অন্তহীন বাঁশির সুর : ভারতীয় জনজীবনে শ্রীকৃষ্ণ

অন্তহীন বাঁশির সুর : ভারতীয় জনজীবনে শ্রীকৃষ্ণ

ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ - নবকুমার দাস

১ : সিন্ধু–সরস্বতী থেকে গঙ্গা

২ : সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতার সমকালীন সর্বভারতীয় স্রোতধারা

৩ : বেদের বাণী থেকে পৌরাণিক ভারত

৪ : আরণ্যক থেকে বেদান্ত  : অন্তর্জগতের অভিযাত্রা

৫ : মৌর্য–গুপ্ত যুগ : ভারতীয় সভ্যতার আত্ম-অনুসন্ধান

৬ : গুপ্তোত্তর ভারত

৭ : ভারতে বসন্ত 

৮ : ধর্মরাজনীতি ও সম্রাট অশোক

৯ : সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ : উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের মিলন

১০ : সংস্কৃত সাহিত্য : ভারতীয় চিন্তার ভাষা

১১ : ভারতের মন্দির : শিল্প, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির সম্মিলন

১২ : নৃত্য ও সংগীত : রস, তত্ত্ব ও ঐতিহ্য

আয়ুর্বেদ ও বিজ্ঞান : জীব রসায়নের দান

পুরাণ ও কাব্য : কল্পনার সাংস্কৃতিক বুনন

নারী ও সমাজ : দেবীচেতনা থেকে বাস্তব জীবন

লোকসংস্কৃতি : ভারতের আত্মার বহুস্বর

ভারতের উৎসব : ঋতুচক্র, কৃষি ও সমাজ

ভারতীয় ভাষার মহাযাত্রা

অন্তহীন বাঁশির সুর : ভারতীয় জনজীবনে শ্রীকৃষ্ণ

“যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত…”

কৃষ্ণের কথা ভাবলেই প্রথমে কি এমন কোনও শ্লোক মনে পড়ে? নাকি একটি বাঁশির সুর ? হয়তো দুটোই।

একদিকে কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণ যাঁর মুখে উচ্চারিত হচ্ছে কর্ম, জ্ঞান, কর্তব্য ও আত্মস্বরূপের কথা; অন্যদিকে বৃন্দাবনের কদমতলায় দাঁড়িয়ে থাকা এক কিশোর যার ঠোঁটে বাঁশি, চারপাশে গোপবালক, গোপিনী, যমুনার জল, কদমফুল এবং সন্ধ্যার নরম আলো। একজন দার্শনিক; অন্যজন প্রেমিক। একজন রাষ্ট্রনায়ক; অন্যজন রাখাল। একজন কূটনীতির কারিগর; অন্যজন মাখনচোর। অথচ ভারতীয় কল্পনায় তাঁরা আলাদা নন। একই কৃষ্ণের অসংখ্য মুখ।

জন্মাষ্টমীর মধ্যরাত্রি যতবার ফিরে আসে, ততবার যেন ভারতীয় সভ্যতার স্মৃতির কোনও গভীর দরজা খুলে যায়। মন্দিরে শঙ্খ বাজে, বাড়িতে জন্মাষ্টমীর উপবাস ভাঙে, কোথাও কীর্তন শুরু হয়, কোথাও দহি-হান্ডির প্রস্তুতি, কোথাও কৃষ্ণের শিশুরূপে সাজানো হয় ঘর। শিল্পীর ক্যানভাসে নীল হয়ে ওঠেন কৃষ্ণ, গায়কের কণ্ঠে ফিরে আসে তাঁর নাম, কবির কলমে তিনি প্রেমের প্রতীক, দার্শনিকের কাছে তিনি আত্মজিজ্ঞাসার উত্তর, আর চলচ্চিত্রকারের কাছে এক অফুরন্ত আখ্যান।

কৃষ্ণ তাই শুধু পুরাণের চরিত্র নন। তিনি ভারতীয় সাংস্কৃতিক স্মৃতির এক চলমান ভাষা। এই ভাষার কোনও একটিমাত্র ব্যাকরণ নেই। বরং যুগে যুগে মানুষ নিজের প্রশ্ন, নিজের আকাঙ্ক্ষা, নিজের সংকট এবং নিজের সৌন্দর্যবোধ নিয়ে কৃষ্ণের কাছে ফিরে গেছে। প্রত্যেকবার কৃষ্ণ যেন একটু অন্যরকম হয়ে উঠেছেন—কিন্তু তাঁর বাঁশির সুরটি থেকে গেছে।

যে দেবতা মানুষের মতো বাঁচেন

ভারতীয় পুরাণে কৃষ্ণের সবচেয়ে বড় বিস্ময় সম্ভবত তাঁর মানবিক মুখ । তিনি জন্মান কারাগারে। তাঁর জন্মের সঙ্গে সঙ্গে বিপদের ছায়া। তাঁকে রাতের অন্ধকারে যমুনা পার করে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর তাঁর শৈশব কাটে রাজপ্রাসাদে নয়, গোপালকদের মধ্যে – গোকুল ও বৃন্দাবনের সহজ, মাটির কাছাকাছি জীবনে।

তিনি দুষ্টুমি করেন। মাখন চুরি করেন। বন্ধুদের সঙ্গে খেলেন। গো-পালকদের সঙ্গে মাঠে ঘোরেন। গোপীদের সঙ্গে রসিকতা করেন। বাঁশি বাজান। আবার জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ে তিনিই হয়ে ওঠেন মথুরার অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে সংগ্রামী, দ্বারকার রাষ্ট্রনায়ক, পাণ্ডবদের মিত্র, কূটনীতিক এবং শেষ পর্যন্ত অর্জুনের সারথি। এই অসাধারণ জীবনরেখার মধ্যে কোনও সরলতা নেই বরং আছে এক বিরাট বৈপরীত্য। কৃষ্ণ একই সঙ্গে লীলা ও নীতি, প্রেম ও কর্তব্য, হাসি ও যুদ্ধ, মানবিকতা ও মহাজাগতিকতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

