ধ্রুপদী সাহিত্য
শ্যামলকৃষ্ণ বসু
১১
দশরথের পুত্র কামনা
[ সর্গ ৮-১০ ]

রাজা দশরথ অনেক তপোনুষ্ঠান করেছিলেন। কিন্তু এ যাবৎ তাঁহার কোন পুত্রলাভ হয় নাই। রাজা দশরথ অতএব কুলগুরু বশিষ্ট্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলেন নৈমিষারণ্যে তাঁর আশ্রম কুটিরে।
বশিষ্ঠদেব। ইনি মিত্রাবরুণের পুত্র। ইনি দশজন প্রজাপতির অন্যতম। ইনি ব্রহ্মার সপ্ত মানসপুত্রের অন্যতম। সপ্তর্ষির এক ঋষি। সূর্যবংশের তিনি গুরু এবং রাজপুরোহিত এবং তিনি ছিলেন রাজা দশরথের একজন অন্যতম মন্ত্রী।
বশিষ্ট্যদেব সাদর অভ্যর্থনা করলেন রাজাকে। – ‘ আসুন রাজন । আসুন । সব কুশল তো?’
রাজা দশরথ অভিবাদন করলেন বশিষ্ট্যদেবকে এবং বললেন, ‘ গুরুদেব আপনার আশীর্বাদে রাজ্যের সব কুশল।‘
বশিষ্ট্যদেব বললেন, ‘ আপনার রাজ্য এখন তবে বারিধারা স্নাতা হয়েছে। রাজ্যবাসী সকলে আনন্দিত হয়েছেন । রাজ্যবাসী সকলে আপনার গুনগান মুখর হয়ে উঠেছেন । এ বড়ই আনন্দ সংবাদ ।’
রাজা দশরথ তখন শনিদেবের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের বিবরন এবং পক্ষীরাজ জটায়ুর অদ্ভুত আশ্বাস এর কথা ও জ্ঞাপন করলেন।
বশিষ্ট্যদেব স্মিতহাস্যে বললেন , ‘ রাজন ,এ বড় অদ্ভুত সংবাদ। সব ঈশ্বরের ইচ্ছা। ‘
রাজা দশরথ বলে ওঠেন, ‘গুরুদেব, আপনার কাছে আজ আমার আগমন আমার আত্মিক আহ্বানে ।’
বশিষ্ট্যদেব মৃদু হেসে বলে উঠলেন, ‘সে বিষয়ে আমি অবিজ্ঞাত নহে রাজন। সে আপনার পুত্রকামনার্থে। আপনার অন্তরাত্মা পুত্রকামনায় অধীর হয়ে রয়েছে। পক্ষীরাজ জটায়ুর আশ্বাসে আপনি আর ও অধিক আশান্বিত হয়ে পড়েছেন। ধৈর্য ধরুন রাজন ! ‘
রাজা দশরথ চমৎকৃত হয়ে বলে উঠলেন,‘ আপনি অন্তর্যামী ! গুরুদেব, আমি তাই ছুটে এসেছি আপনার কাছে ।’
গুরুদেব এর নিকট রাজা দশরথ মনপ্রান দিয়ে পুত্রকামনা জ্ঞাপন করলেন।
বশিষ্ট্যদেব স্মিতহাস্যে একদৃষ্টে রাজা দশরথের দিকে তাকিয়ে থাকেন এবং বলে ওঠেন, ‘ রাজন , অধীর হবেন না। আপনি এখন আশ্রমের আতিথ্য গ্রহন করুন এবং বিশ্রাম নিন। আমি সন্ধ্যাকালে আমার যজ্ঞ আসনে ধ্যানাসনে বসব । আপনার সাথে অবসরে কথা হবে।’
রাজা বললেন; ‘ যথা আজ্ঞা গুরুদেব !’
এইবার বশিষ্ট্যদেব উঠে গিয়ে আচমনান্তে তাঁর আসনে গিয়ে বসলেন এবং ধীরে ধীরে ধ্যানস্থ হলেন।
রাজ দশরথ আশ্রমে প্রসাদ গ্রহন করলেন। পরম আশ্বাসে তিনি বিশ্রাম নিলেন।
পরদিবস প্রাতে বশিষ্ট্যদেব রাজা দশরথকে সামনে বসিয়ে তাঁর ধ্যানযোগে আহৃত এক অদ্ভুত সংবাদ রাজাকে বললেন এবং এক গভীর আশ্বাস দিয়ে বলে উঠলেন, ‘ শুনুন রাজন ! ধ্যানযোগে আমি অবগত হলাম , স্বয়ং নারায়ন আপনার ঘরে জন্ম নেবেন। আপনি পুত্রেস্টি যজ্ঞ করুন।’
রাজা দশরথ আশ্চর্যান্বিত হলেন। তিনি যেন তাঁর শ্রবণকে বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না।
বশিষ্ট্যদেব বলেন, ‘ এই তপোনুষ্ঠানে আপনি একজন কোন পুন্যাত্মা ঋষিকে যজ্ঞের হোতা করুন।’
রাজা বললেন , ‘ যথা আজ্ঞা গুরুদেব।’
রাজা দশরথ অতএব রাজ্যে ফিরে এলেন এবং তিনি মহামন্ত্রী সুমন্ত্রকে আহ্বান করে আনলেন । মহামন্ত্রী সুমন্ত্র, যিনি কোশল রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী এবং যিনি রাজা দশরথের চির অনলস সেবক এবং সখা ও সচিব এবং তাঁর রথের সারথী ও তিনি।
রাজার আহ্বানে মহামন্ত্রী সুমন্ত্র এবার এসে দাঁড়ালেন রাজা দশরথের নিকট এবং বললেন, ‘বলুন মহারাজ , কি আপনার আদেশ ? ‘
রাজ দশরথ বললেন, ‘ মহামন্ত্রী সুমন্ত্র, আমি একটি তপোনুষ্ঠান করতে ইচ্ছা করি। এই তপোনুষ্ঠান আমার পুত্রকামনা যজ্ঞ হেতু! আমি এই তপোনুষ্ঠানের আলোচনায় পাত্র মিত্র অমাত্য সকলকে নিয়ে আলোচনায় বসতে অত্যন্ত অভিলাষী। ‘
সুমন্ত্র বললেন, ‘যথা আজ্ঞা মহারাজ ! আমি আপনার রাজ্যের শুভচিন্তক ব্রাহ্মণগণ মুনিগন পাত্র মিত্র অমাত্যগন সকলকে আপনার ইচ্ছা অনুসারে আহ্বান করে আনছি।’ ’
তারপর এক শুভদিনে রাজার শুভচিন্তক ব্রাহ্মণগণ মুনিগন পাত্র মিত্র অমাত্যগন সকলে রাজসভায় এসে জমায়েত হলেন।
মুনিবর সুযজ্ঞ, জাবালি ,কশ্যপ ,গৌতম , দীর্ঘায়ু, এবং মার্কণ্ডেয় ও কাত্যায়ন এবং অযোধ্যা রাজ্যের দুই প্রধান পুরোহিত বশিস্ট ও বামদেব প্রভৃতি ব্রাহ্মনগন ও রাজসভায় এসে উপস্থিত হলেন।
মহামন্ত্রী সুমন্ত্র আগত সকল সভাবাসীকে বললেন, ‘ সভাসদ্গন, মহারাজা দশরথ এর ইচ্ছায় আজ আমরা আপনারা সকলে এই সভাগৃহে মিলিত হয়েছি। আজ এখানে আমি একটি বিশেষ কথা আপনাদের বিজ্ঞাপিত করতে ইচ্ছা করি । সভাসদগন আপনারা অনুধাবন করুন। মহারাজা দশরথ একটি তপোনুষ্ঠানের আয়োজন করতে ইচ্ছা করেছেন। ‘
সকল সভাসদগন ধ্বনি তুললেন , ‘ সাধু সাধু সাধু ।’
মহামন্ত্রী সুমন্ত্র বললেন,‘ এই তপোনুষ্ঠান আমাদের প্রিয় মহারাজার পুত্রকামনা যজ্ঞ হেতু। আপনারা সকল সভাবাসী রাজার এই যজ্ঞ কি রূপ অনুমোদন করেন আপনারা বলুন ?’
