ভজ মন রাম চরণ

ভজ মন রাম চরণ

   | ১৯ |

কন্যা বিদায়

পরদিন প্রভাতে বাজল আর এক বিদায়ের সুর। ঋষি বিশ্বামিত্র বিদায় নিলেন সবার কাছ থেকে এবং তিনি হিমালয়ের দিকে প্রস্থান করলেন। ভারতবর্ষের রাষ্ট্রজীবনে এক মহামঙ্গল সাধিত করে ঋষি বিশ্বামিত্র এবার নিঃশব্দে প্রস্থান করলেন। মহাপুরুষগণ কর্তব্য শেষ করার পর আর এক মুহূর্ত ও অপেক্ষা করেন না। তাদের  কোন পিছুটান থাকে না।  

রাজা দশরথ এবং তাঁর চারপুত্র সকলে এবং রাজা জনক সপরিবারে এবং বশিষ্ঠ আদি সকলে তাঁকে সসন্মানে বিদায় জানালেন। 

বশিষ্ঠদেব এক্ষনে মুনি বিশ্বামিত্রকে বললেন,‘ মহামুনি বিশ্বামিত্র, তুমি ভারতবর্ষের রাষ্ট্র জীবনে এক মহামঙ্গল সাধিত করে গেলে। রাজা হতে তোমার মহাঋষিতে উত্তরন এবং এই জগতের হিতে তোমার কর্মকরণ মানুষ চিরকাল মনে রাখবেন। ‘

বিশ্বামিত্র এইবার আনত মস্তকে বলে উঠলেন,‘ মহামুনি বশিষ্ঠদেব, আপনি আমার চিরপ্রনম্য। আপনি আমার গুরুর গুরু। আপনার জন্যই আমার জীবনের এই উত্তরন ত্রিলোকে চিরকাল ধ্বনিত হবে। আপনি যে দিন আমাকে ’ ব্রাহ্মন’ বলে উপাধি দিলেন সেইদিন আমি ধন্য হয়েছিলাম। আপনি আমার তীব্র ঈর্ষা এবং আমার অনৈতিক আক্রোশকে যেদিন আপনার ব্রাহ্মন্যগুনে প্রতিহত করেছিলেন, সেই দিন আমি আমাকে আবিস্কার করেছিলাম। আর তাই হতমান আমি আত্মশুদ্ধির লক্ষ্যে কঠোর সাধনায় আত্মমগ্ন হয়েছিলাম এবং তাই সেই দিন আমার ঋষিপদে উত্তরন হয়েছিল। সেদিন আপনি আমাকে ব্রাহ্মন অভিধায় ভূষিত করে আমাকে ধন্য করে ছিলেন।’

বশিষ্ঠদেব বললেন, ‘মুনিবর বিশ্বামিত্র, যে মন্ত্রে ব্রাহ্মন হয় দ্বিজ, সেই ব্রহ্মগায়ত্রীর মন্ত্রদ্রস্টা ঋষি আপনি স্বয়ং !  আপনি ধন্য, জগত ধন্য ।’ 

বিশ্বামিত্র নতমস্তকে বলে উঠলেন, ‘ আপনার বচনে আমি কৃতার্থ গুরুদেব।  এইবার তবে আপনি আমাকে  অনুমতি দিন, আমি এখন আমার হিমালয়স্থ আশ্রমে আমার প্রিয় কৌশিকি নদীর তীরে গিয়ে আমার সাধনায় ব্রতী হই।’

বশিষ্ঠ বললেন,‘তথাস্তু পুন্যবর ।’

বিশ্বামিত্র এইবার বললেন,‘ রাম আমি আমার সাধনার সবটুকু তোমাকে দান করেছি। তুমি এই জগতের এক বিরাট মঙ্গলসাধনে অবতীর্ণ হয়েছ। তুমি স্বয়ং নারায়ন। আমি তোমার লীলার যে প্রকাশ দেখেছি তাতে আমি ধন্য। এখন হে জগত প্রভু , তুমি এবার আমায় আপন কর্ম সাধনে শক্তি দিও।’ 

রাম বললেন, ‘গুরুদেব, আপনি আমায় যে জ্ঞান উজাড় করে দিয়েছেন আমি তাহাতে ধন্য। আপনি আমায় আশীর্বাদ করবেন । আপনার যাত্রা পথ সুগম হোক।’ 

রাম গুরুদেবের দিকে এক ভুবনমোহন হাসি হেসে দাঁড়িয়ে রইলেন। 

সীতা বললেন, গুরুদেব আমায় আপনি কি আশীর্বাদ দিলেন ।

বিশামিত্র বললেন,‘ জনকনন্দিনী, তুমি লক্ষী স্বরুপা সীতা। তুমি রামের ঘরণী। তোমাদের স্বর্গীয় মিলন দেখে আমি আমার চক্ষু সার্থক করে গেলাম। এই নাও সীতা, হাত তোল, আমি তোমার হাতে এই এক গাছি তৃণ দিলাম। বিপদে আপদে এই তৃণ তোমার হাতে তরবারি সমান ঝলসে উঠুক। সামনে তোমার অশেষ পরীক্ষা।‘

