৩ : জিজীবিষা

৩ : জিজীবিষা

This entry is part 3 of 12 in the series জিজীবিষা

জিজীবিষা

১ : জিজীবিষা

২ : জিজীবিষা

৩ : জিজীবিষা

৪ : জিজীবিষা

৫ : জিজীবিষা

৬ : জিজীবিষা

৭ : জিজীবিষা

৮ : জিজীবিষা

৯ : জিজীবিষা

জিজীবিষা  

জিজীবিষা

১২ : জিজীবিষা

সুরঞ্জিত সরকার

তাদেরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দূর থেকে তিন জন হোমড়া চোমড়া লোকজন এগিয়ে আসতে লাগল।

এদের কেউই সেরকম পরিচিত নয়।
কল্যাণকে ডেকে কিছু একটা চিবোতে চিবোতে মুখ বেঁকিয়ে অবাঙালী স্বরে একজন বলে উঠল, ” আপনাদের কে নটুন দেখছি। হেই বাড়িটা কিনবেন নাকি” ?

এরকম প্রশ্নের মুখে পড়ে দুই ভাই একটু বিরক্ত হল। কিন্তু হাবে ভাবে সেরকম কিছু প্রকাশ না করে বরং মজার ছলে কল্যাণ উত্তর দিল, “এ বাড়িতে কেউ থাকে না” ?
তৎক্ষণাৎ ঐ ব্যক্তি গলা হাঁকিয়ে বলে উঠল, ” ডিডিমনি মারা যাবার পর হেই বাড়িটে পাকাপাকি ভাবে কেউ ঠাকে নি। এ বাড়িটে ভূট আছে। একডম কিনবেন না”।
পাশ থেকে সুমন্ত জিজ্ঞেস করল, ” তাই নাকি? আপনারা দেখেছেন নাকি?
কিছুক্ষন নিশ্চুপ থাকার পর দলের থেকে একজন মৃদুকন্ঠে বলে উঠল, ” না , মানে দিদিমনির অবর্তমানে ওনার হাজবেন্ড কাকাবাবু বছর খানেক এই বাড়িতে ছিলেন। এ পাড়ার হরেন খুড়োর নাতি মদন দিনের বেলায় ওনার দেখাশোনা করত। কিন্তু কোভিড অতিমারী আসার পর উনি একাই থাকতেন। ঐ সময় আমরা মাঝে মাঝে এসে কাকুর সাথে দেখা করে যেতাম। অনেক গল্প বলতেন আমাদের। সব ঠিকঠাক চলছিল। হঠাৎ একদিন সকাল বেলায় ঘর দোর খোলা রেখে ভূতের ভয়ে গামছা ও গেঞ্জি পড়ে শ্যামলের মারুতি ভ্যান গাড়িতে চেপে মেয়ের বাড়ি কুমারগঞ্জে চলে যান। তারপরে এই বাড়িতে চুরি ডাকাতি হয়েছিল। কিন্তু কাকাবাবু আর কখনও এখানে ফিরে আসেন নি।”।
এসব গল্পের সবটাই দাদুর মুখে আগেই শুনেছিল দুই ভাই। তবুও অচেনা লোকগুলোর কথাবার্তার ধরন দেখে ঠিক লাগল না। আসল মতলব জানতে আরো কিছু কথা বের করার জন্য কল্যাণ লোকটিকে জিজ্ঞেস করল, ” দিদিমনির সাথে আপনাদের দেখা সাক্ষাত হত?”
এই কথা শোনামাত্রই বাঙালী ভদ্রলোক বেশ গর্বিত ভাবে বলে উঠলেন, ” রাম বাদে আমরা দুজন পূরবী দিদিমনির ছাত্র ছিলাম। উনি আমাদের গ্রামের একমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খ্যাতনামা শিক্ষিকা ছিলেন। ওনাকে সকলেই চেনে। প্রায় পঞ্চাশ বছর এই বাড়িতে কাটিয়েছেন তিনি। সেকেলের হলেও বেশ চটপটে ছিলেন। নিজে হাতে বাজার করা থেকে শুরু করে রান্না বান্না, দুই ছেলে মেয়েকে সামলে শিক্ষকতা করে গেছেন ষাট বছর বয়স অবধি। ওনার স্বামী অতীশ কাকা বলতেন দিদিমনি নাকি আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারিনী ছিলেন। তিনি ভূত ভবিষ্যতের কথা অনায়াসেই সঠিকভাবে বলে দিতে পারতেন।”
বিড়ি টানতে টানতে অন্য একজন লোক পাশ থেকে বলল, ” দুঃখের কথা কি বলব বাপু, এটাই যে দিদিমনির ছেলেমেয়েরা ওনার শেষের সময়ে কেউই এই বাড়িতে সেরকম আসে নি। অতীশ কাকু একা যতটা সম্ভব সামাল দিয়েছেন। পাশের কৈপুকুর গ্রামে ওনার ছেলে সমরদার পেল্লাই বাড়ি আছে। কি আর বলি সমরদাও রোগ ভোগ করে অকালে চলে গেল। দুই খান বাড়িতে থাকার লোক নেই। বৌদি মাঝে মাঝে এসে এই বাড়ির জঙ্গল সাফাই করে দিয়ে যায়”।
“তা আপনারা কোথা থেকে কি ব্যাপারে এসেছেন”? – কল্যাণদের উদ্দেশ্য আবার সেই বিব্রতকর প্রশ্ন ধেয়ে এল।


