ভজ মন রাম চরণ

ভজ মন রাম চরণ

ধ্রুপদী সাহিত্য : ভজ মন রাম চরণ - শ্যামলকৃষ্ণ বসু

ভজ মন রাম চরণ

ভজ মন রাম চরণ

ভজ মন রাম চরণ

ভজ মন রাম চরণ

ভজ মন রাম চরণ

[আদিকান্ড ২]

| ১০ |

সিদ্ধাশ্রমে যজ্ঞ 

সিদ্ধাশ্রমে যজ্ঞের আজ প্রথম দিন। 

বিশ্বামিত্র মৌনব্রত অবলম্বন করেছেন। তিনি এখন যজ্ঞকালে কারো সাথেই কোন কথা বলবেন না।  তিনি যা বলবেন সব কিছুই ইশারায়। তিনি সাতদিন মৌনী থাকবেন এই যজ্ঞকালে। মারিচ ও সুবাহু দুই রাক্ষস সহোদর যজ্ঞ শুরু হলেই  হয়ত আক্রমণ করতে আসবে। তিনি রামকে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন আগেই।

রাম অভয় দেন, ‘আপনারা নির্ভয়ে  যজ্ঞকর্ম  করুন। আমরা দুই ভাই  সদাসতর্ক থাকব যজ্ঞ পাহারা দিতে।’ 

আশ্রমবাসি মুনিগণ, শিষ্যগণ, ব্রাহ্মণগন সবাই যে যার ভুমিকায় কর্মচঞ্চল হয়ে উঠলেন।

রাম এবং লক্ষন তাদের অস্ত্রাদিতে শান দিয়ে নিলেন। প্রথম রাত্রিতে রাক্ষসের আক্রমন এর মুখোমুখি হওয়ার সেই দুঃস্বপ্ন বড়ই সজীব। রাম লক্ষনের তাই এখন নিশ্ছিদ্র সতর্কতার প্রস্তুতি চলতে থাকে। 

অন্যদিকে আশ্রমসেবকগনের সঙ্গে বৈদেহি সহ তাঁরা চার ভগিনি রন্ধনসালে রন্ধনকর্মে ব্যপৃত হলেন সকল আশ্রমবাসী এবং অতিথিবৃন্দের জন্য। 

বিশ্বামিত্র মৌনি থেকে যজ্ঞকর্ম শুরু করলেন। আশ্রমবাসি সাধুমুনিগণ এইবার যজ্ঞবেদী ঘিরে যজ্ঞকর্মে ব্যাপৃত হলেন। তারা আশ্রম পরিসরে উন্মুক্ত আকাশের নীচে পূর্ব হতে প্রস্তুত এক যজ্ঞবেদিকে ঘিরে সকলে বসলেন। তারা যজ্ঞস্থলে গিয়ে বসলেন কুশ তিল হরিতকি কোসাকুসি মধুপর্ক নিয়ে ।

তারা সংগ্রহকৃত ফুলফল আদি দিয়ে এবং যথেষ্ট ঘৃত মধু বিল্লপত্র পাটকাঠি দিয়ে সাজালেন সেই যজ্ঞবেদির চতুর্দিকে। কেহ বসলেন ব্যাঘ্রচর্মে কেহ বা কুশাসনে। এক্ষনে যজ্ঞকর্ম শুরু হলো বিশ্বামিত্রর পৌরহিত্যে। যজ্ঞবেদীতে অগ্নিসংযোগ করে তাঁরা যজ্ঞকর্ম শুরু করলেন।

ঋষি বিশ্বামিত্র মন্ত্রপাঠ শুরু করলেন। সকলে পূর্বদিকে মুখ করে কুশাসনে বসে যজ্ঞ আরম্ভ করলেন। মন্ত্রের প্রভাবে যজ্ঞবেদীতে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হল। যজ্ঞের ধুম আকাশ পথে উঠতে শুরু করল।

             নমো ব্রহ্মণ্য দেবায় গো ব্রহ্মন হিতায় চ

            জগদ্ধিতায় কৃষ্ণায় গোবিন্দায় নমঃ নমোহঃ।।

          নমঃ অপবিত্র পবিত্র বা সর্বাবস্থাং গতোহ পিবা ,

            যঃ স্মরেৎ পুন্ডরীকাক্ষং স বাহ্যাভ্যন্তর শুচিঃ।

            নমস্তে পরমং ব্রহ্ম , নমস্তে পরমাত্মনে

           নিরগুনায় নমস্তুভ্যং সদ্রুপায়ং নমোঃ নমোহঃ।।  

         

আশ্রমবাসি মুনিগণ, শিষ্যগণ, ব্রাহ্মণগন সকলে এক্ষনে যজ্ঞকার্যে ব্যাপৃত। রামলক্ষণ যজ্ঞভূমি প্রহরায় সদা সতর্ক । প্রথম কয়েকদিন নির্বিঘ্নেই কেটে গেলো। সন্ধ্যার পর সকলে মিলে স্বাভাবিক কাজকর্ম বার্তালাপ করলেন।

আশেপাশে গ্রাম হতে দুগ্ধ দধি মাখন থেকে শুরু করে সুগন্ধি চাউল, সুগন্ধি মুগ ডাল আরো কত সুগন্ধি মশলা ইত্যাদি যজ্ঞ কারনে এনে গ্রামবাসী সকলে আশ্রম সেবকদের হাতে তুলে দিচ্ছেন।   

রাজা জনক এবং রাজা কুশধ্বজ বিশ্বামিত্র মুনীর যজ্ঞকর্ম প্রত্যক্ষ করতে বসে আছেন যজ্ঞস্থলে। তাহাদের চারকন্যা যজ্ঞ দেখতে আসা সকলের জন্য আশ্রমবাসি সেবকদের সাথে হাতে হাত লাগিয়ে রন্ধনশালায় ব্যস্ত রয়েছেন ।

সারাদিন যজ্ঞধুম উদ্গিরন,মন্ত্রপাঠ, প্রসাদবিতরন এবং কত শ্রদ্ধালু মানুষের আনাগোনা আশেপাশের লোকালয় হতে চলতেই থাকে। 

সন্ধ্যার পর সকলে শ্রান্ত হয়ে বসেন এবং সারাদিনের কত কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করেন ।

আজ তিন দিন হল যজ্ঞের আসরে কোনরকম বিঘ্ন ঘটেনি। কখন কি ঘটবে বলা যায় না। রাক্ষসদের চতুরতা। তারা সুযোগ সন্ধানী ও বটে। তাই সবাইকে সন্ত্রস্ত থাকতে হয় কখন রাক্ষসদল অযথা উৎপাত করে বসে।

