অবিভক্ত নোয়াখালী ও ত্রিপুরা জেলার নববর্ষ উদযাপন

অবিভক্ত নোয়াখালী ও ত্রিপুরা জেলার নববর্ষ উদযাপন

অবিভক্ত নোয়াখালী ও ত্রিপুরা জেলা থেকে আগত অধিবাসীদের বাংলা নববর্ষ উৎসব সবচেয়ে বড়ো উৎসব। সর্বজনীন দুর্গোৎসব শুরু হ‌ওয়ার আগে দুর্গা পূজা যেহেতু কতিপয় সম্ভ্রান্ত পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল,তাই নববর্ষ উৎসব ছিল বিনোদনের সেরা অনুষ্ঠান। নববর্ষ উপলক্ষে পরিবারের মধ্যে নতুন পোশাক পরিধানের প্রথা ছিল,যা বর্তমানে দুর্গা পূজায় দেখা যায়।এই উৎসব মূলত তিন দিনের – চৈত্র সংক্রান্তিতে চৈত পরব, চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন ফুল গাঁথা এবং নববর্ষ।এই দুই জেলায় নীল ষষ্ঠী পালনের প্রচলন নেই।

ফুল গাঁথার প্রথম কাজ চৈত্র সংক্রান্তির জন্য দেব- দেবী এবং গবাদিপশুর জন্য ফুল দিয়ে মালা তৈরি করা। এইদিন ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা হয়। গৃহ দেবতার পূজার জন্য খ‌ই ও গুড় দিয়ে নাড়ু তৈরি করা হয়,যা লাবন নামে পরিচিত।এক ভাঁড় লাবন মুখ বেঁধে সযত্নে রেখে দেওয়া হয়,যা খোলা হয় জামাই ষষ্ঠীতে। এইদিন চৈত্র সংক্রান্তির জন্য আট প্রকার তেঁতো এবং আট প্রকার কাঁটা সংগ্রহ করে রাখা হয়। সন্ধ্যায় হয় ন্যাড়া পোড়ানো বা বুড়ির বাড়ি পোড়ানো নামে বহ্ন্যুসব।এই বহ্নি উৎসবের মাধ্যমে বিগত বছরের দুঃখ কষ্ট গ্লানিকে বিসর্জন দেওয়া হয়। আনন্দের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বহ্নি উৎসবে বেগুন,আলু, নারিকেল পুড়িয়ে খায়। এতে রোগব্যাধি দূর হয় বলে বিশ্বাস।

চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে ‘ চৈত পরব’ এর অনুষ্ঠান আকর্ষণীয়। চৈত্র সংক্রান্তির প্রত্যুষে বংশের বা পরিবারের পুরুষ সদস্যরা উপোস থেকে একসাথে মিলিত হয়ে পরিবারের বিভিন্ন সমস্যা দূরীকরণের উদ্দেশ্যে সাবধানতা সম্পর্কিত স্লোগান দিয়ে বাড়ির চারিদিকে প্রদক্ষিণ করে।একে বলা হয় ‘ জাগর গান ‘ বা আপদ বিদায় গান। এক্ষেত্রে বংশের বা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ হয় দলনেতা। দলনেতা থাকে অগ্রভাগে এবং অন্যান্য সদস্যরা থাকে পেছনে সারিবদ্ধভাবে। স্লোগান নিম্নরূপ –
দলনেতা – আঁগো বাইর রোগ- ব্যাধি দূর্যা রে দূর্যা!
( আমাদের বাড়ির রোগ ব্যাধি দূরে যা রে, দূরে যা !)
অন্যান্য সদস্যরা – দূর্যা রে,দূর্যা!( দূরে যা রে, দূরে যা!)
দলনেতা – আঁগো বাইর হিংসা নিন্দা দূর্যা রে দূর্যা !
অন্যান্য সদস্যরা – দূর্যা রে,দূর্যা!
দলনেতা – আঁগো বাইর অভাব- অনটন দূর্যা রে,দূর্যা!
অন্যান্য সদস্যরা – দূর্যা রে, দূর্যা!
দলনেতা – আঁগো বাইর মশা- মাছি দূর্যা রে,দূর্যা!
অন্যান্য সদস্যরা – দূর্যা রে,দূর্যা!
দলনেতা – আঁগো বাইর দাদ- চুলকানি দূর্যা রে,দূর্যা!
অন্যান্য সদস্যরা – দূর্যা রে,দূর্যা!
দলনেতা – আঁগো বাইর দুঃখ কষ্ট দূর্যা রে,দূর্যা!
অন্যান্য সদস্যরা – দূর্যা রে,দূর্যা!
দলনেতা – আঁগো বাইর শোক- তাপ দূর্যা রে, দূর্যা!
অন্যান্য সদস্যরা – দূর্যা রে,দূর্যা!
দলনেতা – পূবে যা,পচ্চিমে ( পশ্চিমে) যা, উত্তরে যা,লঙ্কায় যা,রাক্কস ( রাক্ষস) খা!
অন্যান্য সদস্যরা – রাক্কস খা! রাক্কস খা!
এই প্রভাতী পরিক্রমার স্লোগানে রোগ – তাপ মশা- মাছি পালিয়ে যায় বলে বিশ্বাস। প্রভাতী পরিক্রমার পর বংশের বা পরিবারের সদস্যরা একসাথে মিলিত হয়ে অষ্ট কাডা( অষ্ট কাঁটা/ আট ধরনের কাঁটা) শুকনো লতা পাতার সাথে পোড়ায় এবং প্রত্যেকে এই আট ধরনের কাঁটা পোড়ানোর তাপ গ্রহণ করে। লোক বিশ্বাস, এতে নাকি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং সহ্য শক্তি বৃদ্ধি পায়। অষ্ট কাঁটার তাপ গ্রহণের পর পরিবারের দুই একজন পুরুষ সদস্য ‘ ওষুধ ‘ সংগ্রহে বের হয়।এই সব জেলার লোকজন বিশ্বাস করে, চৈত্র সংক্রান্তির দিন সব গাছপালা ঔষধি।তাই প্রত্যেক গাছপালা থেকে ছাল,মূল, শিকড়,ডাল বা পাতার সামান্য করে অংশ সংগ্রহ করে। বাড়ি আনার পর মহিলারা ঝাড়াই বাছাই করে পরিস্কার জলে ধুয়ে নেয়। এরপর ঢেঁকিতে চূর্ণ করে ‘ আরক ‘ বা মিশ্রণ তৈরি করে। তারপর একটি পাত্রে ঐ আরক থেকে একশ গ্রামের মতো রেখে দেয়।একে বলা হয় ওষুধ।
এবার পরিবারের সকলের স্নানের পালা। স্নানের আগে মহিলারা শীল- নোড়ায়
‘ আট তিতা ‘ (অষ্ট তেতো/আট ধরনের তেতো) কাঁচা হলুদের সঙ্গে বেঁটে মসৃণ করে। প্রত্যেক পুরুষ- নারী ‘আট তিতা’ সারা শরীরে মেখে নদীতে বা পুকুরে স্নান করে। গবাদিপশুকে হলুদ ছাড়া আট তিতা মাখিয়ে স্নান করায়। এতে নাকি পরবর্তী বছরে চর্ম রোগ হবে না বলে বিশ্বাস। স্নান করার পর প্রত্যেকে সাধ্যমতো নতুন পোশাক পরিধান করে। এবার গবাদিপশুকে মালা পরানো হয় এবং বাড়ি ঘর ফুলের মালা দিয়ে সাজানো হয়।লাবন দিয়ে গৃহ দেবতার পূজার পর পুরুষরা শত্রু দমন অনুষ্ঠান করে, যাকে বলা হয় ‘ বৈরী ওড়ানো ‘ ।এই অনুষ্ঠানে প্রত্যেক পুরুষ সদস্য ক্রমান্বয়ে বাড়ির সদর দরজায় কাস্তে দিয়ে একজন মানুষের অবয়ব আঁকে, যিনি কাল্পনিক শত্রু। অতঃপর পূর্ব দিকে বা উত্তর দিকে মুখ করে উপোড় হয়ে কচুর ডগা, কাঁচা আম এবং লাবন ( খৈয়ের নাড়ু) প্রতিটি কাস্তে দিয়ে তিন বার করে ঐ কাল্পনিক শত্রুর উপর কোপ দিয়ে কাটে। প্রত্যেকবার কাটার সময় মুখে বলে,
” শত্রু কাডি( কাটি) দুশমন কাডি ( কাটি) ,যে আঁর ( আমার) অমোঙ্গল ( অমঙ্গল) চায়,তারে কাডি ( কাটি) । অতঃপর ঐ কাল্পনিক শত্রুর উপর খৈয়ের ছাতু ছড়িয়ে দেয়। এরপর বাড়ির সবাই মিলে খৈ,মুড়ি, চিঁড়ে,লাবন,খৈয়ের ছাতু,গুড়,কলা দিয়ে
ফলার খায় । এইভাবে বাড়ির সবাই উপবাস ভঙ্গ করে।

