শুভাশিস ঘোষ
একটি বাড়ির চোখ দিয়ে দেখা দুই শতাব্দীর ইতিহাস, মানুষের জীবন ও সময়ের নির্মম পরিবর্তনের কাহিনি
পঞ্চম পর্ব
আট
সেদিন সকাল থেকেই ঘোষালবাড়িতে হইহই ব্যাপার। বাগানজুড়ে সামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। ভেতরমহলে লোকজনের চিৎকারে গমগম করছে বাড়িটা। অঘোরি ভটচাজ, সত্যচরণের ছোটমামা, দিন তিনেক আগেই হাজিপুর থেকে সপরিবারে এসে হাজির। ডোঙাড়িয়া থেকে সত্যচরণের শ্বশুরবাড়ির লোকজনও এসে গেছে কাল।
তিন-তিনটে গরুর গাড়ি যখন পরপর এসে দাঁড়াল ঘোষালবাড়ির সামনে, পাড়ার ছেলেছোকরাদের সে কী আমোদ! এক গাড়িতে মালপত্র বোঝাই, অন্য দুটোতে মানুষজন। সত্যচরণ এই বাড়ি তৈরি করে যখন গৃহপ্রবেশ করল, সেটাও ছিল বেশ ধুমধামের আয়োজন। সেবার ডোঙাড়িয়ার লোকেরা আসতে পারেনি। গৃহপ্রবেশের দুদিন আগেই স্বর্গবাসী হয়েছিলেন সত্যচরণের সেজখুড়শ্বশুর। তাই সেবারও বাড়ির লোকজনকে বাদ রেখেই শুভকাজ সারতে হয়েছিল সত্যচরণকে।
সে দুঃখ চেপে রেখেছিলেন গিন্নিমা। তাই যেদিন শম্ভুচরণ বিলেত গেল, সেদিনই তিনি ঘোষণা করেছিলেন, বড় খোকা দেশে ফিরলে খুব ধুমধাম করে নারায়ণের সিন্নি দেবেন। গিন্নিমা সত্যনারায়ণ উচ্চারণ করতেন না, নরকবাসের ভয়ে। তাই বললেন, নারায়ণের সিন্নি দেবেন। আর তখন ডোঙাড়ের জ্ঞাতিদেরও পাত পড়বে এই ঘোষালবাড়িতে।
তাই একদিন আগে সেবাড়ির লোকেরা এসে গেলেও আজ সকাল থেকেই জ্ঞাতিগোষ্ঠীর আসার বিরাম নেই। সত্যচরণের বোনেরাও এসে গেছে। আরও কত আত্মীয়স্বজন যে আসছে, সবাইকে ঠিক চিনিও না। এই ক’বছরে কি আর সব আত্মীয়দের চেনা হয়ে ওঠে?