অবশ্য প্রথম দিনেই মারীচের অনুচর যত রাক্ষসেরা একবার হানা দিয়ে বুঝে গিয়েছিল এ বড় কঠিন স্থান। এখানে আছেন রাম লক্ষন দুই ভাই । তাদের মত বীর কেহ নাই। তবু ভয় পেয়ে তো আর কেউ বসে থাকবে না।

রাম লক্ষণ তদনুসারে দিবারাত্র সতর্ক থাকলেন।    

ষষ্ঠ দিবসে সহসা যজ্ঞবেদি প্রজ্জলিত হয়ে উঠলো নিশাচরদের প্রক্ষিপ্ত হাড় রক্তে মাংসে। আকাশে ভয়ংকর শব্দ শোনা গেল।        

চারিদিক ঘোর কালো করে বাতাসে পুঁতিগন্ধ বিকিরণ করে তাড়কা পুত্রদ্বয় মারিচ এবং সুবাহু এবং তদঅনুচর যতেক রাক্ষসগন হানা দিল গহীন জঙ্গলের ভিতর হতে।

রাম দেখলেন লক্ষণ ও দেখতে পেলেন,  ঐ যে ঐ, হাজারে অযুতে কোটিতে রাক্ষস এবং রাক্ষস।  কদাকার কুৎসিত কলুসিত রঙ  তথা লাল কালো ধুম্র পিঙ্গলবর্ণ রক্তচক্ষু কষায় নেত্রে বিকট রকমে মুখব্যাদন করে হা হা রবে রাক্ষসগন গাছ পাথর নিয়ে যজ্ঞস্থলে ভীষণ রবে আক্রমণ করেছে। 

রাম লক্ষণ দুই রাজপুত্র এইবার ধনুকে টংকার দিয়ে জানিয়ে দিলেন তারাও প্রস্তুত আছেন রাক্ষসকুল বধিতে। 

রাক্ষসেরা  তাদের অর্ধভুক্ত রক্ত মাংস হাড় আদি প্রক্ষেপন করতে শুরু করেছে। 

রাম লক্ষণ এক্ষনে আকর্ণ বিস্তৃত জ্যা টেনে বাছা বাছা রকমের মন্ত্রপূত সব শরক্ষেপন করতে থাকেন রাক্ষসগনের দিকে।

               হীরাবান জিরাবান অতি ক্ষুরধার 

               রাক্ষস উপরে করে অতীব প্রহার ।। [কৃত্তিবাস ]

রাম লক্ষণ পাশুপত এবং ইন্দ্রবান মেরে রাক্ষসকুলকে প্রতিরোধ করে ধরাশায়ী করলেন।

বরুনাস্ত্র পাশ, বায়ব্যবান ,সে সব এক এক কালানল সম শর রাশি রাশি রাক্ষসকুলকে প্রহার করে অস্থির করে তোলে ।

রাক্ষসগন ভুক্তাবশিষ্ট মাংস এবং রক্ত ছুড়ে মারতে থাকে যজ্ঞস্থলি নস্ট করতে।

আশ্রমবাসিদের মধ্যে আবার  আতংক জেগে ওঠে। রাজা কুশধ্বজ ও তাঁর হস্তধৃত অস্ত্র লয়ে পশুগুলিকে রক্ষা করতে এগিয়ে যান পশুশালার দিকে।

মারিচ ও সুবাহু এবং তাদের অনুচরগণ ভীমমূর্তি ধারণ করে বেদির উপর রুধির বর্ষণ করতে লাগলো। সেই  রাক্ষসেরা তাদের প্রতিহতকারী রাম এবং লক্ষনকে যত ক্ষুরধার মুষল হানতে থাকে।  

রাম এইবার তার ধনুক হতে এক একটি প্রচন্ড বান হেনে শত শত রাক্ষসকে ভীষণ প্রহার করলেন। কত শত রাক্ষসকে আবার সংহার  ও করলেন। 

এক্ষনে রাক্ষসগনের সেনাপতি মারীচ অন্তরাল হতে আবির্ভূত হয়ে হুংকার দিয়ে বলে ওঠে, ‘রাম, আমি মারীচ ! আমি আমার মাতা তাড়কার অন্যায়রকমের হত্যার প্রতিশোধ নিতে এসেছি। আমার হাতে আজ তোমার মরণ!’ – এবং এই কথা বলে মারীচ ভীষণ ভীষণ রকমে আক্রমন হানে রামের উপরে ।

রাম এক্ষণে সরাসরি উপযুক্ত অস্ত্র সন্ধান করে নিশাচর মারীচকে শাসন করে বলে ওঠেন, ‘ মারীচ আমি রাক্ষসকুলকে  নিধন করতে প্রতিজ্ঞা করে এসেছি। কিন্তু আমি এখন দয়া করে তোমাকে মারব না। তবে তোমাকে বিচেতন করে শুন্যমার্গে শতযোজন দূরে নিক্ষেপ করব ! ‘  -এবং এই কথা বলে রাম এক ঐহিক বানে মারীচের বক্ষে সজোরে আঘাত করলেন।

মারীচ  হতচেতন  হয়ে শুন্যমার্গে ঘুরতে ঘুরতে শতযোজন দূরে মহাসাগরে নিক্ষিপ্ত হ’ল।  সকলে চমৎকৃত হলেন ।

এইবার মারীচের ভ্রাতা রাক্ষস সুবাহু তাঁর তীক্ষ্ণনখর দ্বারা রামকে ছিঁড়ে ফেলতে তাঁর দুই বাহু প্রসারিত করে দন্ত কিড়িমিড়ী করে তীব্রবেগে রামকে ধরতে  এগিয়ে আসে। – ‘ রাম,  তবে আমি তোমাকে আমার এই নখর দ্বারা ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলব!’

