সলিল সমাধি

সলিল সমাধি

[ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে নাজিরা মহাবিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।রাজীব বরা সাহিত্যের বিভিন্ন বিভাগে নিজ প্রতিভার পরিচয় দানে সমর্থ হয়েছেন।তিনি একাধারে কবি,সমালোচক,গল্পকার,ঔপন্যাসিক এবং প্রাবন্ধিক।বর্তমান অসমিয়া কবিতার জগতে রাজীব বরা একটি অতি সুপরিচিত নাম।কাব্যগ্রন্থগুলি যথাক্রমে ‘তটিনী তীরর খেলা’,’ঢেউ’,’মানুহ চেরাই বাচি থকা নাযায়’,’মাউরর দিন’,এই ফালেও কবি আছে’।মৌলিক প্রবন্ধ সংকলন ছাড়াও সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘চিন্তা-পরিক্রমা’,’অসমিয়া আরু কথা সাহিত্যর আভাস’ ইত্যাদি।আলোচ্য উপন্যাস ‘সলিল সমাধি’ (‘জলজাহ’)মাখন হাজরিকা স্মৃতি উপন্যাস পান্ডুলিপি প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হয়। এছাড়াও শ্রীবরা বিভিন্ন পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। ]

১৯৫৮ সনে অসমের নগাঁও জেলার যমুনামুখে বাসুদেব দাসের জন্ম হয়।১৯৮২ সনে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্বে এম এ করেন। আজ পর্যন্ত অসমিয়া অনূদিত গল্পের সংখ্যা পাঁচশত পঞ্চাশটির ও বেশি।সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে নিয়মিত ভাবে অসমিয়া গল্প,কবিতা,প্রবন্ধ এবং উপন্যাস অনুবাদ করে চলেছেন।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপরিচিত সংস্থা NEINADএর পক্ষ থেকে অসমিয়া ভাষা-সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারের জন্য Distinguished Life Membership এর দ্বারা সম্মানিত করা হয়।প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশটি।হোমেন বরগোহাঞির অসমিয়া উপন্যাস ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’(সওদাগরের পুত্র নৌকা বেয়ে যায়) বাংলা অনুবাদের জন্য ২০২৪ সনের সাহিত্য আকাদেমি অনুবাদ পুরস্কারে সম্মানিত হন।

১৮

অচিন মাছের কাঁটা

কে জানে হয়তো কুড়ি বছর হবে। কুড়ি বছর আগের সেই বন্যা দামোদর ভুলতে পারেনি। ভালোভাবে বলতে গেলে কোন বন্যাটা ভুলতে পেরেছে।মামাদের যোগীগাঁওটা বন্যায় ভাঙ্গা ঘটনার সেও সাক্ষী ছিল। উদ্দাম জীবনটাকে বন্ধনের মধ্যে পাঠশালায় আসা যাওয়া করা দিনগুলির কথা। তারপর সেই অন্য মাজুলীবাসীদের মতোই কত যে বন্যার অভিঘাত সহ্য করেছে। এখনকার দুই কুড়ি দশ বছরের জীবনটা অনেক বন্যা প্রত্যক্ষ করেছে, শুকনো শরীর ভিজিয়ে জলে চুবিয়েছে।

প্রতিটি বন্যার প্রায় একই রূপ। একই চরিত্র। তথাপি সেই বন্যাটা ছিল ভয়ঙ্কর। শাস্ত্রে বর্ণিত মহাপ্রলয়ের মতো। তথাপি বন্যার পরে বন্যার উপুর্যুপরি আঘাতে কোন বন্যার উপদ্রব কত ছিল আলাদা আলাদা ভাবে মনে রাখতে হল না। তবে বন্যায় হওয়া ঘটনাগুলি কিছু ঘটনা ভুলতে না পারার মতো তার মনে দাগ কেটে স্থায়ী হয়ে গেল। এরকম একটি বন্যায় বাবা নৌকার মাথায় রশি দিয়ে বেঁধে এনেছিল সেই মাছটা, বিশাল আকারের মহাশোল মাছটা,যার সযত্নে রাখা কাঁটা কিছুক্ষণ আগে তার হাতে ফুটেছিল।

তখন সে সফল যুবক। বাবা ও কর্মঠ। মাজুলীর কিছু কিছু অংশ ঘিরে বাঁধ ছিল যদিও বাবা ব্রহ্মপুত্রের জলধারা ভেতরে প্রবেশ করার জন্য অনেক পথ ছিল। টুনী নদী, দরিয়া ঘাট ইত্যাদি পথ গুলি খোলা। জল আসে, মাঠ ঘাট ডুবিয়ে আবার বেরিয়ে যায়। তবে সে বারের জলটা যেন বেড়ে গিয়ে এবারেরটার মতো কিছু সমস্যার সৃষ্টি করেছিল।

অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকা ঠাকুমাকে দেখার জন্য বনগাঁও নৌকা করে যাওয়ার সময় সে পহুমরা ,যোরবিল,পটিয়রী ইত্যাদি গ্রামে জল থেকে বাঁচার জন্য বড়ো চাঙ অথবা ঘরের মটকায় উঠে থাকা মানুষ দেখেছিল। উঁচু রাস্তাঘাট না থাকা সেই গ্রামগুলির মানুষ আশ্রয় নেবার জন্য উপযুক্ত কোনো জায়গা ছিল না। বর্ষায় গরু মোষকে উঁচু ঢিবিতে তুলে রাখা ঢিবিগুলিও ডুবে গিয়েছিল।পেট পর্যন্ত জলে ডুবে থাকা গরু-মোষগুলি স্রোতে দাঁড়িয়ে থাকা দৃশ্যটি হৃদয় বিদারক ছিল।

