সলিল সমাধি

সলিল সমাধি

রাজীব বরা

রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে নাজিরা মহাবিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।রাজীব বরা সাহিত্যের বিভিন্ন বিভাগে নিজ প্রতিভার পরিচয় দানে সমর্থ হয়েছেন।তিনি একাধারে কবি,সমালোচক,গল্পকার,ঔপন্যাসিক এবং প্রাবন্ধিক।বর্তমান অসমিয়া কবিতার জগতে রাজীব বরা একটি অতি সুপরিচিত নাম।কাব্যগ্রন্থগুলি যথাক্রমে ‘তটিনী তীরর খেলা’,’ঢেউ’,’মানুহ চেরাই বাচি থকা নাযায়’,’মাউরর দিন’,এই ফালেও কবি আছে’।মৌলিক প্রবন্ধ সংকলন ছাড়াও সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘চিন্তা-পরিক্রমা’,’অসমিয়া আরু কথা সাহিত্যর আভাস’ ইত্যাদি।আলোচ্য উপন্যাস ‘সলিল সমাধি’ (‘জলজাহ’)মাখন হাজরিকা স্মৃতি উপন্যাস পান্ডুলিপি প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হয়। এছাড়াও শ্রীবরা বিভিন্ন পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। ]

১৯৫৮ সনে অসমের নগাঁও জেলার যমুনামুখে বাসুদেব দাসের জন্ম হয়।১৯৮২ সনে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্বে এম এ করেন। আজ পর্যন্ত অসমিয়া অনূদিত গল্পের সংখ্যা পাঁচশত পঞ্চাশটির ও বেশি।সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে নিয়মিত ভাবে অসমিয়া গল্প,কবিতা,প্রবন্ধ এবং উপন্যাস অনুবাদ করে চলেছেন।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপরিচিত সংস্থা NEINADএর পক্ষ থেকে অসমিয়া ভাষা-সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারের জন্য Distinguished Life Membership এর দ্বারা সম্মানিত করা হয়।প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশটি।হোমেন বরগোহাঞির অসমিয়া উপন্যাস ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’(সওদাগরের পুত্র নৌকা বেয়ে যায়) বাংলা অনুবাদের জন্য ২০২৪ সনের সাহিত্য আকাদেমি অনুবাদ পুরস্কারে সম্মানিত হন।

গর্জে উঠল জলের বাঘ


আগেররাতেই গিয়ে রাস্তায় চালা তৈরি করে নেওয়া বুধিরামের রাতটা অবসর নেওয়ার মতো সময় হল না।গোধূলিতে কাংকান গাছের ডাল কেটে খুঁটি পুঁতে প্রস্তুত করা উনুনে রান্না করা ভাত একমুঠো খেয়ে গ্রামের অন্যান্য যুবকদের সঙ্গে জল গড়িয়ে যাওয়া জায়গায় বস্তার ঠেকা দিয়ে সেও কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।পরে যখন রাস্তাটা ছিন্ন হয়ে গেল সেই ব্যস্ততা আরও বেড়ে গেল।গাছে ডাল,বাঁশের জেং এনে ছিন্ন রাস্তা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে যাওয়া রাক্ষসী স্রোতকে যখন আটকানোর বারবার ব্যর্থ চেষ্টা করা হল তখন অসহায় হয়ে চেয়ে থাকা ছাড়া আর অন্য কোনো উপায় ছিল না।


বাড়িতে রেখে আসা দাদা-বৌ্দির সঙ্গে ভাইপো ভাইঝিদের নিয়েও যে তার চিন্তা হচ্ছে না তা নয়।বাড়ি ছেড়ে রাতেই চলে আসার সময় সে তাদেরকেও অনুরোধ করেছিল।কিন্তু তখনও রাস্তাটা ছিন্ন হয়নি বলেই বোধহয় দামোদর কিছুটা ইতস্তত করেছিল-বুধিরামও দাদার রাস্তায় না আসার কারণ সেটাই বলে ধরে নিয়েছিল।পরে জলের বর্ধিত স্রোত রাতের মধ্যেই রাস্তাটাকে ছিন্ন করে ফেলায় একবার গিয়ে ওদেরকে নিয়ে আসার কথা সে যে ভাবেনি তা নয়।কিন্তু স্রোতের বেগ ক্রমশ বেড়ে চলায় তার সাহস হয় নি।তারমধ্যে কেউ একজন তাকে বাধাও দিল-রাতের বেলা না গিয়ে সকালে সুর্যের আলোতে ওদের নিয়ে আসার পরামর্শ দিল।


