ভজ মন রাম চরণ

ভজ মন রাম চরণ

১

অযোধ্যার রাজসভায়

মূল লেখাটির বানান, ব্যাকরণ, বাক্যগঠন, যতিচিহ্ন ও সংলাপের বিন্যাস সংশোধন করে নিচে প্রকাশযোগ্য রূপে সাজিয়ে দিলাম। মূল কাহিনি, বর্ণনার ভঙ্গি, পৌরাণিক আবহ এবং সাধুভাষার স্বাদ যথাসম্ভব অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে। যেখানে একই বাক্য বা শব্দের অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্তি ছিল, সেখানে তা পরিমার্জন করা হয়েছে।

কালের প্রহরী

পঞ্চম পর্ব

আজ এক মধুর প্রভাত। অযোধ্যার আকাশে উদিত অরুণের রক্তরাগে রঞ্জিত কিরণের দিকে তাকিয়ে রাজা দশরথ প্রভাতের প্রথম সূর্যকে পরম ভক্তিভরে প্রণাম করে জোড়হস্তে স্তব করলেন।

ওঁ জবাকুসুমসঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম্।

ধ্বান্তারিং সর্বপাপঘ্নং প্রণতোহস্মি দিবাকরম্।।

এ তাঁর নিত্যদিনের কর্ম। সকালে মহারাণী কৌশল্যার সঙ্গে চলতে চলতে প্রাসাদকাননের কুসুমসজ্জিত বৃক্ষ থেকে পূজার ফুল সংগ্রহ করেন। প্রধানা মহিষীর সঙ্গে রাজ্যপাটের কথাও আলোচনা করেন। ভবিষ্যতের এক মধুর ছবি মনে মনে আঁকেন। মহারাণী কৌশল্যা এবার তাঁর শিবমন্দিরে পূজা দিতে এগিয়ে যান।

পাখিদের মধুর কাকলি আর ভৈরব রাগিণীর গভীর আলাপে মহারাজ দশরথের মন এক স্বর্গীয় আবেশে মগ্ন হয়ে থাকে। কিন্তু মানুষ সংসারী। সংসারের নানা কথাই অহরহ মনে আলোড়ন তোলে।

মহারাজ দশরথ মনে মনে ভাবলেন, তিনি বৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন। চার পুত্রের বিবাহ দিয়ে তাঁদের সংসারী করেছেন। কিন্তু এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য সম্পন্ন করা বাকি রয়ে গেছে। এই কর্ম সমাধা না হলে মৃত্যুর পরেও তাঁর মুক্তি নেই। এই কর্ম সুসম্পন্ন হলেই যেন তিনি মুক্তির পথ খুঁজে পাবেন। কিন্তু কী সেই কর্ম?

সে হল অযোধ্যার সিংহাসনে একজন যোগ্য উত্তরাধিকারীকে প্রতিষ্ঠা করে যাওয়া। কিন্তু এই বিশাল সাম্রাজ্যের যোগ্য উত্তরাধিকারী কে হতে পারেন? নিশ্চিতভাবেই তিনি রাম—দশরথের প্রিয়পুত্র রাম। রামকে রাজা করে তাঁর হাতে রাজ্যভার অর্পণ করাই এখন প্রধান কর্তব্য।

ভরত বর্তমানে অযোধ্যায় উপস্থিত নেই। কিন্তু সিংহাসনের উত্তরাধিকার স্থির করা এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি। আকাশে, বাতাসে, অন্তরীক্ষে ও ভূতলে ঘোর উৎপাতের অশুভ লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। নিজের শরীরও জরাগ্রস্ত হয়েছে। কেশে পাক ধরেছে। এ তো ঘোর সংসারী মানুষের বানপ্রস্থে যাওয়ার উত্তম সময়! জ্যেষ্ঠপুত্র রামচন্দ্রের হাতে এখন রাজ্যভার অর্পণ করা উচিত।

ভরত তার মাতুলালয়ে রয়েছে, সঙ্গে শত্রুঘ্নও। কিন্তু শুধু ভরতের অনুপস্থিতির কারণে অপেক্ষা করা যুক্তিযুক্ত বলে মনে হল না দশরথের। রামকে রাজা করলে সকলেই নিশ্চয়ই আনন্দিত হবেন। অতএব, জ্যেষ্ঠপুত্র রামকে সিংহাসনে অভিষিক্ত করে সংসার ত্যাগ করে তীর্থভ্রমণে বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছা করলেন রাজা দশরথ। মনে মনে ভাবলেন, এবার তিনি যাবেন সুমেরু পর্বতে।

দীর্ঘ বারো বছর পর আবার আমরা অযোধ্যার রাজপ্রাসাদের সভাগৃহে এসে দাঁড়ালাম।

রাজা দশরথ সিংহাসনে আসীন। মন্ত্রী, অমাত্য, সভাসদ ও পুরোহিতদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে তিনি বসে আছেন মণিমাণিক্যখচিত অযোধ্যার রাজসিংহাসনে। মাথার উপরে বিরাজ করছে শ্বেতছত্র। কিংকরগণ তাঁর উপরে শুভ্র চামর ব্যজন করে চলেছেন।

রাজা দশরথ এখন বৃদ্ধ হয়েছেন। রাজমুকুটের প্রান্তভাগে পলিত কেশ তাঁর বয়সের ভার ব্যক্ত করছে। শীর্ণ মুখে বার্ধক্যের বলিরেখা যেন চিন্তার গুরুভার প্রকাশ করছে। তাঁর ইতস্তত সঞ্চরণশীল দৃষ্টিবিক্ষেপে অসহায়তার আভাস। সসাগরা ধরিত্রীর অধিপতি কি কোনও দুশ্চিন্তায় আক্রান্ত? রাজার ক্লান্ত দৃষ্টিতে কি কোনও দুঃস্বপ্নের ছায়া? যদিও রাজা দশরথ চোখেমুখে প্রসন্নতার ভাব ধরে রেখেছেন, তবু সেই প্রসন্নতার মধ্যে যেন কোনও ঔজ্জ্বল্য নেই। তাঁর মুখমণ্ডলে এক ধরনের নিষ্প্রভতা পরিস্ফুট হয়ে রয়েছে।

রাজা দশরথ আজ এক জরুরি সভা ডেকেছেন। নানা দেশ থেকে দিকপাল রাজারা এসেছেন। সেখানে উপস্থিত হয়েছেন রাজ্যের ব্রাহ্মণ ও পুরজনেরা। রাজসভা আজ গমগম করছে।

মন্ত্রীবর সুমন্ত্র বলে উঠলেন, “মহামান্য সভাসদগণ, মহারাজ দশরথ ষাট হাজার বছর বয়সেও এই মহীতলে তাঁর শাসনের সুনাম অক্ষুণ্ণ রেখে প্রজাবর্গের প্রতি পরম কর্তব্য পালন করে চলেছেন। তাঁর চার পুত্র—রাম, লক্ষ্মণ, ভরত ও শত্রুঘ্ন—সকলকেই তিনি মিথিলার রাজকন্যাদের সঙ্গে বিবাহ দিয়ে এক গৌরবজনক সম্বন্ধ স্থাপন করেছেন এবং তাঁদের সংসারধর্মে দীক্ষিত করেছেন। এমন এক সুখময় সময়ে মহারাজ দশরথ তাঁর মন্ত্রীবর্গ এবং কুলগুরু বশিষ্ঠ প্রমুখ যজ্ঞকারী ঋষিদের আহ্বান করেছেন, হয়তো কোনও সুসংবাদ প্রদান করবেন বলে। আমরা মহারাজকে অনুরোধ করব, তিনি যেন তাঁর বক্তব্য এখন আমাদের সকলের সামনে উপস্থাপিত করেন। আপনারা শুনুন!”

