বিশ্বসাহিত্যের ধারা - রঞ্জন চক্রবর্ত্তী
বিশ্বসাহিত্যের ধারা
রঞ্জন চক্রবর্ত্তী
“Everything you look at can become a fairy tale and you can get a story from everything you touch.”
– Hans Christian Anderson
।। এক।।
শিশু তার চারপাশে যে জগৎকে দেখে তার অপার রহস্য তাকে মুগ্ধ করে। মেঘ, পাহাড়, সাগর প্রভৃতি সবকিছুই তার কল্পনাকে উজ্জীবিত করে। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন রহস্য যেমন তাকে অভিভূত করে, তেমনই একের পর এক রহস্যের আবরণ তার কাছে উন্মোচিত হয়। যখন সে পরিণত হয় তখনও তার মনের সমান্তরালে একটি শিশুমন আবার শৈশবের সেই ফেলে আসা দিনগুলোয় ফিরে যেতে চায় যখন সে কল্পনার রাজ্যে বাস করত। আসলে রূপকথা অতি শৈশবে আমাদের মনে যে গভীর প্রভাব ফেলে পরিণত বয়সে এসেও আমরা তাকে ভুলতে পারি না। শৈশবের সেই সুখস্মৃতি আমাদের বাস্তব জীবনের রুক্ষতা ও কঠোরতার উপর পরিতৃপ্তির প্রলেপ বুলিয়ে দেয়। পরিণত মানুষও মনের গভীরে প্রাত্যহিক জীবনে বাস্তবের কঠোরতা থেকে ক্ষণিকের তরে মুক্তি পেতে চায়। রূপকথার গল্পতার এই মানসিক চাহিদা পূরণ করে। প্রকৃতপক্ষে এ হল সম্পূর্ণরূপে কল্পনানির্ভর এমন এক আশ্চর্য জগৎ যার পরিসর সমুদ্রের অতল থেকে আকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত। বাস্তব জগতের বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের সঙ্গে রূপকথার জগতের কোনও সম্পর্ক নেই।
রূপকথাগুলি কারা রচনা করেছেন তা নির্দিষ্টভাবে জানার উপায় নেই। আবহমান কাল ধরে মা-ঠাকুরমার মুখে শিশুরা এই গল্পগুলি শুনে এসেছে।পৃথিবীর সব দেশেই যুগে যুগে রূপকথা রচিত হয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষ রূপকথাগুলি লাভ করেছে। অন্য সব লৌকিক সাহিত্যের মত এখানেও রচয়িতা সামগ্রিকভাবে একটি জাতিগোষ্ঠীর পিছনে আত্মগোপন করে আছেন। তাই রূপকথায় কোনও বিশেষ ব্যক্তির কথা নেই, “সমগ্র জাতিরই প্রাণের কথা, অন্তরতম আশা-আকাঙ্খা ইহাতে ধ্বনিত হইয়া উঠিয়াছে। যেন জাতি তাহার রচয়িতাকে সম্পূর্ণরূপে অবসর দিয়া সেগুলিকে একেবারে খাস সম্পত্তি করিয়া লইয়াছে।” মহাকাব্য যেমন সমগ্র জাতির অন্তরের সত্ত্বার সামগ্রিক বিকাশ, তেমনই রূপকথাও নিজের মধ্যে নিজেই বিকশিত হয়ে উঠেছে। রূপকথা সম্পর্কে বলা যায় – “Like all traditional literature, were originally the possession of everyone, adults and children alike. They were preserved and used by the common folk from the time of the childhood of the human race.”