এই কারণেই তাঁকে কেবল দেবতা হিসেবে দেখলে তাঁর একটি অংশ বোঝা যায়; মানুষ হিসেবে দেখলেও আর-একটি অংশ। কৃষ্ণের সম্পূর্ণতা যেন এই দুইয়ের মধ্যবর্তী অঞ্চলে। সম্ভবত এই কারণেই সাধারণ মানুষ তাঁকে এত সহজে আপন করে নিতে পেরেছে। রামের মধ্যে যে দূরত্ব, কৃষ্ণের মধ্যে তা নেই। তিনি মানুষের কাছে নেমে আসেন। তিনি শিশুর মতো হাসেন, বন্ধুর মতো পাশে থাকেন, প্রেমিকের মতো আকুল করেন, আবার সংকটে পথ দেখান। ভারতীয় জনমানসে কৃষ্ণ তাই দূরের দেবতা নন বরং তিনি অতি নিকটজন, আপনজন – কাছের মানুষ এবং মনের মানুষও ।

কুরুক্ষেত্রের নীরবতা: দর্শনের কৃষ্ণ

কৃষ্ণের সাংস্কৃতিক প্রভাবের সবচেয়ে গভীর স্তরটি সম্ভবত ভগবদ্গীতা। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগে অর্জুনের রথ থেমে যায় আসন্ন দুই বিবদমান সেনাদলের মাঝখানে। সামনে আত্মীয়, গুরু, বন্ধু। যুদ্ধ মানে বিজয়, কিন্তু সেই বিজয়ের মূল্য রক্ত। অর্জুনের হাত থেকে গান্ডীব শিথিল হয়ে আসে। তিনি প্রশ্ন করেন , এই যুদ্ধ কি সত্যিই ন্যায়সঙ্গত? কর্তব্য কি আপনজনের ঊর্ধ্বে ?

এই মুহূর্তটি ভারতীয় দর্শনের এক অসাধারণ নাটকীয় মুহূর্ত। কৃষ্ণ তখন শুধু যুদ্ধের উপদেশ দেন না; তিনি মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়ান।

কর্ম কী? জ্ঞান কী? আত্মা কী? কর্তব্যের সঙ্গে ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার সম্পর্ক কী? মানুষ কি ফলের জন্য কাজ করবে, নাকি কাজের মধ্যেই নিজের অর্থ খুঁজবে?

গীতার নিষ্কাম কর্মযোগ ভারতীয় মননে যে গভীর ছাপ ফেলেছে, তার প্রভাব ধর্মের সীমা ছাড়িয়ে সমাজ ও ব্যক্তিজীবনের নানা আলোচনায় পৌঁছেছে। কর্ম করব, কিন্তু ফলের প্রতি আসক্ত হব না—এই ধারণা মানুষের কর্মনৈতিকতা ও আত্মশাসনের এক দীর্ঘস্থায়ী সূত্র হয়ে উঠেছে। কিন্তু গীতার কৃষ্ণকে কেবল ‘কর্তব্যের শিক্ষক’ হিসেবে দেখলে তাঁর দার্শনিক ব্যাপ্তি সংকুচিত হয়। তিনি একই সঙ্গে জ্ঞান, ভক্তি ও কর্মের বিভিন্ন পথকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করেন। মানুষের আত্মিক যাত্রা যে একটিমাত্র পথে হয় না—গীতার কৃষ্ণ সেই বহুত্বকে স্বীকার করেন।

এখানেই কৃষ্ণের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে – তিনি উত্তর দেন, কিন্তু প্রশ্ন করার অধিকার কেড়ে নেন না। অর্জুন প্রশ্ন করেন। কৃষ্ণ উত্তর দেন। আবার প্রশ্ন আসে। সংলাপ এগিয়ে চলে। অর্থাৎ গীতা কেবল ধর্মগ্রন্থ নয়; এটি এক অর্থে মানুষ ও তার অন্তরের মধ্যে একটি দীর্ঘ সংলাপ। আজও যখন কোনও মানুষ কর্তব্য ও ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বন্দ্বে পড়ে, যখন কোনও প্রশাসক সিদ্ধান্তের নৈতিকতা নিয়ে ভাবেন, যখন কোনও শিক্ষক বা কর্মী নিজের কাজের অর্থ খুঁজতে চান, তখন গীতার কৃষ্ণ নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন।

কুরুক্ষেত্র তাই শুধু যুদ্ধক্ষেত্র নয়। এটি মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বেরও প্রতীক।

বঙ্কিমের কৃষ্ণ: দেবত্বকে যুক্তির আলোয় দেখা

উনিশ শতকের বাংলায় কৃষ্ণকে নতুন করে আবিষ্কারের একটি সাহসী অধ্যায় রচনা করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর কৃষ্ণচরিত্র কেবল ভক্তিমূলক গ্রন্থ নয়। বঙ্কিম পুরাণের বিভিন্ন আখ্যান, মহাভারত এবং কৃষ্ণ-সম্পর্কিত ঐতিহ্যকে যুক্তি, ইতিহাসবোধ ও নৈতিক বিচারের আলোয় পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন। গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৮৬ সালে এবং পরে এর বিস্তৃত পুনর্লিখন ঘটে।

ঔপনিবেশিক সময়ে ভারতীয় ধর্ম ও নৈতিকতার মূল্যায়ন যখন পাশ্চাত্য মানদণ্ডের চাপে পড়ছিল, তখন বঙ্কিমের কৃষ্ণচরিত্র ছিল এক ধরনের সাংস্কৃতিক আত্মপ্রতিষ্ঠারও প্রচেষ্টা। আধুনিক গবেষণায় বঙ্কিমের কৃষ্ণ-পাঠকে তাঁর বৃহত্তর জাতীয়তাবাদী চিন্তার সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়েছে।