যাই হোক, আয়োজনে যাতে কোনো ত্রুটি না থাকে, সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর আছে সত্যচরণের। বাড়ির ভেতরে আত্মীয়স্বজনের খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে সব দায়িত্ব সামলাচ্ছেন ছোটমামা। পুজোর দিকটা গিন্নিমা সামাল দিচ্ছেন। সঙ্গে আছে বড় মেয়ে সরলা আর বাপেরবাড়ির বউ-ঝিরা।
এদিকে ভোর হতেই ঘোড়ার গাড়ি সাজিয়ে খিদিরপুর রওনা হয়ে গেছে ফজলুল মিঁয়া। জাহাজ ভেড়ার কথা নাকি সকাল-সকাল। তবে দু-চার ঘণ্টা সময়ের হেরফের তো হয়েই থাকে। তাই হাজার কাজের ফাঁকে সে চিন্তাটাও বেশ ভাবাচ্ছে সত্যচরণকে। বেলা থাকতে থাকতে ছেলেটা ভিটেতে ফিরলে হয়। পাঁচ গাঁয়ের লোক দেখুক, বিলেতফেরত ব্যারিস্টার কাকে বলে।
ওদিকে হিরু কাহারের চড়চড়ি বাজনার দল অপেক্ষা করছে চড়িয়াল মোড়ে। বংশীর ভাইটাও হিরুর দলের সঙ্গেই আছে। দূর থেকে ঘোড়ার গাড়ি চোখে পড়লেই শুরু হয়ে যাবে হিরু কাহারের জাদু। হিরুর বাজনদারদের সুখ্যাতি শোনেনি, এ তল্লাটে কেউ আছেন নাকি? ইদানীং হিরু পেল্লায় মাপের খানদুয়েক ইংরিজি বাঁশিও কিনেছে। বুইতায় বেজে উঠলে মিঠাপুকুরে শোনা যায় তার সুর।
তাই যেদিন সত্যচরণ জেনেছে বড় খোকার ফেরার দিনক্ষণ, সেদিনই বায়না করেছে হিরুর দলকে। হিরু কাহারের বাজনা নিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে চেপে তার ব্যারিস্টার ছেলে ঘরে ফিরছে—এ দৃশ্য কল্পনার সুখ সত্যচরণ যে কতবার অনুভব করেছে, সে খবর ক’জন জানে?
আজ তাই পাড়ার লোকজনকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিজে নেমন্তন্ন করে এসেছে সত্যচরণ। মহাজনি কারবারে ফুলেফেঁপে ওঠা অর্থলোলুপ সত্যচরণ আজ যেন দরাজ মানুষ। সব কৃপণতা আজ যেন উধাও হয়ে গেছে। কোন জাদুবলে এমনটা হল! এ কি অপত্যস্নেহের গুণ, নাকি অহংকারের কাছে কৃপণতার পরাজয়?
এত আনন্দের মধ্যে এ বাড়ির একজনের খোঁজ কারও কাছেই নেই। সে কানাইচরণ। বড়দাদার বাড়ি ফেরার আনন্দে ছোট দুই ভাই অভয় আর বিষ্ণুর আনন্দের সীমা নেই। সকাল থেকেই আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে হইচই করে বাড়ি মাতিয়ে রেখেছে তারা।
সত্যচরণের মেয়েরাও আজ বেজায় খুশি। কত দিন পর বাপের ভিটেতে যজ্ঞিবাড়ি! কাল সকালেই চলে এসেছে সরলা, সঙ্গে দুই ছেলে আর স্বামী। জয়রামপুরের হালদারবাড়ির বড় বউ বলে কথা। গা-ভর্তি গয়না আর গরদের শাড়িতে সেজে মায়ের সঙ্গে পুজোর কাজে হাত লাগিয়েছে সরলা।