দুই ভাই একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে উত্তর দেবে এমন সময় শম্ভু কাকুর গলা পাওয়া গেল। ছাদ থেকে জিজ্ঞেস করল, “কল্যাণ কখন আইলি? ক্যামনে আছিস? দাদুর শরীর কেমন? তোর মা পিউ আইসছে নাকি? বাড়িটাতে লোক থাকুম ব্যবস্থা কর। নইলে তিন ভাই কথা বইলা বেইচে দে। এইভাবে ভুতুরে বাড়ি কইরা রাখিস না। বৌদি তোদের বিশেষ কইরা সমরের পোলার কথা খুব বলত।”
সুমন্তর দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে একটু চেনার চেষ্টা করল। চিনতে না পেরে কল্যাণকে পরিচয় জানতে চাইল।
কল্যাণ সুমন্তকে দেখিয়ে বলল—- ” ও আমার মামার ছেলে”।
—– ” ও আইচ্ছা এটাই সমরের পোলা! “
সুমন্তর দিকে তাকিয়ে বলল , “কত্ত বড় হইয়া গেসো। তুমি তো আমাদের চিনবা না ভাই। তুমি যখন বছর খানেকের ছিলা , বৌদি শীতের দিনে তোমারে লইয়া এই বারান্দায় বইসা রোদ পোহাইতো। এই বাড়িতে তোমাগো বোনের অন্নপ্রাশন হইয়াসিল। গ্রামের সব লোক কব্জি ডুইবা খাইসিল। তারপর তো তোমাগো বাবা কৈপুকুরে আলাদা বাড়ি কইরা থাকত। যাই হোক দাদা বৌদি তোমারে খুব ভালবাইসতো। তা এখন কোথায় থাকোস?”
আসলে সুমন্ত তিন বছর বয়স থেকেই কৈপুকুরের বাড়িতে কড়া অনুশাসনের মধ্যে বড় হয়েছে। দুলাইবাড়ির বাড়িতে হাতে গোনা কয়েকবার মাত্র এসেছিল। তাই এখানকার লোকজনের সাথে তার চেনা পরিচিতি নেই বললেই চলে।।
শম্ভু কাকুর প্রশ্নের উত্তরে সুমন্ত কর্মসূত্রে কল্যাণপুরের বাসস্থানের কথা জানাতেই ওনার স্ত্রী পাশ থেকে বলে উঠল, “এবার এদিকে বদলি নিয়ে চলে এসো। তোমরা থাকলে বাড়িটাও একটু চলমান হবে। পাড়াটা বুড়ো বুড়িতে ভরে গেছে। আগামীতে তোমাদের মত নবীন প্রজন্মের খুব দরকার। অতীশদা তো সেই যে গেল আর এলোই না। এখন কেমন আছেন?”
সুমন্ত শুনে শুধু ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি প্রদান করার ভাব দেখিয়ে বলল, “তিরানববই বছর বয়সেও দাদু একদম ঠিক আছে। নিজের কাজ নিজেই করতে পারে।” আর বেশী কথা না বাড়িয়ে কল্যাণদা কে বলল, ‘” সন্ধ্যা নামছে। বাড়ি ফিরতে হবে। কম করে তিন ঘন্টা সময় লাগবে। চল এবার বেরোনা দরকার।”
