ধ্রুপদী সাহিত্য : ভজ মন রাম চরণ - শ্যামলকৃষ্ণ বসু
ধ্রুপদী সাহিত্য
শ্যামলকৃষ্ণ বসু
[আদিকান্ড ২]
| ১৩ |
ভগীরথের গঙ্গা আনয়ন
রাম জিজ্ঞাসা করলেন , তারপর ?
মুনিবর বিশ্বামিত্র বললেন,‘তারপর সগররাজার প্রপৌত্র এবং রাজা দিলীপের পুত্র, যিনি রাজর্ষি ভগীরথ, তিনি গঙ্গা অবতরণের জন্য কঠোর তপস্যা করলেন।
কারন গঙ্গাকে মর্ত্যে আনয়নের ভাবনা অনেক পুরুষ ধরে ইক্ষ্বাকু বংশে সঞ্চারিত ঠিকই। কিন্তু তা কার্য্যে পরিনত না করা গেলে পিতৃপুরুষগনের উদ্ধার অসম্ভব। তিনি এক্ষনে সেই অসম্ভবকে সম্ভব হেতু প্রয়াস পেলেন এবং গঙ্গাকে মর্ত্যে আনয়ন হেতু তিনি সহস্র বৎসর ধরে এক ভীষণ তপস্যা করলেন।
সহস্র বৎসর গত হলে পিতামহ ব্রহ্মা ভগীরথের সামনে আবির্ভূত হয়ে তাঁকে বললেন,‘ বৎস ভগীরথ , তোমার তপস্যায় আমি ভীষণ তুষ্ট হয়েছি। তুমি তোমার প্রার্থিত বর চাও।’
ভগীরথ বললেন,‘ ভগবান যদি প্রীত হয়ে থাকেন তবে এই বর দিন, যেন আমি পিতামহদের স্বর্গলাভের নিমিত্তে তাহাদের চিতাভস্ম গঙ্গাজলে সিক্ত করতে পারি।’
ব্রহ্মা বললেন,‘ তথাস্তু ভগীরথ! তোমার মনোরথ পূর্ণ হবে। কিন্তু , স্বর্গ হতে গঙ্গাবারির পতন পৃথিবী সহ্য করতে পারবেন না। তুমি তাঁকে ধারণ করবার জন্য স্বয়ং মহাদেব এর কাছে প্রার্থনা ক’র যাহাতে তিনি স্বর্গ হতে পতিত গঙ্গার বেগকে তাঁর জটামন্ডলে ধারণ করেন।’
ভগীরথ সেই আদেশেই স্বীকৃত হলেন এবং দেবাদিদেব মহাদেবকে সন্তুষ্ট করতে বৎসরাধিক কাল এক কঠোর তপস্যা করলেন।
অতঃ শিব শম্ভু ভগীরথের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে এক্ষনে আবির্ভূত হয়ে ভগীরথকে বললেন,‘ভগীরথ, তোমার তপস্যায় আমি বড় প্রীত হয়েছি। বলো ভগীরথ কি বর চাই ?’
ভগীরথ বললেন, ‘হে দেবাদিদেব, আপনি আমার প্রনাম গ্রহন করুন। স্বর্গ হতে গঙ্গাকে মর্ত্যে অবতরণে গঙ্গার বিশাল বেগকে ধারণ করতে আমি আপনার সাহায্য চাই। আপনি অপেক্ষা আর কেহই গঙ্গাদেবীর গমনের প্রবল বেগকে ধারন করতে সক্ষম হবেন না। আপনি যদি গঙ্গার ধারাকে আপনার জটায় ধারণ করে এই মর্ত্যে প্রবহমান হতে সাহায্য করেন তাহলে আমার তপস্যা সিদ্ধ হয়।’
তিনি বললেন , তথাস্তু ভগীরথ , আমি গঙ্গাকে আমার জটামন্ডলে ধারন করব।’
তখন গঙ্গা বিশাল আকার ধারণ করে স্বর্গ হতে দুঃসহ বেগে শিবের মস্তকে পতিত হতে লাগলেন। সেই বেগবান ধারা এক্ষনে পাতাল পথে প্রবাহিত হতে শুরু করে।
মহাদেব গঙ্গাকে বিন্দু সরোবরের দিকে পরিত্যাগ করলেন।
ভগীরথ তখন শঙ্খধনিতে গঙ্গাকে বরণ করলেন এবং মকরবাহিনী গঙ্গাকে তিনি মর্ত্যপথে পথ দেখাতে দেখাতে এগোতে থাকলেন।
গঙ্গা তখন সপ্ত স্রোতে বইতে লাগলেন। পশ্চিমে হ্লাদিনী পাবনি ও নলিনী , পূর্বের সুচক্ষু, সীতা ও সিন্ধু এবং সপ্তম স্রোত ভগীরথের পশ্চাতে প্রবহমান হল।
রাজর্ষি ভগীরথ দিব্যরথে আরুঢ় হয়ে শঙ্খধ্বনি করে আগে আগে যেতে লাগলেন।
গঙ্গার মর্ত্যে অবতরণ প্রত্যক্ষ করতে দেবর্ষি গন্ধর্ব যক্ষ ও সিদ্ধগন আকাশ মার্গে ভীড় করে দাঁড়ালেন । আসলে পৃথিবী মন্ডলে এ এক অভূতপূর্ব ঘটনা। ধরাতলে এক পুন্যতোয়া নদী গঙ্গার উৎপত্তি। এমন ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে কে না আগ্রহী হবেন ? তাই বৃহৎ বিমান ও অশ্ব গজাদি আরোহন করে দেবগন ও সেই অপূর্ব ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে উপস্থিত হলেন।
গঙ্গার সেই ভীষণ স্রোতধারার পাণ্ডুবর্ণ ফেনপুঞ্জ সহস্র খন্ডে বিকীর্ণ হওয়ায় বোধ হল যেন হংস সমাকীর্ণ শারদীয় মেঘে আকাশ পরিব্যাপ্ত হয়েছে। গঙ্গার প্রবাহ কোথাও দ্রুতবেগে কোথাও কুটিল গতিতে কোথাও প্রসারিত বা সংকুচিত হয়ে কোথাও ধীরে ধীরে বইতে লাগলো। কোন কোন স্থানে জলের সঙ্গে জলের সংঘর্ষ হল। জলপ্রবাহ ঊর্ধ্বপথে গিয়ে আবার ধরাতলে পড়ল। মহাদেবের জটা নিঃসৃত সেই পবিত্র জলধারায় স্নান করে ধরাতলবাসী সকলে তৃপ্ত ও পাপমুক্ত হলো।
রাম এই কাহিনী শুনে আনন্দিত হলেন এবং বললেন , ‘ অদ্ভুত !’