রাজা দশরথের অভিলাষ শুনে তাঁরা আনন্দে বলে উঠলেন, ‘মহারাজ, আপনার যখন এই ধর্মবুদ্ধি হয়েছে তখন আপনি পুত্রলাভে কখনোই বঞ্চিত হবেন না। রাজন, আপনি এক অশ্বমেধযজ্ঞ আরম্ভ করুন ! ‘
রাজা দশরথ হাতজোড় করে বলে উঠলেন, ‘ যথা আজ্ঞা মান্যবর আপনাদের ! আমি তবে অশ্বমেধ যজ্ঞ করতে অনুরুদ্ধ হলাম।’
এইবার প্রধানমন্ত্রী সুমন্ত্র রাজাকে বললেন,‘মহারাজ, আমি আপনাকে এক মন্ত্রণা অবশ্যই প্রদান করব। আপনি যদি অশ্বমেধ যজ্ঞর পরে পুত্রেস্টি যজ্ঞ করেন তা অবশ্যই ফলপ্রদ হবে।’
পাত্রমিত্র অমাত্য সকলেই হর্ষ সহকারে মন্ত্রীবরের সুমন্ত্রণা অনুমোদন করলেন;‘ সাধু সাধু সাধু। এ এক অত্যন্ত আনন্দের কথা।‘
অতঃ অযোধ্যানরেশ তাঁর মন্ত্রিগণকে বলে ওঠেন,’ মন্ত্রিগন, আপনারা তবে কিরূপে সে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা যায় তার একটা সুচারু বন্দোবস্ত করে ফেলুন।’
এক্ষনে মুনিবর বশিস্ট বললেন,‘ আপনি যজ্ঞের উপকরন সম্ভার আহরন করার আদেশ প্রদান করুন।
রাজা বললেন , ‘ যথার্থ ! আমি যজ্ঞের সমুদয় সম্ভার আহরন করতে আদেশ দিলাম।’
বামদেব বললেন, ‘ আপনি যজ্ঞের অশ্ব দেশে দেশে প্রেরন করুন।’
রাজা বললেন, ‘ আমি অবশ্যই যজ্ঞের নিমিত্ত আমার প্রিয় অশ্ব দেশে দেশে প্রেরন করতে আদেশ দিলাম।’
মহর্ষি গৌতম বললেন, ‘ মহারাজ, আপনি সরযূ তীরে যজ্ঞভূমি নির্মাণ করতে আদেশ করুন।’
রাজা দশরথ এইবার তাঁর মন্ত্রীবর্গকে সরযূ তীরে যজ্ঞভূমি নির্মাণ এর সকল আয়োজনের আজ্ঞা দিলেন। – ‘ মন্ত্রীগণ আপনারা তবে সরযূনদীর তীরে উত্তমস্থান নির্বাচন করে যজ্ঞভূমি নির্মাণ এর বন্দোবস্ত করে ফেলুন। আমি রাজকোষ হতে প্রয়োজনীয় অর্থ মঞ্জুর করে দিতে অনুরোধ করব মহামন্ত্রী সুমন্ত্রকে।’
সভাস্থ সকলে বললেন , ‘সাধু সাধু ! ‘
তবে প্রশ্ন এই যে, কে এই পুত্রার্থ যজ্ঞের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করবেন ? কে হবেন এই যজ্ঞের প্রধান হোতা ? এ এক গুরুতর প্রশ্ন। এ প্রশ্নের সমাধান অসম্ভব। রাজার সভায় এত জ্ঞানী গুণী ঋষি মুনিরা ও আছেন। তারা কেউ কি রাজ হিতার্থে এমন এক পুত্রেষ্টি যজ্ঞের হোতা হতে পারেন না? মহর্ষি গৌতম, কশ্যপ মুনি, বশিষ্ঠ মুনি, ব্রহ্মর্ষি সুযজ্ঞ, জাবালা সকলে মিলে এক গুরুতর আলোচনায় বসলেন।
ঋষিবর কশ্যপ বললেন, মহারাজ আমরা আপনার যজ্ঞ অনুষ্ঠানের সার্বিক ক্রিয়াকর্ম সম্পন্ন করব। তবু একজন ঋষির কথা আপনাকে বলব। তিনি হলেন মুনি ঋষ্যশৃঙ্গ। বিভান্ডক মুনির পুত্র। হরিণীর উদরে তার জন্ম। তার মাথায় হরিনের মত দুটি শিং বর্তমান। তাই তার নাম ঋষ্যশৃঙ্গ।’
রাজা দশরথ সেই কথা শুনে কিঞ্চিত চিন্তিতভাবে বলে ওঠেন,‘ কিন্তু আমার জিজ্ঞাস্য, তিনি কেন? আমার রাজ্যে আপনারা সব ব্রহ্মবিদ বেদবিৎ ঋষিবর্গ থাকতে কেন তবে সেই ঋষ্যশৃঙ্গ মুনির প্রয়োজন ?‘
বশিস্টদেব বললেন, ‘রাজন, অবধান করুন। ঋষ্যশৃঙ্গমুনি যিনি তিনি অতি নির্লোভ, জিতেন্দ্রিয়, সর্বোপরি একজন বেদবাক্যবিৎ। আপনি তাঁকে আপনার এই অশ্বমেধ যজ্ঞের হোতা করুন। আপনার বন্ধু রাজা লোমপাদের রাজ্যে তাঁর অবস্থান। বয়সে তিনি নিতান্ত বালক। কিন্তু যোগে তিনি যোগীবর।’
রাজা দশরথ তার সভার সুচিন্তক সব মুনি ঋষিদের বাক্যে পরম হর্ষ লাভ করলেন এবং কিঞ্চিৎ ভেবে বললেন, ‘এ আপনাদের অতি উত্তম প্রস্তাব। বেশ, আমি এ বিষয়ে নিশ্চয় তবে ভেবে দেখব।’
রাজা দশরথ সকলকে আরব্ধ কর্ম সম্পাদনের আদেশ দিলেন। এইবার মন্ত্রী সকলে রাজসভা হতে বিভিন্ন কার্যে নির্দেশিত হয়ে চলে গেলেন। সকলেই প্রায় সেই বিশাল যজ্ঞভূমি নির্মাণ কার্যে, এবং প্রশস্ত রাজপথ, নুতন তোরন আদি প্রস্তুত করতে এবং অতিথিবর্গের জন্য অতিথিশালা, পশু সকল রাখার জন্য পশুশালা, এবং সেই বিরাট যজ্ঞের জন্য বিশাল রন্ধনশালা ইত্যাদির প্রস্তুতি শুরু করতে নিয়োজিত হলেন। এ ও প্রায় এক বিরাট সময়কালের কাজ।
রাজা দশরথ এক্ষনে মন্ত্রীবর সুমন্ত্রকে বললেন,‘ সুমন্ত্র , আমি মুনি ঋষ্যশৃঙ্গের সবিশেষ ইতিহাস জানতে ইচ্ছা করি। আমাকে বলুন ‘কে ইনি? তিনি নিতান্ত বালক ঋষি। আমি কোনমতেই অনুধাবন করে উঠতে পারছি না, যদি তিনি নিতান্ত বালক হয়ে থাকেন তবে সেই সঙ্গে তিনি একজন যোগী ঋষি কি ভাবে সম্ভব ?’