বিমলা এসেছে আজ সকালে। হুট বললেই তো আর তার পক্ষে আসা সম্ভব নয়। পেশকারের চাকরি জামাইয়ের। হাজিপুর কোর্টের কাছে ঘর ভাড়া নিয়ে সপ্তাহভর থাকে জামাই। ইংরেজ সাহেবদের চাকরি করা কি চাড্ডিখানি কথা? আর্জি পেশ করলেই কি আর ছুটি মেলে নাকি? অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তবে মিলেছে দুদিনের ছুটি।
কিন্তু সত্যচরণের মেজ ছেলে কানাইয়ের কোনো খবর নেই। আত্মীয়রা সবাই একবার করে কানাইয়ের খোঁজ করে, কিন্তু কেউ সঠিকভাবে বলতে পারে না সে কোথায়।
গিন্নিমা কখনও বলেন, “হয়তো ভিয়েনের দিকে আছে।”
আবার কখনও বলেন, “জানোই তো, কানাই আমার বড্ড লাজুক। তাই হয়তো ওপরতলায় নিজের ঘরে বসে আছে।”
সামান্য উত্তরের পরেই প্রসঙ্গ ঘোরাতে অন্য কথায় চলে যান গিন্নিমা।
গাওয়া ঘিয়ের লুচির গন্ধে ম-ম করছে ঘোষালবাড়ি। বাগবাজার থেকে কারিগর এনে ভিয়েন বসিয়েছে সত্যচরণ। লেডিকেনি আর বোঁদের অঢেল আয়োজন। দই পাতা হয়েছে কাল সন্ধের পরেই। সকাল-সকাল অঘোরি ভটচাজ বস্তা সরিয়ে, হাঁড়ির চাপা খুলে দেখে নিয়েছেন দই কেমন বসল।
এদিকে সত্যচরণ আসতেই গদগদভাবে ছোটমামা বলল, “বুঝলি সত্য, খাসা দই বসেছে। মল্লারচক থেকে কারিগর নিয়ে এসে দই বসানোর ব্যবস্থা করলুম কি আর এমনি এমনি! হুঁহুঁ বাবা, এরা হল সব জাত কারিগর। তবে বড় খোকার বিয়েতে কিন্তু পয়ধি বসাব এদের দিয়েই। তুই শুধু দেখবি সত্য, গাঁয়ের লোক কেমন হাত চেটে চেটে খায়।”
— সে তোমার যা মনে হয় করো।
— তা তো বটেই। বলে কিনা বাড়ির বড় ছেলের বিয়ে, তাও আবার বিলেতফেরত ব্যারিস্টার। তার বিয়েতে কি আর যাই-তাই ব্যবস্থা করলে চলবে নাকি? ওসব নিয়ে তুই কিছু ভাবিসনে সত্য। ওসব আমার ওপরেই ছেড়ে দে।
একগাল হেসে সত্যচরণ চলে গেছে অন্যদিকে। আত্মীয়স্বজনরা সবাই একবার করে উঁকিঝুঁকি দিয়ে যাচ্ছে ভিয়েন আর হেঁসেলে। জলখাবারের লুচি ভাজার তো বিরাম নেই। এরপর দুপুরের পংক্তি কখন বসবে, তা নিয়েও গবেষণা চলতে লাগল পড়শিদের মধ্যে।
ঠাকুরঘরের ভেতর আর দালানে মেয়েমহলের ভিড়। গলায় শাড়ির আঁচল পেঁচিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে সবাই পাঁচালি শুনছে। বীরু ঠাকুরের পাঁচালি শুনতে গাঁয়ের বউ-ঝিরা এমনিতেই জড়ো হয় সব পূর্ণিমাতে। আজ আবার বিশেষ পুজো, তায় গাঁশুদ্ধু নেমন্তন্ন। তাই সকাল-সকাল চানটান করে সবাই হাজির ঘোষালবাড়িতে।
এ বাড়িতে সত্যনারায়ণের সিন্নিতে পড়া হয় সত্যপীরের পাঁচালি। এ তল্লাটে অবশ্য এটাই নিয়ম। সব দিকটা ঠিকঠাক চলছে দেখে বেশ খুশি খুশি মনে বড় বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে হুঁকোয় টান দিচ্ছে সত্যচরণ।
হন্তদন্ত হয়ে বংশী এসে ফিসফিস করে বলল, “ছোটঠাকুর, চৌকিদার এয়েচে গো, তোমার সঙ্গে কথা বলতে চায়।”