বিশ্বামিত্র বললেন,‘ যুগে যুগে কালে কালে এই আর্য্যাবর্ত্যের উপর দিয়ে এই বহমান স্রোতঃধারার পাশে পাশে কত গ্রাম, নগর , জনপদ গড়ে উঠেছে। আরো কত কত সভ্যতার উন্মেষ হবে এই গঙ্গার কিনারে কিনারে।
রাম তোমার পূর্বপুরুষের এ এক অবিস্মরনীয় কীর্তি।
রাম, শোনো ,গঙ্গার ধারার অনেক নাম। ভগীরথ স্বর্গ থেকে গঙ্গাকে এনেছিলেন বলে তার নাম ভাগীরথি। তেমনই তাকে জাহ্নবী ও বলা হয়।
রাম কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করেন, ‘যেমন ?’
বিশ্বামিত্র বলেন, ‘গঙ্গার গমন পথের এক স্থানে ছিল জহ্নু মুনীর আশ্রম। জহ্নুমুনি তখন যজ্ঞে ব্যপৃত ছিলেন। গঙ্গার বেগবান জলধারায় তাঁর যজ্ঞস্থান প্লাবিত হওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে গঙ্গার সমস্ত জল নিমেষে পান করে ফেললেন। তখন দেবতা গন্ধর্ব ও ঋষিগন স্তব করে জহ্নু মুনিকে বললেন, ‘মুনিবর , গঙ্গা আপনার দুহিতা। রাজা ভগীরথ এই গঙ্গাকে স্বর্গ হতে আহ্বান করে মহাদেবের জটায় ধারন করতে অনুনয় করে। এখন সেই জল রাশি তিনি মর্ত্যলোকে প্রবাহের জন্য পথ দেখিয়ে চলেছেন। আপনি কৃপা করে গঙ্গাকে মুক্ত করুন।’
তখন জহ্নু মুনি তার কর্ণরন্ধ্র দিয়ে গঙ্গাকে মুক্ত করলেন। সেই অবধি গঙ্গার আর এক নাম হয়েছে জাহ্নবী।
গঙ্গা পুনর্বার ভগীরথের অনুগমন করতে লাগলেন। সাগরে পতিত হয়ে গঙ্গা রসাতলে প্রবেশ করেছেন। স্বর্গ মর্ত্য ও পাতালে, এই তিন স্থানে এঁর গতি। সেই জন্য গঙ্গার আরেক নাম ত্রিপথগা।
গঙ্গা অবতরনের আশ্চর্যকথা ভাবতে ভাবতেই রাম লক্ষনের রাত্রি প্রভাত হ’ল।
প্রভাতে তারা তিনজনে নৌকাযোগে গঙ্গার উত্তর তীরে পৌঁছালেন। নদী পার হওয়ার সময় সপ্তধারা গঙ্গার স্তব করলেন ।
বিশ্বামিত্র রামকে বললেন, ‘রাম, এ হলো রাজা সুমতির দেশ। এই দেশের নাম বিশালা। আর এক নাম বৈশালি । এই স্থান উত্তরপ্রদেশে। আজ তবে আমরা এই স্থানেই সুখে রাত্রি যাপন করব। কাল আমরা মিথিলায় প্রবেশ করলে তুমি রাজা জনকের দর্শন লাভ করবে।‘
বিশ্বামিত্রের আগমন শুনে রাজা সুমতি পাত্রমিত্র সমভিব্যাহারে এগিয়ে এসে তাদের আপ্যায়ন করলেন এবং যথোচিত আতিথ্য করলেন।
রাজা সুমতি বললেন, ‘ মুনিবর আপনার দর্শন পেয়ে ধন্য হলাম।’
কুশল প্রশ্নের পর মহারাজা সুমতি বিশ্বামিত্রকে জিজ্ঞাসা করলেন,’ মুনিবর এই খড়গ তূণ কার্মুকধারী পদ্মপলাশ লোচন নব যুবক দুই বীর, এঁরা কার পুত্র? এঁরা রূপে অশ্বিনীকুমার তুল্য। আকার প্রকারে পরস্পরের সদৃশ। যেন দেবলোক হতে দুই দেবতা ধরায় এসে পড়েছেন? এঁরা কেমন করে এই দুর্গম পথে এলেন ? ‘
বিশ্বামিত্র বললেন,‘রাজন, এঁরা অযোধ্যা নরেশ দশরাত্মজ রাম ও লক্ষন। এই ইনি অগ্রজ রাম এবং এই যে অনুজ লক্ষন। আমি এঁদের নিয়ে এসেছিলাম আমার সিদ্ধাশ্রমের যজ্ঞ রক্ষার্থে। রাম তাড়কাকে বধ করেছেন। মারীচকে প্রহার করেছেন।’
রাজন সুমতি সে কথা শুনে বললেন,’ অহোঃ অদ্ভুত ! অদ্ভুত পরাক্রম ! ‘
মুনিবর বললেন,‘ আর এই তাঁর অনুজ লক্ষন। তিনি নীরব ছায়ার মত তাঁর অগ্রজের অনুসরনকারী। প্রয়োজনে রামের পাশে দাঁড়িয়ে অস্ত্র ধরছেন, যুদ্ধ করছেন। আমি সম্প্রতি এঁদের নিয়ে চলেছি মিথিলাতে রাজা জনকের সভায়, তাঁর কন্যা সীতার স্বয়ংবর সভায়। সেখানে হরধনুভঙ্গের এক আয়োজন হয়েছে। আমরা চলেছি সেখানে সকল আগত রাজকুমার গনের প্রতিস্পর্ধা প্রত্যক্ষ করতে।
সুমতি বললেন, ‘সাধু সাধু। রাম লক্ষন আমি তোমাদের অতিথি রূপে পেয়ে আহ্লাদিত। তোমরা আমার পরম সন্মানীয় অতিথি। মুনিবর, আপনারা আমার আতিথ্য স্বীকার করুন।’
রাজা সুমতি পরম সমাদরে তাদের যথোচিত আতিথেয়তা করলেন। রাম লক্ষণ দুই ভাই ও মুনিবর বিশ্বামিত্র সেই গঙ্গাতীরের একটি টিলায় শুয়ে এক রাত্রি বিশ্রাম গ্রহণ করলেন। স্থানটি বর্তমানে হাজিপুর এর রামচৌড়া মন্দির যথায় ।
| ১৪ |
পাষাণী অহল্যা উদ্ধার
সেই রাত্রি বৈশালীতে রাত্রি যাপন করে পরদিন বিশ্বামিত্র রাম লক্ষণ সমভিব্যাহারে মিথিলার পথে রওনা হলেন এবং চলতে চলতে তাঁরা মিথিলা অঞ্চলের আহিয়ারি গ্রামে এসে পৌছালেন।
পথ চলতে চলতে তারা একটি উপবনে একটি পুরাতন আশ্রমের কাছে এসে দাঁড়ালেন। মনুষ্য বিবর্জিত সেই আশ্রম। পরিত্যাজ্য গৃহ পুষ্প লতা বৃক্ষ সকলই ম্রিয়মান। সেখানে পাখিরা ও ডাকে না।
রাম জিজ্ঞাসা করেন, ‘ ঋষিবর এই আশ্রম এমন পরিত্যজ্য কেন? প্রাণ বিবর্জিত মনুষ্য চিহ্ন রহিত। এমন সুন্দর আশ্রম , এ কেমন হতশ্রী নির্জন। মাত্র মৃগ ও ময়ূর এবং শাখামৃগ সব বিচরণ করছে !
বিশ্বামিত্র বললেন, ‘ রাম পূর্বে এখানে ঋষি গৌতম এর আশ্রম ছিল। আজ তা পরিত্যক্ত নির্জন। আগাছা জঙ্গলে কন্ঠকাকীর্ণ। ঋষি গৌতমের স্ত্রী অহল্যা এখানে পাষাণী হয়ে পড়ে আছেন ঋষি গৌতমের শাপে। ‘
রাম অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে, ‘ ঋষি গৌতমের স্ত্রী ? পাষাণী হয়ে ? কিন্তু সে কিসের শাপে ?’
এবার বিশ্বামিত্র মুনি বলে ওঠেন, ‘বলি শোন রাম আমি পূর্ব ইতিহাস। নারীর সতীত্বের লাঞ্ছনাময় কথা। অভিশপ্ত বেদনায় পাষাণ চাপা দীর্ঘশ্বাস,পতিব্রতা অহল্যার জীবনের ব্যথা। ‘
রাম জিজ্ঞাসা করলেন,‘যথা !’
‘ রাম, আজ এ এক অভিশপ্ত স্থান। কিন্তু একদিন এই আশ্রম ছিল এক পরম পবিত্র স্থান। মহর্ষি গৌতম তাঁর পত্নী ব্রহ্মার কন্যা অহল্যার সঙ্গে এখানে তপস্যা করতেন।’
-’অতঃ?’ – রাম জিজ্ঞাসা করেন।
মুনি বিশ্বামিত্র বলতে থাকেন,‘ একদা মহর্ষি গৌতম আশ্রমে ছিলেন না। তিনি তীর্থস্নানে গমন করেছিলেন। কুটিরে ছিলেন মাত্র একাকিনী অহল্যা। তিনি পরমা সুন্দরী। তাই একদিন কামপরায়ন ইন্দ্র গৌতমমুনির ছদ্মবেশে অহল্যার কাছে এলেন এবং স্বামীর পরিচয়ে তাঁকে কামনা করলেন।’
রাম বললেন, ‘অদ্ভুত !’
বিশ্বামিত্র বলেন, ‘ দুর্বুদ্ধি অহল্যা দুর্বলতাবশত ছদ্মবেশী ইন্দ্রের ইচ্ছায় সম্মত হলেন। হর্ষোৎফুল্ল ইন্দ্র তখন হাসতে হাসতে কুটির হতে নির্গত হতেই হঠাৎ দেখলেন, দ্বারে দাঁড়িয়ে আছেন মহর্ষি গৌতম। তিনি সদ্য তীর্থস্নান করে ফিরছেন। হাতে যজ্ঞের কুশ ও সমিধ। তপোবলে প্রদীপ্ত দেহ। উজ্জ্বল দৃষ্টি। তাঁকে দেখে ভয়ে ইন্দ্রের মুখ শুকিয়ে গেল। এক্ষনে এস্তে পলায়নপর ইন্দ্রকে দেখে সর্বজ্ঞ ঋষি সব বুঝতে পারলেন এবং ক্রুদ্ধ হয়ে তিনি ইন্দ্রকে অভিশাপ দিলেন।
জাতি নষ্ট কৈলে তুমি ওহে পুরন্দর।
যোনিময় হউক তব সর্ব্ব কলেবর ॥
অহল্যাকে শাপিলেন ক্রোধে মুনিবর।
আজ হতে তব তনু হউক প্রস্তর ॥
তব শিরে পদ রাম রাখিবেন যখন।
তখনি হইবা মুক্ত না কর ক্রন্দন। [কৃত্তিবাস ]
ঋষি গৌতম অভিশাপ দিলেন অহল্যাকে,‘ পাপিনী অহল্যা, আমি তোমাকে শাপ দিলাম , তুমি অনুতপ্তচিত্তে প্রস্তরীভূত হয়ে এইখানে পড়ে থাকবে যতদিন দাশরথী রাম এসে তোমাকে উদ্ধার না করেন। তোমার শাস্তি, তুমি লোকচক্ষুর অন্তরালে অনাহারে ভস্মশয্যায় বায়ুভুক হয়ে পাথর হয়ে থাক। যেদিন দাশরথি রাম এসে দর্শন দেবেন এই আশ্রমে, একমাত্র সেই দিন তুমি উদ্ধার পাবে তোমার কৃতকর্ম হতে।’
তখন ক্রুদ্ধ গৌতমকে অহল্যা বলেছেন, “মহর্ষি , ক্ষমা করুন । আমাকে দয়া করুন । আমি ছদ্মবেশী ইন্দ্রকে চিনতে পারিনি। আমি জানতাম না , ইন্দ্র আপনার রূপ ধরে এসেছিল। সে আমাকে প্রতারণা করে কলঙ্কিত করেছে। যা ঘটেছে তা আমার স্বেচ্ছাচারে নয়, আমার অজ্ঞানতায়।”
অজ্ঞানাদ্ধর্ষিতা বিপ্র ত্বদূপেন দিবৌকসা।
ন কামকারাদ বিপ্রর্ষে প্রমাদং কর্তুমর্হসি।। (উত্তরকাণ্ড, ৩০/৪২)
কিন্তু পাপ এবং তাই শাপ !