সুমন্ত্র বললেন,‘ মহারাজ, আমি আপনাকে সমস্ত সংবাদ শীঘ্রই অবগত করার চেষ্টা করব।’
রাজা দশরথ এবার তাঁর মন্ত্রীগনকে সকল রকম আয়োজনের জন্য আজ্ঞা দিলেন। প্রধানমন্ত্রী সুমন্ত্র এক্ষনে বশিষ্ট জাবালি বামদেব প্রভৃতি ব্রাহ্মনদের আহ্বান করলেন যজ্ঞাদি ব্যবস্থার সম্পন্ন করতে। ব্রাহ্মনগন সকলে মিলে রাজা দশরথকে যজ্ঞের উপকরনাদি এবং অন্যান্য যাবতীয় সম্ভার আহরনের কথা বললেন। তখন মন্ত্রীগন অশ্বমেধের প্রয়োজনে রাজা দশরথকে তাঁর সব থেকে প্রিয় কোন অশ্বকে অশ্বশালা থেকে এবার মোচন করার অনুরোধ জানালেন।
রাজা দশরথ এক্ষনে কিঞ্চিৎ দ্বিধান্বিত। সব অশ্বই তো দশরথের খুব প্রিয়। তন্মধ্যে প্রিয় ওই যে পিঙ্গল বর্ণ অম্বর। ওই ঘোড়া যে অনেক যুদ্ধের সাক্ষী। দেবাসুরের যুদ্ধে অম্বর যে পরাক্রম দেখিয়েছিল সে তো ভোলার নয়। দৈত্যকুলের ছোঁড়া ভীষণ মুদ্গরকে এড়াতে রাজা দশরথকে নিয়ে অম্বর এক পাহাড়ী টিলা হতে অন্য পাহাড়ি টিলায় যে অসম সাহসিকতায় লাফ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সে তো ভোলার নয়। আজ সেই প্রিয় অশ্বকে অশ্বমেধ যজ্ঞের কারনে মুক্ত করে দিতে হবে।
দশরথ পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন সেই প্রিয় অশ্বের কাছে। অম্বর রাজাকে দেখে উৎফুল্ল হ‘ল। অশ্ব যেন তাঁর দৃষ্টি দ্বারা রাজাকে স্নেহ প্রদর্শন করে ওঠে। রাজা দশরথ তাঁর প্রিয় অশ্ব অম্বরের গায়ে হাত বোলালেন। তাঁর ঘাড়ের ঘন কেশরাজিতে হাত দিয়ে আদর করলেন। অশ্ব তাঁর হ্রেষা ধ্বনিতে রাজার প্রতি তাঁর আনুগত্য প্রকাশ করে ।
রাজা দশরথ এইবার তাঁর প্রিয় অশ্বকে আদর করে ডাকলেন, ‘অম্বর, প্রিয় অশ্ব আমার, আজ হতে তুমি মুক্ত। আমার যজ্ঞের কারনে আজ আমি তোমাকে জয়টিকা পরিয়ে দেশ জয়ের জন্য নির্বাচন করলাম । যাও অম্বর তুমি রাজা দশরথের জয়গাঁথা প্রচার করে ফিরে এসো ।’ – এবং ভালো করে অম্বরের গাত্র মর্দন করে অশ্বপালকের হাতে এগিয়ে দিলেন।
ভৃত্যগন সেই অশ্বকে গাত্র মার্জনা করে স্নান করালেন। মহারানী কৌশল্যা সেই অশ্বকে উত্তম খাদ্য নিজ হস্তে খাওয়ালেন। অন্য দুই রাণী ও অশ্বটিকে যথেষ্ট সেবা করলেন।
অতঃ সেই অশ্বকে অশ্বমেধ যজ্ঞের কারণে এবার মোচন করা হল। সেই অশ্বর কপালে একটি ফলকে লিখে দেওয়া হল এই মর্মে, ‘মহাপরাক্রমী ত্রিভুবন বিজয়ী রাজা দশরথের এই প্রিয় অশ্ব যজ্ঞবাসনা হেতু মুক্ত এবং অবধ্য ও অনাক্রমণীয়।’ অশ্বমেধের ঘোড়াকে অশ্বশালা হতে এইবার সম্পূর্ণ মুক্ত করে দেওয়া হল। সেই অশ্ব একটি বৎসর দেশের যথা ইচ্ছা তথা ভ্রমন করবে। অশ্বের নিরাপত্তা এবং দেখাশোনার জন্য তাঁর সঙ্গে থাকবে রাজার বেশ কয়েকজন সৈন্য এবং প্রহরী। অবশেষে একবৎসর পরে সেই ঘোড়াকে রাজ্যে ফিরিয়ে আনা হবে , অশ্বমেধ যজ্ঞের তেমনই নিয়ম।
তবে যদি কেউ কোন ভাবে সেই অশ্বকে অধিকার করার চেস্টা করেন, তখন সেই দুঃসাহসী জনের সাথে অশ্বমেধ যজ্ঞকারি রাজার সৈন্যরা যুদ্ধ করবে এবং সেই অশ্বকে বন্দীদশা থেকে মোচন করে আনবে। অশ্বমেধের ঘোড়া ছেড়ে দেবার এক বৎসর পরে যজ্ঞের জন্য দীক্ষা নিতে হয় যজ্ঞবাসনাকারী যজমানকে। অশ্বমেধের এই ঘোড়া একদিন রাজ্যে ফিরে আসবে। যজ্ঞকালে সেই অশ্বকে খড়্গাঘাতে বধ করে সেই অশ্বের বশা নিয়ে যথা শাস্ত্র হোম আদি করে সেই বশার ধূম তখন প্রধান যজ্ঞকারী যজমান আঘ্রান করবেন। ঋত্বিকগন সেই অশ্বের সমস্ত অংগ অগ্নিতে আহুতি দিবেন। একেই বলে অশ্বমেধ যজ্ঞ। এই অশ্বমেধ যজ্ঞের প্রস্তুতি সে এক বিশাল আয়োজন।
অশ্বমেধ যজ্ঞ বৈদিক ধর্মের শ্রৌত ঐতিহ্য অনুসারে গুরুত্বপূর্ণ রাজকীয় যজ্ঞ অনুষ্ঠান গুলির অন্যতম। সেইকালে রাজন্যবর্গ তাদের সাম্রাজ্যর সার্বভৌমত্ব নতুনত্বকরণের জন্য এই বৈদিক যজ্ঞের আয়োজন করতেন। সাম্রাজ্যের প্রসার, ক্ষমতার সম্প্রসারন এবং রাজপদের গৌরব অর্জন তথা প্রতিবেশী সাম্রাজ্যের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন ছিল এই যজ্ঞের উদ্দেশ্য।
অতঃ ব্রাহ্মনগন রাজা দশরথের নিকট পবিত্র সরযূ নদীর তীরে এক সুন্দর যজ্ঞভূমি নির্মাণ করার আবেদন রাখলেন। সপ্ততীর্থ মথুরা হরিদ্বার বারাণসী অযোধ্যা উজ্জ্বয়িনি দ্বারকা এবং কাঞ্চি গড়ে উঠেছে সরযূ নদীর তীরে তীরে। সেই পূণ্যসলিলা সরযূর তীরে হবে যজ্ঞ ভূমি। সে তো অতি উত্তম কথা।
রাজা দশরথ তার সভার সুচিন্তক সব মুনি ঋষিদের বাক্যে পরম হর্ষ লাভ করলেন এবং বললেন, এ আপনাদের অতি উত্তম প্রস্তাব। বেশ আমি এ বিষয়ে ভেবে দেখব। সকলে চলে গেলেন।
রাজা দশরথ এবার তাঁর মন্ত্রীবর্গকে সকল রকম সুষ্ঠু আয়োজনের ব্যবস্থা করতে আদেশ দিলেন।
[আদিকান্ড ১]
১২
ঋষ্যশৃঙ্গের উপাখ্যান
[ সর্গ ৮-১০ ]
মন্ত্রীবর সুমন্ত্র এইবার মহারাজা দশরথকে একদিন নির্জনে সাক্ষাৎ পেয়ে নিবেদন করলেন,‘ মহারাজ আপনি মুনি ঋষ্যশৃঙ্গের যে সংবাদ জানতে চেয়েছিলেন তা আমি সবিশেষ জ্ঞাত হতে পেরেছি।’
রাজা দশরথ উৎসুক হয়ে বললেন , ‘উত্তম । কি সে সংবাদ , শুনি !’