অতঃপর চৈত পরব এর প্রধান খাবার ‘পাঁচন’ এর রান্নার আয়োজন করা হয়।এই পাঁচন হলো বিভিন্ন সবজির রান্না করা তরকারি। পাঁচনে সব রকম সবজি দেওয়া হয়। তারমধ্যে অবশ্যই ইঁচড়, কচু,আলু, মিষ্টি আলু, কাঁচা কলা, বিভিন্ন প্রকার ডাঁটা,লাউর ডগা, কুমড়ো ডগা, সজনে ডাঁটা। ছোলা,বাদাম সীমের বীজ আগের দিন ভিজিয়ে রাখে। ছোলা, বাদাম,সীমের বীজ, নারিকেলের কুচি ভেজে দেওয়া হয়।মশলার মধ্যে দেওয়া হয় হলুদ,জীরে, ধনে,আদা ও এলাচ। পেঁয়াজ, রসুন এতে দেওয়া হয়না।এই মিশ্রণটি রান্না হয়ে এলে ‘ ওষুধ ‘ মেশানো হয়।এই পাঁচন্ই চৈত্র সংক্রান্তির মূল খাবার। এইদিন ভাত খাওয়া হয় না। তবে দৈ বা মিষ্টির আয়োজন থাকে।এই পাঁচন খেলে রোগ- ব্যাধি হয়না, শরীর সুস্থ থাকে বলে লোক বিশ্বাস।

চৈত্র সংক্রান্তির সন্ধ্যায় পালিত হয় ‘ বাড়ি বন্ধন ‘ অনুষ্ঠান। সন্ধ্যা বেলা পরিবারের কর্তা স্নান করে সিক্ত বসনে খালি গায়ে আগের দিন মাটির হাঁড়িতে রান্না করা পান্তা ভাত মেখে বাড়ির সীমানার চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়। এতে বিশ্বাস, বাড়ির সীমানার ভেতরে কোন ভূত- পেত্নি, অপদেবতা প্রবেশ করতে পারবে না।এই পান্তা ভাত বাড়ির সীমানার চারিদিকে ছড়িয়ে দেওয়ার সময় পরিবারের কর্তা একটি ছড়া বলে –
” ভূত- পেত্নি ছোট্ট গাছের পাতা,
কাছে আইলে কাটবো তার মাথা।
চারিদিকে দিলাম শূল,
অপদেবতার হবে ভুল।
জাগো রে বসুমতী জাগ,
৩৬৫ দিন জাগিয়া থাক।
ভিঙ্গি- নন্দীর কিরগায় ( প্রতিজ্ঞায়) থাম,
গুরুর দোহাই রাম।”
এইভাবে শেষ হয় চৈত পরবের অনুষ্ঠান।