রাম আশ্চর্যান্বিত ভাবে তাকিয়ে থাকেন মুনিবর এর দিকে।
বিশ্বামিত্র বললেন, ‘এসো রাম। এই সেই অভিশপ্ত গৌতম আশ্রম। তুমি আশ্রমে প্রবেশ করে অহল্যাকে শাপমুক্ত কর।’
শাপমুক্ত কর রাম পাষাণী অহল্যারে
তাপিত সে নারী অতি শোক জর্জরিত ।
চরণ স্পর্শ কর ওই কালের পাথরে ,
তব স্পর্শে অহল্যা হ’ন প্রাণ পুস্পিত ।। [স্বরচিত ]
রাম এবার বিশ্বামিত্রের কথায় সেই কালোপাথরে তার পা রাখলেন এবং ‘অহল্যা, উঠুন ’ বলে ডেকে উঠলেন। এক্ষনে সেই পাষাণে যেন এক প্রাণ সঞ্চরণ লক্ষ্য করা গেলো।
বিশ্বামিত্র বলেন, ‘ অহল্যা, ওঠো। দেখো রাম এসেছেন। স্বয়ং রাম তোমায় ডাকছেন।’
এইবার শাপগ্রস্থা অহল্যা, ঘুমভাঙ্গা পাষাণী তাঁর দীর্ঘকালের জড়ীভূত অবস্থা হতে ধীরে ধীরে উঠে বসলেন এবং স্বয়ং রামকে সামনে দেখে চমকে উঠলেন।
বিশ্বামিত্র বললেন, ‘ওঠো অহল্যা। আজ শ্রীরাম পদস্পর্শে তুমি ধন্য হলে।’
এক গভীর দুঃখ হতে জাগ্রত অহল্যা এক্ষনে ভীষণ বিস্ময়ে বলে ওঠেন, ‘রাম ! শ্রীরাম। রাম তুমি এসেছ? আমি যে তোমায় এতদিন ধরে স্মরন করছিলাম রাম। আমি পাপিষ্ঠা। এতদিন পরে তুমি আমার ডাকে এখানে এলে রাম। আমাকে ছুঁয়ে আমায় পাপ মুক্ত করলে। রাম আমি না জেনে পাপ করেছিলাম । তোমার দয়া , তুমি আমায় তবে এত দিনে উদ্ধার করলে তবে ! রাম তুমি আমার পরম উপাস্য। তুমি আমার প্রনাম নাও। আজ আমি তোমার স্পর্শে কলংক মুক্ত হলাম ।’
রাম বলে,‘ না, না, দেবী অহল্যা, আপনি কোন পাপ করেননি। সব সেই ঈশ্বরের লীলা। তিনিই পাপ আবার তিনিই পুণ্য হয়েছেন। আপনি সতীসাধ্বি এবং সর্বকালে প্রাতঃস্মরণীয়া হবেন।’
রাম লক্ষণ এবার সানন্দে অহল্যার পাদবন্দনা করলেন।
রাম বললেন, ‘ দেবী অহল্যা উঠে বসুন। ‘
এক্ষনে দুঃখিত ঋষিগৌতম করজোড়ে এসে দাঁড়ালেন। তিনি আশ্রম শাখায় এতকাল অপারগ হয়ে নিজ কৃতকর্মের অনুশোচনায় আপন স্ত্রী পাষাণী অহল্যার দিকে দুঃখিত অন্তরে তাকিয়ে থেকে কালাতিপাত করছিলেন রাম কবে আসবেন সেই আশায়।
আজ সত্য সত্যই রামকে সশরীরে আসতে দেখে ঋষি গৌতম আনন্দবিহ্বল হয়ে এগিয়ে আসেন এবং রামের দুহাত ধরে কৃতজ্ঞতা মিশ্রিত সে এক হাহাকার করে বলে উঠলেন,‘রাম, আমি ধন্য হলাম। তুমি অহল্যাকে উদ্ধার করলে। আমি ক্রোধবশে অহল্যাকে শাপ দিয়ে ফেলেছিলাম। অহল্যা নির্দোষ জেনে ও এমন ক্রূর কর্ম ঘটেছিল আমা ক্তৃক। রাম আমি তখন ক্রোধে সংজ্ঞাহারা হয়ে ছিলাম।’
রাম বলেন , ‘ শান্ত হন মুনিবর !’