এতক্ষণ গল্প শোনার পর হোমড়া লোকগুলো সব একে একে কেটে পড়েছে। কল্যাণ শম্ভু কাকুকে সেদিনের গা ছমছমে অভিজ্ঞতার কথা জানাবে না ভেবেও বলে ফেলতেই উনি বললেন, “এ বাড়িতে অনেক কিসুই ঘটসে। সময় কইরা একদিন আইসো , বলব ক্ষণ। আমাগো একটাই কথ্যা, সময় থাকুম বাড়িটার হিল্লে কইরা ফাইলো। দিনকাল ভাল যাস্সে না।”
—-” যতদিন না কিছু ব্যবস্থা হয় , তোমরা একটু দেখে রাখো। আজ এই বাড়ির মিউটেশন পরিবর্তনের কাজ প্রায় শেষ হল। আমাদের মনে হয় না কারোর পক্ষে এই বাড়িতে থাকা সম্ভব হবে। দাদু ও বলেছে কৈপুকুর থেকেই ইহকালের মায়া শেষ করবে। দুলাইবাড়ির ভিটা আর মারাবে না। কেউ কিনতে চাইলে জানিও। কল্যাণ কথা শেষ করতে গিয়েও জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা এই লোকগুলো কারা ছিল? বেশ তথ্য নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দালাল নাকি?”
দুই ভাই খেয়াল করেনি যে এতক্ষণে উল্টো দিকের বাড়ির ইন্দ্র কাকু পিছনে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। কল্যাণের চিন্তা প্রশমন করতে বলল,
“তোদের আজ বাড়ি ফেরার তাড়া আছে, চিন্তা করিস না। আমরা আছি তো। রাম ছেলেটা বছর সাতেক ধরে সামনে লোহা কারখানায় কাজ করে। সমস্তিপুরে ওর পরিবার থাকে। এমনিতে পাড়ার মাস্তান বলা যেতে পারে তবে আমাদেরকে খুব মান্য করে। বাকি দুই জন অবিনাশ এবং সর্বেশ্বর টোটো চালায়। পাশের খালপারের বস্তিতে থাকে। সরকার এখন এদের জন্য অনেক কিছু করছে। গেলো বছরে সরকারী আবাস প্রকল্পে দুই পরিবারের মাথায় পাকা ছাদ হয়েছে। পাড়ায় কে এলো গেলো , কি ঘটল এসব খবর সন্ধ্যাকালীন আড্ডায় পার্টি অফিসে পৌঁছে দেওয়াই এদের কাজ।”
সুমন্তর দিকে তাকিয়ে শম্ভু কাকু বলতে লাগল, ” হরেনের নাতিটা হইল এক নম্বরের বদমাইস ছেলে। ছেলেটারে কত ভালবাইসতো। তোমাগো দাদুরে ঠকাইসে। বেচারা অতীশদা রে ভয় দ্যাখাইয়া ভিটা ছাড়া করসে। ভগবান ও সব দেখেসে । যেমনি কাজ তেমনি সাজা দেইছে। “

