১৭ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৭ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

This entry is part 17 of 26 in the series এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৫ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৬ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৭ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৮ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

৯ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১০ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা – দশম পর্ব

১১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৫ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৬ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৭ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৮ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

 ১৯ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২০ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২১ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২২ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২৩ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২৪ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

২৫ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

The Blind Owl

কাহিনিকার: সাদেঘ হেদায়েত

বঙ্গানুবাদ: সুপর্ণা বোস

                     
সপ্তদশ পর্ব

ধাইমা আমাকে একেবারে শিশুর মতোই পরিচর্যা করতেন।এমনকি আমার কফথুতুর মত বর্জ‍্যগুলিও তিনি দেখতে চাইতেন!নিজে হাতে আমার চুলদাড়ি আঁচড়ে দিতেন।আমি ঘরে ঢুকলে আমার এলোমেলো টুপিটাও ঠিক করে দিতেন।তাঁর কাছে আমার কোনো লজ্জা ছিল না।যদিও সে অর্থে তিনি আমার কেউ নন অথচ আমার জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন।আমার খুব ভালো মনে পড়ে,আমি আর সেই বেশ‍্যাটি যখন বেশ ছোটোছিলাম তখন আমাদের দুজনের বিছানা করা হতো একটা কোরশির ওপর!আর ধাইমা ঠিক তার নিচেই নিজের বিছানাটি বিছিয়ে নিতেন!ভোরবেলা ঘুম ভেঙেই আমি দরজার পর্দাটার দিকে দেখতাম,একটা অদ্ভুত ভয়ানক পর্দা! সেখানে অদ্ভুত সুতোর নকশা জীবন্ত হয়ে উঠত,একজন ভারতীয় যোগীদের মত মাথায় পাগড়ি বাঁধা ন‍্যুব্জ‍দেহের বৃদ্ধ একটি সাইপ্রাস গাছের নিচে বসে আছে। তার হাতে সেতারের মত একটি যন্ত্র! সামনে ভারতীয় দেবদাসীর মত এক অতীব সুন্দরী যুবতী যার হাত দুটি শৃঙ্খলিত!দেখে মনে হচ্ছে যেন তাকে ওই বৃদ্ধের সামনে নৃত‍্য করতে বাধ‍্য করা হচ্ছে!লোকটার সাদা চুলদাড়ি আর পোশাক আসাক দেখে আমার মনে হচ্ছিল লোকটাকে বোধহয় অন্ধকূপে ঢুকিয়ে ভেতরে কালনাগ ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল!এটা ছিল সেই সোনার কারুকাজ করা পর্দাটা যেটা আমার বাবা অথবা কাকা বহুদূর দেশ থেকে পাঠিয়ে ছিলেন!এটার দিকে খানিক্ষণ চেয়ে থাকার পর কেমন জানি ভয় ভয় করত!আমি ধাইমাকে ডেকে তুললে তিনি আমাকে জাপ্টে ধরতেন আর তার দুর্গন্ধ শ্বাস আর খসখসে কালো চুলের ঝাপটা লাগত আমার মুখে!আজ সকালে যখন আমি জেগে উঠলাম তিনি ঠিক একই কান্ড করলেন। এখন কেবল তার মুখের বলিরেখাগুলো আরো প্রকট হয়েছে!ইদানিং প্রায়শই নিজেকে ভুলতে চেয়ে!নিজের কাছ থেকে পালাতে চেয়ে আমি আমার ছোটোবেলার সেইসব স্মৃতির কাছে আশ্রয় নিতাম!এটা আমাকে অসুখের আগের আমিকে অনুভব করতে সাহায্য করত।আমি যে একদা সুস্থ সমর্থ ছিলাম সেই অনুভূতি দিত।আমার মনে হত আমি যেন একটা শিশু আর আমার মধ‍্যেকার দ্বিতীয় শিশুটি আমাকে করুণা করছে!সে এই মরণাপন্ন শিশুটিকে করুণা করছে!আমার ভয় ও যন্ত্রণার মুহূর্তগুলিতে ধাইমার ফ‍্যাকাশে মুখ,শান্ত নিস্প্রভ কোটরাগত চোখ ক্ষুদ্র নাকেরপাটা আর উঁচু কপাল আমার সেইসব পুরনো স্মৃতি ফিরিয়ে আনত।তবু তার এমন এক রহস‍্যময়ী আভা ছিল যা আমাকে স্বস্তি দিত!ধাইমার কপালে একটি চুলেঢাকা বড়োসড়ো আঁচিল ছিল যেটা প্রতিবার নতুন মনে হতো!তাঁর শরীরে বাহ‍্যিক পরিবর্তন এলেও চিন্তা ভাবনায় বিশেষ বদল ঘটেনি।তার জীবনের প্রতি আকাঙ্খা বাড়ছিল আর পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল মৃত‍্যুভয়!তাঁকে দেখে আমার পাতাঝরার মরশুমে ঘরের ভিতর আশ্রয় নেওয়া পতঙ্গগুলোর কথা মনে পড়ছিল।