সে দাদাদের নিয়ে আসার জন্য নৌকার কাছটিতে এসেছিল,তখনই ছিন্ন রাস্তায়,মানুষের ভিড়ে হইচই শুনে ফিরে গেছে।নামঘরের প্রধান খুঁটিটা দুইহাতের মতো নিচে বসে যেতে দেখে,হা-হুতাশ করতে থাকা মানুষগুলির মধ্যে সেও গিয়ে যোগ দিল।পরে হঠাৎ বাড়িতে রেখে আসা দাদাদের কথা তার পুনরায় মনে পড়ল।


ভিড়ের মধ্যে ঢুকে থাকা কলাইকে চিৎকার করে সে বলল-‘চল বৌ্দিদের নিয়ে আসি গিয়ে।নামঘরটার চিকগুলি কিছুটা হলেও স্রোতে ভেসে আছে।সেগুলি ভেসে গেলে আমাদের ঘরগুলি ভেসে যেতে তিলমাত্র সময় লাগবে না।আমার কথা শুনে ওরা গতকাল চলে এলে ভালো হত।এখন স্রোতের বেগ বেড়ে গেছে।তা সত্ত্বেও যেতে হবে।’


ছিন্ন রাস্তা থেকে তার এবং দাদার বাড়িটা সোজাসুজি যদিও সেখানে এখন সোজা যাবার শক্তি তার নেই।স্রোত নৌকা টেনে নিয়ে ছিন্ন রাস্তায় ফেলবে।ছিন্ন রাস্তা থেকে সরে এসে একপাশ দিয়ে গিয়ে হলিরামের বাগানের পাশ দিয়ে দাদার উঠোনে গিয়ে হাজির হবে।–বুধিরামের পরিকল্পনায় সমর্থন জানিয়ে কলাই সজোরে নৌকার দাঁড় বৈঠা চালাতে লাগল।বুধিরাম গুড়ি বৈঠায় খামচে ধরল।


সোজা না গিয়ে পাশ দিয়ে এগিয়ে গেলেও ছিন্ন রাস্তার দিকে বয়ে চলা স্রোতের জোর খুব।স্রোত যেন বৈঠা কাঁপিয়ে ওদেরকে সাবধান করেছিল।–দেখবি বাবা,উজানমুখে যেতে নৌকা স্রোতের ধারে পাথালি দিলে আর রক্ষা নেই।রাস্তা থেকে কেউ একজন চিৎকার করল-‘ঐ বুধিরাম কোথায় যাচ্ছিস?’


‘দামোদর কাকার পরিবার থেকে গেছে।আনতে যাই।’বুধিরামের পরিবর্তে কলাই নৌকা থেকে চিৎকার করে উত্তর দিল।
দুটো পালোয়ানের বৈঠার কোবে নৌকা গিয়ে একসময় দামোদরের বারান্দার কাছে পৌছে গেল।আগে থেকেই গুছিয়ে রাখা জিনিসপত্র কলাই আর বুধিরাম মিলেমিশে নৌকায় তোলার ব্যবস্থা করল।কয়েকটা টিনও পাথালি করে নৌকায় রাখা হল।সোহাগী মেয়েদের নিয়ে নৌকায় উঠল।নৌকা ছেড়ে দিতে বুধিরামের থেকে হাল নিয়ে দামোদর বলল-‘দেখি বৈঠাটা আমাকে দে।স্রোত বেশি।আমি হাল ধরব।’


ইচ্ছা ছিল না যদিও বৈঠাটা দিয়ে বুধিরাম নৌকার একটা পিড়িতে বসল।বাকি মাঝের দুটি পিড়িতে মেয়েদুটি বসল।মা এবং অন্য মেয়েটি নৌকার তলায় পেতে নেওয়া পিড়ি দুটিতে বসল।কলাই বারান্দার খুঁটিতে চাপ দিয়ে নৌকার সামনেটা ঠেলা দিয়ে স্রোতে ভাটার মুখী করতেই সোহাগী কৃ্ষ্ণ কৃ্ষ্ণ বলে স্রোতের এক গণ্ডূষ জল মাথায় নিল।


