও দেখি। যা, আগে মাকে সাজিয়ে আন। তারপর আড়তের খদ্দের সামলা। পরে ভাবা যাবে।”
অঘ্রাণের ছয় তারিখে শামিয়ানা খাটানো হল বংশীর একচিলতে উঠোনে। সকাল হতেই পুজালিথেকে এসে গেছেন ফজলুল মিঁয়া। দুদিন আগে থেকেই বিয়ের সরঞ্জাম কেনাকাটায় ব্যস্ত কানাইচরণ। বংশী বা তার ভাইয়ের একচিলতে মাটির ঘরে এমন কিছু জায়গা নেই যে, একটা বিয়েবাড়ির সব জিনিসপত্র মজুত করা যায়। তাই পল্লি উন্নয়ন সমিতির ঘরে পেতল-কাঁসার বাসনপত্র, মুদিবাজার, বেনেবাজার, কুমোরসজ্জা—সব গুছিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছে কানাই। সমিতির ঘরে রাতে দুজন মেম্বারের শোবার ব্যবস্থাও করে দিয়েছে।
বিয়ের দিন সকাল থেকে ধোপা, নাপিত, পুরোহিত থেকে হালুইকর, বাজার, দোকান—সব প্রায় একা হাতেই সামলাচ্ছে কানাই। কার বাগানের কলাপাতা কাটতে হবে, কোন পুকুরে জাল পড়বে—সব দায়িত্ব আজ কানাইয়ের। সঙ্গে পল্লি উন্নয়ন সমিতির তরুণ বাহিনী। সব দিকটা তদারকির দায়িত্বে ফজলুল মিঁয়া।
দেখে বোঝার উপায় নেই, আজ কার মেয়ের বিয়ে। মেয়ের বাবা কি বংশী, নাকি ফজলুল মিঁয়া! বংশী আর তার বউ বারবার ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছে ফজলুল মিঁয়া আর কানাইয়ের জন্য।
“ঠাউর আছে গো, ঠাউর আছে। নইলে এই দুদ্দিনে এমন করে আমাদের উদ্ধার করতে ওরাই বা চলে আসবে কেন গো?”
বউয়ের কথায় কী উত্তর করতে হয়, জানা নেই বংশীর। চোখ দুটো কেবল ঝাপসা হয়ে আসে তার। কপালে হাত ঠেকিয়ে কার উদ্দেশ্যে যেন পেন্নাম ঠোকে বারবার।
ওদিকে কাজলির গায়ে হলুদের খবর নিয়ে পরানের বাড়িতে ঢোকে কুব্জা। দেখে, বারান্দায় পা ছড়িয়ে বসে মোক্ষদা পান চিবোচ্ছে আর বিড়বিড় করে কী যেন বলছে। কুব্জা বলল, “ও পিসি, মনে মনে কাকে গাল পাড়ছ গো?”
— আমি আবার কাকে গাল পাড়লুম রে সব্বনাশী?
— ও মা! এক্ষুনি তো শুনলুম তুমি গাল পাড়ছিলে।
— তুই চুপ কর তো, ভাতারখাকি! কাকে আবার, তোকে গাল পাড়ছি।
— ও মা! আমি আবার তোমার কোন বাড়া ভাতে ছাই দিলুম গো পিসি? বলি, বুড়ি হয়ে মরতে গেলে, এখনও তোমার ওই হিংসুটে পনা গেল না!
— অ্যাই ভাতারখাকি, বলি, আমি আবার কাকে হিংসে করছি রে?