রুদ্ধ উৎকণ্ঠায় নীরব হয়ে রইল সভাগৃহ।

তখন সিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে জলদগম্ভীর কণ্ঠে রাজা দশরথ সকলকে সম্বোধন করলেন। তাঁর মধুর, স্নিগ্ধ ও কমনীয় স্বরে ধ্বনিত হল—

“সমবেত রাজসভাসদগণ ও আমার রাজ্যবাসী প্রজাবৃন্দ, আজ আমি আপনাদের সকলের অনুমতিক্রমে কয়েকটি কথা বলতে ইচ্ছা করি। আমার পূর্বপুরুষ ইক্ষাকুবংশের শ্রেষ্ঠ নৃপতিরা পুত্রতুল্য স্নেহে এই রাজ্য প্রতিপালন করে এসেছেন। আমিও তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে এত দিন যথাসাধ্য প্রজাপালন করেছি। কিন্তু এখন আমি বৃদ্ধ ও ক্লান্ত। তাই আমার ইচ্ছা, আপনাদের সকলের অনুমতিক্রমে আমার এই রাজ্যভার উপযুক্ত কারও হাতে সমর্পণ করে রাজপদ থেকে অবসর গ্রহণ করি। আমি আমার দায়িত্বভার উপযুক্ত হস্তে ন্যস্ত করে বিশ্রাম নিতে চাই এবং ঈশ্বরভজনে দিনাতিপাত করতে চাই।”

রাজসভায় যেন হঠাৎ শৈত্যপ্রবাহের মতো এক প্রকট বিষণ্ণতা সঞ্চারিত হল। পরক্ষণেই সভার মধ্যে গুঞ্জন উঠল—তাহলে এখন রাজা কে হবেন?

সকলেই বুঝতে পারলেন, মহারাজ বৃদ্ধ হয়েছেন। তাই তিনি রাজপদ থেকে অবসর গ্রহণ করে বিশ্রাম নিতে চাইছেন। সমবেত প্রজামণ্ডলীর মধ্যে প্রশ্ন উঠল, “তাহলে এখন কে রাজা হবেন?” সকলের মনে কৌতূহল জাগল।

রাজা দশরথ এবার উৎকণ্ঠিত সকলের দিকে তাকিয়ে বলতে থাকলেন, “আমার জ্যেষ্ঠপুত্র রাম সর্বগুণের অধিকারী। সে কর্মদক্ষ, ধার্মিক। আমার ইচ্ছা, আমি আমার জ্যেষ্ঠপুত্র রামকে অযোধ্যার সিংহাসনে অভিষিক্ত করি। অবশ্যই তা আপনাদের অনুমতিক্রমেই সম্ভব। আমার এই সংকল্প যদি আপনারা সাধু বিবেচনা করেন, তবে সকলে আমাকে অনুমতি দিন।”

সকলে সমস্বরে আনন্দিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, “সাধু! সাধু! সাধু! রাম রাজা হবেন—সে তো অত্যন্ত আনন্দের কথা!”

সভাস্থ সকলেই হর্ষধ্বনি করে উঠলেন। একবাক্যে সকলে জানালেন, “আমরা রঘুবীর রামচন্দ্রকে রাজপদে অভিষিক্ত দেখতে চাই। অযোধ্যার মহীপতির জয় হোক!”

বশিষ্ঠদেব বললেন, “মহারাজ, আপনি যথাসময়ে যথোপযুক্ত প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন। রাম সনাতন বিষ্ণু। বলদৃপ্ত রাবণের বধের জন্য দেবগণের প্রার্থনায় তিনি নরলোকে জন্মগ্রহণ করেছেন। তিনি রূপবান, বীর্যবান, অসূয়াশূন্য; ভূতলে তাঁর তুলনা নেই। গুণে তিনি আপনারই সমতুল্য। তিনি সর্বদা প্রশান্তচিত্ত, মৃদুভাষী। কখনও কারও প্রতি কর্কশ উত্তর দেন না। কেউ সামান্য উপকার করলেও তিনি তুষ্ট হন। উদার স্বভাববশত শত অপকারও মনে রাখেন না। তাঁর মতি কুলোচিত। ক্ষাত্রধর্মকে তিনি শ্রদ্ধা করেন। স্বধর্ম পালনে স্বর্গলাভের আদর্শ তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে মানেন। বিচারে তিনি বৃহস্পতিতুল্য। তিনি নিরোগ, তরুণ, বাগ্মী, বিশালবপু, দেশকালজ্ঞ এবং লোকচরিত্রে অভিজ্ঞ। তিনি সাধুমতি ও সর্বগুণান্বিত। তিনি প্রজাগণের প্রাণের তুল্য। আজ আকাশে, অন্তরীক্ষে ও ভূতলে ঘোর দুর্লক্ষণ লক্ষিত হচ্ছে। আপনার শরীরও জরাগ্রস্ত হয়েছে। এখন শ্রীমান রামচন্দ্রকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করলে সকলেই প্রীত হবেন।”

এবার রাজসভায় উপস্থিত সকল নৃপতিকে উদ্দেশ করে রাজা দশরথ বললেন, “আমার পুত্র রাম আমার সমস্ত গুণ নিয়ে জন্মেছে। বীর্যে সে পুরন্দরের সমান। সেই পুরুষশ্রেষ্ঠকে আমি অযোধ্যার সিংহাসনে রাজপদে অভিষিক্ত করতে ইচ্ছা করি। আমার এই সংকল্প যদি আপনারা সাধু বিবেচনা করেন, তবে সকলে আমাকে অনুমতি দিন!”

সকলে পরম উল্লাসে বলে উঠলেন, “সাধু! সাধু! সাধু!”

রাজা দশরথ আবার বললেন, “যদিও এই প্রস্তাব আমার প্রিয়, তথাপি আপনারা মাননীয় ব্যক্তিগণ এর চেয়ে হিতকর অন্য কোনও প্রস্তাব বিবেচনা করে থাকলে তা অবশ্যই বলুন। কারণ, পক্ষপাতিত্বহীন মধ্যস্থ ব্যক্তিদের বিচারই শ্রেষ্ঠ বিচার, এবং তা শিরোধার্যও বটে।”

আসলে মহারাজ দশরথ সর্বার্থে নিঃসংশয় হতে চান। রামের প্রতি প্রজাদের সমর্থন যেন হয় স্বতঃস্ফূর্ত। রাজশক্তির ভয়ে, সংশয়ে বা দ্বিধায় যেন প্রজাদের মন আচ্ছন্ন না থাকে। তিনি চান, কেবল রাজ-আজ্ঞায় নয়, প্রজাদের অকুণ্ঠ সমর্থন ও সম্মতিতেই রাম রাজা হোক।

এবার সভাস্থ সকলেই একবাক্যে বলে উঠলেন, “মহারাজ, আমরা আপনার পুত্র রামচন্দ্রকে অযোধ্যার সিংহাসনে রাজপদে অভিষিক্ত দেখতে চাই!”

উৎফুল্ল জনতার উচ্চনিনাদে সভাগৃহ অনুরণিত হয়ে উঠল।

রাজসভায় উপস্থিত সকলের স্বতঃস্ফূর্ত হর্ষধ্বনিতে রাজা দশরথ নিঃসংশয় হলেন। প্রজারা সকলেই রামকে রাজা দেখতে চান।

রাজা দশরথ আনন্দিত হলেন। এমনটাই তো তিনি চেয়েছিলেন।

মহামন্ত্রী সুমন্ত্র এবার বলে উঠলেন, “মহারাজ, আমরা ইন্দীবরশ্যাম, সর্বশত্রুনাশন আপনার জ্যেষ্ঠপুত্র রামকে দৃঢ়নিশ্চয়ে যুবরাজ্যে অভিষিক্ত দেখতে চাই।”

রাজা দশরথ বলে উঠলেন, “উত্তম, মন্ত্রীবর! তাহলে আপনি, মহর্ষি বশিষ্ঠদেব, মহর্ষি বামদেব—আপনারা সকলে রামের অভিষেকের সেইমতো আয়োজন করে ফেলুন।”

সভায় এক বিরাট হর্ষধ্বনি উত্থিত হল।

ভূপতি বলেন, শুন পাত্র-মিত্রগণ,

রামে রাজা করিব, করহ আয়োজন।

নানা পুষ্প বিকাশ, বসন্ত চৈত্রমাস,

রাম কালই রাজা হবে, আজি অধিবাস।।

— কৃত্তিবাস

রাজা দশরথ এবার মহামন্ত্রী সুমন্ত্রকে বললেন, “সুমন্ত্র, তুমি যাও। রামকে এই সভায় নিয়ে এসো। রামকে আমি অভিষেকের প্রস্তাব দিতে চাই।”

“যথা আজ্ঞা, মহারাজ।”