হলিরামের বাগানের যে সংকীর্ণ পথ দিয়ে ওরা পার হয়ে এসেছিল এই পথ দিয়ে নৌকা পথে বেয়ে যেতে অসুবিধা হল। পাথালি করে নৌকায় পেতে আনা টিন গুলির জন্য সেই সংকীর্ণ পথে নৌকা পার হতে পারে না। তাই বাগানের বেড়ার এক প্রান্ত দিয়ে নৌকাটা পার করে নিতে হল। এরকম করতে গিয়ে নৌকাটা একেবারে ছিন্ন রাস্তার একেবারে স্রোতের মুখে না পড়লেও তার ধারে কাছে নিয়ে যেতে বাধ্য হল।


‘বৈঠা ভালোভাবে ধরবি। স্রোতে টানলেও গোড়াটা সোজা করে রাখবি।’-বুধিরামের পরামর্শের প্রতি সায় জানিয়ে দামোদর বলল–’চিন্তা করবি না। স্রোতের ধার ঐ দূরে আছে।’


তবে নৌকাটা কিছুটা এগিয়ে যাবার পরে ছিন্ন হয়ে যাওয়া অভিমুখী স্রোতের ধারে পড়ল। চোখের সামনে বইতে থাকা স্রোত আর জলের নিচের স্রোত এক নয়–একথা বোঝার আগেই স্রোত নৌকাটাকে এভাবে টানল যে কলাইর দাঁড় বৈঠার কোব, গুড়িয়াল দামোদরের বৈঠার পাক এবং বুধিরামও হঠাৎ নৌকায় থাকা লগীর সাহায্য করতে চাওয়া নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নৌকাটা কাঁপতে শুরু করল। স্রোতের টানে নৌকাটা সম্ভাব্য বিপদের দিকে এগিয়ে গেল–ছিন্ন পথের মুখের দিকে।


দাদার দিকেই তাকিয়ে বুধিরাম চিৎকার করে উঠল–’গুড়িটা সোজা করে ধর। সোজা করে রাখ। স্রোতে নৌকাটাকে পাথালি হতে দিবি না।’কী করবে না করবে বুঝতে না পেরে দাদার হাত থেকে বৈঠাটা কেড়ে নিতে নৌকা স্রোতের টানে পাথালির দিকে এগিয়ে চলল।কলাই প্রাণপণে সোজা করার চেষ্টা করল।বুধিরামও নৌকার গতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করল। নৌকা এগিয়ে যেতে থাকল–ওদের নিয়ন্ত্রণ মেনে নয়, স্রোতের গতিতে তাল রেখে। নৌকা গিয়ে নামঘরের পাশের পথে থাকা একটা চালতা গাছে আটকে রইল।


জলে ডুবে থাকা গাছটিতে আগে থেকেই কচুরিপানার স্তূপ জমা হয়েছিল, তার মধ্যে নৌকাটা পাথালিভাবে আটকে যাওয়ায় নৌকার গায়ে স্রোতের ধাক্কা আরও বেড়ে গেল। উপর্যুপরি স্রোতের চাপে নৌকাটা একপাশে কাত হয়ে যেতে লাগল। জলের প্রবল স্রোত নৌকায় ঢুকে নৌকাটিকে ডুবিয়ে ফেলতে চেষ্টা করতেই ওজন কমানোর জন্য কলাই এবং বুধিরাম নৌকা থেকে লাফিয়ে জলে পড়ল।


বেশি সময় লাগল না, কিছুক্ষণের মধ্যেই নৌকা পাশ ফিরল–উপুড় হয়ে পড়ল। সোহাগীর সঙ্গে মেয়েরাও এবং বুধিরাম স্রোতের জলে পড়ল। জলে ডুবল। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, কিছু কিছু জলের স্রোতে ভেসে গেল। ভারীগুলি জায়গাতেই তলিয়ে গেল।


রাস্তা থেকে ঘটনাটা দেখতে থাকা মানুষগুলি চিৎকার করতে লাগল। কাংকান এবং কলাইয়ের স্ত্রী চম্পা নিজের নিজের মানুষ দুটিকে ভেসে আসতে দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে আকাশভেদী চিৎকার করতে লাগল।