” কেন মদনের কি হল?” সুমন্ত উৎসুক চিত্তে জানত চাইল।

” রামের মুখে শুনেছি পয়সার নেশায় অনলাইনে কিসব গেম খেলত। তারপর একদিন সকাল বেলা এই ডোবাতে বডি ভেসে উঠল। পচা গন্ধে বেশ কিছুদিন আমাদের প্রায় খাওয়া দাওয়া লাটে উঠেছিল। চারিদিকে হৈ চৈ পড়ে গেল। পুলিশ এসে আধগলা বডি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে গেল। “- কথাটা শেষ করে ইন্দ্র কাকু বলল, ” আমি একটু বাজারের দিকে গেলাম। তোরা একদিন আবার আসিস। “
দুই ভাই ও শম্ভু কাকুকে বাড়ি ফিরতে হবে বলে বিদায় জানিয়ে ইন্দ্র কাকুর সাথে হাঁটতে হাঁটতে রেলস্টেশনের দিকে রওনা হল। যেতে যেতে কল্যাণ সোমনাথ কাকুর দোকানের কাছে এসে চা খাওয়ার কথা বলতেই সুমন্ত একটু ক্ষুব্ধ হয়েই বলল, ” মনে আছে দাদা ঐ হারামি লোকটাকে? আমার কাছে ঠাকুমার শববাহী গাড়ি থেকে রক্ষাকালী পূজার চাঁদা তুলেছিল। ছোটলোকের থেকেও অধম না হলে কেউ শ্মশানযাত্রীদের কাছ থেকে টাকা তোলে? “
একথা শুনে ইন্দ্র কাকু হাসতে হাসতে বলল, “সোমনাথ তো সারাদিন মদ খেয়ে থাকত। শববাহী গাড়িকে হয়তো মালবাহী গাড়ি মনে করেছিল। ওর দুই দাদা লিভার সিরোসিস রোগে মারা গেছে। সোমনাথ প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সারে ভুগছে। ডাক্তার তিন মাস সময় দিয়েছে। বাইরে খুব একটা বেরোয় না। এই দোকানটা এখন ওর ভাই দেখাশোনা করে।”
কল্যাণ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, “পাপ বাপকেও ছাড়ে না।”
রামরাজাতলা স্টেশনে বসে চা খেতে খেতে দুই ভাই বাড়িটার দিকে তাকিয়ে পুরানো সব দিনের কথা ভাবছে। হঠাৎ কল্যাণ ফোন করতে যাবে এমন সময় পকেটে মোবাইল খুঁজে পাচ্ছে না। সুমন্তকে বলল, ” তুই একবার আমার মোবাইলে ফোন করতো”। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার ছিল যে ফোনের রিং কেউ ধরছে কিন্তু কথা বলছে না। দুজনেই ভাবছে পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথে মোবাইল কি পকেট থেকে পড়ে গিয়ে চুরি গেল?
সারাদিনের ধকলের পর মোবাইল হারিয়ে দুই ভাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। প্ল্যাটফর্মের চেয়ারে গালে হাত দিয়ে কল্যাণ চিন্তামগ্ন। সুমন্ত একদৃষ্টে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
আকাশে তখন অস্তমান সূর্যের নিস্তেজ আলোয় আসমানি রঙে লালচে আভা ধরেছে। একটা বিকট গোমট পরিবেশে চারপাশে জনজীবনের স্বচ্ছন্দ গতি প্রায় রুদ্ধ। একদিকে গগনে বিহঙ্গের দল ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে বাসার দিকে উড়ে যাচ্ছে অন্যদিকে দৈনিক যাত্রীরা কাজের শেষে কেউ পিঠে কেউবা কাঁধে ঝোলা ব্যাগে সারাদিনের সঞ্চয় নিয়ে ধীর গতিতে শহর থেকে ঘরে ফিরছে। ঝুপ করে আঁধার নামতেই সোলার নিয়ন্ত্রিত ল্যাম্প পোস্টের আলো গুলো এক এক করে জ্বলতে শুরু করল। সুমন্তর দাদু পূরবী ভবন ছেড়ে চলে যাওয়ার পর বিলের অনাদায়ে ইলেকট্রিক অফিস থেকে কারেন্টের লাইন কয়েক বছর আগেই কেটে দিয়েছিল। সন্ধ্যা নামলেই এই বাড়িতে এক তমসাময় ভৌতিক পরিবেশ বিরাজ করে। তার মধ্যে আজকের ঘটনা ও শম্ভু কাকুর কথা শোনার পর মোবাইল খুঁজতে তাঁরা যে ঐ বাড়িতে যাবে সেই সাহস নেই। ট্রেন আসতে দেরী হচ্ছে দেখে কল্যান বলল, ” দিদার বাড়ি থেকে স্টেশনে আসার রাস্তাটা একবার দেখে আসি চল। তবে আমার মন বলছে মোবাইলটা দিদার বাড়িতেই পড়ে আছে। “
এমন সময় স্টেশন মাস্টারের অফিস থেকে ঘোষনা হল,
—-” কুলগাছিয়া স্টেশনের কাছে ডাউন লাইনে ওভার হেডের তার ঝড়ে ছিড়ে গেছে। তাই ট্রেন আসতে দেরী হবে এবং আগামী ঘোষণা অবধি টিকিট পরিষেবা অস্থায়ী ভাবে বন্ধ থাকছে।” স্টেশনের অপেক্ষমান যাত্রীরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে , “তাহলে এখন ঘন্টা দুয়েকের আগে ট্রেন আসার সম্ভাবনা নেই। “
মিনিটের মধ্যে স্টেশন পুরো শুনশান হয়ে গেল। সবাই যে যার মতো চলে যেতে শুরু করেছে। স্টেশনের ঘড়ির কাঁটায় তখন সন্ধ্যা সাতটা বাজছে। সুমন্ত দাদাকে বলল, ” আজ আর বাড়ি ফিরে লাভ নেই। রাস্তায় একবার মোবাইলটা খুঁজে পেলে ভাল নইলে কাল সকালে এই বাড়িতে আরো একবার দেখে নিয়ে থানায় ডায়েরি করতে হবে। আজকের রাতটা কৈপুকুরে থেকে যাই।”
—–” মন্দ বলিস নি। কিন্তু কৈপুকুরে তো ব্রডব্যান্ড পাব না। ইন্টারনেটের গতি অত ভাল নয়। ওখানে থাকলে আজ রাতের মধ্যে জরুরি প্রোজেক্টের কাজটা শেষ করতে পারব না। যে ভাবেই হোক আজ বাড়ি ফিরতেই হবে। তুই বরং থেকে যা। কাল ফিরিস।”
এদিকে সুমন্তর ফোনে তাঁর মা পূর্ণা দেবী সংবাদ নিচ্ছেন, ” কিরে তোরা কতদূর? ট্রেন পেলি?”
—-” না এখনো পাইনি। লাইনে গন্ডগোল। বেশী রাত হলে তোমার কাছে থেকে যাব।” সুমন্ত সংক্ষেপে উত্তর দিয়ে স্ত্রী সুনীপার সাথে ফোনে সমস্ত ঘটনার বিবরণ দিতে দিতে দুলাইবাড়ির বাড়ি অবধি মোবাইল ফোনের হদিশ করার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু বাড়ির পাশে পৌঁছে জানলার কাচ দিয়ে ভেতরটা একটু আলোময় লাগল। দুই ভাইয়ের একটু সন্দেহ লাগল। ভিতরে যাওয়াটা ঠিক হবে কিনা ভাবতে ভাবতে সুমন্ত দাদাকে একটা লাঠি জোগাড় করার কথা বলল।
কল্যাণ পাশের বাড়ির ইন্দ্র কাকু ও উল্টো দিকের শম্ভু কাকুকে বাইরে আসার জন্য ডাকতে লাগল। কিছুক্ষন পর ইন্দ্রকাকু বেরিয়ে বলল, ” তোরা বাড়ি যাস নি? “
—” কাকু মোবাইলটা মনে হয় দোতলার ঘরে রয়ে গেছে। কিন্তু ভিতরে যেতে সাহস পাচ্ছি না। এমার্জেন্সি লাইট নিয়ে একটু সাথে গেলে ভাল হয়।” কল্যাণের উত্তরে ইন্দ্রকাকু যেন অস্বস্তিতে পড়ে গেছে বলে মনে হল। এদিকে শম্ভু কাকু ও বাইরে বেরিয়ে এসে ঘটনা শুনে ইতস্তত ঘোরাঘুরি করতে লাগল।