আমার জীবন প্রায় প্রতিক্ষণেই বদলে যাচ্ছিল!যে বদল আসতে সচরাচর যা সময় লাগে তার থেকে হাজারগুণ দ্রুততার সঙ্গে!অথচ সেই বদল থেকে যে সুখটুকু আমার প্রাপ‍্য ছিল তাকে বাড়ানো তো দূরে থাক বরং কমিয়ে ফেলছিল।শেষমেশ শূন‍্য হয়ে গেল!কেউ বিশ বছর বয়স থেকেই মৃত‍্যুর সঙ্গে লড়তে শুরু করে আবার কেউ হুট করে মরে যায়!সে মৃত‍্যু বড় সুন্দর!বড় শান্তির!যেন দপ করে নিভে যাওয়া এক তেল ফুরনো প্রদীপ!

দুপুরবেলায় যখন ধাইমা আমার জন‍্যে স‍্যুপ নিয়ে এলো আমি স‍্যুপের বাটিটা উল্টে দিয়ে তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠলাম।সে এমন চিৎকার যে বাড়ির মধ‍্যে যে যেখানে ছিল ছুটে এলো দরজার মুখে!সেই বেশ‍্যাটাও এসেছিল কিন্ত দাঁড়ায়নি বেশিক্ষণ।আমি তার পেটের দিকে দেখেছিলাম।উঁচু হয়েছিল।নাহ্ পেটের বাচ্ছাটাকে এখনো রেখে দিয়েছে।ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছিল ওরা!আমার বেশ মজা লাগল যে এই মূর্খগুলোকে অন্তত কিছুটা ফাঁপরে ফেলতে পেরেছি যা হোক!ডাক্তারটার ইয়াব্বড় দাড়ি, আমাকে তামাক টানতে দিয়েছিল!আমার যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবনে তামাক এক মহৌষধ বটে!যত টানছি ততই আমার ভাবনাগুলো দীর্ঘ আর সূক্ষ্ম আর জাদুকরী হয়ে উঠছে!তারা গগনচুম্বী হয়ে উঠল!আর আমি যেন তূরীয় অবস্থা প্রাপ্ত হলাম!আমর ভাবনা ও কল্পনা যেকোনো রকম পার্থিব জগতের টান ও ভার থেকে মুক্ত হয়ে পড়ল।আমি পরম শান্তি ও নিশব্দে স্থিত হলাম।মনে হচ্ছিল আমি কোনো সোনালি বাদুড়ের ডানায় বসে আলোকিত মহাশূন‍্যে অবাধে বিচরণ করছি!
সে যে কী প্রগাঢ় আর আনন্দময় অনুভব যেন মৃত‍্যুর নেশাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