কে জানি বলেছিল। জল শুকানোর পরে ওদের বিপদ হবে। সে রকম বিপদ সে দেখেছিল– কয়েকদিন জলে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য গরুর পায়ের ছাল খসে , মাংস গলে যাওয়ার অসুখ হয়েছিল। কী যন্ত্রণার দিন। কলাগাছের প্রকাণ্ড ভেলা তৈরি করে , তার মধ্যে গরু ছাগলদের তুলে দিয়ে কেউ কেউ তার সঙ্গে নিজেও ছিল।

সেই বন্যায় ওদের গ্রামের মানুষ অন্যান্য বারের মতো সামনের দিকের পথটাতে আশ্রয় নিয়েছিল। একদিন দুদিন করে তিন দিন পর্যন্ত শুকানোর নাম না নেওয়া, সেই বন্যায় পথের আশেপাশে, কারও উঁচু বাগানের ভেতরের কলাগাছ গুলি কেটে কুটে শেষ করা হয়েছিল। কচি কলাগাছের গোড়া খেয়ে গরু পথঘাট, চালার নিচে পাতলা পায়খানা করে সম্পূর্ণ জায়গাটা দুর্গন্ধময় করে তুলেছিল।

যাদের আছে তারা যাদের নেই তাদের এক মুঠো আহার জুগিয়ে প্রাণ বাঁচালেও সাধারণ মানুষের সমস্যা হয়েছিল গরু বাছুরকে নিয়ে। গরুর জন্য খাদ্য নেই। ক্ষুধায় হাম্বারবে ডাকতে থাকা গরুর মুখে কী দেওয়া যায়? এরাবারীর সামনের মাণিক-চর, ন-ভাঙ্গা চরও জলের নিচে। ঘাসের খোঁজে মানুষগুলি খাবলুর বুকের চর পর্যন্ত নৌকায় পাড়ি দিয়েছিল। সারাদিন নৌকায় নৌকায় উজিয়ে ভাটিয়ে দু একটি ঘাস পেয়েছিল বা পায়নি। এরকম সন্ধানে সেদিন সকাল বেলা বেরিয়ে গিয়েছিল সুনদ। দামোদরের পিতা সুনদ। সঙ্গে হেমধর।

লাল চায়ের বাটি হাতে তুলে নিয়ে পনেরো দিন আগে যত্ন করে মাটির কলসে ভরে মুখ বন্ধ করা থেকে বের করে আনা এক আঁজলা মুড়ি চিবিয়ে সুনদ হেমধরকে জিজ্ঞেস করল– ‘তুই কিছু খেয়েছিস কি? সারাদিনের জন্য বেরোতে হবে। আজ কত দূর যেতে হতে পারে তার কোনো ঠিক নেই। কাল নাকি বোপারামরা বিকেল পর্যন্ত বিভিন্ন চরে ঘোরাফেরা করে এক মুঠো ঘাস ও পায়নি। ওরা উজানের দিকে গিয়েছিল। আমাদের ভাটির দিকে নৌকা ভাসাতে হবে।’ঘট থেকে খামচে আনা কিছুটা গুড় মুখে দিয়ে সে স্ত্রী পানীমলার দিকে তাকিয়ে বলল– ‘মুড়ি খেয়ে বিকেল পর্যন্ত থাকা যাবে না, কিছু একটা পুঁটলীতে বেঁধে দে।’

পানীমলা এক মুঠো চাল ভাজা, একটু গুড়, দুটো কলা একটা কাঁসার বাটির সঙ্গে গামছা দিয়ে বেঁধে রেখেছিল। ঘরে তৈরি গুড়। বড়ো আরও দুটো ঘটে রাখা আছে। পথে বেরোনোর সময় তারই অর্ধেক খাওয়া ঘটটা সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। জ্বাল দেওয়ার সময় ঘন ছিল যদিও জল হাওয়ার জন্য গুড়টা এখন পাতলা জলের মতো হয়ে পড়েছে। চাল ভাজাটাও দিন পনেরো আগের। উপায় নেই, অভাবে পড়লে এসব ভাবলে চলে না,-জীবনটাকে কোনোমতে বাঁচাতে পারলেই হয়।

পুঁটলিটা এগিয়ে দিয়ে পানীমলা বলল–‘পেলে পাবে না পেলে নেই। তা বলে ঘাসের জন্য শুধু দেরি করবে না। আলো থাকতে থাকতে বাড়ি ফিরে আসবে।’

স্ত্রীর কথার উত্তর না দিয়ে সুনদ বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। চালায় হেলান দিয়ে রাখা বৈঠাটা তুলে নিল। হেমধরও পুঁটলিটা হাতে নিয়ে নৌকায় গিয়ে বসল। নৌকা বেঁধে রাখা রশির গিঁটটা খুলে সে নৌকাটা ছেড়ে দিল। স্রোতের অনুকূলে নৌকার ভাটির দিকে গতি– কিছুটা এগোতেই হেমধরের মুখ থেকে নাম ভেসে এল–

‘ চলাই দিয়া জীবন বান্ধৈ চলাই দিয়া নাও

মেলি দিলোঁ টুলুঙা নাও যেন সিপার পাওঁ।’