রাম এক্ষনে সুবাহুকে নিধন করতে তীব্র শাসনে বলে উঠলেন, ‘ ওরে মায়াবী রাক্ষস এইবার তবে তুই  মর!’ এবং এই কথা বলে তিনি রাক্ষস সুবাহুকে আগ্নেয়াস্ত্রের দ্বারা বধ করলেন এবং বায়বীয় অস্ত্রে অপর রাক্ষসদের ও নিঃশেষ করলেন।  সেনাপতিহীন রাক্ষসগন এইবার তারা যুদ্ধে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে প্রাণ নিয়ে সবেগে পলায়ন করে।  

সকলে রাম লক্ষণকে ধন্য ধন্য করলেন ।                              

ঋষি বিশ্বামিত্র এক্ষনে হাস্যমুখে দুই রাজপুত্রকে দুই হাত তুলে নীরবে আশীর্বাদ করলেন এবং এইবার তিনি নির্ভীক ও নির্বিকার চিত্তে যজ্ঞকর্ম সম্পাদন করতে শুরু করলেন।  নুতন এক যজ্ঞবেদী প্রস্তুত হ’ল।

মন্ত্রের প্রভাবে যজ্ঞবেদীতে আবার অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হল। যজ্ঞের ধুম আকাশ পথে উঠতে শুরু করল।

ঋষিবর  বিশ্বামিত্র এক্ষনে যজ্ঞভাবনার শেষ মন্ত্র আবৃত্তি করলেন ,

                    অগ্নে নয় সুপথা রায়ে অস্মান

                     বিশ্বানি দেব বয়ুনানি বিদ্বান। 

হে অগ্নিময় ব্রহ্ম জ্যোতিঃ। হে জ্যোতিষ্মান পুরুষ। তুমি আমাদিগকে সুপথে লইয়া যাও। যে পথে গেলে অমৃতময় প্রেমধন পাইব সেই পথই সুপথ। সেই পথে তুমি আমাদের চালিত ক’র। আমরা তোমার কৃপা প্রার্থী মাত্র। হে জ্যোতিষ্মান পুরুষ , তোমাকে নমস্কার। হে অগ্নিময় ব্রহ্ম জ্যোতিঃ , তোমাকে নমস্কার। হে পরম ব্রহ্ম , তোমাকে নমস্কার।

অবশেষে তিনি  শান্তি পাঠ করলেন।

        ওঁ ভদ্রং কর্ণেভি শৃনুয়াম দেবাঃ

                    ভদ্রং পশ্যেমাক্ষভির্যজত্রাঃ

            স্থিরৈরঙ্গৈস্তষ্টুবাংসস্তনুভি

                  ব্যশেম দেব হিতং  যদায়ুঃ ।।

                    ওং শান্তি শান্তি শান্তি ।।  [উপনিষদ ]

ঋষি বিশ্বামিত্র নির্ভীক ও নির্বিকার চিত্তে যজ্ঞকর্ম সম্পাদন করে ওঠেন। তিনি নিশ্চিত ছিলেন রাক্ষসগন রামের হাতে বিনস্ট হবে। 

এইবার তিনি সকলকে যজ্ঞের শান্তিবারি সিঞ্চিত করে হৃস্টচিত্তে বলে ওঠেন, ‘আমি জানতাম, রাম ঐ রাক্ষসদের সম্পূর্ণরূপে পর্যুদস্ত করতে পারবে।’                       

উপস্থিত সকলেই এবার ধন্য ধন্য করে ওঠেন। – রাক্ষসগনকে  সংহার করতেই তো রামের পদার্পণ। 

এক্ষনে সকলে রামের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। 

বৈদেহি বলেন, ‘ বীর এমনই হয়।’

শ্রুতকীর্তি বলেন, ‘যেমন আপনি রাম তেমনই ভাই লক্ষণ।’  

রাজা জনক বললেন, ‘ সত্যিই অসাধারণ বীর অযোধ্যা কুমারগণ।’

মান্ডবি বলে ওঠেন, ‘ বীর বলতেই হয় অযোধ্যাকুমার রাম এবং লক্ষন দুই ভাইকে।

রাজা কুশধ্বজ বলেন,‘ মুনিবর, আজ আমরা দেখলাম দশরাত্মজ রাম লক্ষনের এ এক আশ্চর্য্য বীরত্ব  এবং  রাক্ষসদের  এ এক আশ্চর্য প্রহার।’

রাজা জনক বললেন , ‘ আমি নিশ্চিত , রাম লক্ষণ ভিন্ন অন্য কেহই এই রাক্ষসদের সাথে এমন অসম যুদ্ধ করতে সক্ষম হতেন না।’

বিশ্বামিত্র এইবার রাজা জনক এবং তদভ্রাতা কুশধ্বজকে বলেন,‘ আমি রাজা দশরথের শরণাপন্ন হয়ে তাঁর কাছে আমি রামকে চেয়ে এনেছি এই সিদ্ধাশ্রমে যজ্ঞ রক্ষার্থে। নচেৎ আমার এই যজ্ঞ হয়ত অসম্পূর্ণই থেকে যেত মারীচ রাক্ষসের অত্যাচারে। রাম বশিষ্ঠদেবের শিষ্য। রামের মত বীর এক্ষনে কেহই নহেন এ কথা অনস্বীকার্য। ‘  

জনক বললেন, ‘ যথার্থ। রাম আমাদের সকলের প্রশংসার যোগ্য।’   

বিশ্বামিত্র রামকে জিজ্ঞাসা করেন,‘ কিন্তু, রাম, মারীচ রাক্ষসকে সংহার না করে শুধুমাত্র প্রহার করে ছেড়ে দিলে মাত্র?  এর কারণ কি?’

রাম বলে ওঠে, ‘ মুনিবর, আমি মারীচের জননী তাড়কাকে হত্যা করতে বাধ্য হয়েছিলাম। মারীচকে তাই এবার হত্যা করতে মন সায় দিল না।  তাঁকে তার ঔদ্ধত্যের কারনে সামান্য প্রহার করেই ক্ষান্ত দিলাম।’ 

মুনিবর বললেন, ‘সে তোমার অসীম দয়া। কিন্তু মারীচ বেঁচে থাকা অর্থ, সে কিন্তু জানবে পরে ও আবার বিঘ্ন ঘটাতে সচেষ্ট হবে সুযোগ পেলে।’

লক্ষন বলে ওঠেন,‘ তখন তার মৃত্যুদন্ড অবধারিত।

বিশ্বামিত্র বললেন, ‘তাই সম্ভব। তবে সে হয়ত একবার ভেবে দেখবে রামের অসামান্য দয়ার কথা। আমি মনে করি ।’

কুশধ্বজ বলেন, ‘ নিশ্চয়ই। সে অসম্ভব নয় ।’

সকল মুনি ঋষিগণ রাম লক্ষণকে সাধুবাদ জানালেন এবং তাঁকে এইবার বিশ্রাম করতে বললেন।

রাম এবং লক্ষণ তাদের শ্রান্তি অপনোদন করতে সরোবরে নেমে স্নান করলেন।  অতঃ তারা দুইজন স্নান সেরে পূজা পাঠ সেরে এসে বসবেন আশ্রম প্রাঙ্গনে।  এখন সামগান হবে । 

আশ্রমের এই যজ্ঞ সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে এর থেকে সুসংবাদ আর কি হতে পারে।

 ১১।

হরধনু ভঙ্গে রামের আমন্ত্রন

এইবার রাজা জনক কিঞ্চিৎ গভীরস্বরে মুনিবর বিশ্বামিত্রকে বললেন, ‘ঋষিবর আপনার সাথে আমার একটি কথা আছে । চলুন অন্য কোথাও আমরা গিয়ে বসে আলোচনা করি !’