স্রোতের মধ্য দিয়ে সাঁতরে আসা বুধিরাম এবং কলাইয়ের উদ্দেশ্যে কেউ চিৎকার করে উঠল–ভয় কর না। ভয় করো না। ঘূর্ণিপাক থেকে বাঁচতে চেষ্টা কর। যেমন ভাবেই হোক মাথা বের করে রাখ। জলের নিচে যাবি না।’


প্রাণের মমতায় স্রোতের সঙ্গে বাঁচার জন্য সংগ্রাম করা ওরা দুজনের কানে সেই উপদেশ পরামর্শ প্রবেশ করল কিনা বোঝা গেল না। তীরের মানুষগুলি দেখল–কলাই এবং বুধিরামের প্রায় পাশাপাশি ভেসে চলেছে নৌকাটা এবং একহাতে নৌকাটা ধরে দামোদর সাঁতরে চলেছে। এরকম অবস্থায় জল থেকে মাথাটা তুলে সে চিৎকার করছে–’তোরা আমার চিন্তা বাদ দে। মেয়েদের বাঁচা। স্ত্রীকে বাঁচা।’


তড়িৎ গতিতে কেউ দুটো চৈ নিয়ে এল। ছিন্ন রাস্তায় পৌঁছানোর আগেই বুধিরাম এবং কলাইর দিকে এগিয়ে দিল। সেটাতে ধরে কোনোরকমে ওরা দুজন তীরে উঠে পড়ল। নৌকাটা ধরে ধরেই নিরাপদে দামোদর ও ছিন্ন রাস্তাটার মাঝখান দিয়ে পার হয়ে গেল। কেউ নৌকা বেয়ে যেতে থাকা তাকেও রাস্তায় তুলে আনল।


কিন্তু মেয়ে তিনটি এবং সোহাগী? নেই। মানুষগুলি ছিন্ন রাস্তায় সামনে পিছনে মাঝখানে সব দিকে খুঁজে দেখল–নেই, কল কল করতে থাকা জলের স্রোতেও তো ওরা ভেসে আসেনি। তাহলে তো সর্বনাশ! ডুবে গিয়েছে। ডুবে গিয়েছে। দামোদরের স্ত্রীর সঙ্গে মেয়ে তিনটিও জলে ডুবে গেছে?


রাস্তায় অপেক্ষা করতে থাকা মানুষগুলোর মধ্যে কোলাহল শোনা গেল। কেউ ইস ইস করল। কেউ চিৎকার করল। কেউ চিৎকার করে কান্না শুরু করে দিল। আবার কেউ জলের উপরে চোখ পিটপিট করে খুঁজে বেড়াতে লাগল–কে জানে হয়তো দেখতে পাওয়া যাবে। ছিন্ন রাস্তার সামনে পেছনে, অনেকদূর পর্যন্ত তাকিয়ে থাকা মানুষগুলোর মধ্যে হাহাকার লেগে গেল। চারজন মানুষ চোখের সামনে ডুবে গেল? অভাবনীয় কথা।


তখনই মানুষের দলের মধ্যে কোনো একজন ছিন্ন রাস্তার সামনে থাকা চালতা গাছের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে উঠল–’দেখ। চালতে গাছটার দিকে তাকা।’


সেদিকে তাকিয়ে সবাই দেখে কি–দামোদরের ছোটো মেয়ে জয়া গাছের ডগায় বেয়ে একটা ডাল জড়িয়ে ধরে কাঁপছে। বাকি মেয়েরা?


জলের স্রোত কোবাতে থাকা চালতা গাছের একটা ডালের সামনেটা ধরে কেউ একজন স্রোতের বিপরীতে লড়াই করছে। তার পায়ে ধরে একজন এবং তার পায়ে ধরে আর ও একজন। যেন স্রোতে সাঁতরাতে থাকা একটি প্রকাণ্ড দীর্ঘ সাপ। স্রোত পাগল করা ভেজা চুলে মাথা তুলে মাঝেমধ্যে নিঃশ্বাস নিয়ে সাঁতরে থাকা ওদের কয়েকজনের মধ্যে ডালটা খামছে ধরা হাতটা বড়ো মেয়ে মধুমিতার। সেই হাতটা ছেড়ে দিলেই সর্বনাশ।