না মানিক চরের কোথাও কাটতে পারার মতো এক ফোঁটা ঘাসও পাওয়া গেল না। যে কয়েকটি অবশিষ্ট ছিল, সেগুলিও কেউ কেটে নিয়েছে। দুই এক জায়গায় বেরিয়ে থাকা ডগাগুলি বলছে – নিচে ঘাস আছে। জলে নেমে ঘাস কাটাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না – একটা গোটা মানুষ তলিয়ে যাওয়ার মতো জল, ঠাই পাওয়া যাবে না।

মানিকচরের পাশ দিয়ে ওরা লুইতের মূল উপনদীটা পার হয়ে খাবলুর দিকে এগিয়ে গেল। জায়গা গুলি পরিচিত যদিও জল ডুবিয়ে ফেলে জায়গাটাকে অপরিচিত করে তুলেছে। লোহিত ঘাটের এপার থেকে লক্ষীমপুর পর্যন্ত রাস্তাটা জায়গায় জায়গায় বেরিয়ে আছে যদিও বেশিরভাগই জলের নিচে। এই পথ দিয়ে মাজুলীর মানুষ কতকাল যে উত্তর পারের সঙ্গে সংযোগ রেখেছে। সুনদেরও উত্তর পারে বন্ধুর বাড়িতে খরার সময় এই পথেই যাওয়া আসা।

খরার সময় পরিচিত চরগুলির আঁকাবাঁকা পথে বর্ষা থাকে না। তখনও নেই– নদী পথ গ্রাস করে সেখানে জলের চাদর পেতে রেখেছে। রাস্তা এখন সোজা যদিও সুগম নয়। পথে পথে বিপর্যয়। স্রোতের প্রচন্ড গতিতে পড়লে আর রক্ষা থাকবে না।

চোখে দেখা যায় না এমন দূরত্বে সবুজ দেখে সুনদ আর হেমধরের মনে আশার সঞ্চার হল।যা হোক দুটো ঘাস গরুগুলির মুখে তুলে দেওয়া যাবে।চরের একটা পামের কাছে ঘাসগুলির উদ্দেশ্যে নৌকাটা কাছে নিতেই ওপাশ থেকে কেউ চিৎকার করে উঠল-কে?কে?তোরা কে?ঘাসে হাত দিবি না।কথা খারাপ হবে।’

সুনদ দেখল-চরের একটা ক্ষেতের বাগানের মাঝখানের অর্ধেক ডুবে যাওয়া একটা ঝুপড়ি থেকে কেউ একজন তাদের দিকে দ্রুত নৌকা চালিয়ে আসছে।লোকটি বগেন পগাগ।এটা তার বাথান।সেখানে সে যাযাবরের মতো থাকে।অন্যসময় বন্ধু বলে সম্বোধন করা লোকটার কাছাকাছি যেতে তাদের সাহস হল না।পরিস্থিতি এখন এমন যে বন্ধু বলে কোনো কথা নেই।ঘাসের খোঁজে নাস্তানাবুদ হওয়াটা যেমন সুনদদের ভাগ্য;তেমনই সেই ঘাসগুলিকে নিজেদের গরু-মোষের জন্য বাঁচিয়ে রাখাটা বগেনের দায়িত্ব।

কেবল বগেইন নয়,চরের ঘাসে জল থেকে বেরিয়ে থাকা ঘাসকয়টিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সেই বিপর্যয়ের দিনে অনেককেই পাহাড়া দিতে হয়।তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই।সুনদ এবং হেমধরও দ্রুতগতিতে সেখান থেকে সরে আবার কোথাও দুটো ঘাসের সন্ধানে পুনরায় নৌকা বাইতে লাগল।

নদী তীরের একটি গ্রাম পার হয়ে তীব্র স্রোত এবং কচুরিপানার চলাচল দেখে হেমধর বলল–‘এবার খাবলুতে পড়েছি বলে মনে হচ্ছে। সামনের দিকে দেখ – আকাশ থেকেই তেড়ে আসছে। স্রোতের গতি দেখ। আর এগোব না নাকি? বেলা দুপুর হয়ে গেছে।’

হেমধর ঠিক কথাই বলেছে। ঘাসের খোঁজে নদী দিয়ে আসতে আসতে ওদের গ্রাম থেকে দুজনেই কত মাইল দূরে চলে এসেছে তার ঠিক নেই। আনুমানিক পাঁচ ছয় মাইল হবে বোধহয়। কয়েকটা পান সুপারি খাওয়ার পথ। ফিরে যেতে যেতে বিকেল হয়ে যাবে। কী করা যায়?

আলোচনা করতে করতে দূরে জলের মধ্যে বেশ বডোসড়ো এক টুকরো সবুজ দেখে সুনদ বলে উঠল–’ মনে হচ্ছে ওখানে কোনো পাহারাদার নেই। আশেপাশে পাম খেতও নেই। চলতো দেখা যাক। কিছু ঘাস পাওয়া যেতে পারে।’ সেই জায়গায় উপস্থিত হয়ে তারা দেখল– হ্যাঁ পাহারা বিহীন লুহিয়া ঘাস। জলের ওপরে বেরিয়ে থাকা অংশটা প্রায় আড়াই হাতের মতো লম্বা হবে। বোধহয় তার কিছু অংশ কেটে নিয়েছি যদিও বাকি যা রয়েছে সেটাও কম নয়। ভালোভাবে কাটতে পারলে দশ বারো আঁটি ঘাস উদ্ধার করা যাবে।