বিশ্বামিত্র বললেন,‘ বেশ, চলুন , আমরা না হয় যজ্ঞভূমিতে  গিয়ে বসে নিজেরা কথা বলি।’

মুনিবর তখন রাজা জনককে নিয়ে যজ্ঞস্থলে গিয়ে দুজনে নিভৃতে বসলেন কথঞ্চিত আলাপচারিতায়।

রাজা জনক বললেন , ‘ মুনিবর আমার একটি প্রস্তাব আছে।’

বিশ্বামিত্র বলেন, ‘ কি প্রস্তাব, আমাকে বলুন রাজা জনক?’

রাজা জনক বললেন,’ রাম যেমন বীর, এক্ষনে আমার ইচ্ছা, আমার অযোনিজা কন্যা সীতাকে যদি রামের হাতে সম্প্রদান করা যায় ? রাম আমার কন্যার উপযুক্ত বর হবেন বলেই আমার বিশ্বাস !’  ‘

বিশ্বামিত্র বলেন,‘ রাজা জনক, এ তো অতি উত্তম প্রস্তাব। কিন্তু রাজন হরধনু ভঙ্গ না করলে যে কেউ সীতার হাতে বরমাল্য লাভ করতে পারবে না বলে সকলেই জানে? নচেৎ আমি নিজেই হয়ত সীতার জন্য রাম এর কথা উত্থাপন করতাম আপনার কাছে।’

রাজা জনক বললেন, মহর্ষি আমাদের বিদেহ রাজবংশের মহিমা এবং গৌরব সেই হরধনু। দেবতারা আমার পূর্বপুরুষ রাজা নিমির পুত্র দেবরাতকে সেই ধনুরক্ষা করতে দিয়েছিলেন। সেই হতে দেবতাদের আশীর্বাদ স্বরূপ সেই শৈবচাপ আমাদের রাজগৃহে অগুরু চন্দনে নিত্য পূজিত হয়। বিদেহ বংশের শক্তি ও মহিমার প্রতীক সেই হরধনু। অতীতে এই  হরধনু দেখতে অনেক বীর এসেছিলেন। কিন্তু কেউই এই হরধনুকে বিন্দুমাত্র হাতে তুলে নিতে সমর্থ হননি।’ 

বিশ্বামিত্র বললেন, ‘ অর্থাৎ সেই হরধনু্তে যিনি গুণ পরাতে সক্ষম হবেন কন্যা তাকেই সম্প্রদান করা হবে।’ 

জনক বলেন,‘সে প্রস্তাব যথার্থ। আমার অনুরোধ, মুনিবর আমার কন্যা সীতার স্বয়ংবর সভায় আপনি যদি রামকে নিয়ে আসেন আমি আপ্যায়িত হব। একদা যজ্ঞভূমিতে হলকর্ষণকালে কর্ষণভূমির হল রেখা হতে উত্থিত আমার এই সুলক্ষনা কন্যারত্ন। যদিচ মাতা বসুমতীর কোল হতে আমি পেয়েছি তাঁকে, তবু সে আমার কন্যা। হলের সীতারেখা থেকে উঠেছে তাই তার নাম রেখেছি সীতা। অযোনিসম্ভবা সীতা আমার কন্যা, আমার বংশের সৌভাগ্যলক্ষী। মুনিবর আমার সবিনয় আমন্ত্রন রইল আপনাকে এবং রাম ও লক্ষণ এর জন্য ?’

বিশ্বামিত্র বললেন, ‘তথাস্তু রাজন। আমি নিশ্চয়ই দশরাত্মজ রামকে আমার সঙ্গে নিয়ে যাব জনকনগরে সীতার স্বয়ংবর সভায়। আপনি নিশ্চিন্ত হ’ন। আমিও স্বতঃই কৌতূহলী হয়ে রয়েছি রাজা জনক, কে দেবাদিদেব মহাদেবের ওই প্রবাদপ্রতিম হরধনু ভঙ্গ করতে পারেন সীতার স্বয়ংবর সভায়? ‘

রাজা জনক বললেন, ‘ অতীতে এই  হরধনু দেখতে অনেক বীর এসেছিলেন। কিন্তু কেউই এই হরধনুকে বিন্দুমাত্র হাতে তুলে নিতে সমর্থ হননি।’ 

বিশ্বামিত্র বলেন,‘ রাজন , আমি নিশ্চয়ই রাম এবং লক্ষণ সমভিব্যাহারে মিথিলায় গমন করব প্রত্যক্ষ করতে সেই অভূতপূর্ব শৈবচাপে গুণ পরাতে পারবেন কোন মহাবাহু। ‘  

অনন্তর রাজাজনক এবং তাঁর কন্যারা ঋষি বিশ্বামিত্রর কাছে এবং রাম এর কাছে বিদায় নিয়ে মিথিলার দিকে অগ্রসর হলেন। 

রাম তাকিয়ে রইলেন অপসৃয়মান সীতার দিকে। যেন কোন যুগযুগান্তরের ওপার হতে এসে দেখা দিয়ে গেলেন সেকালের দয়িতা।  

বিশ্বামিত্র বলেন,‘রাম, এবার আমাদের গন্তব্য মিথিলায়, জনক রাজার দেশে। মিথিলার জনকরাজার সভায় এক মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হবে, তাঁর কন্যা সীতার স্বয়ংবরার কারনে। সেই যজ্ঞে রাজা জনক আমাদের আমন্ত্রন জানিয়ে গেছেন। সেখানে তার কন্যার স্বয়ংবর সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে নিমন্ত্রিত হয়ে আসবেন রাজ চক্রবর্তী যত রাজপুরুষ বীরপুরুষ। সেখানে গেলে তুমি এক আশ্চর্য বস্তু ও দেখতে পাবে রাম। ‘ 

রাম জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ কি সেই আশ্চর্য বস্তু মহাত্মন !’