বঙ্কিমের কৃষ্ণ অলৌকিকতার আবরণে আবদ্ধ নন। তিনি এক অসাধারণ মানবিক চরিত্র – বুদ্ধিমান, কৌশলী, সাহসী, রাষ্ট্রচিন্তক এবং নৈতিক সমস্যার মুখোমুখি দাঁড়াতে সক্ষম। এই কৃষ্ণকে বুঝতে হলে ভক্তির চোখ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন যুক্তির চোখও। এখানে কৃষ্ণ মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে বেরিয়ে আসেন ইতিহাসের আলোয়। এটি ভারতীয় আধুনিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। কারণ আধুনিকতা যখন প্রশ্ন করতে শেখায়, তখন বঙ্কিম সেই প্রশ্নকে কৃষ্ণের দিকে ঘুরিয়ে দেন। দেবতাকে ভালোবাসা যায়; কিন্তু তাঁকে কি বিচারও করা যায়?

বঙ্কিমের উত্তর ছিল – যায়। আর সেই উত্তরই কৃষ্ণকে আধুনিক ভারতীয় বৌদ্ধিকতার আলোচনায় নতুন জীবন দিয়েছিল।

বৃন্দাবনের পথে: প্রেমের কৃষ্ণ

কুরুক্ষেত্রের কৃষ্ণ যুক্তির। কিন্তু ভারতীয় হৃদয়ের কৃষ্ণ? 

তিনি বৃন্দাবনের। সেখানে যুদ্ধ নেই। আছে যমুনা, কদমতলা, গোপালদের হাসি, গোপীদের ব্যাকুলতা, রাধার বিরহ এবং বাঁশির ডাক। কৃষ্ণের এই প্রেমময় রূপ মধ্যযুগীয় ভক্তি আন্দোলনের সঙ্গে ভারতীয় সাংস্কৃতিক পরিসরে অসাধারণ বিস্তার লাভ করে। কৃষ্ণ তখন আর কেবল ঈশ্বর নন – তিনি প্রিয়তম, সখা, সন্তান, অন্তরের মানুষ। এই রূপান্তরের মধ্যে রয়েছে ভারতীয় ভক্তির এক গভীর মনস্তত্ত্ব। দূরের ঈশ্বরকে মানুষ নিজের কাছে টেনে আনে। তাঁকে পিতা করে, সন্তান করে, বন্ধু করে, প্রেমিক করে। রাধা-কৃষ্ণের প্রেম এই সাংস্কৃতিক কল্পনায় এক বিশেষ স্থান অধিকার করে। সাধারণ মানবিক প্রেমের ভাষা ধীরে ধীরে আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষার ভাষায় পরিণত হয়। বিরহ শুধু প্রেমিকের বিচ্ছেদ নয় – জীবাত্মার পরমের জন্য আকুলতাও হয়ে ওঠে।

এই দ্বৈততার অসাধারণ শিল্পরূপ আমরা পাই জয়দেবের গীতগোবিন্দ-এ। দ্বাদশ শতকের এই সংস্কৃত কাব্য রাধা ও কৃষ্ণের প্রেমকে এমন এক সঙ্গীতময়, নৃত্যময় ও রসময় ভাষায় প্রকাশ করেছিল, যার প্রভাব বাংলা ও ওড়িশা থেকে ভারতের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল সেন্টার ফর দ্য আর্টস-এর তথ্য অনুযায়ী, গীতগোবিন্দ পরবর্তী সময়ে সংগীত, নৃত্য, চিত্রকলা ও মন্দির-উপাসনার নানা ধারায় গভীর প্রভাব বিস্তার করে। গীতগোবিন্দ-এর আশ্চর্য শক্তি এখানেই – মানবিক প্রেম এবং ঈশ্বরলাভের আকাঙ্ক্ষা একই কাব্যিক স্রোতে এসে মিশেছে। প্রেম শরীর থেকে আত্মায় উঠে যায়। বিরহ হয়ে ওঠে সাধনা। মিলন হয়ে ওঠে পরমের সঙ্গে একাত্মতা। এই কারণেই কৃষ্ণ ভারতীয় প্রেমকল্পনার অন্যতম বৃহৎ প্রতীক।

চৈতন্যের বাংলায়: প্রেম যখন জনসমুদ্র

বাংলায় কৃষ্ণের ইতিহাস লিখতে গেলে চৈতন্যদেবকে বাদ দেওয়া যায় না। নবদ্বীপের রাস্তায় কীর্তনের ঢেউ, করতাল, মৃদঙ্গ, মানুষের সম্মিলিত কণ্ঠ – এই সবকিছুর মধ্য দিয়ে কৃষ্ণভক্তি এক বিশেষ জনজীবনের রূপ পায়। চৈতন্যদেবের বৈষ্ণবধারায় কৃষ্ণকে পাওয়ার পথ যুক্তির চেয়ে বেশি হৃদয়ের। সেখানে চোখের জলও সাধনা, বিরহও সাধনা, নামসংকীর্তনও সাধনা। একজন মানুষ ঈশ্বরের নাম উচ্চারণ করতে করতে নিজের ব্যক্তিসত্তার সীমা অতিক্রম করতে চান। এই কৃষ্ণ কোনও রাজদরবারের দেবতা নন। তিনি জনতার কৃষ্ণ। কৃষক, তাঁতি, গৃহস্থ, কবি, গায়ক ইত্যাদি বিভিন্ন সামাজিক স্তরের মানুষ তাঁর নামের মধ্যে নিজেদের অনুভবের ভাষা খুঁজে পেয়েছে।