সীতা সেই তৃণ হাতে নিয়ে এইবার হাতজোড় করে তাকিয়ে রইলেন এবং মুনিবর কে প্রনাম করে বলে  ওঠেন ,’ মুনিবর , আপনার আদেশ আমার পাথেয়।’

বিশ্বামিত্র বললেন,‘ সুখিনা ভবন্তু।’

বিশ্বামিত্র এইবার রাজা জনককে বললেন,‘ রাজন এইবার কন্যাদের বিদায়ের উদযোগ করুন।  দিনমনি ওই পূর্ব দিগন্তে উদয় হলেন। আমি এক্ষন রওনা হলাম।’

তারপর তিনি সকলের প্রতি হাতজোড় করে তাঁর হস্তস্থিত যষ্টি হাতে নিয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে আপনপথে রওনা হলেন। মায়া নয়, মোহ নয়, নয় কোন বন্ধন। একাকী পথিক তিনি রওনা দিলেন স্বীয় গমনপথে হিমালয়ের দিকে। পিছনে একবার ও ফিরে তাকালেন না। সকলে তাকিয়ে রইলেন।

মুনি শতানন্দ বললেন, ‘জগতের এক অশেষ কল্যান সাধন করে মহাপথিক তবে চললেন আপন পথে, সাধু সাধু সাধু ! রাজা জনক, এখন আর দেরি কেন তবে ! আজ যে কন্যা বিদায়ের পালা।’

রাজা জনক বলে উঠলেন,‘ তাই তো তাই তো তাই তো ! আজ যে আমার সীতা মা‘কে বিদায় জানাতে হবে ! রাণী সুনয়না ,না না, আর দেরী ক’র না। এসো এবার কন্যাদের বিদায়ের আয়োজন করা যাক। কই, কোথায় গেলে সব তোমরা !’ 

সকলে এইবার আপন আপন কর্মে নিয়োজিত হলেন। আজ যে বেজেছে বিদায়ের সুর।

রাজা জনক কন্যাগনকে বহু ধনরত্ন, গো, কম্বল,ক্ষৌম বসন এবং হস্তি, অশ্ব, রথ,পদাতি এবং অনেকানেক সখী ও দাসদাসী কন্যাদের সঙ্গে দিলেন। 

কন্যা বিদায়কালে রাজা জনক তাঁর আদরনীয় সীতাকে বললেন, ‘সীতা তুমি আমার অনেক কর্মের পুন্যফলে লব্ধ। তুমি এখন রাজবধূ হলে। তুমি ছিলে জনক দুহিতা। আমি তোমায় রামের হাতে সমর্পণ করেছি। তুমি এখন অযোধ্যা রাজপরিবারের রাজকুলের রাজবধূ হলে। ইক্ষ্বাকু বংশের ধ্বজা এখন তোমার হাতে। শ্বশুর শাশুড়ির তুমি ভালো মত সেবা করবে। শ্বশুর শাশুড়িকে মহাগুরু জ্ঞান করবে। তাদের আশীর্বাদে তুমি সর্বত্রই তরে যেতে পারবে।’

সীতা বলেন, ‘ তাতঃ, আপনার বচন আমি সাধ্যমত রক্ষা করব তাতঃ !’

রাজ জনক বললেন , ‘ তোমার স্বামী রামচন্দ্রকে তুমি পরমদেবতা জ্ঞানে দেখবে। স্বামী বিনা স্ত্রীর আর ধর্ম নাই। তুমি লক্ষী স্বরূপিণী,জ্ঞান পিপাসিনী, শাস্ত্র পারঙ্গমা। তুমি ধর্ম সম্বন্ধে বিশেষভাবে অবহিতা। সীতা যাও স্বামীর ঘরে। সুখী রেখো সর্বজনে।’ 

সীতা ভাসেন অশ্রুজলে। রাণীমা সুনয়না সীতাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘মা সীতা আমাদের তুমি দুঃখ সাগরে ভাসিয়ে চললে। আমার বুক ফেটে যাচ্ছে তোমাকে বিদায় দিতে। সীতা বলে কাকে আর আমরা ডাকব এই শুন্য পুরীতে। সীতা কভু না শুনিব আর তোমার মধুর বচন।’  

কন্যা মাতাপিতার কাছে অতিথিমাত্র। বিবাহ হলে কন্যাজনের স্বামীর ঘর সেই মাত্র সার। পিতা মাতা ভ্রাতা তখন সকলেই হন পর। 

সীতা বলেন, ‘না কাঁদিয়ো জননী বিদায় কালে। আমায় এবার বিদায় দাও মাতা।’

মন্ত্রী সুমন্ত্র বলেন,’ রাজমাতাগন এবার কন্যাদের বিদায় দিতে হয়। আর বিলম্ব নয়। অযোধ্যা অনেক দূর পথ। 

তখন কন্যাবিদায়ের আচারে রাজা জনকের স্ত্রী এবং রাজা কুশধ্বজের স্ত্রী দুজনেই তাদের স্ব স্ব কন্যাদের পিছনে আঁচল পেতে দাঁড়ালেন।

চার কন্যা তখন পিছন ফিরে তাদের স্ব স্ব মাতার আঁচলে ইঁদুর মাটি ছুঁড়ে দিয়ে বললেন,’মাতা আমরা আমাদের ঋণ চুকিয়ে গেলাম। এবার আমাদের  বিদায় দাও।’