সাহস দিতে দিতে নৌকা মেলে যাওয়া ছেলেগুলি যখন ওদের চারজনকে উদ্ধার করে আনল ততক্ষণে দুজনের জল খাওয়া পেটে নিঃশ্বাস স্বাভাবিক ছিল না। কয়েক ঢোক জল পেটে গেলেও অবশ্য ভয়ার্ত পরিস্থিতিতে পড়া বিপর্যয় তিনজনকে বেশি কাবু করে ফেলেছিল।


সেই অবস্থাতে ও সোহাগী জিজ্ঞেস করছিল–’তোদের বাবা কোথায়? বাপ কোথায়? পাশে এসে দাঁড়ানো দামোদর কথা বলায় সোহাগী আশ্বস্ত হয়েছিল যদিও প্রশ্নবোধক চাহনিতে ওদের ঘিরে থাকা দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেছিল–‘বুধিরাম এবং কলাই ?’
‘ওরাও বেঁচে গেছে’-কে যেন উত্তরটা দিয়েছিল! তার উষ্ণতা উপভোগ করার সোহাগীর সময় হল না। হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠে রাস্তার কাছে গিয়ে সে চিৎকার করতে লাগল–‘নৌকাটা কোথায়? নৌকায় থাকা জিনিসপত্র গুলি? আর বাক্সটা,বাক্সটা কোথায়?’


‘সেটাতো আমাদের চোখের সামনেই ডুবে গেছে।বাক্সটা ভেসে গেছে না জলে তলিয়ে গেছে কে জানে?না, মানুষগুলি বাদ দিয়ে কোনো জিনিস বাঁচানো যায়নি।’মধুমিতার কথা শেষ হতে না হতে ‘হায় আমার পোড়া কপাল’বলে কপালে একটা চাপড় মেরে সোহাগী অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল।


বাক্সটা চলে যাওয়া মানে জীবনের সর্বস্ব যাওয়া নতুন কনে হয়ে আসার সময় আনা সোনার গহনা কয়েক পদ, দুই মেয়ের তোলনী বিয়ের সময় ধার করে গড়ে যাওয়া গলার কানের সোনা রুপোর গয়না, সঞ্চিত রূপো টাকা-পয়সা সমস্ত কিছুই চলে গেল। গেল গেল সব কিছুই চলে গেল।


চিৎকার করে কান্নাকাটি করে বিবশ হওয়া সোহাগীর চিৎকারে ঘিরে থাকা সমব্ মহিলাদের মধ্যে কেউ কেউ নিজেরাও কেঁদে উঠল। মুখ থেকে যেন সান্তনার ভাষা হারিয়ে গেছে। তথাপি সান্তনা দেওয়া যায়।যদিও প্রত্যেকেই জানে –বুঝানোতে পেট ভরে না, ঘা শুকোয় না, ব্যথা কমায় না। হারানো সম্পদ ফিরে আসে না। তথাপি মানুষ মনোবল ফিরে পাবার জন্য দুঃখী কে সান্তনা দেয়। মৃত্যুতুল্য বিপদ থেকে উদ্ধার পেলেও হারানো পরিবারকে প্রত্যেকেই সান্তনা দিতে থাকল।
তার মধ্যে কাংকান ওদের চালার নিচে নিয়ে গিয়ে মেয়েদের কাপড় বদলানো এবং শুকানোর মন্তব্য করে দিল। পুঁটলি গুলি জলে ডুবে যাওয়ায় অন্য কেউ একজন নিজের ভাগের কাপড় এনে দিল। বাড়িতেও ওদের কাপড়চোপড় রেখে এসেছে। কিন্তু এই বিপর্যয়ের মধ্যে আর কাউকে সেই সমস্ত আনার জন্য পাঠানো উচিত হবে না।গরমের দিন হলেও বর্ষা বন্যায় চট করে গরম উঠে না। নিচে জল থাকলে মাচায় গায়ে নিয়ে শুতে হয়। কা়ংকান চায়ের কেটলিটা বসিয়ে জ্বালিয়ে রাখা চালার নিচের আগুনে মধুমিতা এবং বোন দুটি কাপড় আর গা সেঁকতে লাগল। বর্ষাকালের ঠান্ডায় কাঁপার চেয়ে অন্য এক অজানা কম্পন ওদের কাঁপাচ্ছিল। শ্রাবনের দিনেও যেন সেই কম্পন ছিল পৌষ মাসের শীতের মতো। মেঘলা আবহাওয়া এবং বন্যার শীতলতার চেয়ে মনের শীত ছিল বেশি শীতল।