_ “এই অমানিশিতে ঘরের ভিতর ঢুইক্যা কাম নাই। সক্কাল বেলা আইস্যা ডাক দিস। লাঠি লইয়্যা ভিতরে যামু। এখন কৈপুকুরের বাসায় চইল্যা যা”। এই বলে শম্ভু ও ইন্দ্র কাকু যে যার বাড়িতে ঢুকে গেল। এরকম আচরণে দুই ভাইয়ের মনে বেশ খটকা লাগল এবং সংশয়ের মাত্রা আরো বেড়ে গেল। কাকুদের দেখানোর জন্য দুজনেই হেটে কৈপুকুরের দিকে ফিরে যাওয়ার ভান করল। কিন্তু কিছুটা এগোতেই ওরা বুঝতে পারল যে পিছন থেকে ওদের কেউ অনুসরণ করছে। দুজনের বুক দুরুদুরু করছে তখন। সুমন্ত গতিবিধি ভাল নয় দেখে তৎক্ষণাৎ তাঁর পরিচিত একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সৌরীশদাকে সমস্ত ঘটনা জানাতেই সে বলল, “আমি শ্যামপুকুর থানার বড়বাবুকে বলে দিচ্ছি। তোরা থানায় গিয়ে একবার দেখা করে নে। রাতের বেলা পুলিশ ছাড়া কোনভাবেই ভিতরে যাবি না। অসুবিধা হলে জানাস।” দুই ভাই কৈপুকুর যাবে বলে টোটোতে চেপে বসতেই তাদের অনুসরণকারী চর পিছন দিকে হাঁটা শুরু করল। রাস্তা কিছুটা এগিয়ে ভাতৃদ্বয় গন্তব্যস্থল পরিবর্তন করে টোটো নিয়ে সোজা শ্যামপুকুর থানায় পৌছাল। থানায় যাবে শুনে পথিমধ্যে টোটো চালক বেশ আগ্রহী হয়ে জিজ্ঞেস করল, ” দাদা আপনারা কোন অসুবিধায় পড়েছেন নাকি? আমায় নির্দ্বিধায় বলতে পারেন। আমার বড়দা অবিনাশের অনেক কানেকশন আছে। আপনাদের কাজে লাগতে পারে।” টোটোওয়ালার দাদার নামটা শুনে সুমন্ত মনে মনে ভাবছে এই আবার সেই দুপুরের অবিনাশ নয় তো ! একটু এড়িয়ে গিয়ে শুধু বলল, ” সেরকম কোন ব্যাপার নয়। তা তোমার দাদা অবিনাশ কী করে? ” টোটোচালক একটু উচ্ছ্বাসের সঙ্গে জানাল , ” আমার দাদাও এই রুটে টোটো চালায় কিন্তু ওর সাথে বড় বড় লোকজনের বিশাল যোগাযোগ আছে। ” এবারে দুই ভাই পুরোপুরি নিশ্চিত হল। তাই বেশী কথা না বাড়িয়ে “ও আচ্ছা” বলে টাকাটা ধরিয়ে সুমন্ত ও কল্যাণ থানার সামনে নেমে পড়ল। ভিতরে ঢুকতেই প্রহরী জানতে চাইল, “আপনারা কোথা থেকে কী ব্যাপারে আসছেন?” সুমন্ত বড়বাবুর সাথে দেখা করবার কথা বলতেই উনি বললেন, “বড়বাবু ও মেজবাবু বিশেষ কাজে বেরিয়েছে। আপনাদের অপেক্ষা করতে হবে নতুবা ছোটবাবুর সাথে দেখা করতে পারেন। ” কল্যাণ একটু হতাশ হয়ে জিজ্ঞেস করল, ” ওনাদের ফিরতে মোটামুটি কত সময় লাগতে পারে বলতে পারবেন? থানারক্ষী জানালেন, ” সেটা বলতে পারব না। তবে ফিরবেন।” এদিকে ঘড়ির কাঁটাতে আরও এক ঘন্টা অতিক্রান্ত। মোবাইলটা হারিয়ে বেচারা বিপদে পড়ে গেছে। পারিপার্শ্বিক জগত ও সমাজ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন। দুলাইবাড়ির বাড়িতে দোতলায় না