সেখানে দশ আঁটি ঘাস কেটে দুজনেই যখন বাড়িমুখো হল ততক্ষণে সূর্য অস্ত যাবার পথে। অনেক সন্ধানের শেষে ঘাসগুলি খুঁজে পাওয়ার আনন্দ দুজনের মুখে জ্বলজ্বল করছে। গরু বাছুর গুলির ক্ষুধার্ত মুখে দেবার মতো কিছু জুটল। কথাটা ভাবতে গিয়েই সুনদের নিজের পেটটাও কলকল করে উঠল বলে মনে হল।

চালভাজা কাঁসার বাটিটাতে ঢেলে জলীয় গুড় এবং কলা দুটো দিয়ে মেখে , তারই এক মুঠো হেমধরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বাকিটা বাটিতে ঢেলে নিয়ে সুনদ খেতে শুরু করে কিছু একটা ভাবল। নৌকাটা ছেড়ে দিলে ভাটির দিকে যাবে। তাই হেমধরকে খাবার সুবিধা করে দিয়ে সে বৈঠাটা সজোরে খামচে ধরে নিয়ে নৌকা বাইতে লাগল।

হেমধর অবকাশ পাবে নিজের ভাগ্যের চাল ভাজাটা খেয়ে নদী দিয়ে বয়ে যাওয়া কাদা রঙের এ কাজলা জল মুখে নিয়ে সনদ ডাকল– সাত দিনের মধ্যে অভাব দূর হবে বলে মনে হচ্ছে। বর্ষার আগে বলদ জোড়া বিক্রি করে না দিলে বিপদ ছিল। যে কয়টা আছে তাদের এই ঘাসগুলো দিয়েই কয়েকদিন সামলাতে হবে। ‘

হেমধর হ্যাঁ না কোনো উত্তর না দিয়ে নৌকা বেয়ে চলল। ওদেরও মণিপুরী গরু জোড়ার সঙ্গে একটা গাভী । এটা ও আজ কালকের মধ্যে সময় হবে। নতুন পোয়াতি। সেই চিন্তাও আছে। তার মধ্যে এই আপদের বন্যা। এই কয়েকটি ঘাস মুখে দিতে পারলে ওদের ক্ষুধা মিটুক না মিটুক মালিকের আত্মা শান্তি পায়।

ফিরে আসার সময় চরটা ছাড়িয়ে নদীর মূল সূতিতে উজানের দিকে নৌকার সামনের দিকটা পড়তেই পশ্চিমের আকাশটার দিকে তাকিয়ে সুনদ কিছুটা চিন্তায় পড়ে গেল। হঠাৎ আবহাওয়াটা দেখছি খারাপ হয়ে এসেছে। দুপুরের শরীর পুড়িয়ে দেওয়া রোদ এবং গরম শুরু হতে সে ভেবেছিল রাতের দিকে বাতাস বৃষ্টি আসতে পারে। সেটা যে বিকেলেই এবং এত তাড়াতাড়ি আসবে তা বুঝতে পারেনি। এখন একটু একটু বাতাস দিচ্ছে।স্রোতের বিপরীতে বয়ে চলা বাতাস নদীর জলে ঢেউ তুলছে। নৌকার গায়ে ধাক্কা খেয়ে ঢেউয়ের জলের কণাগুলি ছিটকে পড়ছে। ঢেউয়ের গতি বাড়লে টালমাটাল অবস্থা বিপদে ফেলবে – নৌকা নির্ঘাত ডুবে যাবে। কী করা যায়? নদীর মধ্যে নৌকায় থাকলে তুফান এলে আশ্রয় নিতে পারার মতো তীর পাশে নেই। কাছে নেই বড়ো গাছপালা থাকা বন জঙ্গল।

‘বাতাসের বেগ দেখছি প্রবল হয়ে উঠেছে। পশ্চিমের আকাশ ক্রোধী। আকাশের রং বদলে কাকের ডিমের মতো হয়েছে।কী করা যায়?’দূরে তাকিয়ে সুনদ বলল–‘ঐ যে বগরী গুরি চরের বগরীডরা পৌঁছাতে পারলে ভালো ছিল। একটু জোরে দাঁড় টান।’-সুনদের আহ্বানের প্রয়োজন ছিল না।দাঁড়-বৈঠা হেমধর বেশ জোরেই টেনে যাচ্ছিল। সেও সুনদকে উদ্দেশ্য করে বলল–‘বাতাসে নৌকাটাকে পাথালিমুখো হতে দিবি না। সোজা করে রাখ। ঢেউ ডোবাবে। নৌকার পাশটা তিন আঙুলের মতো বেরিয়ে আছে।’

পশ্চিমে কালো হয়ে উঠা আকাশটা যেন ক্ষিপ্র গতিতে ওদের দিকে এগিয়ে আসছে। কিছুক্ষণ পরে হয়তো মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হবে।

শৈশব থেকে মাঠের জীবনে অভ্যস্ত জনগণ আকাশ দেখলেই বুঝতে পারে–কোথায় কখন বৃষ্টি হবে অথবা তীব্র উত্তাপ দহনের সৃষ্টি করবে। এই অভিজ্ঞতায় সনদ জানত যে খুব দ্রুত তুফান -বৃষ্টি শুরু হবে। সঙ্গে সে এটাও আশা করেছিল যে ততক্ষণে তারা শিয়াল চর পার় হয়ে মিলিগ্রামে বা গ্রামটির আশেপাশে বগরী গাছে পূর্ণ জায়গাটায় পৌঁছে যাবে। কিন্তু তাদের হিসেব ভুল প্রমাণিত করে আবহাওয়া দ্রুত খারাপ হয়ে পড়ল।