সকল মিথিলাবাসীকে অশ্রুজলে ভাসিয়ে চারকন্যা এবার রওনা হবেন।

রাজা দশরথ ও রাজা জনক পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে কোলাকুলি করলেন। তারা পরস্পর পরস্পরের নিকট বিদায় প্রার্থনা করলেন। 

রাজা দশরথ সবাইকে বললেন,‘ না না আর দেরী নয়। অযোধ্যা সে চারদিনের পথ। সুমন্ত্র প্রস্তুত হোক আমাদের রথ।’

সুমন্ত্র বললেন,‘ মহারাজ আমরা রওনা হতে প্রস্তুত। কুমারদের দোলায় উঠতে আজ্ঞা হোক ।’

এক্ষনে বিশাল শঙ্খধ্বনি হুলুধ্বনি মাঝে রাম সীতা, লক্ষন ঊর্মিলা, ভরত মান্ডবী এবং শত্রুঘ্ন ও শ্রুতকীর্তি চার বরবধু চার দোলায় উঠে বসলেন।   

এইবার দশরথ রাম এবং সীতাকে নিয়ে অগ্রভাগে রওনা দিলেন। বিশাল শঙ্খধ্বনি, হুলুধ্বনি শিঙ্গাধ্বনি এবং বাদ্যধ্বনির মাঝে মিথিলা হতে এক্ষনে বিরাট এক শোভাযাত্রা অযোধ্যা অভিমুখে রওনা হ’ল। দেবরথে আসীন হলেন বশিষ্ঠদেব প্রমুখ অন্যান্য ব্রাহ্মনগন। সুমন্ত্র  রয়েছেন শোভাযাত্রার একদম প্রথমে। দশরথ চলেছেন তাঁর রাণীগন সমভিব্যাহারে ।

শুভ কাজ শেষ করে আজ রাজা দশরথ অযোধ্যায় ফিরছেন। তাদের সঙ্গে চলেছে রাশি রাশি উপঢৌকন। 

লক্ষ লক্ষ ধেনু অশ্ব রথ। ভারে ভারে কত উৎকৃষ্ট বস্তুসম্ভার। রজত সুবর্ণ মুক্তা প্রবাল। থরে থরে মনি রত্ন অলংকার।

রথ শোভিত শোভাযাত্রা নববর নববধূ সহ অযোধ্যাপথে অগ্রসরায়মান। পথে আছে যত যত নগর নগরী তার যত অধিবাসী প্রজাবর্গ সকলে ভীড় করে দেখতে আসে রামকে সীতাকে।

তারা আনন্দে উত্তেজিত। ওই যে চলেছেন অযোধ্যার রাজা চক্রবর্তী মহারাজ দশরথ আর তাঁর  চারপুত্র আর নববধুগন রথচক্র যানে। 

           নানাবর্ণ পতাকা শোভিছে নানা স্থলে 

           রাম সীতা হেরে সবে মহা কুতুহলে ।। [কৃত্তিবাস]

| ২০ |

তিনি পরশুরাম

মিথিলা হ’তে তখন অনেক দূরে চলে এসেছে অযোধ্যার রথচক্রযান বরবধুগন সহ শোভাযাত্রা সহকারে। তাঁরা তিনদিনের পথ পার হয়ে এসেছেন সদ্য। এমন সময় পথে নানা অমঙ্গলের চিহ্ন দেখা দিল। 

সহসা চারদিক আলোড়িত করে প্রবল বেগে ঝড় উঠলো। ধুলায় ভস্মে চতুর্দিক আঁধার করে এলো।

বৃক্ষ শাখায় ভয়ার্ত পক্ষীর আর্ত কলরব উঠল। আকাশে ও পক্ষিগণ ব্যাকুল হয়ে কলরব করছে,  মৃগগণ দক্ষিণ দিকে ছুটে চলে যাচ্ছে। 

কিন্তু হঠাৎ এমন সময়  কেন এমন ঝড় উঠল ?

রাজা দশরথ বলেন, ‘এ কি সুমন্ত্র এ যে দেখি কেমন অলক্ষন ? ‘

সুমন্ত্র বললেন,‘মহারাজ, মনে হচ্ছে এ যেন কোন মহাপরাক্রমীর আবির্ভাব লক্ষন। আপনি শঙ্কিত হবেন না।’  – এবং পরক্ষনে সুমন্ত্র দেখেন ওই আসছেন তিনি !