আমি গড়গড়াটা ফেলে উঠোনের দিকের জানলাটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।ধাইমা রোদ্দুরে বসে সব্জি ধুচ্ছিল।আমি তাকে তার পুত্রবধূকে বলতে শুনলাম,’ভয়ে আমাদের প্রাণ উড়ে গেছিল।ভগবান ওকে মৃত‍্যু দিয়ে এই নরক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিন।’ আমি শুনেছিলাম ডাক্তার বলেছিলেন আমি আর কখনোই সেরে উঠব না। আমি মোটেও অবাক হইনি।মানুষজন কী যে বোকা!তার একঘন্টা পরেই একবাটি কাড়া নিয়ে হাজির!চোখদুটো কেঁদে কেঁদে টকটকে লাল হয়ে ফুলে গেছে!এদিকে আমার সামনে জোরকরে হাসছে!ওরা সব অভিনয় করছিল কিন্তু ঠিকঠাক পেরেও উঠছিল না!ওরা কি ভাবছিল আমি কিছুই বুঝছি না?
যাইহোক,কেন যে এই মহিলা আমায় এতো ভালোবাসে কে জানে!কেন সে নিজেকে আমার যন্ত্রণার সহভাগী মনে করে?সে তো কেবল কটা টাকার বিনিময়ে তার বুকের দুধের বালতির কালো কোঁচকানো বোঁটা আমার মুখে গুঁজে দিয়েছিল বৈ তো নয়!কুষ্ঠ হোক ওর ওই স্তনে।এখন ওই বুকের দিকে তাকিয়ে ভাবলেও বমি আসে যে ওই বুক থেকেই একদিন প্রাণরস চুষেছি আর আমাদের শরীরের উষ্ণতা মিলেমিশে এক হয়ে গেছে।

একজন বেহায়া বিধবার মত ব‍্যবহার করবে আমার সাথে?কেন না একদিন সে আমাকে তেল মালিশ করেছে!কারণ আমি যখন শিশু ছিলাম তখন সে আমাকে কোলে করে হাগামোতা করিয়েছে? সে আমাকে তার সমপ্রেমের সঙ্গী অথবা পাতানো বোনের মত ব‍্যবহার করেছে কিনা তাই বা কে জানে!যেমন কোনো কোনো মহিলা নিজেদের মত বন্দোবস্ত করে নেয় আর কি!
সে নাকি আমার দেখভাল করছে!দারুণ কৌতুহল আর মনোযোগ দিয়ে করছে!আমার স্ত্রী মানে ওই বেশ‍্যাটা যদি একটুও আমার দেখভাল করত তাহলে কি আমি একে আমার ত্রিসীমানায় আসতে দিতাম?যদ্দূর আমার ধারনা,আমার স্ত্রীর চিন্তা ভাবনা, নান্দনিকবোধ এর থেকে শতগুণে ভালো।তবে আমার ভিতরের যৌনতাড়না খুব লজ্জায় ফেলে দিত সেজন‍্যেই আমি ধাইমাকে একটু কম লজ্জা পাই।সেইজন‍্যেই সে আমার দেখাশোনা করে।ধাইমা মনে করে তার ভাগ‍্যই তাকে এই ধরনের কাজকর্ম করাচ্ছে।
আমার অসুস্থতার অজুহাতে সে আমাকে তার পরিবারের পুঙ্খানুপুঙ্খ ঘটনাবলি শোনাতে লেগে গেল:তাদের আনন্দ,তাদের ঝগড়াঝাটি;সে তার ভিখারিসুলভ ধুরন্ধর মনের কোণাকাঞ্চি খুলে দেখাতে থাকল।সে নাকি তার বৌমাকে নিয়ে মোটেই খুশি নয়!যেন সে নাকি দ্বিতীয় স্ত্রী, তার ছেলের সবটুকু আদর সোহাগ কেড়ে নিচ্ছে!সে এক অবর্ণনীয় প্রতিহিংসাপরায়ণ সুরে এইসব কথাগুলি বলে যেত।তার বৌমাটি নিশ্চয়ই বেশ সুন্দরী ছিল!আমি উঠোনের দিকের জানলা দিয়ে দেখেছি তাকে,কটাচোখ,সোনালি চুল আর ছোট্ট সোজা নাক।
কখনো আবার ধাইমা সাধুসন্তদের অলৌকিক কার্যকলাপের কথাও বলত। সে ভাবত এসব শুনে আমি বেশ আশাভরসা পাবো কিন্তু আদপে আমি তার এই নিম্নমানের ভাবনাচিন্তা ও বোকামি দেখে বিরক্ত বোধ করতাম।মাঝেমাঝে সে এসব নিন্দাচর্চা করার জন‍্যেই আমার কাছে আসত।এই যেমন দিন কতক আগে সে আমাকে বলেছিল,তার মেয়ে মানে সেই বেশ‍্যাটা নাকি শিশুটির জন‍্যে,তার নিজের অনাগত সন্তানটির জন‍্যে কফিনের পোশাক সেলাই করছে!সে এমনভাবে বলছে যেন এই কথাটা বলে সে আমায় খানিকটা মলমপটি করতে পারল।মাঝেমাঝে সে পাড়া বেড়িয়ে আমার জন‍্যে কীসব দৈব ওষুধ নিয়ে আসে।সেই লোকটা,যে নাকি ভাগ‍্য গননা করে।আসলে জাদুকর, গনৎকার,হাতুড়ে ডাক্তার,ওঝা যে কারোর সঙ্গেই সে আমার অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করে।
গেল বুধবার,একান্ন সালের;সে এইসব চুগলখোরি করতে বেরিয়ে ছিল;ফিরে এলো একবাটি পেঁয়াজ,চাল আর খানিকটা পোড়াতেল নিয়ে। বলে ভিক্ষা করে এনেছে!এগুলো নাকি আমার স্বাস্থের উন্নতি ঘটাবে!এই সব আমাকে গোপনে গেলাবে।তারমধ‍্যেই আবার ডাক্তারের নিদান,দুনিয়ার ভেষজ ওষুধ,সেও খেতে হবে!
যতরাজ‍্যের অশুভ আঁতাত!গন্ধলতা,যষ্ঠিমধু, কর্পূর, ফার্ণ,ক‍্যামোমাইল,তেজপাতার তেল,তিসির তেল,দেবদারুর তেল,মাড়,লন্ডন রকেট বীজ…এরকম হাজারো আলবাল!
দিন কতক আগে একখানা ধুলি ধুসরিত প্রার্থনা- পুস্তক এনে হাজির করলেন!না তো কোনো প্রার্থনার হইহল্লা নাই তার বইয়ের প্রজ্ঞা!কোনোটিই আমার কাজের নয়।তাদের এই গাঁজাখুরি আর ভড়ং আমার কোন কম্মে লাগবে শুনি?

এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

১৬ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা ১৮ : এক দৃষ্টিহীন পেঁচা

Author

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook
Twitter
LinkedIn

বর্তমান কভার স্টোরি

 : ঊর্ণনাভ

ধারাবাহিক উপন্যাস শ্যামলী রক্ষিত ঊনবিংশতি অধ্যায়  যেদিন প্রথম তার গালের এই সাদা দাগের ছিটেটা দেখতে পেয়েছিল, সেদিনের কথাটা কোনোদিন ভুলবে না মালবিকা! বিকেলে জবজবে করে

Read More »

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

পূর্ববর্তী কভার স্টোরি

 : ঊর্ণনাভ

ধারাবাহিক উপন্যাস শ্যামলী রক্ষিত ঊনবিংশতি অধ্যায়  যেদিন প্রথম তার গালের এই সাদা দাগের ছিটেটা দেখতে পেয়েছিল, সেদিনের কথাটা কোনোদিন ভুলবে না মালবিকা! বিকেলে জবজবে করে

Read More »

সলিল সমাধি

ধারাবাহিক অনুবাদ উপন্যাস ( অসমিয়া ) রাজীব বরা [ রাজীব বরা ১৯৭০ সনে অসমের মাজুলীতে জন্মগ্রহণ করেন।ডিব্রগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৪ সনে অসমিয়া সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে

Read More »

কালের প্রহরী

শুভাশিস ঘোষ  অষ্টম পর্ব চোদ্দো অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলেন গান্ধিজি। তাঁর সঙ্গে মতিলাল নেহেরু, চিত্তরঞ্জন দাশদের মতের মিল হল না। তাঁরা তৈরি করলেন স্বরাজ

Read More »