দেখা পর্যন্ত মন মানতে চাইছে না যে সত্যিই ফোনটা খোয়া গেছে। একটা উৎকন্ঠার মধ্যে অস্বস্তিকর অবস্থায় থানা থেকে বেরিয়ে কল্যাণ সিগারেটে টান দিতে দিতে সুমন্তকে বলল, ” এখন আরও একবার কল করে দেখ তো রিং হচ্ছে কিনা?” এবারে আর রিং হল না। নেটওয়ার্ক ক্ষেত্রের বাইরে আছে এরকম মেসেজ শোনা গেল। সুমন্ত আরও একবার ফোন করে বর্তমান পরিস্থিতির কথা জানাতেই সৌরীশদা বলল, “বড়বাবু এইমাত্র ফোন করে ফিরতে রাত হবে জানিয়েছে। উনি তোদের ব্যাপারটা দেখার জন্য ছোটবাবুকে বলে দিয়েছেন। তোরা এখুনি গিয়ে দেখা কর”। কল্যাণ সিগারেটের শেষ টান মেরে দুজনে আবার থানায় ঢুকবে এমন সময় পাশে এসে একজন টোটোওয়ালা দাদাভাই বলে ডেকে উঠল। দুই ভাই মনে মনে “উফ্ফ ” বলে পিছনে ফিরে তাকাতেই দেখল এ হল সেই অবিনাশ। সুমন্ত বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ” আপনার ভাই তো একটু আগে আমাদের নামিয়ে দিয়ে গেল”। অবিনাশ তাড়াতাড়ি পকেট থেকে একটা মোবাইল বের করে দেখিয়ে বলল, “এই ফোনটা কি আপনাদের কারোর?” কল্যাণ কাকতালীয় ভাবে নিজের ফোন চিনতে পেরে মনে মনে বেশ খুশি হয়ে বলল, “হ্যাঁ, এটা আমার ফোন কিন্তু আপনার কাছে কিভাবে?” __” এই ফোনটা সন্ধ্যাবেলা দিদিমনির বাড়ির পাশ থেকে পেলাম। ফোনটা লক করা অবস্থায় ছিল। অনেক ফোন আসছিল। দুবার ফোনটা ধরে কথা বলার চেষ্টা করলাম কিন্তু নেটওয়ার্ক সমস্যার জন্য কেটে গেল। তারপর ব্যাটারী শেষ হয়ে গিয়ে সুইচ অফ হয়ে গেছে। একটু আগে শম্ভু কাকু আমাকে বলল যে আপনাদের মোবাইল হারিয়ে গেছে। তারপর ভাই বলল দুজন কৈপুকুর যাবে বলে শ্যামপুকুর থানায় নেমে গেছে। আসার সময় বড়বাবু ও মেজবাবাবুর সাথে কিছুক্ষন কথা হল। ভাবলাম আপনারা হয়তো বাড়ি যাওয়ার আগে থানায় মোবাইল হারানোর রিপোর্ট করতে এসেছেন।”
কল্যাণের হাতে মোবাইলটা দিয়ে একটু মুচকি হেসে অবিনাশ বলল, “কপাল ভাল আপনার। আজ না হয় পেয়ে গেলেন কিন্তু এরপর কমিশন দিতে হবে”।
হাসতে হাসতে কল্যাণ ধন্যবাদ জানিয়ে বলল, “সে আপনি চাইলে এখনও দিতে পারি।”
অবিনাশ বলল, ” না না আমি মজা করলাম। চলুন আপনাদের কৈপুকুরের বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে আসি। ন টা বাজে। ডাউন লাইনে এখনো ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয় নি।”
মোবাইল উদ্ধারের পুরো গল্পটা দুই ভাই এর কাছেই কেমন যেন ধোঁয়াশার মত লাগল। কল্যাণের বার বার মনে হচ্ছিল মোবাইল টা সে টেবিলে দিদার ছবিটা যাতে উড়ে না যায় তার জন্য চাপা দিয়ে রেখেছিল। তবে অবিনাশ লোকটা যে দুলাইবাড়ি এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি এ ব্যাপারে আর কোন সন্দেহ ছিল না।