দশরথ বলেন, ‘ সুমন্ত্র, আমি যে আমার শংকা ধরে রাখতে পারছি না। হঠাৎ এ কি দুর্লক্ষণ ! ‘

সুমন্ত্র দশরথকে বলেন, ‘ মহারাজ,  আপনি স্থির হ’ন। আমি এগিয়ে দেখছি।’

দূত এসে সংবাদ দেয়,‘ মহামন্ত্রী, ওই ওই ওই তিনি আসছেন,  সেই মহাক্রোধী মুনি ক্ষত্রিয় নাশন যিনি ।’ 

মহামন্ত্রী সুমন্ত্র বলে ওঠেন, ‘এ কি মহাশংকা উপস্থিত এমন অসময়ে। এ যে চিন্তার ব্যাপার। ঐ আসছেন তিনি যিনি পরশুরাম। স্কন্ধে কুঠার তাঁর হাতে ধনুর্বাণ। মহাবীর তিনি। তিন সাতবার তিনি পৃথিবীকে নিঃক্ষত্রিয় করেছেন। ’

দশরথ দেখতে পেলেন ভীমদর্শন জটামণ্ডলধারী ক্ষত্রিয়কুলনাশন ভৃগুপুত্র জমদগ্ন্য এসেছেন।

ইনি জমদগ্নির পুত্র পরশুরাম। ইনি ঋচীকের পৌত্র, ভৃগুর প্রপৌত্র।

 তিনি কৈলাসের ন্যায় দুর্ধর্ষ, কালাগ্নির ন্যায় দুঃসহ, পামর জনের দুর্নিরীক্ষ্য। তাঁর স্কন্ধে কুঠার, হস্তে বিদ্যুদবর্ণ ভীষণ ধনুর্বাণ। বশিষ্ঠাদি ঋষিগণ জল্পনা করতে লাগলেন, ইনি কি আবার ক্ষত্রিয় বধ করতে এসেছেন?  তাঁরা ভার্গবকে অর্ঘ্য দিয়ে পূজা করলেন। 

দশরথ কেঁপে ওঠেন, ‘সে কি? এখানে পরশুরাম ? জমদগ্নি মুনির পুত্র। মুনি বিশ্বামিত্রের আত্মীয় , তাঁর ভগিনীর পৌত্র ।

হঠাৎ এ সময়ে তিনি এখানে ?’

কথাটা দ্রুত বেগে ছড়িয়ে  পড়ে বারাতি দলে। পরশুরাম আসছেন।

সীতা তাকান রামের দিকে। চোখে তাঁর কৌতুহল। 

রাম  আশ্বস্ত করেন, ‘ তিনি পরশুরাম। শুনেছি তিনি একজন বড় যোদ্ধা।’ 

বশিষ্ঠদেব বলে ওঠেন, ‘ মহারাজা দশরথ, তোমার চার চারজন যোগ্যপুত্র থাকতে কেন ভীত হও অকারন ? ‘

                  চার পুত্র তব সনে আছে বিদ্যমান

                 কে করিতে পারে তব অশুভ বিধান ? [ কৃত্তিবাস ]

রাজা দশরথ ,মন্ত্রী সুমন্ত্র এবং অন্যান্য মন্ত্রীগন সকলে বিরাট শোভাযাত্রার আগে গিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর কথা সকলেই জানে। তিনি ক্ষুব্ধতেজা, তিনি মহাযোদ্ধা, তিনি তিন সাতবার এই পৃথ্বীকে ক্ষত্রিয় শুন্য করেছেন । কে না ভয় পায় তাঁকে ?‘

রাজা দশরথের ললাটে দুশ্চিন্তা। কে জানে কোন মূর্তি নেবেন তিনি কখন। 

হেনকালে জমদগ্ন্য, যিনি তাঁর পিতার নামে কীর্তিত, সেই তিনি তাঁর হাতে সেই সোনার কুঠার লয়ে ভীমবেগে এসে উপস্থিত হলেন। সকলে কম্পমান। 

দশরথ দেখলেন সম্মুখে দাঁড়িয়ে পুঞ্জিভূত তেজরাশির মত এক পুরুষ আকৃতি। তিনি একজন  যোগী পুরুষ। তিনি কৈলাসের মতো দুর্ধর্ষ। কালাগ্নির মত দুঃসহ। 

ভীমদর্শন ক্ষত্রিয়নাশন ভৃগুপুত্র পরশুরাম। স্কন্ধে তাঁর কুঠার। হস্ত ধৃত তার ধনুক। তাঁর গলায় যজ্ঞ উপবিত। চক্ষু মহাউজ্জ্বল। যেন তিনি ভুজঙ্গবেষ্টিত এক চন্দনতরু। ত্রিপুরনাশী রুদ্রের মত তাঁর রূপ প্রজ্বলন্ত। পরশুরাম এসে দাঁড়ালেন দশরথের মুখোমুখি।

তিনি হুংকার দিলেন, ‘ রাজা দশরথ, শুনলাম তোমার পুত্র জনকের সভায় হরধনুভঙ্গ করে জনককন্যার বরমাল্য লাভ করেছে ? আমার নামে রেখেছো তাঁর নাম !  তাঁর ও নাম রাম ! কোথায় সে ? ডাকো তাকে। আমি দেখতে চাই সে কত বড় বীর ? আমার গুরুর ধনুক ভেঙ্গে আমার অপমান করেছে সে? 

দশরথ বলেন, ‘হ্যাঁ মুনীবর, আপনি যথার্থই শুনেছেন। কিন্তু মুনীবর সে নিতান্ত বালক। সে আপনার প্রতিস্পর্ধার যোগ্য তো নহেন?’