— চৌকিদার? তার আবার কী হল? ঠিক আছে, ভেতরে ডাক।
নিশ্চিন্তপুরের বীরেন নস্কর দুটো গ্রামের চৌকিদার। বুইতা আর নিশ্চিন্তপুরের ভার তার ওপরে। গাঁয়ের লোকের কাছে অবশ্য চৌকিদারের হাবভাব বড় দারোগার চেয়ে কম কিছু নয়। আবার মুরুব্বি লোকের কাছে খুব একটা পাত্তা পায় না এরা।
তাই বাড়িভর্তি আত্মীয়, পড়শিদের মাঝখান দিয়ে এসে উঠোনে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় সত্যচরণকে বলল, “ঘোষালঠাকুর, দারোগাবাবু খবর পাঠিয়েছে। বলি, একটু আড়ালে আসুন না, কথা আছে।”
বাড়িভর্তি আত্মীয়-পড়শিদের কৌতূহলী দৃষ্টির মধ্যেই সত্যচরণ উঠে সিঁড়িঘরের দিকে চলল। পিছু পিছু সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল বীরেন চৌকিদার।
“বংশী, এক্ষুণি গিয়ে দ্যাখ কানাই কোথায় আছে। কোথায় গিয়ে দেশ উদ্ধার করছে। গিয়ে বল, ছোটঠাকুর এখনই ডাকছে বাড়িতে,” সত্যচরণ বলল।
“কোতায় যেতে পারে মেজবাবু?” বংশী উত্তর করে।
— তার আমি কী জানি? তোকে বললুম, যা খুঁজে আন গে। দ্যাখ গিয়ে প্রমোদের সঙ্গে কোথায় গিয়ে স্বদেশি করছে হয়তো। বাড়িভর্তি লোকজন, সেদিকে হুঁশ আছে ছেলের? সব দিকটা কোথায় একটু দেখাশোনা করবে, তা নয়, দেশ উদ্ধার করতে গেছে। যত সব!
হিরু কাহারের ইংরিজি বাজনার পিছু পিছু ঘোড়ার গাড়ি যখন ঘোষালবাড়ির সামনে এসে থামল, বেলা তখন গড়িয়ে গেছে। পাড়াপড়শির দল খেয়েদেয়ে অনেকেই যে যার বাড়ি ফিরে গেছে। ছেলেছোকরাদের অনেকেই বাগানে খেলায় মত্ত। বাজনার আওয়াজে গোটা গাঁ নিমেষে জড়ো হয়ে গেল ঘোষালবাড়ির সামনে।
শাঁখ বাজিয়ে, উলুধ্বনি দিয়ে শম্ভুচরণকে বরণ করে বাড়ির ভেতরে আনা হল।
সন্ধের পর বংশী খবর আনল, মেজ দারোগা নিজে এসে বেঁধে নিয়ে গেছে প্রমোদকে। মোড়লদের কলাবাগানে লুকিয়েছিল।
সত্যচরণ বলল, “কানাই কোথায়?”
বংশী বলল, “ওপরে গিয়ে নিজের ঘরে শুয়ে আছে মেজবাবু।”
— তোর গিন্নিমাকে কোথায়? গিয়ে বল, আদরের ছেলেকে যেন কালই পাঠিয়ে দেয় কলকাতায়। লেখাপড়া করুক না করুক, মেসবাড়িতে থাকলে তবু এই বদসঙ্গ ছাড়বে।
নয়
তখন প্রায় বছর তিরিশেক হয়ে গেছে এ তল্লাটে রেলপথ বিছানো হয়েছে। সেই নব্বই সাল থেকেই তো মালগাড়ির যাতায়াত বজবজ স্টেশনে। তখন থেকেই চটকল আর তেলের ডিপোতে মালপত্র আসা-যাওয়া করছে রেলগাড়িতে। বছর দুয়েকের মধ্যেই আবার শুরু হয়ে গেছে প্যাসেঞ্জার ট্রেন। সে সময় নাকি খুব হইচই হয়েছিল। কত লোকের কত কথাই তো কানে এল। এত সব বড়ো বড়ো ঘটনা ঘটে যাবে এ তল্লাটে, আর ঘোষালবাড়ির পাঁচিল জানবে না, তা আবার হয় নাকি?
