ধ্রুপদী সাহিত্য
শ্যামলকৃষ্ণ বসু
২
দস্যু রত্নাকর

এই ব্রহ্মান্ডে চারযুগ। সত্য ত্রেতা দ্বাপর এবং কলি। সত্যযুগ ছিল মানুষের সিদ্ধ নৈতিকতার যুগ। সেই সময়ে মানুষের মধ্যে ছিল সত্যনিষ্ঠা এবং নৈতিকতা। মানুষের মধ্যে তখন কোন অনৈতিকতা ছিল না। তখন শুধুই পুন্য ছিল। তখন পাপ ছিল না। প্রাণ ছিল মজ্জায়। মৃত্যু ছিল ইচ্ছাধীন। তখন বেদ ছিল সামবেদ। নাম ছিল তারকব্রহ্ম নাম।
আর ত্রেতাযুগ হল ক্ষত্রিয় যুগ। এই ত্রেতাযুগে জন্মাবেন ভগবান রাম। একজন অবতার পুরুষের জন্ম হবে এই যুগে। সেখানেই এই কাহিনীর আখ্যান ভাগ শুরু।
দেবাদিদেব বলতে থাকেন, ‘শুনুন মুনিবর, মনুষ্যগন হত্যা আদি যত পাপ করে, একবার রাম নামে সর্বপাপ হরে। মহাপাপী হয়ে যদি রামনাম লয়, সংসার সমুদ্র তাঁর বৎসপদ হয়।
পৃথিবীতে মহাপাপী আছয়ে একজন ,
তাঁরে গিয়া রামনাম দেহ তপোধন !
এক সে মুনীর পুত্র দস্যু রত্নাকর
দস্যুবৃত্তি করে সেহ বনের ভিতর ।। [কৃত্তিবাস ]
সেই ত্রেতাযুগে রত্নাকর নামে ছিলেন একজন দস্যু। মহাপাপী রত্নাকর। ইতিহাস বলে আসলে তিনি ছিলেন একজন ঋষির তনয়। কিন্তু তিনি যখন একজন পঞ্চম বর্ষীয় বালক, তখন সেই যুগে কোনভাবে তিনি গভীর জঙ্গলে পথ হারিয়ে ফেলেন এবং এক দস্যুদলের করায়ত্ত হন। অতঃপর বালক রত্নাকর সেই দস্যুদলের দস্যু সর্দারের কাছে প্রতিপালিত হতে থাকেন। তিনি আর কোনভাবেই নিজের পিতার কাছে ফিরে যেতে সক্ষম হন নি। ক্রমে ক্রমে রত্নাকর তার বয়ঃকালে তাঁর পালক পিতা সেই দস্যুসর্দারের শিক্ষায় অচিরেই একজন দস্যুতে পরিনত হয়ে ওঠেন এবং দস্যুবৃত্তি অবলম্বন করেন। রত্নাকর ক্রমে ক্রমে তাঁর নিজের অতীত কথা বিস্মৃত হন।
সেই যুগে তখন অনেকেই তাদের পরিবার পরিজন পালনার্থে দস্যুবৃত্তি করতেন। সেইকালে এই ধরিত্রিতে নেমেছিল এক ভীষণ অজন্মা খরা অনাবৃষ্টি কাল। দীর্ঘ বারোবৎসরকাল অজন্মা আর অনাবৃষ্টিতে, গৃহে গৃহে প্রদেশে প্রদেশে কর্মহীনতা আর অনাহারে মানুষের জীবন তখন অস্তব্যস্ত। অনেকেই সংসার প্রতিপালনে দস্যুবৃত্তি অবলম্বন করে জীবনধারন করত। রত্নাকর ও সেই পথ অবলম্বন করেছিলেন পরিবার প্রতিপালনে।
একদিন দস্যু রত্নাকর গভীর জঙ্গলে তাঁর শিকারের অপেক্ষায় উন্মুখ হয়ে আছেন।
উচ্চবৃক্ষে চড়িয়া সে চতুর্দিকে চায় ,
সন্ন্যাসী বেশী নারদেরে দেখিবারে পায় !
ভাবে দস্যু রত্নাকর লুকাইয়া বনে ,
সন্ন্যাসী মারিয়া বস্ত্র লুটিব এক্ষনে ! [কৃত্তিবাস ]
সন্ন্যাসী বেশী নারদ ভাবেন কোথায় দস্যু রত্নাকর? কেমনে জানা যাবে সে কোন জন ? গহন বনে রত্নাকরের সন্ধানে মুনিবর এগিয়ে চলেছেন দেবাদিদেবের ইচ্ছায়।
নারদ মুনি এবে সেই পথেতে যাইতে,
লৌহমুদ্গর তোলে দস্যু নারদে বধিতে।
ব্রহ্মার মায়াতে তাঁর মুদ্গর না চলে ।
মায়ায় মুদ্গর বন্ধ থাকে তাঁর করতলে। [কৃত্তিবাস ]
এ কি অদ্ভুত ব্যাপার ! হাতের মুদ্গর আজ হাতেই কেন বন্ধ ! কে ইনি ?
নারদ মুনি জিজ্ঞাসা করেন, ‘ ওহে বাপু , তুমি কোন জন ? আমারে বধিতে চাও বল কি কারন ? ‘
দস্যু বলে,‘ আমি রত্নাকর। আমি এই বনভূমির বনচর দস্যু! আমি দস্যুগিরি করে আমার সংসার প্রতিপালন করি।’
দেবর্ষি নারদ জিজ্ঞাসা করেন, ‘ কিন্তু আমা হেন সন্ন্যাসীকে বধ করে তোমার কোন পুন্য হয় ?’