সর্বদেশের সর্বশ্রেণীর মানুষ রূপকথার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। বহিরঙ্গ বিশ্লেষণে মনে হতে পারে গল্পের টানই এর কারণ, কিন্তু অন্তরঙ্গ বিশ্লেষণে দেখা যায় এর মধ্যে মানবজীবনের পরম সত্য লুকিয়ে থাকে যা কোনকালেই মিথ্যে হয়ে যায় না। রূপকথা আমাদের এমন এক মায়ার জগতে নিয়ে যায় যেখানে বাস্তব আর অবাস্তবের সীমারেখা মুছে যায়, লৌকিক ও অলৌকিকের ভেদ ঘুচে যায়।
রূপকথারআবেদন শিশুমনে অত্যন্ত গভীর। সমালোচক বলেন – “শিশুর মনের গোপন কোণে যে পুঞ্জীভূত অন্ধকার জমাট হইয়া থাকে তাহাতে পৃথিবীর সমুদয় রহস্য যেন নীড় রচনা করে; তাহার চিত্তাকাশে যে কুহেলিকা ব্যাপ্ত হইয়া রহিয়াছে, তাহাতে অন্ধকারের তারার মত, নানাবর্ণের আকাশকুসুম ফুটিয়া থাকে। পৃথিবীর শেষ সীমা সম্বন্ধে এখনও তাহার কোন সুস্পষ্ট ধারণা জন্মে নাই; নানারূপ সম্ভব-অসম্ভব আশা-কল্পনার রঙীন নেশায় সে সর্বদা মশগুল। রূপকথা তাহার সম্মুখে একটি দিগন্তবিস্তৃত, বাধাবন্ধনহীন কল্পনারাজ্যের দ্বার খুলিয়া দিয়া তাহার সংসারানভিজ্ঞ মনে স্বচ্ছন্দ ভ্রমণের উপযুক্ত ক্ষেত্র রচনা করে। রূপকথার সৌন্দর্যসম্ভার তাহারই জন্য, যে পৃথিবীর সঙ্কীর্ণ আয়তনের মাঝে নিজ আশা ও কল্পনাকে সীমাবদ্ধ করে নাই।”
রূপকথার প্রভাব যে শুধু শিশুমনের উপরেই পড়ে তা নয়, বিভিন্ন বয়সের মানুষেরাও তার দ্বারা প্রভাবিত হন। রূপকথার গল্পের সঙ্গে অনেক সময় বাস্তবতার যোগসূত্র পাওয়া যায়।জীবনে বাস্তবতা নিঃসন্দেহে সত্য, কিন্তু তার পাশাপাশি সংসারে অবাস্তবতারও প্রয়োজন আছে। সমালোচকের ভাষায় – “কাজেই রূপকথা আমাদের মনের কোণে আশা-আকাঙ্খাকে যেভাবে ব্যক্ত করিতে চায় তাহাকে কিভাবে অসম্ভব বলিয়া উড়াইয়া দেওয়া যায়। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য স্হুল বস্তুনিচয় যাহা আমাদের নিত্য প্রয়োজন মিটায় তাহাই একমাত্র বাস্তব এমন কথা বলা যায় না। রূপকথা আমাদের প্রাণে যে অস্পষ্ট আবেগ, যে ক্ষীণ প্রতিধ্বনি, যে আপাত-অসম্ভব আশা-কল্পনা জাগাইয়া তোলে তাহারা যে অবাস্তব, আমাদের সম্পূর্ণ অনাত্মীয় এমন কথা বলিতে পারি না।”
সুতরাং রূপকথাকে একেবারে অবাস্তব বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যদি আমরা ধরে নিই যে রূপকথা আমাদের স্বপ্নের জগতে নিয়ে যায় তাহলেও তার মধ্যে বাস্তবতার পরিচয় পাওয়া যায়। আমাদের বাস্তব জীবনের অতৃপ্ত আশা-আকাঙ্খাগুলি স্বপ্নে রূপ পরিগ্রহ করে। বাস্তবজগতে আমরা যে অন্যায়ের প্রতিকার করতে পারি না বা আম্তরিকভাবে চাইলেও যে অপরাধীকে শাস্তি দিতে পারি না, স্বপ্নে সেগুলির প্রতিকার হয়ে যায়। ড. শ্রীকুমার বন্দেপাধ্যায় বলেন – “পৃথিবীর চিরপরিচিত মূর্তিগুলিই একটু অতিরঞ্জনের রাগে রঞ্জিত হইয়া, কল্পনার দ্বারা সামান্যমাত্র রূপান্তরিত হইয়া রূপকথার রাজ্যের অলিতে গলিতে ঘুরিয়া বেড়ায়। যে সব রাক্ষস-খোক্ষস আমাদের পথরোধ করে তাহারা আমাদের পার্থিব বাধা-বিঘ্নেরই একটা রূপান্তরিত সংস্করণ মাত্র; যে অনুকূল দৈব ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমীর রূপে সেইসমস্ত রাক্ষস-খোক্ষসের মৃত্যুরহস্য আমাদের শিখাইয়া দেন, তিনি যেন অযাচিত সাহায্যের দ্বারা এই পৃথিবীতে তাঁহার কার্পণ্য-কলঙ্কের ক্ষালন করেন। . . . . . . . . সাত সমুদ্র তের নদীর পারে বিজন রাক্ষসপুরে যে রাজকন্যা প্রবাল-পালঙ্কে নিদ্রামগ্ন থাকেন, তিনি আমাদের গোপন অন্তঃপুরশায়িনী প্রেয়সী; যে বাধাবিপদের মধ্য দিয়া রূপকথার রাজপুত্র নিজ প্রিয়াকে লাভ করেন, তাহা আমাদের বর্তমান বণিকধর্মী বিবাহের উপর আমাদের অন্তঃস্থ আদর্শ প্রেমিকের অভিমানক্ষুব্ধ দীর্ঘশ্বাস মাত্র। পাতালপুরে নাগকন্যার প্রাসাদ-প্রাঙ্গণে আমরা এই চিরপরিচিত পৃথিবীর স্পর্শ অনুভব করি এবং তাহার মণিমাণিক্যদীপ্ত কক্ষের মধ্যেও এই নিত্যসহচর, পরিচিততম সূর্যালোকের দর্শন পাই।”
রূপকথার হারিয়ে যাওয়া গল্পগুলো সংকলিত ও লিপিবদ্ধ করার জন্য জার্মানির গ্রিম ভাইরা (জ্যাকব লুডউইগ কার্ল এবং উইলহেলম কার্ল) অমর হয়ে আছেন।তাঁদের অমর সৃষ্টি ‘The Frog Prince’, ‘The Goose-Girl’, ‘Hansel and Gretel’, ‘Sleeping Beauty’, ‘Snow White’ইত্যাদি গল্পগুলো যুগ যুগ ধরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের পাঠকদের সম্মোহিত করে রেখেছে। এভাবেই সাহিত্যের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত আছে ফরাসী লেখক শার্ল পেরো-র (১৬২৮-১৭০৩) নাম, যিনি আমাদের ‘Cinderella’, ‘Little Red Riding Hood’, ‘Bluebird’ প্রভৃতি গল্প উপহার দিয়েছেন।
বাংলাদেশে এই কাজ করেছেন রেভারেণ্ড লালবিহারী দে,তাঁর ‘Folktales of Bengal’ বইটির গুরুত্ব অপরিসীম। একইরকম গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন‘ঠাকুরমার ঝুলি’ প্রণেতা দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার। বস্তুত দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার (বাংলায়) এবং লালবিহারী দে (ইংরেজিতে) বাংলার চিরায়ত রূপকথাগুলি উদ্ধার করে সেগুলি লিখে রাখতে শুরু করেন। দীর্ঘদিন পোল্যাণ্ডে থাকার সুবাদে ড. হিরণ্ময় ঘোষাল ঐ অঞ্চলের রূপকথার সঙ্গে বাংলার রূপকথার তুলনা করে বলেছেন – “বাংলার লোক-সাহিত্য অনুসন্ধানে দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার যে কাজ করেছেন, ইউগোশ্লাভিয়ার অর্ন্তগত সার্বিয়া দেশের ভুকও করেছেন সেই কাজ। দক্ষিণারঞ্জনের মত ভুকও চাষা, গেঁয়ো লোকেদের কাছে যেমনভাবে গল্পগুলি শুনেছেন ঠিক তেমন ভাবেই টুকে নিয়ে লিখে গেছেন। তাই তাঁর সংগৃহীত গল্পগুলি সাহিত্যের কারসাজিতে আড়ষ্ট হতে পারে নি।”