তখন ১৮৯২ সাল। চার কামরার রেলগাড়ি এসে দাঁড়াল বজবজ স্টেশনে। লোকে-লোকারণ্য স্টেশন চত্বর। ভুসভুস করে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে রেলগাড়ি ঢুকল স্টেশনে। হইহই করে উঠল শয়ে শয়ে লোক। পুরো দুটো কামরা গোরা সাহেবদের জন্য আলাদা। ওখানে নেটিভদের ওঠার নিয়ম নেই, ওগুলো ফার্স্ট ক্লাস। নেটিভদের জন্য বাকি দুটো, সেকেন্ড ক্লাস।
সে ট্রেন তখন যেত বালিগঞ্জ পর্যন্ত। পরে তো বেলেঘাটায় তৈরি হল নতুন স্টেশন। এখন নাম তার শিয়ালদা। সে তো শুনেছিই, নাকি খুব বড়ো স্টেশন! কত লোকজন দিনভর রেলগাড়ি চড়ে শহরে যায় আর আসে।
কানাইচরণও শিয়ালদা পর্যন্ত যায় ট্রেনে চেপেই। স্টেশনের কাছাকাছিই রিপন কলেজে পড়ে। থাকে মেসবাড়িতে। কলেজের খুব কাছেই সে মেসবাড়ি। সপ্তাহে সপ্তাহে বাড়ি আসে কানাইচরণ।
বড়ো ছেলেকে বিলেত-ফেরত ব্যারিস্টার করে গাঁয়ে ফেরানোর পর সত্যচরণও যেন একটু একটু করে বদলে ফেলেছে নিজেকে। সেই হাড়কিপটে সুদখোর লোকটা যেন একটু যশলোভী হয়ে উঠেছে। সবাই ঠিকমতো বুঝতে না পারলেও আমার চোখকে কি আর ফাঁকি দেওয়া যায়!
লোকজনকে প্রায়ই ডেকে ডেকে বলে, “একজনকে বিলেতে পাঠিয়েছি বলেই তো আর সব্বাইকে পারব না, তাই মেজটাকে কলকাতার রিপন কলেজে পাঠালাম। নাম শুনেছিস তো রিপন কলেজের? মস্ত বড়ো কলেজ রে। খুব নামডাক। ওখান থেকে পাশ দিয়ে ফিরলে সেও একজন গণ্যিমান্যিই হবে। দেখে নিস।”
সে কথার উত্তরে যদি কেউ বলে, “হ্যাঁ গো খুড়ো, তোমার কানাই তো শুনতুম নাকি প্রমোদের সাকরেদ ছিল। তা সেসব ভূত কি এখন মাথা থেকে নেমেছে? নাকি এখনও সেই দেশ উদ্ধার করেই বেড়ায়?”
এসব কথা যে যত নরম করেই বলুক না, সত্যচরণের যে তেতে ওঠে, তা বেশ বুঝতে পারি। তখন সে রাগ চেপে, চোয়াল শক্ত করে উত্তর করে, “আরে ছ্যা ছ্যা ছ্যা! ওসব কম্ম কি আর ভদ্দরলোকের ছেলে করে নাকি? শোন, এই ঘোষালবাড়িতে এখন একজন বিলেত-ফেরত ব্যারিস্টার আছে। রাজভক্ত না হলে কি আর চলে নাকি? একসময়ে ওরকম কত লোকেই তো স্বদেশি-টদেশি করেছিল। তা তারা কি এখন সবাই দেশ উদ্ধার করে বেড়াচ্ছে নাকি?”
সে কথা আরও পাঁচ কান ঘুরে পুলিশ দারোগা মহলেও যেন পৌঁছে যায়, তাই একটু গলা চড়িয়ে সত্যচরণের বলার চেষ্টা—অন্তত আমার বুঝতে অসুবিধা হয় না।
সত্যচরণ আজকাল ধুতিটা আরও একটু ঝুলিয়ে পরে। সচরাচর ফতুয়া গায়ে বাইরে বেরোয় না। হাওয়াই শার্ট আর ধুতিতে বেশ মানায় তাকে। কুটুমবাড়ি গেলে ধুতির ওপর পাঞ্জাবি, চাদর, সোনার বোতাম, পামসু আর দামি ছড়িতে একদম ফুলবাবু। অবশ্য বাড়িতে বা আড়তে থাকলে আলাদা কথা।
শম্ভুচরণ কোর্টে যায় ফিটন চড়ে। এক ঘোড়ায় টানা গাড়ি। সেই তেজি ঘোড়ার আস্তাবল তৈরি হয়েছে বাগানের এক কোণে। তার পাশে কোচোয়ানের ঘর। সকাল-সন্ধেয় সেই ফিটন যখন চড়িয়াল মোড়ের ওপর দিয়ে যাওয়া-আসা করে, লোকজন তাকিয়ে থাকে। ঘোড়ার গলার ঘণ্টা আর খুরের শব্দে বেশ দূর থেকেই টের পাওয়া যায় শম্ভুচরণের আসা-যাওয়া।
গাঁয়ের লোকে বলে, “বেলিস্টার সাহেবের টমটম গাড়ি।”
সত্যচরণকে দেখে যখন গাঁয়ের লোকেরা এসব কথাবার্তা বলে, তা যে বেশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে সে, বুঝতে আমার কোনো অসুবিধাই হয় না।
সেদিন সকালবেলায় বৈঠকখানায় খাতা খুলে বসেছে সত্যচরণ। বাগদিপাড়ার নিতু আর তার বউ এসেছে সব হিসেব-নিকেশ চুকিয়ে দিয়ে জমির দলিলখানা আজই নিয়ে যাবে বলে। আগেই অবশ্য আড়তে গিয়ে কথাটা বলে এসেছিল নিতু, “ঘোষালঠাকুর, এবার আমার হিসেব-নিকেশটা করে দাও গো। যা-যতটা বাকি আছে, সব মিটমাট করে দলিলখানা নিয়ে আসব পরশুদিন।”
সত্যচরণ চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে কিছুক্ষণ জরিপ করেছিল নিতুকে। তারপর তাচ্ছিল্যের সুরে বলেছিল, “বাব্বা, রাতারাতি এত টাকা পেলি কোত্থেকে রে নিতু? বলি, সিঁদ-টিঁদ কাটছিস নাকি আজকাল?”
“কী যে বলো ঠাকুর! আমরা গরিব ছোটোজাত বলে কি চোর নাকি গো? জীবনে কারও এক পয়সা বেইমানি করিনি গো ঠাকুর। দিনরাত খাটি, খাই। তখন মেয়ের বিয়েতে জমিটা বন্ধক দিসলুম। তাও তো এই ক’বছরে টুকটুক করে কতটা মেটালুম বলো। এখন পরেশটা চটকলে কাজে যায়। পারমেন্ট টিকিট হয়ে গেছে গো ঠাকুর। তার থেকেই তোমার বউমা একটু একটু করে সরিয়ে রাখে অসময়ের জন্য। তা দেখলুম, আড়কাঠে তোলা টাকা যা জমেছে, তা দিয়ে জমিটা আগে ছাড়িয়ে নিই। পরেশটাও তাই বলছিল গো ঠাকুর।”
মাটিতে বসে বলল নিতু।
চৌকিতে বসে কথাগুলো শুনছিল সত্যচরণ। খুব একটা খুশি যে হল না, তা বলাই বাহুল্য।
“তা চটকলে তো শুনেছি গাধার খাটুনি খাটতে হয়। পারে তোর ব্যাটা?”
— কেন পারবে না গো ঠাকুর? গরিবের ছেলে, গায়ে-গতরে খেটেই তো খেতে হবে।
— হুম, তা তো বটেই। তা কী কাজ করে তোর ছেলে?
— তাঁতঘরে গো ঠাকুর। তাঁত চালায়। একটা লোককে এক জোড়া তাঁত চালাতে হয়।
— সে কী রে? একটা লোক দুটো তাঁত?
— ওরা ঠিক পারে গো ঠাকুর।
— তা ছেলে রোজগেরে হয়েছে, এবার বিয়ে দিবি তো?