মুনি গৌতম বলে ওঠেন, ‘ রাম , আমি অশান্ত হয়ে ছিলাম তোমার আসার পথ চেয়ে। তুমি ছাড়া কে অহল্যাকে শাপমুক্ত করবে ? রাম, আমি ইন্দ্রের ছল বুঝে উঠতে পারিনি। আসলে ইন্দ্র আমার তপস্যা নস্ট করতে অহল্যাকে ছলনা করেছেন। রাম, আমি ইন্দ্রকে শাস্তি প্রদান করেছি। কিন্তু রাম, অহল্যাকে শাপ দিয়ে আমি আমার অন্তরে এক ভীষণ মর্মদহনে জ্বলে মরেছি। রাম তোমাকে আমি কি বলে যে ধন্যবাদ জানাব। অহল্যা , তুমি আমাকে ক্ষমা কর। রামের পাদবন্দনা কর।’
রাম তার ভুবন ভোলানো হাসি দিয়ে বলে উঠলেন,‘মুনিবর গৌতম, এ সবই ক্ষনিকের প্রমাদ। আপনি আপনার সাধ্বি স্ত্রীর হাত ধরুন।’
অত:অহল্যা গৌতমবাক্য অনুসারে সমাহিত চিত্তে তাদের সংবর্ধনা করে পাদ্য ও অর্ঘ্য দিয়ে এক্ষণে আতিথ্য করলেন। তখন স্বর্গ হতে পুষ্পবৃষ্টি হলো এবং দেবলোকে দুন্দুভি ধ্বনি হতে লাগলো। গন্ধর্ব এবং অপ্সরাগন উৎসবে রত হলেন। দেবগণ ‘সাধু সাধু’ বলে তপ:শুদ্ধা অহল্যাকে সম্মানিত করলেন। ঋষি গৌতম এইবার অহল্যার সহিত পুণ:মিলিত হয়ে সুখী হলেন। রাম তাদের আতিথ্য গ্রহণ করে তাদের সুখী করলেন।
রাম হেসে বললেন , ‘মাতা অহল্যা , আমি আপনার স্নেহে আপনার আতিথ্যে আনন্দিত। মুনিবর গৌতম , আপনি তবে আজ্ঞা করুন , এইবার আমরা প্রস্থান করি।’
দেবী অহল্যা এবং মুনিবর গৌতম এক্ষনে তাদের বিদায় জানালেন।
এক্ষনে সেই স্থান হতে বিশ্বামিত্র দুই রাজপুত্র রাম এবং লক্ষনকে সঙ্গে নিয়ে জনকের রাজ্য মিথিলার দিকে যাত্রা করলেন।
বিশ্বামিত্র যেতে যেতে রামকে বললেন,‘ রাম, নারীকে নিন্দার হাত হতে রক্ষা করা খুবই কঠিন। আর নারীর শুদ্ধি সাধারন মানুষ বিচার করতে পারে না। তারা সত্যই দুর্জন। রাম তোমায় বলে রাখি গৌতম এবং অহল্যার পুত্র হলেন, মুনি শতানন্দ। জনকের যজ্ঞের প্রধান পুরোহিত এই শতানন্দকে তুমি মিথিলায় জনকের সভায় দেখতে পাবে।’
এইবার রাম এবং লক্ষণ গুরু বিশ্বামিত্রের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব মুখে চলতে শুরু করলেন। মিথিলার জনকপুর এখনো আর কিছু পথ বাকি। এবার গমনের লক্ষ্য মিথিলারাজ জনকের যজ্ঞক্ষেত্রের দিকে, যেখানে জনককন্যা সীতার স্বয়ংবর অনুষ্ঠিত হবে। অনেকানেক বীরপুরুষ সেখানে উপস্থিত হবেন। সেখানে অপেক্ষা করছে এক বিশাল প্রতিদ্বন্দিতা । সেখানে হবে দেবাদিদেব মহাদেবের আশীর্বাদী প্রহরন বিশ্বের কৌতুহল বিশাল হরধনুতে জ্যা সংযোগের তীব্র প্রতিযোগিতা । সে এক ভাগ্য পরীক্ষা। যিনি সফল হতে পারবেন সীতা তার গলাতেই বরমাল্য প্রদান করবেন।
প্রায় দ্বিপ্রহরের পর বিশ্বামিত্র এবং দুই রাজপুত্র রাম ও লক্ষন তিনজনে পথ চলতে চলতে পর্বত সানুদেশে মেঘাবৃত প্রদেশে দেখতে পান সেই মনোরম অঞ্চল। ওই দেখা যায় মিথিলা।
| ১৫ |
জনক রাজার দেশে
অবশেষে মিথিলা। মুনি বিশ্বামিত্র দুই রাজকুমার রাম ও লক্ষন সমভিব্যাহারে মিথিলায় এসে উপস্থিত হলেন। মিথিলা অর্থাৎ যাহাকে ত্রিহুত ও বলা হয়, ভারতীয় উপমহাদেশে বিহার রাজ্যের উত্তরে অবস্থিত। সেখানে সীতামড়ি জেলায় সীতার জন্ম। কিংবদন্তি পুরাকালে একটি লুপ্ত ও পবিত্র পৌরানিক নদী বয়ে যেত এই মিথিলার পাশ দিয়ে।
মিথিলার পূর্বে মহানন্দানদী, দক্ষিনে গঙ্গা, পশ্চিমে গন্ডকি নদী এবং এই রাজ্যের উত্তর অংশ হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত। এটি বর্তমানে বিহার ও ঝাড়খন্ডের কিছু অংশ নিয়ে এবং নেপালের তরাই অঞ্চলের পূর্ব অংশে বিস্তৃত।
মুনি বিশ্বামিত্র বললেন,‘রাম,আমরা এখন মিথিলার কাছে সরিশপাহি গ্রামে এসে পড়েছি। ঐ যে পুন্যবতী অমরাবতী নদী। এসো এখানে স্নান আদি সেরে কিছু সময় বিশ্রাম করে ক্লান্তি অপনোদন করা যাক।‘
তাঁরা অমরাবতীতে স্নান সেরে এবং জপতপ সারলেন। স্নানান্তে তাঁরা জনকপুরের উদ্দেশ্যে তাদের পরবর্তী যাত্রা শুরু করেন।
রাজা জনকের রাজধানী মিথিলার জনকপুরে। সেই জনকপুর এখন এক যজ্ঞক্ষেত্র।
রাম লক্ষণ বিশ্বামিত্রের সঙ্গে জনকের যজ্ঞক্ষেত্রে উপস্থিত হলেন।
অনেক বনবনান্তর গহীন কানন পর্বতের শানু দেশ পেরিয়ে কত নির্জন স্থান নদী জলধারা উপত্যকা অধিত্যকা প্রদেশ পেরিয়ে অবশেষে মিথিলায় এসে পৌঁছলেন দুই ধনুশপানি সালংকৃত রাজকুমার রাম এবং লক্ষণ ঋষি বিশ্বামিত্রের সাথে।