বাংলা বৈষ্ণব পদাবলি এই অনুভূতিকে ভাষা দিয়েছে। রাধার কণ্ঠে বলা হয়েছে যে বিরহ, তা একই সঙ্গে নারী-হৃদয়ের প্রেম এবং আত্মার ঈশ্বরলাভের আকাঙ্ক্ষা। এখানে কৃষ্ণের সাংস্কৃতিক শক্তি আরেকবার প্রকাশিত হয়। তিনি ব্যক্তিগত অনুভূতিকে সমষ্টিগত সংস্কৃতিতে রূপান্তর করতে পারেন।

দোলের রঙে কৃষ্ণ

কৃষ্ণকে বোঝার আর একটি বড় দরজা উৎসব। দোল ও হোলির রঙের মধ্যে কৃষ্ণের উপস্থিতি এত গভীর যে রাধা-কৃষ্ণের চিত্রকল্প ছাড়া ভারতীয় বসন্ত-উৎসবের জনপ্রিয় নন্দনতত্ত্ব প্রায় অসম্পূর্ণ। ব্রজভূমিতে হোলির ঐতিহ্য কৃষ্ণ ও গোপীদের রঙের খেলার স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু উৎসবের তাৎপর্য কেবল পৌরাণিক নয়। রঙ সামাজিক দূরত্ব ভাঙে, পরিচয়ের কঠিন রেখা সাময়িকভাবে মুছে দেয়, মানুষকে সমবেত করে। বাংলায় দোলযাত্রা আবার চৈতন্যস্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক মাত্রা পেয়েছে। নবদ্বীপের দোল তাই কেবল আবিরের উৎসব নয়; এটি বৈষ্ণব স্মৃতি, কীর্তন, ধর্মীয় আবেগ এবং লোকজ আনন্দের সম্মিলন।

আর রবীন্দ্রনাথ ? 

শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসব পুরনো দোলের আচারকে একটি আধুনিক নান্দনিক ভাষায় পুনর্নির্মাণ করেছে। রঙ, গান, নৃত্য, প্রকৃতি – সব মিলিয়ে বসন্ত সেখানে একটি সাংস্কৃতিক কবিতায় পরিণত হয়েছে।কৃষ্ণ সেখানে সরাসরি দৃশ্যমান না হলেও তাঁর উত্তরাধিকার রয়ে গেছে। কারণ সংস্কৃতি অনেক সময় তার উৎসকে আড়াল করেই বাঁচিয়ে রাখে।

কৃষ্ণের ক্ষেত্রেও তাই। তিনি কখনও মূর্তিতে, কখনও গানে, কখনও উৎসবে – আবার কখনও শুধুই একটি অনুভূতিতে উপস্থিত।

বাঁশির সুর: কৃষ্ণ এবং ভারতীয় সংগীত

কৃষ্ণের হাতে অস্ত্র যেমন আছে, তেমনই আছে বাঁশি। কিন্তু ভারতীয় কল্পনায় বাঁশিটি যেন তাঁর অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী। বাঁশির কোনও শব্দ নেই, যদি না তার ভিতর দিয়ে শ্বাস প্রবাহিত হয়। হয়তো এই কারণেই বাঁশি কৃষ্ণের এক গভীর প্রতীক – শূন্যতার মধ্য দিয়ে সুরের জন্ম।

জয়দেবের গীতগোবিন্দ এই সুরকে এক অসাধারণ কাব্যিক শরীর দিয়েছে। এর অষ্টপদীগুলি নৃত্য ও সংগীতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে ভারতীয় শিল্পসংস্কৃতিতে বহমান হয়েছে। বিভিন্ন নৃত্যধারায় গীতগোবিন্দ-এর প্রভাবের কথাও সরকারি সাংস্কৃতিক সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপর সুরদাস। ব্রজভাষায় তাঁর কৃষ্ণ কখনও শিশু, কখনও দুষ্টু বালক, কখনও ঈশ্বর। তাঁর পদে ভক্তি ও মাতৃস্নেহ একাকার।

তারপর মীরাবাঈ। রাজপ্রাসাদের সমস্ত সামাজিক পরিচয় অতিক্রম করে তিনি কৃষ্ণকে নিজের একান্ত প্রিয়তম করে নেন।বাংলায় চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি, বৈষ্ণব পদাবলির অসংখ্য কবি কৃষ্ণকে প্রেমের ভাষায় পুনর্জন্ম দিয়েছেন।

আর রবীন্দ্রনাথের ভানুসিংহ ? আধুনিক বাংলা কবিতার একজন শ্রেষ্ঠ নির্মাতা নিজের তরুণ বয়সে বৈষ্ণব পদাবলির ভাষা ধার করে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকে নতুন কাব্যিক চেতনায় ফিরিয়ে আনলেন। এখানে কৃষ্ণ আর শুধু ধর্মীয় চরিত্র নন। তিনি বাংলা কাব্যের প্রেমের অভিধান।

‘মনের মানুষ’: কৃষ্ণের অন্তরযাত্রা

বাংলার লোকসংস্কৃতিতে কৃষ্ণের উপস্থিতির আরও সূক্ষ্ম রূপ দেখা যায় বাউল ভাবনায়। বাউলের ‘মনের মানুষ’ কোনও নির্দিষ্ট পৌরাণিক চরিত্র নয়। কিন্তু ভক্তি-ঐতিহ্যের সঙ্গে তার যে অন্তর্গত সম্পর্ক, সেখানে কৃষ্ণের ব্যক্তিগত ঈশ্বরের ধারণার সঙ্গে এক ধরনের সাদৃশ্য অনুভব করা যায়।

ঈশ্বর তখন বাইরে নন। তিনি ভিতরে। মন্দিরে নয়, মানুষের শরীরে। দূরের আকাশে নয়, অন্তরের অন্ধকারে। এই ভাবনায় কৃষ্ণের বাঁশি যেন বাইরে থেকে ডাকে না; ভিতর থেকে বাজে। এখানেই ভারতীয় সংস্কৃতির একটি বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হয় – একই প্রতীককে লোকধর্ম, ভক্তি, দর্শন এবং ব্যক্তিগত সাধনা নিজেদের মতো করে গ্রহণ করতে পারে। কৃষ্ণ তাই একটি স্থির মূর্তি নন। তিনি এক অন্তহীন ব্যাখ্যা। 