রাম এক্ষনে নেমে এসেছেন তাঁর রথের থেকে মাটিতে। সঙ্গে অন্য রথের থেকে নেমে এলেন লক্ষন।

রাম বলেন, ‘ আপনি আমার প্রনাম গ্রহন করুন। আমি রাম। হরধনু ভঙ্গ করে যদি কিছু ভুল হয়ে থাকে আপনি আমার সেই দোষ ক্ষমা করুন তপস্বী ব্রাহ্মন।’

পরশুরাম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন , ‘ আমি তপস্বী ব্রাহ্মন ?  ওহে অজ্ঞান বালক , কাহাকে তুচ্ছ জ্ঞান কর এমন ?’ 

              কহেন পরশুরাম তখন  আরক্ত নয়ন

               তুচ্ছ জ্ঞান কর দেখি তপস্বী ব্রাহ্মন !

              নিঃক্ষত্রিয় ভূমি করি তিন সাত বার

              রক্ত নদী বহায়েছে আমার কুঠার। 

মহামন্ত্রী সুমন্ত্র  রুক্ষ মেজাজি পরশুরামকে তোষণ করতে এগিয়ে যান, ‘ মহাবীর, আপনি সংযত হ’ন ! রামচন্দ্র বয়সে বালক মাত্র । মহারাজ এমন ক্রোধ আপনার শোভা পায় না!’

মহাবীর  পরশুরাম মহামন্ত্রী সুমন্ত্রর কথায় বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করেন না ! তিনি তাঁর উদ্যত দক্ষিন হস্ত তুলে সুমন্ত্রকে তাদের মধ্যখানে কথা বলতে নিষেধ করে তিনি রাম এর প্রতি তাঁর কথা বলতেই থাকেন ।

               সমস্ত পৃথিবী করি কশ্যপেরে দান ।

               তপস্বী ব্রাহ্মন বলি কর অপমান?                                          

              আমার গুরুর ধনু ভাঙ্গিলেক যেই  ,

              তাহারে বধিয়া তাঁর প্রতিফল দেই ।।[কৃত্তিবাস]

রাজা দশরথ এবং অন্যান্য সকলে ভয়ে কেঁপে ওঠেন।

দশরথ ভীত হয়ে কৃতাঞ্জলি পুটে বললেন, ‘ ভগবন , আপনি শান্ত হোন। আপনি ইন্দ্রের কাছে প্রতিজ্ঞা করে অস্ত্র ত্যাগ করেছেন এবং আপনার তপস্যায় নিরত আছেন। রাম আপনার সমকক্ষ কেহ নহেন। আপনি রামকে অভয় দিন। রাম হত হলে আমরা কেউ বাঁচবো না।’ 

পরশুরাম দশরথকে উপেক্ষা করে পুনরায় রামকে আহবান করলেন, ‘ এই বুঝি তোমার পুত্র রাম ? ‘

সুমন্ত্র বলেন, ‘ মান্যবর, এ আপনি কি বলছেন ? বালক রাম কি জানে? হরধনু ভংগ করতে রাজা জনক যদি নিয়ম করে থাকেন তবে বিনা কারনে দশরাত্মজ রামকে দোষারোপ করা হয় কি উচিত?’ 

দশরথ বলেন, ‘বালকের অপরাধ ক্ষমা করে দিন মহাবীর ।’

পরশুরাম ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, ‘ না না না দশরথ , আমি কোন ক্ষমা জানি না।’ 

এইবার লক্ষনের মুখে তীব্র এক প্রতিবাদ ঝরে পড়ে।

লক্ষন বলে ওঠে ,  ‘মহাবীর আপনি আমা হেন বালকের অপরাধ নেবেন না। আপনি কাকে ভয় দেখাচ্ছেন ?’ 

         রুষিয়া কহেন শক্ত সুমিত্রা কুমার

         কথায় কি ফল কর বীরের আচার ।

          ক্ষত্রিয় বিনাশ তুমি করেছ যখন

         তখন না জন্মেছিল শ্রীরাম লক্ষন ।[ কৃত্তিবাস ]

এ যে একদম যুদ্ধংদেহী রব। এ কি স্পর্ধা ? –  পরশুরাম চমকিত হয়ে তাকিয়ে থাকেন লক্ষনের দিকে। এক্ষনে এক ভীষন রোষে বলে ওঠেন,‘ লক্ষণ, রামানুজ লক্ষণ, আমাকে কেহ দ্বন্দে আহবান করলে আমি তা অবশ্যই পূরন করি অর্বাচীন বালক। আমি স্বয়ং পরশুরাম।’

লক্ষন বলেন, ‘মহাযোগী এহ ক্ষত্রিয়ের ধর্ম। সন্মুখ দ্বন্দে আমরা ও ভয় পাই না।’ 

রাম বলেন,‘ শান্ত হন মহাবীর। রোষ আপনাকে শোভা পায় না। আপনি ব্রাহ্মন। মহাযোদ্ধা। ক্ষত্রিয় কুলের গর্ব। যদিচ সারা পৃথিবী তিন সাত বার নিঃক্ষত্রিয় করে আপনি এমন কিছু সুকর্ম করেননি। ‘

পরশুরাম চমকিত হয়ে তাকান রাম এর দিকে , ‘অর্থাৎ ?’