— করছুনি? তুমি করছুনি? আজ কাজলির ভালো ঘরে বিয়ে হচ্ছে বলে তোমার যত জ্বালা। আমি কি আর বুঝিনি? তোমার বুড়ো মদ্দভাইপোর গলায় কাজলিকে ঝুলিয়ে দেওয়ার কম ফন্দি করেছিলেন নাকি? আজ সব ভেস্তে গেল, তাই এত জ্বালা। সব বুঝি আমি।
— হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাই। তাতে তোর এত জ্বালা কেন রে মাগি? আমি আমার ভাইপোর সংসারের কথা ভাবছি। তাতে তোর বাপের কী? ওরে, এই ঘরে বিয়ে দিলে বংশীর চোদ্দো গুষ্টি উদ্ধার হয়ে যেত রে! তা নয়, কোথায় চটকলের মজুর ধরে এনে মেয়েটাকে জলে ফেলে দিচ্ছে। যাক গে, তোর পাঁটি তুই মুখে কাটবি, না কি ন্যাজে কাটবি, সে তোর ব্যাপার।
— হুঁ! কত শখ বুড়ির! ওই বাপের বয়সি বুড়ো মদ্দর সঙ্গে কচি মেয়েটার বিয়ে দেবে! ওদিকে দেখো, তোমার আদরের ভাইপো বিষ্টুর বউয়ের পেছন পেছন ঘুরঘুর করছে। বিষ্টুটারও আর মরণ নেই! একটা বউ খেয়ে শান্তি হয়নি, তিন মাস যেতে না যেতেই ওমন একটা ডবগা মেয়েকে বিয়ে করে আনল। নে, এখন সামলা।
— অ্যাই কুব্জে, মুখ সামলে কথা বলবি। আমার ভাইপোর অন্ন তোর পেটে আছে রে। এত বেইমানি ধম্মে সইবে নে রে!
ধুতির ওপর নতুন গেঞ্জি পরে, গলায় ধুতির খুঁটটা জড়িয়ে, হাত দুটো জোড় করে বংশী ঢুকল বাড়িতে। তাকে দেখে কুব্জা বলল, “এসো গো বংশীদা। বসো।”
একটা পিঁড়ে পেতে দেয় দালানে।
বংশীকে দেখে মুখ বাঁকিয়ে আরও একটা পান মুখের মধ্যে ঠেসে দিল মোক্ষদা।
বংশী হাত দুটো জোড় করে বলল, “কন্যাদায় থেকে উদ্ধার করো গো পিসি। আজ সন্ধেয় আমার কাজলির বিয়ে। তোমাদের সকলের নেমন্তন্ন। পরানকে বলে দিয়ো, এসেছিলুম। সবাই এসো গো। ও কুব্জা, তুই কিন্তু বেলা বেলি চলে আসবি।”
পানভরা মুখে মোক্ষদা বলল, “আমাদের আর কে যাবে বাছা? ওই কুব্জা যাবে তো, ও গেলেই হবে ক্ষণ। ও তো আমাদের বাড়িতেই থাকে। ওকেই এ বাড়ির লোক মনে করবি।”
বংশী বেরিয়ে গেলে দাঁতে দাঁত চেপে মোক্ষদার দিকে তাকিয়ে কুব্জা বলল, “মরণদশা! আমাকেই এ বাড়ির লোক মনে করবে! কেন রে বুড়ি, আমার কি মরণ হয়নি যে এ বাড়ির লোক হতে যাব?”
— অ্যাই মুখপুড়ি, তুই কী বুঝবি রে? ওদের সঙ্গে আমাদের জল চলে নাকি? বংশীরা জাতিতে জেলে। আমার বাপ-ঠাকুরদা জেলেদের হাতে জল খেতুনি। আমরা হলুম গিয়ে জাত কৈবর্ত। ওদের বাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে যাব? আরে ছ্যা ছ্যা!
— ও মা! আর বাঁচি নে! বুড়ো ভাইপোর সঙ্গে যখন বিয়ে দেওয়ার তাল করছিলে, তখন ওরা কী জাত ছিল গো? তখন তো ঠিক ছিল। আর এখন জল চলে না! কী কথা বলছ গো পিসি? আমিও যেন কৈবর্তের ঝি নই? জেলেরা বুঝি কৈবর্ত নয়? ওরা জেলে আর তোমরা হেলে—এই তো তফাত!
(চলবে)