কী করা যায়?ছলাৎ ছলাৎ করে নৌকায় ঢেউয়ের আঘাত ভারসাম্য হারিয়ে নৌকাটাকে অস্থির করে তুলেছে। ইকরার ডগা খামচে ধরে দুজনেই নৌকাটা স্থির রাখার চেষ্টা করল। কিন্তু হঠাৎ মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল। নৌকার খোলে জমা হওয়া জল ছেঁচে ফেলার অবকাশ পাওয়া যাচ্ছে না। বৃষ্টিতে নৌকার খোল উপচে পড়ল এবং একসময় ধীরে ধীরে নৌকাটা ডুবে গেল। জলে ভাসার মতো কাঠের তৈরি বলে নিচে চলে না গেলেও পাশ ফিরল।

যা ভয় করেছিল সেটাই হল–নৌকার খোল থেকে গাছগুলি বেরিয়ে স্রোতে ভাসতে লাগল। নৌকা ধরে ভাসতে থাকা হেমধরকে নৌকাটাকে ওপরমুখী করার জন্য বলে সুনদ ঘাসের মুঠোগুলো চেপেচুপে ধরে সাঁতার দিতে থাকল। বৈঠাটাকে ঘাসের ওপরে তুলে ধরল। হেমধর ও নিজের নৌকা বেয়ে যাওয়া বৈঠাটা এবং নৌকার খোলে থাকা বাঁশের কাঠির কোঁচটা ঘাসের মুঠো গুলির উপরে ছুঁড়ে দিয়ে পাশ পরিবর্তন করে নিচুমুখো হয়ে যাওয়া নৌকাটাকে উপরমুখো করার চেষ্টা করল।

নৌকাটা ভাটির দিকে যাচ্ছে। ঘাসের মুঠোগুলোও তাই। তার সঙ্গে ভাটির দিকে চলেছে ওরা দুজন। হঠাৎ আগত দুর্যোগ কাবু করলেও দুজনের নিজেদের প্রাণের সংশয় নেই। জীবনে এর আগেও এভাবে কখনও নৌকা ডুবেছে। এরকম বিপর্যয় থেকে বেঁচেও গেছে। এখন পরিস্থিতিটা আকস্মিক যদিও দুজনেই ভয় পায়নি। সঙ্গে বাচ্চারা থাকলেই বিপদ। তবে ঘাসগুলিকে বাঁচাতে না পারার চিন্তায় দুজনেরই মন খারাপ।

উপুর হয়ে পড়া নৌকাটাকে পুনরায় সঠিক অবস্থানে এনে একটু একটু করে জল সেঁচে নৌকাটাকে মানুষ উঠার মতো অবস্থায় নিয়ে এল। বাকি জলটুকু সেঁচার জন্য রাখা কলা গাছের খোল দিয়ে তৈরি সেঁচনীটাও ভেসে গেল । নৌকায় লাফ দিয়ে উঠে পা দিয়ে ছিটিয়ে যতক্ষণে সে খোলের মধ্যে থাকা জলটুকু সম্পূর্ণভাবে সেঁচল ততক্ষণে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে এল। বিদ্যুৎ চমক আর গর্জন করে কার ও উপরে ক্রোধ প্রকাশ করা ক্রোধী আবহাওয়ার পরিবর্তন হল। কালো রঙের মেঘ দূরে সরে গেল। কিন্তু গোটা পরিস্থিতিটাতে স্রোত ওদের বহুদূর ভাটির দিকে নিয়ে গেল।

ঘাসগুলি সামলে সুমলে দুই একটাকে নৌকায় তুলে ওরা স্রোতে ভাটিয়ে গিয়ে কুল গাছের ঝোপের মধ্যে পৌঁছাল। তারই একটি গাছে ওদের নৌকাটা পাথালি ভাবে লেগে রইল। তখনও তুলতে বাকি থাকা ঘাস গুলি ধরে সুনদ নৌকার পাশে স্রোতে সাঁতার কেটে যেতে লাগল।

জলে ভেজা ঘাসের ভারে নৌকাটার ওজন বৃদ্ধি হওয়ায় তিন মুঠোর মতো ঘাস ছেড়ে দিতে হল। কথাটা দুজনকেই মনোকষ্ট দিল। এছাড়া উপায়ও নেই। মনকে শান্ত করতে না পেরে নৌকায় তুলে নিলে পুনরায় যদি নৌকা ডুবে যায়। না খুব বেশি মুখ না মেলাই ভালো, ঠোঁটের পাশটা ফেটে গেলে বিপদ হবে।

নৌকায় উঠে কুল গাছের গায়ে লেগে থাকা শেষ ঘাসের মুঠো জল থেকে নৌকায় তুলতে গিয়ে, জলের দিকে হেলে যাওয়া সুনদ গাছের মধ্যের জলে কিছু একটা দেখে উশখুশ করে উঠল। ঘাসের মুঠো নৌকায় না তুলে হেমধরের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সে ফিসফিস করে বলল–’ওদিকে তাকিয়ে দেখ, ওটা কি?’