‘অর্থাৎ , আপনি পৃথিবীর নিয়ামক নহেন । আপনি নিজের পিতার ইচ্ছায় আপন মাতাকে হত্যা করে এমন কিছু মহৎ কাজ করেননি। এ সবই আপনার বিভ্রান্ত সিদ্ধান্ত মহামান্যবর ! ’

এক্ষনে পরশুরাম বালক রামের কথায় কিঞ্চিত স্তম্ভিত হয়ে যান। তিনি যেন কোন উত্তর খুঁজে পান না।

জমদগ্ন তাই এবার নিজেকে সংযত করে তিনি ক্ষত্রিয় নন্দন রামকে সম্মোধন করে বললেন,’রাম তোমার বীরত্ব এবং হরধনু ভঙ্গের কথা শুনেছি। কিন্তু এই দেখ এই আমার বৈষ্ণব ধনু। হরধনুর চেয়েও ভয়ংকর। ভগবান বিষ্ণু তার এই মহাধনু ভৃগুবংশের ঋষি ঋচিককে দান করে ছিলেন। মহাতেজস্বী ঋষি ঋচিক হলেন অহিংস অক্রোধী এবং শান্ত আত্মা। তাই তিনি তাঁর পুত্র জমদগ্নিকে সেই ধনুক দান করে দেন। জমদগ্নি তপস্যারত হয়ে অস্ত্র ত্যাগ করেন। সেই ধনু তিনি আমাকে দেন। দেখো এই সেই ধনু। এই ধনুতে শরযোজন করে তুমি তোমার বীরত্ব দেখাও। দেখি তুমি কত বড় শূরবীর। যদি তুমি সক্ষম হও তাহলেই মাত্র তোমার সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধ সম্ভব।’

 দাশরথি রাম তখন ভার্গব এর ধনুক গ্রহণ করে তাতে অক্লেশে গুন যোজনা করলেন।

        এ কথা শুনিয়া রাম হাসিয়া কৌতুকে ,

         ধনুক নোংগাইয়া গুন দিলেন ধনুকে ।।

           ধনুক টংকার গিয়া উঠিল গগন ,

         পাতালে বাসুকী কাঁপে স্বর্গে দেবগন ।। [কৃত্তিবাস ] 

রামের সম্মুখে আর এক রাম। ধনুর্ধারী দাশরথি রামের সন্মুখে কুঠারধারি ব্রাহ্মণ পরশুরাম।

তখন ব্রহ্মা এবং দেবগন এবং গন্ধর্ব কিন্নর ও ঋষি সিদ্ধচারণগন সকলে সেই অদ্ভুত অসম প্রতিযোগিতা প্রত্যক্ষ করতে সেখানে উপস্থিত হলেন।

এক্ষনে শান্ত এবং নম্রকণ্ঠে রাম প্রতিদ্বন্ধি কুঠারধারি ব্রাহ্মণ পরশুরামকে  বললেন,‘হে ভার্গব আমি আপনার কীর্তিগাঁথা জানি। কিন্তু আমার শক্তিকে আপনি অবজ্ঞা করছেন, তা আমি  নিশ্চয়ই সহ্য করব না।’

দাশরথি রাম এক্ষনে ভার্গব এর ধনুকে শরসংযোগ করে বলে উঠলেন,’আপনি ব্রাহ্মণ। আমার পূজনীয়। তাই আপনাকে বধ করব না।’

       তব ধনুর্বাণে যদি গুন দিতে পারি 

       সেই বানে আমি তব তেজ সংহারী ।।  [কৃত্তিবাস]

রাম বলেন,‘হে ব্রাহ্মন শুনুন, এই শর জ্যামুক্ত হলে তখন হয় আপনার গতিশক্তি না হয় আপনার তপোবল এই দুয়ের যে কোন একটি নষ্ট  হতে বাধ্য। বৈষ্ণব ধনু:শর কখনো ব্যর্থ হয় না।’ 

পরশুরাম এইবার স্তম্ভিত হয়ে রামের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তিনি দেখলেন সামনে চতুর্ভুজ নারায়ন রূপে দন্ডায়মান বালক রাম। এ কি অদ্ভুত !

এক্ষনে তিনি বুঝলেন, তিনি যার সাথে প্রতিস্পর্ধা করতে এসেছেন তিনি সামান্য কেহ নন। তাই হাতজোড় করে বলে ওঠেন, ‘রাম, তুমি আমার ধনুষ গ্রহণ করে গুনযোজনা মাত্র বুঝেছি তুমি স্বয়ং মধুসূদন। ত্রিভুবনের অধীশ্বর। তুমি শরমোচন কর, কিন্তু আমার গতিশক্তি নাশ করো না। রাম, তুমি বরং আমার সকল তপোবল নষ্ট করে দাও। কিন্তু আমার গতিশক্তি রুদ্ধ ক’রো না। তোমার কাছে পরাজিত হয়ে আমার কোন লজ্জা নেই। আমি মহেন্দ্র পর্বতে চলে যাব।’