মুনিবর বললেন,‘ সে হল শিবের হরধনু শৈবচাপ। একদা যজ্ঞের আশীর্বাদস্বরূপ দেবতারা রাজা জনকের কাছে গচ্ছিত রেখেছিলেন স্বর্গের বিখ্যাত শৈবচাপ হরধনু। সেই হরধনু  মিথিলার জনকভবনে রক্ষিত। দেব গন্ধর্ব অসুর দেবাসুর ত্রিভুবনে কেউই সেই মহাধনুকে জ্যা আরোপ করার ক্ষমতা রাখে না। রাজা জনক তাই তাঁর কন্যা সীতার স্বয়ংবর উপলক্ষে সেই হরধনু ভঙ্গের আয়োজন করেছেন। 

                  বিশ্বামিত্র বলেন শুনহ রঘুবর 

                  মিথিলাতে হইবে সীতার স্বয়ং বর।।

                 করেছে প্রতিজ্ঞা এই জানকীর পিতা

                   হরধনু ভাঙ্গিবে যে তাকে দিবে সীতা ।। [কৃত্তিবাস ]

তিনি তোমাদের দুইভাই সহ আমাকে ও সেখানে যেতে আমন্ত্রন জানিয়েছেন সীতার স্বয়ংবর প্রত্যক্ষ করতে। তোমরা গেলে তিনি আপ্যায়িত হবেন।

রাম বললেন, ‘ যথা আজ্ঞা গুরুদেব।’

মুনিবর বললেন, ‘ তিনি তার ভূমিজা কন্যা সীতার স্বয়ংবর এর আয়োজন করেছেন। সেখানে তুমি দেখতে পাবে সেই বিশাল হরধনু। নিত্যপূজিত সেই হরধনুতে যিনি গুন চড়াতে পারবেন, জনক কন্যা সীতা তাঁর গলায় বরমাল্য অর্পণ করবেন।  

রাম সেই কথা শুনে মনে মনে চমৎকৃত হলেন। 

বিশ্বামিত্র বললেন, ‘ আমার ইচ্ছা, রাম তুমি ও সেই প্রতিস্পর্ধায় অংশগ্রহন করবে সীতার স্বয়ংবর সভায়। সেখানে তুমি সেই আশ্চর্য্য হরধনু দেখতে পাবে। যদি তুমি সেই হরধনুতে গুণ চড়াতে পারো তাহলে বেদবতী সীতা তোমাকেই বরণ করে নেবেন। ‘  

লক্ষণ উৎসাহিত ভাবে বলে ওঠে,‘ অবশ্যই হরধনুতে আমার অগ্রজ রাম গুণ পরাবেন। তিনি একজন প্রকৃত বীর।’

আসলে লক্ষ্মণের মনে সীতা অপেক্ষা হরধনু অনেকাংশে মহত্বপূর্ন। অযোধ্যাকুমারগন তাদের মাতৃদেবী ছাড়া অন্য কোন নারীর ভূমিকা তাদের জীবনে প্রত্যক্ষ করেননি। লক্ষণ তাই বড় ভাইকে উৎসাহিত করে রাখে হরধনু সম্বন্ধে। আসলে এ যে এক ভীষণ শৌর্য বীর্যের কথা।        

রাম সারারাত বিশ্বামিত্রের কথাগুলি মনে মনে আলোচনা করলেন। হরধনু দেবাদিদেব মহাদেবের আশীর্বাদধন্য শৈবচাপ। সে এক অদ্ভুত ধনু। দেব গন্ধর্ব অসুরগন কেহই তাতে জ্যা রোপণ করতে সক্ষম হয়ে ওঠেন নি। মানুষ তো দূরের কথা। অনেক রাজা ও রাজপুত্র চেষ্টা করে বিফল হয়েছেন। দেবগন যজ্ঞের ফলস্বরূপ জনকের পূর্বপুরুষকে এই ধনুক প্রদান করে ছিলেন। রাম মনে মনে সেই ধনুকটিকে স্বচক্ষে দেখতে উৎসাহিত হয়ে পড়ে। 

কত দূরে মিথিলা ! সেখানে হবে সীতার স্বয়ংবর সভা। পৃথিবীর এ এক আশ্চর্য্যতম  ঘটনা জনকের রাজ সভায় প্রত্যক্ষ করবে জগতবাসী। 

     । ১২।

মিথিলার পথে রাজগৃহে

বিশ্বামিত্র তার সম্পাদ্য যজ্ঞ  নির্বিঘ্নে সমাপন করতে পেরে ভীষণ প্রীত হয়েছেন। মুনিবর এক্ষনে রামকে বললেন, ‘ মহাবাহু , আমি কৃতার্থ তোমার কর্তব্যে। তুমি গুরুবাক্য রক্ষা করেছ। এই সিদ্ধাশ্রম এর নাম তুমি  সার্থক করেছো।  এখন তুমি নিশ্চই বুঝতে পারছ কেন আমি তোমাকে এখানে এনেছি ? আমি তোমাকে জীবনের কঠিন পদক্ষেপে আগুয়ান হতে শিক্ষা দিতে নিয়ে এসেছি। বৎস আমি তোমাকে আমার অর্জিত জ্ঞান আমার  দিব্যাস্ত্র আদি এবং আমার ওজঃ শক্তি আমি তোমায় সব দিয়েছি।’

রাম বলেন,‘আমি কৃতার্থ গুরুদেব। ’

বিশ্বামিত্র বলেন, ’রাম, এই তোমার শিক্ষার সময়। এখানে তোমার বৃদ্ধ পিতার কোন ভূমিকা নেই। তোমাকে রাজ্য পরিচালনা শিখতে হবে। তোমাকে ভবিষ্যতের পথে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। ‘

রাম বললেন,  ‘যথার্থ গুরুদেব ।

বিশ্বামিত্র বললেন, ’ গুরু বশিস্টদেব এর কাছে তুমি শাস্ত্রবিদ্যা লাভ করেছ। তুমি যাগযজ্ঞ শিখেছ। তপস্যা শিখেছ। আমি তোমাকে শেখাব বাস্তবের ভূমিতে শিক্ষার প্রয়োগ। সমাজের জন্য তোমার বাস্তব পদক্ষেপ। ‘

রাম বলেন,‘  যেমত  আপনার আদেশ গুরুদেব।  আমি সদা আনত আপনার কাছে ।’

বিশ্বামিত্র বলেন, ‘ রাম, তোমার এই পৃথিবীতে এখন অনেক কর্মযজ্ঞ। আমি তোমাকে কর্মযোগ শেখাব। রাজযোগ শেখাব। আমি তোমাকে চার নীতি শিক্ষা দেবো। সাম দম দন্ড ও ভেদ। আমি তোমাকে ধর্ম অর্থ কাম মোক্ষ কি তা জানাব।’ 

রাম বিশ্বামিত্রের দিকে তাকিয়ে অনুধাবন করার চেষ্টা করে গুরুদেবের মর্মবাণী এবং বলে,‘গুরুদেব সে আপনার আশীর্বাদ।’

বিশ্বামিত্র বলেন, ‘বশিষ্ট তোমায় দিয়েছেন পুঁথিগত জ্ঞান এই জগত সম্বন্ধে। তুমি বেদবিদ্যা অধ্যয়ন করেছো। আমি তোমায় দেব প্রকৌশল জ্ঞান এই জীবন সম্বন্ধে। তোমাকে  প্রতিপদক্ষেপে সেই জ্ঞান অর্জন করতে হবে।‘ 

রাম এবার জিজ্ঞাসা করেন, ‘গুরুদেব এবার আমাদের  কি করনীয় ! কি আদেশ আপনার ?