মিথিলা সুরম্য নগরী। সৌধ প্রাকার বেস্টিত জনকের রাজধানী। জ্ঞান সাধনা সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র এই মিথিলা । মঙ্গলময়ী সেই নগরী মুনিঋষি দ্বারা সম্পুজিত।
রাম লক্ষণ মুনি বিশ্বামিত্রের সঙ্গে সঙ্গে সপ্রশংস দৃষ্টিতে সব দেখতে দেখতে চলেছেন। জল সিঞ্চিত রাজপথে সতত সুগন্ধি পুষ্পের শোভা।
অযোধ্যা ছেড়ে আসা হয়েছে কতদিন হলো। এতদিন দুই রাজকুমার গভীর জঙ্গল প্রদেশে ঋষিগণের আশ্রমে আশ্রমে ঘুরেছেন। তাঁরা মুনি বিশ্বামিত্রের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে বনবাসী জীবন প্রত্যক্ষ করে এলেন। এত কাল তাঁরা বিশুদ্ধ হবিষ্য কিংবা শিকারকৃত অগ্নিশুদ্ধ হরিনাদির মাংস বা মাত্র কাননের ফলফলাদি গ্রহন করে কালাতিপাত করেছেন। এখন এই জনকনগরে পা রাখতেই এক নয়ন লোভন উৎসব মুখরতা এবং সুগন্ধি খাদ্যগন্ধ মনটাকে যেন লুব্ধ এবং চনমনে করে তুলেছে। এ এক অদ্ভুত পরিবর্তন। কোথায় আশ্রম জীবন আর কোথায় নগর জীবন। কত রঙের শোভায় সেজে উঠেছে আজ মিথিলা নগরী। নগরবাসী সকলে আনন্দমগ্ন। মিথিলা এখন উৎসব নগরী। কত রঙ্গিন পতাকা রঙ্গিন সামিয়ানা কত মানুষজন কত কোলাহল। গৃহচুড়া মন্দির মিনার সব রঙিন। আসলে মিথিলায় বসবে এক জাঁকজমক পূর্ণ আসর। সীতার স্বয়ম্বর। হরধনু ভঙ্গ রঙ্গোৎসব।
রাজা জনকের ভূমিজা কন্যা সীতার স্বয়ংবর সভা। সীতা হবেন স্বয়ংবরা। কত শত রাজা রাজপুত্র কত শত বীর
প্রধানদের সমাগম হয়েছে এই মিথিলা নগরীতে।
মিথিলা এখন গীতবাদ্য আনন্দরঙ্গ মুখরিত। কোথা ও জাদুরঙ্গ, কোথাও নাট্যাভিনয়, কোথাও পুতুল নাচের আসর তো আবার কোথা ও হাস্যকবিদের রঙ্গতামাসা। সুবেশা নরনারী গন এখানে সেখানে জোড়ায় জোড়ায় সদলে নৃত্যগীতরত। কোথা ও রাজা জনকের প্রশস্তি গান আর কোথা ও সীতার গুনের ব্যাখ্যান। নারীগন নৃত্যগীতে বীনা বাদনে রত। পুরুষগন বাদ্য সঙ্গতে মত্ত। সকলে আনন্দিত ।
কোথা ও হাতির রঙ্গ কোথা ও ঘোড়ার দৌড়। কাননে রাজপথে কত রকমের সুন্দর পক্ষীকুলের কলরব এবং ক্ষনে ক্ষনে ময়ুরের কেকা ধ্বনি। আরো কত প্রকার ধ্বনি তরঙ্গে মন আনন্দময় হয়ে উঠছে ।
রাম লক্ষন চলতে চলতে দেখছেন কত দোকানের সারি। সেখানে কত রকমের পশরা। কোন দোকানে স্বর্ণখচিত মনিমুক্তা খচিত নয়ন লোভন গলার হার, হাতের চূড়ি বালা কঙ্কণ, বাহুতে বাজু , পায়ের মল ইত্যাদি। আহা কত রকমের মালা, ঝোলা, চমড়ি গাইয়ের লোমের তৈরি টুপি, পরচুলা আর কত রকমের মুখোশ।
রাম লক্ষন নগরীর শোভা দেখতে দেখতে চলেছেন।
বিশ্বামিত্র বললেন,‘ রাম এই হল রাজা জনকের মিথিলা। চল এইবার আমরা রাজা জনকের সঙ্গে দেখা করি। তার ভবনে আতিথ্য গ্রহন করি।’
এক্ষনে তাঁরা তিনজনে রাজা জনকের ভবন সন্নিকটে প্রায়। ভবন সন্নিকটে ফুলহরে বাগ তরাগ পুষ্পবাটিকা নামে একটি রাজকীয় পুষ্পোদ্যান বিদ্যমান। রাম ও লক্ষ্মণ গুরুর পূজার জন্য পুষ্পচয়ন করতে ইচ্ছা করলেন।
উদ্যানের নিকটেই গিরিজা দেবী মন্দির অবস্থিত।
রাজকুমারী সীতা এসেছেন দেবী গিরিজার আরাধনা করতেন। তিনি সেই উদ্যানে পুষ্পচয়ন করছিলেন।
রাম ও পুষ্প চয়নকালে হঠাৎ দেখতে পান পুষ্প চয়নরতা সীতা ও তার সহচরীদের।
চার চক্ষু একত্র হতেই দুজনে বুঝি শিহরিত হয়ে উঠলেন। হঠাৎ লজ্জায় তাঁরা চোখ সরিয়ে নিলেন। এমনই তো হয়। এ যেন কত জন্মের পরিচয়। চার বোন চার সখী ও তাঁরা। সখিগন রাম লক্ষণকে মিথিলায় আসতে দেখে আনন্দিত হলেন।
রাম সীতাকে দেখে মোহিত। সীতাও পদ্মপলাশলোচন অনিন্দ্যকান্তি রামকে দেখে প্রায় মুরচ্ছিত। আহা ওই তো এসেছেন দশরথ পুত্র রাম। সিদ্ধাশ্রমে তার বীরত্ব , তাঁর অশেষ শৌর্য দেখে আশ্চর্য হয়েছিলেন সীতা। মনে মনে তখনই সেই বীর রাজকুমারকে তিনি স্বামীত্বে বরন করে নিয়েছিলেন বললে অত্যুক্তি হয় না। সেই রাম এসেছেন হরধনুভঙ্গ রঙ্গ দেখতে। আচ্ছা রাম কি হরধনু ভঙ্গ করতে পারবেন ?
আর তেমনই দূর্বাদলশ্যাম রাম মনে মনে ভাবছেন জানকীর কথা। সিদ্ধাশ্রমে দেখেছিলেন। বেদজ্ঞা গুনবতী সৌন্দর্যশালিনী। আহা পূর্ণশশী জ্যোৎস্না বিকিরনে যে শোভা বর্ধন করে, সীতা তদপেক্ষা অধিক সুন্দর। হরধনু ভঙ্গ করা গেলে তবে সীতার বরমাল্য ভাগ্যবানের গলায় শোভা পেতে পারে।
সীতা ভাবেন বৃষস্কন্ধ সমুন্নত বদন ধনুর্বাণ শোভিত উজ্জ্বল দৃষ্টি বীরশ্রেষ্ঠ রাম এসেছেন জনক নগরে । তিনি কি পারবেন এই কুমারীর হৃদয় হরন করতে ?