রঙে-রেখায় কৃষ্ণ

কৃষ্ণের বহুরূপী জীবন শিল্পীদের জন্যও যেন এক অন্তহীন ভাণ্ডার। রাজস্থানি মিনিয়েচার চিত্রকলায় কৃষ্ণ ও রাধার প্রেম, রাসলীলা, যমুনাতীর, বর্ষার মেঘ ইত্যাদি সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক স্বপ্নময় জগৎ।

কিষণগড় ঘরানার ‘বনী-ঠনী’ চিত্র ভারতীয় ক্ষুদ্রচিত্রকলার এক স্মরণীয় প্রতিমূর্তি। তার দীর্ঘ চোখ, কপালের রেখা, মুখের সূক্ষ্মতা – পরবর্তী কল্পনায় রাধার এক আদর্শীকৃত রূপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

পাহাড়ি চিত্রকলায়, বিশেষত কাংড়া ধারায়, কৃষ্ণ প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম। বৃক্ষ, নদী, পাহাড়, মেঘ, পাখি – সবকিছু যেন তাঁর প্রেমের নাট্যমঞ্চ। এখানে প্রকৃতি নিছক পটভূমি নয়। প্রকৃতিই প্রেমের অংশ। কৃষ্ণের বাঁশি বাজলে বৃক্ষও যেন সেই সুর শোনে ।

রবি বর্মা থেকে যামিনী রায়

উনিশ শতকে রাজা রবি বর্মা ভারতীয় পৌরাণিক চরিত্রগুলিকে এমন এক বাস্তবসম্মত চিত্ররূপ দিয়েছিলেন, যা পরে মুদ্রিত অলিওগ্রাফের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছয়। ফলে কৃষ্ণ আর কেবল মন্দিরের ছবি নন; তিনি হয়ে ওঠেন গৃহসজ্জার অংশ। তারপর বাংলা শিল্পে আসে অন্য এক বিপ্লব। যামিনী রায় লোকশিল্পের শক্তিশালী রেখা, রঙের সংযম এবং আধুনিকতার বোধ দিয়ে কৃষ্ণ-রাধাকে নতুনভাবে নির্মাণ করেন। এখানে কৃষ্ণ আর রাজদরবারের অলংকারময় দেবতা নন। তিনি হয়ে ওঠেন প্রায় লোকগাথার মানুষ। চোখ বড়, রেখা সরল, ভঙ্গি সংক্ষিপ্ত – কিন্তু আবেগ গভীর।

কালীঘাট পটেও পৌরাণিক চরিত্রগুলি নাগরিক জীবনের রসিকতা ও তীক্ষ্ণতার সঙ্গে নতুন অর্থ পেয়েছিল। এই ধারাবাহিকতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা শেখায় – কৃষ্ণকে যে যুগ আঁকে, কৃষ্ণের মধ্যে সেই যুগের মুখও ফুটে ওঠে।

রুপালি পর্দায় কৃষ্ণ: পুরাণের দ্বিতীয় জন্ম

ভারতীয় চলচ্চিত্রের সঙ্গে কৃষ্ণের সম্পর্কও প্রায় শতাব্দীপ্রাচীন। ১৯১৮ সালের শ্রী কৃষ্ণ জন্ম ভারতীয় পুরাণকে চলচ্চিত্রের ভাষায় নিয়ে আসার প্রাথমিক উল্লেখযোগ্য উদাহরণগুলির একটি। এরপর চলচ্চিত্রের ভাষা বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, দর্শক বদলেছে – কৃষ্ণ থেকেছেন।

১৯৫৭ সালের মায়াবাজার তার এক অসামান্য দৃষ্টান্ত। কে. ভি. রেড্ডির পরিচালনায় নির্মিত এই তেলুগু-তামিল চলচ্চিত্রে এন. টি. রামা রাও কৃষ্ণের ভূমিকায় অভিনয় করেন। তাঁর কৃষ্ণচরিত্র পরবর্তী দক্ষিণ ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। এখানে একটি আকর্ষণীয় বিষয় আছে। চলচ্চিত্র কৃষ্ণকে শুধু পুনরায় দেখায়নি; অনেক সময় চলচ্চিত্রই মানুষের কৃষ্ণ-ভাবনাকে নতুন করে নির্মাণ করেছে।

তারপর আসে টেলিভিশন। ১৯৮৮ সালে বি. আর. চোপড়ার মহাভারত ভারতীয় পরিবারের রবিবার সকালকে যেন এক সমবেত অভ্যাস বানিয়ে দেয়। নীতিশ ভরদ্বাজের কৃষ্ণচরিত্র সেই প্রজন্মের স্মৃতিতে বিশেষভাবে গেঁথে যায়। কয়েক দশক পরও তাঁর সেই কৃষ্ণরূপ নিয়ে আলোচনা ও পুনরাভিনয় চলতে দেখা যায়। রামানন্দ সাগরের শ্রীকৃষ্ণও পরবর্তী সময়ে কৃষ্ণকাহিনিকে টেলিভিশন দর্শকের কাছে আরও জনপ্রিয় করে।

এরপর অ্যানিমেশন। কৃষ্ণ অউর কংস, লিটল কৃষ্ণ – শিশুদের জন্য তৈরি নতুন ভাষা। অর্থাৎ কৃষ্ণ শাস্ত্র থেকে পর্দায়, পর্দা থেকে ছোটপর্দায়, ছোটপর্দা থেকে অ্যানিমেশনে – প্রতিবার নতুন পোশাক পরেছেন। কিন্তু গল্পের প্রাণ থেকে গেছে।