‘বেশ , তবে তাই হোক !’ – নারায়ন যিনি স্বয়ং রামচন্দ্র তখন তাঁর হস্তস্থিত ধনুঃ হতে শর নিক্ষেপ করলেন। সহসা পরশুরামের সকল তেজ নির্বাপিত হয়ে গেল। তাঁর প্রদীপ্ত তেজঃরাশি রামচন্দ্রের শরীরে প্রবিষ্ট হল। তিনি হতবল এবং নির্জীব হয়ে পড়লেন। আকাশমার্গে তখন ব্রহ্মা এবং দেবগন, এবং গন্ধর্ব কিন্নর ঋষিগন এবং সিদ্ধচারণগন সকলে, যারা সেই অদ্ভুত অসম প্রতিযোগিতা প্রত্যক্ষ করতে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন, তাঁরা সকলে জয়ধ্বনি করে উঠলেন। সমবেত সকলে এক্ষনে এক পরম স্বস্তি বোধ করলেন ।  

তখন ভার্গব যিনি, এইবার রামকে প্রদক্ষিণ করে বললেন,‘ রাম, এই নিগ্রহ আমার কাছে তোমার অনুগ্রহ। আমার পরম সৌভাগ্য আমি তোমার সাক্ষাৎ পেলাম । তুমি স্বয়ং নারায়ন। তুমি আমার প্রনাম গ্রহন কর। আজ আমার তপস্যা সার্থক। যাও রাম তোমার নুতন অধ্যায় শুরু কর।’

সকলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। সকলে এইবার রথারুঢ় হলেন । 

দশরথ এতক্ষন যেন বিকল হয়ে ছিলেন। এখন তিনি তাঁর পুত্রের কৃতিত্বে পুনর্জীবিত এবং গর্বিত হলেন।

পরশুরাম এক্ষনে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে রইলেন এবং দশরথকে বললেন,‘ রাজা দশরথ তুমি ভাগ্যবান। আজ তোমার রামকে দেখে আমার জন্ম সার্থক হল। যাও দশরথ এইবার তুমি তোমার পথে অগ্রসর হও।’

দশরথ প্রনাম জানালেন। পথের বিপত্তি কেটে গেল। দশরথ এবং অযোধ্যাবাসী সকলে এক্ষনে চার রাজপুত্র এবং চার নববধূ কে নিয়ে হৃষ্টমনে তাহারা আবার অযোধ্যার পথে যাত্রা করলেন।

আবার বাজনা বেজে উঠল। বেজে উঠল সানাই শিঙ্গা কাড়া নাকাড়া তূরী ভেরি । 

বরবধূগনকে নিয়ে শোভা যাত্রা এগিয়ে চলল অযোধ্যার দিকে।

ওই দেখা যায় অযোধ্যাতোরন।

| ২১ |

বধূবরণ 

রাজা দশরথ সদলবলে অযোধ্যায় ফিরে এলেন।  

রাজপুত্রগন তাদের নব বিবাহিতা পত্নীদের সঙ্গে যতেক ধন এবং যতেক পরিজন লয়ে দোলা হতে নাবলেন । রাম এবং সীতাকে দেখতে দলে দলে পুরবাসী সব এসে ভীড় করলেন।

                  পরশুরাম জিনিয়া রাম আইলা হরিষে 

                    উত্তরিলা গিয়া রাম আপনার দেশে ।।

                   নানাবর্ণে পতাকা উড়ে, ঘরের চালে চালে

                   উপরে চাঁদোয়া শোভে গগন মণ্ডলে ।।  [ কৃত্তিবাস ]                                             

সবার চোখের মনি রাম ফিরেছেন অযোধ্যায় নববধূ সঙ্গে করে।  চার ভাই তাদের নব পরিণীতা বধুদের সমভিব্যহারে সকলের আনন্দধ্বনির মধ্যে রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করলেন।

                 কুল বধূ যত আছে প্রজার কুমারী

               ঘৃত প্রদীপ জ্বালিল দ্বারে সারি সারি ।। [কৃত্তিবাস ]

রামকে দেখে আনন্দিত দেশের সর্বলোক। কত কীর্তি আর কত বীরত্ব কাহিনী শ্রী রামের  প্রচারিত আজ সকল লোক। রামের তাড়কা রাক্ষসীবধ, রামের দেবী অহল্যা উদ্ধার, রামের মারীচ নিপীড়ন, সুবাহু নিধন, তদুপরি রামের হরধনু ভংগ, সীতার বরমাল্য জয় এবং পরশুরামের দর্পচূর্ণ এ সবই এক এক অক্ষয় কীর্তি দশরাত্মজ রামের। 

দশরথ ও তাই আজ তাঁর বুক ভরা গর্বে  দাঁড়িয়ে আছেন রাজ অন্তঃপুরে পাত্র মিত্র অমাত্য সকলের সঙ্গে।

 আজ রামের চাঁদ মুখ দেখতে উৎসাহী সব পুরজন। কতদিন পরে রাম ফিরে এসেছেন অযোধ্যায় আজ।

                সুবর্ণ কলসীর উপরে শোভে আম্রসার ।  

                 সুপারী ডাব কলা আদি শোভনে বাহার ।।

                কৌশল্যা কৈকেয়ী সুমিত্রা তিন সে সতিনী

                চারি বধূ বরিতে আইলে তিন মহারাণী ।। [কৃত্তিবাস]

মহারাণী কৌশল্যা , ছোট রাণী সুমিত্রা , এবং মেজ রাণী কৈকেয়ী এবং রাজ অন্তঃপুরের অন্যান্য পুরনারীগন সকলে নববস্ত্র নবভূষণ শোভিত হয়ে তাহারা নববধূদিগকে বরণ করলেন । 