বিদেশে নতুন করে যাঁরা রূপকথা লিখেছেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন অস্কার ওয়াইল্ড – ‘The Happy Prince’, ‘The Nightingale and the Rose’, ‘The Selfish Giant’, ‘The Remarkable Rocket’ এবং ‘The Devoted Friend’ প্রভৃতি গল্পগুলি বিশ্বসাহিত্যের সম্পদ বলে বিবেচিত হয়। তবে সকলের কথা মাথায় রেখেও সবথেকে আগে যাঁর নাম করতে হয় তিনি হলেনহান্স ক্রিস্টিয়ান অ্যান্ডারসন। মূলতঃ ছোটদের জন্য লেখা হলেও বিশ্বের সব দেশের সব বয়সের মানুষই তাঁর রূপকথার গল্পের পাঠক। তাঁর গল্পগুলি ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে প্রকাশিত হতে থাকে, শেষ বইটি প্রকাশিত হয় ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে।সারা বিশ্বের পাঠকদের কাছে‘The Little Mermaid’, ‘The Emperor’s New Clothes’, ‘The Snow Queen’, ‘The Princess and the Pea’ প্রভৃতি গল্পগুলির আকর্ষণ কোনওদিন কমবে না। হান্স অ্যান্ডারসনের বেশীর ভাগ গল্পই নিজের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এবং গভীরতর অর্থের আলোকে উজ্জ্বল। তাঁর ছেলেবেলা যে ভয়াবহ দারিদ্র্যের মধ্যে দিয়ে কেটেছে তার প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায় ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত “The Little Match Girl” গল্পটিতে। সমাজ ও সংসার সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা বিধৃত হয়েছে“The Ugly Duckling” গল্পে।
।। দুই।।
বাংলা কথাসাহিত্যের রূপকথার প্রাথমিক রূপটির জন্ম দিয়েছিলেন অন্দরমহলের মেয়েরা। গ্রামের চণ্ডীমন্ডপে বসে মঙ্গলকাব্য রচনা করতে গিয়ে সে আমলের কবিরাও এগুলির দ্বারা অনেকটা প্রভাবিত হতেন। মঙ্গলকাব্যগুলির মধ্যে প্রায়ই রূপকথার গল্পের ছায়াপাত ঘটার ফলে অতিলৌকিক বাতাবরণের সৃষ্টি হয়েছে। কমলে কামিনীর গল্প বা গাঙুড়ের জলে বেহুলার ভেলায় চড়ে স্বর্গে যাত্রার গল্প তো আসলে রূপকথাই। বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের রচনা কৃত্তিবাসী রামায়ণেও এই ধরণের রূপকথার সন্নিবেশ দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে আমরা রাবণের সৈন্যদলভুক্ত জনৈক রাক্ষস ভস্মলোচনের কথা উল্লেখ করতে পারি। ভস্মলোচন যার উপর দৃষ্টিপাত করত সে-ই ভস্ম হয়ে যেত। ইংলণ্ডেও এরকমই একটি রূপকথা প্রচলিত আছে। গ্যালিক দেবতা বেলর নাকি একইভাবে শত্রুদের দিকে তাকিয়ে তাদের ভস্ম করতে পারত।
সাধারণভাবে বলা যায় রূপকথার গল্পগুলি অতি প্রাচীনকালের। এই ধরণের রূপকথা হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই প্রচলিত আছে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিশুরা মা-ঠাকুমার মুখে এগুলি শোনে। এবিষয়ে দীনেশচন্দ্র সেন বলেন – “তাহাদের গৃহের পার্শ্বে খোল করতাল বাজাইয়া এই পাঁচ-ছয়শত বৎসর যাবৎ হিন্দুরা যে পৌরাণিক ধর্ম প্রচার করিতেছে, তাহার একটি বর্ণও মুসলমান গ্রহণ করে নাই। প্রহ্লাদের ভক্তি, ধ্রুবের তপস্যা, রাম-রাবণের যুদ্ধ, কুরুপাণ্ডবের কীর্তিকথা মুসলমানগণ গ্রহণ করে নাই। কিন্তু কাঞ্চনমালা ও পুষ্পমালার রূপকথা সখীসোনার গীতিকথা তাহারা মাতৃক্রোড়ে বসিয়া এখনও শুনিয়া থাকে।” মুসলমান প্রভাবে আরব্য উপন্যাসের গল্প, পারস্য উপন্যাসের গল্প, চাহার-দরবেশের গল্প, লায়লা-মজনুর গল্প বাংলার রূপকথার ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।