রত্নাকর বলে, ‘ ওহে সন্ন্যাসী পাপ পুন্য আমি জানি না। মারিলাম তোমা হেন কতেক সন্ন্যাসী ! আমি এমনি করেই হত্যা করি এবং পরধন লুট করি।’
সন্ন্যাসী জিজ্ঞাসেন,‘ কিন্তু রত্নাকর, সংসারে কোন মানুষ কি পরধন হরণ করে সুখী হয়? সে যে পাপ ! সে তো পুন্য নয় ! সে কি কখনো উচিত হয় ? রত্নাকর পাপ কর কার লাগি ! তোমার এ পাতকের কেহ আছে ভাগি ?
রত্নাকর বলে , ‘ কেন নয় ? আমার পিতা মাতা স্ত্রী পরিজন। সকলেই আমার পাপের ভাগী এক্ষন !
নারদ বলেন , ‘ রত্নাকর, তোমার পাপের ভাগী কেন হবেন তাঁরা ? ‘
দস্যু বলে, ‘ সন্ন্যাসী , যত কিছু বেচি কিনি খাই চারিজনে। আমার পাপের ভাগী সকলে এক্ষনে !‘
‘ করিয়াছ যত পাপ আপনার কায়
আপনি করিলে পাপ আপনার দায়
জিজ্ঞাসা করিয়া আইস তুমি নিশ্চয়
তোমার পাপের ভাগী তাঁরা যদি হয় ! ‘ [কৃত্তিবাস]
রত্নাকর কিঞ্চিত চিন্তায় পড়ে যায়। এমন কথা কেহই তাহাকে কখনো বলে নাই। পাপ কি, পুন্য কি, কে সেই কথা বিচার করে ? অনাবৃষ্টি কাল। কর্মহীন মানুষ। কর্ষণহীন ভুমি। ফসলহীন জমি।
সন্ন্যাসী বললেন,‘ রত্নাকর, কেন না তুমি আপন গৃহে গমনপূর্বক তোমার পরিবার পরিজনকে জিজ্ঞাসা করে এসো, তাঁরা, তোমার আপনজনেরা, তোমার পরম প্রিয়জনেরা, তোমার এই দস্যুবৃত্তি কি চোখে দেখেন ? তাদের চোখে তুমি কতখানি মহান এবং তাদের নিকট তুমি ঠিক কতখানি প্রিয়? তাঁরা কি তোমার এই অনিচ্ছাকৃত পাপের ভাগ নিতে রাজি আছেন ?’
দস্যু বলে,‘ সন্ন্যাসী এ বৃথা প্রশ্ন ! তুমি পলায়নের পথ খুঁজিতেছ। সে সম্ভব না।’
সন্ন্যাসী বলেন,‘রত্নাকর, তুমি আমার উপরে বিশ্বাস রাখিতে পারো। আমি ঈশ্বরের দিব্য দিয়ে বলছি, তুমি না ফিরে আসা পর্যন্ত আমি এই স্থানে তোমার জন্য অপেক্ষা করব। আমি তোমার উত্তরের মীমাংসা না নিয়ে এই স্থান হতে কদাপি কোথাও গমন করিব না। তুমি নিশ্চিন্তে যাও তোমার গৃহে। রত্নাকর আমার পরিচয় শোনো। আমি দেবর্ষি নারদ।’
রত্নাকর সন্ন্যাসীর নাম শুনে কিছু বুঝতে না পারলে ও কিঞ্চিৎ আশ্বস্ত হয় এই ভেবে যে এই সন্ন্যাসী তাঁর কথা রাখবে । সে নিশ্চয়ই পলায়ন করবে না। তাই সে বলে, ‘বেশ যেমন আপনার অভিপ্রায়! আমি আমার পরিবার পরিজনদের কাছে আপনার প্রশ্নের উত্তর জেনে আসছি।
এইবার রত্নাকর মনে মনে সন্ন্যাসীর কথাগুলি আলোচনা করতে করতে গৃহের দিকে আগুয়ান হয় এবং পথিমধ্যে একপ্রকার স্থির নিশ্চয়ই হয়, সংসারে যারা তার উপার্জিত অর্থে প্রতিপালিত হয় তারা কি কখনো তাকে অস্বীকার করতে পারে ? সন্ন্যাসী যে কথাগুলির মীমাংসার কারনে তাকে গৃহে প্রেরণ করলেন সেখানে এ কথার মীমাংসা কি সম্ভব? আসলে রত্নাকর নিজ ভাবনায় কথাগুলির কোন মীমাংসা করে উঠতে পারে না। রত্নাকরের মনের মধ্যে একটা বিচিত্র দোলাচল দানা বাঁধতে থাকে।
সন্ন্যাসী কথা দিয়েছেন , ‘সত্য করি বলি শুন , না পলাইব আমি
মাতাকে পিতাকে শুধাইয়া আইস তুমি ।!
অতঃপর যায় দস্যু ফিরি ফিরি চায় ,
ভাবে মনে ভাঁড়াইয়া সন্ন্যিসি না পলায় ।। [কৃত্তিবাস ]
( চলবে )