বলিউডের রঙে কৃষ্ণ

জনপ্রিয় হিন্দি সিনেমায় কৃষ্ণ সবসময় সরাসরি উপস্থিত নন। কখনও তিনি একটি গান। কখনও একটি উপমা। কখনও নায়কের স্বভাব। কখনও প্রেমের রঙ। 

‘রং বরসে’-র মতো হোলির গান ভারতীয় সিনেমায় কৃষ্ণ-রাধা-প্রতীকের সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে জনপ্রিয় উৎসবের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। লগান-এর ‘রাধা কৈসে না জলে’ গানও কৃষ্ণ-রাধার প্রেমকল্পনাকে আধুনিক সিনেমার প্রেমের ভাষায় পুনর্গঠন করেছে। আর গোলিয়োঁ কি রাসলীলা: রাম-লীলা- শিরোনামেই ‘রাসলীলা’ শব্দটির ব্যবহার দেখায়, কীভাবে কৃষ্ণীয় নন্দনতত্ত্ব আধুনিক প্রেম, আকাঙ্ক্ষা ও নাটকীয়তার সাংস্কৃতিক অভিধানে প্রবেশ করেছে। কৃষ্ণের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য এখানে ধরা পড়ে। তিনি কেবল ধর্মীয় চরিত্র নন; তিনি ভারতীয় রোমান্টিক কল্পনারও এক প্রাচীনতম archetype। চতুর, রসিক, আকর্ষণীয়, কখনও দুর্বোধ্য – কিন্তু গভীরে গিয়ে সম্পর্ক ও ন্যায়ের প্রশ্নে জড়িত।

দহি-হান্ডি: লীলার নগরায়ণ

কৃষ্ণের বাল্যলীলা কীভাবে আধুনিক নগর-উৎসবে পরিণত হয়েছে, তার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ দহি-হান্ডি। মাখনচোর বালকের গল্প একসময় গ্রামের লোকস্মৃতি ছিল। পরে তা মুম্বাইয়ের নগর-সংস্কৃতিতে বিশাল গণউৎসবের রূপ পেয়েছে। মানুষের শরীরের উপর মানুষ উঠে তৈরি করে মানব-পিরামিড। উপরে ঝুলছে দইয়ের হাঁড়ি। সেটি ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে উল্লাস। পুরাণের একটি ছোট্ট কাহিনি এখানে পরিণত হয়েছে দলগত দক্ষতা, প্রতিযোগিতা, উৎসব ও জনসমাবেশে। কৃষ্ণের লীলার এই আধুনিক রূপান্তর দেখায় – লোকসংস্কৃতি কখনও স্থির থাকে না। সে শহরে আসে। মাইক্রোফোন পায়। বিজ্ঞাপন পায়। রাজনীতির মঞ্চ পায়। কিন্তু তার ভিতরে থেকে যায় গোকুলের সেই দুষ্টু বালক।

রাজনীতির মঞ্চে কৃষ্ণ

কৃষ্ণের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল অধ্যায় সম্ভবত রাজনীতি। বিশেষ করে গীতা।

ঔপনিবেশিক ভারতের জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীরা গীতাকে নতুন করে পড়েছিলেন। বাল গঙ্গাধর তিলকের গীতারহস্য কর্মযোগকে সক্রিয় কর্তব্য ও কর্মের সঙ্গে যুক্ত করে। অন্যদিকে মহাত্মা গান্ধী গীতাকে অনাসক্তি, আত্মশুদ্ধি ও অহিংস নৈতিকতার আলোয় পাঠ করেছিলেন।

একই কৃষ্ণ। একই গীতা। কিন্তু পাঠ দুটি সম্পূর্ণ অভিন্ন নয়। এই বৈপরীত্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ কৃষ্ণ কোনও একমাত্রিক রাজনৈতিক মতাদর্শের শিক্ষক নন। তাঁর বাণীর মধ্যে এমন এক ব্যাখ্যাগত বিস্তার আছে, যার কারণে বিভিন্ন যুগ ও বিভিন্ন চিন্তক নিজেদের প্রশ্ন নিয়ে তাঁর কাছে ফিরে যেতে পারেন।

বঙ্কিমের কৃষ্ণচরিত্রও ঔপনিবেশিক জ্ঞান ও নৈতিকতার চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষিতে ভারতীয় আত্মপরিচয় পুনর্গঠনের বৃহত্তর প্রকল্পের অংশ হিসেবে পড়া যায়। স্বাধীনতার পর কৃষ্ণ আরও নানা রাজনৈতিক প্রতীকে ব্যবহৃত হয়েছেন – সাংস্কৃতিক পরিচয়, ধর্মীয় সমাবেশ, জনউৎসব, জাতীয়তাবাদী ভাষ্য, এমনকি সামাজিক ন্যায়ের প্রতীক হিসেবেও। কিন্তু এখানেই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কৃষ্ণকে যখন কেবল একটি রাজনৈতিক পরিচয়ের পতাকায় বেঁধে ফেলা হয়, তখন তাঁর বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সংকুচিত হয়ে যায়। কারণ কৃষ্ণের মধ্যে শুধু ক্ষমতা নেই। আছে প্রেম। শুধু যুদ্ধ নেই। আছে বাঁশি। শুধু রাষ্ট্রনীতি নেই। আছে বন্ধুত্ব। শুধু কর্তব্য নেই। আছে আনন্দ। 

কৃষ্ণ এবং ভারতীয় বহুত্ব

কৃষ্ণকে কোনও একটি মাত্র অঞ্চল দিয়ে বোঝা যায় না। উত্তরে তিনি ব্রজের কৃষ্ণ। পশ্চিমে দ্বারকার কৃষ্ণ। পূর্বে বাংলা-ওড়িশায় রাধাকৃষ্ণের প্রেমিক। দক্ষিণে তিনি গোপাল, গোবিন্দ, বালকৃষ্ণ – ভক্তির নানা রূপে পূজিত। বিভিন্ন ভারতীয় ভাষা ও আঞ্চলিক সাহিত্য কৃষ্ণকে নিজেদের সাংস্কৃতিক ভাষায় গ্রহণ করেছে। আধুনিক গবেষণাতেও বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষ্ণের রূপভেদের বিষয়টি স্পষ্টভাবে আলোচিত হয়েছে। এই বহুত্বই কৃষ্ণের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক শক্তি।