উৎসুকভাবে নৌকার এক প্রান্ত থেকে হেমধর এগিয়ে এল এবং মাথাটা পেছনদিকে হেলিয়ে সুনদের অঙুলি নির্দেশ করা জায়গায় তাকিয়ে তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।কী ওটা? একটা মুখ। মাছের মুখ। একটা গভীর গর্তের মতো মুখ। হ্যাঁ। হ্যাঁ। ওটা মাছেরই মুখ। ছটফট করতে থাকা মাছের মতো মুখটা বারবার খুলছে আর বন্ধ করছে।

মাছের ছটফটানি ওরা অনেকবার দেখেছে।মকা,পুঠি থেকে আরম্ভ করে কুঁড়ি-বোয়াল,আইর়-গাগলা পৰ্যন্ত। এই ধরনের মাছ ওরা মেরেছে- ধরেছে। বিলে- ডোবায় ছটফট করতে থাকা মাছের অবস্থাটা মৃত্যুর আগের মুহূর্তের অবস্থা। মাছ এমনিতে ছটফট করে না। জল বিষাক্ত হলে অথবা কখনও মরণ সন্নিকট হলে ছটফট করে। এই ক্ষেত্রেও মাছটির মৃত্যু সন্নিকটে বলেই মনে হচ্ছে। তবে এটা মাছই তো? এত বিশাল মুখ। হাতের মুঠো ঢুকে যেতে পারার মতো বিশাল মুখের সুড়ঙ্গ। তাহলে মাছের মাথাটা কত বড়ো হবে? শরীর তো একটাই। হেমধর মনে মনে মাছটার আকারের আভাস পেতে চেষ্টা করল।

‘খুব বেশি ছটফট করবি না। মাছ তো একবার তলিয়ে গেলে আর উঠবে না। মাছটার শরীরে শক্তি নেই বলেই মনে হচ্ছে। দাঁড়া, দেখছি কী হয়।’-খালে- ডোবায়- বিলে মাছ মারা, উজানেও মাছ ধরার অভিজ্ঞতা এবং অনেক মাছ দেখার অভিজ্ঞতায় সুনদ চেনার চেষ্টা করল–মাছটা আসলে কী? কেবল মুখ দেখে পরিষ্কার বোঝা যাবেনা। মুখের বৃহৎ আকার মাছটাকে অপরিচিত করে তুলেছে।তারমধ্যে ঘোলা জলের জন্য নিচের অংশ ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে না।রুই বা কাতলা বলেই মনে হচ্ছে যদিও মুখের আকারটাাই ওদেরকে বিপদে ফেলে দিয়েছে।

কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে সুনদ দেখল মাছটা যেন স্থিরতা হারিয়ে ফেলেছে।সোজা হয়ে থাকার চেষ্টা করেও বারবার একপাশে হেলে পড়ছে।এরকম করার সময় হঠাৎ ঝলসে উঠা মাছের পিঠটা দেখে হেমধর ফিসফিস করে বলল -‘এত বড়ো।মাছ নয় নাকি?কোনোভাবে ভূতটূতও হতে পারে।এখনই অন্ধকার নেমে আসবে।চল চলে যাই।কোনো বিঘ্নও ঘটতে পারে।’পরিবেশটা তার কেমন যেন ভয়ঙ্কর বলে মনে হচ্ছিল।সন্দেহ হয়েছিল।ভয়ও পেয়েছিল।

সুনদের মনে যে সেরকম ভাব একেবারে জাগেনি তা নয়।তারমধ্যে আজ দিনটাও ভালো নয়।আবহাওয়া খারাপ হওয়া,নৌকা ডুবে যাওয়া ইত্যাদি বিপর্যয় থেকে কোনোমতে উদ্ধার পেয়েছে।আর এখন না চাইতেই ওদের সামনে একটা মাছ।মাছ মানে আগে কখনও না দেখা,অপরিচিত বলে মনে হওয়া বিশাল মাছ।যেন আউনী-আটী সত্রে দেখা মৎস্য অবতার অভিনয়ে ব্যবহার করা ছোঁ-মুখোসটার সমান।ঘোলা জলেও কোনো মুহূর্তে জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকা চোখের মণিদুটো ভয় দেখাতে পারা লাল এবং উজ্জ্বল।

‘জলদেবতা। জলদেবতা।’ –অস্ফুটভাবে উচ্চারণ করে জলাশয়ের দিকে হাত জোড় করে হেমধর প্রণাম জানাল।

‘না।দাঁড়া। এটা মাছই। বুড়ো মাছ। হয়তো তার মরণকাল উপস্থিত হয়েছে।’-সুনদ বলল যদিও মাছ কীভাবে বুড়ো হয় সেও জানে না। কারু কারুকে বলতে শুনেছে দক্ষিণ পাট সত্রের পুকুরে গজার মাছ নাকি বুড়ো হয়ে পিঠে ঢেঁকিয়া গজিয়েছিল।

সেই সত্রে সে যে যায়নি তা নয়। যোগী গাঁও থেকে দামোদরের মাকে বিয়ে করে আনার সুবাদে সম্পূর্ণ বনগাঁওটাই সুনদের শ্বশুর বাড়ি। সেখানে গেলে পাশে থাকা পুরোনো চামগুরি বা দক্ষিণপাট সত্রে এক পাক ঘুরে আসাটা তার নিয়মের মধ্যে ছিল। এরকম যাত্রায় সে দুপুরের রোদে সত্রের পুকুরে জোড়া গজার স্থির হয়ে থাকতেও তীর থেকে দেখেছে। স্থির হয়ে থাকা গজার মাছের চোখ দেখে ভয়ও পেয়েছে। সেটা নাকি অপদেবতায় পাওয়া মাছ।