এদিকে সুমন্তর ফোনে রিং বেজে উঠল। ” বড়বাবু জানাল, স্থানীয় একজন ব্যক্তি রাস্তা থেকে একটা মোবাইল পেয়েছে। জমা দেওয়ার জন্য থানায় পাঠিয়েছে। যদি তোদের হয় তাহলে ছোটবাবুর কাছ থেকে নিয়ে নিস।” মোবাইল ফোনের ওপার থেকে সৌরীশদা জানাল।
_” মোবাইল পেয়ে গেছি দাদা। ছোটবাবুর সাথে কথা বলে নিচ্ছি।” ফোনে এই কথা বলে সুমন্ত অবিনাশকে বলল, ” আমাদের মিনিট পনেরো সময় লাগবে। আপনি একটু ঘুরেও আসতে পারেন। নইলে অপেক্ষা করতে হবে।”
অবিনাশ তাঁর মোবাইল ফোনের নাম্বারটা দিয়ে বলল, ” আমার একটু তাড়া আছে। যদি টোটো পেতে অসুবিধা হয় তাহলে এই নাম্বারে ফোন করবেন। কাউকে পাঠিয়ে দেবো”।
টোটো নিয়ে চলে যেতে যেতে আবার বলে উঠল, “ওহ্, বলতে ভুলেই গেছিলাম। শুনলাম দিদিমনি তো বাড়িটা আপনাদের তিন ভাই এর নামে করে দিয়ে গেছে। ভালো খদ্দের আছে। বিক্রি করলে জানাবেন। ফ্ল্যাট ও টাকা দুটোই ব্যবস্থা করে দেবো।”
দুই ভাই ঘাড় নাড়িয়ে ঠিক আছে বলে থানার ভিতরে ঢুকে অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব ইন্সপেক্টর সুকোমল বাবুর টেবিলের সামনে পরিচয় দিতেই উনি বললেন , ” আপনারা খুব লাকি যে আজকেই মোবাইলটা পেয়ে গেছেন। বড়বাবু ফোনে আপনাদের ঘটনা জানিয়েছেন। আপনাদের দাদুর বাড়িতে উনি থাকাকালীন থানা থেকে একটি বিপদকালীন অ্যালার্মের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছিল। ঐ বাড়িতে যখন চুরি হয়েছিল পাড়ার থেকে থানায় খবর দিয়েছিল। আপনাদের কাউকেই সে সময় দেখি নি। দিনকাল ভাল নয়। বছরখানেক আগে পাড়ার থেকে থানায় রিপোর্ট করা হয় যে ঐ বাড়িতে নাকি রাতের বেলায় অনৈতিক কাজ কর্মের আড্ডা বসে। আমরা একদিন গিয়েও ছিলাম। কিন্তু সেরকম কিছু দেখতে পাই নি। তবে বড়বাবু জানিয়েছেন আপনারা চাইলে ঐ বাড়িতে পুলিশ পাঠাবে।”
ঘড়ির কাঁটা বলছে রাত সাড়ে ন টা। পরিশ্রান্ত শরীর আর বইছে না। দুই ভাই এর খুব খিদেও পেয়ে গেছে। তাই মনে ইচ্ছে থাকলেও একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে পুলিশ আধিকারিকবৃন্দকে ধন্যবাদ জানিয়ে সেদিনের মত তাঁরা থানা থেকে বার হয়ে গেল।

(ক্ৰমশঃ)

জিজীবিষা

২ : জিজীবিষা ৪ : জিজীবিষা

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

ঊর্ণনাভ

This entry is part 3 of 12 in the series জিজীবিষা

This entry is part 3 of 12 in the series জিজীবিষা ঊর্ণনাভ ১ : ঊর্ণনাভ ২ : উর্ণনাভ ৩ : ঊর্ণনাভ ৪ : ঊর্ণনাভ ৫

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

ঊর্ণনাভ

This entry is part 3 of 12 in the series জিজীবিষা

This entry is part 3 of 12 in the series জিজীবিষা ঊর্ণনাভ ১ : ঊর্ণনাভ ২ : উর্ণনাভ ৩ : ঊর্ণনাভ ৪ : ঊর্ণনাভ ৫

Read More »