রূপকথার গল্পগুলো বেশীরভাগই রাজাদের কাহিনী হলেও তাতে ইতিহাসের খুব একটা ছায়া পড়েনি।মঙ্গলকাব্যগুলির মত রূপকথাগুলি থেকেও বাংলার সামাজিক ইতিহাস বিষয়ক অনেক তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে। ইতিহাস প্রাচীন হলে তাতে প্রক্ষিপ্ত অংশ থাকার সম্ভাবনা থাকে, একথা রূপকথার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বিজয়সিংহের সিংহল বিজয়ের কাহিনীর মধ্যে রূপকথার বিষয়বস্তুর সমাবেশ ঘটেছে। এর ফলে বিজয়সিংহের সেই অভিযানের ঐতিহাসিকতা কতটা সেবিষয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকেই যায়। এমনও হতে পারে চণ্ডীমঙ্গলের কাহিনী হয়ত সেই ঐতিহাসিক অভিযান থেকেই সৃষ্টি হয়েছে।
রূপকথার গল্পে রাজপুত্রের মত সওদাগরপুত্রের কথাও পাওয়া যায়। এর থেকে স্বাভাবিকভাবেই অনুমান করা যায় দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের যথেষ্ট প্রসার ঘটেছিল। তাছাড়া বিভিন্ন রূপকথায় সমুদ্রযাত্রার প্রসঙ্গ এসেছে। সপ্তডিঙা মধুকর নিয়ে সওদাগর সাতসমুদ্র পারে বাণিজ্যযাত্রায় বেরিয়েছে, সোনাদানা মণিমাণিক্য নিয়ে তারা ফিরেও এসেছে। আধুনিক যুগের কবি লিখেছেন –
“সপ্তডিঙায় বঙ্গদেশ,
স্মরি তব সাধু বৈশ্যশক্তি স্মরি তব আজ শ্রেষ্ঠীবেশ।
অয়ুত নাবিক লইয়া সঙ্গে যাত্রা করিত একদা রঙ্গে
শত শ্রীমন্ত, ধনপতি, চাঁদ তুচ্ছ করিয়া মহাসাগর
তুচ্ছ করিয়া তুফান ঝড়।।
- – – – – – – – – – – – – – – – – – – – – –
সপ্তডিঙায় বঙ্গদেশ,
স্মরি সেই দিন ছিল না যে দিন কোন উদ্বেগ চিন্তা লেশ।
নিজ নিজ গ্রামে মিলিত সকলি সাত মধুকর আনিত কেবলি
গন্ধদ্রব্য বিদেশ হইতে আর মোতি মণি হিরণ হার
বিদেশ বহিয়া পণ্যভার।।”
মঙ্গলকাব্যের কাহিনীগুলিও রপকথার মত ধর্মবিশিষ্ট। চণ্ডীমঙ্গল ও মনসামঙ্গল কাব্যে রাজপুত্র বা সওদাগরপুত্রকে আমরা অভিযানে রওনা হতে দেখি। যখন তারা দেবীর কৃপা লাভ করছে তখন তাদের তরী ধনসম্পদে পূর্ণ হয়ে উঠছে, আবার যখন তাদের প্রতি দেবী বিরূপ হয়েছেন তখন তীরের কাছে এসেও তাদের তরী ডুবছে। কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে দেবীর কাছে মার্জনা চাইলে আবার তারা যা হারিয়েছে সব ফিরে পাচ্ছে। ধর্মমঙ্গল কাব্য তো পুরোপুরি রূপকথার সমষ্টি। ধর্মের কৃপায় অজেয় লাউসেনের বীরত্বের কাহিনী সন্দেহাতীতভাবে রূপকথা, অন্তত বাস্তবের সঙ্গে তার যোগ সামান্যই। আসলে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে গদ্যভাষায় উপন্যাস রচনার প্রথা ছিল না, তাই কাহিনীগুলি কাব্যের আকারে লেখা হত। কাব্যরূপে রচিত এই কাহিনীগুলি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবতাবর্জিত এবং শ্রেণীগতভাবে রূপকথার মত একই ধর্মবিশিষ্ট।