এই মাছটাও হয়তো অপ দেবতায় ভর করা। তাদের ছলনা করতে এসেছে। এরকম চিন্তা মনে এসেছে যদিও মাছটাকে জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে দেখে মরণমুখী মানুষের মুমূর্ষ অবস্থার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

নৌকায় থাকা কোঁচটা তুলে শক্ত করে খামচে ধরে সুনদ মাছটার গতিবিধির লক্ষ্য করতে লাগল। বাঁশের শলা দিয়ে নির্মিত হলেও সামনে লাগানো লোহার শলাকা গুলি কঠিন। কাঠ ভেদ করতে পারার মতো সূঁচলো এবং ধারাল। অবশ্য এত বড়ো একটা মাছকে এই কোঁচ দিয়ে বিদ্ধ করে আটকে রাখতে পারাটা হয়তো সম্ভব হবে না। তবে একটি মাছের জন্য এই কোঁচের একটা খোঁচাই যথেষ্ট–সুনদ ভাবল এবং নৌকাটা ঝোপের মধ্য দিয়ে ক্রমান্বয়ে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য হেমধরকে ইঙ্গিতে নির্দেশ দিতে লাগল।

নৌকাটার সামনেটা ক্রমান্বয়ে ঝোপের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় সুনদ মাথাটা ঘুরিয়ে হাল ধরে থাকা হেমধরকে ফিসফিস করে বলল–’মহাশোল মাছ।মহাশোল মাছ।আধমরা হয়ে ভেসে উঠেছে।দেখ,দেখ।পিঠের দিকটায় কতবড়ো ফিছা।জলে পিঠ দেখিয়ে অহঙ্কারী ভাবে ঘুরে বেড়ায় বলেই অসমিয়া ভাষায় একে পিঠিয়া মাছ বলে।’ অবশ্য অহঙ্কারী মাছটার তখন আর অহঙ্কার করে পিঠ দেখিয়ে ঘুরে বেড়ানোর মতো আর শক্তি ছিল না।মাছটা মৃত্যুর দরজায় কড়া নাড়ছিল।সুনদ শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে মহাশোল মাছটার পেটটা লক্ষ্য করে কোঁচটা বসিয়ে দিল।অন্য সময় হলে সর্বশক্তি দিয়ে জল থেকে লাফিয়ে উঠে এরকম একটি বিশাল মাছ ওদের নৌকাটাকে ডুবিয়ে দিত।তবে মরণমুখী মাছটা লাফিয়ে উঠার পরিবর্তে নিচে তলিয়ে গেল।কোঁচটা ধরে থাকায় হাঁতে চাপ পড়া থেকে সুনদ বুঝতে পারল মাছটা বিশাল ভারী।

কোঁচটার অন্য প্রান্ত হেমধরকে ধরতে বলে হয় শংকার সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া সুনদের হাতটি ধীরে ধীরে গিয়ে মাছটার গালের নিচ দিয়ে আঙ্গুল ভরিয়ে খামচে ধরল, তখনও মাছটা নড়াচড়া করল না। ক্রমান্বয়ে একপাশে হয়ে জ্বলজ্বল করে উঠা তার পেটটা দেখে সুনদ আভাস পেল–তার ভাবা থেকেও মাছটা অনেক বড়ো। এত বড়ো মাছ সে তার জীবনকালে ধরেনি।

কেউ পুকুরে বিষ দিলে, কখনও অত্যধিক কলা কেটে পুকুরে ফেললে বা অন্য কারণে ও জল বিষাক্ত হলে মাছকে ছটফট করে তারা মরতে দেখেছে। তবে এই মাছটার কেন এভাবে মৃত্যু হল? কেউ হয়তো কোঁচ দিয়ে খুঁচিয়ে মেরেছে। তার চোখে পড়া অংশগুলিতে অবশ্য সেই ধরনের কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। সুনদের কোঁচের একটা মাত্র আঘাত ছিল।

ঘাস বাঁধা একটা জরি খুলে মাছটার চোয়ালে ঢুকিয়ে একটা গিঁট দিয়ে নৌকার গলুইয়ে বেঁধে রাখতে রাখতে মাছটার প্রাণবায়ু বেরিয়ে গিয়েছিল। সক্ষম অবস্থায় অফুরন্ত শক্তি থাকা মাছটার শেষ দশা দেখে সুনদের দুঃখ হচ্ছিল। মাছ মারার বা মাছ ধরার অনেক আনন্দ লাভ করার অভিজ্ঞতায় পুষ্ট ওদের দুজনেরই মনে খুব একটা আনন্দ হচ্ছিল না। এত বড়ো মহাশোল মাছটা ধরেও বীরোচিত ভাব মনের মধ্যে জাগছিল না। মৎস্য শিকার করতে গিয়ে এরকম একটা বিশাল মাছ কৌশলে ধরতে পারলে যেরকম বীরত্বের উপলব্ধি হতে পারত আত্মসমর্পণকারী মাছটা ধরে সেই আনন্দ ওদের মনে জাগছিল না। তথাপি কিছু একটা গৌরবে দুজনেই গৌরবান্বিত হয়ে গ্রামে ফিরেছিল – কারণ ওদের আগে গ্রামের কোনো মানুষ এত বড়ো মাছ ধরার উদাহরণ ছিল না।