বিশ্বামিত্র বলেন,‘রাম, এবার আমাদের গন্তব্য মিথিলায়, জনক রাজার দেশে।

পরের দিন সকালে মুনিবর বিশ্বামিত্র সিদ্ধাশ্রমকে প্রদক্ষিণ করে রাম লক্ষণ দুই রাজপুত্র সমভিব্যাহারে উত্তর দিকে যাত্রা করলেন। 

রাম জিজ্ঞাসা করলেন, ‘গুরুদেব এখন আমাদের  যাত্রা কোন পথে ?

বিশ্বামিত্র বললেন,‘ রাম, এইবার আমাদের যাত্রা কৌশাম্বী গিরিব্রজ এর পথে। সেই পথ ভীষণ দুর্গম। আমরা যাব শোন নদীর দিকে। তোমরা আমাকে অনুসরণ কর !’ 

মুনি বিশ্বামিত্র চলতে থাকেন।  দুই রাজকুমার মুনি বিশ্বামিত্রকে কৌশাম্বীর পথে নীরবে অনুসরন করলেন। ক্রমে তারা শোননদীর তীরে এসে উপস্থিত হলেন। তখন বেলা পড়ে এসেছে।

মুনিবর বললেন, ’ রাম, আজ বেলা পড়ে এসেছে। আজ এখানেই হোক আমাদের চলার ইতি।’

রাম বললেন, ‘যথা আজ্ঞা গুরুদেব।’

এইবার লক্ষন শিকার করে নিয়ে এলেন। তারা তখন অগ্নি প্রজ্বলন করে সেই মাংস অগ্নিতে ঝলসে নিলেন । তারপর সেই মাংস ভক্ষন করে তাদের উদর জ্বালা পরিতৃপ্ত করলেন। তারা বনবাসী। যেমন বনের ফল আদি ভক্ষন করেন তেমনই তারা পশুর মাংস ও খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করে থাকেন।

সন্ন্যাসীর জীবন পথে পথে পরিভ্রমন। কোথায় পাবে তারা গৃহের খাদ্যসুখ। তাই শিকারে কি ভিক্ষায় তাদের ক্ষুন্নিবৃত্তির প্রয়োজন বৈ কি ! 

আজ অনেক পথ পদব্রজে অতিক্রম করা হয়েছে। অতঃ সায়ংকালীন স্নান ও অগ্নিহোত্রের পর তারা বিশ্রামে বসলেন। আজ এখানেই রাত্রিবাস। 

রাম জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ মুনিবর এ কোন দেশ ? ‘

বিশ্বামিত্র বললেন, এই স্থানের নাম গিরিব্রজ। মুনি অজাতশত্রু নাম রেখেছিলেন রাজগৃহ। লোকে বলে রাজগীর । ওই দেখো ওই পঞ্চশৈল এবং ওই হল মাগধী নদী। ওই মাগধী নদী হল আজকের শোন নদী। এই রাজগিরকে পাঁচপাহাড়ী ও বলে থাকে লোকে। ওই দেখা যায় বৈভার, তারপরে বিপুল, ওই হল রত্নগিরি, তারপর উদয়গিরি, তারপর শোনগিরি। এই পাঁচ পাঁচটি পাহাড় দ্বারা চক্রাকারে ঘেরা এই রাজগৃহ। এগুলি সবই সমৃদ্ধ নগরী।’

বিশ্বামিত্র বলতে থাকেন, ‘ রাম তোমাকে বলি, এই স্থানে কুশ নামে এক ধর্মাত্মা রাজা ছিলেন। তার পুত্র ছিল কুশনাভ। কুশনাভর পুত্র হলেন পরম ধার্মিক রাজা গাধি। গাধির পুত্র এই আমি কৌশিক। আমি কুশবংশ জাত। তাই আমার নাম কৌশিক। আমি এককালে এই স্থানের রাজা ছিলাম। এই হলো এই স্থানের বৃত্তান্ত। ‘

রাম অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন বিশ্বামিত্রের দিকে। পথের ধারে বৃক্ষমূলে বসে আছেন যে ঋষি, বিশ্বাস হয় না একদিন তিনিই ছিলেন এই রাজ্যের রাজা ? নরপতি কুশনাভের পুত্রসম্রাট গাধির তনয় বিশ্বামিত্র !

রাম বলে ওঠে,‘ গুরুদেব আপনি এই দেশের রাজা ছিলেন ? আজ আপনি একজন ঋষি ও সন্ন্যাসী ! আশ্চর্য্য ! ‘

বিশ্বামিত্র বলেন,’ রাম আমি এখন সংসার বহির্ভূত সন্ন্যাসী। আমাকে পূর্বজন্ম স্মরণ করতে নেই। তুমি এই স্থানের ইতিহাস জানতে চেয়েছিল। আমি সেইটুকু মাত্র তোমাকে জ্ঞাত করলাম। রাম, আরো বলি শোনো, আমার জ্যেষ্ঠা ভগিনী সত্যবতী। তাঁর স্বামী ঋচিক সশরীরে স্বর্গে যাবার পর হতে আমার ভগিনী সত্যবতী লোকহিত কামনায় কৌশিকি নদী হয়ে হিমালয় হতে প্রবাহিত হচ্ছেন। আমি আমার ভগিনীর প্রতি স্নেহবশে হিমালয়ের পার্শ্বে নিয়ত সুখে বাস করি। কেবল আমার যজ্ঞের নিমিত্ত তাঁকে ছেড়ে কিছুদিনের জন্য আমি এই সিদ্ধাশ্রমে এসেছিলাম। এখন আমার যজ্ঞ সম্পূর্ণ হয়েছে। আমার বংশবৃতান্ত , এবং এই স্থানের বিবরন যা তুমি  জানতে চেয়েছিলে তা আমি বললাম। কাল আমরা এই স্থান আমরা পরিত্যাগ করব।’