সুমন্ত্র বললেন, ‘ আমি আপনাকে সনৎকুমারোক্ত যে পুরাণ কথা শুনেছি সে কথাই নিবেদন করছি। মহারাজ, কশ্যপতনয় যিনি, বিভান্ডক মুনি তিনি। তাঁর এক পুত্র আছেন। তিনি ঋষ্যশৃঙ্গ নামে খ্যাত। বয়সে তিনি বালক মাত্র । তবে তিনি একজন বেদবাক্যবিত। ‘
দশরথ বলেন, ‘ বেশ !’
সুমন্ত্র বললেন ,‘ একবার অঙ্গদেশে এক ভয়ংকর অনাবৃস্টি হয়। সেই অনাবৃস্টি রোধ করতে রাজা লোম্পাদ তাঁর মন্ত্রীদের পরামর্শে কৌশলে ঋষ্যশৃঙ্গকে অঙ্গরাজ্যে এনে নিজকন্যা শান্তার সঙ্গে তাঁর বিবাহ দেন। এই ঋষ্যশৃঙ্গই হয়ত আপনার মনস্কামনা পূর্ণ করতে পারবেন। ইনি একজন মহাসিদ্ধ যোগী।’
দশরথ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কিন্তু মন্ত্রীবর, কৌশল অবলম্বন করার কি অর্থ ? ‘
সুমন্ত্র বললেন, ‘ মহারাজ , সে এক ইতিহাস। তখন এক ভীষণ অনাবৃষ্টি কাল। রাজা লোম্পাদ তাঁর রাজ্যে অনাবৃস্টি নিয়ে ভীষণ চিন্তিত ছিলেন। অনাবৃস্টির সবিশেষ কারণ তাঁর রাজ্যের একপ্রান্তে বসবাসকারী মুনি বিভান্ডকের অদ্ভুত এক কঠিন তপস্যা ! সেই তপস্যা ছিল দেবরাজ ইন্দ্রের ইন্দ্রত্ব হরণ করে নেবার দুর্দমনীয় তপস্যা। ‘
রাজা দশরথ জিজ্ঞাসা করে ওঠেন, ‘ ইন্দ্রত্বহরন? অহো, এ তো তবে দেবরাজ ইন্দ্রের সঙ্গে কশ্যপতনয় বিভান্ডক মুনির এক বিচিত্র অহংদ্বন্দ্ব ?’
সুমন্ত্র বলেন,‘যথার্থই মহারাজ। সে এক মহা অহংদ্বন্দ্ব দুই যুযুধানের। তাই অঙ্গরাজ্যের প্রধান পুরোহিত তখন রাজা লোম্পাদকে সবিশেষ পরামর্শ দিলেন, ‘ মহারাজ, আমার কথা রাখুন ! আপনি বিভান্ডক মুনির পুত্র ঋষ্যশৃঙ্গকে বিশেষ কৌশলে হরণ করে এনে রাজ্যের মধ্যে লুকিয়ে রাখুন। কারন ওই ঋষ্যশৃঙ্গমুনির পিতা বিভান্ডক দেবরাজ ইন্দ্রের ইন্দ্রত্বহরনের জন্য মহাতপস্যায় বসেছেন । আর তাই দেবরাজ ইন্দ্র এই অঙ্গরাজ্যে বর্ষণ করছেন না।’
অঙ্গরাজ্যের মন্ত্রীবর বললেন,‘ মহারাজ, পুরোহিত মহাশয়ের এই সুযুক্তি অবশ্যই গ্রহনযোগ্য । মহাতপস্বী বিভান্ডক এর সঙ্গে দেবরাজ ইন্দ্রের ইন্দ্রত্বহরনের প্রকট মনোমালিন্যের কারণে এই অঙ্গরাজ্য এখন এক মহাঅনাবৃস্টির কোপে পতিত হয়ে আছে। বিভান্ডক মুনি পুত্রকে ভীষণ নজরে রাখেন। পুত্রের অভাবে তবে নিশ্চই তখন বিভান্ডক মুনির মনঃসংযোগ ভঙ্গ হবে এবং তখন অনায়াসেই তাঁর তপঃ প্রভাব নস্ট হতে পারবে।’
রাজা লোম্পাদ তখন নিজ রাজ্যে সেই অনাবৃস্টি বন্ধ করতে বালক মুনি ঋষ্যশৃঙ্গকে কিভাবে বিশেষ কৌশলে হরণপূর্বক অঙ্গরাজ্যে নিয়ে আসা যায় সেই কথাই তাঁর মন্ত্রীদের সঙ্গে পরামর্শ করতে বসলেন !’