সুমন্ত্র তখন রথ নিয়ে রওনা হলেন রাজপুত্র রামকে তাঁর মহল থেকে সভায় নিয়ে আসতে।

এ যে এক ভীষণ আনন্দের সংবাদ! রাম রাজা হবেন। রাম সকলের চোখের মণি, সকলের নয়নরঞ্জন।

মহারাজ দশরথ তখন বশিষ্ঠদেবকে বললেন, “গুরুদেব, আমার ইচ্ছা, এই চৈত্রমাসেই আমি রামকে যুবরাজপদে অভিষিক্ত করার আয়োজন করি। ভগবন, অভিষেকের সমস্ত উপকরণ সংগ্রহের জন্য আপনি আজই আজ্ঞা দিন।”

বশিষ্ঠদেব এবার মন্ত্রীগণকে সেইমতো আদেশ দিলেন, “রাজমন্ত্রীগণ, রামের অভিষেকের জন্য সুবর্ণাদি রত্ন, পূজার দ্রব্য, সর্বৌষধি, শুক্লমাল্য, লাজ, মধু, ঘৃত, অচ্ছিন্ন বস্ত্র, রথ, সর্বপ্রকার আয়ুধ, চতুরঙ্গ বল, সুলক্ষণযুক্ত গজ, দুই চামর, ধ্বজা, শ্বেতছত্র, শত স্বর্ণকুম্ভ, স্বর্ণমণ্ডিত শৃঙ্গবিশিষ্ট ঋষভ, অখণ্ড ব্যাঘ্রচর্ম এবং আরও যা যা আবশ্যক, সমস্ত সংগ্রহ করে আনুন।”

বশিষ্ঠদেব আবার বললেন, “মহারাজ, প্রভাতকালে শতসহস্র দ্বিজকে উত্তম অন্ন প্রদান করা বিধেয়। সেই সঙ্গে দধি, ক্ষীর, ঘৃত, লাজ—অর্থাৎ চিড়া ও খই—এবং প্রত্যেক ব্রাহ্মণকে প্রচুর দক্ষিণা দেওয়াও কর্তব্য।”

দশরথ বললেন, “যথার্থ, গুরুদেব। আপনার আদেশ অবশ্যই শিরোধার্য।”

বশিষ্ঠদেব আবার বললেন, “মহারাজ, আগামীকাল সূর্যোদয়ের মুহূর্তে স্বস্তিবাচন শুরু হওয়ার সময় সকল ব্রাহ্মণকে নিমন্ত্রণ করা এবং তাঁদের আসনের ব্যবস্থা করাও বাঞ্ছনীয়।”

দশরথ বলে উঠলেন, “যথার্থ, গুরুদেব। আমি এখনই প্রধান অমাত্য সুমন্ত্রকে সমস্ত ব্যবস্থার নির্দেশ দিচ্ছি, ঋষিবর।”

এবার মহারাজ দশরথ তাঁর মন্ত্রীমণ্ডলীর অন্যান্য সদস্যদের উদ্দেশে বলে উঠলেন, “মন্ত্রীগণ, আপনারা আগামীকাল অযোধ্যার রাজপথে রাজপতাকা উত্তোলনের ব্যবস্থা করুন এবং সমগ্র রাজমার্গ জলসিক্ত করা হোক।”

তিনি আবার নির্দেশ দিলেন, “গায়ক-গায়িকা, নর্তক-নর্তকী এবং গণিকারা অলংকৃত হয়ে রাজপ্রাসাদের নাট্যমঞ্চে নৃত্য-গীতাদি পরিবেশন করুন।”

“দেবমন্দিরাদিতে পূজাপাঠ, দান ও ধ্যানের আয়োজন শুরু করুন।”

“সুবেশধারী বীরগণ দীর্ঘ অসিচর্ম ধারণ করে রাজপথে, রাজভবনে, সভাস্থলে ও মন্দিরপ্রাঙ্গণে প্রহরার ব্যবস্থা করুন।”

মন্ত্রীরা সমস্বরে বললেন, “আপনার আজ্ঞা শিরোধার্য, মহারাজ।”

মহামন্ত্রী সুমন্ত্র এবার রামকে রাজসভায় এনে উপস্থিত করলেন।

চৈত্রদিনের বসন্তপ্রভাত। মৃদু সমীরণ বইছে। অনিন্দ্যকান্তি রামের আগমনে রাজসভায় অভিনন্দন, হর্ষ ও উল্লাসের ধ্বনি উঠল।

রাজসিংহাসন থেকে আকাশের মতো গভীর পিতৃস্নেহ নিয়ে রাজা দশরথ পুত্রের দিকে তাকিয়ে আছেন।

সুমন্ত্রের সঙ্গে রাজসভায় প্রবেশ করছেন রাম। তাঁর গতি ধীর, গজেন্দ্রের মতো। দীর্ঘবাহু, মহাসত্ত্ব, চন্দ্রকান্তি রামচন্দ্রের চোখে কৌতূহলী জিজ্ঞাসা। দশরথ যেন নিজের যৌবনের প্রতিমূর্তিকেই প্রত্যক্ষ করছেন।

রাম পিতাকে দেখে অভিবাদন জানালেন। তারপর কৃতাঞ্জলিপুটে পিতার সম্মুখে উপস্থিত হয়ে তাঁকে প্রণাম করলেন।

রাজা দশরথ প্রণত পুত্রকে আলিঙ্গন করে রত্নাসনে বসালেন।

“রাম, আসন গ্রহণ করো।”

                ।২।

রামকে অভিষেকের প্রস্তাব

রাম আসন গ্রহণ করলেন। সমবেত রাজন্যবর্গের উপস্থিতিতে সভাগৃহ মৃদু অনুনাদে পূর্ণ হয়ে উঠল।

উদিত সূর্যের প্রভায় উজ্জ্বল মেরুপর্বতের মতো দশরথকে অত্যন্ত মহিমান্বিত দেখাচ্ছিল।

পিতা পুত্রে বসিলেন সিংহাসনোপরে,

পাত্র-মিত্র সকলে বেষ্টিত নৃপবরে।।

নক্ষত্রে বেষ্টিত যেন পূর্ণ শশধর,

সেইমতো শোভিত হইলেন রঘুবর।।

— কৃত্তিবাস

রাজা দশরথ বললেন, “বৎস রাম, তুমি আমার জ্যেষ্ঠপুত্র, আমার একান্ত প্রিয়। তুমি নিজের গুণ ও চরিত্রবলে প্রজাদের মন জয় করেছ। আগামীকাল শুভ পুষ্যা নক্ষত্রে তোমার রাজ্যাভিষেক হবে। আশীর্বাদ করি, তুমি বিনয়ী ও জিতেন্দ্রিয় হয়ে, কাম-ক্রোধজনিত ব্যসন পরিহার করে, অমাত্য ও প্রজাদের প্রতি অনুরাগী থেকে রাজ্য শাসন করো।”

দশরথের কথা শেষ না-হতেই সভাকক্ষ অভিনন্দনের ধ্বনিতে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।

রাম সভার দিকে তাকিয়ে সভাস্থ সকলের আনন্দ ও উচ্ছ্বাস প্রত্যক্ষ করলেন।

বশিষ্ঠদেব এবার রামকে উদ্দেশ করে বললেন, “রাম, মহারাজের ইচ্ছা অনুসারে আগামীকাল পুষ্যা নক্ষত্রের যোগে তুমি অযোধ্যার সিংহাসনে অভিষিক্ত হবে।”

রাম বিনয়সহকারে মস্তক নত করে গুরুজনদের বক্তব্যে সম্মতি জানালেন।

রাম বললেন, “আপনার আদেশ শিরোধার্য, গুরুদেব।”

রাজা দশরথ এবার তাঁর প্রিয় পুত্রকে উপদেশ দিলেন, “রাম, রাজতন্ত্র হল রাজধর্মের কর্মময় ক্ষেত্র। রাজা শাসক হলেও তিনি ধর্মের প্রতিনিধি, ধর্মের রক্ষক ও সেবক। রাজা যেমন প্রভু, তেমনই তিনি জনগণের সেবক ও শিষ্য। রাজা যেমন একমাত্র প্রধান নন, তেমনই প্রজারাও এককভাবে মুখ্য নন। রাজত্ব যেমন কেবল রাজার নয়, তেমনই প্রজারও নয়। রাজত্ব হল ধর্মের। ধর্মই প্রধান, ধর্মই মুখ্য। রাজা কেবল ধর্মের সেবক ও প্রতিনিধি, আর প্রজা সেই ধর্মের ব্যবহারিক ক্ষেত্র।”