দুজনে মিলে কষ্ট করে বিশাল মাছটা নৌকায় হয়তো তুলতে পারত কিন্তু তা করার অবকাশ ছিল না। কারণ, নৌকায় বোঝা বইতে না পারার জন্য ওদের তিন মুঠো ঘাস ফেলে রেখে আসতে হয়েছে। স্রোতে উজানমুখী নৌকাটিতে বেঁধে আনা মাছটির জন্যই নৌকার গতি মন্থর হয়ে পড়েছিল। নৌকার বা দিকটাতে বেঁধে আনা মাছটার একটা আনুমানিক মাপ নিয়ে হেমধর উৎসাহে আনন্দে চিৎকার করে উঠে বলল –’ তিন হাত এক বিঘা।’

কিন্তু এটা করার সময় তার আনন্দের চিৎকারটা বিষাদে পরিণত হতে খুব বেশি সময় লাগল না। মাছটার লেজের দিকে ওটা কি? এক খাবলা মাংস বের করে নেওয়া একটা লাল গভীর গর্ত। সে লেজের দিকটা তুলে ধরে দেখার চেষ্টা করল। হ্যাঁ একখন্ড মাংস নেই। সে বৈঠা ধরে নৌকা বাইতে থাকা সুনদকেও এগিয়ে এসে মাছটা দেখতে বলল। কিছু একটা কামড়ে খেয়েছে বলে মনে হল। কোঁচের আঘাত নয়। আলো- আঁধারে সুনদ দেখতে পেল – হ্যাঁ মাছটার লেজের দিকের একটি অংশ নেই। কোনো কিছুতে কামড়ে খেয়েছে বলে মনে হচ্ছে। চট করে তার মনে পড়ে গেল – ঘা টা দেখছি সেই কবে বিল– পুকুরে মহামারী হয়ে মৃত মাছের গায়ে হওয়া ঘায়ের মতো। সে শৈশব থেকেই দেখে আসছে–ঘা হওয়া অসুখে মাংস খসে কখনও কখনও বিল পুকুরে মাছ মারা পড়ে। সেই সময় তীরের পরিবেশটাই দুর্গন্ধময় হয়ে পড়ে।

তাহলে এটা একটা অসুস্থ মাছ। এরকম একটি বৃহৎ আকারের মাছ ধরে নিয়ে জনগণের সামনে হাজির হওয়াই নয়, বন্যার বিপর্যয়ের মধ্যে কেটেকুটে বিলিয়ে খাওয়ার আনন্দময় একটা পরিস্থিতি কল্পনা করে তারা যে কিছু পরিমাণে উৎসাহিত হয়ে উঠেছিল সেটা মুহূর্তের মধ্যেই নাই হয়ে গেল।

তারা ফিরতে ফিরতে গ্রামে অন্ধকার নেমে এসেছিল। চালার নিচের প্রদীপ গুলি বাতাসের আঘাতে কাঁপছিল। নৌকাটা তীরে ঘেঁষার পরে জল থেকে মাছটাকে তোলার জন্য দুজন মানুষের প্রয়োজন হয়েছিল। খবর পেয়ে গোটা গ্রামের লোকজন মাছটিকে দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। প্রদীপের আলোতে মাছটার আঁশের উজ্জ্বলতা দেখে লোকগুলি অবাক হয়েছিল। কেউ কেউ বলছিল এক মণের মতো ওজন হবে। কেউ বলছিল তার চেয়েও বেশি হবে। আকার দেখে জিভে জল এসে যাওয়া লোকেরাও মাছটার শরীরে ঘা দেখে ইতস্তত করতে লাগল। তথাপি কেউ কেউ খেয়েছিল। কেটে কুটে নেওয়ার সময় পেটের কাঁটা কয়েকটা বের করে রাখতে সুনদ বলেছিল। তারই দুটো কাঁটা এবং কয়েক টুকরো আঁশ নিয়ে সে যত্ন করে রেখে দিয়েছিল। সে মাছ খায় নি। কিন্তু অনেকেই ঘ থাকা অংশটা কেটে ফেলে দিয়ে বাকি অংশটা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে খেয়ে ছিল। কেউ কেউ সেই মাছটা খেয়ে তৃপ্তি লাভ করার কথা অনেকদিন পর্যন্ত বলাবলি করছিল।ভাগ করে নেওয়া আঁশ এবং কাঁটাগুলি বেড়ায় গুঁজে রেখেছিল। কেবল বিশাল মাছের আখ্যানের নমুনা হিসেবে নয়, ভূতপ্রেত এবং যখিনী তাড়ানোর জন্যও আঁশ এবং কাঁটা কাজে লাগিয়েছিল।

Author

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

ভারতীয় ভাষায় অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ

অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও সংবেদনা তৃষ্ণা বসাক মনে আছে নরেন্দ্র হিরোয়ানিকে? টেস্ট অভিষেকে ১৬ টা উইকেট নিয়ে হইচই ফেলে দেওয়া সেই উজ্জ্বল যুবা (সালটা ১৯৮৮

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

ভারতীয় ভাষায় অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ

অনুবাদের বাদ, বিসংবাদ ও সংবেদনা তৃষ্ণা বসাক মনে আছে নরেন্দ্র হিরোয়ানিকে? টেস্ট অভিষেকে ১৬ টা উইকেট নিয়ে হইচই ফেলে দেওয়া সেই উজ্জ্বল যুবা (সালটা ১৯৮৮

Read More »

কালের প্রহরী

শুভাশিস ঘোষ ষষ্ঠ পর্ব দশ সেযাত্রায় কীভাবে যে কানাইকে ঘরে ফিরিয়ে এনেছিল শম্ভুচরণ, তা সেই সময় ঠিক জানতাম না। কেউ না বললে আর জানবই বা

Read More »