‘মন্ত্রীগন এবং অমাত্যগন, আমার কথা শুনুন, রাজ্যের পুরোহিত এবং মন্ত্রীবরের পরামর্শে এই অঙ্গরাজ্যে, এই ঘোর অনাবৃস্টি বন্ধ করতে বালকমুনি ঋষ্যশৃঙ্গকে বিশেষ কৌশলে হরণপূর্বক অঙ্গরাজ্যে নিয়ে আসা যাক ! মুনি বিভান্ডক এবং ইন্দ্রদেবের মধ্যে এই অহংদ্বন্দ আমাদের রাজ্যের সমূহ ক্ষতি ডেকে এনেছে !’ – বললেন রাজা লোম্পাদ ।
অমাত্যগন বললেন,‘ কিন্তু মহারাজ, ঋষ্যশৃঙ্গ, চৌদ্দবৎসরের বালক মাত্র। তিনি বনে বাস করেন তাঁর পিতা বিভান্ডকের সঙ্গে। তিনি মাত্র তপস্যা ও বেদ অধ্যয়ন করেন। তিনি জাগতিক ভোগসুখ কিছুমাত্র অবহিত নহেন। ‘
রাজা লোম্পাদ বললেন, ‘ বেশ, তবে নগরের সকল রূপবতী কলাবতী নটীগনকে উত্তম বেশভূষা অলংকারে সুসজ্জিত করে পাঠানোর আদেশ দিন ওই বালক ঋষ্যশৃঙ্গ মুনিকে সাদরে ভুলিয়ে নিয়ে আসতে আমাদের অঙ্গরাজ্যে।’
মন্ত্রীগন বললেন,‘ মহারাজ, কিন্তু তিনি নারী সম্বন্ধে অনভিজ্ঞ। একমাত্র মনুষ্য যা চায় তেমন চিত্ত উন্মাদক ইন্দ্রিয়ভোগ্য পদার্থে ওই বালক মুনিকে প্রলোভিত করে তবেই তাকে এই নগরে নিয়ে আসার চেস্টা করা যেতে পারে এবং তা অবশ্যই তাঁর পিতা বিভান্ডকের সম্পূর্ণ অজ্ঞাতে এবং , এবং সে ও তাঁর কোপদৃস্টির প্রকৃত আড়ালে।‘
রাজা লোম্পাদ বললেন,‘বেশ,আপনারা তাই করুন। নগরের সকল রূপবতী কলাবতী রঙ্গবতী নটীগনকে উত্তম বেশভূষা অলংকারে সুসজ্জিত করে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন ওই বালক ঋষ্যশৃঙ্গ মুনিকে সাদরে ভুলিয়েভালিয়ে তুলে নিয়ে আসতে এই অঙ্গরাজ্যে। ‘
লোম্পাদ রাজার আদেশে তবে তেমনই আয়োজন সম্পন্ন হল। রাজ্যের যতেক রূপবতী কলাবতী রঙ্গবতী নগর নটীগণ ঋষ্যশৃঙ্গ মুনিকে সাদরে ভুলিয়ে নিয়ে আসতে সঙ্গে গেল এবং তাঁবু কানাত গাড়ী জুড়ি নিয়ে রাজার অনেক সৈন্যসকল ও ভৃত্যসকল ও তাঁদের সঙ্গে গেলো সেই গভীর বনাঞ্চলে রাজার আদেশে। তাদের সঙ্গে অনেক সুগায়ক এবং কয়েকজন বাঁশুরী বাদক ও সঙ্গে গেলেন। অনেক মিষ্টদ্রব্য ইত্যাদি ও সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হল বালক ঋষির জন্য। তারা সকলে উত্তম খাদ্যাদি সঙ্গে নিয়ে বনের কিনারে গিয়ে ঘাঁটি গাড়লেন ঋষ্যশৃঙ্গ এর সন্ধানে। বিভান্ডক পুত্র ঋষ্যশৃঙ্গকে আকৃষ্ট করতে তাঁরা এইবার এক লোভনীয় গৃহাবাস সাজিয়ে বসলেন।
সে এক ভীষণ উষর মরুপ্রদেশ। সেখানে শুধু দাঁড়িয়ে আছে পাতাঝরা শুকনো বৃক্ষাদি। শুকনো পাতার মর্মর পায়ের নীচে। সেখানে মাত্র রুক্ষপাথর আর টিলা আর পর্বত। বিভান্ডকের তপঃ প্রভাবে সেখানে কোন নারীর প্রবেশের কোন অধিকার নেই। সেখানে মনুষ্য বসতি পর্যন্ত ও কিছু নেই। আছে শুধু দুই শুষ্ক মানব, এক পিতা ও এক পুত্র। মুনি বিভান্ডক এবং তস্য পুত্র ঋষ্যশৃঙ্গ।
রাজার প্রেরিত অনুচরবৃন্দ সকলে সেই অনুর্বর রুক্ষ ভুমিতে তাঁবু বসিয়ে অতঃপর রোজ নৃত্যগীতাদি করেন এবং সুগন্ধি রান্না ইত্যাদি করে পরম ধৈর্যে তাঁরা বালক মুনি ঋষ্যশৃঙ্গের অপেক্ষা করতে লাগলেন। স্থানীয় গ্রামবাসীরা সেখানে এসে ভীড় করে ঠিকই কিন্তু সেই বালক মুনি ঋষ্যশৃঙ্গের আর দেখা মেলে না। সে এক অদ্ভুত প্রতীক্ষা।

একদিন ঋষ্যশৃঙ্গ কৌতুহল বশে চলতে চলতে সেখানে এসে পড়লেন। ঋষ্যশৃঙ্গ বিচিত্রবেশা নারীদের নৃত্যগীত দেখে মুগ্ধ হয়ে এবার সেখানে এসে দাঁড়ালেন এবং জানতে চাইলেন, ’ তোমরা কে ?’
কি অদ্ভুত তাঁর কণ্ঠস্বর ! যেন স্ত্রীলোকের মত রিনরিনে তাঁর কথা। সকলে অবাক হয়ে গেলেন সেই বালক মুনিকে দেখে । তাঁর সরলভাব দেখে সকলে আনন্দিত হলেন। বুঝতে পারলেন ইনিই সেই ঋষ্যশৃঙ্গ। মাথায় দুটি হরিনের শিং। সেই বিচিত্রবেশা নারীরা তখন ঋষ্যশৃঙ্গকে সমাদর করে আপ্যায়ন করলেন। – ‘ আসুন আসুন আসুন ! আমাদের কোলে বসুন। এই মিষ্টদ্রব্য গ্রহন করুন ।’
বিভান্ডক পুত্র ঋষ্যশৃঙ্গ অকুন্ঠিত চিত্তে নটীদের কোলে গিয়ে বসলেন। মিষ্ট দ্রব্য হাতে নিলেন। অমন সব স্বাদিস্ট খাবারের স্বাদে সরল হৃদয় ঋষ্যশৃঙ্গ ভীষণ ভীষণ প্রলোভিত হয়ে পড়লেন। এক্ষনে সকলেই তাঁকে তাঁর পছন্দের জিনিস হাতে তুলে দিতে থাকেন।
ফল বলি হাতে দিল গঙ্গা জলের নাড়ু
জল বলি খাওয়াইল মধু গাড়ু গাড়ু ।
মুনি বলে এই ফল কোথা গেলে পাই
সঙ্গে করে লয়ে গেলে তবে সঙ্গে যাই । [কৃত্তিবাস ]
তখন সকলে ঋষ্যশৃঙ্গ যথা বালক মুনীকে সুস্বাদু কামেশ্বর মোদক খাওয়ালেন। কামেশ্বর মোদক খেয়ে বালক ঋষি এইবার যেন আনন্দে উন্মাদ হয়ে গেলেন।
কন্যাগন বলেন, ‘ মুনিবর খাইলে যত স্বাদিস্ট সন্দেশ,
ইহার অধিক পাইবে চল মোদের দেশ।’ [কৃত্তিবাস ]
বালক মুনি ঋষ্যশৃঙ্গ এত এত জন নারীর সঙ্গ পেয়ে,তাদের কোল পেয়ে, তাদের মধুরবোলে মোহিত হয়ে এবং অমন রসালো খাদ্য পেয়ে তাদের সঙ্গে যেতে আর আপত্তি করলেন না। তাই বালক মুনি আনন্দিত হয়ে বলে উঠলেন, ‘ আমাকে তোমাদের সঙ্গে নিয়ে যাবে ? বেশ আমায় নিয়ে চলো । আমি তোমাদের দেশে যাব !