সময় প্রায় দুপুর হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পথের পাশে চালাগুলির নিচ থেকে ভেজা খড়ি জ্বালানোর ধোঁয়া বেশি করে বের হচ্ছিল। ভেজা চালের গন্ধ বের হচ্ছিল।মানুষগুলির অলিতে আসা এক রাত অতিক্রান্ত হয়েছে। রেশনের ব্যবস্থাও হয়নি।
কেউ যদি চাল-ডাল ও বাড়িতে রেখে আসতে বাধ্য হয়ে থাকে তাদের আত্মীয়স্বজনরা দুই একদিন দেখাশোনা করবে। পরে কী হবে সেটা আলাদা কথা। প্রাণ ধরণের জন্য পেটে কোনো মতে কিছু একটা দিতে পারলেই হল। এখানে মুখরোচকের কথাটা অবান্তর।


অন্য সময়ে মাছের প্রচুর প্রাচুর্য থাকলেও বন্যায় ঘরবাড়ি, খাল-ডোবা কিছু ডুবিয়ে ফেলায় মাছ ধরায় খুব একটা সুবিধা থাকে না।জাল ফেলার ও সুবিধা থাকে না।হঠাৎ আগত বন্যার গ্রাসে পড়া গ্রাম গুলিতে দিনরাত পেট ভরানোর চেয়ে প্রাণ বাঁচানোটাই যখন কঠিন হয়ে ওঠে তখন আহারাদিতে সুখ বিলাসের প্রশ্নই উঠে না ।


সেইসব তখন অবান্তর হয়ে পড়ে। না,হাড়ি গুলিতে অন্য সময়ের মতো মাছের ছটফটানির আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল না। অনেকের হাড়ি থেকে ভাত ছাড়া মলঙা ডাল সিদ্ধ করার গন্ধ ভেসে আসছিল।ছিন্ন রাস্তাটার প্রান্তে মাথায় কপালে হাত দিয়ে বসে থাকা দামোদরকে কিছু একটা মুখে দেবার জন্য বারবার জোর করে কা়ংকান এবং সোহাগী হেরে গেল। সোহাগীর নিজেরও যেন ক্ষুধা- তৃষ্ণা নাই হয়ে গেছে।


মেয়েদের অন্য কেউ দেখাশুনা করছে। বুধিরাম তৈরি করা চালাটিকে ওরা সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। বিপদ সবাইকে এভাবে চেপে ধরেছে–কে কাকে দেখবে, প্রত্যেকেরই অবস্থা প্রায় একরকম। বাড়ি-ঘর, জিনিস-পত্র, ফেলে এসে প্রাণের মমতায় রাস্তায় রয়েছে।তথাপি জলে পড়ে মৃত্যুর মুখ থেকে উদ্ধার পাওয়া মানুষ হিসেবে জনগণ ওদের প্রতি যতটুকু সম্ভব তা করে চলেছে। লোকগুলি বুঝতে পেরেছে দামোদরের পরিবারটির বিপর্যয় অন্যদের তুলনায় বেশি, প্রাণেখন ও বেঁচে গেলেও ওরা হারিয়েছে জীবনের সম্বল–সমস্ত সঞ্চয়।


ছিন্ন রাস্তার প্রান্তে দামোদর বসে আছে। দেশের উষ্ণতায় ধুতি এবং গেঞ্জি শুকিয়ে গেছে। মাথায় বেঁধে রাখা গামছাটা জলে পড়তেই ভেসে গেল। মেজ মেয়ে বুলু মা কাকিমার সঞ্চয় থেকে অন্য একটি এনে দিয়েছে। সেটাই মাথায় জড়িয়ে সে চুপ করে বসে আছে। মাঝে মাঝে ছেড়ে আসা বাড়িটাকে দেখছে। দূর থেকেই গোয়ালঘর এবং ভাঁড়ারটার অবস্থা বোঝার চেষ্টা করছে।