রাম বললেন, ‘ গুরুদেব আপনার মত একজন রাজা এবং ঋষির সান্নিধ্য পেয়ে আমি ধন্য।’  

বিশ্বামিত্র বললেন, ‘ রাম, বিদ্যা এবং ধন দান করা পরম পুন্যকাজ। তোমার এখন অনেকানেক কর্তব্য। ‘ 

পরদিন তারা তিনজন, মুনি বিশ্বামিত্র এবং রাম ও লক্ষন শোন নদীর তটদেশ অতিক্রম করে মধ্যাহ্নকালে জাহ্নবী নদীর তীরে উপস্থিত হলেন। 

বিশ্বামিত্র মুনি এইবার রামকে বললেন,‘রাম, এই যে জাহ্নবি নদী বয়ে চলেছে, এ হল পরম পবিত্র গঙ্গা।  এ তোমার পূর্বপুরুষের কীর্তি। এসো আজ এখন আমরা এই জাহ্নবী তীরে স্নানতর্পণ সমাপন করি। পরে আমি তোমায় তোমার পূর্বপুরুষ সগর রাজার উপাখ্যান শোনাব।’ 

অনন্তর তাঁরা তিনজন সেই জাহ্নবীর তীরে বসে স্নান ও যথাবিধি তর্পণ ও হোম ইত্যাদি সেরে তৎপরে তাঁরা অমৃতবৎ হবি অর্থাৎ অগ্নিতে উৎসর্গকৃত দ্রব্য ভোজন করলেন। এরপর বিশ্রামকালে রাম ও লক্ষন বিশ্বামিত্রের সান্নিধ্যে বসে কিছু আলাপে মগ্ন হলেন। 

বিশ্বামিত্র মুনী বললেন,‘ রাম এই যে জাহ্নবি নদী বয়ে চলেছে এ হল পরম পবিত্র গঙ্গা। স্বর্গ হতে আবির্ভূত হয়ে গঙ্গা এই মহান আর্য্যাবর্ত্যের বিশাল ভুমিখন্ডের বিভিন্ন প্রদেশ হয়ে শেষে সমুদ্রে পতিত হয়েছে। এই গঙ্গা হলেন ত্রিপথগামী। এর গতি স্বর্গ হতে মর্ত্যলোকে এবং তারপর তার গতি সেই পাতালে। তাই একে ত্রিপথগা ও বলা হয়। সেই কাহিনী বলি শোনো !‘ 

এ সেই সত্যযুগের কথা। সেকালে ইক্ষ্বাকু বংশের রাজা ছিলেন রাজা সগর। তিনি এক অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। 

সেই অশ্বমেধ যজ্ঞ হিমালয় এবং বিন্ধ্য পর্বতের মধ্যবর্তী কোন এক দেশে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। 

সগর রাজার অশ্বমেধের ঘোড়াকে ইন্দ্র তাঁর ক্রূরতাবশে ছলে বলে হরন করে পাতালে লুকিয়ে রেখেছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন এই অশ্বমেধ যজ্ঞের ফলে তাঁর আসন টলে উঠবে এবং রাজা সগর তার ইন্দ্রত্ব কেড়ে নেবেন। 

সগর রাজার ষাট হাজার পুত্র ছিল সেই ঘোড়ার ত্বত্তাবধানে। তাঁরা তাদের পিতা সগররাজাকে  যজ্ঞাশ্ব অপহৃত হবার সংবাদ দিলে তিনি ভীষণ ক্রুদ্ধ হলেন।

রাজা সগর তৎক্ষনাৎ তাঁর ষাট হাজার পুত্রকে আজ্ঞা দিলেন,’পুত্রগন, তোমরা পৃথিবীর সর্বত্র গিয়ে এক এক যোজন অর্থাৎ আশী মাইল পরিমিতি স্থান অনুসন্ধান কর এবং যতক্ষন সেই  যজ্ঞাশ্ব এবং তাঁর অপহরনকারীকে না পাওয়া যাবে ততক্ষন আমার আজ্ঞায় তোমরা পৃথিবীর প্রতি তর্জনী পরিমান ভূমি খনন করে অনুসন্ধান করতে থাকবে। এ আমার আদেশ। আমি সেই যজ্ঞাশ্বের প্রতীক্ষায় থাকব।  

সগর পুত্রগন পিতার আদেশে ধরাতল খনন করতে করতে এই বার পাতালে প্রবেশ করলেন। সেখানে কপিল মুনির আশ্রমে তাঁরা সকলে পদার্পণ করলেন।

কপিলমুনী তখন সেই স্থানে গভীর ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। সগর রাজার পুত্ররা কপিলমুনির আশ্রমে প্রবেশ করে আবিষ্কার করেন সেই যজ্ঞের ঘোড়াকে। অদ্ভুত এই যে, স্বয়ং কপিলমুনী সেখানে গভীরভাবে  ধ্যানস্থ হয়ে আছেন। আর তাঁর পশ্চাতে একটি নিমগাছে বাঁধা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে রাজা সগরের সেই যজ্ঞের ঘোড়া। –  এ কি আশ্চর্য ব্যাপার! – তারা সকলে তৎক্ষণাৎ ভেবে নেয়, এই ধ্যানমগ্ন কপিলমুনিই বুঝি এই যজ্ঞাশ্বের অপহারক। ভাবাটাই স্বাভাবিক। তারা কপিল মুনিকে অত্যন্ত অনুচিত বাক্যবানে তস্কর অভিধায় বিদ্ধ করে। 

ধ্যানস্থ কপিল মুনি এবার তাঁর ধ্যানভঙ্গে ক্রোধ্বান্বিত হয়ে সকলকে  অভিশাপ দেন,‘ ইদম  ভস্মং দুর্জনং। ওরে দুর্জনগন, তোমরা সকলেই ভস্ম হয়ে যাও।’

কপিলমুনি হলেন এই জগতের স্বামী স্বয়ং বাসুদেব। তিনি পাতালে বসে ধ্যান করছিলেন। আর ঠিক সেই সময়েই এই অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে যায়। অতঃ সেই  ষাট হাজার সগরপুত্র তৎক্ষনাৎ ভস্ম হয়ে গেলেন।’

রাম লক্ষন কৌতুহল বশতঃ জিজ্ঞাসা করেন, ‘ অতঃ ?’