তিনি ভারতকে একরকম চোখে দেখেননি। বরং ভারতের বৈচিত্র্যের ভিতর দিয়ে নিজের জন্য অসংখ্য ঘর তৈরি করেছেন। এক অঞ্চলে তিনি রাধার প্রেমিক। অন্য অঞ্চলে তিনি শিশুগোপাল। কোথাও তিনি দার্শনিক। কোথাও রাজা। কোথাও লোকগানের নায়ক। এই কারণেই কৃষ্ণ ভারতীয় সংস্কৃতির এক অনন্য সেতুচরিত্র। সাংস্কৃতিক সেতু বন্ধন করেন তিনি। 

কেন কৃষ্ণ আজও পুরনো হন না ?

হাজার-হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনও একটি সাংস্কৃতিক চরিত্র কীভাবে এত জীবন্ত থাকতে পারে ? সম্ভবত কারণ কৃষ্ণ কোনও একটি মাত্র উত্তর নন। তিনি প্রশ্নের সঙ্গী।

যে মানুষ কর্তব্যের সংকটে পড়েছে – তার কৃষ্ণ গীতার গুরু। যে মানুষ প্রেমে পড়েছে – তার কৃষ্ণ বাঁশিওয়ালা। যে মানুষ সন্তানকে কোলে নিয়েছে – তার কৃষ্ণ বালগোপাল। যে মানুষ বন্ধুকে খুঁজছে – তার কৃষ্ণ সখা। যে মানুষ ঈশ্বরকে নিজের মতো করে পেতে চায় – তার কৃষ্ণ অন্তরের প্রিয়তম। যে শিল্পী রঙ খুঁজছেন – তার কৃষ্ণ নীল। যে সংগীতশিল্পী সুর খুঁজছেন – তার কৃষ্ণ বাঁশি। যে কবি বিরহের ভাষা খুঁজছেন – তার কৃষ্ণ অনুপস্থিত। যে রাষ্ট্রনায়ক কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়ে – তার কৃষ্ণ কূটনীতির গুরু। আর যে সাধারণ মানুষ উৎসব করতে চায় তার কৃষ্ণ দোলের আবির, হোলির রঙ, জন্মাষ্টমীর আলো, দহি-হান্ডির উল্লাস। এ কারণেই কৃষ্ণের সাংস্কৃতিক জীবন কখনও শেষ হয় না। তিনি প্রতিটি যুগে নতুন করে জন্ম নেন।

কৃষ্ণ: আনন্দের দর্শন

কৃষ্ণকে আমরা প্রায়ই ধর্ম, নীতি বা দর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করি। কিন্তু তাঁর আর একটি বড় শিক্ষা আছে তা হল আনন্দ। আনন্দম। 

বৃন্দাবনের কৃষ্ণ জীবনকে শুধু কর্তব্যের ভারে দেখেন না। তিনি নাচেন। গান করেন। বাঁশি বাজান। বন্ধুর সঙ্গে হাসেন। প্রেম করেন। লীলা করেন। ভারতীয় দর্শনে এই ‘লীলা’ ধারণার মধ্যে গভীর তাৎপর্য আছে। বিশ্ব কেবল কঠোর নিয়মের যন্ত্র নয়; তার মধ্যে খেলা আছে, সৌন্দর্য আছে, সৃষ্টির আনন্দ আছে। কৃষ্ণের এই লীলাময়তা ভারতীয় নন্দনতত্ত্বকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। রসের ধারণা, প্রেমের সৌন্দর্য, সংগীতের মাধুর্য, নৃত্যের ভঙ্গি – সবকিছুর সঙ্গে কৃষ্ণের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। তাই কৃষ্ণকে শুধু ‘কী করতে হবে’-র শিক্ষক হিসেবে দেখলে তাঁর অর্ধেক হারিয়ে যায়। তিনি শেখান – কীভাবে বাঁচতে হয়, কীভাবে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে কাজ করতে হয়, এবং কীভাবে আনন্দ করতে হয়।

অন্তহীন বাঁশির কাছে ফিরে আসা

শেষ পর্যন্ত আমরা কোথায় ফিরে আসি ? 

বাঁশির কাছে। গীতার মহাকাব্যিক কৃষ্ণের সমস্ত দার্শনিকতা, বঙ্কিমের যুক্তিবাদী কৃষ্ণের সমস্ত বিশ্লেষণ, চৈতন্যের প্রেমোন্মত্ত কৃষ্ণ, জয়দেবের রাধার প্রিয়তম, সুরদাসের বালগোপাল, মীরার শ্যাম, যামিনী রায়ের রেখার কৃষ্ণ, রবি বর্মার চিত্রের কৃষ্ণ, এন. টি. রামা রাও-এর চলচ্চিত্রের কৃষ্ণ, নীতিশ ভরদ্বাজের টেলিভিশনের কৃষ্ণ – সবশেষে যেন এসে মিশে যায় সেই বাঁশির সুরে। একটি বাঁশি নিজে কিছু বলে না। তার ভিতর ফাঁকা জায়গা থাকে বলেই সে সুর দিতে পারে। হয়তো কৃষ্ণের সবচেয়ে গভীর প্রতীকও এই শূন্যতা। নিজেকে একটু সরিয়ে দিলে তবেই বৃহত্তর কোনও সুর আমাদের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। এই অর্থে কৃষ্ণ কেবল দেবতা নন। তিনি এক অন্তর্গত সম্ভাবনা। মানুষের মধ্যে যে আনন্দ, যে প্রেম, যে সাহস, যে বুদ্ধি, যে আত্মসন্ধান – কৃষ্ণ যেন তারই বহুরূপী প্রতীক।