— এই আপনাদের আশীর্বাদে এবার দেবো। জমিটা ছাড়িয়ে নিই। এই শীতে চালায় নতুন বিচুলি দিয়ে ঘরদোর একটু সারিয়ে নিয়ে তারপর…
আজ সকাল-সকাল বউকে সঙ্গে নিয়ে কোমরে সাদা কাপড়ের থলি গুঁজে ঘোষালবাড়িতে হাজির হয়েছে নিতু। থলিটা যে বেশ ভারী, তা একপলকেই দেখে বুঝেছে সত্যচরণ। তার মানে মালকড়ি ভালোই জমেছে নিতুর।
ব্যাজার মুখে মাটিতে তাদের বসতে বলে সত্যচরণ। নিজে চৌকির ওপর বসে খাতায় মন দিয়েছে।
বংশী ঘরে এসে বলল, “ছোটঠাকুর, কলকেতা থেকে কারা যেন এয়েচে। একটু দেখা করতে চায়।”
— কলকাতা থেকে এত সকালে? কারা রে বংশী?
— কী জানি ঠাকুর! তবে দুটোই কমবয়সি ছোঁড়া।
— কমবয়সি? তা আমার সঙ্গে আবার কী দরকার?
— হ্যাঁ গো ঠাকুর, ওই মেজখোকাদের বয়সি হবে।
বংশীর কথাটা শুনে কপালে ভাঁজ পড়ল সত্যচরণের। নিতুর দিকে তাকিয়ে বলল, “শোন নিতু, দেখছিস তো কলকাতা থেকে লোক এসেছে। তোর হিসেবটাও আমি শেষ করতে পারিনি রে। তুই বরং এক কাজ কর, পরশু সকালে আয়। আমি হিসেব-নিকেশ সব করে রাখবখন।”
মুখটা শুকিয়ে গেল নিতু আর তার বউয়ের। চোখ দুটো ছোটো করে নিতু বলল, “ঠাকুর, কত টাকা আর দিতে হবে জানতে পারলে ভালো হত গো।”
— শোন নিতু, আর ম্যালা দেরি করিস না। তুই পরশু সকালে আয়, তোর সবকিছু করে দেব। এখন লোক এসেছে, এরপর আবার আড়তে বেরোতে হবে। তুই এখন যা।
মুখ ভার করে বেরিয়ে যায় নিতু। পিছনে তার বউ।
দুটো অল্পবয়সি ছেলে হাত জোড় করে নমস্কার করল সত্যচরণকে। চোখের ইশারায় চৌকির একদিকে তাদের বসতে বলল সত্যচরণ। দুজনের চেহারাটা একবার ভালো করে দেখে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তা তোমাদের তো ঠিক চিনলাম না বাবা। আসছ কোথা থেকে?”
“আজ্ঞে, আমরা শিয়ালদার মিত্তিরবাবুর মেসবাড়িতে থাকি। কানাইও আমাদের ঘরের বাসিন্দা,” একজন উত্তর করল।
সত্যচরণের মুখ দেখে বোঝা গেল, এমনই একটা উত্তর সে প্রত্যাশা করছিল। বলল, “হুম। তা কী হয়েছে কানাইয়ের? শরীর-টরির ঠিক আছে তো?”
— না না, শরীর-টরিরের ব্যাপার নয়।
— তবে?
— ওই কানাই আসলে…
— কী হল? তোতলাচ্ছ কেন, বলো। কানাইয়ের কী হয়েছে?
প্রথমজন চুপ থাকায় দ্বিতীয়জন বলল, “মানে, কানাইকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। কাল রাতে তিনজন দেশি পুলিশ সঙ্গে নিয়ে একটা গোরা পুলিশ এসেছিল মেসে। মন্মথদা আর কানাইকে ধরে নিয়ে গেছে। আজ মনে হয় কোর্টে তুলবে। ফৌজদারি।”
— মানে? কী বলছ? পুলিশ কেন?