দেবগনে প্রার্থনা করেন সীতা মনে,
স্বামী করি দেহ রাম কমল লোচনে ।। [কৃত্তিবাস ]
সীতা দ্রুত গিরিজা দেবী মন্দিরে গমন করলেন।
মিথিলাবাসী সকলে তাকিয়ে দেখেন দুই রাজকুমারের দিকে। আহা কি সুন্দর। দুই অনিন্দ্যকান্তি বীর পুরুষ অযোধ্যার রাজকুমারদ্বয় সকলের নয়নের মনি হয়ে শোভিত হলেন।
রাম লক্ষন দেখলেন নানাদেশ হতে বহু সহস্র ব্রাহ্মণ এসেছেন। ঋষিদের জন্য নির্দিষ্ট আবাসগুলি শত শত শকটে সমাকির্ন।
বিশ্বামিত্রের আগমন সংবাদ পেয়ে রাজা জনক তাঁর পুরোহিত শতানন্দ এবং ঋত্বিকদের সঙ্গে এগিয়ে এসে সবিনয় সংবর্ধনা করলেন।
বিশ্বামিত্রে দেখিয়া উঠিল সর্বজন।
আইস বলি দিল রাজা বসিতে আসন ।।
মুনি তবে বলিলেন শুন জনক রাজন
তব ঘরে আইলেন আজ শ্রীরাম লক্ষন ।। [কৃত্তিবাস ]
জনকের যজ্ঞশালায় রাম লক্ষণ এবং বিশ্বামিত্রকে পাদ্য অর্ঘ্য দিয়ে অভ্যর্থনা করলেন রাজ পুরোহিত শতানন্দ ।
পুষ্প মাস । ফুলের গন্ধভরা মলয় পবন। গোধূলি রাগের মোহন আবেশ। তরু পল্লবে পিক কন্ঠের সুর শৃঙ্গার ।
পথশ্রান্ত ঋষি বিশ্বামিত্রের এবং সেই সঙ্গে অযোধ্যার দুই যুবরাজ রাম ও লক্ষনের আগমনের সংবাদ পেয়ে রাজা জনক এবং রাজা কুশধ্বজ পাত্র মিত্র অমাত্য সহ দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তাদের অভ্যর্থনা করলেন।
মুনিবর বিশ্বামিত্র এবং তৎসমভিব্যহারে রাম লক্ষণ কে দেখে জনক অত্যন্ত আনন্দিত হলেন।
জনক বললেন, ‘আসুন আসুন মুনিবর। আমার যজ্ঞশালায় আপনার এবং অযোধ্যাকুমারদ্বয় রাম ও লক্ষন স্বাগতম ।
মুনি শতানন্দ বিশ্বামিত্রকে অভিনন্দন করলেন এবং কুশলাদি জ্ঞাপন করলেন।
বিশ্বামিত্র বললেন, ‘ শতানন্দ আমরা গৌতমের আশ্রমে আপ্যায়িত হয়ে এলাম।’
এই বার শতানন্দ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এই রাজপুত্র কি দীর্ঘ তপস্যা নিরতা আমার যশস্বিনী মাতাকে দেখেছেন ? আমার মায়ের প্রতি ইন্দ্রের দুষ্ট আচরনের কথা কি রাম কে বলেছেন ?’
বিশ্বামিত্র শতানন্দকে সব সংবাদ জ্ঞাপন করলেন। তিনি বললেন, ‘ শতানন্দ, সুসংবাদ এই যে, রাম তোমার মাতা অহল্যার শাপমোচন করে তাঁকে যথাপূর্ব সন্মান প্রদর্শন করে সম্প্রতি জনক সভায় এসেছেন।‘
গৌতমের জ্যেষ্ঠপুত্র শতানন্দ তার জননী অহল্যার শাপমোচন সংবাদে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং রামের সঙ্গে অহল্যা ও গৌতমের সাক্ষাৎকারের সমস্ত বৃত্তান্ত সাগ্রহে শুনলেন এবং বললেন , ‘সাধু সাধু ! আমার মাতার কলংক মোচন করেছেন রাম, আমি আনন্দিত এবং সন্মানিত বোধ করছি।
এইবার একটি স্বচ্ছ সরোবরের তীরে এক সুরম্যকাননের পার্শ্বে একটি সুন্দর আশ্রম সদৃশ্য সুরম্য ভবনে রাজা জনক এবং তস্যভ্রাতা কুশধ্বজের তত্ত্বাবধানে মুনিবর বিশ্বামিত্র এবং রাম ও লক্ষনের বিশ্রাম গৃহের আয়োজন করা হলো।
এই স্থান বিসৌল নামে পরিচিত। বিসৌল গ্রামে রাজা জনকের একটি রাজকীয় আম্রকানন ছিল, যেখানে রাজা জনক মিথিলায় মহর্ষি বিশ্বামিত্রের বাসের জন্য একটি আশ্রম নির্মাণ করে রেখেছিলেন বিশ্বামিত্রের আগমন হেতু।
জনক বললেন, ‘ মুনিবর আপনারা আজ বিশ্রাম করুন। কাল কথা হতে পারবে। এই আশ্রম আপনার সন্মানেই নির্মিত ।’
বিশ্বামিত্র বললেন, ‘ সাধু সাধু।’
[] [] [] [] [] [] []
পরদিন সকালে নির্মল প্রভাতের পুন্য ঘোষনা করে জনকের রাজভবনে মঙ্গল আরতির বাদ্য বেজে উঠল ।
রাজা জনক স্তোত্রমন্ত্র পাঠ করে শাস্ত্রবিধি অনুসারে মহর্ষি বিশ্বামিত্রকে এবং রাম লক্ষন দুই রাজকুমারকে ও অভ্যর্থনা করলেন।
বিশ্বামিত্র বললেন, ‘রাজা জনক আপনার আতিথ্যে আমি মুগ্ধ। আমি তোমার ধর্মসভা দেখব। তোমার কন্যা সীতার স্বয়ংবর দেখব বলে এসেছি।’
জনক বললেন, ’ ভগবান স্বাগতম তেহস্তু ! আপনাকে প্রণাম করি। কি আদেশ আজ্ঞা করুন। ‘