নব বর্ষের প্রভাতে প্রথমে দেওয়া হয় গৃহ দেবতার পূজা। গৃহ দেবতার পূজার সময় একটি মুদ্রা সিঁদুর মাখিয়ে সঞ্চয়ের প্রতীক হিসেবে সঞ্চয় বাক্সে রেখে দেয়।বিজয়া দশমীতে যেমন ছোটরা বড়োদের প্রণাম করে এবং বড়োরা ছোটদের মিষ্টি মুখ করায়, তেমনি অবিভক্ত নোয়াখালী জেলা ও ত্রিপুরা জেলা থেকে আগত অধিবাসীদের মধ্যে ১লা বৈশাখ প্রভাতে ছোটরা বড়োদের প্রণাম করে এবং বড়োরা বংশের মধ্যে ছোট ছেলেমেয়েদের ‘ বাজার খর্চা ‘ ( বাজার খরচ) দেয়। মধ্যাহ্ন ভোজনে সুস্বাদু খাবারের ব্যবস্থা থাকে। তবে পুঁটি মাছ ও ‘ মিষ্টান্ন, ( পায়েস) ,দৈ অবশ্যই থাকবে। দৈ সাধারণ বাড়িতে তৈরি করে।বিকেলে সবাই মিলে নব বর্ষের মেলায় যায়। অবিভক্ত নোয়াখালী জেলায় এবং বর্তমানে পশ্চিম বঙ্গে যেখানে নোয়াখালী জেলার লোক সর্বাধিক বাস করে, সেখানে নব বর্ষের মেলা বসে।নব বর্ষের মেলাকে নোয়াখালী জেলার লোক ‘ গুলিয়া বাজার ‘ বলে। গুলিয়া বাজারে গিয়ে পরিবারের কর্তা প্রথমে গ্রাম দেবতার পূজা দেয়। তারপর কাঁচা হলুদ ও পান ক্রয়ের মাধ্যমে নব বর্ষের শুভ ক্রয়ের সূচনা করে। কাঁচা হলুদ এবং পান সমস্ত মাঙ্গলিক কাজে লাগে।এই দুটি শুভ প্রতীক,তাই পান ও কাঁচা হলুদ প্রথম ক্রয় করে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা প্রাপ্ত বাজার খরচ দিয়ে পছন্দ মতো জিনিস ক্রয় করে। এরপর দোকানে দোকানে হালখাতা করতে যায়। আগে দোকানে বসিয়ে মিষ্টি মুখের ব্যবস্থা থাকতো, বর্তমান সময়ের মতো প্যাকেটজাত মিষ্টির ব্যবস্থা চালু ছিল না। এইভাবে নোয়াখালী বংশোদ্ভূতদের তিন দিন ব্যাপী বছরের মূল উৎসবের পরিসমাপ্তি ঘটে।

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

আজন্ম-অর্জিত ভাষার পক্ষে লড়াইয়ের কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর পথযাত্রী …সৃষ্টির শেষ রহস্য, ভালোবাসার অমৃত”- নবনীতা দেব সেন “…সৃষ্টির শেষ রহস্য,ভালোবাসার অমৃত”- নবনীতা দেব

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

আজন্ম-অর্জিত ভাষার পক্ষে লড়াইয়ের কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

আলোর পথযাত্রী – বিতস্তা ঘোষাল আলোর পথযাত্রী ২ : আলোর পথযাত্রী …সৃষ্টির শেষ রহস্য, ভালোবাসার অমৃত”- নবনীতা দেব সেন “…সৃষ্টির শেষ রহস্য,ভালোবাসার অমৃত”- নবনীতা দেব

Read More »

ভজ মন রাম চরণ

ধ্রুপদী সাহিত্য শ্যামলকৃষ্ণ বসু ৯ অযোধ্যাপতি রাজা দশরথ  [ সর্গ ৫-৭ ] সরযূ নদীর তীরে কোশল নামে সে এক বিশাল দেশ। বিশাল আয়তনের মহতী সমৃদ্ধিশালী

Read More »