এক চরিত্র, অসংখ্য জন্ম

শ্রীকৃষ্ণের প্রকৃত শক্তি হয়তো তাঁর দেবত্বে নয় – তাঁর রূপান্তরক্ষমতায়। তিনি কখনও একটি নির্দিষ্ট রূপে বন্দি থাকেননি। মহাভারতের কৃষ্ণ থেকে ভাগবতের কৃষ্ণ, গীতার কৃষ্ণ থেকে বৃন্দাবনের কৃষ্ণ, জয়দেবের কৃষ্ণ থেকে চণ্ডীদাসের কৃষ্ণ, চৈতন্যের কৃষ্ণ থেকে রবীন্দ্রনাথের কৃষ্ণ, বঙ্কিমের কৃষ্ণ থেকে তিলক ও গান্ধীর কৃষ্ণ, রবি বর্মার কৃষ্ণ থেকে যামিনী রায়ের কৃষ্ণ, মঞ্চের কৃষ্ণ থেকে সিনেমার কৃষ্ণ, টেলিভিশনের কৃষ্ণ থেকে অ্যানিমেশনের কৃষ্ণ – প্রতিটি যুগ তাঁকে নতুন করে নির্মাণ করেছে। তবু তিনি শেষ হয়ে যাননি। কারণ কৃষ্ণ কোনও শেষ হয়ে যাওয়া গল্প নন। তিনি একটি চলমান সংলাপ। ভারতীয় সভ্যতা নিজের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেই কোনও না কোনওভাবে কৃষ্ণের কাছে ফিরে গেছে। কখনও প্রশ্ন নিয়ে। কখনও প্রেম নিয়ে। কখনও যন্ত্রণা নিয়ে। কখনও যুদ্ধ নিয়ে। কখনও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে।

আর কৃষ্ণ ? 

তিনি কখনও রথের আসনে বসে উত্তর দিয়েছেন। কখনও কদমতলায় বাঁশি বাজিয়েছেন। কখনও রাধার চোখে বিরহ হয়ে থেকেছেন। কখনও মায়ের কোলে শিশুরূপে হেসেছেন। কখনও শিল্পীর ক্যানভাসে নীল হয়ে উঠেছেন। কখনও সিনেমার পর্দায় জীবন্ত হয়েছেন। কখনও রাজনৈতিক বক্তৃতায় প্রতীক হয়েছেন। আবার কখনও নিঃশব্দে কোনও মানুষের অন্তরে প্রবেশ করেছেন।

জন্মাষ্টমীর মধ্যরাতে তাই কৃষ্ণের জন্মকে শুধু একটি পৌরাণিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি বলে মনে হয় না। মনে হয়, আমাদের নিজস্ব অন্ধকারের মধ্যেও কোথাও একটি আলো জন্ম নিচ্ছে। কারাগারের দরজা খুলছে। যমুনার জল পথ করে দিচ্ছে। দূরে কদমগাছের ছায়া। আর তারপর একটি বাঁশি বাজছে। সে বাঁশির কোনও নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই। মথুরায় নয়, বৃন্দাবনেই নয়, কুরুক্ষেত্রেও নয়। সে বাজে মানুষের স্মৃতিতে। মানুষের প্রেমে। মানুষের প্রশ্নে। মানুষের শিল্পে। মানুষের স্বপ্নে। তাই কৃষ্ণের জন্ম শেষ হয়ে যায় না। তিনি জন্ম নেন বারবার – প্রতিটি যুগে,প্রতিটি শিল্পে,প্রতিটি হৃদয়ে।

আর তাঁর বাঁশি ? সে তো অন্তহীন

…………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………..

নির্বাচিত পাঠ ও সাংস্কৃতিক উৎস : 

প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় উৎস : মহাভারত · ভগবদ্গীতা · হরিবংশ · শ্রীমদ্ভাগবত মহাপুরাণ · জয়দেব, গীতগোবিন্দ · শ্রীকৃষ্ণকীর্তন · বৈষ্ণব পদাবলি · সুরদাসের পদাবলি · মীরাবাঈয়ের ভজন।

আধুনিক ভারতীয় চিন্তা : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কৃষ্ণচরিত্র · বাল গঙ্গাধর তিলক, গীতারহস্য · মহাত্মা গান্ধীর গীতা-ব্যাখ্যা অনাসক্তিযোগ · রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলি।

চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন : শ্রী কৃষ্ণ জন্ম (১৯১৮) · মায়াবাজার (১৯৫৭) · মহাভারত (১৯৮৮) · শ্রীকৃষ্ণ · কৃষ্ণ অউর কংস (২০১২) · অন্যান্য কৃষ্ণভিত্তিক চলচ্চিত্র ও অ্যানিমেশন।

চিত্রকলা ও নন্দনতত্ত্ব : কিষণগড় মিনিয়েচার · বনী-ঠনী · কাংড়া ও পাহাড়ি চিত্রশৈলী · রাজা রবি বর্মার কৃষ্ণচিত্র · কালীঘাট পট · যামিনী রায়ের কৃষ্ণ-রাধা বিষয়ক চিত্রকর্ম।

ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ - নবকুমার দাস

ভারতীয় ভাষার মহাযাত্রা

Author

আপনার মতামত লিখুন

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

অন্তহীন বাঁশির সুর : ভারতীয় জনজীবনে শ্রীকৃষ্ণ

This entry is part 19 of 19 in the series ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ – নবকুমার দাস ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ – নবকুমার দাস ১ : সিন্ধু–সরস্বতী

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

অন্তহীন বাঁশির সুর : ভারতীয় জনজীবনে শ্রীকৃষ্ণ

This entry is part 19 of 19 in the series ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ – নবকুমার দাস ভারতের সংস্কৃতি সিরিজ – নবকুমার দাস ১ : সিন্ধু–সরস্বতী

Read More »