পুত্রেরে শিখান বিদ্যা সভা বিদ্যমান,

রাজনীতি, ধর্ম আর বিবিধ বিধান।।

প্রজার অনুনয় তুমি শুনিবা যতনে,

তোমার মহিমা যেন সর্বত্র বাখানে।।

— কৃত্তিবাস

বামদেব বললেন, “রাম, তুমি বিনয়ী ও জিতেন্দ্রিয় হয়ে কাম-ক্রোধজাত ব্যসন পরিহার করবে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে অমাত্য ও প্রজাবর্গকে সন্তুষ্ট রাখবে এবং প্রজাদের তুষ্টিসাধন করবে।”

রাম বললেন, “আমি অমাত্য ও প্রজাবর্গকে সন্তুষ্ট রাখব। তাঁদের তুষ্টিসাধনে সর্বদা সচেষ্ট থাকব।”

সভায় উপস্থিত সকলে সানন্দে রামকে সর্বান্তঃকরণে সমর্থন করলেন।

রাম এবার সভাস্থ ব্রাহ্মণ, পুরজন ও অযোধ্যাবাসী প্রজাগণকে করজোড়ে অভিবাদন জানিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।

রামের অনেক হিতৈষী বন্ধু তখন অন্তঃপুরে ছুটে গেলেন মহারাণী কৌশল্যাকে এই আনন্দসংবাদ দিতে।

দশরথকে প্রণাম করে এবং সভার সকলের প্রতি সম্ভ্রমে মস্তক অবনত করে হর্ষধ্বনির মধ্যে রাম ধীরে ধীরে নিজের মহলের দিকে প্রস্থান করলেন।

সভা ভঙ্গ হল। একে একে অমাত্য ও রাজন্যবর্গ বিদায় নিলেন।

এদিকে রামের সুহৃদগণ এবং অনুজ লক্ষ্মণ দ্রুতপদে কৌশল্যার কাছে গিয়ে রামের যৌবরাজ্যে অভিষেকের শুভসংবাদ জানালেন।

তাঁরা বললেন, “রামজননী, মাতা কৌশল্যা, আপনার রাম রাজা হবেন! আমরা রাজসভা থেকে এই সংবাদ শুনে এলাম। মহারাজ স্বয়ং সেই কথা ঘোষণা করেছেন।”

মহারাণী কৌশল্যা সংবাদটি শুনে বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে সকলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এ কী শুনছেন তিনি আজ বাতাসের মুখে! এ যে অচিন্তনীয়, অবর্ণনীয়—রাম রাজা হবেন!

“তাই! এ তো আনন্দের সংবাদ! কিন্তু মহারাজ তো আমায় কিছু জানালেন না! আহা, রাম কোথায়? আমার রাম কোথায়?”

মনে মনে ভাবলেন, এই সংবাদ তো মহারাজ তাঁকে জানাননি। কে জানে, হয়তো মেজরানি কৈকেয়ী জানেন। রাজা তো কেকয়রাজের প্রাসাদে কৈকেয়ীর কাছেই সব সময় পড়ে থাকেন। বড়রানিকে তিনি আর কতটুকুই বা ভালোবাসেন! তবে এখন এসব ভেবে কী হবে? রাম যদি রাজা হন, তবে সেটাই তো এক বিরাট সংবাদ। এমন সংবাদ শুনে কোনও মা কি স্থির থাকতে পারেন? কৌশল্যা তাঁর কোলের পুত্র, সকলের প্রিয় রামকে অযোধ্যার পরবর্তী রাজা হতে দেখবেন!

কৌশল্যা অত্যন্ত খুশি হয়ে বলে উঠলেন, “অহো! এ যে ভীষণ আনন্দের সংবাদ! আমার রাম রাজা হবে!”

অন্তঃপুরে তখন কৌশল্যা আনন্দে সকলকে দুহাত ভরে উপহার দিচ্ছেন। সামনে যাকেই পাচ্ছেন, তাকেই দান করছেন অজস্র সুবর্ণ, রত্ন ও ধেনু।

রাম ও সীতা এবার মাতা কৌশল্যার সঙ্গে দেখা করতে অন্তঃপুরে গেলেন। কৌশল্যা তখন পুত্রের মঙ্গলকামনায় দেবমন্দিরে ধূপ-দীপ-ঘণ্টার আয়োজনে হর-পার্বতীর আরাধনায় রত। মাতা সুমিত্রা ও অনুজ লক্ষ্মণও সেখানে বসে কৌশল্যার সঙ্গে হর-পার্বতীর ভজনা করে চলেছেন।

রাম সীতাকে সঙ্গে নিয়ে মাতা কৌশল্যার কাছে গিয়ে ‘মা’ বলে দাঁড়ালেন।

পুত্র রামকে দেখে কৌশল্যা আনন্দিত হয়ে উঠলেন।

“রামা! আমার রামভদ্র! আমি যে কতক্ষণ ধরে আমার রাম আর সীতাকে খুঁজছি! রামা, আমার যে কী আনন্দ হচ্ছে! পিতার সিংহাসনে আমার রামভদ্র এবার রাজা হয়ে বসবে!”

রাজা দশরথ ডাকেন ‘রাম’। কৌশল্যা ডাকেন ‘রামা’ কিংবা ‘রামভদ্র’। কৈকেয়ী ডাকেন ‘রামচন্দ্র’। ছোট মা সুমিত্রা ডাকেন ‘রামানন্দ’। লক্ষ্মণ ডাকেন ‘রাঘব’। অন্যান্য মুনিগণ ডাকেন ‘রঘুনাথ’।

গুরু বশিষ্ঠ ডাকেন ‘বেদস’—অর্থাৎ যিনি স্বয়ং বেদ! আর অযোধ্যাবাসীর কাছে রাম শুধুই ‘সীতাপতি’।

তবে সীতা কী বলে ডাকেন? তাঁর কাছে রাম যে কেবল ‘নাথ’। তাই সীতা রামকে সম্বোধন করেন, ‘হে নাথ’।

রাম বললেন, “মা, আমি তোমার আশীর্বাদ নিতে এসেছি। পিতা আমাকে যুবরাজ্যে অভিষিক্ত করবেন বলে জানিয়েছেন।”

আমারে দিবেন পিতা সর্ব রাজ্যখণ্ড,

আজি অধিবাস, কালি পাব ছত্রদণ্ড।।

আমারে রাজা করিতে পিতার অভিলাষ,

শুভবার্তা কহিতে আইনু তব পাশ।।

— কৃত্তিবাস

কৌশল্যা এবার আনন্দে আবেগাকুল হয়ে স্নেহবৎসল হাসিতে রামকে আশীর্বাদ করে বলে উঠলেন, “বৎস রামভদ্র, তুমি চিরজীবী হও। আমিও তোমার অভিষেকের সংবাদ শুনেছি। তুমি রাজা হও, তোমার শত্রুরা দূর হোক, তুমি রাজ্যশ্রী লাভ করো। আমার ও সুমিত্রার আত্মীয়-পরিজনদের আনন্দিত করো।”

কৌশল্যা বলেন, রাম, হও চিরঞ্জীব,

তোমার সহায় হউন শ্রী পার্বতী-শিব।।

— কৃত্তিবাস

এরপর কৌশল্যা সীতার হাত ধরে তাঁকে নিজের পাশে বসিয়ে নিলেন।

“এসো মা সীতা, তুমি আমার পাশে বসো।”

রাম এবার মাতা সুমিত্রার চরণ স্পর্শ করে প্রণাম জানিয়ে বললেন, “মাতা সুমিত্রা, আমাকে আশীর্বাদ করুন, যেন আমি প্রজাদের সন্তুষ্ট রাখতে পারি এবং ন্যায়ের পথে রাজ্য শাসন করতে পারি।”

মাতা সুমিত্রা বলে উঠলেন, “রামানন্দ, জয়স্তু! লক্ষ্মণ সর্বদা তোমার সঙ্গে থাকবে। তুমি সর্বদা জয়ী হও। ধর্ম তোমাকে রক্ষা করুক।”

লক্ষ্মণকে কৃতাঞ্জলিপুটে বিনীতভাবে বসে থাকতে দেখে রাম এবার তাঁকে বললেন, “ভাই লক্ষ্মণ, আমার সঙ্গে তুমিও এই রাজ্যভার বহন করবে। তুমি আমার দ্বিতীয় অন্তরাত্মা। রাজশ্রী তোমাকেও শোভা প্রদান করেছেন।”