আধুনিক যুগে যাঁরা রূপকথার গল্প লিখেছেন তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী ভাষায় প্রাচীনত্বের বৈশিষ্ট্য আরোপ করতে হয় ও গল্প বলার ভঙ্গীর ক্ষেত্রে কৌশল অবলম্বন করতে হয়। আজকের দিনে তো আর তেপান্তরের মাঠ, পরীর দেশ বা ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী পাখির অস্তিত্ব নেই। তাই সুদূর প্রাচীনকালে মনকে নিয়ে যেতে হলে তার জন্য যথোপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা দরকার। এই পরিবেশ সৃষ্টির সহায়ক হয় গল্পের ভাষা, প্রকাশভঙ্গী, রচনাকৌশল, ছড়া ও গান, রোমান্টিক বাতাবরণ প্রভৃতি। তাছাড়া রূপকথায় নিত্যকার জীবনযাত্রার মধ্যে অপ্রাকৃত পরিবেশ সৃষ্টিরও প্রয়োজন হয়। এই কারণে গল্পের ভিতর নানারকম বিচিত্র শব্দসমষ্টির ব্যবহার করা হয়। গল্পে ব্যবহৃত বিভিন্ন ছড়া ও মন্ত্রের মধ্যে অনেক সময় রহস্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। উদাহরণ হিসেবে একটি সাপের মন্ত্র উদ্ধৃত করা হল –
“হস্ত সারম্ গলা সারম্ আর সারম্ মুখ।
পেট পিঠ চরণ সারম্ আর সারম্ বুক।।
পেট পিঠ চরণ সাতি মনসার বরে।
লক্ষঃ লক্ষঃ বাণঃ কুমারের কি করিত পারে।।
কাউরের কামিক্ষি দেবী দিয়ে গেল বরঃ।
কালীর বিন্দ রাজা বলে অমুক হৈলা অমরঃ।।”
এখানে সংস্কৃতের মত হসন্ত ও বিসর্গ ব্যবহার করে মন্ত্রটিতে একদিকে যেমন প্রাচীনত্ব আরোপ করা হয়েছে তেমনই অন্যদিকে পবিত্রতা যোগ করার চেষ্টা করা হয়েছে। এর কারণ অজ্ঞ মানুষেরা সংস্কৃত মন্ত্র শুনছে মনে করে কিছুটা মানসিক তৃপ্তিলাভ করবে।
শিশুরা যেমন ঠাকুরমার কাছে মন দিয়ে রূপকথার গল্প শুনত, ঠিক তেমনই গ্রামবাংলার রমণী ও গৃহস্থরা কথক ঠাকুরের কাছে পাঁচালী শুনত। পাঁচালীগুলিও তো একরকম রূপকথাই – সেগুলিতে দেবদেবীর সঙ্গে সাধারণ গৃহস্থের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা বলা হত। এক একটি নির্দিষ্ট বারে শনি, মনসা বা সত্যনারায়ণের পাঁচালীর কথকতা শুনে সাধারণ মানুষ সাহিত্যের রস আস্বাদন করত। ব্রতকথাগুলিও পাঁচালীর পর্যায়েই পড়ে। এখানে দেখা যায় দেবদেবীরা প্রায়ই মর্তের মাটিতে নেমে আসতেন, ভক্তের উপর সন্তুষ্ট তাঁরা বর দিয়ে যেতেন। ব্রতকথার গল্পগুলো তো রূপকথারই অঙ্গ বলে স্বীকৃত। বিভিন্ন ব্রত পালনের সঙ্গে পল্লীরমণীরা এগুলি ভক্তিভরে শুনতেন। বস্তুত প্রাচীন বাংলার লৌকিক সংস্কৃতি রূপকথা, ব্রতকথা, ছড়া, প্রবাদ-প্রবচন, পাঁচালী, পল্লীগীতি প্রভৃতির মধ্যেই রক্ষিত আছে। রূপকথার মধ্যেই ছড়া, গান, কুলজি, প্রবাদ, গাথা প্রভৃতি সন্নিবিষ্ট থাকত। সেদিক থেকে বিচার করলে রূকথাগুলিকে আমরা লোক-সংস্কৃতির আকর বলে ধরতে পারি।
রূপকথার গল্পের মধ্যে একটা সহজ স্বাভাবিকতা আছে। তাছাড়া রূপকথাগুলির ভাষা এবং বলার ভঙ্গীও প্রাচীনতার বৈশিষ্ট্যযুক্ত। যদি রূপকথার গল্প খুব প্রাচীন হয় তাহলে তার মধ্যে সে আমলের মানুষের সহজ সরল জীবনযাত্রার ছবি পাওয়া যেতে পারে। তাই সংগ্রাহকদের অন্যতম লক্ষ্য সেগুলিকে যতটা সম্ভব অক্ষুণ্ণ ও অবিকৃত রাখা। রূপকথার গল্পের মধ্যে কৃত্রিমতার কোনও স্থান নেই। এই ধরণের অনেক গল্পই গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে আছে।