বিশ্বামিত্র বলতে থাকেন,‘ অতঃ, রাজা সগর বৎসরাধিককাল অপেক্ষা করে স্বীয় পুত্রদের ফিরতে না দেখে তিনি তাঁর পৌত্র অংশুমানকে তাদের সন্ধানে প্রেরন করলেন। অংশুমান বিস্তর অনুসন্ধান করতে করতে কপিলমুনির আশ্রমে এসে পৌঁছালেন এবং সেখানে এসে তিনি সেই যজ্ঞের ঘোড়াকে আবিস্কার করলেন।’  

অংশুমান সেই ঘোড়া দেখতে পেয়ে চমকে ওঠেন, ‘এই তো সেই যজ্ঞাশ্ব। 

অংশুমান কপিলমুনিকে দেখতে পেয়ে সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করলেন তার ষাটহাজার পিতৃব্যদের কথা।  কপিলমুনি তখন অংশুমানকে  তাঁর অঙ্গুলি দ্বারা সারা অঙ্গনে ছড়িয়ে থাকা ভস্মরাশির প্রতি নির্দেশ করে বলেন, ‘ ওই যে তোমার ষাট হাজার পিতৃব্যদের সন্ধান !’ 

‘অংশুমান তোমার এই ষাটহাজার পিতৃব্যদের আমি অভিসম্পাত দিয়েছি তাদের অভব্য রুঢ় আচরনের জন্য। তারা আমাকে তোমাদের যজ্ঞের অশ্বের অপহারক বলে কটু কথা বলেছিল। আমি তাদের ভস্ম হতে অভিশাপ দিয়েছি। যাও তুমি তাদের পারলৌকিকতার ব্যবস্থা কর।’

অংশুমান রোদন করতে থাকেন পিতৃব্যদের শোকে এবং নিকটবর্তী সরোবর হতে জল এনে পিতৃব্যদের মুক্তির জন্য তর্পণ করার কথা চিন্তা করেন।

কপিলমুনি বলেন,’ শোনো অংশুমান, তোমার পিতৃব্যগন আমার শাপে ভস্মীভূত হয়েছেন। সাধারন জলে এঁদের ক্রিয়াকর্ম হবে না। তুমি গঙ্গার জলে এদের প্রেতকৃত্য সম্পন্ন কর। এ জন্য স্বর্গ হতে গঙ্গাদেবীকে আহবান করে মর্ত্যে আনতে হবে। গঙ্গা যদি এই ভস্মরাশি প্লাবিত করেন তা হলেই মাত্র ষাটহাজার সগর তনয়গন মুক্তিলাভ করে স্বর্গলোকে যাবেন।’

অংশুমান বলেন, ‘কিন্তু, ভগবন, সে তো এক ভীষণ অসম্ভব ব্যাপার। স্বর্গ হতে গঙ্গাকে আমন্ত্রন সে কিভাবে সম্ভব হতে পারে ?’ 

কপিল মুনি বললেন,‘ বৎস অংশুমান, গঙ্গাকে মর্ত্যে আহবান করতে অনেক তপস্যা করতে হবে। সেই গঙ্গা মর্ত্যে এলে সগর তনয়গন মুক্তি লাভ করবেন। তোমাদের বংশের কোন পুন্যপুরুষ নিশ্চয়ই এই কর্ম সম্পন্ন করবেন । তুমি এখন ফিরে যাও।  

অংশুমান এইবার কপিলমুনির উপদেশে সেই যজ্ঞাশ্ব নিয়ে রাজ্যে ফিরে এলেন এবং পিতামহ সগরকে এই শোক সংবাদ ও কপিলমুনির উপদেশ বাক্য জানালেন। 

অংশুমান বললেন,‘হে পিতামহ, কপিলমুনির উপদেশে স্বর্গ হতে গঙ্গাকে আনয়ন না করলে পিতৃব্যগনের মুক্তি সম্ভব নহে।  এবং এই দুস্কর কর্ম আমাদের বংশের কোন একজন হয়ত ভবিষ্যতে করবেন বলে তিনি জানালেন।’

রাজা সগর ভীষণ চিন্তায় পড়লেন কি ভাবে গঙ্গাকে মর্ত্যে আনয়ন করা যাবে সেই কথা ভেবে। অথবা কে এই কাজ সম্পন্ন করতে পারেন এই বংশে ? অদূর ভবিষ্যতে ও তেমন কোন সম্ভাবনা তাঁর মনে হল না। তখন নিরুপায় রাজা সগর যথাবিধি তার অশ্বমেধ যজ্ঞ সমাপন করলেন। যজ্ঞভাগ নিতে আসা দেবগন গন্ধর্বগন রাজাকে বললেন, ‘রাজা সগর, তোমার পুত্রগন নরকে পতিত হয়েছেন। তুমি আগে তাদের উদ্ধারের ব্যবস্থা কর।’

রাজা সগর তাদের আশ্বাস দিলেন,‘ আপনাদের উপদেশ শিরোধার্য করলাম। আমি নিরন্তর গঙ্গাকে স্বর্গ হতে মর্ত্যে আনয়নের কথা চিন্তা করে চলেছি।’

সকলে তাঁকে বললেন, ‘ সাধু ,  সাধু ।’

কিন্তু রাজা সগর বাস্তবিকই গঙ্গাকে মর্ত্যে আনয়নের সঠিক কোন উপায় স্থির করতে পারলেন না। অবশেষে  তিনি তাঁর অন্তিমকালে অংশুমানকে গঙ্গা আনয়নের কোন প্রচেস্টা করে তার পিতৃব্যগনের উদ্ধারের ব্যাপারে প্রযত্নশীল হতে অনুরোধ করে স্বর্গে গেলেন।

                                  [আদিকান্ড ২]

( চলবে )

ধ্রুপদী সাহিত্য : ভজ মন রাম চরণ - শ্যামলকৃষ্ণ বসু

ভজ মন রাম চরণ

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

কালের প্রহরী

শুভাশিস ঘোষ এক শীতের এমন ঝাঁক মনে পড়ে না শেষ কবে দেখেছি। এবারের ঠান্ডা বেশ জবুথবু করে দিয়েছে কলকাতা লাগোয়া এই শহরতলিকে। কুয়াশার চাদরে ঢাকা

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

কালের প্রহরী

শুভাশিস ঘোষ এক শীতের এমন ঝাঁক মনে পড়ে না শেষ কবে দেখেছি। এবারের ঠান্ডা বেশ জবুথবু করে দিয়েছে কলকাতা লাগোয়া এই শহরতলিকে। কুয়াশার চাদরে ঢাকা

Read More »