লক্ষ্মণ বললেন, “রাঘব, এ আমার পরম সৌভাগ্য। আপনি আমার অগ্রজ। আমি আপনার ছায়াসঙ্গী ও অনুচর। সর্বদা আপনার আদেশের অপেক্ষায় থাকব।”

রাম বললেন, “সৌমিত্র, তুমি তোমার অভীষ্ট অনুযায়ী রাজ্যের সুখ-সম্পদ ভোগ করো। তোমার জন্য আমার জীবন ও রাজ্য—উভয়ই কাম্য।”

লক্ষ্মণ বললেন, “আমি জানি, আমি আপনার সেবক।”

রাম এবার মাতা কৌশল্যা ও মাতা সুমিত্রাকে অভিবাদন জানিয়ে সীতাকে সঙ্গে নিয়ে নিজের ভবনে ফিরে গেলেন।

পরদিন অভিষেকের আয়োজন। তাই মন্দিরে নানা কাজে পুরোহিতদের সঙ্গে কৌশল্যা ও সুমিত্রাও ব্যস্ত রয়েছেন। লক্ষ্মণ মন্দিরসজ্জার ব্যবস্থা তদারক করতে ব্যস্ত।

এই সময় রাজা দশরথ কিছুটা ভাবুক মনে মহারাণী কৌশল্যার কাছে এসে দাঁড়ালেন।

রানি কৌশল্যা বুঝতে পারলেন, মহারাজ কিছুটা চিন্তিত। বিষয়টি নিয়ে মনে প্রশ্ন জাগলেও মুখে কিছু বললেন না। শুধু মধুর অনুযোগের সুরে বললেন, “মহারাজ, এমন সুসংবাদ আমাকে আগে তো জানাননি!”

মহারাজ দশরথ এবার কৌশল্যাকে আশ্বস্ত করে বললেন, “মহারাণী কৌশল্যা, আমি তোমাকে আগে এই সংবাদ জানিয়ে উঠতে পারিনি। তুমি জানো, এ হল রাজধর্ম। অনেক বিষয় পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। সেই সব বিষয় নিয়ে আমি মহামন্ত্রী সুমন্ত্র ও আমাদের কুলগুরু বশিষ্ঠদেবের সঙ্গে আলোচনা করতে ব্যস্ত ছিলাম। তুমি সংবাদটি আগেই জেনে গিয়েছ বটে, তবু এবার আমি নিজ মুখে তোমাকে জানাচ্ছি—আমি রামকে যুবরাজপদে অভিষিক্ত করার সংকল্প করেছি। আগামীকাল পুষ্যা নক্ষত্রে তোমার রামভদ্র অযোধ্যার সিংহাসনে বসবে। অন্য অনেক জটিল বিষয় নিয়ে চিন্তিত ছিলাম বলেই তোমাকে আগে জানিয়ে উঠতে পারিনি। তোমার রামা নিশ্চয়ই নিজ মুখে তোমাকে সেই সংবাদ দিয়েছে?”

কৌশল্যা বললেন, “সেই সংবাদ আমার কাছেও পৌঁছেছে, মহারাজ। আমার খুব আনন্দ হচ্ছে—আমার রামভদ্র অযোধ্যার রাজা হবেন! এর চেয়ে সুখের কথা আর কী হতে পারে?”

দশরথ বললেন, “কুলগুরু বশিষ্ঠদেব বলেছেন, আজ রাত্রে রাম ও সীতা একসঙ্গে উপবাস করবে। রামের অভিষেকের জন্য যে মঙ্গলাচার আবশ্যক, তুমি তার আয়োজন করো।”

বশিষ্ঠদেব বললেন, “মহারাণী, রামজননী, আগামীকালের অধিবাসের জন্য চাই পট্টবস্ত্র, সুবর্ণাদি রত্ন, পূজার দ্রব্য, সর্বৌষধি, শুক্লমাল্য, লাজ, মধু, ঘৃত এবং নতুন বস্ত্র। আজ রাম ও সীতা উভয়েই উপবাস করবে।”

দশরথ বললেন, “কৌশল্যা, আমি এখন বশিষ্ঠদেবকে নিয়ে রামের ভবনে গিয়ে এই সংবাদ জানিয়ে আসি।”

কৌশল্যা বললেন, “মহারাজ, আমি রামের অধিবাসের সমস্ত আয়োজন প্রস্তুত করে রাখছি। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। নতুন পট্টবস্ত্র ইত্যাদি সব সাজিয়ে রাখব।”

এরপর দশরথের ইচ্ছাক্রমে কুলপুরোহিত মহর্ষি বশিষ্ঠদেবকে সঙ্গে নিয়ে রাজা দশরথ রথে আরোহণ করে রামের ভবনের দিকে রওনা হলেন। উদ্দেশ্য, রাম ও সীতাকে উপবাসের সংকল্পের কথা জানানো।

রামের ভবন ইন্দ্রালয়ের তুল্য। সর্বত্র আলোর বিচ্ছুরণ। রাম তখন তাঁর অস্ত্রশালায় প্রিয় অস্ত্রগুলি নিরীক্ষণ করছিলেন।

রাম মনে মনে ভাবতে লাগলেন, পিতা মহারাজ তাঁকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করতে ইচ্ছা করেছেন। এক বিরাট দায়িত্ব এবার রাজমুকুটের মতো তাঁর শিরে অধিষ্ঠিত হতে চলেছে। পিতা তাঁকে অমাত্য ও প্রজাবর্গকে সন্তুষ্ট রাখা, প্রজাদের তুষ্টিসাধন এবং ধনাগার ও আয়ুধাগার পরিপূর্ণ রাখার উপদেশ দিয়েছেন।

আগামীকালের অভিষেকের কথা ভেবে রাম কিছুটা চিন্তিত হয়ে রইলেন। এরপর তিনি সীতার কাছে গেলেন।

সীতা তখন তাঁর অলংকারাদি নিয়ে ব্যস্ত। আগামীকাল কোন কোন স্বর্ণালংকারে নিজেকে সাজাবেন, তারই প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। স্ফটিকনির্মিত দেওয়াল-আয়নায় নিজেকে দেখতে দেখতে অলংকার বেছে নিচ্ছিলেন তিনি।

এমন সময় ভবনের সামনে রথ থামার শব্দে রাম তাকিয়ে দেখলেন, পিতা মহারাজ গুরুদেব বশিষ্ঠদেবকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর মহলে উপস্থিত হয়েছেন। রাম দ্রুত এগিয়ে গেলেন।

দশরথ ডাক দিলেন, “রাম! গুরুদেব এসেছেন।”

রথ থামার শব্দ শুনে রাম ও সীতা দুজনেই বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। পিতা দশরথকে দেখে তাঁরা দুজনেই প্রণত হলেন।

দশরথ বললেন, “রাম, বশিষ্ঠদেব এসেছেন তোমাকে অভিষেক ও অধিবাসের সমস্ত নিয়ম বুঝিয়ে দিতে।”

রাম ও সীতা বশিষ্ঠদেবকে সাদরে অভ্যর্থনা জানালেন।

“আসুন, আসুন!”