মুনি ঋষ্যশৃঙ্গ নিরস পিতার সঙ্গে হাঁপিয়ে উঠেছিলেন। তাই এমন রঙ্গরসকারী এমন মোহিনী নারীদের অবাধ সঙ্গ পেয়ে এবং এমন সুস্বাদু মিস্টান্ন আদি পেয়ে ভীষণ সুখী হলেন এবং তাহাদের সঙ্গে আপন ইচ্ছাতেই তিনি চললেন অঙ্গরাজ্যে।
লোম্পাদ শুনিলেন যবে মুনীর আগমন
পাদ্য অর্ঘ্য দিয়া ভজেন মুনীর নন্দন ।। [কৃত্তিবাস]
ঋষ্যশৃঙ্গ অঙ্গরাজ্যে পদার্পণ করলে বিভান্ডক মুনি তাঁকে খুঁজে না পেয়ে হতাশায় ভেঙ্গে পড়লেন। ঋষ্যশৃঙ্গকে বনে বনান্তরে কোথাও না দেখতে পেয়ে বিভান্ডকমুনি এইবার তপশ্চারণে অমনোযোগী হয়ে পড়লেন।
তিনি খুঁজে বেড়ান তাঁর পুত্রকে লোকালয়ে জঙ্গলে । কিন্তু না কোথা ও তাঁকে খুজে পান না। তিনি হতাশ হয়ে পড়লেন।
অন্যদিকে দেবরাজ ইন্দ্রের মনোবাসনা এইবার পূর্ণ হল। তিনি হাসলেন বিভান্ডকের তপঃভঙ্গ হওয়াতে। এইবার তিনি মনের সুখে অঙ্গরাজ্যে ধারা বর্ষণ করলেন।
রাজা লোম্পাদ বালক মুনিকে যথোচিত সৎকার করে নিজ কন্যা শান্তাকে তাঁর হাতে সম্প্রদান করলেন। এই রূপে মহাতেজা ঋষ্যশৃঙ্গ সর্বকামসম্পন্ন হয়ে তখন হতে অঙ্গদেশে বাস করতে লাগলেন।
দশরথ বললেন,‘বেশ, এই তবে ইতিবৃত্ত সেই বালক মুনি ঋষ্যশৃঙ্গের ? ‘
সুমন্ত্র বলেন, ‘ আজ্ঞে মহারাজ । এই সেই কাহিনী বালক মুনি ঋষ্যশৃঙ্গের ! ‘
রাজা দশরথ বললেন, ‘ উত্তম, আমি স্বয়ং অঙ্গরাজ্যে গিয়ে লোমপাদকে অনুরোধ করব যাতে উনি ঋষ্যশৃঙ্গ মুনিকে আমার যজ্ঞের পৌরহিত্য করার জন্য আমার হয়ে সবিশেষ অনুরোধ করেন। বালক মুনিকে আমি স্বয়ং আমন্ত্রন করে নিয়ে আসব।’
মন্ত্রীবর সুমন্ত্র বললেন, ‘ যথার্থ মহারাজ । আপনি নিজে অঙ্গরাজ্যে গিয়ে রাজা লোম্পাদ এর সঙ্গে আলোচনা করে ঋষ্যশৃঙ্গকে আমন্ত্রন করে নিয়ে আসাটাই সমীচীন হবে।‘
রাজা দশরথ বললেন , ‘ যথার্থ মন্ত্রীবর ! বেশ আমি তবে বন্ধুবর রাজা লোম্পাদ এর রাজ্যে গমন করলাম ।
অঙ্গপাদ রাজ্যে রাজা লোম্পাদ এর সদনে রাজা দশরথ পদার্পণ করলেন এবং এইবার তাঁকে নিবেদন করলেন, ‘রাজন , আপনি ঋষ্যশৃঙ্গ মুনিকে যদি আমার হয়ে অনুরোধ করেন আমার পুত্রেষ্টি যজ্ঞ সম্পাদন করতে তবে আমি বড় আনন্দিত হই ।’
লোম্পাদ বলেন , ‘ মহারাজ , আমি আপনার পুত্রেষ্টি যজ্ঞ সম্পাদন হেতু নিশ্চয়ই ঋষ্যশৃঙ্গ মুনিকে অনুরোধ করব ।’
পরদিন রাজ লোম্পাদ ঋষ্যশৃঙ্গ মুনি সকাশে গিয়ে বিনীত ভাবে নিবেদন করলেন, ‘ যোগীবর ? দেখুন কে এসেছেন ? ঋষ্যশৃঙ্গ মুনি আনন্দিত ভাবে তাকিয়ে থাকেন রাজার মুখের দিকে।
অঙ্গরাজ্যের রাজা লোম্পাদ বলেন ,
রাজা দশরথ আইলেন তোমার সদন।
পুত্র যজ্ঞ করিতে রাজা ইচ্ছুক অতি ।
তোমারে রাজা তাই করিছেন আমন্ত্রন।’
হরষিত হন এবে ঋষ্যশৃঙ্গ অতি ।
নিশ্চয়ই করিব যজ্ঞ রাজন তোমার ।।
আপনি আসিয়া মোরে দিলা আমন্ত্রন ,
ঈশ্বর করিবেন তব যজ্ঞের সুসার ।।
আনন্দিত রাজা তবে ঋষ্যশৃঙ্গ লয়ে ,
ফিরিলেন ত্বরা করি অযোধ্যানগরে,
সেথা তবে কর্মকাণ্ড ব্যস্ততা প্রচুর
ঋষ্যশৃঙ্গে আপ্যায়ন করিলেন সমাদরে ।। [স্বরচিত ]
দশরথ ঋষ্যশৃঙ্গকে প্রণাম করে যজ্ঞের প্রধান যাজকরূপে বরন করলেন।
বশিস্ট বামদেব এবং অন্য মুনীগন রাজাকে সাধুবাদ জানালেন।
রাজা দশরথ এইবার ঋষ্যশৃঙ্গ মুনীর নিকট অনুমতি প্রার্থনা করলেন অশ্বমেধ যজ্ঞের প্রারম্ভের শুভক্ষনের।
ঋষ্যশৃঙ্গ মুনী বললেন,’ মহারাজ, আগত বসন্তে যজ্ঞ অতি প্রশস্ত।’-
রাজা দশরথ আশ্বস্থ হলেন। বললেন , ‘যথা আজ্ঞা !’
এমত সময়ে স্বয়ং ইন্দ্রদেব এসে দাঁড়ালেন রাজা দশরথের সমক্ষে !
ইন্দ্রদেবকে উদ্ভ্রান্ত দেখে দশরথ এইবার কুশল জিজ্ঞাসা করেন, ‘কি সংবাদ ইন্দ্রদেব ? আপনাকে কেমন উদ্ভ্রান্ত বোধ হচ্ছে !’
ইন্দ্রদেব বলেন,‘ মহারাজা দশরথ, দৈত্যরাজ সম্বর স্বর্গপুরী আক্রমন করেছে। সে অমরাবতী অধিকার করতে চায় !
আমি আপনার সাহায্যের জন্য আপনার কাছে ছুটে এসেছি। ‘
দশরথ এমত সংবাদ শুনে বড়ই আশ্চর্য হলেন । – ‘ সে কি ! অমরাবতী অধিকার করতে সম্বর এর এত সাহস ?’