           চারি বধূর কাঁখে দিল সুবর্ণ কলসী ।

          চারি বধূ দেখিতে আইল যতেক রুপসী।।

           আলতা চরনে তারা  প্রবেশে অঙ্গনে

           কাঁখে কলসী বধূগন দেখে শ্বশ্রূগনে ।। 

পুরনারী গনের হুলুধ্বনি পুরবাসীদের আনন্দধ্বনি ঘন ঘন শঙ্খ ধ্বনি আর ও নানান কৌতুকময় বাণী অযোধ্যার  রাজ অন্তঃপুরে সে এক আনন্দঘন পরিবেশ গড়ে তুলেছে।  সকলে বলে ওঠেন, ‘রাম এর বৌ এর মুখ দেখো ওগো বড় রানী !’

        ধান্য গুবাক পান আর দীপ ধুপ সনে

       সাজানো কুলায় বরন করে শাশুড়িগনে ।।

        শুভক্ষনে কৌশল্যা দেখেন পুত্রবধূ মুখ 

       চন্দ্রবদন দেখিয়া রানীর হইল পরম কৌতুক ।। [কৃত্তিবাস ]

মঙ্গলাচার ও হোমের পরে তখন সীতা এবং  ঊর্মিলা এবং মান্ডবী ও শ্রুতকীর্তি ক্ষৌমবসনে শোভিত হয়ে অন্তঃপুরে প্রবেশ করলেন এবং  গৃহদেবতার পূজা করে তাঁর সকল মুনিজন গুরুজন এবং মন্ত্রীগনকে অভিবাদন করলেন।   

রাজকন্যারা পরম আনন্দে তাদের স্বামীদের সঙ্গে নিভৃতে বাস করতে লাগলেন। রাজপুত্রগন ও তাহাদের স্ব স্ব পত্নী অস্ত্র ধন ও পরিজন লাভ করে পিতৃসেবায় রত হলেন। 

কিছুকাল পরে শত্রুঘ্নকে নিয়ে ভরত তাঁর মাতুল যুধাজিতের সঙ্গে মাতামহ কেকয় রাজের কাছে গেলেন।

রাম পিতার আজ্ঞায় পৌরজনের প্রিয় ও হিতকর সমস্ত কার্য্য এবং মাতৃগন ও গুরুজনের প্রতি যা যা কর্তব্য সমস্ত করতে লাগলেন। অযোধ্যাবাসী সকলেই তাঁর অনুরক্ত হল।

রাম সীতার সঙ্গে বহু ঋতু সুখে যাপন করলেন। তিনি সীতাকে হৃদয় সমর্পণ করে তদ্গত চিত্ত হলেন। সীতা রামের প্রিয় ছিলেনই। তাঁর রূপ গুনের জন্য রামের অনুরাগ আর ও বর্ধিত হল। সীতার হৃদয়ে ও স্বামীর প্রতি দ্বিগুন প্রীতির সঞ্চার হল। তাঁর হৃদয় নিহিত অভিপ্রায় ও রাম নিজ হৃদয়ে স্পষ্ট বুঝতেন। এবং দেবাঙ্গনা তুল্য রূপবতী লক্ষ্মী রূপিণী সীতা রামের হৃদয় আরও অধিক বুঝতেন। 

নববধূ নব্যবর থাকুক তারা তদ্গত চিত্তে পরস্পর পরস্পরের প্রতি নব প্রেমের বাঁধনে। বসন্তের কোকিল কুহু রবে চতুর্দিক করুক মাতাল। ছয় ঋতু তাদের নব নব রূপে তাদের সন্মুখে কৌতুক বর্ষণ করুক । 

পাঠক এখানে আদিকাণ্ডের যবনিকা পাত হল।

দীর্ঘ বারো বছর পর আবার এই যবনিকা উত্তোলন হবে।

এর ভিতর রাম সীতার জীবনের মধুমাস মধুবর্ষগুলি কেটে যাবে।

আমরা অপেক্ষা করে থাকব পরবর্তী যবনিকা উত্তোলনের জন্য। 

( চলবে )

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

ভজ মন রাম চরণ

ধ্রুপদী সাহিত্য শ্যামলকৃষ্ণ বসু [ আদিকান্ড ২ ]    | ১৯ | কন্যা বিদায় পরদিন প্রভাতে বাজল আর এক বিদায়ের সুর। ঋষি বিশ্বামিত্র বিদায় নিলেন সবার

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

ভজ মন রাম চরণ

ধ্রুপদী সাহিত্য শ্যামলকৃষ্ণ বসু [ আদিকান্ড ২ ]    | ১৯ | কন্যা বিদায় পরদিন প্রভাতে বাজল আর এক বিদায়ের সুর। ঋষি বিশ্বামিত্র বিদায় নিলেন সবার

Read More »

৪ : কালের প্রহরী

                      শুভাশিস ঘোষ একটি বাড়ির চোখ দিয়ে দেখা দুই শতাব্দীর ইতিহাস, মানুষের জীবন ও সময়ের নির্মম পরিবর্তনের কাহিনি পাঁচ ঘোষালবাড়ির নিয়মরীতি ঠিক পছন্দ নয় কানাইচরণের।

Read More »