মাঝেমধ্যে তার এরকম মনে হয়–স্রোতের চাপে ভাঁড়ার ঘরটা এবং গোয়াল ঘরটার কম্পন বেড়েই চলেছে। কোনো এক সময় যেন দুটিই ভেঙ্গে চুরে ভেসে যাবে। ইতিমধ্যে রামধন ,হরিরাম এবং নোমল কাকুদের ভাঁড়ার ঘর ছাড়া ও ছিন্ন রাস্তার সামনে থেকে কয়েকটি বাড়ি স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। মানুষগুলি রাস্তায় পাগলের মতো এদিক ওদিক করে বেড়াচ্ছে। কেউ কাউকে বোঝাতে না পারা অবস্থা। কেউ কাঁদছে।কপালে চাপড় মেরে মেরে অদৃশ্য দেবতাকে অভিশাপ দিচ্ছে।
ছিন্ন রাস্তার অন্যপ্রান্তে আলির উদ্দেশ্যে ছেলে মেয়ে নিয়ে আসা দেউরামের নৌকা ডুবে গেছে। স্রোতে বড়শির টোপের মতো উপর-নিচ করতে থাকা তার লে মেয়েদের কেউ একজন নৌকা বেয়ে উদ্ধার করেছে। পরিবেশ এরকম হয়েছে যে চিৎকার চেঁচামেচি এবং হইচই সৃষ্টি হলেই আভাস পাওয়া যায় যে কোথাও কিছু একটা অঘটন ঘটেছে।


দামোদর ভাঁড়ার এবং গোয়ালঘর থেকে চোখ সরাতে পারছে না। দুটিই কখন ভেঙ্গে পড়ে ঠিক নেই। ভাঙলে সে কি করবে সেটাও জানে না। মরতে চলা মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে পাহাড় দেওয়ার মতো অবস্থা–বাঁচাতে ও পারে না, ছাড়তেও পারে না। আর অবস্থা ও তথৈবচ–দেখেও কিছু করতে পারো না; না দেখেও থাকতে পারে না।ঘর ভেঙ্গে ভেসে এলেও কিছু করার ক্ষমতা তার নেই।


স্রোতে টিকতে না পেরে গোয়ালঘরটা ভেঙ্গে ভেসে এসে ছিন্ন রাস্তায় মাঝখানে ঘূর্ণিপাকে পড়ে যখন তার সামনে দিয়ে পার হয়ে গেল দামোদরের শরীরের কম্পন বৃদ্ধি পেল। গোয়ালঘরটা গেল যদিও ভাঁড়ারটা বেঁচে গেলেই যদিও ভাঁড়ারটা বেঁচে গেলেই হয়। সে মনে মনে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানাল।


ইতিমধ্যে তার জীবনের সম্বল গুলির সিংহভাগ সকালবেলাতেই নৌকা ডুবে জলে ভেসে গেছে। গতবছর নতুন ভাঙ্গা চাষ করে দশ কুইন্টাল সরষে পেয়েছিল। তা বিক্রি করে মধুমিতার বিয়ের জন্য জমিয়ে রাখা কয়েকটি রুপোর টাকা, কয়েক পদ থালা-বাসন, গয়না পত্র সবই গেল। সম্পত্তি বলতে আর বেঁচে থাকল কি? যদিও মানুষের জীবনটাই আসল সম্পত্তি–বিজ্ঞ লোকেরা বলে।


সেও যে জানে না তা নয়। কিন্তু জীবনটা বাঁচিয়ে রাখার জন্য ভাতের মুঠির প্রয়োজন। ভাড়ারটা যদি ভেসে যায়! না তার জীবনের ভবিষ্যৎ ভালো নয়। ভাঁড়ারে থাকা সঞ্চিত ধানটুকু ভেসে গেলে না খেয়ে মরতে হবে। এ নিয়ে সে আর বেশি চিন্তা
করতে পারল না। মাথাটা কেমন যেন করতে লাগল।সে ভয়ে ভয়ে কাঁপতে থাকা ভাঁড়ারটার দিকে তাকিয়ে রইল।
সময় পার হয়ে যাচ্ছে। তার মনে হল বন্যার জল যেন গাধৈটাকে ডুবিয়ে ফেলছে।