— জ্যাঠামশাই, আমরা তো ঠিক জানি নে। কাল রাতে পুলিশ এসে যখন নিচের তলায় মিত্তিরবাবুর সঙ্গে কথা বলছিল, মন্মথদা ঠিক সন্দেহ করে কানাইকে তড়িঘড়ি ডেকে নিয়ে ছাদের ওপর উঠে গিয়েছিল। পেছনের লোহার সিঁড়ি বেয়ে পালিয়ে যাবার সময় হাতে-নাতে ধরে ফেলে পুলিশ।
বিস্ময় আর রাগে ঠোঁট দুটো কাঁপতে লাগল সত্যচরণের। জিজ্ঞেস করল, “এই মন্মথটা আবার কে?”
প্রথমজন বলল, “শুনেছি তো আরামবাগের দিকে কোথায় যেন বাড়ি। এটুকু জানি, উনি রাজনীতি করেন। অবশ্য আমাদের ঘরে নয়, তিনতলায় থাকতেন।”
দ্বিতীয়জন বলল, “জ্যাঠামশাই, ওই মন্মথদার সঙ্গে কিন্তু কানাইয়ের বেশ ভাবসাব আছে। তবে কী নিয়ে কথাবার্তা হয়, আমরা ঠিক জানি নে।”
— তা তোমরা কী করো?
“আজ্ঞে, আমরা কানাইয়ের সহপাঠী। রিপন কলেজেই পড়ি,” প্রথমজন বলল।
বেশ উত্তেজিত হয়ে সত্যচরণ ডাকল বংশীকে। বলল, “বড়োখোকাকে একবার ডেকে আন। বল, এক্ষুনি আসতে।”
শম্ভুচরণ কোর্টে বেরোনোর জন্য তৈরি হচ্ছিল। বাবার তলব শুনে চলে এসেছে বৈঠকখানায়। সকাল-সকাল কানাইয়ের সহপাঠী দুই তরুণ ট্রেনে চেপে শিয়ালদা থেকে বজবজে নেমে এতটা পথ উজিয়ে এসেছে বন্ধুর খবর নিয়ে।
হয়তো পুলিশের থেকেও খবর আসবে বেলায়। কিন্তু তার আগেই দুই তরুণের এই বন্ধুপ্রীতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ঘটনার বিস্তারিত শোনে শম্ভুচরণ। তাদের জলখাবারের ব্যবস্থা করতে বলে বংশীকে।
আদিনাথ ও শশীভূষণ, কানাইয়ের দুই সহপাঠীকে সঙ্গে নিয়ে আজ ফিটনে চড়েছে শম্ভুচরণ। গ্রামের লোকের কাছে এ দৃশ্য বেশ অপরিচিত। প্রতিদিন আয়েশ করে আস্ত ফিটনে চেপে একাই কলকাতায় যায় ব্যারিস্টার শম্ভুচরণ। আজ দুজন অপরিচিত তরুণকে তার সঙ্গী হতে দেখে সবাই একটু অতিরিক্ত কৌতূহল নিয়েই তাকায়।
সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করে না শম্ভুচরণ। সঙ্গী তরুণদেরও বলা আছে, তাঁদের এখানে আসার উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ে যেন কারও কাছেই কিছু না বলে। অবশ্য গ্রামের লোক সাহস করে তেমন কিছু যে তাঁদের জিজ্ঞেস করবে না, সে বিষয়ে একরকম নিশ্চিতই ছিল শম্ভুচরণ।
এতটা পথ যেতে যেতে শম্ভুচরণ জানার চেষ্টা করে ভাইয়ের গতিবিধি। মন্মথর পরিচয়, তার কাজকর্ম, কানাইয়ের সঙ্গে তার মেলামেশার বিষয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শুনতে চায় শম্ভুচরণ। বোঝার চেষ্টা করে পুলিশি ধরপাকড়ের কারণ।
(চলবে)