এরপর তাঁরা দুজনেই তাঁর চরণ স্পর্শ করে প্রণাম করলেন।

বশিষ্ঠদেব বললেন, “রাম, তুমি ও সীতা আজ উপবাসে থাকবে। আজ কোনও রকম তণ্ডুলাদি গ্রহণ করবে না। সামান্য ফল ও সুমিষ্ট পানীয় গ্রহণ করে সাত্ত্বিকভাবে থাকবে। পবিত্রচিত্তে আজকের রাত ঈশ্বরস্মরণে অতিবাহিত করবে।”

রাম বললেন, “যথা আজ্ঞা, গুরুদেব।”

বশিষ্ঠদেব বললেন, “আগামীকাল প্রত্যুষে তোমরা দুজন স্নানাদি সেরে যজ্ঞশালায় আসবে। সেখানে শ্রীবিষ্ণুর উপাসনা শেষে হোম-যজ্ঞের সময় হবি প্রদান করা হবে। আগামীকাল তোমার অধিবাস।”

রাম বললেন, “যথা আজ্ঞা, গুরুদেব।”

দশরথ এবার রামকে বললেন, “রাম, দীর্ঘায়ু লাভ করেছি, অভীষ্ট বিষয়ও ভোগ করেছি। বৃদ্ধ হয়েছি। শত যজ্ঞ করে প্রচুর দক্ষিণা প্রদান করেছি। ভুবনে যার তুলনা নেই, এমন তোমাকে পুত্ররূপে পেয়েছি। যথেষ্ট দান ও অধ্যয়নও করেছি। দেব, ঋষি, পিতৃ, বিপ্র ও আত্মঋণ—এই পঞ্চঋণ থেকে আমি মুক্ত।”

যজ্ঞ করি তুষিলাম যত দেবগণে,

তুষিলাম পিতৃলোক শ্রাদ্ধ ও তর্পণে।।

রাজা হয়ে করিলাম লোকের পালন,

তোমা হেন পুত্র পাই যজ্ঞের কারণ।।

— কৃত্তিবাস

দশরথ বললেন, “রাম, এখন তোমাকে এই কোশল রাজ্যে অভিষিক্ত করা ছাড়া আমার আর কোনও কর্তব্য নেই। তুমি সূর্যবংশ তথা ইক্ষ্বাকুবংশ—বর্তমানে কথিত রঘুবংশের—সুনাম অক্ষুণ্ণ রেখে এই বিরাট কোশল রাজ্য এবং তার রাজধানী অযোধ্যার সিংহাসন থেকে শাসন পরিচালনা করবে।”

আমি বিদ্যমানে ধর ছত্র নব দণ্ড,

কি জানি আসিয়া কেহ হয় বা পাষণ্ড।।

আজি অধিবাস পুনর্বসু সুনক্ষত্র,

পুষ্যা কল্য হইবে ধরিবে ছত্রদণ্ড।।

— কৃত্তিবাস

রাম বললেন, “আপনার আদেশ শিরোধার্য, পিতা মহারাজ।”

রাম লক্ষ করলেন, পিতা মহারাজ উঠে দাঁড়াতে গিয়েও আবার ফিরে বসলেন। তাঁকে কিছুটা চিন্তিত দেখাচ্ছিল। দশরথ বললেন, “রাম, এখন তোমাকে এই কোশল রাজ্যে অভিষিক্ত করা ছাড়া আমার আর কোনও কর্তব্য নেই। গত কয়েক রাত্রে আমি অত্যন্ত অশুভ কিছু স্বপ্ন দেখেছি। মনে হয়েছে, দিনের বেলায় বজ্রনির্ঘোষের সঙ্গে উল্কাপাত হচ্ছে। দৈবজ্ঞরা বলেছেন, সূর্য, মঙ্গল ও রাহু—এই তিন ভয়ংকর গ্রহে আমার জন্মনক্ষত্র আক্রান্ত হয়েছে। এ ধরনের দুর্লক্ষণ প্রায়ই রাজার ঘোর বিপদ ও মৃত্যুর সূচনা করে। আমার বর্তমান সংকল্প বহাল থাকতেই তুমি অভিষিক্ত হও। কারণ, মানুষের মতি স্থির নয়।”

রাম দেখলেন, পিতা মহারাজ বিশেষভাবে চিন্তিত। তিনি আবার বললেন, “রাম, ভরত যখন রাজধানী ছেড়ে প্রবাসে রয়েছে, তখনই অভিষেকের উপযুক্ত সময়। এটাই আমার মত। তুমি প্রস্তুত হও।”

রাম বললেন, “কিন্তু পিতা মহারাজ, আমাদের ভ্রাতা ভরত অত্যন্ত সৎস্বভাব। সে জ্যেষ্ঠের অনুগত, ধর্মাত্মা, স্নেহশীল ও জিতেন্দ্রিয়। তার মধ্যে তো আমি কোনও বিকার দেখতে পাই না!”

রাজা দশরথ বললেন, “সত্য বটে, রাম। তোমার ভ্রাতা ভরত সৎস্বভাব ও সদ্‌গুণসম্পন্ন। আমি তোমার কথা সমর্থন করছি। কিন্তু আমার মনে হয়, মানুষের চিত্ত অস্থির। সাধু ও ধার্মিকদের মনও উপযুক্ত কারণ উপস্থিত হলে বিকারগ্রস্ত হতে পারে।”

কনিষ্ঠ ভরত তার না জানি আশয়,

তারে রাজ্য দিতে কভু উপযুক্ত নয়।।

জ্যেষ্ঠ সত্ত্বে কনিষ্ঠের নাহি অধিকার,

তুমি রাজা হও, রাম, কর অঙ্গীকার।।

— কৃত্তিবাস

দশরথ আবার বললেন, “রাম, মানুষের মতিগতির কথা কে বলতে পারে? ভরত সৎ, ধার্মিক ও উদার—এ কথা সত্য। কিন্তু সাধু ব্যক্তির মনেও তো বিকার আসতে পারে, বৎস! তুমি আজ সস্ত্রীক ব্রত-উপবাসে শুদ্ধচিত্ত হয়ে কুশশয্যায় শয়ন করবে এবং অধিবাসের রাত অতিবাহিত করবে। তোমার বন্ধুরা যেন আজ সাবধানে তোমাকে রক্ষা করে।”

সুহৃদশাপ্রমত্তাত্ত্বাং রক্ষত্ত্বদ্য সমন্ততঃ।

— অযোধ্যাকাণ্ড, ৪/২৪

কত শত শত্রু তব আছে কত স্থানে,

কে বা শত্রু, কে বা মিত্র, কে বা তাহা জানে?

— কৃত্তিবাস

তখন বশিষ্ঠদেব বললেন, “মহারাজ, দুশ্চিন্তা ত্যাগ করুন। শুভ কাজ শুভভাবেই সম্পন্ন হোক।”

দশরথ বললেন, “গুরুদেব, আপনি যথার্থ বলেছেন। আমি বোধ হয় অহেতুক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ছি।”

এরপর রাজা দশরথ ও রাজগুরু বশিষ্ঠদেব রথে আরোহণ করে রাজমহলের দিকে প্রস্থান করলেন।

রাম ও সীতা অপসৃয়মাণ রথের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

অযোধ্যাবাসীরা নগরশোভা সম্পাদনে নিযুক্ত হয়েছেন। অসংখ্য মানুষ কৌতূহলবশে রাজমার্গে সমবেত হয়েছে। তাদের হর্ষোচ্ছ্বাসের কোলাহলে সমগ্র অযোধ্যা যেন সমুদ্রের গর্জনের মতো মুখর হয়ে উঠেছে। রাম ও সীতা ভবন থেকে নগরের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

নগরের সমস্ত চৌমাথা, সুরম্য অট্টালিকা ও মন্দির ধ্বজপতাকায় সজ্জিত হয়েছে। কুসুমালংকৃত রাজপথে নট, নর্তক ও গায়কদের নৃত্য-গীত চলছে।

সন্ধ্যায় অযোধ্যা নগরী আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠল। রাম ও সীতা তাঁদের সুরম্য ভবনের সুন্দর বারান্দায় বসে নগরীর উজ্জ্বল শোভা দেখতে লাগলেন।

রাম বললেন, “বৈদেহী, এ কি অভাবিত ঘটনা নয়? আমি রাজা হতে চলেছি!”