ভাঁড়ারটা স্রোতে কাঁপছে। হয়তো কাঁপছে না। মাটির গভীর পর্যন্ত পোঁতা এবং মজবুত কাঠের খুঁটিগুলিকে জল হেলাতে পারবে কি? না, সম্ভবত হেলবে না। কথাগুলো সে ভাবছে না নিজের চোখে দেখছে–কিছুই বুঝতে পারছে না।
হয়তো হেলে পড়েছে। খুঁটি হেলে পড়ে ভাঁড়ার ঘরের চাল দুটি চাপিয়ে রাখা গছি ধানের মুঠিগুলির ওপরে খসে পড়েছে। সেটা এখন ভেসে থাকা ভেলার মতো দেখাচ্ছে।স্রোত ওটাকে নাড়িয়ে চলেছে। জলের এত জোর। খুঁটি গুলির সঙ্গে ভাঁড়ারের চালাটা ধরে রাখা পিলারগুলির দীর্ঘদিনের সম্পর্ক শূন্য হয়েছে। আর তাই ভাঁড়ারটা এখন ভেলার মতো হয়ে বিভিন্ন জায়গাটার মুখে, তারদিকে ভেসে আসছে।—সেটা স্বপ্ন না বাস্তব। তার দুর্ভাবনা নাকি সত্যি! ব্যাপারটা বুঝতে না বুঝতেই সে শুনতে পেল সোহাগীর প্রাণ কাতর চিৎকারটা–’ঐ গেল…গেল ঐ গেল। ভাঁড়ারটা গেল…।’


অসহায়। সে চরম অসহায়। হ্যাঁ, ওই যে ভাঁড়ারটা ভেসে আসছে। জীবনটা ঘূর্ণিপাকে পড়েছে। ধরার উপায় নেই। বাঁচানোর সামর্থ্য নেই। তার ভেতরে ঢুকে থাকা অন্য একটি মানুষ যেন তাকে মনে মনে বলছে–’কিছু একটা কর। গেলেই গেল। ভাঁড়ারটা বাঁচা। ভাঁড়ারটা বাঁচা। ভাঁড়ারটা ধর। ভাতের মুঠি ধর।’ তারপরে সে কী করল নিজেরই মনে নেই। যখন বুঝতে পেরেছে ততক্ষণের সে ভাঁড়ারের চালের উপরে। অথৈ জলধির মধ্যে।

( চলবে )

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

একজন ‘সাতচল্লিশের শিশুর কাহিনী’-র স্রষ্টা সাহিত্যিক তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর পথযাত্রী …সৃষ্টির শেষ রহস্য, ভালোবাসার অমৃত”- নবনীতা দেব সেন “…সৃষ্টির শেষ রহস্য,ভালোবাসার অমৃত”- নবনীতা দেব

Read More »

১৪ : ঊর্ণনাভ

ঊর্ণনাভ ১ : ঊর্ণনাভ ২ : উর্ণনাভ ৩ : ঊর্ণনাভ ৪ : ঊর্ণনাভ ৫ : ঊর্ণনাভ ৬ : ঊর্ণনাভ ৭ : ঊর্ণনাভ ৮ : ঊর্ণনাভ

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

একজন ‘সাতচল্লিশের শিশুর কাহিনী’-র স্রষ্টা সাহিত্যিক তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর পথযাত্রী …সৃষ্টির শেষ রহস্য, ভালোবাসার অমৃত”- নবনীতা দেব সেন “…সৃষ্টির শেষ রহস্য,ভালোবাসার অমৃত”- নবনীতা দেব

Read More »

১৪ : ঊর্ণনাভ

ঊর্ণনাভ ১ : ঊর্ণনাভ ২ : উর্ণনাভ ৩ : ঊর্ণনাভ ৪ : ঊর্ণনাভ ৫ : ঊর্ণনাভ ৬ : ঊর্ণনাভ ৭ : ঊর্ণনাভ ৮ : ঊর্ণনাভ

Read More »

ভারতের উৎসব : ঋতুচক্র, কৃষি ও সমাজ

ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ – নবকুমার দাস ১ : সিন্ধু–সরস্বতী থেকে গঙ্গা ২ : সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতার সমকালীন সর্বভারতীয় স্রোতধারা ৩ : বেদের বাণী থেকে পৌরাণিক ভারত

Read More »