ইন্দ্রদেব বললেন,‘রাজা দশরথ, আমি এবং দেবগন প্রবল পরাক্রমে ও তাঁর সাথে জুঝে উঠতে পারছি না। আমি তাই আপনার কাছে সাহায্যপ্রার্থী হয়ে এসেছি। আপনি আমার সহায় হয়ে যদি এই যুদ্ধে যদি যোগ দেন তবে দেবগন স্বস্তি পায়। আমি ব্রহ্মার আদেশে আপনার কাছে এসেছি।’
আমার সহায় হৈয়া যদি কর রণ।
তোমার প্রসাদে তবে বাঁচে দেবগণ।
শুনিয়া ইন্দ্রের কথা দশরথ হাসে।
সম্বরে মারিব আমি তুমি যাও বাসে ॥ [কৃত্তিবাস]
দশরথ বলেন,‘ ইন্দ্রদেব, আমি এই যুদ্ধে আপনার পাশে আছি। আমি নিশ্চয়ই এই যুদ্ধে সম্বরকে প্রতিহত করব। এ আমার অঙ্গীকার।’
ইন্দ্রদেব বললেন , ‘ আমি নিশ্চিন্ত হলাম আপনার আশ্বাসে ।’
দশরথ বললেন, ‘ আপনি ফিরে যান। আমি আমার সৈন্য সামন্ত নিয়ে আপনার সঙ্গে শীঘ্র যুদ্ধে যোগ দিতে আসছি। ’
ইন্দ্রদেব দশরথ বাক্যে নিশ্চিন্ত হয়ে ফিরে গেলেন তাঁর পুরীতে।
রাজা দশরথ এক্ষনে মহামন্ত্রী সুমন্ত্রকে মুনি ঋষ্যশৃঙ্গের যজ্ঞকাল অবধি সার্বিক সেবা আদির সম্পূর্ণ ভার দিলেন।
সুমন্ত্র বলেন, ‘ আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন মহারাজ । ওনার সেবার কোন ত্রুটি হবে না। ’
[আদিকান্ড ১]
১৩
সম্বর যুদ্ধ ও কৈকেয়ীর সেবা
সম্বরের সঙ্গে যুদ্ধের পর রাজা দশরথ এবার এই এতদিনে সুস্থ হয়ে উঠেছেন।
সেই যে ঋষ্যশৃঙ্গ মুনিকে অঙ্গপাদ রাজ্য থেকে নিজের সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন অযোধ্যায়, কিন্তু তারপরে আর তেমন বেশী বার্তালাপের সময় পাননি তিনি তাঁর পরম অতিথি যিনি সেই ঋষ্যশৃঙ্গ মুনির সাথে। অযোধ্যায় ফিরে আসা মাত্রই আবার দেবেন্দ্রদেব ইন্দ্র এসে তড়িঘড়ি রাজা দশরথকে নিয়ে গেলেন ওনার ইন্দ্রপুরীতে। দৈত্যরাজ সম্বর স্বর্গ রাজ্য আক্রমন করে বসে আছেন। এমন যুদ্ধ অবরে সবরে লেগেই আছে দেবাসুরে। ইন্দ্রর পাশে পাল্লা দিয়ে দশরথকে ও যুদ্ধ করতে হয়েছে । আর সে কি একটু আধটু মাত্র সামান্য যুদ্ধ ? সে এক প্রকার অসম যুদ্ধ । দৈত্যকুল যেমন মায়াযুদ্ধ করতে ওস্তাদ তেমনই তাঁরা ছায়াযুদ্ধ ও করে থাকে। দৈত্যগন রাজা দশরথকে এমন আক্রমন করেছিল যে রাজা দশরথ সারা গায়ে অস্ত্রের ঘা নিয়ে একদম বেকাবু হয়ে পড়েছিলেন।
অতঃপর মহারানী কৈকেয়ীর ভীষণ সেবাযত্নে অনেক অনেক দিন পরে আবার সুস্থ হয়ে উঠেছেন তিনি। গায়ের ঘা এবং শরীরের অবসাদ দূর হয়েছে এইবার। রাজা বারংবার রানী কৈকেয়ীর প্রাণঢালা সেবার ভুয়সী প্রশংসা করেন।
কুঁজী বুড়ি কৈকেয়ীকে পরামর্শ দেয় , ‘ এত যে সেবা করলে তা রাজা তোমাকে কোন বর দিলেন না ?’,
কৈকেয়ী অবাক হয়ে বলে ওঠেন , ‘ কি বর চাই রাজার কাছে ? আমার তো কম কিছু নেই !’
কুঁজী একটা ক্রূর হাসি হেসে বলে, ‘ ও মাগো , শোনো কথা বোকা মেয়ের ! এত সেবা করলে , তাঁর প্রতিদান নেই গো রাজার কোনো ! আহা , তুমি না তাঁর প্রিয়া ! হাঃ হাঃ হাঃ ।’
কৈকেয়ীর মনে জ্বালা ধরে কুঁজীর কথায় । এবার তাই জিজ্ঞাসা করে , ‘ কি বর চাই রাজার কাছে বলতো আমায় কুঁজী ?’
কুঁজী বলে , ‘ আহা , সে যখন রাজা চাইবে দিতে বর , তখন না হয় কইব আমি লও তুমি এই বর !
কৈকেয়ী মনে মনে ভাবে , বেশ রাজা যদি কোন বর দিতে ইচ্ছা করেন তখন না হয় কুঁজীকে জিজ্ঞাসা করবেন, কোন বর চাই বল তো কুঁজী ! আগে রাজা বর দেবার কথা না হয় উত্থাপন করুন , তখন দেখা যাবে !
রাজা বেশ সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন । কিন্তু আবার হঠাৎ রাজাকে শয্যাশায়ী করে দিল প্রবল অর্শের বেদনায় ।
রাজবৈদ্য প্রভাকর রাজা দশরথের অর্শের অবস্থা দেখে চমকে ওঠেন এবং বলে্ন, ‘মহারাজ, এ যে নালিঘা। আয়ুর্বেদে একে বিস্ফোট বলে। এ ব্যাথা খুবই অসহ্য।’
রাজা দশরথ আর্তনাদ করে ওঠেন,‘ প্রভাকর, ওঃ এ যে ব্যাথা তো নয়, মরনযন্ত্রণা। একে তুমি শীঘ্র নিরাময় করে দাও। আমি যন্ত্রণায় মরে যাচ্ছি ।’
রাণী কৈকেয়ী পাশে দাঁড়িয়ে সবই দেখছেন। রাজা যে মরণ যন্ত্রনায় ছটফট করছেন। কিন্তু নিরুপায়। তাই তিনি রাজা দশরথকে স্বান্তনা দেন,‘ মহারাজ , ধৈর্য রাখুন। রাজবৈদ্য প্রভাকরের চিকিৎসা ধন্বন্তরীর সমান। আপনি এঁর চিকিৎসায় নিশ্চয়ই সুস্থ হয়ে উঠবেন।’
রাজবৈদ্য প্রভাকর এইবার রাজা দশরথের বিস্ফোটের নিদান দিলেন, ‘ মহারাজ, আমার কথা শুনুন , এই ভীষণ রোগের আরোগ্য হেতু আপনাকে রাজভোগ ছেড়ে রাজবাড়ির পুষ্করিণীর যতেক গেঁড়ীগুগলি এবং শামুকের ঝোল খেতে হবে। নচেৎ এই রোগ আরোগ্য হওয়া একপ্রকার অসম্ভব। আর লজ্জা পরিত্যাগ করে গুহ্যে কাকে ও চুম্বক ধরে রাখতে হবে। তবেই অমন পুঁজ রক্ত মাখা বিশ্রী ঘা তাহলে ক্রমে ক্রমে শুকিয়ে যাবে।’
কি অদ্ভুত নিদান। গেড়ীগুগলি এবং শামুকের ঝোল খেতে হবে ? এ যে এক প্রকার অসম্ভব কোন অনভস্থ্য মানবের পক্ষে। তদুপরি গুহ্যে কাকে ও চুম্বক ধরে রাখতে হবে। সে আর এক নিদারুণ সমস্যা ।
কিন্তু কে এমন অসুস্থ মানুষের সেবা করতে পারে। আর সেও কি না শরীরের অন্য কোন অংশে নয়, সে যে গুহ্যের বিস্ফোট। এমন মরন যন্ত্রণায় স্বামীর এ হেন চরম অসুস্থতা কোন স্ত্রীলোক বসে দেখতে পারে? তাই কৈকেয়ী নিজেকে রাজার সেবায় নিয়োজিত করলেন। তাঁর ভীষণ সেবা দিয়ে রাণীকৈকেয়ী ক্রমে ক্রমে সুস্থ করে তুললেন রাজা দশরথকে। মাস কয়েকের সেবা যত্নে রাজার দুঃখ বিমোচন হল। শরীরের যন্ত্রণার ও উপশম হল। বিস্ফোট শুকিয়ে গেল। কৈকেয়ীর সেবায় রাজা প্রতিকার পেলেন। অনেক অনেক দিন পর রাজা এইবার সুস্থ হয়ে বসেছেন। রাজা বারংবার রানী কৈকেয়ীর প্রাণঢালা সেবার ভুয়সী প্রশংসা করেন।

কৈকেয়ী তোমার অতুলনীয় সেবায় আমি প্রাণ ফিরে পেয়েছি । তুমি কি বর চাও আমাকে বলো !