সীতা বললেন, “হে নাথ, আপনাকে কেমন যেন চিন্তিত দেখাচ্ছে। এ তো অলৌকিক কিছু নয়, এ তো স্বাভাবিক কর্মযজ্ঞ। আপনি রাজপুত্র, আপনি রাজা হবেন, রাজ্য শাসন করবেন। কিন্তু আপনাকে কেমন যেন অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে।”

রাম আপন মনে বললেন, “বৈদেহী, আমার কাছে এ জগৎ যেন স্বপ্নবৎ। আমার রাজ্যাভিষেক হতে চলেছে—ভাবতেই কেমন অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে।”

সীতা এবার হর্ষোৎফুল্ল হয়ে উঠলেন।

“অহো, রাঘব! এ যে ভীষণ সুসংবাদ! আহা, আজ এই আনন্দ কোথায় রাখি! রঘুকুলনন্দন শ্রীরাম আমার স্বামী—যিনি রঘুকুলের গৌরব, যিনি তাঁর পিতার পরম প্রিয় পুত্র—তিনি এই সসাগরা ধরণীর অধিপতি হতে চলেছেন। এই গৌরবে আমি ভীষণভাবে গৌরবান্বিত বোধ করছি। আজ আমার সমস্ত রত্ন, আভরণ ও স্বর্ণালংকার গরিব-দুঃখী মানুষদের দান করতে ইচ্ছা করছে।”

স্ত্রীর আনন্দ দেখে রাম সস্নেহে বলে উঠলেন, “হে বৈদেহী, এ আমার পরম গৌরব। আমি সকলের হিতসাধনে ব্রতী হব। আমার পূর্বপুরুষদের মতো ধর্মানুসারে এই পৃথিবী শাসন করব।”

সীতা বললেন, “আপনি পরম বীর। আপনি নিশ্চয়ই সিংহাসনে বসার যোগ্য।”

রাম বললেন, “কিন্তু প্রিয়ে, গত কয়েক রাতে আমি খুবই অশুভ স্বপ্ন দেখেছি। মনে হচ্ছে, এই রাজ্যে কোনও ঘোর বিপদ ঘনিয়ে আসছে। এ ধরনের দুর্লক্ষণ কখনও কখনও ঘোর বিপদ ও মৃত্যুর সূচনা করে।”

সীতা বললেন, “না, না, রঘুনাথ! আপনি অহেতুক দুশ্চিন্তা করবেন না। স্বপ্ন তো মনের কোনও দুশ্চিন্তা থেকেই উৎপন্ন হতে পারে।”

রাম আপন মনে বলে উঠলেন, “কিন্তু, সীতা, কাল প্রবল। জানি না কেন, আমার মনে কোনও স্বস্তি আসছে না।”

সীতা বললেন, “হে নাথ, দুশ্চিন্তা ত্যাগ করুন। আর দেরি নয়। আগামীকাল অতি প্রত্যুষে শয্যা ত্যাগ করতে হবে। আমি হর-গৌরীর কাছে প্রার্থনা করি, যেন আমার স্বামীকে কোনও সংকটে পড়তে না হয়।”

এরপর রাম পত্নীসহ স্নান করে নারায়ণের উপাসনা করলেন। প্রজ্বলিত অগ্নিতে আহুতি দিয়ে হবি গ্রহণের পর তিনি কুশশয্যায় রাত্রি যাপন করলেন।

| ৩ |

কৌশল্যা মহলে রাজা

পরদিন ঊষাকাল হতে অযোধ্যাবাসিগন নগরের শোভা সম্পাদনে নিযুক্ত হলেন। চতুষ্পথ, চৈত্য, অট্টালিকা, বিপণি সকল এবং দেব মন্দিরাদি এবং নগর সভাগৃহ তথা উচ্চ বৃক্ষ প্রভৃতি ধ্বজ পতাকায় শোভিত করা হল।

ধূপদীপবাসিত ও কুসুমালংকৃত রাজপথে নট,নর্তক এবং গায়কগনের নৃত্যগীত হতে লাগল। চত্বরে এবং সভায় লোকে আনন্দমগ্ন হয়ে তাঁরা বলতে লাগলেন,‘আমাদের রাজ্য এই অযোধ্যা ধন্য, আমরা প্রজাবৃন্দ ও সকলেই ধন্য, কারণ লোকচরিত্রজ্ঞ মহীপতি রাম চিরকালের জন্য আমাদের রাজা হবেন। তিনি আমাদের পরম রক্ষক হবেন। ধর্মাত্মা নিস্পাপ রাজা দশরথ চিরকাল বেঁচে থাকুন। তাঁর প্রসাদে আমরা রামের অভিষেক প্রত্যক্ষ করব। 

অন্যদিকে রাজপ্রাসাদের অন্য এক ঘরে হয়ে চলেছে অন্য এক কথা। সেখানে রাজা দশরথ এবং তার প্রধানা মহিষী কৌশল্যা কথোপকথনে ব্যস্ত।

রাজপ্রাসাদে অনেক মহল। কোশল মহল। কেকয় মহল। সুমিত্রা মহল। তিন রানীর তিন মহল।

রাজা যখন যেখানে মর্জি সেখানে সেই মহলে সেই রানীর কাছে গিয়ে অবস্থান করেন।

কোশল মহল। মহারাণী কৌশল্যার মহল। 

প্রধানা মহিষী কৌশল্যার ঘরে আজ রাজা দশরথ অবস্থান করছেন। তিনি সদাসর্বদাই  ভরত জননী কৈকেয়ীর ঘরেই গিয়ে বসেন। কৈকেয়ীর কাছেই থাকেন। আজ কয়েকদিন যেন তিনি বড় তরফের মহলেই অবস্থানে স্বস্তি বোধ করছেন।

মহারানী কৌশল্যা এক্ষনে মহারাজকে এক গ্লাস সুমিষ্ট শরবত পরিবেশন করে বলে ওঠেন,’ মহারাজ  , আমার কৌতুহল হচ্ছে এই দেখে , যে , আপনি আমার পিতা কোশলরাজকে আমার রামার অভিষেকে আসতে আমন্ত্রণ করেছেন। এমন কি অনেকানেক রাজা মহারাজাকে রামের অভিষেকে আপনি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কিন্তু কেকয় রাজ অশ্বপতিকে কিংবা মিথিলাপতি রাজা জনক,কই,আপনি তাদের কাহাকেও তো আমার রামাভদ্রের  রাজ্যাভিষেকে যোগ দিতে আমন্ত্রণ করলেন না ? 

রাজা দশরথ বুঝি কি বলবেন সেই কথা ভাবলেন এবং এইবার ধীরে ধীরে বড়রাণী কৌশল্যাকে বললেন,‘ রাণী কৌশল্যা, এ হল এক জরুরী বিষয়। তোমাকে বলি,  রামের অভিষেক এর সিদ্ধান্ত বড় দ্রুত নিতে হল আগামী কাল এর শুভ মুহূর্ত হেতু।  এত দ্রুত অত দুরস্থানে তাদের খবর দেওয়া সম্ভব হয়ে উঠল না। গান্ধার রাজ্য কিংবা মিথিলা সে অনেক অনেক দূর। কাল পুষ্যানক্ষত্রে আমি রামের অভিষেক সম্পন্ন করতে চাই। কালকের শুভমুহূর্ত চলে গেলে অভিষেক আদির শুভদিন আবার কয়েক বৎসর পরে জানা যাচ্ছে। তখন অনেক দেরী হয়ে যাবে।  আর, কারো অপেক্ষায় এমন শুভ কাজ কেমন করে আমি আটকে রাখি  ?’

কৌশল্যা বলেন, ‘ কিন্তু মহারাজ অত্যন্ত ব্যস্ততার সাথে এই আয়োজন এর কি কারণ ?

কারণ ? – দশরথ বললেন, ‘কারণ নিশ্চয়ই কিছু আছে দেবী ! কৌশল্যা, রাজসিংহাসন শত্রু পরিবৃত। হিংসার বিষ-নিশ্বাস চলতে থাকে সিংহাসন অধিকারের জন্য। আমি তাই এখন কাকে কিছু জানাতে আগ্রহী নয়।’

কৌশল্যা রাজনীতি বুঝেন না। তিনি সরলা। তাই তিনি বলে ওঠেন আপনি রামের অভিষেকের আয়োজন করছেন অথচ আমি আমার পুত্র রাম বা সতিনী কৈকেয়ী কিংবা সুমিত্রা আমরা কেউই সে কথা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারিনি। ভরত শত্রুঘ্ন ও এই সময় অযোধ্যায় উপস্থিত নেই। যেন অত্যন্ত ব্যস্ততার সাথে আপনার এই অভিষেকের আয়োজন দেখতে পাচ্ছি। এর কি কোন কারন আছে ? কেননা আপনি অত্যন্ত বিচক্ষন।’

রাজা দশরথ বলেন, ’কৌশল্যা আমার বিচক্ষণতার অভাব কোনদিন দেখেছ কি ?’

কৌশল্যা বলেন,‘ না মহারাজ। এমন কথা কখনোই বলব না। আপনার উপরে আমার আস্থা অটুট।’

রাজা দশরথ আবার বলেন,’ অথচ মহারাণী,আমি আজ  নিজেই ভীষণ ভীষণ চিন্তিত। আমি যেন কোন অঘটন আশঙ্কায় রয়েছি । আমি আজ তাই ভীষণ বিচলিত বোধ করছি। আমি যেন কি সব দুঃস্বপ্ন দেখতে পাচ্ছি কৌশল্যা !’