বিশ্বামিত্র বললেন,‘রাজন, কোশল রাজকুমার রাম এবং লক্ষণ এসেছেন আমার সঙ্গে। আপনার রাজবংশের রক্ষিত পরম আশ্চর্য সেই হরধনু দেখবার জন্য তারা উৎসুক। আমি সেই উগ্রায়ুধ পিনাক সংবাদ জানতে এসেছি ।’
রাজা জনক বললেন, ‘সে আমার পরম সৌভাগ্য। আপনারা আসুন আমার দেবমন্দিরে। শৈবচাপ সেই ধনু সেই স্থানে রক্ষিত আছে।’
মুনিবর তাঁর দুই শিষ্য রাম ও লক্ষন সহ সেই দেবমন্দিরে গিয়ে দেখলেন এক বিরাট সুদৃশ্য কাচের ঢাকার মধ্যে সেই দিব্য ধনু রক্ষিত। সেই ধনু গন্ধমাল্যানুলেপিত এবং নিত্য পূজিত। সহজেই অনুমেয় তার বিশাল ভার।
রাজা জনক বললেন, ‘বিদেহ রাজবংশের মহিমা আর গৌরব এই হরধনু। লোকবিশ্রুত সে পুণ্য মাহাত্ম্য। যখন দক্ষযজ্ঞে মহাদেবকে যজ্ঞভাগ দেওয়া না হয়, তখন দেবাদিদেব কুপিত হয়ে তাঁর হরধনুতে টংকার দিলেন। তিনি সকল দেবতার শিরচ্ছেদ করতে উদ্যত হলেন। তখন সকল দেবতারা দেবাদিদেবকে স্তুতি করতে লাগলেন। দেবগনের স্তবে সন্তুষ্ট হলেন আশুতোষ। তিনি তার সংহারউদ্যত ধনু নত করে সেই ধনু দেবতাদের দান করলেন।
আনতেনাথ শুলেন পানিনামিত তেজস
পিনাকমিতি চোবাচ শুলমুগ্রায়ুধ প্রভু: ।। [বাল্মীকি ]
[ শিব তাঁর তার আপন হস্তের শুল আনত করে উগ্রায়ুধ পিনাকে পরিণত করেছিলেন। ]
দেবাদিদেব আমার পূর্বপুরুষ রাজা নিমির পুত্র দেবরাতকে সেই ধনু রক্ষা করতে দেন। সেই হতে দেবতাদের আশীর্বাদস্বরূপ ঐ শৈবচাপ আমাদের রাজপরিবারের মন্দিরে অগুরু চন্দনে নিত্য পূজিত হয়ে আসছে। এই হরধনু আমাদের বংশের শক্তি ও মহিমার প্রতীক।
বিদেহ রাজবংশের মহিমা আর গৌরব এই হরধনু। সেই হরধনুতে যিনি গুনযোজনা করতে সক্ষম হবেন তাঁর হাতে অর্পিত হবে আমার কন্যা। অযোনিসম্ভবা সীতা আমার কন্যা। আমার বংশের সৌভাগ্যলক্ষ্মী। ওই যে দেখুন। ওই সেই হরধনু চন্দন চর্চিত সদা পূজিত আমার গৃহমন্দিরে।’
বিশ্বামিত্র বললেন,‘ অহোঃ এ যে বিশাল ধনু। এর দর্শনেই মহিমা বিচ্ছুরিত ।’
রাজা জনক বিশ্বামিত্রকে বললেন, ‘মুনিবর, মনুষ্য দূরে থাক, সুরাসুর যক্ষ রক্ষ কেহই এই ধনুতে জ্যা রোপন করতে সক্ষম নয়। এই শৈবচাপকে উত্তোলন করতে কিংবা শর সংযোগ করতে বা জ্যা আকর্ষণ করতে ও সক্ষম হয় না কেহই। যদি রাম তাহাতে জ্যা রোপন করতে পারেন তবে তাঁকে আমি সীতা দান করব।
রাজা জনকের ভ্রাতা কুশধ্বজ সংযোজন করেন,‘ মুনিবর, এ হরের ধনু ! এই ধনু বিশাল ওজন সম্পন্ন। এই শৈবচাপকে স্বয়ংবর সভায় নিয়ে যেতে অন্তত দুহাজার লোক এর দরকার। এক বড় শকটে নিয়ে গিয়ে একে সভায় স্থাপিত করা হবে।’
রাজা জনক বললেন,‘ মুনিবর, অতীতে আমার এই কন্যার পাণিপ্রার্থী হয়ে এসেছেন অনেক পরাক্রান্ত রাজা । কিন্তু তারা কেহই এই হরধনু উত্তোলন করতে পারেন নি। তাই আমি ও তাদের কন্যাদান করিনি। আমার প্রত্যাখ্যানে সকলে অপমানিত ও ক্রুদ্ধ হল। তারা এক সাথে মিথিলা আক্রমন ও অবরোধ করলেন। শত্রুর আক্রমন প্রতিহত করতে আমার সমস্ত সৈন্যবল ধনবল নিঃশেষ হয়ে গেলো। এক বৎসর মিথিলা অবরোধ করে তারা অত্যাচার উৎপীড়ন করতে থাকে। আমি আর্ত অসহায় হয়ে পড়লাম। তবু প্রতিজ্ঞায় অটল ছিলাম। বীর্যশুক্লা আমার সীতাকে কোন দুর্বল রাজার হাতে কখনো দেব না। শেষে দেবগন প্রসন্ন হলেন। দৈবের সাহায্যে আমি শত্রুদের পরাস্ত করে বিতাড়িত করি।
বিশ্বামিত্র বললেন, ‘ মহারাজ দেবতার শক্তি ও আশীর্বাদ যারা বহন করেন তাদের বিরুদ্ধে সর্বদা জগতের ঘোর অপশক্তি সব শত্রু হয়ে ওঠে। ‘
রাজা জনক বললেন, ‘ যথার্থ মুনিবর! একদিন ক্ষেত্রকর্ষণ কালে ভূমির হলরেখা হতে উত্থিত হয় আমার কন্যা সীতা। সে আত্মজা রূপে বড় হয়েছে। আমার এই অযোনিজা কন্যা বীর্যশুল্কা হবে আমি এই স্থির করেছি।’
বিশ্বামিত্র বলেন,‘ সাধু সাধু সাধু । রাজন আপনার এই দুই দুর্লভ সৌভাগ্যের মধ্যে হয়ত কোন গৌরবের সম্বন্ধ আছে।’
জনক বললেন, ‘সে আমার পরম সৌভাগ্য। সীতার স্বয়ংবর সভায় এই হরধনু প্রদর্শিত হবে।

[ আদিকান্ড ২ ]