কৈকেয়ী বলেন, ‘ সে আমি চেয়ে নেবো সময় হলেই যথা কালেই ।’
এক সুন্দর সকালে রসালো আঙ্গুর আর অমৃতময় শরবৎ পান করতে করতে রাজা দশরথ রাণী কৈকেয়ীকে বলে ওঠেন,‘ প্রাণাধিকা প্রিয়তমা রাণী কৈকেয়ী, তুমি আমার যা সেবা করলে তার তুলনা নেই। আমি তোমায় বর দিতে চাই। বলো এক্ষনে তুমি কি বর চাও।’
রাজা দশরথ প্রথমবার দেবাসুরের যুদ্ধের পর আহত হয়েছিলেন। সে বার ও তিনি আহত হয়েছিলেন এবং কৈকেয়ী তখন ও তাঁর যথেস্ট সেবা করেছিলেন। তখন ও সুস্থ হয়ে উঠে রাজা দশরথ রাণী কৈকেয়ীকে বর দিতে চেয়েছিলেন।
কৈকেয়ী তখন কুঁজীকে জিজ্ঞাসা করে এসে রাজার কাছে নিবেদন করেছিলেন, রাজা যে বর দিতে চান, তিনি পরে কখনো সেই বর চেয়ে নেবেন যখন কুঁজী বর চাইতে বলবেন। সরলমনা রানি। প্যাঁচঘোঁচ তিনি বোঝেন কম। পিতৃগৃহের দাসি, কুঁজী বুড়ি, রাণীর শ্বশুর গৃহে এসে ও প্রতি পদে কৈকেয়ীর বুদ্ধিদাত্রী সেবাদাসী। রাজার দুলালী বলে কথা। যদি ও কৈকেয়ী এমন কিছু বালিকা নহেন। তিনি সুন্দরী। তিনি এক প্রাণচঞ্চলা রাণী। তবু ওই একেক জনের একেক রকম। কৈকেয়ী যেন কুঁজী বুড়ির পরামর্শের খাতক।
রাজ বাড়িতে কেউ কুব্জীকে পছন্দ করে না। সে মুখরা। সে বাচাল। সে সর্ব বিষয়ে ঘোর বিজ্ঞ এবং বুদ্ধিনাশা । সর্ববিষয়ে নাশা প্রবেশকারিণী পদে পদে বিঘ্নকারিনী।
মহারাণী কৌশল্যা কুঁজির জন্য এক প্রকার ভয়ে ভয়ে থাকেন। কুঁজীর চরম বিরক্তি সহ্য করেন। তবু তিনি মুখে কখনোই কিছু বলেন না বা প্রতিবাদ করেন না। কারন সে কৈকেয়ীর সেবা দাসী। কোন ন্যায্য কথা বললে ও কৈকেয়ী তুমুল অশান্তি বাঁধিয়ে দিতে পারন সংসারে। এমন কি রাজাকে ও নালিশ করতে পিছপা হন না তিনি। কৈকেয়ীর ভীষণ দেমাক। তিনি সুন্দরী। তিনি রাজার সব থেকে প্রিয়। কৌশল্যাকে কথায় কথায় ঠেস দিতে ছাড়েন না।
রাজা দশরথ বোঝেন সবই। কৌশল্যাকে স্বান্তনা দেন। কৈকেয়ীকে হয়ত বুঝিয়ে বলেন বড় দিদি কৌশল্যার সাথে এই রকম না করতে, ওই রকম না করতে। কৈকেয়ী এক অবোধ বালিকা। সব শুনে বলেন, ‘ বেশ , আর ও রকম বলব না। তবে হ্যাঁ, আমায় যেন কেউ কখনো ঘাঁটায় না।’
দশরথ জানেন কৈকেয়ীকে বোঝানো আর না বোঝানো একই কথা। এই বেশ বুঝল। কিন্তু আবার যে কে সেই । সব সংসারে এই রকমই চলে। এখানে ও তার অন্যথা নয়। আরে তিন বৌ সামলানো সে কি সামান্য মানুষের কাজ ? কিন্তু কৈকেয়ী কিছু অন্যরকম ! সে যেমন অবুঝ বালিকা তেমন ই সেবাপরায়ন !
সেই সম্বর অসুরের সঙ্গে যুদ্ধের পর এইবার এবং এই দ্বিতীয়বার, রাজা দশরথ তাঁর গুহ্যের বিস্ফোটের জ্বালা হতে শান্তি পাওয়ার পর রানী কৈকেয়ীকে এবার দ্বিতীয় বর দিতে চাইলেন। এমন সেবা আর কে করতে পারে ? এবার ও কৈকেয়ীর সেই একই আবদার, একই বয়ান।
কৈকেয়ী আবার কুঁজী বুড়িকে জিজ্ঞাসা করেন,‘কুঁজী কুঁজী, রাজা দশরথ আবার খুসী হয়ে আমাকে বর দিতে চেয়েছেন । কি বর চাইব বল দেখি মহারাজার কাছে ?
কুঁজী বুড়ী আবার সেই একই কথা বলে বসে, ‘ আমি যখন বর নিতে বলব তখন বর নিও । ‘
কৈকেয়ী আবার সেই একই কথা রাজার কাছে গিয়ে বলেন। মহারাজ কুঁজী যখন বর দিতে বলবে তখন না হয় তোমার সেই বর দিও আমাকে ! রাজা বলেন, ‘ বেশ ! যেমন তোমার ইচ্ছা।’
কুঁজীর কথা কৈকেয়ী কহে রাজার গোচর
কুঁজী যখন বর চাহে দিও তখন বর ।
দুই বারে দুই বর থাকিল তোমার ঠাঁই ।
কুঁজী যখন চাহে বর তখন যেন পাই ।। [ কৃত্তিবাস]
রাজা দশরথ আর কি বলবেন। প্রথমবারে ও প্রানপ্রিয় ভার্যার কথা শুনে হেসেছিলেন। এবার ও সেই একই কথা শুনে কাঁধটা ঈষৎ নাড়িয়ে মনে মনে হাসলেন। বুঝলেন কৈকেয়ী বড়ই কোমলমতি, স্বামীপ্রাণা, ভীষণ সরলা। হোক না সে রাজরাণী । তবু যেন তিনি অদ্ভুত খেয়ালিনী এক বালিকা।
রাজা মনে মনে ভাবলেন, ‘বেশ তাই হবে। না হয় এক সাথে গড়িয়ে দেবেন রাণীর গলায় রাণীর পছন্দের সাতনরী হার, কোমরে রুপার পৈছাঁ, আর দুই হাতে বাজু আর দুই মকরধ্বজ বালা। আহা এ আর এমন কি উপহার। যে সেবা করলেন রাণী কৈকেয়ী তার তুলনায় এ তো সামান্য , অতি সামান্য উপহার। নারীর মন চাহে মাত্র স্বর্ণ আভরন।