কৌশল্যাদেবী জিজ্ঞাসা করেন , ‘ দুঃস্বপ্ন !  মহারাজ সে আপনার অত্যধিক চিন্তার কারণে আমি বলব !’

দশরথ বলেন,‘কৌশল্যা, আমি কাল অত্যন্ত অশুভ স্বপ্ন দেখেছি  জানো ! যেন দিবসে বজ্রনির্ঘোষ সহ উল্কাপাত হচ্ছে। দৈবজ্ঞরা বলেছেন, সূর্য,মঙ্গল ও রাহু এই তিন দারুন গ্রহে আমার জন্ম নক্ষত্র আক্রান্ত হয়েছে। এই প্রকার দুর্লক্ষণ প্রায় রাজার ঘোর বিপদ ও মৃত্যু সুচনা করে।’

কৌশল্যা চমকে ওঠেন, ‘ না না না এ কি কথা বলছেন মহারাজ !’

রাজা দশরথ বলেন,‘ কৌশল্যা, আমি যেন কোন অশুভ কিছু বোধ করছি, আমার মন ভীষণ ভীষণ ভীষণ অস্থির বোধ করছে। তাই আমার বর্তমান সংকল্প থাকতে থাকতেই আমি রামকে সিংহাসনে অভিষিক্ত করে দিতে চাই। কারণ মানুষের মতির স্থিরতা নেই।‘

কৌশল্যা বলেন, ‘মহারাজ, না না, বুঝতে পারছি আপনি অতি চিন্তায় জর্জরিত। এ সব কথা শুনে আমারই কেমন মন উচাটন হয়ে যাচ্ছে ! না না, শুভকাজ শুভভাবে সম্পন্ন হোক ! হে হরগৌরী !’ – তিনি হাত জোড় করে হরগৌরীর উদ্দেশ্যে প্রনাম করলেন।

রাজা দশরথ বলেন, ‘ কৌশল্যা, রামের অভিষেক সুসম্পন্ন হয়ে যাক। পরে আমি একদিন তোমাকে এই বিষয় নিয়ে অনেক অনেক কথা বলব কৌশল্যা। আমি কেন চিন্তায় আছি সে কথা আমি তোমায় বিস্তারিত বলব।’

কৌশল্যা তাকিয়ে থাকেন বয়ঃভারে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত রাজা দশরথের দিকে। কৌশল্যা কোন কিছুই বুঝতে পারেন না। শুধুমাত্র অলস দৃষ্টিপাতে উৎসবময় নগরীর দিকে তাকিয়ে থাকেন একদৃষ্টে। 

 অযোধ্যা আজ আলোক নগরী হয়ে উঠেছে । ওই যে রামের  ভবন দেখা যাচ্ছে আলোকমালায় সজ্জিত। 

পুত্র রাম যেমন সকলের নয়নের মনি পুত্রবধু সীতা ও তেমনই সর্বগুণসম্পন্না। সকলে রাম এবং সীতার গুণ মুগ্ধ। রাম এবং সীতা সকলের পরম প্রিয়। সকলে রাম সীতা বলতে অজ্ঞান। রাজা এক্ষনে রামের অভিষেক সম্পন্ন করতে চান। পুত্র রাজা হবে। এর থেকে আনন্দের কি হতে পারে ! কিন্তু রাজা স্বয়ং যে কেন এই নিয়ে এত চিন্তিত, তা মহারাণী কৌশল্যা কোন ভাবেই যেন অনুমান করে উঠতে পারছেন না। রামকে তো সবাই ভালোবাসে। 

কৈকেয়ী রামকে যেমন তাঁর পুত্র ভরত অপেক্ষা ভালোবাসে , তেমন কোন মা তাঁর নিজের সন্তানকে ও এমত ভালোবাসতে পারেন না। আচ্ছা, কৈকেয়ী যখন রামের অভিষেকের সংবাদ জানতে পারবে তখন সে রামকে  কত আদর করবে। কত কত উপহার উপঢৌকন প্রদান করবে। রামের কাছে আবদার করবে রাম একবার ইন্দ্রপুরি অলকাপুরি দর্শন করিয়ে আনতে। কিন্নর কৈলাশ কেদারবদ্রী গঙ্গোত্রী যমুনোত্রি ভ্রমন করিয়ে আনতে। রাম হবে সসাগরা ধরনীর অধিপতি। এর থেকে আনন্দের কথা আর কি হতে পারে। মহারাজ কোন উপহার দেবেন তার রাম জননীকে। রাজা তাঁর প্রিয় রাণী কৈকেয়ীকে কি দেবেন রামের অভিষেকের আনন্দে। মহারাজা নিজ মুখেই সেই কথা বলবেন নিশ্চই।   

কৌশল্যা গবাক্ষ হতে দৃষ্টি সরিয়ে মহারাজের দিকে তাকাতেই হঠাৎ খেয়াল করেন রাজা দশরথ একটা ক্লান্তি নিয়ে কেমন একরকম নিদ্রামগ্ন হয়ে পড়েছেন। কৌশল্যা অনুমান করেন মহারাজা চিন্তার ভারে ভীষণ বিষণ্ণ। আহা , থাক , মহারাজ একটু নিশ্চিন্তে নিদ্রা যান। রাম জননী এক্ষনে তাড়াতাড়ি একটি চিত্রিত বালাপোষ রাজার গায়ে টেনে মেলে দেন। 

রাজা দশরথ চমকে জেগে ওঠেন, কে ?

কৌশল্যা বলেন, ‘ মহারাজ আমি। আমি কৌশল্যা। ‘ 

‘ ও ! তুমি ! আমি একটু বিশ্রাম করি কৌশল্যা !’ – রাজা দশরথ এবার নিশ্চিন্ত হয়ে শুয়ে পড়েন।

কৌশল্যা ভেবে পান না রাজা কেন এমন অস্থির,  কেন এমন আতঙ্কিত। তিনি কেন এমন অনন্যচিন্ত হয়ে রয়েছেন নিজের মধ্যে কে জানে? তিনি কাহাকে ও কিছু বলছেন না। শুধু মাত্র এক চিন্তা। কি ভাবে রামের অভিষেক আদি সুসম্পন্ন হবে। বুঝতে অসুবিধা হয় না, কি একটা দুঃসহ চিন্তার ভারে তিনি যেন কেমন ক্লান্ত, অতিরিক্ত আতংকিত, অদ্ভুত উদ্ভ্রান্ত হয়ে রয়েছেন। হেহরগৌরী তুমি জানো। কাল পুষ্যা নক্ষত্রে আমার রামাভদ্রের অভিষেক সুসম্পন্ন হোক অযোধ্যার রাজসিংহাসনে। 

( চলবে )

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

ভজ মন রাম চরণ

ধ্রুপদী সাহিত্য শ্যামলকৃষ্ণ বসু [ অযোধ্যাকান্ড ১ ] ১ অযোধ্যার রাজসভায় মূল লেখাটির বানান, ব্যাকরণ, বাক্যগঠন, যতিচিহ্ন ও সংলাপের বিন্যাস সংশোধন করে নিচে প্রকাশযোগ্য রূপে

Read More »

৫ : কালের প্রহরী

 শুভাশিস ঘোষ একটি বাড়ির চোখ দিয়ে দেখা দুই শতাব্দীর ইতিহাস, মানুষের জীবন ও সময়ের নির্মম পরিবর্তনের কাহিনি পঞ্চম পর্ব আট সেদিন সকাল থেকেই ঘোষালবাড়িতে হইহই

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

ভজ মন রাম চরণ

ধ্রুপদী সাহিত্য শ্যামলকৃষ্ণ বসু [ অযোধ্যাকান্ড ১ ] ১ অযোধ্যার রাজসভায় মূল লেখাটির বানান, ব্যাকরণ, বাক্যগঠন, যতিচিহ্ন ও সংলাপের বিন্যাস সংশোধন করে নিচে প্রকাশযোগ্য রূপে

Read More »

৫ : কালের প্রহরী

 শুভাশিস ঘোষ একটি বাড়ির চোখ দিয়ে দেখা দুই শতাব্দীর ইতিহাস, মানুষের জীবন ও সময়ের নির্মম পরিবর্তনের কাহিনি পঞ্চম পর্ব আট সেদিন সকাল থেকেই ঘোষালবাড়িতে হইহই

Read More »

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »